সবার জন্য নন্দনতত্ত্ব
হাসনাত আবদুল হাই
কাগজ প্রকাশন,
ঢাকা, ২০০৪,
দাম : ৩৭৫.০০
প্রখ্যাত চিত্র-সমালোচক গমব্রিখ লিখেছেন যে, ‘আর্ট বলে সত্যি কিছু নেই, আছে শুধু আর্টিস্ট’। এ-রকম ভাবার কারণ হলো শব্দটি বিভিন্ন সময়ে এবং বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন জিনিসকে বুঝিয়েছে এবং ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত ও আচরিত হয়েছে। আলতামিরা ও লাসকোর গুহাগাত্রে উৎকীর্ণ চিত্রমালা থেকে আজ পর্যন্ত ত্রিশ হাজার বছর ধরে মানুষ ছবি আঁকছে, মূর্তি তৈরি করছে, ফ্রেস্কো তৈরি করছে, কিন্তু এর প্রায় সবটাই মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের কোনো না কোনো উদ্দেশ্য সাধনের জন্য করা হয়েছিল। হয় কোনো প্রাকৃতিক শক্তির আনুকূল্যলাভের জন্য অথবা দেব-দেবী ও ঈশ্বরের আরাধনা। ওইসব ছবি, ভাস্কর্য ও মূর্তিতে ঐন্দ্রজালিক গুণ আরোপ করা হয়েছিল, যার কিছুটা এখনো আছে, যেমন-দুর্গার মূর্তিতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা। এঁরা যখন ছবি আঁকছিলেন বা মূর্তি তৈরি করছিলেন তখন এঁরা আর্টও করছেন – এমনটি কিন্তু ভাবেননি। বস্তুতপক্ষে পাঁচশ বছর আগেও সৌন্দর্য-নির্মাণসংক্রান্ত একটি পৃথক শিল্প হিসেবে আর্টের চর্চা ছিল না। ইউরোপে রেনেসাঁ সেক্যুলারাই-জেশনের ফলে এটি ঘটল। আর্ট একটি সেক্যুলার শিল্প হিসেবে আবির্ভূত হলো – যার সঙ্গে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের কোনো আত্যন্তিক যোগ ছিল না। শুধুমাত্র সৌন্দর্য সৃষ্টি এর প্রেরণা এবং আনন্দবিধান এর লক্ষ্য। এইসব রেনেসাঁ-শিল্পী যে ধর্মাশ্রিত ছবি আঁকছিলেন না তা নয়। জীবিকার্জনের জন্য ইউরোপের অধিকাংশ শিল্পীকেই চার্চের জন্য ছবি আঁকতে হয়েছে। কিন্তু ধর্মবহির্ভূত অন্যান্য বিষয় নিয়েও এঁরা ছবি এঁকেছেন এবং এ-সমস্ত বিষয় নিয়ে আঁকা ছবি কম আনন্দদায়ক, আবেগসঞ্চারী বা কম বিস্ময়-উদ্বোধক হয়নি। এখন প্রশ্ন হলো, তবে কি এক ধরনের ছবি আর্ট, অন্য ধরনের ছবি আর্ট নয়? তা তো হতে পারে না। হয় দুধরনের ছবিই আর্ট, অথবা কোনোটিই আর্ট নয়। বিষয়বস্তু বা উদ্দেশ্য একটি অঙ্কিত ছবির বা নির্মিত মূর্তির বা ভাস্কর্যের আর্ট হিসেবে বিবেচিত হওয়ার অন্তরায় হতে পারে না। তা-ই যদি হবে তাহলে প্রাচীনকাল থেকে তৎকাল পর্যন্ত অঙ্কিত ছবির আর্ট হতে বাধা কোথায়? ঐতিহাসিক পশ্চাদ্দৃষ্টি যতদূর যায় ততদূর অতীত-সভ্যতার বিচিত্র সব সৌন্দর্য-নির্মাণ আর্ট হিসেবে স্বীকৃত হলো। প্রশ্ন অবশ্য থেকেই গেল যে, কোন গুণ বা বৈশিষ্ট্য থাকলে একটি শিল্পকর্মকে আর্টের মর্যাদা দেওয়া হবে? ওই বৈশিষ্ট্য কি তবে ব্যবহারিক উপযোগিতার পর যা অবশিষ্টাংশ, না-কি ওই রহস্যময় গুণ, যা ওই শিল্পবস্তুরই কেন্দ্রে বসে থাকে আত্মার মতো, যাকে ধরা যায় না? কারো কারো মনে হলো শিল্পীর সৌন্দর্য-চেতনা, কল্পনাশক্তি ও নির্মাণ-প্রতিভার অনন্যতাই নির্মিত শিল্পবস্তুকে বিশিষ্টতা দান করে ও তার গুণের নির্ণায়ক হয়। এটি কোনো সন্তোষজনক উত্তর হলো না, কারণ, গুচ্ছের প্রশ্ন উঠে গেল। সৌন্দর্য কী? সৌন্দর্য-চেতনা মানে কী? অনন্যতা কতটা অনন্য? প্রতিভার অস্তিত্ব কীভাবে বোঝা যাবে? আগে শিল্পীর অনন্যতা ও গুণাবলি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে কি আমরা শিল্পবস্তুর উৎকর্ষের পরিমাপ করি? না-কি শিল্পবস্তুর সৌন্দর্য দ্বারা অভিভূত হওয়ার পরই ওইসব কথিত গুণ শিল্পীতে আরোপ করি? তাছাড়া রেনেসাঁ-পূর্ববর্তী কাল পর্যন্ত তো অধিকাংশ শিল্পীর নাম-পরিচয়ই পাওয়া যায় না। শিল্পী কি একা না একটি গ্রুপ? দর্শকের সৌন্দর্য-চেতনা, কল্পনা, অনুভূতিশীলতাও বিচারের বাইরে রাখা যায় না, কারণ তাঁরাইতো ওই সৌন্দর্য আবিষ্কার করেন। সর্বোপরি দর্শক তার রুচি, অনুভূতি, কল্পনা ও সৌন্দর্য-চেতনা দিয়ে যে-সৌন্দর্যটি শিল্পবস্তুতে আবিষ্কার করে আনন্দিত হন, – সেই সৌন্দর্যটি তো সেখানে থাকতে হবে। সেই সৌন্দর্যের প্রকৃতি কী? সেই সৌন্দর্যের উৎসই বা কী? দেখা যাচ্ছে, নন্দনতাত্ত্বিকদের মনোযোগ কেবলই প্রতিসরিত হয়ে চলেছে – শিল্প থেকে শিল্পীতে, শিল্পী থেকে শিল্পভোক্তাতে, আর উৎসের কথা যেহেতু উঠে পড়ল – তবে কি প্রকৃতিতে অথবা বিবর্তমান সমাজে? মনোযোগের ওই প্রতিসরণের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পের ভরকেন্দ্রও বদলে বদলে যাচ্ছিল।
ধরা যাক, সৌন্দর্যের প্রশ্নটি। সৌন্দর্য কি রূপের বহিরঙ্গের ব্যাপার – পরিমাপ, অনুপাত ও সামঞ্জস্যের গাণিতিক ঐক্য? নাকি বস্তুর মধ্যেই নিহিত মাধুর্যের ‘আত্মা’ যা অধরা, ‘সিক্ত যূথির গন্ধে’র মতো বেদনাসঞ্চারী, যা ‘পূর্ণিমার দেহহীন চামেলীর লাবণ্য বিলাসে’র মতো ভাষার অনধিগম্য। এখানে দুটি ধারণা পাই : একটি শিল্পকে বস্তু হিসেবে দেখছে, অন্যটি অভিজ্ঞতা হিসেবে। একটি অবজেকটিভ, বিষয়গত; অন্যটি সাবজেকটিভ, বিষয়ীগত। একটি আমাদের ফর্মালিজমের দিকে নিয়ে যায়, অন্যটি শিল্পের কন্টেন্ট বা আধেয়সংক্রান্ত দার্শনিক-প্রস্তাবনার দিকে। হেগেল যেমন বলেছিলেন, ‘Beauty is the pure appearance of the idea to the sense.’ অর্থাৎ সংবেদনের স্পর্শকাতর ঝিল্লির ওপর বিশুদ্ধ আইডিয়ার প্রক্ষেপণ। কিছু বোঝা গেল? একটি অধরা বিষয় সম্পর্কে ততোধিক বিমূর্ত একটি সাধারণীকরণ, যা একটি ছবির সৌন্দর্য বুঝতে আমাদের তেমন সাহায্য করে না। সৌন্দর্যের প্রকাশ বিভিন্ন শিল্পে বিভিন্ন রকম। তাদের মধ্যে একটি সাধারণ সূত্রের অন্বেষণ করতে গিয়ে বিভিন্ন উপাদান ও গুণের নির্বাচন ও অপনয়ন করতে করতে ভারসাম্য, ঐক্য প্রভৃতি নির্বস্তুক, ‘টটোলজি’তে বা সমার্থ শব্দের অনুবর্তনে উপনীত হন। এই দুই আপাত বিপরীত প্রস্থান-বিন্দুর কোনোটিই তাৎপর্যহীন নয়, ফেলে দেওয়ার মতোও নয়। বস্তুত একটি শিল্পবস্তুতে এই দুটি জিনিসই এসে মিলিত হয়। নান্দনিক রহস্যের অনুধ্যানে গ্রিক আমল থেকে বহু শিল্পীই ‘গোল্ডেন সেকশনে’র গাণিতিক অনুপাতের দ্বারা সম্মোহিত থেকেছেন। পিয়েরো দেলা ফ্রাঞ্চেসকার ছবিতেও যেমন জ্যামিতিক বিন্যাসের প্রাধান্য। অন্যদিকে ইম্প্রেশনিস্ট চিত্রকলায় সৌন্দর্যাভিজ্ঞার যে-নির্মাণ তার সঙ্গে গ্রিক বা রেনেসাঁ-সৌন্দর্য-চিত্রণের কোনো মিল নেই। তবে বোদলেয়ার বলেছিলেন যে, সৌন্দর্যকে যদি পণ্ডিতদের আইনকানুন মানতে হতো তবে সৌন্দর্য অন্তর্ধান করত। সৌন্দর্যের বোধ কোথা থেকে আসে? কান্ট বলবেন, মানুষের মধ্যেই আছে এই বোধ, এই অপ্রতর্ক্যসজ্ঞা বা a-priori হিসেবে। অন্য সকলেই বলেছেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নিত্য অভিজ্ঞতা থেকেই এটি আসে। কিন্তু প্রকৃতিতে সৌন্দর্য কোথা থেকে আসে? দার্শনিকদের সিদ্ধান্ত যে, সৌন্দর্য প্রকৃতিতে নিহিত শৃঙ্খলা ও পারম্পর্য, অনুপাত ও নিয়মেরই প্রকাশ। অর্থাৎ প্রকৃতির সৌন্দর্যের ভেতর প্রকৃতিতে নিহিত সত্যেরও একটা সংকেত। কীটসের ভাষায় এই ধারণা বা বিশ্বাসটি অমর হয়ে আছে। অতএব, চিত্রকলায় বা অন্য কোনো শিল্পে প্রকৃতির সৌন্দর্যের অনুকৃতি রচনা করা সৌন্দর্য-নির্মাণেরই অভ্রান্ত পদ্ধতি নয় শুধু, তা সত্যে আরোহণেরও পদ্ধতি – এমনকি দায়িত্বও। বাস্তবতার অনুকৃতি যেমন আধুনিক শিল্পী-সাহিত্যিকদের সত্যে আরোহণের পদ্ধতি ও দায়িত্ব বলে আমরা অনেকে মনে করি। শিল্পী মাত্রই অনুকরণের দ্বারাই শিল্প রচনা করে থাকেন – এই প্রত্যয়টিকে সূত্রাকারে নিবদ্ধ করে অ্যারিস্টটল এটিকে আপ্তসত্যের মর্যাদা দিয়েছেন এবং আপ্তসত্যের ক্ষেত্রে যেমনটি হয়ে থাকে এক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। পরবর্তী দুই হাজার বছরের মধ্যে কখনোই আমরা এই আপাত-সত্যটিকে গভীরভাবে লক্ষ্য করে দেখিনি। ভেবে দেখুন, শিল্প বা সাহিত্য অনুকরণনির্ভর বটে, কিন্তু অনুকরণ কখনোই পূর্ণ অনুকরণ হতে পারে না। অনুকরণ সবসময়েই নির্বাচিত জিনিসের অনুকরণ। নির্বাচনটি শিল্পী নিজেই করেন কখনো সচেতনভাবে, কখনো অচেতনভাবে। নির্বাচন মানেই কিছুটা নেওয়া, কিছুটা বাদ দেওয়া। ফলত, অনুকরণে একটা বিকৃতি ঢুকেই যায়। ছবির ফ্রেম যেমন। প্রকৃতিতে কোনো ‘ফ্রেম’ নেই। ওই ফ্রেমটি আরোপিত। অর্থাৎ প্রকৃতির ছবি আর প্রকৃতি এক নয়। দেলাক্রোয়া যেমন বলেছিলেন যে, এমনকি প্রকৃতির সান্নিধ্যে বসেও আমাদের কল্পনাই ছবিটি আঁকে। অ্যারিস্টটল নিজেই অনুকৃত ঘটনার সূচনা, মধ্য ও অন্তের কথা বলেছিলেন, যা প্রকৃতিতে নেই। নির্বাচন কেন করা হয়? অর্থারোপ করার জন্য। কেননা একজন চিত্রশিল্পীতো কেবল ছবিই আঁকেন না, তিনি একজন চিন্তকও বটে। তাঁর কল্পনার পেছনে থাকে দর্শন, বিশ্বাস, অভিজ্ঞতা, বাসনা, আবেগ সবকিছু।
ছবিতে বিকৃতি চিরকালই ছিল। সচেতনভাবেই শিল্পীরা ছবিতে বিকৃতি নিয়ে এসেছেন, এবং তা কুশলতার অভাবের জন্য নয়। দার্শনিক কারণে, ধর্মীয় আদর্শের কারণে, রাজনৈতিক প্রয়োজনের কারণে। হাইরোনিমাস বশের ছবি যেমন, অথবা বাইজান্টাইন ছবি। বড় বেশি ‘যথাযথ’ প্রকৃতি-চিত্র সম্পর্কেই বরং কার্লাইল বা ইমারসন উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়েছিলেন। প্রকৃতির অনুপুঙ্খ চিত্রণ করতে গিয়ে ভগবানের যে দিব্য বিভা, যে অনির্বচনীয় আলো, তা হারিয়ে যাবে নাতো? জেরার্ড ম্যানলি হপকিন্সের কবিতায় যে ঝলসিত সৌন্দর্যের কথা আছে, সেই যে লিখেছিলেন :
‘Skies of couple-colour as a brindled cow..
Fresh-firecoal chestnust-falls..
All things counter, original, spare, strange।’
ইমারসনই বরং তরুণ শিল্পীদের বলেছিলেন যে, ‘অনুকৃতিতে যেও না। অনুকরণ, অনুকরণ বলেই কখনো গৌরবে মূলকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে না। অনুকরণ সবসময়েই দ্বিতীয় শ্রেণির শিল্পের জন্ম দেবে। শিল্প অনুকরণ নয়, শিল্প হচ্ছে প্রকাশ। তোমার মনোজগতে যে প্রকৃতি বিম্বিত তাকে প্রকাশ করো।’ ভ্যানগগ তা-ই করেছিলেন।
ইমারসনের এই উৎকণ্ঠা কেন? অষ্টাদশ শতকে নিউটনের আবিষ্কার বস্তুবিশ্বে গণিত ও নিয়মের যে বিশাল ছকের প্রস্তাবনা করল তার ফলে প্রকৃতির রহস্য অবসিত হয়ে আসছিল। এর ফলে প্রকৃতিসংক্রান্ত সব অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর পাওয়া হয়ে গেল তা নয়। তবে প্রকৃতি নামক কঠিন সমীকরণের সমাধান যে মানুষের নাগালের মধ্যেই এমন একটা বিশ্বাসের জন্ম হলো। ঊনবিংশ শতক নাগাদ প্রযুক্তি-সঞ্জাত শিল্পসভ্যতা প্রকৃতির ওপর তার থাবা বাড়িয়েছিল আগ্রাসনের। প্রকৃতি হলো বিজ্ঞানের বিজিত প্রদেশ, অনেকটা বিজিত কলোনির মতো।
রোমান্টিক কবি-সাহিত্যিকরা যুক্তি ও প্রযুক্তির আগ্রাসীরূপ দেখে শঙ্কিত বোধ করছিলেন। এর মধ্যে মানুষের অন্ধতা ও অহংকারও দেখতে পাচ্ছিলেন এবং অন্তিমে এই প্রকৃতির প্রত্যাখ্যান যে ভালো হতে পারে না, এ-রকম একটি বোধ তাঁদের মধ্যে কাজ করেছিল। তাঁরা ব্যাকুলভাবে প্রকৃতিতে ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু বিজ্ঞানের প্যারাডাইম মনের ঐন্দ্রজালিক ক্ষমতায় বিশ্বাসকেও টলিয়ে দিয়েছিল। কীটস্ যেমন বলেছিলেন : ‘Fancy cannot cheat so well as she is famed to do.’ কোলরিজেও হতাশার ছোঁয়া লেগেছিল : ‘Lady we receive but what we give’। প্রকৃতিতে রোমান্টিকরা যে দার্শনিক আশ্রয় খুঁজছিলেন সেই আশ্রয় আর সেখানে ছিল না। ইমারসন যথার্থ কারণেই উৎকণ্ঠিত ছিলেন। কান্টের ‘সাবলাইম’ প্রকৃতিতে সাবলাইমের পুনর্বাসন ঘটাতে পারল না। প্রকৃতি-চিত্রণ কি তবে পর্যবসিত হবে রং ও রেখার ইন্দ্রিয়বেদ্য সংবেদনে? কিছুদিন আগে ঢাকায় বিভিন্ন শিল্পীর আঁকা সুন্দরবন এবং রাঙামাটিভিত্তিক ছবির দুটি প্রদর্শনী হয়েছিল। তাদের কথা মনে করুন।
না, ঠিক তা-ই ঘটল না। ইমারসনের উপদেশেই তার ইঙ্গিতও আছে। বস্তুত শিল্পীরা যখন প্রকৃতি-চিত্রণ করেন তারা ঠিক প্রতিবিম্ব রচনা করেন না, বরং তারা প্রকৃতিকে চিত্রে আত্মস্থ করার চেষ্টা করেন। চিত্র যেন নিজেতেই প্রত্যাবর্তন করে। নিসর্গের প্রতিচিত্রণ নয়, চিত্রকর নিসর্গের প্রতি তার প্রতিক্রিয়াই ব্যক্ত করেন। নিসর্গের বহিরঙ্গ শিল্পীর অন্তরঙ্গ অভিজ্ঞতায় রূপান্তরিত হয়। তার পুরোটাই ইন্দ্রিয়বেদ্য নয়, তা ইন্দ্রিয়বেদ্যতার অধিক। আবার এটি বিশুদ্ধ বিমূর্ত আইডিয়ার আরোপণও নয়। এটি শিল্পীর নিজস্ব প্রকাশ-ভঙ্গিমা, কিন্তু কনসেপচুয়ালাইজেশন নয়। শিল্পীরা তাঁদের চিত্রের মাধ্যমে যেন প্রকৃতির সীমা ছাড়িয়ে যান। এ যেন এক ধরনের মুক্তি বস্তুর সীমাবদ্ধতা থেকে, যখন স্বয়মপ্রকাশ শিল্পী গেয়ে ওঠেন : আমার মুক্তি আলোয় আলোয় ..। পিসারোর ছবির কথা মনে করুন।
এটি কি তবে পলায়নপরতা? মোটেও তা নয়। শিল্পীরা চিরকালই বস্তুর সীমা অতিক্রম করতে চেয়েছেন, অন্যথায় শিল্পের যাথার্থ্য কোথায়? শিল্প তো প্রকৃতির ‘টটোলজি’ নয়। শিল্পী যেন প্রকৃতির ঘাটতি পূরণে নেমেছেন, তাঁরই চেতনার রঙে পৃথিবী সুন্দর হয়ে উঠেছে। প্রুস্ত বলেছিলেন: ‘রেনোয়ার পরে আমরা বস্তু পৃথিবীকে অন্য চোখে দেখছি।’
বাস্তবতা কি তবে বর্জিত হবে? বাস্তবতা হচ্ছে সেই ভূমিতল যেখান থেকে শিল্পের কুসুম উদ্গত হয়ে থাকে, হয়ত-বা কখনো তা ‘ক্লেদজ কুসুম’। উপমাটি বদলে বলা যায়, বাস্তব থেকে যে আলো প্রতিফলিত হয়ে আসে, শিল্পীর নান্দনিক আতশি কাচে তা প্রতিসরিত হয়ে যায়। কিন্তু ওই প্রতিসরিত নান্দনিক বিন্যাসকে পূর্ণভাবে বোঝা যাবে না যদি-না প্রতিসরিত বস্তুটিও বীক্ষণের আলোকিত বৃত্তের মধ্যে থাকে। কল্পনার বস্তুটিকে বাদ দিলে যেমন কল্পিত নির্মাণটিও পুরোপুরি বোঝা যায় না। আর্ট যদি বস্তুকে অতিক্রম করতে চায় সে-তো আঙ্গিকের মাধ্যমেই, যে-আঙ্গিক আবার বস্তুরই পরিশ্রুত নির্যাস। তবু আর্ট বস্তুর থেকে আলাদা। এটি আমরা প্রায়ই বিস্মৃত হই। এই যে আলাদা হয়ে-ওঠা এর কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম বা ছক নেই। মানুষের আত্মপ্রকাশের যেমন কোনো ছক নেই। পণ্ডিতরা অবশ্য চিরকালই বর্গীকরণের মাধ্যমে ছক বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা করে আসছেন। পাশ্চাত্যের পণ্ডিতরা যেমন আফ্রিকান বা ভারতীয় আর্টকে স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠিত হয়েছেন। ইম্প্রেশনিস্টরা প্যারিস সালঁর ১৮৬৩-র প্রদর্শনীতে জায়গা পাননি। আর্ট সবসময়েই ছক ভেঙে ভেঙে চলে। তাই, যা একসময় আর্ট বলে বিবেচিত হয়নি, পরবর্তীকালে তা আর্ট বলে স্বীকৃতিই শুধু নয়, শিরোপাও পেয়েছে। আবার যে আর্টের প্রাতিষ্ঠানিক দাপটে নতুন শিল্পীরা জায়গা পাননি, সমালোচকরাও নমিত হয়েছেন, তারা আজ অপসৃত হয়েছেন। অন্যদিকে নির্জ্ঞানের আবিষ্কারের পরে যাঁরা প্রচলিত আর্টের প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করে আর্ট নামক প্রতিষ্ঠানটির প্রতিই অবজ্ঞা ও অশ্রদ্ধা প্রকাশ করেছিলেন এবং ঘোষণা দিয়ে তথাকথিত সৌন্দর্য, অনুপাত, ঐক্য, সুষমা অস্বীকার করে নন-আর্ট রচনা করেছিলেন, সেই স্যুররিয়ালিস্ট চিত্রকলা এখন হাই-আর্টের মর্যাদা পাচ্ছে। এটিই আর্টের রহস্য, যা আছে এবং নেই একই সময়ে। সম্মোহক রহস্যে মোড়া ওই সৌন্দর্য ও আর্ট সম্পর্কে একটি যুক্তিনিষ্ঠ ধারাবাহিক বিশ্লেষণ করেছেন হাসনাত আবদুল হাই তাঁর সবার জন্য নন্দনতত্ত্ব নামক গ্রন্থটিতে।
আমার উপরোক্ত মন্তব্যগুলো আসলে আর্ট সম্পর্কে যে প্রশ্নগুলো আমাকে ভাবায় তারই অপরিচ্ছন্ন প্রকাশ। ওই প্রস্তাবনায় প্রশ্নগুলো গুরুত্বপূর্ণ, উত্তরগুলো নয়। কাজেই যখন হাসনাত আবদুল হাইয়ের মূল্যবান গ্রন্থটি হাতে পাই তখন খুব উত্তেজিত বোধ করি। গ্রন্থটি আমার প্রশ্নগুলোর ওপর আলোকপাত করে এবং শুধু তা-ই নয় আরো অন্যান্য প্রশ্নের যা আলোচনা-পরম্পরায় চলে আসে, তার ওপরও আলোকপাত করে। যথা-আর্টের জ্ঞানাত্মক ভূমিকা, নান্দনিক বিচার ও রুচি, শিল্পীর প্রতিভা ও দর্শকের প্রতিভা, শিল্প ও কম্যুনিকেশন প্রভৃতি। তবে গ্রন্থটি প্রশ্নোত্তর ঢঙে লেখা নয় মোটেও।
হাসনাত আবদুল হাই নন্দন-তত্ত্বের ইতিহাস রচনা করেছেন। নন্দনতত্ত্ব বা সৌন্দর্যসংক্রান্ত ধারণা গত আড়াই হাজার বছর ধরে কীভাবে বিকশিত হয়ে একটি স্বতন্ত্র জ্ঞানমার্গের রূপ পেয়েছে তা অতিশয় যত্নের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন কালে, বিভিন্ন সভ্যতায় সৌন্দর্য ও তার সংজ্ঞা, উপাদান, অভিজ্ঞতা, তাৎপর্য, সৌন্দর্য ও নৈতিকতা, প্রকাশের বিচিত্রতা প্রভৃতি বিষয় নিয়ে কী ভাবা হয়েছে তার একটি সামগ্রিক ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ফলে এখানে প্লেটো এবং পিথাগোরাস, আনন্দবর্ধন এবং বমগার্টেন, কান্ট এবং কুমারস্বামী, দেকার্তে এবং দেরিদা, রাস্কিন এবং রবীন্দ্রনাথ, টলস্টয় এবং টোডোরভ, হেগেল এবং হেবারমাস গা ঘেঁষাষেষি করে আছেন। বিভিন্ন শিল্পান্দোলন যথা- রোমান্টিনিজম, রিয়ালিজম,এক্সপ্রেশিভিজম, ডাডাইজম, কিউবিজম, মডার্নিজম, পোস্ট-মডার্নিজম প্রভৃতি সম্পর্কে
বেশ বিশ্লেষণাত্মক আলোচনা আছে। যদিও বিস্ময়করভাবে এক্সপ্রেশনিজম সম্পর্কে কোনো আলোচনা নেই। এই বিস্মরণের কারণ কী? তবে এইসব বিমূর্ত আলোচনাকে কিছুটা স্পর্শযোগ্য ও দৃষ্টিগ্রাহ্য করার জন্য কিছু ছবি থাকা খুব প্রয়োজনীয় ছিল।
গ্রন্থটি সম্পর্কে অন্য কিছু অতৃপ্তিও আছে। সবই গ্রন্থটি কেন ‘আরো ভালো হলো না’-সংক্রান্ত। তবে চারশ পৃষ্ঠার ক্ষুদ্র কলেবরে ছশো কনসেপ্ট সম্পর্কে আলোচনা করতে হলে যে-কোনো কনসেপ্ট নিয়েই অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা যায় যে, আলোচনা সম্পূর্ণ হয়নি। আরো বিশেষ করে, যখন এই কনসেপ্টগুলো এক একটি দার্শনিক প্রস্থানবিন্দু সূচিত করে, যার ওপর বিশাল বিশাল গ্রন্থ রচিত হয়েছে। গত ষাট-সত্তর বছরে বাংলা ভাষায় দর্শন নিয়ে আলোচনা খুব কমই হয়েছে। আধুনিক দর্শন নিয়ে আলোচনা তো প্রায় হয়ইনি। এই গ্রন্থের একটি মূল্যবান অংশ ‘ফেনমেনলজি’ এবং ‘হারমেনিউ-টিক্স্’ নিয়ে আলোচনা। বাংলা ভাষায় এই দুটি দর্শন নিয়ে আলোচনা, তা সে যতই সংক্ষিপ্ত ও আংশিক হোক না কেন, সম্ভবত এই প্রথম। তবে পূর্বাপর ইউরোপীয় দর্শনের সঙ্গে অন্বিত করে আলোচনা না করলে কোথায় এদের অভিনবত্ব ও আজকের জন্য প্রাসঙ্গিকতা তা বোঝা যায় না। ফেনমেনলজি এবং হারমেনিউটিক্স্ শব্দদুটি শুরুতেই ব্যাখ্যা করে নিলে তাদের নান্দনিক সিদ্ধান্তগুলোর যৌক্তিকতা আরো স্পষ্ট হতো।
অস্পষ্টতার অন্য একটি কারণ অবশ্য ভাষা। এই অতি আধুনিক ধারণাগুলো একটি আরেকটি থেকে আলাদা করার মতো প্রমিত সর্বজনগ্রাহ্য ভাষা এখনো তৈরি হয়নি। আরো বেশি গ্রন্থ রচিত হলে একটি প্রমিত এবং প্রাঞ্জল ভাষা দাঁড়াবে। ততোদিন পথিকৃত আলোচকদের আরো যত্নবান ও সাবধান হতে হবে। এ-গ্রন্থে লেখকের ভাষা যতটা ভারি ততটা প্রাঞ্জল নয়। কখনো ধারণাগত কারণে, কখনো-বা বাক্যগঠনের কারণে বক্তব্যটি অস্পষ্ট হয়ে গেছে। যথা-‘প্রপঞ্চবাদে ভাষাকে অর্থের প্রকাশ বলে মনে করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি ভাষার প্রতি খুব গুরুত্ব দেয় না। .. ঘটনা সর্বজনীন হলে ভাষা-ব্যতিরেকেই সে-ঘটনা অর্থময়তা পায়। .. অর্থময়তা ভাষার আগের অভিজ্ঞতা। পরবর্তীতে ভাষা সেই অর্থময়তার নামকরণ করে।’ (১৯৬ পৃ.) অথবা এই বাক্যটি : ‘আদর্শ শিক্ষিত ব্যক্তি, যে জাগতিক বিষয় থেকে দূরে থাকার যোগ্যতা রাখে, তার সম্বন্ধে যে ধারণা, সেই আদর্শেই এই তাৎক্ষণিক বাছ-বিচারের উৎস আছে বলে মনে করেন তিনি (বালথাজার গ্রেসিয়ান)।’ (২২৬ পৃ.) অথবা এই বাক্যটি : ‘আধুনিকতাবাদের (মডার্নিজম) বিশেষণ মডার্ন নয়, মডার্নিস্ট (আধুনিকতাবাদী)। গ্রীনবার্গ যাকে কিসচ বা জগাখিচুড়ি বলেছেন, তা আধুনিক (মডার্ন) হতে পারে, কিন্তু যেহেতু এটি স্ব-সমালোচনাপ্রসূত বিষয় নয় এবং সেই কারণে মৌলিকও নয়, সেই জন্য একে আধুনিকতাবাদী (মডার্নিস্ট) বলা যায় না’ (৩৩৪ পৃ.)। ছয়টি ধারণা ব্যবহার করা হয়েছে এই বাক্যে, যা উদাহরণ দিয়ে না বোঝালে বোঝা যাবে না। সম্ভবত বাক্যবন্ধটি ইংরেজিতে লেখকের মাথায় এসেছে, যার অনুবাদ এটি। অবশ্য লেখক যে এই ভাষায় গোটা বইটি লিখেছেন, তা নয় মোটেও। গ্রন্থের শেষ অধ্যায় ‘নান্দনিক অভিজ্ঞতা’ যেখানে তিনি নিজের মতামত ব্যক্ত করেছেন, সেখানে ভাষাও খুবই প্রাঞ্জল হয়ে উঠেছে।
গ্রন্থটি শেষ বিচারে একটি দর্শনের গ্রন্থ, যদিও কাঠামোটি ইতিহাসের। অনুভূতি ও ইন্দ্রিয়জ অভিজ্ঞতা থেকে ধারণায় ও চিন্তায় উন্নীত হওয়া, কল্পনা ও সৃষ্টি প্রক্রিয়ার সংযোজন, বিয়োজন ও ভাষাসংক্রান্ত সমস্ত দার্শনিক তত্ত্বের একটি পর্যালোচনা করা হয়েছে এখানে। অ্যানালিটিক ও কন্টিনেন্টাল – এই দুই বিরোধী দর্শন-প্রস্থানকে অনুসরণ করে নান্দনিক ভাবনার বর্গীকরণ করা হয়েছে। ইতিহাসের স্বীকৃতি-অস্বীকৃতি নিয়ে আলোচনাও এসেছে – লেখকের ইচ্ছানুক্রমেই এসেছে। ‘একটি বইয়ের ভেতর যদি দার্শনিক, ঐতিহাসিক এবং ধারণাগত সব বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা যায় তাহলে সাধারণ পাঠকের সুবিধা হবে’ – এমনই ছিল লেখকের অভিপ্রায়। এই দুঃসাধ্য কাজটি তিনি অসাধারণ যোগ্যতার সঙ্গেই সমাপন করেছেন। তবে অধুনাতন অনেক তাত্ত্বিক হয়ত শিল্পের ইতিহাসের ধারণাটি সম্পর্কেই প্রশ্ন তুলবেন যে, শিল্পে নিরন্তর পরিবর্তন আছে বিবর্তন নেই এবং ভোক্তা হিসেবেও সবকালের শিল্পই আমাদের কাছে ‘সিনক্রনিক’। আমরা আমাদের মাথায় একটি কাল্পনিক মিউজিয়াম বহন করছি যাকে আন্দ্রে মালরো বলেছিলেন গঁংর্বব ওসধমরহধরৎব। অন্যথায় আধুনিক পাশ্চাত্য শিল্পীরাই বা আফ্রিকান ট্রাইবাল ভাস্কর্য দ্বারা প্রভাবিত হন কীভাবে অথবা জাপানি সিল্ক-প্রিন্টিংয়ের দ্বারা ইম্প্রেশ-নিস্টরা? আমরা ভোক্তারাও যেমন একই মুহূর্তে মুঘল চিত্রকলা এবং বাংলার পট, অমৃতা শেরগিল এবং মাতিস, কানডিন্স্কি এবং কামরুল দ্বারা অভিভূত হচ্ছি। কোনো থিওরি এসে সংবেদনের পথ রোধ করে দাঁড়াচ্ছে না।
শেষ কথা, গ্রন্থটি আর্টের ছাত্রদের অসাধারণ কাজে লাগবে, হয়ত-বা তাদের কথাও মনে
ছিল লেখকের; তবে গ্রন্থটি
পাঠ করে প্রবীণ ভোক্তারাও উপকৃত হবেন। তাঁদের নিজেদের আর্টসংক্রান্ত ধারণার সঙ্গে এবং আর্ট-অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারবেন, অনেক অব্যক্ত প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন এবং পাবেন নতুন ভাবনার খোরাক। দীর্ঘকালের একটি অভাব পূরণ করলেন হাসনাত আবদুল হাই। তাঁকে সাধুবাদ জানাই।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.