পক্ষী মারা

‘জয়নাল ঘুমাইছস? ও জয়নাল? পক্ষীটারে মারবি না?’

জয়নাল সারাদিন কেমন যেন ঝিম ধরে শুয়ে থাকে। ওর ঘুমটা নষ্ট করে মরতুজ আবার মিহিকণ্ঠে ডাকতে থাকে। ‘জয়নাল, মুবাইল আনছি। মুবাইল। আরে পিরিতের কতা কবি না! মুবাইল আনছি।’

জয়নাল তো তখন সেখানে ছিল না। শিউলী যেন কেবলি তার মাথায় হাত দিচ্ছে। ছোট্ট ছোট্ট আঙুলের স্পর্শ চুলের ভেতর দিয়ে একেবারে চান্দির মূলে গিয়ে কী যে এক সুখানুভূতি! ‘বাপজান, ও বাপজান, তুমি আইবা না। তুমি না আমারে পুতুল কিন্যা দিবা? বাপজান, আমার ভালো লাগে না।’ শিউলির নরম হাতটা ধরতে ইচ্ছা করল – হাতাকাটা ফ্রকের ছোট্ট শিউলি আমার মা। তখন মনে পড়ল, শিউলি তো এখনো কথা বলতেই শেখেনি।

মরতুজ আবার কানের কাছ ফিসফিস করে ডাকল, ‘জয়নাল, অ্যাই জয়নালের বাচ্চা, মুবাইল টুকাইয়া আনছি। কথা ক। আবজলভাই দিছে। আইজ রাইতটা তর কাছে থাকব। কাইল ফিরায়া দিতে হইব।’

তন্দ্রা ভেঙে লাফ দিয়ে উঠল জয়নাল। শিউলির হাতের স্পর্শ নিমিষে উধাও হয়ে যায়। ছোট্ট লাল ঘাগরাপরা মেয়েটা একটু টলোমলো হাঁটতে হাঁটতে কোথায় যেন মিশে যায়। জয়নালের দু’চোখ জ্বলতে থাকে যন্ত্রণায়। পিচ্চি মেয়েটাকে আর কোথাও দেখা যায় না।

মোবাইল আনছি। ‘নম্বরটা ক। – আমি ডাইকা দেই।’

জানালার শিক ডিঙিয়ে বাইরের বড় রাস্তার

বাস-ট্রাকের তীব্র আলো খণ্ড খণ্ড হয়ে পড়েছে ঘরে। এই ঘরের লোহার খাটে ঘুমায় দুজন, মাটিতে দুজন। আজকে শুধু জয়নাল আর মরতুজ থাকবে। বাকি দুজন চলে গেছে বেনাপোল। ওখানে নাকি আজকেই তাদের পারাপার।

‘এত্তো রাইতে মুবাইল!’

‘এহ্যানো মুবাইল পাইতে হইলে অনেক রাইতই হইব। হারামজাদা। এইটা কি তোমার শাউরির বাড়ি পাইছ?’ মরতুজ নিচু স্বরে কথা বলতে গিয়েও চেতে ওঠে। জয়নাল চোখের পাতা খুলতে গিয়ে ভাবল, তাই তো, এ-বাসায় যারা থাকে, তারা মোবাইল ব্যবহার করে না। সে হাই তুলে বলল, ‘এত্তো রাইতে কেউদ্দে কেউ ডাহে?’

‘দূর হারামজাদা, এত কথা কিয়ের? তুই কথা কইলে ক, নাইলে আবজলভাইয়ের কাছে মুবাইল ফিরাইয়া দেই। আবজলভাই ভালোবাইস্যা … পক্ষীটারে মারবি না?’

বাইরে গোঁ-গোঁ করে ইন্টার ডিস্ট্রিক্ট বাসের আর ট্রাকের ছুটে চলার শব্দ। জুলুম বাজারের কাছে একটা বড় বটগাছতলা আছে, ওখানে এলে রাস্তাটা ঘুরতে হয় – যশোর থেকে এলে ডান দিক দিয়ে যাবে, বেনাপোল থেকে যারা আসবে তারা বাঁ দিক দিয়ে ঘুরে যাবে। একটু এদিক-ওদিক হলেই অ্যাকসিডেন্ট। আর রাস্তাটাও ভাঙাচোরা, গাড়িগুলির ঝাঁকুনির শব্দ এখান থেকেই টের পাওয়া যায়।

মরতুজ মোবাইলের বাটনে চাপ দিয়ে বলে, ‘নম্বর ক।’

জয়নাল লুঙ্গির গিরা লাগাতে লাগাতে বলল, ‘জিরু ওয়ান সেবেন থিরি …’

সুফিয়ার মোবাইল নম্বরটা সবসময় মনে পড়ে। নম্বরটা কত সহস্রবার যেন মনে মনে আবৃত্তি করে রেখেছে জয়নাল। মোবাইলটা সে নিজেই কিনে দিয়েছিল। সুফিয়া তখন সু-অনুশীলন এনজিও থেকে ক্ষুদ্র ঋণের টাকা এনে দিত। কাঁথা সেলাই আর মৌমাছির চাষ। কি সব প্রকল্পের নাম! বিকেলবেলা ঘরের আঙিনায় মিটিং। মহিলা সমিতির সভা। জরিনা, মর্জিনা, জান্নাতি, ফেরদৌসী, কবিরের মা, নুরবানু, শফিকের দুই নম্বর বউটা, কি যেন নাম! সবাই একে একে এসে গোল হয়ে বসত। একটা ছেঁড়া মাদুর পেতে দিত সুফিয়া। তারপরে মাঝখানে বসে ক্ষুদ্রঋণ। জয়নাল তখন আর ঘরের ভেতর শুয়ে থাকতে পারত না। সে একটা গেঞ্জি গায়ে দিয়ে বরিশাইল্যা বস্তির সবুজ গাছগুলির পাতার আড়ালে বসে একটার পর একটা সিগারেট টানত আর দূর থেকে দেখত সুফিয়ার মহিলা সমিতির সভা।

‘জিরু ওয়ান সেবেন থিরি … এ্যাই রাইতের এখন কয়টা বাজে?’ মোবাইলে বারবার কল দিয়ে মরতুজ নিজে নিজেই বলল। ‘কতই আর! রাইত এগারোটা হইবই। আমি যশোর

থেইক্যা বাস ধরছি রাইত নয়টায়। দুই ঘণ্টা লাগছে জুলুম বাজার আইতে। এত রাইতে তোমার মাগি কি হুইত্যাই রইছে … নাকি … আল্লায় জানে … যেইডাই হোউক … ফোন ধরলে কইলাম ভালো কইরা বুঝায়া দিবা। কানেকশনটা শুরু হোক।’

মোবাইলের রিংটোন কতক্ষণ বেজে হঠাৎ একটা মিষ্টি নারীকণ্ঠ শোনা গেল, ‘হ্যালো কেডা? কেডা আপনে? এত রাইতে কী চান?’

মরতুজ সঙ্গে সঙ্গে সেটটা জয়নালের হাতে গছিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ‘তোমরা অহন কথা কও, খুব নিচা স্বরে।’

‘কেডায় হুনব?’

‘আরে খালা হুনতে পারে? হুনলেই কইব মুবাইল আইল কোইত্থে? খালা যেন না হোনে। আমি অহন যাই বাজারে।’

মরতুজ চলে গেলে জয়নাল মোবাইলটা নিয়ে কানের কাছে ধরে। ‘হ্যালো হ্যালো।’ নাহ্, কেউ কোনো উত্তর দিলো না। ‘হ্যালো … ।’ একটু আগেই সুফিয়ার মতো কণ্ঠস্বর শুনেছিল। কিন্তু এখন কোনো কথা বলছে না। ফোনের মধ্যে কোথাও যেন ইলেকট্রিক ফ্যান ঘোরার শব্দ হচ্ছে। ঘড়ঘড় শব্দ। ‘সুফিয়া সুফিয়া … সুফি … সুফি … সুফি কথা ক। সুফি আমার ডাক হুনছিস? সুফিয়া? তুই কথা কবি না? আমি জয়নাল। আমি জয়নাল।’

অপর প্রান্তে কোনো মানুষের উত্তর নাই; কিন্তু একটা ঘরের ভেতরের কিছু শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। শো-শো শব্দ। সুফিয়া মোবাইলটা ধরে আবার রেখে দিলো কেন? দুইজন মানুষের অস্পষ্ট সংলাপ শোনা যাচ্ছে কি! আবার খসখস শব্দ হচ্ছে। এতো রাইতে সুফিয়ার ঘরে কার শব্দ! জয়নাল আবার ডাক দেয়, ‘হ্যালো হ্যালো …।’ হঠাৎ লাইনটা কেটে গেল। আর কোনো সাড়াশব্দ নাই। সুফিয়ার ঘরে কে?

মোবাইলটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকল জয়নাল। বাইরে থেকে জুলুম বাজারের হল্লার শব্দ ইন্টার ডিস্ট্রিক্ট বাসের সঙ্গে ঢেউয়ের মতো ভেসে এসে টিনের বাড়িটার গায়ে আছড়ে পড়ে। মাঝে মাঝে ভারি বাসের চাকার চাপে মাটি কাঁপতে থাকে। মোড়ের বাজারে নাইটকোচ এসে থামছে। লোকজন নেমে খাওয়া-দাওয়া করে আবার চলে যাচ্ছে গন্তব্যে। ঢাকা-যশোর-বেনাপোল-শার্শা বাসের কন্ডাক্টরদের চিৎকার অহরহ ভেসে আসে। পাশের ঘরে আরো দুজন থাকে। তারা অনেক রাতে আসে

আবার সকালবেলায় কোথায় যেন চলে যায়। ঢাকা থেকে আবজলভাই কখন কাকে পাঠাবে, কে কোথায় যাবে – কেউ কিছু বলতে পারে না। জুলুম বাজারের এই বাড়িটার একমাত্র মালিক আবজলভাই।

 চারদিকে গাছগাছালিতে ঢেকে থাকা টিনের ঘরগুলির শেষদিকে আরেকটা ছোট ভাঙা ইটের ঘর আছে। সেটা নাকি একবার আগুনে পুড়ে অর্ধেক ছাই হয়ে গেছে। সেখানে শুয়ে থাকে জরিনা খালা। মাঝে মাঝে জরিনা খালার একা একা কথা বলা শোনা যায়। জরিনা খালা নাকি রাতের বেলা ঘুমের মধ্যে শুধু কথা বলে। ঘুমের মধ্যে কথা না বললে সে ঘুমাতেই পারে না। মরতুজ বলে, জরিনা খালা নাকি রাতের বেলা পাগল হয়ে যায়। আবার সকালবেলা সেই জরিনা খালাই আটার রুটি ভেজে সবাইকে খাওয়ায় – দুপুরবেলার ভাত রান্না করে।

জয়নাল এসব কথাবার্তা শুনতে চায় না। ঘুমের তরঙ্গের মধ্যে তার মাথায় শুধু সুফিয়ার কণ্ঠস্বর ঘুরপাক খাচ্ছে। সুফিয়া এখন কোথায়? এখান থেকে অনেক দূরে ধনাগোদা নদীর তীরে। সেখানে ভূমিহীন সমিতির এক বস্তিতে শুয়ে আছে। এখন জয়নালের ঘুম কেটে যাচ্ছে। সুফিয়ার ঘরে কে? সুফিয়া কেন মোবাইলে একবার হ্যালো বলেও আর কথা বলল না। জয়নাল আরো কয়েকবার রিং করলেও কেউ ধরল না।

খাটে বসে বসে সোনেরিলের স্প্রিংয়ের দোলা খেল সে। নাহ, সুফিয়াকে আজকে আর ফোন দেবে না। একলা ঘরে চুপচাপ বসে বসে ভাবল, সুফিয়া, তোমার সব আন্ধিউন্ধি আউলাইয়া ফালামু। তোমার ক্ষুদ্রঋণের দিন শ্যাষ কইরা ফালামু। একদিন সময় লাগব আমার। মাত্র একদিন। আজ কয় মাস হইল, আমি এই ঘরে পইড়া আছি! কোনো খবর আছে? কথা কী ছিল? কথা ছিল তিন মাসের মধ্যে তোমার স্যার আইসা মীমাংসা করব? ট্যাকা আমি দিয়া রাখছি। আর বাকি কাজ তো তুমি করবা। আজ ছয় মাস হইয়া যাইতাছে,   

   তোমার কোনো দেখা নাই। কোনো খবর নাই। ডিসেম্বর মাসে শীতের রাইতে মনোহরপুর বাজারে মার্ডার হয়েছিল। তখন থেকে জয়নাল পলাতক। মনোহরপুর থেকে ইচলি ঘাট পেরিয়ে ফরিদগঞ্জ বাজার হয়ে চলে এসেছিল দালাল বাজার। সেখান থেকে ফেনী। ফেনীতে এসে তিন রাত পাঁচগাইচ্ছা রোডে সুলেমান হাজারীর আশ্রয়ে। তারপর চেষ্টা করেছে দেশ ছাড়ার। না, হলো না, রমজান ব্যাপারীর কাজ – তার লোক এসে নিয়ে গেল রামু। রামুতে ছিল কয়েকদিন। তারপর তারা নিয়ে গেল চট্টগ্রাম। সেখানেই ওরা বলল, ‘জয়নাল মিয়া, ফুলিশ কেইস হই গিয়ে, কেইসে রমজান ব্যাপারীর নাম আইয়ে ন। শুধু তোঁয়ার নাম আইয়ে। হেই বাজারের প্রহ্লাদ মুচি সাক্ষী দিলে তোমার অবস্থা শ্যাষ। তাই তোঁয়ারে হলাই থাইকত হইব কয়েক মাস। ইয়ান থুন যাইবা যশোহর। আবজল এক হোটেল বানাইছে। হিয়ানো থাকন ফরিব কয়েক মাস।’ জয়নাল সেদিনই বুঝেছিল, রমজান ব্যাপারী নির্দোষ সেজে ওকে পুলিশে ধরিয়ে দেবে। জয়নাল নিজের মনে এখন সুফিয়াকে বলে, ‘আমি ওদের বিশ্বাস করি নাই। তোমারে মোবাইলে ডাইকা কইছিলাম, যাও, তোমার স্যারেরে কও … আমার কেইসটা দেখুক।’ 

তখন থেকে জয়নাল যশোরে আছে। পালাতে পালাতে এখন শীত শেষ হয়ে গ্রীষ্ম এসে গেছে। সে উচ্চারণ করল : ‘আর আজকে আদখা তোমারে ফোন দিছি – তুমি কথা বলো না। তোমার ঘরে এসব কীসের শব্দ!’

ঠিক সেই সময় মোবাইলটা বেজে ওঠে। দৌড়ে গিয়ে জয়নাল মোবাইলটা ধরে। ‘হ্যালো, হ্যালো …’

সুফিয়ার কণ্ঠ ওপাশে শোনা যায়, ‘কেডা? কেডা আপনি?’

‘আমি … আমি … আমি জয়নাল … মোর কথা বুজ না!’

‘হ … অহন বুজছি। কিন্তু তখন বুজি নাই। অন্য ব্যাডার মতো লাগছে। তা এ্যাতো রাইতে কেমনে ফুন করলেন?’

‘ফুন করছি অনেক কষ্টে। তা কী খবর?’

‘খবর আর কি! খবর আপনারে কেমতে দিমু? আপনার কুনু ফুন আছে? আপনে তো পলাতক।’

‘চোপ – কোনো কথা কবি না। ক্যান আমাগো উকিলরে কইলেই তো হয়। তারে খবর দিলেই তো হ্যাতে মোরে হগল খবর দেবে।’

‘উকিল সাহেব তো খালি ট্যাকা চায়।’

‘এইসব কথা রাখ। বুজছি তরে দিয়া কাম হইব না। ছয় মাস হইয়া গেল। মোর জামিন হইব কম্বে? তর লোক তো অহনতরি আইল না।’

‘লোক কেমনে আইব কন? দ্যাশের খবর রাখেন? দ্যাশে অহন কোনো কিছু করন যায়? আইন-শৃঙ্খলা খুব শক্ত।’

‘হেই ব্যাডা কী কয়? তোমার খাতিরের লোকটা …’

‘আমার খাতির? আপনে কী কন?’

‘হ, তোমার খাতিরই তো …’

সুফিয়া চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। কেউ কোনো কথা বলে না। জয়নালের খুব ভালো লাগে। সুফিয়া নিশ্চয়ই রাগ করেছে। তাই চুপ করে আছে। তারপর জয়নাল আবার বলে, ‘কি কথা কও না ক্যা? কী হইল?’

‘তিনি তো কাজ করছেন। আপনার মারডার কেসের মামলা উঠানি এতো সহজ!’

‘আমি মারডার করছি! তরে না আমি সব কইছি।’

‘হু।’

‘হু কী? একটা সত্য কথা কইৎ পার?’

‘সত্য কথাই কই। টাইম লাগব। উনি সব করবেন কইছেন। আপনেরে অপেক্ষা করতে হইব। আমি সব কিছু গুছাইয়া রাখছি। খবর দিলে আপনে থানায় ধরা দিবেন।’

‘তাইলে তুই কইতে চাস আমি পালায়ে যামু না।’

‘না। স্যারে আপনারে সব কইব। আহন আপনে যেখানে আছেন হেনোই থাহেন। আমি উকিলরে কইলে ঢাকায় চইলা আইবেন।’

জয়নাল একটু দম নিল। তারপর কণ্ঠের ভার পরিবর্তন করে প্রশ্ন করল, ‘সুফি, সুফিয়া, তর মাইয়াটার মাথার ওপর হাত রাইখ্যা ক, সত্যসত্যই ব্যাডায় আমার লাইগ্যা কিছু করব? সত্য কথা? আমি শুধু তর কথায় বিশ্বাস কইরা আছি।’

সুফিয়ার দীর্ঘশ্বাসটা খুব জোরেশোরে শোনা যায়। ‘আপনারে আমি কী আর কমু? সবি আমার ভাগ্য। আপনে যা করেন, আমি কী আপনেরে তা করতে বলি? অহন আমি কী করুম? আমার ওপর কি বিশ্বাস করবেন?’

‘কী বিশ্বাস মানে?’ জয়নাল নিচু স্বরেই প্রায় গর্জে ওঠে। ‘তুই কী কইবার চাস?’

সুফিয়া বলে, ‘আইচ্ছা থাক। আপনে অহন চেতাচেতি কইরেন না। আমি যা করবার করুম।’

জয়নাল দৃঢ় কণ্ঠে বলে, ‘কথাটা যেন মনে থাকে সুফিয়া।’

‘আইচ্ছা মনে থাকব। অহন অনেক রাইত হইছে। আপনের লগে চিল্লাচিল্লি করলে কোনো লাভ নাই। অহন আপনে ঘুমান। আমি কাইলকা আবার ফুন দিমু।’

জয়নাল হুংকার দিয়ে উঠল, ‘না, না এই মোবাইলে কইলাম কোনো কথা বইল না। এইটা আমার না, তোমার মোবাইলে এই নম্বর রাইখ না। মুইছা ফালাও।’

‘আচ্ছা। আপনে এখন কোথায় থাহেন?’

‘আমি এখন আবজলভাইয়ের আস্তানায় থাহি।’

তারপর হঠাৎ শিউলির কথা মনে হয়। জয়নাল ফিসফিস করে জিজ্ঞাসা করে, ‘শিউলি, শিউলি কেমন আছে?’

‘মাইয়ার খবর নিবেন? মাইয়া ভালোই আছে। অহন কথা কওন যাইব না। মাইয়া ঘুমায়।’

‘আচ্ছা।’

এরপর জয়নাল কিছু বলতে গেলেই সুফিয়া, ‘আচ্ছা আইজ রাখি, পরে কথা কইয়েন’ – বলে তাড়াতাড়ি লাইনটা কেটে দিলো। 

মোবাইল হাতে নিয়ে রাগে-দুঃখে জয়নাল ঘরের কাঠের দরজার সামনে দাঁড়ায়। মরতুজ তালা লাগিয়ে গেছে। বাইরের থেকে মনে হবে এ-বাসায় কেউ থাকে না। গাছগাছালির আড়ালে আবজলভাইয়ের এই ঘর। অনেকটা মেসবাড়ির মতো। যারা এখানে আসে, তারাই শুধু জানে কেন তারা এখানে থাকে।

ঠান্ডা বাতাসের এক পলকা ছোঁয়াকে সামনে পেয়ে সে বলল, ‘আইচ্ছা, আমি সবই বুজছি। সুফি এত রাইতে আমার লগে কথা কইল না ক্যা? ঘরের মধ্যে কিয়ের শব্দ?’ ফিসফিস শব্দ সে নিজেই শুনেছে। জয়নাল ভাবল, আজকেই সে সিদ্ধান্ত নেবে, পক্ষী মারা হবে। মরতুজ বলেছে, বাংলাদেশে পক্ষী মারা কোনো কঠিন কাজ না।

একসময় বড় রাস্তায় হঠাৎ বাস-ট্রাকের শব্দ কমে আসে। রাত তিনটা থেকে চারটা বাজতে চলেছে। এই সময় নাইট কোচগুলির যাওয়া-আসায় বিরতি পড়বে। 

তখন দুজন লোকের হাত ধরে বাসায় ফিরল মরতুজ। সে ঢলে ঢলে পড়ে যাচ্ছে – পাশের লোকগুলো তাকে ধমক দিচ্ছে, আর ঠেলে ঠেলে ঘরের ভেতর ঢোকাচ্ছে। মরতুজের তখন কোনো জ্ঞান নাই। দরজার সামনে জয়নালকে দেখে চিৎকার দিয়ে উঠল, ‘অই শালা শুয়োরের বাচ্চা, এ্যাহানো দাঁড়াইয়া রইছস ক্যা? আমারে চিনস? আমার ঘরে তুই কী করস? আমি একা থাকুম এই ঘরে। আমি একা। আমারে আবজলভাই কইসে আমি আইজকা এই ঘরের মালিক। আমি রাজা। তুই এ্যাহানথে যা। আমার কথা হুনতেই হইব। অকখনই তুই এই ঘর থেইক্যা চইলা যাবি। যা …’

এভাবে কথা বলতে বলতে সে ধপাস করে শুয়ে পড়ল মাটিতে। তারপর ঘুম। লোক দুজনে যাওয়ার আগে ওর পাছায় জুতা দিয়ে লাথি মেরে চলে গেল।

দুই

সকালে মরতুজ সম্পূর্ণ অন্য মানুষ।

হাসি হাসি মুখে জিজ্ঞাসা করে, ‘তর পক্ষীর লগে কথা হইল? দে মুবাইলটা দে, আবজলভাইরে ফেরত দিয়া আহি।’

জয়নাল গম্ভীর মুখে বলে, ‘কথা হইছে।’

‘কথা হইলে তো ভালোই, তাইলে ব্যবস্থা কী দাঁড়াইল?’ মরতুজ জানতে চাইল।

‘কইছে কিছুদিন সময় লাগব।’

‘কত সময়?’

‘কয়েক মাস তো লাগব।’

মরতুজ বলে, ‘এক মাস হইলে ঠিক আছে, কিন্তু এর বেশি হইলে চলব না। আমারেও চইলা যাইতে হইব। গত রাইতে আবজলভাইয়ের লগে আমার কথা এক রকম ফিনিস। টাকা দিমু নগদ … প্রথমে ভিতরে যামু। তারপর তালেবালে জেলখানা থেইক্যা এক গামলা পিজনার বাহির হইয়া যাইব। আমারে তো তারা লগে রাখছে। আমি বাইর হমুই। কিন্তু তরে লইয়া চিন্তা। হ্যাশে যদি তোর পক্ষী কিছু করতে না পারে?’

জয়নালের মনটা বিষণ্ন ছিল, সে ভাবল সুফিয়া যদি সত্যি সত্যি কিছু না করতে পারে, তাহলে কী হবে! সে কিছুক্ষণ পরে বলল, ‘ভাই মোর চিন্তা বাদ দেন। আপনারা বাইরে যান। মোর একটা কিছু হইবেই। মোর সমেস্যার জন্য আপনার সমেস্যা কইরা লাভ নাই।’

মরতুজ জয়নালের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল। ‘আরে না, তরে ছাড়া আমি যামু না। এ্যাহানে আইসা তরে যখন থেইক্যা দেখছি, কেমনে জানি অন্তরের ভিতরে একটা কিড়া ঢুইকা গেছে। তর পক্ষী যদি কিছু না করতে পারে … হেই বেলা একটা কিছু করন যাইব। … আল্লা ভরসা। … চিন্তা করিস না। আমার একটা দাম আছে। আমি কত মানুষ সাফা কইরা আইছি। আমার নামই কিলার মরতুজ।’

জয়নাল ভাবে, এ-জীবনে সে কত জায়গায় পালিয়ে পালিয়ে ঘুরেছে। মরতুজের মতো বন্ধু আর কখনো পায়নি। মরতুজের ক্ষমতা দেখে সে বিস্ময়ে চেয়ে থাকে। মরতুজ একবার মানুষ সাফা করতে পারে, একেক জনকে বর্ডার পাস করিয়ে দিতে পারে, আবার বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করতেও বাধে না।

মরতুজ হঠাৎ বলল, ‘জয়নাল, তোমারে ছাড়া আমি একা একা আর কাজ করুম না কেন, বুজজ?’

‘বুজজি।’ জয়নাল মাথা নাড়াল।

‘এ্যাহান থেইকা বাইর হইলে তুমি আমার একটা কাজ করবা, আর আমি তোমার একটা কাজ করমু। ঠিক? তুমি আমার লগে চিটাগাং যাইবা, আর আমি তোমার পক্ষী মাইরা দিমু। ঠিক?’

‘ঠিক।’ জয়নাল মাথা নাড়াল।

বাইরে তখন আবার গোঁ-গোঁ করে ইন্টার ডিস্ট্রিক বাস-ট্রাক ছুটে চলেছে। জয়নাল হঠাৎ বলল, ‘চিটাগাংয়ের কাজটা কি অহন মোরে কইতে পারেন না?’

মরতুজ আনমনে বলে, ‘কমু কমু সবটাই কমু। তোমারে না কইলে কারে আর কমু! সময় হইলে সব কমু। তখন তো তুমি হইবা আমার পার্টনার। একবার যখন এই লাইনে আইছ, কোনো কাজ বুঝতে অসুবিধা হইব না। যাই হোক, অহন তুমি ওই তোমার স্যাররে দিয়া জলদি জলদি বাইর হও। সময় খুব কম।’

জয়নাল শুধু বলল, ‘চেষ্টা করমু ভাই। দেখা যাক কী হয়!’

‘চিটাগাংয়ের পার্টি আমারে অগ্রিম ট্যাকা সাধে। আমি কই অহন না, ট্যাকা অপারেশনের আগে লমু। এখন দরকার নাই। তখন ট্যাকা দুই ভাগ হইব। ফিফটি ফিফটি। তুমি আর আমি।’

এই সব কথা শেষ হলে মরতুজ হঠাৎ জিজ্ঞাসা করে, ‘আইচ্ছা জয়নাল, আবার জিগাই, তোমার পক্ষীটারে তুমি রাখবাই না? সত্য?’

জয়নাল একটুও সময় নেয় না। সরাসরি উত্তর দেয়, ‘সত্য, পক্ষী আমি রাখমু না। একবার সন্দ করলে আমি আর রাখি না।’

‘পক্ষীর উপকারটা নিবা?’

‘শুধু এইবার।’

মরতুজ মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে। তারপর দার্শনিকের ভঙ্গিতে বলে, ‘জয়নাল একটা কথার বিচার পাই না। তুমি যেন কী কারণে ফেরারি হইছ?’

‘ক্যান কইছি না?’ জয়নাল খুব স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দেয়। ‘মনোহরপুর বাজারে একটা মার্ডার কেইস।’

‘আচ্ছা, মনোহরপুর বাজারে মার্ডার হইল, পুলিশ

তোমারে বিচরাইল, আর মাইয়াটারে তুমি নিজে পাঠাইলা হেই লোকটার কাছে নিজেরে বাঁচানের লাইগ্যা। আর অহন তুমি তারে সন্দেহ কর!’

‘হে গ্যালো ক্যান? আমি কইছি মানলাম, কিন্তু হে গ্যালে ক্যান?’

‘কঠিন প্রশ্ন। সত্যই তো, হে গ্যালো ক্যান?’

তিন

একমাসও লাগেনি, সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে আবজলভাইয়ের কাছে সংবাদ এলো – জয়নালকে ঢাকায় যেতে হবে। মরতুজ বাজার থেকে এসে বলল, ‘তোমার ছাঁটাই হইছে জয়নাল, কালকে তোমারে ছাইড়া দিমু।’

‘কী কন? কোনো সংবাদ পাইছেন?’

মরতুজ হাসতে হাসতে বলে, ‘তোমার পক্ষীর এত লাইনঘাট! কও কী! হেই মাইয়া কারে নাকি ধরছে। তোমার মার্ডার কেস টিকব না। তোমারে ঢাকা যাইতে কইছে।’

‘আমি ঢাকা গেলে তর কাছে যামু। তর ঠিকানাটা আরেকবার ক।’

‘চাঁদপুর থেইক্যা বাসে যাইবেন মনোহরপুর। মনোহরপুর বাজারে নাইম্যা পাইবেন রিকশাভ্যান। কইবেন ওয়াপদার পোল্ডারে যামু। পোল্ডার মানে সেচ প্রকল্প। ওয়াপদার সেচ প্রকল্পে আইসা কইবেন বকরিকাটা সøুইসগেট। বকরিকাটা স্লুইসগেটের ঢালে আমরা কয় ঘর বরিশাইল্যার বস্তি। … কইবেন বরিশাইল্যা ভূমিহীন সমিতি কম্মে?’

মরতুজ ওকে থামিয়ে দেয়, ‘খাইসে আমারে! এত কিছু আমার মনে থকব না। আমি মনোহরপুর বাজারে নাইম্যা তোর নাম কমু। মাইনষে তরে চিনব না! আমারে তোর বাড়িত লইয়া যাইব।’

জয়নাল হাসে। ‘মানু চিনব না মানে? বেবাকে চিনব।’

মরতুজ সবশেষে বলে, ‘তোর পক্ষীরে দেইখা রাখিস। কাজে দিব।’

চার

ঢাকায় এসে জয়নালকে কোনো এক স্যারের সঙ্গে দেখা করতে হলো।

জয়নালকে স্যারের অফিসঘরের সামনে এনে পাহারাদার বলল, ‘খাড়াও, তোমার ডাক পড়ব।’ জয়নাল চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। স্যারের ঘরের পর্দা বাতাসে উড়ছে। ভেতরে সুফিয়ার সেই স্যারকে দেখা যাচ্ছে। এই লোকটাকেই সুফিয়া স্যার বলে ডাকে। এনজিও করতে গিয়ে লোকটার সঙ্গে পরিচয়। জয়নালের সঙ্গে কয়েকবার দেখা হয়েছে লোকটার। জয়নাল জেলহাজতে এলে সুফিয়া এই লোকটার কাছেই যায়। দুই-তিনবার লোকটা তাকে জেলখানা থেকে বের করেছে। কিন্তু সুফিয়াকে এখন দেখা যাচ্ছে না। জয়নাল চিন্তা করল, লোকটা কি একাই এসেছে? সুফিয়া আসেনি? সুফিয়া এলে তো শিউলিকে সঙ্গে নিয়ে আসত। হঠাৎ সে দেখল সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে হেঁটে একজন বোরখাপরা মহিলা উঠে আসছে। তার হাত ধরে একটা ছোট্ট মেয়ে লাফ দিয়ে দিয়ে উঠছে। আরে এ যে শিউলি! আমার মেয়ে। বোরখার নেকাব তুলে সুফিয়া বলল, ‘সালামালেকুম।’

‘ওয়ালাইকুম’ – সালাম দিয়ে জয়নাল হাত বাড়িয়ে শিউলিকে কোলে নিতে চায়। শিউলি বাপকে দেখে কেঁদে ওঠে। সুফিয়া বলে, ‘ওই দ্যাহেন, বাচ্চায় বাপরে চেনতে পারে নাই। থাইক, আপনারে আর বাচ্চা কোলে লইতে হইব না।’

জয়নাল ধমক দিয়ে ওঠে, ‘চুপ থাক, বড় বড় কথা কইস না মাতারি। হেই ব্যাডা কম্মে? তোমরা একত্রে আহ নাই?’

‘কার কথা কন?’

‘হেই ব্যাডা, তোর স্যার।’

‘একত্রে আমু ক্যান? হে হের মতো আইছে। আমি বাসে কইরা আইছি। আমি সকালে আইছি, বিকালে চইলা যামু।’ 

‘মিছা কথা।’

‘মিছা না। আচ্ছা আমি কার লাইগ্যা আইছি? আপনার লাইগ্যা আইছি – আর আপনে আমারে সন্দেহ করেন?’

‘চোপ … ।’ জয়নাল কী যেন বলতে চাচ্ছিল, সেন্ট্রি এসে বলল, ‘জয়নাল মিয়া, দাঁড়াও, স্যারে আইতেছে।’

কালো সানগ্লাস পরা স্যার সোজাসুজি সুফিয়ার দিকে এগিয়ে এসে বললেন, ‘এই যে সুফিয়া বেগম, কই, তোমার লোক কই?’

সুফিয়া হাত তুলে জয়নালকে দেখিয়ে দিলো।

জয়নাল সালাম দিলো, ‘সালামোলেকুম স্যার।’

সালামের কোনো উত্তর দিলেন না স্যার। ‘হুম, তুমি সেই জয়নাল মিয়া। অনেকদিন পরে তোমারে আবার দেখলাম। তোমাকে চিনতে পারি নাই। তা কও কী খবর তোমার? এইবার কিসের কেইস? গতবার তো ডাকাতির মামলা। ধনাগোদা নদীতে নৌকায় ডাকাতি … কী কষ্ট করে তোমারে ছাড়াইছি। এইবার কীসের মামলা?’ 

‘স্যার, কেইসটা তো হইছিল মনোহরপুর বাজারে … দুদখালি ইউনিয়ন … থানা …’

‘কী করছিলা সত্য কইরা কও? মার্ডারের মামলা।’ স্যার চোখের সানগ্লাসের আড়ালে একটা কেমন জানি দৃষ্টি লুকিয়ে রেখেছে।

ধমক খেয়ে জয়নাল প্রথমে হতভম্ব হয়ে চেয়ে থাকে, তারপর সুফিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘স্যাররে তুমি কিছু কও নাই?’

স্যার আবার একটা ধমক দিয়ে ওঠেন। ‘সুফিয়া যা কওনের কইছে। অহন আমি তোমার কাছ থেকে শুনতে চাই। তুমি কও তুমি কী করছিলা? সেকশন ৩০০ নাকি ৩০২? তোমারে কোন কেইসে পাঠাইছে?’

জয়নাল মাথা নত করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে – মনে মনে বলে, ‘শালা লোকটা সবই জানে, এখন কেমন না-জানার ভাব দেখাচ্ছে! সে কিছু বলছে না দেখে সুফিয়াই পাশ থেকে বলে, স্যার, আমার স্বামী হেইদিন মনোহরপুর বাজারে গেছিল জুতা সারাইতে। হে বইসা ছিল মুচি প্রল্লাদদার লগে। হেরবাদে হেহানে মারামারি বাজ্জে। মারামারিতে এক ব্যাডা হান্দাইয়া এক দোকানিরে খুন করছে।’

‘মনোহরপুর বাজারে দোকানিকে খুন। ড্যাগার কে চালাইছিল? চার্জশিটে কী লেখা আছে?’

এবারো সুফিয়াই উত্তর দেয়, ‘স্যার রমজান। রমজান ব্যাপারী। মনোহরপুর বাজারে ট্রাক চালায়। হেই ব্যাডাই প্রকৃত খুনি।’

স্যার হাত দিয়ে সুফিয়ার কাঁধে একটা আলতো করে ছোঁয়া দেন, ‘আহ তুমি থামো তো সুফিয়া। আমি জয়নালের মুখে শুনতে চাই। জয়নাল বলো, তুমি কী করছিলা? সত্য কইরা কও। থানায় কী কইছ? স্টেটমেন্ট …’

‘স্যার, যেইকালে ঘটনাটা ঘটে, মোরে রমজান ব্যাপারী ডাকছেলে বাজারে যে এক ব্যাডারে পিটাইব। ব্যাডা নাকি ট্যাহা নেছালে, হ্যাশে রমজান ব্যাপারীকে ট্যাকা দেছেলে না। তো সেখানে মারামারি হয়। সত্য কথা কই, আমি কিছু করি নাই। প্রহ্লাদ মুচি বাজারে হারাদিন জুতা সেলাই করে। হে হেইখানে ছ্যালে – হে দাঁড়াই দাঁড়াই সব দ্যাহে।’

‘প্রহ্লাদ মুচি সাক্ষ্য দেবে?’

‘দিব স্যার, দিব। তার লগে একরকম কথা বইলাই আইছি।’

স্যার হাসলেন। ‘রমজান ব্যাপারী অহন কই? কইতে পারো?’

‘হেইয়া মুই কইত্তারি না। ফেরারি হইছে হুনছি।’

স্যার সুফিয়ার দিকে ফিরে বলেন, ‘সুফিয়া, আমি মনে হয় ওকে বাঁচাতে পারব না। আমার কাছে মিথ্যা কথা বলে লাভ আছে?’

‘সত্য কইতাছি হুজুর …’

তখন সুফিয়া স্যারের কাছে গিয়ে বলল, ‘হেইয়া কইলে হইবে! স্যারের পা ছুঁইয়া সালাম করেন। স্যারের পা ধরেন।’

জয়নাল লোকটার পা ধরে কাঁদতে থাকে। ‘স্যার, আপনে আমারে বাঁচান।’

স্যার খুব গম্ভীর স্বরে বললেন, ‘মার্ডার কেস উপড়ানি খুব কঠিন। আমি এসব ডিল করি না। খালি সুফিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে তোমারে হেল্প করতে আসি। সুফিয়া এনজিও করে। ওর দিকে তাকিয়ে তোমাকে হেল্প করি। কিন্তু কতবার করব? তোমরা সব বরিশাইল্যা ভূমিহীন সাইজ্জা এই ধনাগোদা নদীর পারে কী সব করো …।’

গরগর করতে করতে স্যার চলে গেলেন।

পাঁচ

বাড়িতে এসে জয়নাল প্রথম কয়েক মাস শুধু একরকম শুয়েবসেই দিন কাটাল। বরিশাইল্যা ভূমিহীন সমিতির ইয়ারবন্ধুদের সঙ্গে মিলেমিশে জম্পেশ আড্ডা চলল কয়েক সপ্তাহ। সেচ প্রকল্পের ফেদু মুন্সির মজা পুকুরে মাছ চাষের জন্য দুই সপ্তাহ। চুন প্রয়োগ আর টিএসপি দিতে আরো কয়েকদিন। ধনাগোদা নদীতে নৌকা আটয়ে কিছু টাকা পাওয়া গেল।

কিন্তু এসব দিনে ঘরে ফিরে এলে ছোট্ট শিউলির সঙ্গে খেলা করতেই তার সবচেয়ে ভালো লাগত। বাচ্চাটা খিলখিল করে হেসে উঠতেই সে চিৎকার দিয়ে উঠত, ‘আমার মা হইছে, মা হইছে, দ্যাহ … দ্যাহ …।’

কিন্তু এসব শান্তির মধ্যে একটা বিষকাঁটা তার বুকের ভিতর বিঁধত সারাক্ষণ। জয়নাল জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘স্যারে কি আমাগো বাড়িত আইতে?’

সুফিয়া ঘাড় বাঁকা করে বলেছিল, ‘অ-কী কন? স্যারে এই বাড়িত না আইলে পুলিশ ভেরিফিকেশন কি ভূতে করলে?’

জয়নালের পিছনের শিরদাঁড়ায় একটি ঠান্ডা অনুভূতি নেমে যায়। পক্ষী মারতে হইবই।

একদিন শিউলিকে নিয়ে খেলছিল জয়নাল, সুফিয়া শুঁটকি মাছগুলি বেছে বেছে বেতের চাঙ্গারিতে রাখছিল। সুফিয়া হঠাৎ বলে উঠল, ‘শুধু বইস্যা বইস্যা কাটাইলেন। ব্যবসাপাতি কিছু করবেন? সংসারে টাকা-পয়সা লাগব না?’

জয়নাল মাথা ঘুরিয়ে একবার তাকালও না। সরাসরি বলল, ‘ক্যান মহিলা সমিতি, তারপর ক্ষুদ্রঋণ এগুলির ট্যাকা কী করস? এই ট্যাকা কি উইড়া যায়?’

‘আমি তো সমিতি করি। এনজিও করি। আপনে কী করেন? আবার তো নদীতে নৌকা ধইরা ট্যাকা আনলেন।’

‘ফাও কথা কইস না। মুই কি করমু, না করমু, হেইয়া তর কইতে হইব না।’

‘আমার পেরতেক কথায় ধমক দিয়েন না। কাইলকা কলাম স্যারে আইব। স্যারে আইয়া আপনারে জিগাইব, আপনে অহন কী কাম করেন।’

‘আমি অহন কী কাম করি হেইয়া লইয়া তর খাতিরের কী হইব?’

সুফিয়া উঠে দাঁড়াল। ‘স্যারে কইছে, আপনের মামলা কলাম উডে নাই। মার্ডার কেস অত সহজ ভাইব্যেন না।’

‘তাতে কী?’

‘হেতে আপনারে জামিন দিয়া খালাস দেছে। পুলিশের ডিউটি হইল সপ্তাহে সপ্তাহে আইসা খবর নেওন – আপনে অহন কী করেন – কি বিষয়-আশয়। বুজ্জেন? হেতে পেরশ্ন করলে কোনো উত্তর কইত পারমু না আমি। কাইলকা স্যারে আইলে কিছু নাস্তাপানি লাগে। আপনে কী দেবেন …’

জয়নাল কোনো উত্তর না দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। আলনা থেকে একটা শার্ট গায়ে দিয়ে পকেট থেকে একশ টাকা বের করে রাখে খাটের ওপর। তারপর বলে, ‘কাইল দুপুরে আমারে সদরে যাইতে হইবে। মুই মনোহরপুর গেলাম – রাইতে আসুম না।’

ছয়

সন্ধ্যায় মনোহরপুর বাজারে এসে জয়নাল যখন চায়ের দোকানে বসেছে, তখন প্রহ্লাদ মুচি এসে সামনে দাঁড়াল। জয়নাল তাকে বলল, ‘দাদা নমস্কার।’

প্রহ্লাদ হাসল। ‘না বাবু। তোমারে একটা সংবাদ দিতে আইলাম।’

‘কী সংবাদ?’

প্রহ্লাদ তার ময়লা শার্টের পকেট থেকে একটা ছোট্ট কাগজ বের করে এগিয়ে দেয়। ‘দুদিন আগে মরতুজ নামে এক লোক এই বাজারে আইছিল। আমারে একটা মোবাইল নম্বর দিয়া গেছে। তোমারে দিতে কইছে – এই লও।’

জয়নাল সেই রাতেই মরতুজকে মোবাইলে ফোন করে। ‘হ্যালো মরতুজভাই, আপনে কবে বাইরে আইছেন? আপনে অহন কই?’

মরতুজ অপর প্রান্ত থেকে বলে, ‘জয়নাল, আমি অহন চিটাগাং। কাইল-পরশু চিটাগাং চইলা আয়। অপারেশন শুরু হইব।’

‘ট্যাকা?’

‘ট্যাকা রেডি। ট্যাকা আমি ডবল দিমু। কিন্তু …’

‘কিন্তু কী?’

‘কিন্তু অপারেশন নিজ হাতে করতে হইব।’

জয়নাল কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করে বলল, কালকেই জানাবে।

পক্ষী মারার চিন্তাটা মাথা থেকে একবারে সেরে গেছে। সুফিয়া মেয়েটার মুখ জ্বলজ্বল করে ভাসে জয়নালের চেখে। সে নিজের হাত দুটোর দিকে তাকায়। এখনো নড়বড়ে হয়নি। দুনিয়ায় কত কাজ! পাপ নেই – এমন একটা কাজ জুটিয়ে নেবে। নিজের মনের মধ্যে কেমন সুবাতাস বইতে থাকে।

Published :


Comments

Leave a Reply