‘মাটির ময়না’ এবং ‘চিত্রা নদীর পাড়ে’র জন্য এই চলচ্চিত্রদুটির নির্মাতাদ্বয় তারেক মাসুদ এবং তানভীর মোকাম্মেলকে কখনোই ঘটা করে কৃতজ্ঞতা জানানো হয়ে ওঠেনি আমার। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের দুটি নিষিদ্ধ প্রসঙ্গ – ধর্ম, ধর্মীয় বাস্তবতা এবং সাম্প্রদায়িকতাকে ওরা অকপটতায় যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, এর আগে এ-দেশের চলচ্চিত্রে তা ঘটেনি, না ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের আগে, না পরে। দ্বিধাহীনভাবে বলা যায় যে, অকারণ লালিত বহুদিনের সংশয় এবং জড়তা ভেঙে এরা যেভাবে সমস্যাগুলোকে দেখালেন, তা একদিকে যেমন এ-দেশের চলচ্চিত্র-ইতিহাসে নতুন মাত্রা যোগ করল, তেমনি অন্যদিকে, আগামীতে এ-দেশের চলচ্চিত্রকারদের জন্য সুস্থচর্চার সুযোগ তৈরি করে দিল। যে স্পেস বা পরিসর একজন সমাজসচেতন সৃষ্টিশীল মানুষের, তথা চলচ্চিত্রকারের জন্য প্রয়োজন, সেই পরিসর সৃষ্টির জন্য তারেক এবং তানভীর উভয়ই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন এ-দেশে।
এছাড়াও আরো একটি দিক উল্লেখ না করলেই নয়, তারেক-তানভীরের চলচ্চিত্র, রাষ্ট্রীয় সংকীর্ণতার বিরুদ্ধেও যেমন প্রতিবাদ, একই সঙ্গে এ-দেশের প্রতিবাদী চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে যে বিরাট ঘাটতি রয়েছে, সেক্ষেত্রেও সমৃদ্ধ সংযোজন।
প্রাক ’৭১ প্রতিবাদী চলচ্চিত্র
বাংলাদেশ-মুক্তির আন্দোলন সংস্কৃতিগত ব্যাপক এবং বহুবিধ অবদানে সমৃদ্ধ হলেও, সবচাইতে অকিঞ্চিৎকর ভূমিকা চলচ্চিত্রের।
এ-কথা ভেবে বিব্রত হতে হয় যে, পাকিস্তানি শাসনের দীর্ঘ ২৪টি বছরে, এ-দেশে নির্মিত প্রতিবাদী চলচ্চিত্র মাত্র একটি! ১৯৬৯-এ জহির রায়হান তাঁর ‘জীবন থেকে নেয়া’ নির্মাণ শুরু করেন, যা ছিল পাকিস্তানি সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে কটাক্ষ। যদিও এর নির্মাণ-ঢঙ প্রতীকী, তবুও নির্মাণকাল থেকেই চলচ্চিত্রটি নানা বিড়ম্বনায় জর্জরিত হয়। এর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে যে-গণআন্দোলন, এবং সেই আন্দোলনের মাধ্যমে ছাড়পত্র আদায় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক-আন্দোলনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। ‘জীবন থেকে নেয়া’র বাইরে আর একটি নামও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যা সেই অর্থে চেতনা-সঞ্চারী। যদিও ১৯৬৭-এ নির্মিত খান আতার ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’-কে আজকাল একই কাতারে এনে দাঁড় করানো হয়, মূলত তা ছিল ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে জনপ্রিয় নাটকের চলচ্চিত্র রূপান্তর। এছাড়া ১৯৭০-এ রেবেকা নির্মিত ‘বিন্দু থেকে বৃত্ত’-তে কিছু জাগরুক চেতনার উপকরণ ব্যবহৃত হলেও, মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলন-তপ্ত দর্শকের দৃষ্টি কাড়া।
পরবর্তীকালে জহির রায়হানই মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে প্রতিবাদী প্রামান্যচিত্রসমূহ নির্মাণ করেন, যা এ আলোচনায় অপ্রাসঙ্গিক।
১৯৫২-র রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্বের হাত ধরে এবং ধারাবাহিকতায় যে-ধরনের চলচ্চিত্র প্রত্যাশিত ছিল, তার উদ্যোগ কখনো নেওয়া হয়েছিল কি-না, সে-বিবেচনা এবং সে-ইতিহাস সম্পূর্ণ অন্য পাঠ দাবি করে।
’৭১-পরবর্তী চলচ্চিত্র : যোগ-বিয়োগের কড়চা
৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এ-দেশের মানুষের নিবিড়তম অভিজ্ঞতা। গণযুদ্ধের বহুমাত্রিক অনুষঙ্গ, ধ্বংস এবং প্রাপ্তির বিচিত্র বিন্যাস – জাতিগত চেতনায় গভীর রেখাপাত। এ-সবই সৃষ্টিশীলতার অনুকূলে। এই ঘটনাবহুল সময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রইতিহাসের নতুন অধ্যায় রচনা-সম্ভাবী। সূচনা হতে পারত চলচ্চিত্র-নির্মাণের নতুন ধারার, যখন বিষয় এবং আঙ্গিক পারস্পরিক উৎকর্ষের জন্য তৈরি। যুদ্ধকালীন সময়ে এ-দেশে সংঘটিত পাকবাহিনীর নির্মমতা, গণহত্যা, নারী-নির্যাতন, ধর্ষণের ব্যাপকতা, শরণার্থী জীবনের নানানদিক, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মদান এবং বীরত্বের কাহিনী, বুদ্ধিজীবী নিধন, ২৫শে মার্চের কালরাত্রি, ক্ল্যানডেস্টাইন সরকার এবং রাজনীতির বহুধা ধারা – চলচ্চিত্র-নির্মাণের অজস্র উপকরণ ন’টি মাসের পরিধি জুড়ে যেমন রয়েছে, তেমনি ভাষা-আন্দোলন থেকে তিলেতিলে গড়ে-ওঠা গণমানুষের মুক্তির স্বপ্ন, মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিমূলক অধ্যায় এবং বিজয়ও চলচ্চিত্রের চমৎকার বিষয় হতে পারত।
এই সূত্রে যে-দিকসমূহ আরো স্পষ্ট হতে পারত এবং সেক্ষেত্রে প্রভূত সম্ভাবনাও ছিল – তা হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের স্বরূপ। তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক চাওয়া-পাওয়া, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলার মানুষের বিযুক্তির কারণ, নানান ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের সহাবস্থানের চিত্র, সমাজে তাদের অবস্থান এবং অবদানগত পরিষ্কার ধারণা।
চলচ্চিত্র যে চেতনা-সঞ্জীবনী প্রভাব ফেলতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ সোভিয়েত চলচ্চিত্র ‘ক্রেনস্ আর ফ্লাইং, ‘ব্যালাড ফর
এ সোলজার’, যা এ-দেশের দর্শক-হৃদয় বিপুলভাবে
মথিত করেছিল।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী চলচ্চিত্রের দায়বদ্ধতা ছিল মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য এবং যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতার মধ্যে সন্ধি-স্থাপনে সচেষ্ট হওয়া। তৎকালীন যুদ্ধ-পরবর্তী সমাজ, এর অন্তর্গত দ্বন্দ্বের উৎস, কার্যকারণের সার্থক রূপায়ণ একদিকে যেমন চেতনা-জাগরীর কাজ করত, তেমনি আদর্শিক বিভ্রান্তি-নিরসনেও অনেকটা কার্যকর হতো। বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল জহির রায়হানের মতো সমাজ-সচেতন চলচ্চিত্রকারের, যিনি মুক্তিযুদ্ধকালেও সৃষ্টি করে গেছেন যুদ্ধের দলিলচিত্রসমূহ, যার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে আমরা পাই আলমগীর কবীর এবং তার ‘ধীরে বহে মেঘনা’।
যেখানে মূল চরিত্র একজন ভারতীয় নারী, হারিয়েছেন তার বৈমানিক প্রেমিককে, যিনি ১৯৭১-এর যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর পক্ষে অংশ নিয়েছিলেন। যে-দেশের জন্য তার প্রেমিক শহীদ হলেন, সেই যুদ্ধ-পরবর্তী দেশ-দর্শনে তিনি আসেন এবং জানতে পারেন বাংলাদেশের গণমানুষের সংগ্রামী ঐতিহ্য, তাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বজন হারানোর কষ্ট, ধর্ষিত নারীর স্বরূপ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আশা, আকাক্সক্ষা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী দেশের হতাশার কথা। দুটি ঘণ্টার চলচ্চিত্রে উঠে আসে একটি দেশের যুদ্ধ, এর মানুষ এবং অন্যদেশের সঙ্গে সংহতির সম্ভাবনার কথাও, যা একটি দেশের সমাজ এবং যুদ্ধকে অন্য দেশের চেতনার অঙ্গনে রোপণ করে।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ‘ধীরে বহে মেঘনা’র মতো যুদ্ধকাহিনী নিয়ে সার্থক চলচ্চিত্র ১৯৭৩-এর পর আমরা পাইনি। সুভাষ দত্তের ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ও সচেষ্ট ছিল মুক্তিযুদ্ধকে ব্যক্তি এবং সমষ্টির দুটি পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখায়। এছাড়া ’৭১-পরবর্তী উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রসমূহের মূল ট্রেন্ড সমাজ-ব্যবচ্ছেদের চাইতে গুরুত্ব দেয় হতাশা রূপায়ণে, যার সমাধান সমাজ-বাস্তবতা নাটকীয়ভাবে পালটে দেওয়ার মধ্য দিয়ে। চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধের সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার এই সময়কার প্রবণতা আলাদা একটি পাঠ দাবি করে।
১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ পালটে দেয় এবং লক্ষণীয়ভাবে নিশ্চুপ হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ।
এই সময়ে রাজনৈতিক দল এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নির্জীব হয়ে। এ-সময়ই কিছু আপাত-নিরাপদ সাংস্কৃতিকচর্চা অব্যাহত থাকে কিছুকাল। এইসব সংগঠনের রাজনৈতিক ঝোঁকটি সম্পর্কে রাষ্ট্রের স্পষ্ট ধারণা না থাকার ফলেই সম্ভবত এরা টিকে থাকতে পেরেছিল। যেমন- বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ কার্যক্রম। এই সংগঠনসমূহের কার্যক্রম সেই মধ্যসত্তরে তারুণ্যকে একরকমের সাংস্কৃতিক প্রকাশের ও চর্চার জায়গা করে দেয় – যার ফলে সেই বন্ধ্যা সময়েও তরুণেরা সৃষ্টিশীলতার স্বপ্ন দেখেছিল। এখানেই প্রসঙ্গে প্রবেশ তারেক মাসুদ, তানভীর মোকাম্মেলের।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী তারুণ্য :
১৯৭৮
তারেক মাসুদের সঙ্গে সখ্য সত্তর-দশকের শেষদিকে, যখন আমরা একই সংগঠনের ছত্রতলে গলা ফাটিয়ে সমাজভাঙার গান আর স্লোগানধর্মী নাটকের জোর রিহার্সেল করছি। সম্ভবত সখ্যের সমিল সূত্র হিসেবে কাজ করেছিল আশেপাশের চোখে লাল রুমাল বাঁধা, বজ্রমুষ্ঠি, দৃঢ় চোয়াল কমরেডদের কাছ থেকে আড়াল করে খুব নিভৃতে পোষা আমাদের উভয়েরই সংশয়বাদ – অবশ্য যা কখনোই আমরা প্রকাশ্যে স্বীকার করিনি।
আরো একটি সূত্র, যা আমাদের মধ্যে ভাবনার যোগসূত্র হয়ে কাজ করে এবং কালে কালে প্রকাশ্য হয়ে ওঠে, তা হচ্ছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একই ধারার বিশ্বাস, যা আমাদের সমকালীন এবং সাংগঠনিক বন্ধুদের মধ্যে একটা পরিষ্কার ভেদরেখা টেনে দেয় পরবর্তী সময়ে। শিশুর সারল্যে আমরা তখন একযোগে বিশ্বাস করেছি বাংলাদেশে এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ অবশ্যম্ভাবী। তখন যদিও সেই ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ চীন না রুশের দড়িটানায় উন্মুল হবার অবস্থায়, আমরা কতিপয় বুকের মধ্যে সঙ্গোপনে বাঙালি-জাতিসত্তার প্রায় নিভু-নিভু শিখাটি বাঁচিয়ে পায়ে-পায়ে ফিরতে শুরু করি।
কার কাছে ফিরেছিলাম, জানি না। এটুকু জানি যে, তখনই, মুক্তিযুদ্ধশেষে পাঁচ-ছয় বছরের মাথায়, কিছু প্রগতিশীল বলে কথিতের মধ্যে বাঙালি না বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গিয়েছিল। সেখানে আমাদের অগ্রজদের মতাদর্শিক দলছুট কাজ-কারবার তরুণদের ওপর এক ঘোলাটে প্রভাব বিস্তার করে, যা ভেঙে আজ অবধি অনেকেই আর কখনোই সবুজ মাঠকে সবুজরূপে দেখেনি (যদিও তাদের দিক থেকেও একই কথা মনে হতে পারে)। যে যার বিশ্বাসের বদ্ধকুঠুরির অর্গল এঁটে সাময়িকভাবে পড়ে থাকলেও একসময়ে আবার সকলেই খোলা প্রান্তরে হাজির হবো বলে যে-আস্থা ছিল সময়ের ওপর, সেটাও অনেকের ক্ষেত্রে ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়। আমরা যারা কখনোই রাজনৈতিক দলভুক্ত ছিলাম না, তারাও দুর্ভাগা বাংলাদেশের মতোই ডিফিকাল্ট পলিটিক্সের অভিঘাতে জর্জরিত হই, কারণ ‘কঠিন রাজনীতি’র প্যাঁচ মূলত বাঙালি সংস্কৃতির কণ্ঠরোধের জন্য কাজ করে।
ততদিনে ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন’-এর সঙ্গে আমাদের সংযুক্তি ঘটে গেছে। এই সূত্রে পরিচয় তানভীর মোকাম্মেলের সঙ্গে। ও তখন কমিউনিস্ট পার্টির কঠিন সমর্থক। পার্টির মুখপত্র একতা আর ক্ষেতমজুর সমিতি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। দেখা হলেই আমরা একে অন্যকে তর্জনী নাচিয়ে ‘তুমি ভুল, তুমি ভুল’ বললেও আমাদের সৌহার্দ্যরে ক্ষেত্র ছিল চলচ্চিত্র-পাঠ, চলচ্চিত্র-আলোচনা এবং চলচ্চিত্র-নির্মাণের স্বপ্ন।
নিত্যনতুন বিষয়ের উদ্গার মগজে, জমে-ওঠে স্ক্রিপ্টের ¯তূপ। জানি কখনোই সে-স্ক্রিপ্ট প্রাণ পাবে না, এ-ও জানি যে, চলচ্চিত্র-নির্মাণ সহজ নয়, বিশেষ করে যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের কোনো সুযোগ নেই, অর্থেরও যোগ যেখানে দুরাশা। এ-সত্য ক্রমাগত স্পষ্ট হয়েছে যে, এ-রাষ্ট্র আর যার জন্যই হোক, স্বাধীন সত্তাধারী সমাজ-সচেতন তরুণদের জন্য অন্তত নয়। এখানে সব বয়সী মানুষ জরাগ্রস্ত, কী শিশু, কী কিশোর! তারুণ্যের কাছে দুটি পথ খোলা – হয় দেশ ছাড়ো, না হয় চলচ্চিত্র আন্দোলন করো।
আশির দশক
চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের কাজ মূলত ছিল দেশ-বিদেশের চলচ্চিত্র প্রদর্শন। সংসদ কার্যালয়ে লাইব্রেরি, যেখানে থাকত চলচ্চিত্র-সম্পর্কিত হরেক বই, পুস্তিকা, পত্রাদি। এখান থেকে বেরুত চলচ্চিত্রপত্র, চলচ্চিত্র-সংকলন প্রভৃতি। এছাড়াও আয়োজিত হতো দেশ-বিদেশের চলচ্চিত্র-প্রশিক্ষকের পরিচালনায় বিশেষ কর্মশালা, প্রশিক্ষণ-কোর্স। এই প্যারালেল সাংস্কৃতিকচর্চা চলচ্চিত্র-নির্মাণের প্যারালেল ধারাকে অনেকটাই অনুপ্রাণিত করে। সে-সময়কার তরুণ-তরুণীদের জন্য এই কার্যক্রম একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা রাষ্ট্রীয় কালাকানুনের আওতাভুক্তির পর ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে থাকে।
নানারকম বাধা সত্ত্বেও এ-দেশের চলচ্চিত্রসমূহ, যা আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত, নন্দিত এবং পুরস্কৃত হয়, তা সংসদকর্মীদের একরোখা উৎসাহের ফসল। তা শর্টফিল্ম ফোরামের কার্যক্রমের সূচনা ও চলচ্চিত্র সংসদ কর্মীদের উৎসাহে বলা যেতে পারে নির্দ্বিধায়।
এ-যেন ছিল সামরিকতন্ত্রের রাহুগ্রস্ততা থেকে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে মুক্ত করার লড়াই।
নব্বইয়ের দশক
নব্বইয়ে গণঅভ্যুত্থানের পর চলচ্চিত্র-নির্মাণ যেন নতুন মাত্রা পায়। চলচ্চিত্র-নির্মাণের জন্য রাষ্ট্রীয় অনুদানের পর্বটি প্রথমবারের মতো সাড়া জাগালেও চলচ্চিত্রের বিষয়-নির্বাচনে সতর্কতার লাল আলো জ্বালিয়ে রাখে। রাষ্ট্রের আঁকা লক্ষণরেখা পার হওয়া মানে সেন্সর ছাড়পত্রের সুযোগ হারানো। তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’ মুুক্তিযুদ্ধের অমূল্য দলিল বলে গণ্য হলেও ছাড়পত্রের প্রাকার পেরিয়ে জনসম্মুখে আসতে হিমশিম খায়। একই ভাগ্য তানভীর মোকাম্মেলের ‘নদীর নাম মধুমতি’র।
বিষয়টি স্পষ্টতই যে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্র-নির্মাণ করতে যাওয়া মানে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে নাজেহাল হওয়া, সে-রাষ্ট্র সামরিক হোক কী গণতান্ত্রিক! এক্ষেত্রে দাঁত কামড়ে লড়ে গেছেন তারেক মাসুদ এবং তানভীর মোকাম্মেল। তারা ইতিহাসকে তুলে ধরে, সেন্সর-সংক্রান্ত সমস্যায় জড়িয়ে, রাষ্ট্রীয় প্রতিকূলতা এবং বৈরিতার দিকটি বারবার দেখিয়ে দিয়েছেন। তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ এবং তানভীর মোকাম্মেলের
‘চিত্রা নদীর পাড়ে’ আজ বিপুলভাবে সমাদৃত স্বদেশে এবং
আন্তর্জাতিকভাবে।
‘মাটির ময়না’ একটি সার্থক পিরিয়ড পিস
তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ একটি শিশুর দেখা এ-বাংলার ষাটের বাঙালি-সমাজ এবং ক্রমাগত তার জাতিসত্তার সংগ্রামে উপনীত হওয়া। তিনটি মূর্তিমান দ্বন্দ্ব এই ষাটের প্রেক্ষাপটে সহাবস্থান করে এবং যুদ্ধের মাধ্যমে নিরসন চায়। কাজী, যিনি বালক আনুর পিতা, এক সময়কার কেতাদুরস্ত প্রায় সাহেব, যিনি বদলে গিয়ে ধর্মীয় গোঁড়ামির কাছে সমর্পিত। অন্যদিকে কাজীর স্ত্রী আসমা। ছেলেবেলায় প্রায় এক্কা-দোক্কা খেলার বয়সে বিয়ে হয়ে-আসা এ-বাড়িতে; যার সংসারের নিগড়ে আবদ্ধ হওয়া, মাতৃত্ব ও বদলে-যাওয়া কঠোর স্বামীর নিয়ন্ত্রণে; যার কণ্ঠরুদ্ধ ধর্মীয় অনুশাসনে, সেই আসমা নিয়ম ভাঙে স্বামীর আড়ালে। অন্যদিকে, মিলন, কাজীর ছোট ভাই। মিলন ষাটের দশকের তরুণ, সমাজতন্ত্রের, সাম্প্রদায়িকতার পক্ষে যে বাংলাদেশের স্বাধিকারে বিশ্বাস করে। আসমা এবং মিলনের দেবর-ভাবির সেই চিরমধুর সম্পর্কের মধ্যে কাজীর গড়া দেয়াল, যা ডিঙিয়ে তারা সমস্যা, আশা-নিরাশার দু-চার কথা বলে। মিলন বড় ভাইয়ের চোখ এড়িয়ে এনে দেয় বাড়িতে নিষিদ্ধ অ্যালোপ্যাথি। আনু নামের বালকটি চাচার কাছেই পৃথিবীর নিশানা চেনে। চলচ্চিত্রের শেষ পর্যায়ে প্রতিরোধ-যুদ্ধে পাকসেনাদের গুলিতে নিহত হয় মিলন। যে-আনুকে মাদ্রাসায় পাঠিয়েছিল বাবা, সে মাদ্রাসার দুঃসহ অবরুদ্ধ, কঠোর নিয়মানুবর্তিতার, প্রাণহীন জীবন থেকে ফিরে আসে বাড়ি, ঠিক যখন তার গ্রামটিতে উঠে এসেছে পাকিস্তানি সেনারা। কাজীর পুরোদমে আস্থা যে তার বিজাতীয় ধর্মীয় ভাইয়েরা তাকে রক্ষা করবে, কারণ তারা বাঙালিদের হাত থেকে ইসলাম রক্ষা করতেই এসেছে। তার ধর্মীয় গ্রন্থ, তার বিশ্বাস, তার আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা তার সহায়।
শেষ দৃশ্যে হতবুদ্ধি, বিক্ষিপ্ত কাজী তার পোড়া বাড়ির, পোড়া ধর্মগ্রন্থ পরিবেষ্টিত। সারারাত আনুকে নিয়ে জঙ্গলে পড়ে-থাকা আসমা ফিরে আসে। পলায়নরত মানুষের মুখে জানতে পারে মিলন নিহত হয়েছে। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য কাজীকে নিয়ে সে-ও পালিয়ে বাঁচতে চায়। কাজী অনড়, অথবা তার বিশ্বাস এবং ঘটনাপটের সঙ্গে সে মিল খুঁজে পাচ্ছে না। কাজীর একরোখামির জন্য কন্যার অকাল মৃত্যুতেও যে আসমা কোনো প্রতিবাদ করেনি সে প্রথমবারের মতো ফুঁসে ওঠে, ‘দেখ, তোমার মুসলমান ভাইয়েরা কোন চিতা জ্বালায়ে গেছে …।’ আনুর হাত ধরে আসমা বেরিয়ে যায়। এখানেই ছবির শেষ। ছোট ছোট আঁচড়ে অথবা বলা যায়, যেন ব্রাশের আলতো টানে এই সবই মূর্ত হওয়া। বিশেষ করে আনুর মাদ্রাসার জীবনের যে-রূপায়ণ। আনুর মাদ্রাসার বন্ধু রোকনের ক্রমাগত বাস্তবের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলা, অথবা কঠোর, আনন্দহীন জীবনে এক টুকরো নিজের জগৎ গড়া, বুক নিংড়ানো মর্মস্পর্শী চিত্রায়ণ। আঙ্গিকের অপরূপ বিন্যাস।
তারেক বলেন, এ তার বাল্যকালের অভিজ্ঞতা। মানুষ মাত্রেই উৎসে ফেরা, পুঞ্জীভূত স্মৃতির কুণ্ডলী ছিঁড়ে-খুঁড়ে নিজেকে দেখা। কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতির মধ্যেও ঘটনাপট নিয়ে সময়কাল এবং সামষ্টিক ইতিহাসের নানান ব্যঞ্জনা লুকিয়ে থাকে। এর যথাযথ রূপায়ণ সৃষ্টিশীলতাকে সমৃদ্ধ করে, বাস্তবোচিত করে। তারেকের ‘মাটির ময়না’ সে-কারণেই বুঝি সার্থক পিরিয়ড পিস হয়ে ওঠে। সে-কারণেই কেবল দেশ-বিদেশে ‘মাটির ময়না’ নন্দিতই হয় না, সীমানা পেরিয়ে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন মানুষের বোধের দরজায় পৌঁছে দেয় বাংলাদেশ নামক দেশটির জন্মবৃত্তান্তের ঘটনাপট, দেশের মানুষের মুক্তির সংগ্রাম, দেশের মানুষের আশা, হতাশা, স্বপ্ন। ফরাসি চলচ্চিত্র-সমালোচক ফিলিপ লেকলের ‘মাটির ময়না’ নিয়ে লিখতে বসে বলেই ফেলেন, ‘Due to the universality of the message and the diversity of its themes, The Clay Bird should be seen by all students, from class six onwards whatever their subject of study.’ ‘সার্বজনীন বক্তব্য এবং বিষয়ের বহুমাত্রিকতার জন্য ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রটি প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর দেখা উচিত। ক্লাস সিক্স থেকে ওপর পর্যন্ত, তাদের পাঠ্যবিষয় যা-ই হোক না কেন।’ একই বক্তব্য তেহরান টাইমস-এর। ‘Film maker recalls his past to take Bangladesh to Cannes.’ ‘চলচ্চিত্রকার তার অতীত-রোমন্থন করেছেন বাংলাদেশকে
‘কান’-এ পৌঁছে দিতে’ – এই শিরোনামে চলচ্চিত্র-আলোচনা লেখা হয়েছে।
চলচ্চিত্র-নির্মাণে তারেক-ক্যাথেরিনের সমন্বয় কতটা উৎকর্ষের তা স্পষ্টতই ‘মাটির ময়না’র বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তায়। তারা ক্যামেরায়, সম্পাদনা, সেট, পোশাক, সংগীতেও যে সুচিন্তিত অনবদ্য মাত্রা যোগ করেছেন, তার সপ্রশংস রিভিউ বিশ্বের সেরা সব পত্রিকায়, চলচ্চিত্র-সমালোচকের। সেসব পড়তে গিয়ে আপ্লুত হয়েছি বারবার। বাংলাদেশ, বিশেষ করে এর মুক্তি-সংগ্রামের গর্বিত এবং একই সঙ্গে বেদনাবিধুর ইতিহাস, ১৯৭১-এর ৩২ বছর পর আন্তর্জাতিকভাবে এত ব্যাপক আলোচিত হলো।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ-ছবির অনুদান তারেককে যোগাড় করতে হয়েছে দেশের বাইরে থেকে। কারণ, ইতিহাসনির্ভর চলচ্চিত্রের নির্মাণের জন্য অন্তত তার মাতৃভূমির কোনো দায় নেই! না এর মানুষের, না বাংলাদেশের ইতিহাসের সংরক্ষকদের, না রাষ্ট্র-পরিচালনায় যারা আসেন – তাদের।
তানভীর মোকাম্মেলের ‘চিত্রা নদীর পাড়ে’
মিনতিদের নিয়ে আগে কেউ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিল কি এ-দেশে? কই মনে পড়ে না-তো! দেশটা যখন ভাগ হয়ে গেল ধর্মভিত্তিতে, তখনো মিনতির বাবা উকিল শশীকান্ত সেনগুপ্ত বিচলিত হননি। তিনি ধর্মভিত্তিক দেশটির অস্তিত্বকে মেনে নিয়েছেন। বন্ধু-স্বজনরা অনেকবার বলার চেষ্টা করেছিল – এ-দেশ এখন আর হিন্দুদের নয়। সে-কথা কানে তোলেননি শশীকান্ত। যেখানে পরম্পরায় থেকেছেন, যে মাটি, যে প্রকৃতির সঙ্গে নাড়ির যোগ, সেই চিরচেনা পরিমণ্ডল ফেলে তিনি কোথায় যাবেন? এ তার জন্মভূমি! তাছাড়া তার ওকালতির পসার রয়েছে, তাকে এক নামে সারা তল্লাট চেনে। এতদিনের নামডাক তার, হিন্দু-মুসলমান বিচারে দাঁড়ায়নি। তার মক্কেল ধর্ম দেখে তার কাছে আসে না, আসে কর্মগুণে। শশীকান্ত এসব নীরব বোঝাপড়ায় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তিনি আর যা-ই হোন, দেশত্যাগী হবেন না। কিন্তু অচিরেই তার ভুল ভাঙতে থাকে। পাকিস্তান যে ধর্মকেন্দ্রিক রাষ্ট্র – কেবল ধর্মের অজুহাতে ধরে রেখেছে হাজার মাইল ব্যবধানের দুই অংশকে, যার রয়েছে একেবারে বিপরীত প্রকৃতি, আবহাওয়া, জীবনযাপন, সমাজকাঠামো এবং নানা বিশ্বাসের মানুষের বসবাস। পাকিস্তানের জন্মসূত্রে যে-শ্রেণিটি নতুন মুসলমানিত্বের দোর্দণ্ডপ্রতাপে মাথা তুলতে থাকে, তারা শশীকান্তদের তাড়িয়ে জায়গা নিতে চায়, সস্তায় বাড়ি কিনতে চায়। কিনতে না পারলে অন্তত দখল করার কৌশলটা নিয়ে ভাবে। এদের পক্ষে পাকিস্তানি আইন কাজ করে। শশীকান্তদের কাছে এ-সবই স্পষ্ট হয়।
মিনতি বড় হয়েছিল হিন্দু-মুসলমান না বুঝে। সে-রকম কোনো শিক্ষা তো দেয়নি বাবা। যখন সে বড় হয় পাশের বাড়ির আশৈশব চেনা মুসলমান ছেলেটিকে সে ভালোবাসে। একবারও মনে হয়নি অন্য ধর্মের ছেলেটিকে গ্রহণ করতে সামাজিক ঝক্কি পোহাতে হবে কি-না। পাশাপাশি গড়ে-ওঠা, বড় হওয়া – যারা কেবল পার্থক্য দেখেছে যজ্ঞ পালনের ক্ষেত্রে। ভাইটি কলকাতায় চলে গেলেও মিনতি যায়নি। দাদা বুঝে গিয়েছিল এ দেশে তার জন্য সুযোগ ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। ১৯৬৪-র রায়টের নানান অঘটনের মধ্য দিয়ে মিনতি টের পায় তার জন্যও বদলে গেছে চারপাশ। বাবা বিগত হয়েছেন, বিধবা পিসি কেবল সঙ্গী। পাশের বাড়ির ছেলেটি ঢাকায় মিছিলে গুলি খেয়ে শহীদ হয়েছে। মিনতি তার নাড়ির যোগ ছিন্ন করে পথে ওঠে। গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড – যশোর রোড ধরে। এভাবেই বর্ডার পেরিয়ে ঘরছাড়া মানুষ পূর্ববাংলার শরণার্থী হয়ে উঠে যায়।
আমাদের চলচ্চিত্রে লক্ষণীয়ভাবে যা অনুপস্থিত, সেই সম্প্রদায়গত প্রসঙ্গ উপস্থাপন করেছেন তানভীর মোকাম্মেল অকপট, সরাসরি, কোনোরকম আপস না করে। আমি যে বিশেষ দিকটি লক্ষ করে বরাবরই বিচলিত হয়েছি, সে-দিকটি আমাদের স্ববিরোধী দৃষ্টিভঙ্গিগত। আমরা বহুবার ‘সেকুলার’ সংস্কৃতির কথা সগর্বে বলেছি, কিন্তু কখনোই আমরা লক্ষ করিনি, ১৯৪৭ থেকে আজ অবধি যেসব চিত্র নির্মিত হয়েছে তাতে অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কতটুকুন উপস্থিতি। কতটুকুন প্রাধান্য বা জায়গা দেওয়া হয়েছে অন্য সম্প্রদায়কে এবং সেটি সমাজ-বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি-না! অন্য সম্প্রদায়ের মানুষকে যে-পেশা, যে-শ্রেণিভুক্ত দেখানো হয়েছে, তাতে তাদের উপস্থিতি প্রান্তিক পর্যায়ের। শিল্পে বিষয়কে স্পেস-অ্যালটমেন্ট বা জায়গা দেওয়ার মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়ে ওঠে কে প্রধান কে গৌণ। সে-বিচারে আমাদের চলচ্চিত্রে অন্যান্য সম্প্রদায় সুনির্দিষ্ট চেহারা নিয়ে উপস্থাপিত হয়নি, বরং অদৃশ্যই রয়ে গেছে। অবশ্য ‘বেহুলা, লক্ষ্মীন্দর’, ‘বিরাজ বউ’, ‘দেবদাস’ প্রসঙ্গ এখানে টানার প্রয়োজন দেখছি না, কারণ তা স্পষ্টতই ভিন্ন মাত্রার প্রসঙ্গ।
তানভীর মোকাম্মেল ‘চিত্রা নদীর পাড়ে’-তে সাম্প্রদায়িক প্রসঙ্গটির সঙ্গে সমাজ, রাষ্ট্র, সম্প্রদায়ভুক্ত এবং সম্প্রদায়-বহির্ভূতের নানান মাত্রার যোগসূত্রগুলো যেমন স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন, তেমনি প্রতিবাদের জায়গাটিও স্পষ্ট করেছেন, যা পক্ষান্তরে আরো স্পষ্ট হয়েছিল, যখন তানভীর ছাড়পত্রের সময় সেন্সরের ঝামেলায় পড়েন। আমরা অচিরেই বুঝে যাই, কেন মিনতিদের নিয়ে এদেশে চলচ্চিত্র হয়নি। কারণ বাণিজ্যিক অশ্লীলতা এবং সাম্প্রদায়িক বাস্তবতা রাষ্ট্রীয় সেন্সর-ব্যবস্থায় একই পাল্লায় মাপা হয় অথবা সমার্থক অফেন্স!
পরিশেষে তারেক মাসুদ এবং তানভীরকে অভিনন্দন
আগেই বলেছিলাম, তারেক এবং তানভীরকে কখনোই আয়োজন করে আমার ধন্যবাদ জানানো হয়নি। যে-প্রসঙ্গ চলচ্চিত্র কেন, সাহিত্যে, প্রবন্ধে, চিত্রের মোটিভে ব্যবহার করতে গিয়ে আমরা সংশয়ে ভুগি, ভয় পাই, সেই স্পর্শকাতর ধর্মীয় দিকটিকে খুব সহজ এবং কোমলতা নিয়ে বাংলাদেশের এবং বাইরের – দু-রকম দর্শকের সামনেই তুলে ধরলেন তারেক মাসুদ।
আজকের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে ধর্ম সবচাইতে স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ এবং নানা অর্থেই তা যেন শাঁখের করাত, সেই প্রসঙ্গ স্বদেশ এবং বিদেশের দু-রকম দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য করা এবং এ-দেশের রাষ্ট্রচরিত্রে অনুমোদনসাপেক্ষে বেরিয়ে আসার সাহস দেখিয়েছেন তারেক। একই কারণে তানভীর মোকাম্মেলকে বিশেষভাবে অভিনন্দন জানাচ্ছি, কারণ সাম্প্রদায়িকতার যে-প্রসঙ্গ আজ অবধি চলচ্চিত্রে প্রায় নিষিদ্ধ ছিল – সেই জানালাগুলো যেন খুলে গেল।
এখন আগামী চলচ্চিত্রকারদের এই জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখার পালা! ৎএ-কথা ভেবে বিব্রত হতে হয় যে, পাকিস্তানি শাসনের দীর্ঘ ২৪টি বছরে, এ-দেশে নির্মিত প্রতিবাদী চলচ্চিত্র মাত্র একটি! ১৯৬৯-এ জহির রায়হান তাঁর ‘জীবন থেকে নেয়া’ নির্মাণ শুরু করেন, যা ছিল পাকিস্তানি সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে কটাক্ষ। যদিও এর নির্মাণ-ঢঙ প্রতীকী, তবুও নির্মাণকাল থেকেই চলচ্চিত্রটি নানা বিড়ম্বনায় জর্জরিত হয়। এর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে যে-গণআন্দোলন, এবং সেই আন্দোলনের মাধ্যমে ছাড়পত্র আদায় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক-আন্দোলনের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। ‘জীবন থেকে নেয়া’র বাইরে আর একটি নামও চলচ্চিত্রের ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যা সেই অর্থে চেতনা-সঞ্চারী। যদিও ১৯৬৭-এ নির্মিত খান আতার ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’-কে আজকাল একই কাতারে এনে দাঁড় করানো হয়, মূলত তা ছিল ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে জনপ্রিয় নাটকের চলচ্চিত্র রূপান্তর। এছাড়া ১৯৭০-এ রেবেকা নির্মিত ‘বিন্দু থেকে বৃত্ত’-তে কিছু জাগরুক চেতনার উপকরণ ব্যবহৃত হলেও, মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলন-তপ্ত দর্শকের দৃষ্টি কাড়া।
পরবর্তীকালে জহির রায়হানই মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে প্রতিবাদী প্রামান্যচিত্রসমূহ নির্মাণ করেন, যা এ আলোচনায় অপ্রাসঙ্গিক।
১৯৫২-র রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্বের হাত ধরে এবং ধারাবাহিকতায় যে-ধরনের চলচ্চিত্র প্রত্যাশিত ছিল, তার উদ্যোগ কখনো নেওয়া হয়েছিল কি-না, সে-বিবেচনা এবং সে-ইতিহাস সম্পূর্ণ অন্য পাঠ দাবি করে।
’৭১-পরবর্তী চলচ্চিত্র : যোগ-বিয়োগের কড়চা
৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এ-দেশের মানুষের নিবিড়তম অভিজ্ঞতা। গণযুদ্ধের বহুমাত্রিক অনুষঙ্গ, ধ্বংস এবং প্রাপ্তির বিচিত্র বিন্যাস – জাতিগত চেতনায় গভীর রেখাপাত। এ-সবই সৃষ্টিশীলতার অনুকূলে। এই ঘটনাবহুল সময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র-ইতিহাসের নতুন অধ্যায় রচনা-সম্ভাবী। সূচনা হতে পারত চলচ্চিত্র-নির্মাণের নতুন ধারার, যখন বিষয় এবং আঙ্গিক পারস্পরিক উৎকর্ষের জন্য তৈরি। যুদ্ধকালীন সময়ে এ-দেশে সংঘটিত পাকবাহিনীর নির্মমতা, গণহত্যা, নারী-নির্যাতন, ধর্ষণের ব্যাপকতা, শরণার্থী জীবনের নানানদিক, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মদান এবং বীরত্বের কাহিনী, বুদ্ধিজীবী নিধন, ২৫শে মার্চের কালরাত্রি, ক্ল্যানডেস্টাইন সরকার এবং রাজনীতির বহুধা ধারা – চলচ্চিত্র-নির্মাণের অজস্র উপকরণ ন’টি মাসের পরিধি জুড়ে যেমন রয়েছে, তেমনি ভাষা-আন্দোলন থেকে তিলেতিলে গড়ে-ওঠা গণমানুষের মুক্তির স্বপ্ন, মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিমূলক অধ্যায় এবং বিজয়ও চলচ্চিত্রের চমৎকার বিষয় হতে পারত।
এই সূত্রে যে-দিকসমূহ আরো স্পষ্ট হতে পারত এবং সেক্ষেত্রে প্রভূত সম্ভাবনাও ছিল – তা হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের স্বরূপ। তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক চাওয়া-পাওয়া, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলার মানুষের বিযুক্তির কারণ, নানান ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষের সহাবস্থানের চিত্র, সমাজে তাদের অবস্থান এবং অবদানগত পরিষ্কার ধারণা।
চলচ্চিত্র যে চেতনা-সঞ্জীবনী প্রভাব ফেলতে পারে তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ সোভিয়েত চলচ্চিত্র ‘ক্রেনস্ আর ফ্লাইং, ‘ব্যালাড ফর
এ সোলজার’, যা এ-দেশের দর্শক-হৃদয় বিপুলভাবে
মথিত করেছিল।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী চলচ্চিত্রের দায়বদ্ধতা ছিল মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য এবং যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতার মধ্যে সন্ধি-স্থাপনে সচেষ্ট হওয়া। তৎকালীন যুদ্ধ-পরবর্তী সমাজ, এর অন্তর্গত দ্বন্দ্বের উৎস, কার্যকারণের সার্থক রূপায়ণ একদিকে যেমন চেতনা-জাগরীর কাজ করত, তেমনি আদর্শিক বিভ্রান্তি-নিরসনেও অনেকটা কার্যকর হতো। বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল জহির রায়হানের মতো সমাজ-সচেতন চলচ্চিত্রকারের, যিনি মুক্তিযুদ্ধকালেও সৃষ্টি করে গেছেন যুদ্ধের দলিলচিত্রসমূহ, যার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে আমরা পাই আলমগীর কবীর এবং তার ‘ধীরে বহে মেঘনা’।
যেখানে মূল চরিত্র একজন ভারতীয় নারী, হারিয়েছেন তার বৈমানিক প্রেমিককে, যিনি ১৯৭১-এর যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর পক্ষে অংশ নিয়েছিলেন। যে-দেশের জন্য তার প্রেমিক শহীদ হলেন, সেই যুদ্ধ-পরবর্তী দেশ-দর্শনে তিনি আসেন এবং জানতে পারেন বাংলাদেশের গণমানুষের সংগ্রামী ঐতিহ্য, তাদের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বজন হারানোর কষ্ট, ধর্ষিত নারীর স্বরূপ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আশা, আকাক্সক্ষা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী দেশের হতাশার কথা। দুটি ঘণ্টার চলচ্চিত্রে উঠে আসে একটি দেশের যুদ্ধ, এর মানুষ এবং অন্যদেশের সঙ্গে সংহতির সম্ভাবনার কথাও, যা একটি দেশের সমাজ এবং যুদ্ধকে অন্য দেশের চেতনার অঙ্গনে রোপণ করে।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ‘ধীরে বহে মেঘনা’র মতো যুদ্ধকাহিনী নিয়ে সার্থক চলচ্চিত্র ১৯৭৩-এর পর আমরা পাইনি। সুভাষ দত্তের ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ও সচেষ্ট ছিল মুক্তিযুদ্ধকে ব্যক্তি এবং সমষ্টির দুটি পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখায়। এছাড়া ’৭১-পরবর্তী উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রসমূহের মূল ট্রেন্ড সমাজ-ব্যবচ্ছেদের চাইতে গুরুত্ব দেয় হতাশা রূপায়ণে, যার সমাধান সমাজ-বাস্তবতা নাটকীয়ভাবে পালটে দেওয়ার মধ্য দিয়ে। চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধের সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার এই সময়কার প্রবণতা আলাদা একটি পাঠ দাবি করে।
১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ পালটে দেয় এবং লক্ষণীয়ভাবে নিশ্চুপ হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ।
এই সময়ে রাজনৈতিক দল এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নির্জীব হয়ে। এ-সময়ই কিছু আপাত-নিরাপদ সাংস্কৃতিকচর্চা অব্যাহত থাকে কিছুকাল। এইসব সংগঠনের রাজনৈতিক ঝোঁকটি সম্পর্কে রাষ্ট্রের স্পষ্ট ধারণা না থাকার ফলেই সম্ভবত এরা টিকে থাকতে পেরেছিল। যেমন- বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ কার্যক্রম। এই সংগঠনসমূহের কার্যক্রম সেই মধ্যসত্তরে তারুণ্যকে একরকমের সাংস্কৃতিক প্রকাশের ও চর্চার জায়গা করে দেয় – যার ফলে সেই বন্ধ্যা সময়েও তরুণেরা সৃষ্টিশীলতার স্বপ্ন দেখেছিল। এখানেই প্রসঙ্গে প্রবেশ তারেক মাসুদ, তানভীর মোকাম্মেলের।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী তারুণ্য :
১৯৭৮
তারেক মাসুদের সঙ্গে সখ্য সত্তর-দশকের শেষদিকে, যখন আমরা একই সংগঠনের ছত্রতলে গলা ফাটিয়ে সমাজভাঙার গান আর স্লোগানধর্মী নাটকের জোর রিহার্সেল করছি। সম্ভবত সখ্যের সমিল সূত্র হিসেবে কাজ করেছিল আশেপাশের চোখে লাল রুমাল বাঁধা, বজ্রমুষ্ঠি, দৃঢ় চোয়াল কমরেডদের কাছ থেকে আড়াল করে খুব নিভৃতে পোষা আমাদের উভয়েরই সংশয়বাদ – অবশ্য যা কখনোই আমরা প্রকাশ্যে স্বীকার করিনি।
আরো একটি সূত্র, যা আমাদের মধ্যে ভাবনার যোগসূত্র হয়ে কাজ করে এবং কালে কালে প্রকাশ্য হয়ে ওঠে, তা হচ্ছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একই ধারার বিশ্বাস, যা আমাদের সমকালীন এবং সাংগঠনিক বন্ধুদের মধ্যে একটা পরিষ্কার ভেদরেখা টেনে দেয় পরবর্তী সময়ে। শিশুর সারল্যে আমরা তখন একযোগে বিশ্বাস করেছি বাংলাদেশে এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ অবশ্যম্ভাবী। তখন যদিও সেই ‘সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ চীন না রুশের দড়িটানায় উন্মুল হবার অবস্থায়, আমরা কতিপয় বুকের মধ্যে সঙ্গোপনে বাঙালি-জাতিসত্তার প্রায় নিভু-নিভু শিখাটি বাঁচিয়ে পায়ে-পায়ে ফিরতে শুরু করি।
কার কাছে ফিরেছিলাম, জানি না। এটুকু জানি যে, তখনই, মুক্তিযুদ্ধশেষে পাঁচ-ছয় বছরের মাথায়, কিছু প্রগতিশীল বলে কথিতের মধ্যে বাঙালি না বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গিয়েছিল। সেখানে আমাদের অগ্রজদের মতাদর্শিক দলছুট কাজ-কারবার তরুণদের ওপর এক ঘোলাটে প্রভাব বিস্তার করে, যা ভেঙে আজ অবধি অনেকেই আর কখনোই সবুজ মাঠকে সবুজরূপে দেখেনি (যদিও তাদের দিক থেকেও একই কথা মনে হতে পারে)। যে যার বিশ্বাসের বদ্ধকুঠুরির অর্গল এঁটে সাময়িকভাবে পড়ে থাকলেও একসময়ে আবার সকলেই খোলা প্রান্তরে হাজির হবো বলে যে-আস্থা ছিল সময়ের ওপর, সেটাও অনেকের ক্ষেত্রে ভ্রান্ত প্রমাণিত হয়। আমরা যারা কখনোই রাজনৈতিক দলভুক্ত ছিলাম না, তারাও দুর্ভাগা বাংলাদেশের মতোই ডিফিকাল্ট পলিটিক্সের অভিঘাতে জর্জরিত হই, কারণ ‘কঠিন রাজনীতি’র প্যাঁচ মূলত বাঙালি সংস্কৃতির কণ্ঠরোধের জন্য কাজ করে।
ততদিনে ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন’-এর সঙ্গে আমাদের সংযুক্তি ঘটে গেছে। এই সূত্রে পরিচয় তানভীর মোকাম্মেলের সঙ্গে। ও তখন কমিউনিস্ট পার্টির কঠিন সমর্থক। পার্টির মুখপত্র একতা আর ক্ষেতমজুর সমিতি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। দেখা হলেই আমরা একে অন্যকে তর্জনী নাচিয়ে ‘তুমি ভুল, তুমি ভুল’ বললেও আমাদের সৌহার্দ্যরে ক্ষেত্র ছিল চলচ্চিত্র-পাঠ, চলচ্চিত্র-আলোচনা এবং চলচ্চিত্র-নির্মাণের স্বপ্ন।
নিত্যনতুন বিষয়ের উদ্গার মগজে, জমে-ওঠে স্ক্রিপ্টের ¯তূপ। জানি কখনোই সে-স্ক্রিপ্ট প্রাণ পাবে না, এ-ও জানি যে, চলচ্চিত্র-নির্মাণ সহজ নয়, বিশেষ করে যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের কোনো সুযোগ নেই, অর্থেরও যোগ যেখানে দুরাশা। এ-সত্য ক্রমাগত স্পষ্ট হয়েছে যে, এ-রাষ্ট্র আর যার জন্যই হোক, স্বাধীন সত্তাধারী সমাজ-সচেতন তরুণদের জন্য অন্তত নয়। এখানে সব বয়সী মানুষ জরাগ্রস্ত, কী শিশু, কী কিশোর! তারুণ্যের কাছে দুটি পথ খোলা – হয় দেশ ছাড়ো, না হয় চলচ্চিত্র আন্দোলন করো।
আশির দশক
চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের কাজ মূলত ছিল দেশ-বিদেশের চলচ্চিত্র প্রদর্শন। সংসদ কার্যালয়ে লাইব্রেরি, যেখানে থাকত চলচ্চিত্র-সম্পর্কিত হরেক বই, পুস্তিকা, পত্রাদি। এখান থেকে বেরুত চলচ্চিত্রপত্র, চলচ্চিত্র-সংকলন প্রভৃতি। এছাড়াও আয়োজিত হতো দেশ-বিদেশের চলচ্চিত্র-প্রশিক্ষকের পরিচালনায় বিশেষ কর্মশালা, প্রশিক্ষণ-কোর্স। এই প্যারালেল সাংস্কৃতিকচর্চা চলচ্চিত্র-নির্মাণের প্যারালেল ধারাকে অনেকটাই অনুপ্রাণিত করে। সে-সময়কার তরুণ-তরুণীদের জন্য এই কার্যক্রম একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা রাষ্ট্রীয় কালাকানুনের আওতাভুক্তির পর ক্রমান্বয়ে দুর্বল হতে থাকে।
নানারকম বাধা সত্ত্বেও এ-দেশের চলচ্চিত্রসমূহ, যা আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত, নন্দিত এবং পুরস্কৃত হয়, তা সংসদকর্মীদের একরোখা উৎসাহের ফসল। তা শর্টফিল্ম ফোরামের কার্যক্রমের সূচনা ও চলচ্চিত্র সংসদ কর্মীদের উৎসাহে বলা যেতে পারে নির্দ্বিধায়।
এ-যেন ছিল সামরিকতন্ত্রের রাহুগ্রস্ততা থেকে বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে মুক্ত করার লড়াই।
নব্বইয়ের দশক
নব্বইয়ে গণঅভ্যুত্থানের পর চলচ্চিত্র-নির্মাণ যেন নতুন মাত্রা পায়। চলচ্চিত্র-নির্মাণের জন্য রাষ্ট্রীয় অনুদানের পর্বটি প্রথমবারের মতো সাড়া জাগালেও চলচ্চিত্রের বিষয়-নির্বাচনে সতর্কতার লাল আলো জ্বালিয়ে রাখে। রাষ্ট্রের আঁকা লক্ষণরেখা পার হওয়া মানে সেন্সর ছাড়পত্রের সুযোগ হারানো। তারেক মাসুদের ‘মুক্তির গান’ মুুক্তিযুদ্ধের অমূল্য দলিল বলে গণ্য হলেও ছাড়পত্রের প্রাকার পেরিয়ে জনসম্মুখে আসতে হিমশিম খায়। একই ভাগ্য তানভীর মোকাম্মেলের ‘নদীর নাম মধুমতি’র।
বিষয়টি স্পষ্টতই যে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্র-নির্মাণ করতে যাওয়া মানে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে নাজেহাল হওয়া, সে-রাষ্ট্র সামরিক হোক কী গণতান্ত্রিক! এক্ষেত্রে দাঁত কামড়ে লড়ে গেছেন তারেক মাসুদ এবং তানভীর মোকাম্মেল। তারা ইতিহাসকে তুলে ধরে, সেন্সর-সংক্রান্ত সমস্যায় জড়িয়ে, রাষ্ট্রীয় প্রতিকূলতা এবং বৈরিতার দিকটি বারবার দেখিয়ে দিয়েছেন। তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ এবং তানভীর মোকাম্মেলের
‘চিত্রা নদীর পাড়ে’ আজ বিপুলভাবে সমাদৃত স্বদেশে এবং
আন্তর্জাতিকভাবে।
‘মাটির ময়না’ একটি সার্থক পিরিয়ড পিস
তারেক মাসুদের ‘মাটির ময়না’ একটি শিশুর দেখা এ-বাংলার ষাটের বাঙালি-সমাজ এবং ক্রমাগত তার জাতিসত্তার সংগ্রামে উপনীত হওয়া। তিনটি মূর্তিমান দ্বন্দ্ব এই ষাটের প্রেক্ষাপটে সহাবস্থান করে এবং যুদ্ধের মাধ্যমে নিরসন চায়। কাজী, যিনি বালক আনুর পিতা, এক সময়কার কেতাদুরস্ত প্রায় সাহেব, যিনি বদলে গিয়ে ধর্মীয় গোঁড়ামির কাছে সমর্পিত। অন্যদিকে কাজীর স্ত্রী আসমা। ছেলেবেলায় প্রায় এক্কা-দোক্কা খেলার বয়সে বিয়ে হয়ে-আসা এ-বাড়িতে; যার সংসারের নিগড়ে আবদ্ধ হওয়া, মাতৃত্ব ও বদলে-যাওয়া কঠোর স্বামীর নিয়ন্ত্রণে; যার কণ্ঠরুদ্ধ ধর্মীয় অনুশাসনে, সেই আসমা নিয়ম ভাঙে স্বামীর আড়ালে। অন্যদিকে, মিলন, কাজীর ছোট ভাই। মিলন ষাটের দশকের তরুণ, সমাজতন্ত্রের, সাম্প্রদায়িকতার পক্ষে যে বাংলাদেশের স্বাধিকারে বিশ্বাস করে। আসমা এবং মিলনের দেবর-ভাবির সেই চিরমধুর সম্পর্কের মধ্যে কাজীর গড়া দেয়াল, যা ডিঙিয়ে তারা সমস্যা, আশা-নিরাশার দু-চার কথা বলে। মিলন বড় ভাইয়ের চোখ এড়িয়ে এনে দেয় বাড়িতে নিষিদ্ধ অ্যালোপ্যাথি। আনু নামের বালকটি চাচার কাছেই পৃথিবীর নিশানা চেনে। চলচ্চিত্রের শেষ পর্যায়ে প্রতিরোধ-যুদ্ধে পাকসেনাদের গুলিতে নিহত হয় মিলন। যে-আনুকে মাদ্রাসায় পাঠিয়েছিল বাবা, সে মাদ্রাসার দুঃসহ অবরুদ্ধ, কঠোর নিয়মানুবর্তিতার, প্রাণহীন জীবন থেকে ফিরে আসে বাড়ি, ঠিক যখন তার গ্রামটিতে উঠে এসেছে পাকিস্তানি সেনারা। কাজীর পুরোদমে আস্থা যে তার বিজাতীয় ধর্মীয় ভাইয়েরা তাকে রক্ষা করবে, কারণ তারা বাঙালিদের হাত থেকে ইসলাম রক্ষা করতেই এসেছে। তার ধর্মীয় গ্রন্থ, তার বিশ্বাস, তার আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা তার সহায়।
শেষ দৃশ্যে হতবুদ্ধি, বিক্ষিপ্ত কাজী তার পোড়া বাড়ির, পোড়া ধর্মগ্রন্থ পরিবেষ্টিত। সারারাত আনুকে নিয়ে জঙ্গলে পড়ে-থাকা আসমা ফিরে আসে। পলায়নরত মানুষের মুখে জানতে পারে মিলন নিহত হয়েছে। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য কাজীকে নিয়ে সে-ও পালিয়ে বাঁচতে চায়। কাজী অনড়, অথবা তার বিশ্বাস এবং ঘটনাপটের সঙ্গে সে মিল খুঁজে পাচ্ছে না। কাজীর একরোখামির জন্য কন্যার অকাল মৃত্যুতেও যে আসমা কোনো প্রতিবাদ করেনি সে প্রথমবারের মতো ফুঁসে ওঠে, ‘দেখ, তোমার মুসলমান ভাইয়েরা কোন চিতা জ্বালায়ে গেছে …।’ আনুর হাত ধরে আসমা বেরিয়ে যায়। এখানেই ছবির শেষ। ছোট ছোট আঁচড়ে অথবা বলা যায়, যেন ব্রাশের আলতো টানে এই সবই মূর্ত হওয়া। বিশেষ করে আনুর মাদ্রাসার জীবনের যে-রূপায়ণ। আনুর মাদ্রাসার বন্ধু রোকনের ক্রমাগত বাস্তবের সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে ফেলা, অথবা কঠোর, আনন্দহীন জীবনে এক টুকরো নিজের জগৎ গড়া, বুক নিংড়ানো মর্মস্পর্শী চিত্রায়ণ। আঙ্গিকের অপরূপ বিন্যাস।
তারেক বলেন, এ তার বাল্যকালের অভিজ্ঞতা। মানুষ মাত্রেই উৎসে ফেরা, পুঞ্জীভূত স্মৃতির কুণ্ডলী ছিঁড়ে-খুঁড়ে নিজেকে দেখা। কেবল ব্যক্তিগত স্মৃতির মধ্যেও ঘটনাপট নিয়ে সময়কাল এবং সামষ্টিক ইতিহাসের নানান ব্যঞ্জনা লুকিয়ে থাকে। এর যথাযথ রূপায়ণ সৃষ্টিশীলতাকে সমৃদ্ধ করে, বাস্তবোচিত করে। তারেকের ‘মাটির ময়না’ সে-কারণেই বুঝি সার্থক পিরিয়ড পিস হয়ে ওঠে। সে-কারণেই কেবল দেশ-বিদেশে ‘মাটির ময়না’ নন্দিতই হয় না, সীমানা পেরিয়ে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন মানুষের বোধের দরজায় পৌঁছে দেয় বাংলাদেশ নামক দেশটির জন্মবৃত্তান্তের ঘটনাপট, দেশের মানুষের মুক্তির সংগ্রাম, দেশের মানুষের আশা, হতাশা, স্বপ্ন। ফরাসি চলচ্চিত্র-সমালোচক ফিলিপ লেকলের ‘মাটির ময়না’ নিয়ে লিখতে বসে বলেই ফেলেন, ‘Due to the universality of the message and the diversity of its themes, ÔThe Clay BirdÕ should be seen by all students, from class six onwards whatever their subject of study.’ ‘সার্বজনীন বক্তব্য এবং বিষয়ের বহুমাত্রিকতার জন্য ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রটি প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর দেখা উচিত। ক্লাস সিক্স থেকে ওপর পর্যন্ত, তাদের পাঠ্যবিষয় যা-ই হোক না কেন।’ একই বক্তব্য তেহরান টাইমস-এর। ‘Film maker recalls his past to take Bangladesh to Cannes.’ ‘চলচ্চিত্রকার তার অতীত-রোমন্থন করেছেন বাংলাদেশকে
‘কান’-এ পৌঁছে দিতে এই শিরোনামে চলচ্চিত্র-আলোচনা লেখা হয়েছে।
চলচ্চিত্র-নির্মাণে তারেক-ক্যাথেরিনের সমন্বয় কতটা উৎকর্ষের তা স্পষ্টতই ‘মাটির ময়না’র বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তায়। তারা ক্যামেরায়, সম্পাদনা, সেট, পোশাক, সংগীতেও যে সুচিন্তিত অনবদ্য মাত্রা যোগ করেছেন, তার সপ্রশংস রিভিউ বিশ্বের সেরা সব পত্রিকায়, চলচ্চিত্র-সমালোচকের। সেসব পড়তে গিয়ে আপ্লুত হয়েছি বারবার। বাংলাদেশ, বিশেষ করে এর মুক্তি-সংগ্রামের গর্বিত এবং একই সঙ্গে বেদনাবিধুর ইতিহাস, ১৯৭১-এর ৩২ বছর পর আন্তর্জাতিকভাবে এত ব্যাপক আলোচিত হলো।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ-ছবির অনুদান তারেককে যোগাড় করতে হয়েছে দেশের বাইরে থেকে। কারণ, ইতিহাসনির্ভর চলচ্চিত্রের নির্মাণের জন্য অন্তত তার মাতৃভূমির কোনো দায় নেই! না এর মানুষের, না বাংলাদেশের ইতিহাসের সংরক্ষকদের, না রাষ্ট্র-পরিচালনায় যারা আসেন – তাদের।
তানভীর মোকাম্মেলের ‘চিত্রা নদীর পাড়ে’
মিনতিদের নিয়ে আগে কেউ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিল কি এ-দেশে? কই মনে পড়ে না-তো! দেশটা যখন ভাগ হয়ে গেল ধর্মভিত্তিতে, তখনো মিনতির বাবা উকিল শশীকান্ত সেনগুপ্ত বিচলিত হননি। তিনি ধর্মভিত্তিক দেশটির অস্তিত্বকে মেনে নিয়েছেন। বন্ধু-স্বজনরা অনেকবার বলার চেষ্টা করেছিল – এ-দেশ এখন আর হিন্দুদের নয়। সে-কথা কানে তোলেননি শশীকান্ত। যেখানে পরম্পরায় থেকেছেন, যে মাটি, যে প্রকৃতির সঙ্গে নাড়ির যোগ, সেই চিরচেনা পরিমণ্ডল ফেলে তিনি কোথায় যাবেন? এ তার জন্মভূমি! তাছাড়া তার ওকালতির পসার রয়েছে, তাকে এক নামে সারা তল্লাট চেনে। এতদিনের নামডাক তার, হিন্দু-মুসলমান বিচারে দাঁড়ায়নি। তার মক্কেল ধর্ম দেখে তার কাছে আসে না, আসে কর্মগুণে। শশীকান্ত এসব নীরব বোঝাপড়ায় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তিনি আর যা-ই হোন, দেশত্যাগী হবেন না। কিন্তু অচিরেই তার ভুল ভাঙতে থাকে। পাকিস্তান যে ধর্মকেন্দ্রিক রাষ্ট্র – কেবল ধর্মের অজুহাতে ধরে রেখেছে হাজার মাইল ব্যবধানের দুই অংশকে, যার রয়েছে একেবারে বিপরীত প্রকৃতি, আবহাওয়া, জীবনযাপন, সমাজকাঠামো এবং নানা বিশ্বাসের মানুষের বসবাস। পাকিস্তানের জন্মসূত্রে যে-শ্রেণিটি নতুন মুসলমানিত্বের দোর্দণ্ডপ্রতাপে মাথা তুলতে থাকে, তারা শশীকান্তদের তাড়িয়ে জায়গা নিতে চায়, সস্তায় বাড়ি কিনতে চায়। কিনতে না পারলে অন্তত দখল করার কৌশলটা নিয়ে ভাবে। এদের পক্ষে পাকিস্তানি আইন কাজ করে। শশীকান্তদের কাছে এ-সবই স্পষ্ট হয়।
মিনতি বড় হয়েছিল হিন্দু-মুসলমান না বুঝে। সে-রকম কোনো শিক্ষা তো দেয়নি বাবা। যখন সে বড় হয় পাশের বাড়ির আশৈশব চেনা মুসলমান ছেলেটিকে সে ভালোবাসে। একবারও মনে হয়নি অন্য ধর্মের ছেলেটিকে গ্রহণ করতে সামাজিক ঝক্কি পোহাতে হবে কি-না। পাশাপাশি গড়ে-ওঠা, বড় হওয়া – যারা কেবল পার্থক্য দেখেছে যজ্ঞ পালনের ক্ষেত্রে। ভাইটি কলকাতায় চলে গেলেও মিনতি যায়নি। দাদা বুঝে গিয়েছিল এ দেশে তার জন্য সুযোগ ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। ১৯৬৪-র রায়টের নানান অঘটনের মধ্য দিয়ে মিনতি টের পায় তার জন্যও বদলে গেছে চারপাশ। বাবা বিগত হয়েছেন, বিধবা পিসি কেবল সঙ্গী। পাশের বাড়ির ছেলেটি ঢাকায় মিছিলে গুলি খেয়ে শহীদ হয়েছে। মিনতি তার নাড়ির যোগ ছিন্ন করে পথে ওঠে। গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড – যশোর রোড ধরে। এভাবেই বর্ডার পেরিয়ে ঘরছাড়া মানুষ পূর্ববাংলার শরণার্থী হয়ে উঠে যায়।
আমাদের চলচ্চিত্রে লক্ষণীয়ভাবে যা অনুপস্থিত, সেই সম্প্রদায়গত প্রসঙ্গ উপস্থাপন করেছেন তানভীর মোকাম্মেল অকপট, সরাসরি, কোনোরকম আপস না করে। আমি যে বিশেষ দিকটি লক্ষ করে বরাবরই বিচলিত হয়েছি, সে-দিকটি আমাদের স্ববিরোধী দৃষ্টিভঙ্গিগত। আমরা বহুবার ‘সেকুলার’ সংস্কৃতির কথা সগর্বে বলেছি, কিন্তু কখনোই আমরা লক্ষ করিনি, ১৯৪৭ থেকে আজ অবধি যেসব চিত্র নির্মিত হয়েছে তাতে অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কতটুকুন উপস্থিতি। কতটুকুন প্রাধান্য বা জায়গা দেওয়া হয়েছে অন্য সম্প্রদায়কে এবং সেটি সমাজ-বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি-না! অন্য সম্প্রদায়ের মানুষকে যে-পেশা, যে-শ্রেণিভুক্ত দেখানো হয়েছে, তাতে তাদের উপস্থিতি প্রান্তিক পর্যায়ের। শিল্পে বিষয়কে স্পেস-অ্যালটমেন্ট বা জায়গা দেওয়ার মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়ে ওঠে কে প্রধান কে গৌণ। সে-বিচারে আমাদের চলচ্চিত্রে অন্যান্য সম্প্রদায় সুনির্দিষ্ট চেহারা নিয়ে উপস্থাপিত হয়নি, বরং অদৃশ্যই রয়ে গেছে। অবশ্য ‘বেহুলা, লক্ষ্মীন্দর’, ‘বিরাজ বউ’, ‘দেবদাস’ প্রসঙ্গ এখানে টানার প্রয়োজন দেখছি না, কারণ তা স্পষ্টতই ভিন্ন মাত্রার প্রসঙ্গ।
তানভীর মোকাম্মেল ‘চিত্রা নদীর পাড়ে’-তে সাম্প্রদায়িক প্রসঙ্গটির সঙ্গে সমাজ, রাষ্ট্র, সম্প্রদায়ভুক্ত এবং সম্প্রদায়-বহির্ভূতের নানান মাত্রার যোগসূত্রগুলো যেমন স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন, তেমনি প্রতিবাদের জায়গাটিও স্পষ্ট করেছেন, যা পক্ষান্তরে আরো স্পষ্ট হয়েছিল, যখন তানভীর ছাড়পত্রের সময় সেন্সরের ঝামেলায় পড়েন। আমরা অচিরেই বুঝে যাই, কেন মিনতিদের নিয়ে এদেশে চলচ্চিত্র হয়নি। কারণ বাণিজ্যিক অশ্লীলতা এবং সাম্প্রদায়িক বাস্তবতা রাষ্ট্রীয় সেন্সর-ব্যবস্থায় একই পাল্লায় মাপা হয় অথবা সমার্থক অফেন্স!
পরিশেষে তারেক মাসুদ এবং তানভীরকে অভিনন্দন
আগেই বলেছিলাম, তারেক এবং তানভীরকে কখনোই আয়োজন করে আমার ধন্যবাদ জানানো হয়নি। যে-প্রসঙ্গ চলচ্চিত্র কেন, সাহিত্যে, প্রবন্ধে, চিত্রের মোটিভে ব্যবহার করতে গিয়ে আমরা সংশয়ে ভুগি, ভয় পাই, সেই স্পর্শকাতর ধর্মীয় দিকটিকে খুব সহজ এবং কোমলতা নিয়ে বাংলাদেশের এবং বাইরের – দু-রকম দর্শকের সামনেই তুলে ধরলেন তারেক মাসুদ।
আজকের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে ধর্ম সবচাইতে স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ এবং নানা অর্থেই তা যেন শাঁখের করাত, সেই প্রসঙ্গ স্বদেশ এবং বিদেশের দু-রকম দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ কাছে আসে না, আসে কর্মগুণে। শশীকান্ত এসব নীরব বোঝাপড়ায় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তিনি আর যা-ই হোন, দেশত্যাগী হবেন না। কিন্তু অচিরেই তার ভুল ভাঙতে থাকে। পাকিস্তান যে ধর্মকেন্দ্রিক রাষ্ট্র – কেবল ধর্মের অজুহাতে ধরে রেখেছে হাজার মাইল ব্যবধানের দুই অংশকে, যার রয়েছে একেবারে বিপরীত প্রকৃতি, আবহাওয়া, জীবনযাপন, সমাজকাঠামো এবং নানা বিশ্বাসের মানুষের বসবাস। পাকিস্তানের জন্মসূত্রে যে-শ্রেণিটি নতুন মুসলমানিত্বের দোর্দণ্ডপ্রতাপে মাথা তুলতে থাকে, তারা শশীকান্তদের তাড়িয়ে জায়গা নিতে চায়, সস্তায় বাড়ি কিনতে চায়। কিনতে না পারলে অন্তত দখল করার কৌশলটা নিয়ে ভাবে। এদের পক্ষে পাকিস্তানি আইন কাজ করে। শশীকান্তদের কাছে এ-সবই স্পষ্ট হয়।
মিনতি বড় হয়েছিল হিন্দু-মুসলমান না বুঝে। সে-রকম কোনো শিক্ষা তো দেয়নি বাবা। যখন সে বড় হয় পাশের বাড়ির আশৈশব চেনা মুসলমান ছেলেটিকে সে ভালোবাসে। একবারও মনে হয়নি অন্য ধর্মের ছেলেটিকে গ্রহণ করতে সামাজিক ঝক্কি পোহাতে হবে কি-না। পাশাপাশি গড়ে-ওঠা, বড় হওয়া – যারা কেবল পার্থক্য দেখেছে যজ্ঞ পালনের ক্ষেত্রে। ভাইটি কলকাতায় চলে গেলেও মিনতি যায়নি। দাদা বুঝে গিয়েছিল এ দেশে তার জন্য সুযোগ ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। ১৯৬৪-র রায়টের নানান অঘটনের মধ্য দিয়ে মিনতি টের পায় তার জন্যও বদলে গেছে চারপাশ। বাবা বিগত হয়েছেন, বিধবা পিসি কেবল সঙ্গী। পাশের বাড়ির ছেলেটি ঢাকায় মিছিলে গুলি খেয়ে শহীদ হয়েছে। মিনতি তার নাড়ির যোগ ছিন্ন করে পথে ওঠে। গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড – যশোর রোড ধরে। এভাবেই বর্ডার পেরিয়ে ঘরছাড়া মানুষ পূর্ববাংলার শরণার্থী হয়ে উঠে যায়।
আমাদের চলচ্চিত্রে লক্ষণীয়ভাবে যা অনুপস্থিত, সেই সম্প্রদায়গত প্রসঙ্গ উপস্থাপন করেছেন তানভীর মোকাম্মেল অকপট, সরাসরি, কোনোরকম আপস না করে। আমি যে বিশেষ দিকটি লক্ষ করে বরাবরই বিচলিত হয়েছি, সে-দিকটি আমাদের স্ববিরোধী দৃষ্টিভঙ্গিগত। আমরা বহুবার ‘সেকুলার’ সংস্কৃতির কথা সগর্বে বলেছি, কিন্তু কখনোই আমরা লক্ষ করিনি, ১৯৪৭ থেকে আজ অবধি যেসব চিত্র নির্মিত হয়েছে তাতে অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কতটুকুন উপস্থিতি। কতটুকুন প্রাধান্য বা জায়গা দেওয়া হয়েছে অন্য সম্প্রদায়কে এবং সেটি সমাজ-বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি-না! অন্য সম্প্রদায়ের মানুষকে যে-পেশা, যে-শ্রেণিভুক্ত দেখানো হয়েছে, তাতে তাদের উপস্থিতি প্রান্তিক পর্যায়ের। শিল্পে বিষয়কে স্পেস-অ্যালটমেন্ট বা জায়গা দেওয়ার মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়ে ওঠে কে প্রধান কে গৌণ। সে-বিচারে আমাদের চলচ্চিত্রে অন্যান্য সম্প্রদায় সুনির্দিষ্ট চেহারা নিয়ে উপস্থাপিত হয়নি, বরং অদৃশ্যই রয়ে গেছে। অবশ্য ‘বেহুলা, লক্ষ্মীন্দর’, ‘বিরাজ বউ’, ‘দেবদাস’ প্রসঙ্গ এখানে টানার প্রয়োজন দেখছি না, কারণ তা স্পষ্টতই ভিন্ন মাত্রার প্রসঙ্গ।
তানভীর মোকাম্মেল ‘চিত্রা নদীর পাড়ে’-তে সাম্প্রদায়িক প্রসঙ্গটির সঙ্গে সমাজ, রাষ্ট্র, সম্প্রদায়ভুক্ত এবং সম্প্রদায়-বহির্ভূতের নানান মাত্রার যোগসূত্রগুলো যেমন স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন, তেমনি প্রতিবাদের জায়গাটিও স্পষ্ট করেছেন, যা পক্ষান্তরে আরো স্পষ্ট হয়েছিল, যখন তানভীর ছাড়পত্রের সময় সেন্সরের ঝামেলায় পড়েন। আমরা অচিরেই বুঝে যাই, কেন মিনতিদের নিয়ে এদেশে চলচ্চিত্র হয়নি। কারণ বাণিজ্যিক অশ্লীলতা এবং সাম্প্রদায়িক বাস্তবতা রাষ্ট্রীয় সেন্সর-ব্যবস্থায় একই পাল্লায় মাপা হয় অথবা সমার্থক অফেন্স!
পরিশেষে তারেক মাসুদ এবং তানভীরকে অভিনন্দন
আগেই বলেছিলাম, তারেক এবং তানভীরকে কখনোই আয়োজন করে আমার ধন্যবাদ জানানো হয়নি। যে-প্রসঙ্গ চলচ্চিত্র কেন, সাহিত্যে, প্রবন্ধে, চিত্রের মোটিভে ব্যবহার করতে গিয়ে আমরা সংশয়ে ভুগি, ভয় পাই, সেই স্পর্শকাতর ধর্মীয় দিকটিকে খুব সহজ এবং কোমলতা নিয়ে বাংলাদেশের এবং বাইরের – দু-রকম দর্শকের সামনেই তুলে ধরলেন তারেক মাসুদ।
আজকের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে ধর্ম সবচাইতে স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ এবং নানা অর্থেই তা যেন শাঁখের করাত, সেই প্রসঙ্গ স্বদেশ এবং বিদেশের দু-রকম দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য করা এবং এ-দেশের রাষ্ট্রচরিত্রে অনুমোদনসাপেক্ষে বেরিয়ে আসার সাহস দেখিয়েছেন তারেক। একই কারণে তানভীর মোকাম্মেলকে বিশেষভাবে অভিনন্দন জানাচ্ছি, কারণ সাম্প্রদায়িকতার যে-প্রসঙ্গ আজ অবধি চলচ্চিত্রে প্রায় নিষিদ্ধ ছিল – সেই জানালাগুলো যেন খুলে গেল।
এখন আগামী চলচ্চিত্রকারদের এই জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখার পালা!


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.