চিতা বহ্নিমান

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষ হয়ে গিয়েছে। আঠারো দিনের যুদ্ধ। আঠারো অক্ষৌহিণী সৈন্য নিধন হয়েছে। কুরুক্ষেত্রটি যেন যজ্ঞকুণ্ড। নরমেধ যজ্ঞ। প্রতিদিন গড়ে দুই লাখ আঠারো হাজার সাতশো জন মানুষ বিসর্জিত হয়েছে এই নরমেধ যজ্ঞকুণ্ডে। কুরুক্ষেত্রকে শুধু নরমেধ যজ্ঞকুণ্ড বললে ভুল হবে। এটি পশুমেধ যজ্ঞকুণ্ডও। এই যুদ্ধে হস্তি এবং অশ্বও কম নিহত হয়নি। মনুষ্য শোণিতের সঙ্গে পশুরক্ত মিশে কুরুক্ষেত্রে রক্তের প্লাবন বয়ে গেছে। কুরুক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে হিরণ¦তী নদী প্রবাহিত। কুরুক্ষেত্রে অবিরত নির্ঝরিত রক্তের ফোয়ারা ওই নদীজলের রং পালটে দিয়েছে। 

দিনে দিনে পশু-মনুষ্যের মৃতদেহ জমেছে কুরুক্ষেত্রে। প্রথমে ঢিবি, পরে টিলা, শেষের দিকে ছোটখাটো পাহাড়ের রূপ নিতে শুরু করেছে। খুব বেশি মৃতদেহ সরানো যায়নি কুরুক্ষেত্র থেকে। প্রথমদিকে শুধু দিনের বেলায়, শেষের দিকে দিন এবং রাত জুড়ে যুদ্ধ চলেছে। ফলে শবের ওপরে শব স্তরাকারে জমেছে। প্রথম কদিনের যুদ্ধে চিতা জ্বললেও শেষের দিকে কৌরব-পাণ্ডব যোদ্ধারা এতই উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল যে, হত্যা ছাড়া সৎকারের কোনো চিন্তাই মাথায় আনেনি তারা।

কিছু বিশিষ্ট যোদ্ধার মৃতদেহের সৎকার হয়েছে। মৃত্যুর পর চিতা জ্বলেছে ভীষ্মের, দ্রোণের, কর্ণের, দুর্যোধনের ভাইদের, শকুনির, অভিমন্যুর, বিরাট ও ধ্রুপদ রাজার এবং আরো কিছু খ্যাতিমান ব্যক্তির। সাধারণ যোদ্ধাদের

ছিন্ন-খণ্ডিত দেহকে চিতায় তোলা হয়নি। এদের দেহ শকুনে-চিলে,

শেয়ালে-হায়নায় ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়েছে।

সাধারণ সৈনিকের দলে ঘটোৎকচও পড়েছে। যদিও ভীমের এই অনার্য পুত্রটি একজন সাধারণ মানুষ ছিল না। ছিল মহাবীর, ছিল অনার্য-সমাজের দোর্দণ্ড প্রতাপী যোদ্ধা। যুধিষ্ঠিরের আহ্বানে এক অক্ষৌহিণী রাক্ষসসৈন্য নিয়ে কুরুক্ষেত্রে পিতৃঋণ শোধ করতে এসেছিল ঘটোৎকচ। চতুর্দশ দিনের দিবাগত রাত্রির যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন ঘটোৎকচ। কৃষ্ণ এবং অর্জুন – দুজনেই ঘটোৎকচকে কর্ণের একবীরঘাতিনী বৈজয়ন্তী বাণের সামনে ঠেলে দিয়েছিলেন। ঘটোৎকচ নিজের প্রাণ দিয়ে পিতৃব্য অর্জুনের প্রাণ বাঁচিয়েছিল। নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে অনার্য হিড়িম্বাপুত্র ঘটোৎকচকে ঠেলে দিতে মুহূর্তকালের জন্য বুক কাঁপেনি কৃষ্ণার্জুনের। একজন অনার্যের মৃত্যুতে আর্য অর্জুন এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী কৃষ্ণের কী বা আসে যায়!

ঘটোৎকচের মৃত্যুশেষে পাণ্ডবপক্ষে হা-হুতাশ হয়েছে; কিন্তু তার মৃতদেহের সৎকার করা হয়নি। ঘটোৎকচের মৃত্যুর পর আরো চারদিন যুদ্ধ চলেছিল। আঠারোতম দিনে কৌরবদের পতন হয়েছে। ওই দিনেরই রাতে পাতানো দ্বন্দ্বযুদ্ধে ভীম অন্যায়ভাবে দুর্যোধনের ঊরু ভেঙেছে। এই পাঁচদিন ঘটোৎকচের বিরাটাকার মৃতদেহটির কিছু অংশ শকুন-শেয়াল-হায়েনায় খেয়েছে। অবশিষ্টাংশ

পচে-গলে একাকার হয়েছে।

দুর্যোধন-বিজয়ের পর কুরুক্ষেত্রের শবগুলোর সৎকারের আদেশ দিয়েছে যুধিষ্ঠির। কিন্তু তখন অত সৈন্য কোথায় যে শতসহস্র মৃতদেহকে চিতায় তোলে! কুরুক্ষেত্রে ছড়িয়ে থাকা পশু-মনুষ্য নির্বিশেষে সবাইকে স্তূপীকৃত করা হয়েছে স্থানে স্থানে। তারপর সেই সম্মিলিত দেহস্তূপে আগুন লাগানো হয়েছে। সেই আগুনে হাতি-ঘোড়া, আর্য-অনার্য একত্রে জ্বলে ছাই হয়েছে। ভস্মীভূত হয়েছে পাণ্ডবদের প্রথম সন্তান হিড়িম্বাপুর অধিপতি অনার্য রাক্ষস ঘটোৎকচও।

যুদ্ধশেষে পাণ্ডবদের কেউই, এমনকি ভীমও আর্যজন্মা বিড়ম্বিত ঘটোৎকচের কথা তেমন করে স্মরণে রাখেনি।

উনিশতম দিনের সকাল। কৃষ্ণের মনে জয়োল্লাস। পঞ্চপাণ্ডবের মনে নানা প্রতিক্রিয়া। যুধিষ্ঠির ধর্মবোধ-তাড়িত। তার মনে হচ্ছে – এ-জয়ে সুখ নেই। বারবার অন্যায় করে তারা কৌরবদের হারিয়েছে। বাহুবলের চেয়ে মিথ্যা বলে জিতেছে তারা। অর্জুনের মনেও গভীর অতৃপ্তি। পিতৃতুল্য দ্রোণাচার্যের হত্যার পেছনে তারও সক্রিয় ভূমিকা ছিল। যে-কর্ণ সুযোগ পেয়ে তাকে হত্যা করেনি, সেই কর্ণকে অস্ত্রহীন অবস্থায় আক্রমণ করেছে। শুধু তো আক্রমণ নয়,

রথচক্র-উত্তোলন অবস্থায় হত্যা করেছে কর্ণকে। কৃষ্ণের মিথ্যাচারকে পুঁজি করে জয়দ্রথকে হত্যা করেছে অর্জুন। এই জয়দ্রথ দুর্যোধনদের একমাত্র বোন দুঃশলার স্বামী। দুর্যোধনদের বোন মানে তারও তো বোন! কিন্তু নিষ্ঠুর অর্জুন জয়দ্রথ হত্যাকাণ্ডের সময় তা মনে রাখেনি। ভাগ্নে অভিমন্যুকে চক্রব্যূহের মধ্যে হত্যার জন্য জয়দ্রথকে দায়ী করেছে অর্জুন। অথচ জয়দ্রথ নিজে অভিমন্যু হত্যায় অংশ নেয়নি। অংশ নিয়েছিলেন দ্রোণ, কৃপ, কর্ণ, অশ্বত্থামা, বৃহদ্বল ও কৃতবর্মা। জয়দ্রথ চক্রব্যূহের সম্মুখভাগ পাহারা দিয়েছিল মাত্র। যে-কাজগুলো যুদ্ধের সময় ঠিক বলে মনে হয়েছিল, আজ যুদ্ধশেষে সেগুলোর প্রত্যেকটি অন্যায় বলে মনে হচ্ছে। কৃষ্ণের কাছ থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে জ্বলন্ত চিতাসমূহের দিকে তাকিয়ে এসব কথা ভেবে যাচ্ছে অর্জুন। নকুল-সহদেব শিবিরের বাইরে দাঁড়িয়ে নিম্নস্বরে কী বিষয়ে আলাপ করছে, বোঝা যাচ্ছে না।

একমাত্র ভীমকে দেখে অনুমান করা যাচ্ছে – তার ভেতরের রক্তপাত এখনো বন্ধ হয়নি। চারদিন আগে তার অনার্যপুত্র ঘটোৎকচ নিহত হয়েছে। মৃত্যুমুখে ইচ্ছা করে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল ঘটোৎকচকে। কোন দুইজনের প্ররোচনায় এই ঘটনা ঘটেছে, জানে ভীম। কৃষ্ণই এই দুষ্কর্মের হোতা। কৃষ্ণ বাইরে বলেছে – শুধুমাত্র অর্জুনকে বাঁচানোর জন্যই ঘটোৎকচকে কর্ণের একবীরঘাতিনী অস্ত্রের মুখে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু কৃষ্ণের মনে তো অন্য। ঘটোৎকচের পত্নী কামকটঙ্কটাকে পরাজিত করতে না পারার গ্লানি থেকে কৃষ্ণ হত্যাকাণ্ডটি ঘটিয়েছে। ছিঃ,  কৃষ্ণ ছিঃ!

আলো ফুটে সকাল হয়েছে তখন। পাণ্ডবরা নিজ নিজ শিবির থেকে বেরিয়ে অবস্থানে জমায়েত হয়েছে। অদূরে

কৃষ্ণ দাঁড়িয়ে। তার মুখে হাসি।

আগের দিন মধ্যাহ্নে পরাজয় নিশ্চিত মেনে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে দ্বৈপায়ন হ্রদে আশ্রয় নিয়েছিল দুর্যোধন। বিকেলের দিকে সেখান থেকে ধরে আনা হয়েছে তাকে। কয়েদির মতো বেঁধে টানতে টানতে এতটা পথ রক্তাক্ত দুর্যোধনকে কুরুক্ষেত্রে নিয়ে এসেছে পাণ্ডবরা। এখানেই যুদ্ধ হবে ভীমে আর দুর্যোধনে। আঠারো দিনের যুদ্ধে দুর্যোধনের দেহে অশেষ ক্লান্তি, নিরানব্বই জন ভাই, অসংখ্য আত্মীয়স্বজনকে হারিয়ে মনে গহিন-গভীর বিষণ্নতা। দেহের ক্লান্তি এবং মনের বিপন্নতা কাটিয়ে ওঠার জন্য পাণ্ডবদের কাছে সময় চাইল দুর্যোধন। যে-দুর্যোধন বালকবেলায় ভীমকে জলে ফেলে মারতে চেয়েছিল, বারণাবতের জতুগৃহে মাসহ পঞ্চপাণ্ডবকে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল, কপট পাশাখেলায় সমগ্র রাজ্য কেড়ে নিয়েছিল, দ্রৌপদীকে সভামধ্যে উলঙ্গ করাতে চেয়েছিল, সেই দুর্যোধনকে সুযোগ দিতে রাজি হলো না পাণ্ডবরা। যুধিষ্ঠির বললও তা, ‘তোমার মতো কদাচারী কুলাঙ্গারকে কোনোভাবেই কোনো সুযোগ দিতে সম্মত নই আমরা। তোমাকে আজ, এখনই যুদ্ধ করতেই হবে।’

সিংহপুরুষ দুর্যোধন। যুদ্ধকে ভয় পায় না কোনোভাবেই। যুধিষ্ঠিরের কটু বাক্য শুনে অনুনয়ের দিকে গেল না। জ্বলে উঠল, ‘কাপুরুষ তোমরা। মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে কৃষ্ণের কুমন্ত্রণায় বারবার যুদ্ধনিয়ম ভঙ্গ করে যুদ্ধে জিতেছ তোমরা। ভেবেছ, তোমার কথা শুনে আমি ভড়কে যাব। আমি যে তোমাদের মতো হীনবীর্য নই, জানো তুমি তা। শোন যুধিষ্ঠির, যুদ্ধ আমি করব তোমাদের সঙ্গে। কিন্তু …।’

‘কিন্তু কিন্তু বলে তোমাকে বিভ্রান্ত করতে চাইছে দুর্যোধন। তুমি কুলাঙ্গারের কথা শুনতে যেও না যুধিষ্ঠির।’ বেশ চিবিয়ে চিবিয়ে বলল কৃষ্ণ। ঘৃণাভরে একবার কৃষ্ণের দিকে তাকাল দুর্যোধন। যুধিষ্ঠিরের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যুদ্ধ আমি অবশ্য করব। তোমরা আমাকে নিরস্ত্র করেছ, হাত-পা বেঁধে রেখেছ। আমার প্রতিপক্ষ যারা, তারা সবাই সশস্ত্র। এই অবস্থায় কী করে যুদ্ধ করব, কার সঙ্গে যুদ্ধ করব? যদি সশস্ত্র আমাকে যুদ্ধ করার সুযোগ দাও, তাহলে তোমাদের পাঁচ ভাইকেই যমালয়ে পাঠাব আমি।’

যুধিষ্ঠিরের কী হলো কে জানে! চট করে বলে বসল, ‘তোমাকে একটাই অস্ত্র দেওয়া হবে, যে অস্ত্র তুমি চাও। তা দিয়ে যুদ্ধ করার সুযোগ পাবে তুমি। আর হ্যাঁ …।’ বলে একটু থামল। তারপর বেপরোয়া কণ্ঠে বলে উঠল, ‘তুমি আমাদের পাঁচ ভাইয়ের যে-কোনো একজনকে বেছে নাও। তাকে যদি পরাস্ত করতে পার, তা হলে তোমার হারানো সমস্ত রাজ্য আমি তোমাকে ফেরত দিয়ে দেব।’

যুধিষ্ঠিরের কথা শুনে সমবেত যোদ্ধাদের মধ্যে হাহাকার ধ্বনি উঠল। কৃষ্ণ না-বলে পারল না, ‘এই যুধিষ্ঠিরটা সারাজীবন যে স্থূলবুদ্ধি, সেই স্থূলবুদ্ধিই থেকে গেল! পাণ্ডবদের আবার ভিক্ষাবৃত্তিই গ্রহণ করতে হবে।’

কৃষ্ণ আর অন্য চার পাণ্ডব ফাঁপরে পড়ে গেল। কী করবে, স্থির করতে পারল না। ভীম, অর্জুনরা কৃষ্ণের মুখের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকল।

দুর্যোধনই বাঁচিয়ে দিলো তাদের। বীরশ্রেষ্ঠদের একজন সে। সে কেন যুধিষ্ঠিরের করুণার পাত্র হবে! তাকে বন্ধনমুক্ত করা হলে দুর্যোধন হাতে গদা তুলে নিল। দুর্যোধন অত্যন্ত বলদৃপ্ত কণ্ঠে যুধিষ্ঠিরকে লক্ষ করে বলল, ‘দেখো যুধিষ্ঠির, আমি কৃষ্ণের মতো ধুরন্ধর নই, আর তোমার মতো বোকা নই। আমি হস্তিনাপুর-অধিপতি ধৃতরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ সন্তান। আমার ধমনিতে বীরের রক্ত প্রবাহিত। আমি তোমার স্থূলবুদ্ধিপ্রসূত প্রস্তাবটি গ্রহণ করলাম না। এই গদা দিয়েই যুদ্ধ করব আমি। তোমাদের ভাইদের মধ্যে যার ইচ্ছে সে আমার সঙ্গে গদাযুদ্ধে অবতীর্ণ হোক। শুধু কথা একটিই – পরাজিত হলে আমার রাজ্য আমাকে ফিরিয়ে দেবে।’

দুর্যোধনের কথা লুফে নিল কৃষ্ণ, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক আছে। জয়ী হলে গোটা সাম্রাজ্য তোমারই হয়ে যাবে দুর্যোধন। তবে তোমার সঙ্গে যুদ্ধ করবে এই ভীম।’ পাশে দাঁড়ানো ভীমকে দেখিয়ে কথা শেষ করল কৃষ্ণ।

বীরের হাসি হেসে দুর্যোধন বলল, ‘আমার সঙ্গে ওই ভীমটাই তো যুদ্ধ করবে। সে কিছুক্ষণ টিকে থাকতে পারবে। অন্য চারজন তো ইঁদুরের বাচ্চা। ওরা কী যুদ্ধ করবে আমার সঙ্গে!’

এরপর দুর্যোধন আর ভীম মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। যেমন রাবণের সামনে রাম। দুজনে মণ্ড হস্তির মতো গদাযুদ্ধ শুরু করল। কিন্তু কেউ কাউকে হারাতে পারছে না। চতুর্দিকে সৈন্যরা, পাণ্ডবরা গোল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভীমের যুদ্ধকৌশল দেখে অর্জুন চিন্তিত হয়ে পড়ল। চাপা কণ্ঠে কৃষ্ণকে বলল, ‘দাদা ভীম বোধহয় দুর্যোধনকে হারাতে পারবে না।’

‘পারবে। তবে কূটকৌশলের আশ্রয় নিতে হবে।’ কৃষ্ণ স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলল।

‘সে কী রকম?’

কৃষ্ণ বলল, ‘যদি ভীম গদার আঘাতে দুর্যোধনের ঊরু ভেঙে দেয়।’

‘তা কী করে হয়!’ অর্জুন কপালে চোখ তুলে বলল, ‘এ তো যুদ্ধের চিরাচরিত নিয়মের বিপরীত কথা! নাভির নিচে গদাঘাত করলে তো অন্যায় যুদ্ধ হবে!’

‘ওই অন্যায় যুদ্ধই করতে হবে ভীমকে। ন্যায়যুদ্ধে ভীম কখনোই দুর্যোধনকে পরাজিত করতে পারবে না। যুদ্ধে জিততে চাইলে, বিজিত রাজ্য নিজেদের দখলে রাখতে চাইলে, অন্যায় যুদ্ধে দুর্যোধনের ঊরুই গুঁড়িয়ে দিতে হবে।’

কৃষ্ণের কথা শুনে অর্জুন সামান্যক্ষণ ভাবল। কৃষ্ণের কথাই তার কাছে যুক্তিযুক্ত বলে মনে হলো। হওয়ারই কথা। কারণ অর্জুন কৃষ্ণের সাঙ্গাত, কুকর্মের দোসর।

যুদ্ধরত দুই বীরের অতি নিকটে এগিয়ে গেল অর্জুন। ভীমের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বারবার নিজের বাঁ ঊরুতে চপেটাঘাত করতে থাকল। কু-ইঙ্গিতটা দ্রুতই বুঝে গেল ভীম। এবং কালবিলম্ব না করে দুর্যোধনের ঊরুতে প্রবল এক গদাঘাত করে বসল ভীম। দুর্যোধন ধুলোমলিন মাটিতে গড়িয়ে পড়ল।

ভূপতিত দুর্যোধনের মাথায় বারবার পদাঘাত করতে থাকল ভীম। বীরপুরুষ ভীম ঠিক সেসময় কাপুরুষে রূপান্তরিত হয়ে গেল।

অর্ধমৃত দুর্যোধনকে অন্ধকারাচ্ছন্ন কুরুক্ষেত্রে ফেলে রেখে শিবিরে ফিরে গিয়েছিল যুধিষ্ঠিররা। মনে তখন বড় সুখ পাণ্ডবদের। পরদিন বিশাল এক আনন্দ তাদের জন্য অপেক্ষা করছে যে!

পরদিন সকালে শিবিরের বাইরে দাঁড়িয়ে পাণ্ডবরা নানা চিন্তায় মগ্ন। কৃষ্ণ বিভোর কীভাবে যুধিষ্ঠিরের

সিংহাসন-আরোহণের দিনটি উদ্যাপন করবে।

ঠিক এই সময় ধৃষ্টদ্যুম্নের সারথিকে প্রাণ হাতে নিয়ে যুধিষ্ঠিরের দিকে দৌড়ে আসতে দেখা গেল। সারথির দৌড়ের ভঙ্গি দেখে পাণ্ডবপুত্ররা অনুমান করল – সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটে গেছে!

বহুবিস্তারী জায়গা জুড়ে পাণ্ডবদের শিবির স্থাপিত। মর্যাদা ভেদে শিবিরগুলোর আকার এবং নিরাপত্তা। পাণ্ডব, কৃষ্ণ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যোদ্ধার যুদ্ধশিবিরের নিরাপত্তা অত্যন্ত কঠোর। যে কেউ সেই নিরাপত্তা-বলয়ে প্রবেশ করতে পারে না। অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ শিবিরগুলোর সুরক্ষাবলয় তত দৃঢ় নয়। সারথি সেরকম একটা সুরক্ষাবৃত্ত থেকে দৌড়ে আসছে। কেন জানি যুধিষ্ঠিরের বুক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল। ওদিকে দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র থাকে যে!

সারথি নিকটে এসে মাটিতে আছড়ে পড়ল। ওই অবস্থাতেই আর্তনাদ করে উঠল সারথি, ‘সর্বনাশ হয়ে গেছে মহারাজ।’

ভীম এক ঝটকায় সারথিটিকে মাটি থেকে টেনে তুলে বলল, ‘স্থির হও। কীসের সর্বনাশের কথা বলছ তুমি!’

ততক্ষণে সবাই সারথিকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। কৃষ্ণ নিকটে এগিয়ে এসেছে।

সারথি নিজেকে সংবরণ করল। কাঁপা কণ্ঠে ধীরে ধীরে বলে গেল, ‘গতরাতে, রাত গভীর তখন, কুরুপক্ষের অশ্বত্থামা,

কৃপাচার্য আর কৃতবর্মা অতর্কিতে রাজকুমারদের শিবিরে প্রবেশ করেছেন।’

অর্জুন আর ধৈর্য ধরে থাকতে পারল না, ‘অত ভূমিকা করছ কেন তুমি? আসল কথাটা সংক্ষেপে বলছ না কেন?’

এই সারথি অর্জুনকে আগে এমন রুদ্রমূর্তিতে দেখেনি। ত্রস্তকণ্ঠে বলল, ‘শিবিরে প্রবেশ করে ওরা ধ্রুপদপুত্রদের এবং আপনাদের পাঁচ …।’ কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেল সারথির।

এমন যে শান্ত যুধিষ্ঠির, সে অশান্ত কণ্ঠে গর্জে উঠল, ‘কী হয়েছে আমাদের পাঁচ পুত্রের, দ্রৌপদীর পাঁচ …!’ বলতে বলতে তারও কণ্ঠ বাষ্পরুদ্ধ হয়ে গেল।

ভগ্নদূত সারথিটি বলল, ‘মহারানি দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্রকে শিবিরের মধ্যেই নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে গেছেন ওই দুরাত্মারা।’

এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত। সমবেত সবাই সমস্বরে হাহাকার করে উঠল। কৃষ্ণ শুধু নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকল। তিনি যেন শোক-ক্রোধ-রহিত এক অনুভূতিহীন পুরুষ!

যুধিষ্ঠির তখন পুত্রশোকে মাটিতে পড়ে অচেতন হয়ে গেছে। ভীম-অর্জুন-নকুল-সহদেবের পরিচর্যায় কিছুক্ষণের মধ্যে যুধিষ্ঠিরের চেতনা ফিরে এলো। ওই অবস্থাতেই যুধিষ্ঠির বুকফাটা আর্তনাদে বলতে থাকল, ‘দুর্যোধনদের হারিয়ে শেষ পর্যন্ত আমরাই পরাজিত হলাম রে ঈশ্বর!’ এই সময় কৃষ্ণের ওপর চোখ পড়ল যুধিষ্ঠিরের। কঠোর গলায় বলল, ‘তুমিই বলো কার পাপে, কার অপরাধে আমাদের পাঁচ ভাইয়ের মাথায় এরকম বজ্রাঘাত নেমে এলো?’

দ্রৌপদীর কথা মনে পড়ে গেল যুধিষ্ঠিরের। নকুলকে উদ্দেশ করে বলল, ‘দ্রৌপদীকে এখানে নিয়ে এসো নকুল। হায় হায়, তাকে আমি কী জবাব দেব! তিনি কী করে পাঁচজন পুত্রের হত্যাশোক সংবরণ করবেন?’ শোকার্ত যুধিষ্ঠির ভাইদের এবং অন্যান্য সুহৃদকে সঙ্গে নিয়ে হত্যাস্থানে উপস্থিত হলো। সবাই দেখল – নিহতদের দেহ ছিন্নভিন্ন এবং মাথা কাটা। ঠিক ওই সময় সেখানে দ্রৌপদী উপস্থিত হলো। এবং দ্রৌপদী জ্ঞান হারাল। মাটিতে পড়ে যাওয়ার আগমুহূর্তে ভীম দ্রৌপদীকে আঁকড়ে ধরল।

ঠিক তখন একজন মধ্যগোছের সেনাপতি এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ‘মহারাজ, দুঃসংবাদ। বিরাট সৈন্যবাহিনী এদিকে ছুটে আসছে। দেখে মনে হচ্ছে শত্রুসৈন্য। আমাদের আক্রমণ করার জন্যই এরা আসছে।’ যুধিষ্ঠির পুত্রশোক ভুলল। কৃষ্ণ উৎকণ্ঠিত হলো। অর্জুন গাণ্ডীবে হাত রাখল। ভীম গদাটা হাতে তুলে নিল। নকুল-সহদেবও সশস্ত্র হলো। এবং সবাই, দ্রৌপদীসমেত, শিবিরের বাইরে ছুটে বেরিয়ে এলো।

বেরিয়ে দেখল – সেই সৈন্যবাহিনী কুরুক্ষেত্রে প্রায় ঢুকেই পড়েছে। নিরীক্ষণ করে বোঝা গেল – এরা রাক্ষসসৈন্য। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া যুধিষ্ঠিরদের আর কোনো উপায় থাকল না। এই মুহূর্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সৈন্যদের একত্রিত করে এই রাক্ষসবাহিনীর মোকাবিলা সম্ভব নয়। কুরুদের এতবড় বাহিনীকে পরাজিত করে শেষমুহূর্তে রাক্ষসদের হাতে প্রাণ দিতে হবে তাদের – দ্রুত ভেবে গেল যুধিষ্ঠির।

এই সময় একটি রাজকীয় রথ এসে যুধিষ্ঠিরদের সম্মুখভাগে থামল। রথ থেকে রাজমহির্ষী ধরনের দুজন নারী বেরিয়ে এলো। তাদের একজন – ভীমের অনার্য-পত্নী হিড়িম্বা, অন্যজন তারই পুত্র ঘটোৎকচের স্ত্রী কামকটঙ্কটা।

এই দুই নারীকে দেখে পাঁচভাই অনেকটাই বাকরহিত হয়ে পড়ল। সবচাইতে বেশি চমকাল কৃষ্ণ। তার মুখমণ্ডলকে অপরাধবোধের কালো ছায়া দ্রুত ঢেকে ফেলল। কৃষ্ণ বিচক্ষণ। মহাসংকটেও নিজেকে স্থির রাখতে জানে। কিছু হয়নি – এমন ভঙ্গি করে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা এখানে? এই সময়ে?’ কৃষ্ণের প্রশ্নকে উপেক্ষা করে হিড়িম্বা ভীমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কঠোর গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘আমার পুত্র ঘটোৎকচ কোথায়?’

আসলে যে-রাতে ঘটোৎকচ কর্ণের হাতে নিহত হয়েছে, ঠিক তার পরদিন প্রত্যুষেই এক রাক্ষসসৈন্য হিড়িম্বাপুরের দিকে ঘোড়া ছুটিয়েছিল। রাক্ষস রাজধানীতে পৌঁছে হিড়িম্বা আর

 কামকটঙ্কটাকে দুই ঘটোৎকচপুত্রের নিধন এবং নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও কর্ণের একবীরঘাতিনী অস্ত্রের সামনে ঘটোৎকচকে ঠেলে দেওয়ার ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বলেছে। স্বামী আর পুত্র শোকে আচ্ছন্ন দুই নারী সেদিনই রথে চড়ে বসেছিল। কুরুক্ষেত্র পর্যন্ত পৌঁছাতে পৌঁছাতে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। অজ্ঞাতনামা সৈন্য ও পশুদের মৃতদেহের সঙ্গে ঘটোৎকচ তখন অগ্নিকুণ্ডে জ্বলছে। কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে তখন অজস্র অস্থায়ী চিতা জ্বলছে। কোন চিতায় যে ঘটোৎকচের দেহ ছাই হচ্ছে, পিতা হয়েও জানে না ভীম। ভীমের কাছে দ্রৌপদীর পুত্ররা যত মূল্যবান, হিড়িম্বাপুত্র ঘটোৎকচ ততটা নয়।

বিভ্রান্ত উদাসী চোখে স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল ভীম। তার বলতে কষ্ট হলো – চারদিন আগের এক রাত্রিযুদ্ধে ঘটোৎকচ নিহত হয়েছে।

এই সময় কৃষ্ণ এগিয়ে এসে বলল, ‘ভীম এবং অন্য চার পাণ্ডবের মাথা এখন স্থির নেই। তারা এখন পুত্রশোকে আচ্ছন্ন।’

‘তাই নাকি?’ একটু ভড়কে গেল হিড়িম্বা। ‘আহারে, ঘটোৎকচের মৃত্যুতে পঞ্চপাণ্ডব এরকম শোকাতুর হয়ে পড়েছে! ভীমের সঙ্গে এরকম কঠোর কণ্ঠে কথা বলা উচিত হয়নি আমার।’ মনে মনে দ্রুত ভেবে গেল হিড়িম্বা। ‘ঘটোৎকচের মৃত্যুতে পঞ্চপাণ্ডব এরকম করে ভেঙে পড়েছে?’ স্পষ্টে বলল হিড়িম্বা।

কৃষ্ণ ক্রোধকে দমন করে রাখতে পারল না। সরোষে বলল, ‘রাখো তোমার ঘটোৎকচের মৃত্যু। কাদের সঙ্গে কার তুলনা করছ। আজ রাতে শিবিরের মধ্যে দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্র খুন হয়েছে। তাদেরই শোকে পাণ্ডবরা এখন মুহ্যমান।’

‘ও তাই নাকি! এই যে সকল পাণ্ডবকে ম্রিয়মাণ দেখছি, তাহলে তা দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্রের শোকে?’ বলে দৃঢ় পায়ে ভীমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল আবার। চোখ পাকিয়ে বলল, ‘তাহলে মধ্যম পাণ্ডব ভীম, তোমার প্রথম পুত্র ঘটোৎকচের জন্য তুমি শোকাতুর নও তেমন? তোমার মধ্যে এই যে হাহাকার দেখছি, তা তাহলে দ্রৌপদীপুত্রদের জন্য? জিজ্ঞেস করছি – আমার পুত্রে ঘটোৎকচের জন্য তাহলে তোমার মধ্যে কোনোই শোককাতরতা নেই?’ মিউ মিউ করে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল ভীম। রাক্ষসীর কণ্ঠে গর্জন করে উঠল হিড়িম্বা, ‘থামো তুমি ভীম। আমার সঙ্গে কোনো অভিনয় করতে যেও না। জানি তো তোমরা ক্ষত্রিয়রা রাক্ষসজাতির মানুষদের আপন বলে ভাবতে শেখোনি। তোমার ঔরসে ঘটোৎকচের জন্ম হয়েছে ঠিক, কিন্তু কখনো তুমি তাকে পুত্রের মর্যাদা দাওনি।’

এই সময় যুধিষ্ঠির আর অর্জুন হিড়িম্বার সামনে এগিয়ে এলো। যুধিষ্ঠির বলল, ‘তুমি আমাদের ভুল বুঝছো হিড়িম্বা। ঘটোৎকচকে কখনো আর্যের চোখে দেখিনি আমরা। অনার্য হলেও সে আমাদের প্রথম পুত্র।’

‘হ্যাঁ, দাদা ঠিকই বলেছে – ঘটোৎকচকে আমরা নিজেদের সন্তান বলেই মানি।’ অর্জুন বলে উঠল।

অনার্যরক্ত হিড়িম্বার শিরায় ছলকে উঠল, ‘তুমি অর্জুন বলছ এই কথা! ঘটোৎকচকে নিজেদের সন্তান বলে মানো তুমি? ছিঃ! মিথ্যে কথাটি বলতে গলা কাঁপছে না তোমার?’ দম নেওয়ার জন্য একটু থামল হিড়িম্বা। ক্রোধী চোখে অর্জুনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সন্তান হিসেবে মানো বলেই তো সেদিনের রাত্রির যুদ্ধে আমার একমাত্র ছেলেটিকে কর্ণের একবীরঘাতিনী অস্ত্রের সামনে ঠেলে দিয়েছিলে, তাই না? দূতের মুখে সব শুনেছি। কার প্ররোচনায় তুমি এই জঘন্য কাজটি করেছো অর্জুন? ওই যে মুখ লুকিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে যে কৃষ্ণ, তারই দুষ্ট বুদ্ধিতে আমার ছেলেটিকে কর্ণের সামনে যেতে জোর করেছিলে তুমি। তাই তো?’ অর্জুন কিছু না-বলে মাথা নিচু করে রাখল। সত্যিই তো কৃষ্ণ সে-রাতে তাকে প্ররোচিত না করলে ঘটোৎকচকে ওভাবে কর্ণের সামনে ঠেলে দিত না অর্জুন।

অর্জুন তার প্রিয়বন্ধু। হিড়িম্বার প্রশ্নের সামনে সে এখন মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। হিড়িম্বার প্রকোপ থেকে অর্জুনকে বাঁচানো দরকার। এক পা, দুই পা করে হিড়িম্বার সামনে এগিয়ে এলো কৃষ্ণ।

ম্যাড়ম্যাড়ে স্বরে বললো, ‘তুমি অর্জুন আর আমাকে ওরকম করে ভুল বুঝো না হিড়িম্বা। সে-রাতে যুদ্ধপরিস্থিতি মোটেই পাণ্ডবদের অনুকূলে ছিল না। সে-রাতেই পাণ্ডবদের পরাজয় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। তোমার বীরপুত্র ঘটোৎকচই সে-রাতে পাণ্ডবদের পরাজয় ঠেকিয়েছিল।’

হা হা করে গলা ফাটিয়ে হিড়িম্বা হেসে উঠেছিল। তার সেই হাসিতে হিংস্রতা। ‘তুমি আমার সঙ্গে চালাকি করতে এসেছ কৃষ্ণ? আমি তোমাকে চিনি না? সে-রাতে পাণ্ডবপক্ষে বুঝি আর কোনো বীর ছিল না? মৎস্যরাজ বিরাট কোথায় ছিলেন? পাঞ্চালরাজ দ্রুপদ? নকুল, সহদেব, ধৃষ্টদ্যুম্ন, যুধমন্যু, সাত্যকি, শিখণ্ডী – এদের নাম ভুলে গিয়েছিলে বুঝি তুমি? নিদেনপক্ষে ভীমের নামটি তো তোমার মনে থাকার কথা! কই ভীমকে তো পাঠাওনি তুমি কর্ণের অস্ত্রের সামনে! এদের কাউকে না পাঠিয়ে কেন আবার পুত্রটিকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিলে কৃষ্ণ, বলো।’

কৃষ্ণ লা-জওয়াব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল। একজন রাক্ষসনারী তাকে এভাবে বেকায়দায় ফেলবে, কখনো ভাবেনি কৃষ্ণ।

এবার এতক্ষণ নিশ্চুপ থাকা ঘটোৎকচপত্নী কামকটঙ্কটা হিড়িম্বার পাশে এসে দাঁড়াল। অকম্পিত কণ্ঠে বলল, ‘কার কাছে কী জিজ্ঞেস করছেন মা! কৃষ্ণ হলেন একজন মিথ্যাবাদী। ধুরন্ধর এবং অনার্যবিদ্বেষী। তিনি সারাটা জীবন ব্রাহ্মণ তথা আর্যদের জয় চেয়েছেন। এই ভারতবর্ষে অনার্য-উত্থান হোক, এটা কখনো চাননি তিনি।’

চট করে কৃষ্ণের দিকে মুখ ফেরাল কামকটঙ্কটা। কর্কশ কণ্ঠে বলল, ‘আমি মিথ্যে বললাম কৃষ্ণ? আপনি শুধু অনার্যবিদ্বেষী নন, অনার্যদের ধ্বংসকামীও। নইলে কেন আমার পুত্র বর্বরীককে বিনা অপরাধে হত্যা করলেন? আমার স্বামী ঘটোৎকচ তাঁর দুই বীর পুত্রকে নিয়ে পাণ্ডব পক্ষেই তো যুদ্ধ করতে এসেছিলেন।’ কৃষ্ণ ভ্রু কুঞ্চিত করে নিজের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগ খণ্ডন করতে চাইল, ‘তোমার পুত্র বর্বরীক সেই সকালে আমার সঙ্গে বেয়াদবি করেছিল।’

কামকটঙ্কটা শাশুড়ির মতো মাথা গরমের নারী নয়। তার কণ্ঠ নিচু, কিন্তু মর্মঘাতী। বলল, ‘শুনুন কৃষ্ণ, প্রতিদিনের ঘটনার বিবরণ সংবাদবাহক দূত আমাদের কাছে পৌঁছে দিত। আর্যদের মিথ্যে বলার স্বভাব। অনার্যরা সহজ-সরল। ওরা মিথ্যে বলে না। দূতও আমাদের কাছে মিথ্যে সংবাদ পৌঁছাত না। সেদিন কী হয়েছিল, আমি বলি?’

কৃষ্ণ দেখল – তার আশেপাশে সবাই আছে, কিন্তু সবাই নিশ্চুপ। এমন যে সুহৃদ যুধিষ্ঠির আর অর্জন, ওরাও তার হয়ে কথা বলছে না। কৃষ্ণ বুঝে গেল – যা বলতে হবে, তাকেই বলতে হবে; আর যা শুনতে হবে, তাকেই শুনতে হবে।

কামকটঙ্কটার দিকে তাকিয়ে থাকল কৃষ্ণ।

কামকটঙ্কটা বলতে শুরু করেছে, কণ্ঠস্বর মৃদু কিন্তু হৃদয়ভেদী, ‘সেদিনের প্রায়-পরাজয়ের কথা মনে আছে আপনার? আমার পিতা মুরু দানবের সঙ্গে আপনার যুদ্ধের কথা?’ খাঁকারি দিয়ে বাষ্পরুদ্ধ গলাটা পরিষ্কার করে নিল কামকটঙ্কটা। তারপর বলল, ‘আপনার হাতে আমার বাবা নিহত হলে আপনার বিরুদ্ধে আমি অস্ত্র তুলে নিয়েছিলাম হাতে। মেয়ে বলে আপনি আমার প্রতি অবহেলা দেখিয়েছিলেন।’

কৃষ্ণ তখন ঘামতে শুরু করেছে। একজন সামান্য দানবীকে পরাজিত করতে না পারার গ্লানির কথা অতগুলো বীর যোদ্ধার সামনে বলে দেবে নাকি কামকটঙ্কটা? তাকে থামাতে চাইল কৃষ্ণ। কিন্তু কী করে থামাবে, সেই কৌশল জানা নেই কৃষ্ণের। নিরুপায় হয়ে কামকটঙ্কটার কথা শুনে যেতে লাগল।

কামকটঙ্কটা বলছে, ‘হেলায় আমার সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করলেও অচিরেই আপনি বুঝতে পারলেন, আমাকে হারানো সহজ নয়। তুমুল যুদ্ধে আপনার জানা সকল যুদ্ধকৌশল প্রয়োগ করলেন আপনি। আপনার কালঘাম ছুটে গেল। ঠিক ওই সময় ওখানে দেবী কামাখ্যা উপস্থিত না হলে আপনি নিশ্চিতরূপে আমার হাতে পরাজিত হতেন। কামাখ্যা দেবী মধ্যস্থতা করে যুদ্ধ থামিয়েছিলেন সেদিন। আমার আরাধ্যা দেবী কামাখ্যার কথা আমি উপেক্ষা করিনি বলে সেদিন পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে আপনাকে ফিরতে হয়নি। আমি সেদিন আপনার অস্ত্রদম্ভকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিলাম।’

বড় একটা শ্বাস ত্যাগ করল কামকটঙ্কটা। বেদনায় চুরচুর কণ্ঠে বলল, ‘এতদিন পরেও সেদিনের সেই প্রায়-পরাজয়ের গ্লানি ভুলতে পারেননি আপনি। হয়তো সেদিন মনে মনে শপথ নিয়েছিলেন – সুযোগ পেলে ওই প্রায়-পরাজয়ের প্রতিশোধ নেবেন আপনি। নিলেনও।’ বলে হু-হু করে কেঁদে উঠল কামকটঙ্কটা। আঁচল চাপা দিয়ে কান্না রোধের আপ্রাণ চেষ্টা করে যেতে থাকল।

শেয়ালকণ্ঠে কৃষ্ণ বলল, ‘এটা তোমার মনগড়া কথা। আমি কোনো প্রতিশোধ-টতিশোধ নিইনি।’ কিন্তু তার কণ্ঠস্বর শুধু সে-ই শুনতে পেল। এত জোরহীন অপরাধমগ্ন কণ্ঠস্বর যে, নিকটে দাঁড়ানো পাণ্ডবরা পর্যন্ত শুনতে পেল না। সংযত হলো কামকটঙ্কটা। কঠোর অথচ কর্কশ গলায় বলল, ‘আপনি নামে কৃষ্ণ, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে অত্যন্ত প্রতিশোধপরায়ণ মিথ্যাবাদী, ধাপ্পাবাজ আপনি। আমার পুত্র বর্বরীককে হত্যা করে আপনি ক্ষান্ত হননি সেদিন। হ্যাঁ, মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগেই নিজ অস্ত্র দিয়ে সবার সামনে আমার ছেলেটিকে হত্যা করেছিলেন আপনি। আমার অন্য পুত্র অঞ্জন পর্বা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে নিহত না হলে কোনো একটা ছলে তাকেও হত্যা করতেন আপনি।’

প্রমাণসহ চোর ধরা পড়লে চোর যেমন করে মুখ লুকায়, কৃষ্ণও সেরকম করে মুখ লুকাতে চাইল।

কিন্তু কামকটঙ্কটাকে আজ কথায় পেয়ে বসেছে। এরকম কলেপড়া কৃষ্ণকে আর কোনোদিন নাও পেতে পারে। তাই সকল দুঃখকথা আজ ঝেড়ে বলতে মনস্থ করেছে কামকটঙ্কটা। বলছে, ‘আমার দুই পুত্র নিধন হবার পর আপনি সিদ্ধান্ত নিলেন রাক্ষসরাজ ঘটোৎকচকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেবেন। সুযোগ খুঁজছিলেন আপনি। সে-রাতে সুযোগ পেয়ে গেলেন। অর্জুনকে বাঁচানোর অজুহাত দেখিয়ে কর্ণের সামনে ঠেলে দিলেন আমার স্বামীকে। একটি সঠিক কথা বলুন আপনি আমাকে – কর্ণ কখনো কি অর্জুনকে মারতে পারতেন? না মারতেন? অর্জুন যে তার সহোদর – সে-কথা তো জানতেন কর্ণ! কর্ণ কখনো সহোদর অর্জুনকে হত্যা করতেন না। সেই কথাটি আপনিও ভালো করে জানতেন। তারপরও সুযোগ হাতছাড়া করলেন না আপনি। অনার্য ঘটোৎকচকে ধ্বংস করার এই তো সুযোগ!’

পাশে দাঁড়ানো হিড়িম্বা উচ্চৈঃস্বরে বলে উঠল, ‘তাহলে এত সব এই কৃষ্ণের অপকৌশলের কারণে হয়েছে?’

‘না মা, শুধু এই কৃষ্ণের কুমন্ত্রণায় এবং কূটপ্রচেষ্টায় যে আপনার পুত্র নিহত হয়েছে, তা নয়। এই কৃষ্ণের সাঙ্গাত ছিলেন আপনার ওই ভাশুর যুধিষ্ঠিরও।’

‘কী বলছ তুমি কামকটঙ্কটা!’

‘ঠিক কথাই বলছি মা। আপনি তাঁকে ডেকে জিজ্ঞেস করুন না।’

নিজের নাম শুনে যুধিষ্ঠির এগিয়ে এলো। কৃষ্ণের পাশে দাঁড়াল।

তখনো কামকটঙ্কটা বলে চলেছে, ‘যুদ্ধজয় সম্পন্ন হয়েছে। আপনার ভাশুর যুধিষ্ঠির হস্তিনাপুরের রাজা হবেন। তিনি বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। খুব বেশিদিন যে রাজত্ব করতে পারবেন, এমন নয়। একদিন তিনি সিংহাসন ত্যাগ করবেন। তারপর সিংহাসনে কে আরোহণ করবেন। প্রথা অনুসারে পরিবারের জ্যেষ্ঠপুত্রই পরবর্তী রাজা হওয়ার অধিকার রাখে। যুধিষ্ঠিরের পর ঘটোৎকচের হস্তিনাপুরের রাজা হওয়ার বিধি। কারণ তিনি যে পাণ্ডবকুলের প্রথম পুত্র!’ গলা শুকিয়ে এসেছে, তারপরও কথা থামাল না কামকটঙ্কটা, ‘কিন্তু ঘটোৎকচ রাজা হবেন কী করে? তিনি যে অনার্য রাক্ষস! একজন অনার্য রাক্ষস কী করে ব্রাহ্মণ্যবাদী হস্তিনা-অধিপতির পরিবর্তে সিংহাসনে বসে! আর্যরা কী করে অনার্য দ্বারা শাসিত হবে? তাই ঘটোৎকচের বংশকে নির্বংশ করা দরকার। কৃষ্ণ আর যুধিষ্ঠির মিলে করলেনও তা।’ বলতে বলতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল কামকটঙ্কটা।

হিড়িম্বা ভীমের দিকে ছুটে গেল। ভীমের বুকে দু-হাতে চাপড় দিতে দিতে জিজ্ঞেস করতে থাকল, ‘আমার পুত্র কোথায়? পুত্র ঘটোৎকচের মৃতদেহটা কোথায় – বলো তুমি। আমি আমার বুকের ধনকে একবার বুকে জড়িয়ে কাঁদতে চাই। বলো তুমি, বলো। আমার-তোমার পুত্র ঘটোৎকচের দেহটি কোথায় রেখেছ? তার মুখটি আমাকে একবার দেখতে দাও ভীম।’

ভীম মুখে কিছু না বলে তার ডান হাতের তর্জনীটা কুরুক্ষেত্র জুড়ে বহ্নিমান চিতাগুলোর দিকে প্রসারিত করল। কোনো একটি বিশেষ চিতাকে নির্দিষ্ট করল না ভীম। কারণ সে নিজেও তো জানে না কোন চিতায় হিড়িম্বাপুত্র ঘটোৎকচ পুড়ে ছাই হচ্ছে।

হিড়িম্বা সেই বহ্নিমান চিতাগুলোর দিকে ছুটে গেল। তার পিছু পিছু কামকটঙ্কটাও। এই দুই অনার্য নারীকে থামানোর চেষ্টা করল না কেউ।

কৃষ্ণের মুখে ক্রূর হাসি তখন। সত্যিই এবার কামকটঙ্কটার বংশধারা পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হবে।

Published :


Comments

Leave a Reply