সাক্ষাৎকার গ্রহণ : হামিদ কায়সার
তিরিশের কবিরা স্বতন্ত্র বিষয়, ভাষা, ভঙ্গি নিয়ে তখন প্রস্ফুটিত, কিন্তু তখনো রবীন্দ্র-আলোর সরোবরে øান করছে বাংলা কবিতা, অন্য আরো অনেকের মতো আবুল হোসেনও ডুবে আছেন রবীন্দ্র-মুগ্ধতায়। কিন্তু মননের কবি বলেই কি-না, তিনি হঠাৎ তিরিশের কবিতার আধুনিকতার স্পর্শে রাতারাতি অনুধাবন করলেন, কবিতার জন্য প্রয়োজন নতুন জমিন। প্রয়োজন নিজস্ব একটা বলার ভঙ্গি। তারই প্রতিফলন ঘটল ১৯৪০ সালে মাত্র আঠারো বছর বয়সে প্রকাশিত প্রথম কবিতার বই নববসন্তে।
তারপর দীর্ঘ এক বিরতি। ২৯ বছর পর প্রকাশিত হলো তাঁর দ্বিতীয় কবিতার বই বিরস সংলাপ। কবিতায় যেমন তিনি স্বল্পভাষী, বিনম্র, তাঁর সমগ্র জীবনের কাব্যচর্চার পথটিও তেমনি নিঃশব্দ, নির্ভেজাল, শান্ত নদীর বয়ে চলার মতো øিগ্ধ। স্বভাবতই তাঁর কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা পরিমিত। এরপর দীর্ঘ বিরতিতেই বেরিয়েছে হাওয়া, তোমার কিদুঃসাহস, দুঃস্বপ্ন থেকে দুঃস্বপ্নে, এখনও সময় আছে, আর কিসের অপেক্ষা এবং প্রকাশিতব্য রাজকাহিনী ধরলে মোট ৮টি কবিতার বই। এছাড়াও রয়েছে অনূদিত কবিতার সংকলন অন্য ক্ষেতের ফসল, ইকবালের কবিতা, আমার জন্মভূমি – রসুল হামজাতফের মোই দাগেস্তান বইটির কবিতার তর্জমা, এবং ছোটদের জন্য কবিতার বই রাজ-রাজড়া, শাহানের বই।
কবি হিসেবে আবুল হোসেনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, তাঁর কবিতা আশ্চর্য রকমের সরল। বলবার ভঙ্গিটি এত চেনা যে, মনে হয় কবি পাঠকের সঙ্গে কথার বুনন নির্মাণ করে চলেছেন। অথচ ছন্দমিলের বৈচিত্র্যে প্রতিটি কবিতাই ঋদ্ধ। সেই সরল বর্ণনাতেও ছড়িয়ে থাকে বুদ্ধির দীপ্তি, ব্যঙ্গের সূক্ষ্ম আঁচড়, প্রতীক-চিত্রকল্পের স্বতঃস্ফূর্ত প্রয়োগ। আর কথা কম বলতে ভালোবাসেন তিনি, কত কম বলে বেশি বলা যায় তারই একটা প্রচেষ্টা দেখা যায় তাঁর কবিতায়।
আশির ঊর্ধ্বে এই মানুষটি এখনো সৃষ্টিশীল, ব্যস্ত রয়েছেন আÍজীবনীর দ্বিতীয় পর্ব লেখায়। ব্যস্ততা এবং বয়সের দুর্দৈব আমাদের কথা বলার বাধা হয়ে দাঁড়াল না। কিন্তু সীমাহীন একটা নৈরাশ্যবোধ সন্ধ্যার আঁধারে জড়িয়েছিল, আমাদেরই এক সাহসী কবি ড: হুমায়ুন আজাদ তখন সিএমএইচে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন।
হামিদ কায়সার : হুমায়ুন আজাদের মতো একজন প্রগতিশীল, সৎ এবং শক্তিমান কবির উপর এই যে একটা আঘাত এল, আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
আবুল হোসেন : খুবই দুঃখজনক। অসহনশীলতা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, এটা তার একটা অসহ্য উদাহরণ। মতামত খণ্ডন করতে হয় মতামত দিয়ে, বন্দুক তুলে বা তলোয়ার খুলে নয়।
হামিদ কায়সার : একজন কবি হিসেবে এ-পরিস্থিতিতে কী করণীয় বলে আপনার মনে হয়?
আবুল হোসেন : কবিরা তো আর রাজনৈতিক নেতাদের থামিয়ে রাখতে পারবেন না। তাঁদের শক্তি ও উন্মাদনা খর্ব অথবা রোধ করার ক্ষমতা কবিদের নেই। কবি তাই নিজের অনুভূতি নিজের মতো করেই বলে যাবেন। এভাবেই হয়ত তিনি মানুষের চেতনা ও বিবেককে জাগিয়ে তুলতে পারেন।
একজন কবি নিজের খুশিতে নিজে সারাক্ষণ মশগুল থাকতে পারে না, সে সবাইকে চায় – সমাজকে চায়, জগৎকে চায়। তবে তার কাজের পদ্ধতিটার সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক নেই। সে যখন লিখতে বসে, তখন সে একাকী। তার কাজ শেষ হলেই তা সামাজিক হতে শুরু করে।
হামিদ কায়সার : আপনার কবিতা লেখার বয়স কত হলো?
আবুল হোসেন : সাড়ে ছয় দশক।
হামিদ কায়সার : বেশ দীর্ঘ সময়। সে-তুলনায় আপনার কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা খুবই কম। দীর্ঘ বিরতির লগ্নে কি আপনার কবিতার বাঁক বদল হয়েছে? বদলে থাকলে সেটা কখন, কোন পর্যায়ে?
আবুল হোসেন : সংখ্যা দিয়ে কবিতার বিচার হয় না। মানই আসল কথা। আমি চিরকাল কথাটা মনে রেখেছি। বিরতি কোথায় দেখলে? বই বেরোয়নি নানা কারণে। লেখা তো কখনো বন্ধ হয়নি। এতকাল লিখছি, অবশ্যই এক জায়গায় বসে থাকিনি। নড়েচড়ে বসতে হয়েছে। কবিতা লেখার সম্পর্কে আমার ভাবনা এবং ধারণা কখনো স্থির হয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেনি। আমার কবিতা কখন, কতবার, কতটা বদলেছে সে-তো আমার বলার কথা নয়। কাজটা যে আমিই করছি। যাঁরা দেখছেন, পাঠক-সমালোচক, তাঁরাই বলুন। আমি যেটা বলতে পারি তা হলো, নিজের মনে কাজ করে গেছি, ফলের জন্য অপেক্ষা করিনি। যা দেখেছি, শুনেছি, জেনেছি, চিনেছি এবং যে আনন্দ-দুঃখ-বেদনা অনুভব করেছি, তার নীরব সাক্ষী আমার কবিতা।
হামিদ কায়সার : কবিতার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক তো সেই শৈশব থেকেই?
আবুল হোসেন : হ্যাঁ, আমি ছেলেবেলা থেকেই কবিতা লিখি। আমার প্রথম কবিতার বই নববসন্ত যখন বের হয় ১৯৪০ সালে, তখন আমার বয়স ছিল আঠারো। কবিতাগুলো লেখা হয়েছিল আরো আগে, দেড় বছর ধরে। সেই কৈশোরিক কবিতাগুলো দিয়েই এই বই।
হামিদ কায়সার : নববসন্তের কবিতাগুলো শুধু পরিণতই নয়। বাংলা কাব্য-সাহিত্যের অনেক সেরা কবিতা রয়েছে এ-গ্রন্থে। কবিতা লেখার ব্যাপারটি কীভাবে সেই কৈশোরেই পেয়ে বসেছিল আপনাকে?
আবুল হোসেন : তৃতীয় শ্রেণি থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে ওঠার সময়ে স্কুল থেকে অনেকগুলো বই উপহার পেয়েছিলাম। এর মধ্যে একটি বই ছিল রবীন্দ্রনাথের সোনার তরী। সে-বইটি প্রথমে পড়ার তেমন আগ্রহ হলো না। আগে পড়লাম জীবজন্তুর কাহিনী, যখের ধন নামে একটা গল্পের বই। এইরকম রংচংয়ে বাহারি বইগুলো যখন পড়া শেষ হলো, তারপর খুললাম সোনার তরী। এখনো মনে আছে, হলুদ মলাটের মধ্যে লালকালিতে বইয়ের নাম উপরে লেখা, নিচে লেখকের নাম ‘শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। ৩য় শ্রেণিতে তাঁর একটা কবিতা পড়েছিলাম, ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে সব গাছ ছাড়িয়ে মাথা তোলে আকাশে’ – খুব মনে ধরেছিল। কিন্তু সোনার তরী বইটি খুলে প্রথম কবিতাটির দুটি লাইন পড়তেই বুকের মধ্যে বিদ্যুৎ খেলে গেল, ‘গগনে গরজে মেঘ ঘন বরষা, কূলে একা বসে আছি নাহি ভরসা’। শব্দের এই ঝনঝনানি যেন আর কখনো শুনিনি। এক নিশ্বাসে কবিতাটি পড়ে দম নিই। কবিতাটির মানে যে কিছু বুঝেছিলাম, মনে হয় না। ওই বয়সে তা বোঝার কথাও নয়। কিন্তু শব্দ আর চিত্র যে কীভাবে শিশুমনকে আপ্লুত করে ফেলে! মনে হয়েছিল মানুষ কী করে এইরকম লিখতে পারে! আমি কি কখনো পারব? তখন থেকেই কবিতা লেখা শুরু। আর সেগুলো সবই রবীন্দ্রনাথের ধরনে। কিন্তু প্রথম যে-কবিতাটি ছাপা হয়েছিল, তা কিন্তু মোটেই রবীন্দ্রনাথের মতো নয়।
হামিদ কায়সার : কার মতো? ছাপাই বা হয়েছিল কোথায়?
আবুল হোসেন : মাইকেল মধুসূদনের মতো অমিত্রাক্ষর পয়ারে লিখেছিলাম। কবিতার নাম ছিল ‘আকবরের প্রতি রানাপ্রতাপ’। রানাপ্রতাপ আকবরকে খুব ভর্ৎসনা করছে, খুব দেশাÍবোধক কবিতা। পেট্রিয়টিক। আর ছাপা হয়েছিল স্কুল ম্যাগাজিনে।
হামিদ কায়সার : কোন স্কুল?
আবুল হোসেন : আমার স্কুলজীবন কাটে কৃষ্ণনগরে। কৃষ্ণনগরের কলেজিয়েট স্কুল। তারপর যখন নবম-দশম শ্রেণিতে পড়ি, প্রচুর কবিতা লিখেছি। লিখে লিখে খাতা ভর্তি করেছি।
হামিদ কায়সার : ছাপাতে দিচ্ছিলেন না?
আবুল হোসেন : ছাপাও হচ্ছিল স্থানীয় পত্রপত্রিকায়। কলকাতার পত্রিকাতেও। মুসলমানদের কয়েকটি দৈনিক, মাসিক পত্রিকা ছিল, সেগুলোতেও ছাপা হতো।
হামিদ কায়সার : মুসলমানদের সে-সব পত্রিকায় কি শুধু মুসলমান কবি-সাহিত্যিকরাই লিখতেন? পারিবারিক এবং সামাজিক পরিমণ্ডলে আপনার সাহিত্য-চর্চার পরিবেশটি তখন কেমন ছিল?
আবুল হোসেন : যে-সময়ের কথা বলছি, তখন আমরা কুষ্টিয়ায়। মুসলমানদের যে কাগজগুলোর কথা বলছি তার কয়েকটির নাম মনে পড়ছে – এস. ওয়াজেদ আলীর গুলিস্তাঁ, চৌধুরী শামসুর রহমানের হানাফী। এসব কাগজে হিন্দু-মুসলমান সকলের লেখাই ছাপা হতো, তবে প্রধানত মুসলমানরাই লিখতেন। লেখালেখি করি বলে মা-বাবা কখনো অসন্তুষ্ট হননি। বাইরের লোকেও মোটামুটি ভালো চোখে দেখত।
হামিদ কায়সার : স্কুলের সেইসব দিনে তাহলে শুধু কবিতাই লিখছিলেন?
আবুল হোসেন : না, না। প্রচুর গদ্যও লিখছিলাম। ছোটগল্প, প্রবন্ধ – তার মধ্যে খেলাধুলার বিষয়ও ছিল। কলকাতার বড় দুটো কাগজে সে-সময় দুটো গদ্যরচনাও বেরিয়ে গেল। একটি ছোটগল্প,হবীবুল্লাহ বাহার-শামসুন নাহার সম্পাদিত ত্রৈমাসিক বুলবুল-এ এবং ‘শিলং যাত্রী’ নামে একটি ভ্রমণকাহিনী মওলানা আকরম খাঁ-র মাসিক মোহাম্মদীতে।
হামিদ কায়সার : পরবর্তীকালে আপনি শুধু কবিতাতেই নিমগ্ন রইলেন? গদ্যচর্চা থেকে সরে গেলেন যে?
আবুল হোসেন : আমি আমার সব কথা কবিতার মধ্য দিয়েই বলতে চেয়েছিলাম। আর কবিতা লেখার মধ্যে যে-আনন্দ পেয়েছি, তা আর কোনো কাজে পাইনি। কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে নয়, কিছু হবার জন্যও নয়, নিজের খুশিটা ধরে রাখবার জন্যই কবিতা লেখা। আমি আমার এই ভালোলাগা-পথটা কখনো একেবারে হারাইনি, ছাড়িনি কবিতা লেখা। মনে হয়, এই ছিল আমার নিয়তি। বিধাতা আমার জন্য এই কাজটিই বেছে রেখেছিলেন।
হামিদ কায়সার : আমরা জেনেছি, প্রথম-জীবনে আপনি ছিলেন রবীন্দ্র-প্রভাবিত। কিন্তু নববসন্তের কবিতায় দেখা গেল স্ববৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল এক আধুনিক কবিকে। আধুনিকতার এই দীক্ষা কীভাবে পেলেন?
আবুল হোসেন : কলকাতার কলেজে পড়তে এসেই একদিন আমার চোখে পড়ে বুদ্ধদেব বসুর একটি কবিতার বই, বন্দীর বন্দনা। পড়ে চমকে উঠলাম, এর অনেকখানি ভিন্নতায়। তখন থেকে খুঁজে খুঁজে আধুনিক কবিতার বই পড়তে শুরু করি। ভালো লেগেছিল প্রেমেন্দ্র মিত্র, সমর সেন ও জীবনানন্দ দাশ। বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকাটি নিয়মিত পড়তাম। এইসব পড়তে পড়তে বুঝতে পারি, যাকে আধুনিক কবিতা বলা হচ্ছে সেটা আসলেই রবীন্দ্রনাথ থেকে দূরে সরে যাওয়া। রবীন্দ্রনাথের গীতিময়তা, কোমলতা, পেশিহীনতা, বাঁধাধরা ছন্দ ও মিল – তখন ঠিক মনে হয়নি, তবে তার নৈতিকতা, হার্দিকতা, বিধাতায় বিশ্বাস – এইসব এড়িয়ে যাওয়া – তাঁর ছন্দমিল বর্জন করতে গিয়ে গদ্য কবিতা লেখা। আমি কিন্তু তখনো ছন্দমিলের পক্ষে। আমার এই বিশ্বাস থেকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেও প্রায় বাহাসে অবতীর্ণ হতে যাচ্ছিলাম।
হামিদ কায়সার : চমকপ্রদ ব্যাপার মনে হচ্ছে। বিশদ করে বলবেন কি?
আবুল হোসেন : রবীন্দ্রনাথ এক পর্বে কিছুদিন গদ্যকবিতা লিখে তার ওকালতি করছিলেন। গদ্যকবিতার পক্ষে তাঁর যুক্তির বিরোধিতা করে আমি প্রেসিডেন্সি কলেজের ম্যাগাজিনে এবং মাসিক মোহাম্মদীতে দুটি প্রবন্ধ লিখলাম। আজো ভাবতে আশ্চর্য লাগে, মাসিক মোহাম্মদীতে এই অর্বাচীনের লেখা প্রবন্ধটি রবীন্দ্রনাথের চোখে পড়ে এবং তিনি এর প্রতিবাদ করেন একটি প্রবন্ধ লিখে।
হামিদ কায়সার : কত দিকে চোখ রবীন্দ্রনাথের! কোন কাগজে লিখেছিলেন তিনি প্রবন্ধটি?
আবুল হোসেন : প্রবাসীতে। ‘গদ্যকাব্য’ শীর্ষক তাঁর প্রবন্ধের শুরু, ‘আজকেই মোহাম্মদী পত্রিকায় দেখছিলুম কে একজন লিখেছেন যে, রবিঠাকুরের গদ্যকবিতার রস তিনি তাঁর সাদা গদ্যেই পেয়েছেন। দৃষ্টান্তস্বরূপ লেখক বলেছেন যে, ‘শেষের কবিতা’য় মূলত কাব্যরসে অভিষিক্ত জিনিস এসে গেছে। তা-ই যদি হয়, তবে কি জেনানা থেকে বার হবার জন্যে কাব্যের জাত গেল।’
হামিদ কায়সার : তারপর?
আবুল হোসেন : চুপসে গেলাম। উনি প্রতিবাদ করেছেন। রবীন্দ্রনাথের সাথে কি বাহাসে যাওয়া যায়? তখনো তাঁর সঙ্গে দেখা হয়নি। রবীন্দ্রনাথের এইরকম একটা ধারণা ছিল যে, ছন্দমিলের কবিতায় সব বিষয় আনা যায় না। ছন্দমিলে যা বলা যায় না, সেগুলোই গদ্য কবিতার বিষয়। আধুনিকেরা তা মানেন না। রবীন্দ্রনাথ সুধীন্দ্রনাথকে বললেন, ‘লেখো তো দেখি, মোরগ নিয়ে একটা কবিতা। সুধীন্দ্রনাথ দত্ত সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে ‘কুক্কুট’ নামে এমনই এক অসাধারণ কবিতা লিখে পাঠিয়ে দিলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে, কবিগুরু চুপ! তো তখন এরকমই হচ্ছিল – বাংলা কবিতার সেই পালা-বদলের সময়ে।
হামিদ কায়সার : আমরা বলছিলাম, আপনি কীভাবে আধুনিকতাকে আÍস্থ করলেন?
আবুল হোসেন : গদ্যকবিতার প্রতি আমার অনুরাগ জন্মাল সমর সেনের গদ্যকবিতা পড়ে। সমর সেনই গদ্যকবিতাকে তার আসল রূপ দিলেন। আমি তাঁর কাছেই পেলাম ভিন্ন ধরনের কবিতা লেখার চাবিকাঠি – কবিতার ভাষাকে গদ্যের কাছাকাছি নিয়ে আসতে হবে। কী করে সেটা করা যায়? আমার মনে হয়েছিল, আমি যদি মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তার ভাষায় কবিতা লিখতে পারি, তাহলে কবিতার ছন্দসুর বদলে দেওয়া সম্ভব। এবং তা রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে অবশ্যই ভিন্ন হবে। সমর সেন তো সেটা আগেই দেখিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি সাম্যবাদী হয়েও রোমান্টিকতা বর্জন করতে পারেননি। আমি কবিতা থেকে ভাবালুতা একেবারেই বাদ দিতে চেষ্টা করি। আরো একটি ব্যাপার করেছিলাম গদ্য কবিতায় মিল দিয়ে, যাকে কেউ কেউ বলেছেন সমিল গদ্য কবিতা। এই প্রচেষ্টার প্রথম ফসল নববসন্তের ‘বাংলার মেয়ে’। প্রথমে বেরিয়েছিল বুদ্ধদেব বসুর কবিতা পত্রিকায় ১৯৩৮ কী ’৩৯ সালে। আবদুল কাদির যে-কবিতাটি সম্পর্কে বলেছিলেন, তাঁর নিজের ধারণা ‘বাংলার মেয়ে’র মতো মাত্র একটি কবিতা লিখে যদি কেউ লোকান্তরিত হন, তবু তিনি সাহিত্যে অমরতার দাবি রাখেন। একটু পড়ে শোনাচ্ছি দেখো ‘মিল’টা কীভাবে এসেছে-
সব প্রথমেই দিয়ে রাখি পরিচয়।
তার মানে এই নয়, এটাই সুবিধা, এতে সংশয় নেই ;
বরং ব্যাপার উল্টো একেবারেই অর্থাৎ কিনা নামটা না দিলেই ছিল ভালো।
কারণটা নয় মোটেই ঘোরালো।
বাঙালির মেয়ে দোয়াত কলম আর কালি হাতে পেয়ে প্রকাশ্যে
কোন পত্রিকাতে আপন জবানবন্দী ছাপাতে শুরু করে দেবে…
এরপর আমি সারাজীবন কবিতার ভাষা, ছন্দ ও মিল নিয়ে অবিরাম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। কিন্তু আমার একটা দুঃখ কী জানো?
হামিদ কায়সার : জ্বী, বলুন।
আবুল হোসেন : আধুনিক কবিতায় আমরা যে-ছন্দমিল বর্জন করবার জন্য গদ্যের কাছে গিয়েছিলাম, সেটা রবীন্দ্রনাথের পর খুবই প্রয়োজন ছিল। কেননা গদ্য ব্যবহার করে আমরা কবিতায় ঋজুতা আনতে পেরেছিলাম। জীবনের যে অসুন্দর অন্ধকার দিকটা রবীন্দ্রনাথ সারাজীবন এড়িয়ে গেছেন, আধুনিক কবিতায় আমরা সেই পথে অনেক দূর অগ্রসর হতে পেরেছি। কিন্তু এইসব করতে গিয়ে এমন বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি যে আজ ষাট-সত্তর বছর পরে আমরা যে গদ্যকবিতা লিখছি, তা অনেক সময়ে খবরের কাগজের রিপোর্টারের গদ্যের চেয়ে ভালো নয়, কবিতার কথা তো ছেড়েই দিলাম। আজকালকার পাঠক যে ক্রমেই কবিতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তার একটা কারণ এই ছন্দ আর সুরহীনতা। ছন্দ নেই, সুর নেই, মিলের অভাব।
হামিদ কায়সার : কখন থেকে লক্ষ করছেন বাংলা কবিতার এই দৈন্য?
আবুল হোসেন : বিশ-পঁচিশ বছর হবে। কবিতার পাঠক ক্রমেই কবিতা থেকে সরে যাচ্ছে। সেজন্যে আমি কবিতায় অতি সাধারণ দৈনন্দিন কথোপকথনের ভাষা ব্যবহার করেও, কবিতা থেকে রোমান্টিকতা বর্জন করেও, ছন্দমিলের ভিন্নরকম কাজ করে যাচ্ছি। কারণ, যেভাবে চলছে, এভাবে চলতে থাকলে, কবিতার পাঠক ক্রমেই হারিয়ে যাবে। কবিতা যদি সাদামাটা গদ্য হয়ে যায়, তাহলে পাঠক কবিতা পড়বে কেন? তারা তো গদ্যের কাছেই যাবে। বাংলা কবিতার বয়স এক হাজার বছর। গদ্য তো সেদিনের, মাত্র আড়াইশ-তিনশ বছরের। তার আগে তো গদ্য ছিলই না। এ-দেশের মানুষের এত প্রিয় যে-কবিতা সে কেন কবিতা থেকে সরে যাবে! তাদের হৃদয়ের ভেতরে কবিতা আছে, কিন্তু তার স্বচ্ছ সুন্দর প্রকাশ দেখতে পাচ্ছে না বলেই সেই জিনিসটা হারিয়ে যাচ্ছে।
হামিদ কায়সার : নববসন্তের প্রচ্ছদ তো করেছিলেন রামকিংকর বেইজ?
আবুল হোসেন : সেটা নিয়ে যে কত কাহিনী !
হামিদ কায়সার : যদি বলতেন!
আবুল হোসেন : প্রথমেই হবীবুল্লাহ বাহারের কথা বলে নিতে হয়। তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে নববসন্ত প্রকাশ করতে এগিয়ে আসায় প্রথম বই ছাপতে গিয়ে একজন তরুণ লেখককে যে-বাধার দরজায় মাথা খুঁড়তে হয়, সেই দুর্ভোগ আমাকে পোয়াতে হয়নি। এবার আসি প্রচ্ছদের কথায়, আমি প্রচ্ছদের দায়িত্বটা দিয়ে রেখেছিলাম আমার এক বন্ধু রথীন্দ্রকান্ত ঘটক চৌধুরীকে। সে তখন শান্তিনিকেতনে। তার পরের কাহিনীটা ওর জবানিতেই শোনা যাক। রথীন্দ্র তার রবীন্দ্র তরুমূলে বইতে লিখেছে এইভাবে, “কবিবন্ধু আবুল হোসেনের চিঠি পেলাম কলকাতা থেকে। ‘আমার কবিতার বই ছাপা হচ্ছে। তার অনেক কবিতাই তো আপনাদের নির্বাচিত।… বলেছিলেন, আপনার বইয়ের প্রচ্ছদ নিশ্চয়ই আঁকিয়ে দেবো।… জানিয়ে রাখি, আমি রঙের চেয়ে রেখার বেশি ভক্ত।’ চিঠিটা পেয়েই শরণাপন্ন হলাম কিংকরদার। আবুল হোসেনের চিঠি পড়লেন। পড়ে মৃদু হাসলেন।… রাজি হয়ে গেলেন একবার বলতেই…একটা তারিখও দিয়ে দিলেন কয়েক দিন পরে। গিয়ে ব্যর্থ হলাম। ছবিটা এঁকে দিতে বড় ঘোরাতে লাগলেন।… রোজই তাঁর একই কথা। আইডিয়াটা আসেনি এখনো। এলেই এঁকে দেবো। জোর করে তো আঁকা যায় না। ওদিকে বই বেরোবার মুখে। অনবরত তাগিদ আসছে আবুল হোসেনের। এবার দু-তিন দিন পরে একরকম আশা ছেড়ে দিয়েই তাগাদা দিতে গিয়েছি। কিংকরদা হেসে বললেন, হয়ে গেছে। ও মা, কোথায় ছবি? আঁকেননি এখনো। আমরা বিরক্ত হয়ে চলে যাচ্ছিলাম। ডেকে বললেন, কোথায় যাচ্ছ তোমরা। আইডিয়াটা এসে গেছে, এখন আর দেরি হবে না। এঁকে দেবো এক্ষুনি।
কিংকরদা ছবি আঁকতেন পিস বোর্ড, প্যাকিং কাগজ, হাতের কাছে যখন যা পেতেন তার উপরেই। রং-তুলি হাতের কাছে না থাকলে ফুলপাতা নিঙড়ে, কখনো-বা মাটি গুলিয়ে রং বানিয়ে। আঁকতেন দাড়ি কামানো ব্রাশ, টুথ ব্রাশ দিয়েও কখনো কখনো।…প্রচ্ছদ আঁকতে এক টুকরো শক্ত কাগজ রাখলেন টেবিলে, তারপরে চট করে নিয়ে এলেন মোটা মতন একটা ব্রাশ। সেটাতে রং নিয়ে ক’মিনিটের মধ্যে এঁকে ফেললেন পাখির ঠোঁটের মতো একটা ছবি। সে-ব্রাশটা দিয়ে মোটা টানে উপর-নিচে লিখে দিলেন বই আর কবির নাম। আমাদের অনেক অনুরোধে ছবিটার নিচের দিকে এক কোণে খুব ছোট করে লিখেছিলেন নিজের নামের তিনটি অক্ষর র.ক.ব, জড়াজড়ি করে। প্রচ্ছদটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে এলাম আমরা। অর্থ বুঝলাম না কিছু… পছন্দও হলো না তেমন। আগে পাঠালাম না বন্ধুবর আবুল হোসেনের কাছে। শিল্পাচার্য নন্দলাল বসু কিছু দিনের জন্য গিয়েছিলেন বাইরে। কদিন পরে ফিরে আসতেই আমরা দেখাতে গেলাম তাঁকে। কলাভবনে বসেছিলেন তিনি। দেখে বললেন, ‘বাহ্ বেশ ফুটিয়েছে তো নববসন্তের অভিব্যক্তি।’ আমরা চেয়ে রইলাম তাঁর মুখের দিকে। ‘বসন্তকাল মাত্র এসেছে।’ আনতে বললেন একটা পলাশ ফুলের ডাল। নিয়ে এলাম তাড়াতাড়ি করে। একটা পলাশ কোরক বোঁটা থেকে খুলে দেখালেন। ‘মিলছে তো এটা ছবির সঙ্গে? বসন্ত সবে এসেছে, তার রূপ ফোটানো হয়েছে এই প্রতীকটি দিয়ে।’’
ওদিকে যেমন রথীন্দ্র ঘটকের একটা কাহিনী হয়েছে প্রচ্ছদটা নিয়ে, এদিকেও কিন্তু একটা হলো। প্রচ্ছদসহ বই ছাপা শেষ হয়েছে, এমন সময় প্রেসের মালিক শৈলেনবাবু হঠাৎ বেঁকে বসলেন। এই প্রচ্ছদ চলবে না। অসাধারণ ছবি। সেকালে প্রচ্ছদের জন্য এ-রকম ছবি কেউ দেখেনি। যদিও আমরা ছবিটার কিছুই বুঝতে পারিনি। কিন্তু রামকিংকরবাবু পারিশ্রমিক না নিয়ে খুশি হয়ে যে-ছবিটা এঁকে দিয়েছেন সেটা কি উপেক্ষা করা যায়? হাফ টোন ব্লক করে এনে ছবিটা ছেপে ফেলা হলো আর্ট কাগজে। এমন সময়েই সেটা চোখে পড়েছিল শৈলেনবাবুর। তিনি অনড়, কিছুতেই ছবিটা ব্যবহার করবেন না। বিপদ আমাদের। শান্তিনিকেতনে ওরা কী ভাববেন? অবশেষে একটা রফা হলো। কাপড়ে মোড়া বোর্ড কভারে বড় বড় লেটারিং করে আরেকটা প্রচ্ছদ হবে। তার উপর রামকিংকরের আঁকা আর্ট কাগজে ছাপা হবে প্রচ্ছদটি। তা-ই হলো। ব্লক তৈরি হবার পর মূল ছবিটা কী করে কার হাত-সাফাইয়ে রথীনের দখলে চলে যায়, তা বিধাতাই জানেন। শুনেছি সেটা আজো শরিয়তপুরে তাদের বালুচরের বাড়িতে আছে।
হামিদ কায়সার : ছাপা হওয়ার পর তো কোনো কাহিনী হলো না?
আবুল হোসেন : কাহিনী?
হামিদ কায়সার : প্রচ্ছদটা পাঠকরা নিল তো?
আবুল হোসেন : সাধারণ পাঠকদের সমাদর কি জুটেছিল? কত বই বিক্রি হয়েছিল? সঠিক খবর পাইনি। দেশবিভাগের অনেক আগেই বইটা আর পাওয়া যাচ্ছিল না। রয়্যালটি দেওয়ার কথা প্রকাশকের মনেও হয়নি। তাঁর প্রকাশনা-সংস্থার অস্তিত্বও তখন শেষ হয়েছে। তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছেন, মন্ত্রী হয়েছেন। জনপ্রিয়তা আশা করিনি। আমাদের সমাজ তখন নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, গোলাম মোস্তফায় আচ্ছন্ন। নববসন্ত তাঁদের ট্রেনের টিকেট কাটেনি। সে যে-ট্রেন ধরেছিল তার লাইন কেবল পাতা হচ্ছে। প্রতিবেশীরা কয়েকজন অচেনা যাত্রী। পথটা নতুন। কাঁচা জমি। গন্তব্য অনির্দিষ্ট। লেখকের দুই সহযাত্রী বন্ধু ফররুখ আহমদ ও আহসান হাবীব তখনো তাঁকে এই পথে সঙ্গ দেননি।
শুধু একটি জায়গায় আমার ভাগ্য ছিল ভালো। সমাজে, সাহিত্যক্ষেত্রে, যারা সুপ্রতিষ্ঠিত, বিশিষ্ট, যাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রবল, তাদের নেকনজর পেয়েছিলাম। গোলাম কুদ্দুস নববসন্তর একটা লম্বা সমালোচনা লিখে পাঠিয়েছিল কবিতার জন্য। সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু জানালেন লেখাটা তাঁর ভালো লেগেছে, কিন্তু তিনি ছাপতে পারছেন না, কারণ তার আগেই তিনি ড. নীহাররঞ্জন রায়কে অনুরোধ করেছিলেন এই বইটি আলোচনা করার জন্য এবং তাঁর লেখাটা তিনি পেয়েও গেছেন। ড. সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত আলোচনা করেন একটা নতুন কাগজে। প্রেমেন্দ্র মিত্রের নিরুক্ত, সঞ্জয় ভট্টাচার্যের পূর্বাশা, আনন্দবাজার পত্রিকা, যুগান্তর, অরণি, চতুরঙ্গ নববসন্ত-কে স্বাগত জানিয়েছিল। মোতাহার হোসেন চৌধুরী গিয়েছিলেন নজরুল ইসলামের কাছে। কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করলেন এই বইটি সম্পর্কে। নজরুল বললেন, এ কেমন লেখা। এর মধ্যে যৌবন কোথায়?
হামিদ কায়সার : নজরুলের সঙ্গে কি আপনার পরিচয় ছিল?
আবুল হোসেন : নজরুলকে আমি প্রথম দেখি আমার বয়স যখন ছ-সাত বছর। কৃষ্ণনগরে একটি বাড়ির বাগানের এক কোণে আমগাছের তলায় টেবিলে বসে লিখছিলেন। সে-স্মৃতি আমার মনে গেঁথে আছে। এরপর নজরুলের সঙ্গে আমার পরিচয় হলো ১৯৩৯ সালে। কবির কাছে বুলবুলের জন্য লেখা আনতে যাচ্ছিলেন হবীবুল্লাহ বাহার। আমি তখন তাঁর নিত্যসঙ্গী। সাতসকালে যখন শ্যামবাজারে গলির ভেতর নজরুলের বাড়িতে আমরা পৌঁছলাম, তখন বৃষ্টি। নজরুল আমাদের ঘরে না বসিয়ে নিয়ে গেলেন হিজ মাস্টারস ভয়েস গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সেল বাড়িতে। নজরুলকে আমার বড় ক্লান্ত, বড় নিরুত্তাপ, উদাসীন মনে হচ্ছিল। কথাবার্তার মাঝে হো হো করে হাসছিলেন। কিন্তু সে-হাসির মধ্যে আনন্দের উচ্ছলতা ছিল না, যেন অনেকদিনের অভ্যেসবশেই হাসছেন। এরপর নজরুলের সঙ্গে আমার অনেকবারই দেখা হয়েছে। হিজ মাস্টারস ভয়েসের অফিসে, আরো দু-এক জায়গায়।
হামিদ কায়সার : আপনার দ্বিতীয় কবিতার বই বিরস সংলাপ বেরিয়েছিল ১৯৬৯ সালে ঢাকায়। কলকাতা থেকে ঢাকায় আসলেন কবে? নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশে আপনার কবিতাচর্চার পটভূমিটি কেমন ছিল? কাব্যচর্চার সহযাত্রী পেলেন কাদেরকে?
আবুল হোসেন : পূর্ববাংলায় এলাম ১৫ আগস্ট, ১৯৪৭-এ, পাকিস্তান-পত্তনের পরের দিন, কলকাতা থেকে ঢাকায়, প্লেনে। পরের দিনই চলে গেলাম ময়মনসিংয়ে। সেখানেই আমাকে বদলি করা হয়েছিল। তারপর প্রায় তিন বছরের নির্বাসন – শহর তো নয়, যেন মরুভূমি। লেখাপড়া চুলোয় গেল। কথাবার্তা তেল-নুন-লাকড়ি নিয়ে। ’৫০-এর মাঝামাঝি ঢাকায় এসে হালে খানিকটা পানি পাই। তবে স্বস্তি আসে অনেকদিন পরে। আমার দুই বন্ধু – শওকত ওসমান চাঁটগায়, আবু রুশ্দ সিলেটে। ঢাকায় যারা ছিল, আমি তাদের এড়িয়ে চলতাম।
হামিদ কায়সার : কেন এড়িয়ে চলতেন?
আবুল হোসেন : ফররুখ আহমদ, সৈয়দ আলী আহসান, তালিম হোসেনদের কথাবার্তা আমার ভালো লাগত না।
হামিদ কায়সার : আপনার কবিতায় কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতবাদের ছাপ পাওয়া যায় না। তবে কি রাজনীতির প্রতি আপনি আস্থাহীন?
আবুল হোসেন : ঠিকই ধরেছ, তবে আমার কবিতায় একটা রাজনৈতিক প্রবণতা তো সবসময়েই ছিল। তা কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ বা রাজনৈতিক দলের পক্ষে নয় – সাধারণ মানুষের সপক্ষে। দলিত, নির্যাতিত, নিরন্ন মানুষের পক্ষে। এই যেমন ধরো পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময়ে লেখা, ‘মানপত্র’।
হুজুর, সালাম নিবেন গরিবের,
আপনি নিজেই এসেছেন, আমাদের জোর –
কপাল। চলুন, দেখবেন কিছু ঘুরে ফিরে।
এই গ্রামটিরে আদর্শ বলতে হয়, কি যে
নির্বিকার ঝকঝকে এ দিকটা। রোদে জলে ভিজে
সব যে করেছি নিজেরাই অবশ্যি ঠিক তা নয়,
বিধাতাই সহায়, বাকিটা না বললেও
চলে আমাদেরই কাজ। দারুণ দুর্দিনে যে যা
চেয়েছে বেচতে, যা-ই দাম হোক, আহা কি কষ্ট,
নিতে হলো কিনে। অকেজো বাড়তি লোকগুলো
গেছে শহরে, তাই তো
খাওয়ার পরার শোওয়ার
ভাবনাও আর নাই, ঘরে ঘরে নির্ভেজাল শান্তি,
হয় না লড়াই। আর এমনি চমৎকার লোক এরা
নালিশও করবে না, আগাড় ভাগাড় যাই হোক
তিন হাত চাই মাটি শুকনো হাড়ে সার দেয়ার।
মাটির সাথে একাÍ, আহা, কী সামান্য প্রয়োজন।
শব্দহীন নির্বিকার জলের জীবন। মৃত্যু আর
জীবন সমান। হুজুরের অপূর্ব শাসন।
এর মধ্যে কি রাজনীতি নেই? সময়ের সংকট কি উঠে আসেনি? ‘দেব, সব দেব’ কবিতায় যেমন আছে,
দেব, সব দেব যা যা চাও –
কলমীলতা নুয়ে পড়া মাচা
দাওয়ার শালিকসুদ্ধ খাঁচা
টিকের ছাইতে ভরা কল্কে দুটো
গোয়ালে ছড়ানো ভাঙ্গা ঘুটো
বাতায় শিকেয় তোলা ফুটো
পেতলের কলসীটা
মাদুর বালিশ তেলচিটা –
এখনও যা আছে।
ধান তো আর নেই, পাটও শেষ
বছর বছর ডোবে দেশ
আম জাম কাঁঠালের
জমি গেছে ঢের
ফল নেই গাছে।
নাও, যা যা পার নিতে
চৌদ্দ পুরুষের ভিটে
গোয়ালের গরু
ঘরের মা বোন জরু
ছেলের মেয়ের শব।
সাহেব, দিয়েছি দেব সব।
মরবে কি মানুষটা?
মনে ঢাকা ফানুসটা?
ঝাঁঝরা বুকের মধ্যে শুধু
জ্বলবে আগুন ধু ধু
থাকবে দু’ চোখ ভরে ঘৃণা।
সে তো আর নিতে পারবে না।
এইরকম প্রতিবাদের প্রতিরোধের কবিতা আমি আরো অনেক লিখেছি। আর সে-সব কবে লিখেছি জানো? ১৯৪২ থেকে ১৯৬২ সালের বিভিন্ন পর্যায়ে। ‘মানপত্র’, ‘স্বদেশী কোরাস’, ‘গৌরী সেন’, ‘নায়ক’, ‘শেষ যুক্তি’, ‘ছাতাটা’ – এ-রকম কত কবিতার কথা বলব! এর মধ্যে ব্যঙ্গ আছে। তীব্র ঘৃণা আছে। নেই সোগান, বেশির ভাগ রাজনৈতিক কবিতা অধঃপতিত হয় যা ব্যবহার করে। অনেক দিন আগে ‘রাজনীতি’ নামের একটি কবিতায় লিখেছিলাম,
কখনও করিনি তার পদসেবা। যাদুর বাঁশিতে
একটু হইনি বিহ্বল, যদিও দেখেছি শুধু
দূর থেকে আজীবন হরেকরকম ছলাকলা,
দেখেছি আগুনে তার ঝাঁপ দেয় অবলীলাক্রমে
যুবক যুবতী প্রৌঢ় থুরথুরে বুড়ো ও বুড়ি, আর
কখনও কখনও কচি ছেলে নির্ভয়ে গুলির মুখে
বুক পেতে দেয়, বাঘেরও অসাধ্য যা,
………………………………………………
কে শেখাবে ইতিহাস নেতাদের? তারা একবার
পেয়েছেন স্বাদ তাজা রক্তের। এখন, শিকারের
গন্ধে মত্ত, আÍহারা। নীতির বালাই নেই কোন,
রুচির ধারে না ধার, বিশ্বাস করে না কিছুতেই,
শুধু যে ক’রেই হোক টিকে থাকতেই হবে যেন।
জীবন ও জগতের কত কিছু জানি না তা ঠিক,
তবু জানি রাজনীতি আমাদের অমোঘ নিয়তি।
আমার কবিতায় প্রচুর রাজনীতি আছে, সে যেমন ছিল প্রথম দিকে এখনো তেমনি আছে। নেই বিশেষ কোনো মতবাদ বা সোগান। সেজন্যেই বুঝি তা লোকের চোখে পড়ে না। সোগান আমাকে ক্লান্ত করে। তুমি ঠিকই বলেছ, রাজনীতিতে আমার আস্থা নেই, কিন্তু সে স্লোগানের রাজনীতি।
হামিদ কায়সার : বলা হয় যে, কবিরা ভালোবাসা ছড়িয়ে দেন। এই প্রেম-ভালোবাসা সম্পর্কে আপনার কী দৃষ্টিভঙ্গি? আপনার প্রেমের কবিতা সম্পর্কে বলুন।
আবুল হোসেন : সাধারণ মানুষ মনে করে কবিদের সঙ্গে প্রেমের একটা বিশেষ সম্পর্ক আছে। তা কিন্তু নয়। প্রেমে সবাই পড়ে। কেউ সেটা প্রকাশ করতে পারে, কেউ পারে না। কবিরা একটু বেশি সোচ্চার বলেই লোকেরা ভাবে কবিরাই সেরা প্রেমিক। কবিরা লিখতে পারে বলে তার কথাটা অনেকে জেনে যায়। অনেকে তার কথাটা নিবেদনের জন্য ব্যবহার করে। কিন্তু প্রেম-নিবেদনের জন্য প্রত্যেকের নিজের নিজের ভাষা আছে। সে-ভাষা যে-কোনো কবির ভাষার চেয়ে কম কার্যকরী নয়।
বেশ কিছু প্রেমের কবিতা আছে আমার, বিরহের কবিতাও। আসলে বিরহের কবিতাগুলো তো এক ধরনের প্রেমের কবিতাই। প্রেম তো হাওয়ায় হয় না। তার ভেতরে কোনো বিশেষ ব্যক্তি থাকে। আমার বেলায়ও ছিল। বিশেষ কারো উদ্দেশে অথবা কাউকে মনে করে কবিতাগুলো লিখেছি। এগুলো আসলে সেই বিশেষ ব্যক্তির সম্পত্তি। কিন্তু সত্যি কি তাই? লেখা যখন হয়ে গেল তখন তা আর বিশেষ কোনো একজনের থাকল না। সকলের হয়ে গেল। লেখার সময় কথাটা কি কবির মনে থাকে? কার কী হয়, জানি না। প্রেমের কবিতা লেখার সময় আমার মনে থাকে ব্যক্তিটি। তার কী ভালো লাগবে?
বিরহের বেলায় সে তো থাকে না। তাকে দেখানোর কথাও ওঠে না। তবু কবিতাটি তো তাকে নিয়েই। বিরহের কবিতা মূলত স্বগতোক্তি।
হামিদ কায়সার : কোনো নারী কি প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে কবিতা-রচনায়?
আবুল হোসেন : প্রেমের কবিতায় অবশ্যই।
হামিদ কায়সার : রবীন্দ্রনাথের যেমন ছিলেন একজন ‘জীবনদেবতা’, আপনারও কি সে-রকম কেউ রয়েছেন? আপনার কবিতা লেখার মূল প্রেরণা কে?
আবুল হোসেন : কেউ একজন আমাকে শব্দ, সুর দিয়ে যান, কথা জোগান, একান্তে, ঘুমের মধ্যে। তাঁকে চিনি না। কে তিনি? সারাক্ষণ খুঁজি।
হামিদ কায়সার : সংসার-জীবন ও কবি-জীবনের মধ্যে কখনো দ্বন্দ্ব হয়নি?
আবুল হোসেন : খুব বেশি নয়। মাঝে-মাঝে। ঘুমের মধ্যে কবিতার লাইন এলে বাতি জ্বেলে বিছানা ছেড়ে যখন উঠে যেতে পারতাম না, খুব খারাপ লাগত। কিন্তু সে-কথা বলতে পারিনি।
হামিদ কায়সার : যে-ধারণা নিয়ে কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন, জীবনের এই শেষ পর্যায়ে এসে সে-দৃষ্টিভঙ্গির কি কোনো পরিবর্তন হয়েছে?
আবুল হোসেন : ছেলেবেলায় যখন কবিতা লিখতে শুরু করি, কবিতার ভাষা, ছন্দ, মিল, বিষয় – এসব নিয়ে ভাবনাচিন্তা ছিল না। লিখতে ভালো লাগে, সেটাই যথেষ্ট। কেন লিখব, কার জন্য লিখব, কী লিখব, কীভাবে লিখব – এসব কথাও মনে ওঠে অনেক পরে। গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, সমালোচনা, ভ্রমণকাহিনী, খেলাধুলার বিবরণ – কী-ই না লিখছি তখন দু-হাতে। কিছুদিন পরে মনে হলো, এ কী করছি আমি? কেউ কি একসঙ্গে এত কাজ করতে পারে? আমি ভেবেচিন্তে কবিতাকেই বেছে নিলাম। দেখি, আর একজন কে তার ভেতরে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে।
হামিদ কায়সার : কে?
আবুল হোসেন : কে আবার? রবীন্দ্রনাথ! কী করে তাঁকে সরিয়ে রাখি? আমি খুঁজতে শুরু করি নিজের ভাষা। অন্তর্যামী বলে দিলেন, তোমার কাছেই তো আছে সে-ভাষা। সবচেয়ে পুরনো ভাষা। তোমার আশেপাশের লোকেরা যে-ভাষায় কথা বলে, চিরকাল বলে আসছে। আমি লুফে নিলাম প্রস্তাবটা। প্রথম যৌবনেই আমি কবিয়ানার পথ ছেড়ে, সাধারণ মানুষের আটপৌরে মুখের ভাষার প্রেমে পড়ি। এ-ভাষাই আমাকে দিয়েছে ছন্দ ও মিলের খেলোয়াড়ি। অপ্রত্যাশিত লাভ হলো কবিতা সহজ-সরল হয়ে গেল। আধুনিক কবিতার দুর্বোধ্যতার অপবাদ থেকে মুক্ত হলাম। আজো মেতে আছি সেই খেলায়।
হামিদ কায়সার : আমরা জেনেছি, লেখালেখির শুরুতে আপনি গদ্যচর্চা করেছেন, বাংলাদেশের কোন কোন গদ্যশিল্পীর লেখা আপনার ভালো লাগে?
আবুল হোসেন : গদ্য তো আমি এখনো লিখি। গত বৎসর আমার দুটো গদ্যের বই বেরিয়েছে। সে-কথা থাক। যাদের গদ্য আমার ভালো লাগে, তাদের মধ্যে দুজনার নাম করি। কথাশিল্পী রশীদ করীম। প্রাবন্ধিক আনিসুজ্জামান। রশীদ করীমের গদ্য উজ্জ্বল ও সরস। আনিসুজ্জামানের প্রাঞ্জল ও স্বচ্ছ।
হামিদ কায়সার : কথাশিল্পীদের কাকে আপনার পছন্দ?
দুজন প্রয়াত লেখকের নাম করব। মাহবুব উল আলম ও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্। মাহবুব উল আলমকে আমি আমাদের প্রথম আধুনিক গল্পলেখক মনে করি। পাশ্চাত্যে চেতনার প্রবাহ বলে যে জিনিসটা বিশ শতকের মাঝামাঝি কথাশিল্পে আলোড়ন তুলেছিল, ওয়ালীউল্লাহ্ তা আমাদের সাহিত্যে আমদানি করে একটা নতুন পথ দেখালেন। তারপর রশীদ করীম। আমাদের উচ্চ মধ্যবিত্ত জীবনের সেরা ভাষ্যকার। অসুস্থতার জন্য রশীদ করীম আর লিখতে পারছেন না। আমাদের দুর্ভাগ্য।
বর্তমানে যাঁরা সক্রিয়, তাঁদের মধ্যে হাসান আজিজুল হক উঁচুমানের গাল্পিক। আরো ভালো লাগে হুমায়ূন আহমেদের লেখা। শুরু করেছিলেন চমৎকার। কিন্তু এখন সম্ভবত নানা কাজে খুব বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ায় উপন্যাস লেখার দিকে তেমন সময় দিতে পারছেন না। হাসনাত আবদুল হাইও ভালো গল্প-উপন্যাস লেখেন। কিন্তু আমার পছন্দ ওর জর্নাল এবং ভ্রমণকাহিনী। নাসরীন জাহানও একজন সাহসিকা কথাশিল্পী। খুব ভালো লিখছিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। ওর খোয়াবনামা পড়ে মুগ্ধ হই। দুর্ভাগ্য, অকালে চলে গেলেন।
হামিদ কায়সার : আমরা আবার কবিতায় ফিরে আসি, আপনি প্রথমে রবীন্দ্র-প্রভাবিত ছিলেন, পরে তিরিশের কবিদের প্রভাবে আধুনিক – জীবনের এ-পর্যায়ে এসে বাংলা কবিতা সম্পর্কে আপনার সামগ্রিক মূল্যায়ন কী?
আবুল হোসেন : আধুনিক কবিতার কোনো পথিকৃৎই প্রথম দিকে রবীন্দ্রনাথের প্রভাবমুক্ত ছিলেন না। তবু রবীন্দ্রনাথ বেঁচে থাকতেই, তিরিশের কবিরা কবিতায় একটা নতুন পথ ধরেছিলেন। সাত দশক পরেও তাঁদের অর্জনই আমাদের সম্বল। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দের পর এখন বাংলা কবিতার এক ক্রান্তিকাল।
হামিদ কায়সার : শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ – এঁদেরকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
আবুল হোসেন : আধুনিক কবিতার পথিক হিসেবেই। তবে এঁরা নিজের বলার কথা ও ভঙ্গি আয়ত্ত করেছেন।
হামিদ কায়সার : তরুণ কোনো কবির কবিতা পড়েছেন? ভালো লেগেছে কার কবিতা?
আবুল হোসেন : শামসুর রাহমান, আল মাহমুদদের পর যাদেরকে শনাক্ত করতে পারতাম, তারা আর তরুণ নেই। যারা সত্যিই তরুণ, যাদের বয়স তিরিশের নিচে, তারাই তো ভবিষ্যৎ। তারা কি কেউ নজরুলের মতো ঘোড়া ছুটিয়ে আসবেন, না জীবনানন্দের মতো সময় নেবেন? দিগন্তে কাউকে তো দেখছি না!
হামিদ কায়সার : কবিতা নিয়ে মাঝে-মাঝেই একেকটা মতবাদ চেপে বসে, যেমন এখন বলা হচ্ছে উত্তর-আধুনিকতা – এই প্রবণতাকে আপনি কী চোখে দেখেন? এ-প্রসঙ্গে আরেকটু জানতে চাচ্ছি, লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন-বিষয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি?
আবুল হোসেন : এক-একটা জ্ঞানের মতবাদ একেক সময়ে আসে। তাদের চেহারাও ভিন্ন। দর্শনের আর বিজ্ঞানের মতবাদ কি একই সঙ্গে হাত ধরে আসে? না, তারা একরকম হয়? দেশে দেশে তাদের প্রতিফলন ভিন্ন প্রকৃতি নেয়। শিল্পে মডার্নিজম আর সাহিত্যে মডার্নিজম তো এককথা নয়। এমনকি ইংরেজি আর বাংলা কবিতার আধুনিকতা ভিন্ন পদার্থ। তাদের কালও ভিন্ন। উত্তর-আধুনিকতা আমি ভালো করে বুঝি না। এই দার্শনিক মতবাদটা সাহিত্যে কীভাবে কতখানি প্রতিফলিত হয়েছে সে-খবর আমার ভালো জানা নেই। এদেশে এখনো তেমন কিছু দেখছি না। লিটল ম্যাগাজিনগুলো একটা ভালো কাজ করে। তরুণ লেখকদের, যারা প্রতিষ্ঠিত কাগজগুলোতে সহজে ঢুকতে পারে না, তাদের আÍপ্রকাশের সুযোগ করে দেয়। নতুন চিন্তাভাবনার পথ সুগম করে।
হামিদ কায়সার : বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে তুলনা করলে আজকের বাংলাদেশের কবিতার অবস্থান কোথায় বলে মনে হয় আপনার?
আবুল হোসেন : আমাদের কবিতার মান ক্রমেই উন্নত হচ্ছে, কিন্তু বিশ্বমানের কাছে পৌঁছাতে আরো অনেক সময় লাগবে। ভালো লেখার জন্য ভালো রুচি দরকার। তা আয়ত্ত করতে হয় রুচিমানদের দেখে, তাদের কাছে শিখে, ভালো লেখাপড়া করে। সেদিকে আমাদের তেমন মনোযোগ দেখছি না।
হামিদ কায়সার : বাংলা কবিতার – আপনি বলেছেন – এক হাজার বছর অতিক্রম হয়েছে, এই এক হাজার বছর থেকে যদি আপনাকে বলা হয়, সেরা দশজন কবির নাম বেছে নিতে, আপনি কাদের নাম বলবেন?
আবুল হোসেন : আমি একটা তালিকা দিতে পারি। হয়ত গবেষকদের সঙ্গে মিলবে না। আমার তালিকাটা এইরকম – দৌলত কাজী, সৈয়দ আলাওল, বিদ্যাপতি, বড়ু চণ্ডীদাস, ভারতচন্দ্র, ঈশ্বর গুপ্ত, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ।
হামিদ কায়সার : এবার বলুন, কবিতা কি সমাজের মঙ্গল বা ক্ষতি কোনোটাই করতে পারে? করলে কীভাবে?
আবুল হোসেন : কবিতা সমাজের মঙ্গল আনতে পারে, ক্ষতিও করতে পারে। মঙ্গল আনতে পারে মানুষের রুচি উন্নত করে, হৃদয়ের সুকুমার বৃত্তিগুলোকে উজ্জীবিত করে, তার মনকে সুসংস্কৃত করে, তাকে আলোর, সুন্দরের ও সত্যের পথ দেখিয়ে। ক্ষতি করতে পারে ভুলপথে নিয়ে গিয়ে।
হামিদ কায়সার : যন্ত্রের যে-আগ্রাসন শুরু হয়েছে, স্যাটেলাইট, ইন্টারনেট, আইটি, কবিতার অস্তিত্বই তো…
আবুল হোসেন : আইটি-বিস্ফোরণে কবিদের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ দেখছি না। গত শতকের প্রথম ও দ্বিতীয় পাদে যখন রেডিও ও টিভি এদেশে এল, এইরকম একটা ‘গেল গেল’ রব উঠেছিল। এখন কে আর গান শুনতে, নাটক দেখতে সিনেমা বা থিয়েটার-হলে যাবে? সিনেমা বা থিয়েটারের দর্শক কি কমেছে? ইন্টারনেট কি বইয়ের বাজারে মন্দা আনতে পেরেছে? পাঠকের সংখ্যা কোথায়ও কমেনি। বইয়ের অনেকগুলো তুরুপের তাস আছে। হাতে ধরে, বুকের ওপর রেখে, চিৎ হয়ে অথবা ট্রেনে, প্লেনে, বাসে বসে বই পড়ার আনন্দ কোন ইন্টারনেট দেবে? কবিতার পাঠকের চাহিদা আরো অনেক অন্তরঙ্গতার। কবিতা ও তার পাঠকের সখ্য ভাঙতে পারেন শুধু কবিরাই। কবিতার মান যত পড়ে যাবে, তার পাঠকের সংখ্যাও তত কমবে। ঝোঁকটা তো দেখছি সেই দিকে। কবিরা কি ‘হারাকিরি’ করবেন?


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.