বাংলাদেশের পাঠকদের সঙ্গে আমার আত্মীয়তা শুরু হয়েছিল প্রায় কুড়ি বছর আগে, যখন কালবেলা বের হয়েছিল বই হিসেবে। তখন ঢাকায় অসৎ প্রকাশকরা সক্রিয় ছিলেন না, তাই আমার বই পাইরেট হতো না। কলকাতা থেকে যেসব বই যেত তা থাকত ঠিকঠাক। পরে যখন পাইরেসি প্রায় মুড়ি-মিছরির মতো ছড়িয়ে পড়ল, আমাদের অনুমতি ছাড়াই বইগুলো ওখানে ছাপা হতে থাকল তখন আবিষ্কার করলাম দাম কমাবার জন্যে তিরিশ পাতার কাহিনী দুই পাতায় ওঁরা লিখে ফেলছেন। যে-পাঠক ফরিদপুর অথবা চট্টগ্রামে বসে ওই বই পড়ছেন তিনি জানতেও পারছেন না। তবু বইগুলো যে তাঁদের পছন্দ হচ্ছে এটা তাঁদেরই উদারতা। কিন্তু সম্পূর্ণ বইটি পড়তে তাঁরা পারছেন না এটাই সত্যি। এ বছর ঢাকার ঈদ সংখ্যাগুলোতে আমার উপন্যাস বেরিয়েছিল। ভেবেছিলাম বই করার আগে লেখাগুলো নিয়ে বসব, কিছু কিছু অংশ বাড়াতে হবে। কিন্তু দেখলাম তার আগেই ঢাকা থেকে বইগুলো ছেপে দিয়েছেন পাইরেট ব্যবসায়ীরা। আমি কাকে উৎসর্গ করব তা তাঁরাই ঠিক করেছেন। ওই বইগুলো যাঁরা কিনবেন তাঁরা আসল পরিমার্জিত বই পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন।
মনে পড়ছে, শেখ হাসিনা যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তখন তাঁর কাছে আমরা গিয়েছিলাম এই সমস্যাটি নিয়ে। তিনি সব দেখে-শুনে বলেছিলেন যে, এটা স্বীকার করতেই হবে বাংলাদেশের মানুষ খুব ভালো নকল করতে পারে। তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। অনেক বড় সমস্যার মুখোমুখি থাকায় এই সামান্য সমস্যা নিয়ে চিন্তা করার সময় হয়তো পাননি।
এসব কথা দিয়ে আমার লেখা শুরু করার যথেষ্ট কারণ আছে। বাংলা ভাষার যাঁরা পাঠক, তাঁদের বৃহৎ অংশের বাস বাংলাদেশে। সমসাময়িক সাহিত্য নিয়ে যাঁদের উৎসাহ বেশি তাঁরা থাকেন ওখানে। এই দুই বাংলার মানুষ বাংলায় কথা বলে, গান গায়, লেখে এবং বই পড়ে বটে, কিন্তু ভাষার প্রতি অনুরাগ ওখানে এতই প্রবল যে এই বাংলার মানুষ তার কাছাকাছি যেতে পারেন না। এই কয়েক বছর আগে যখন পাইরেটরা সক্রিয় ছিল না, যখন এদেশ থেকে ওদেশে বই রপ্তানি হতো তখন দেখা যেত আমাদের কোনো বই দশ হাজার বিক্রি হলে তার সাড়ে সাত হাজার কিনে নিতেন বাংলাদেশের বই-ব্যবসায়ীরা।
শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে নয়, আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও তা-ই বলছে। শেখ হাসিনা তখন বিরোধী নেত্রী। অনেক কাজ। একদিন আমাকে চায়ে ডাকলেন। ক্ষিরের তৈরি ইলিশ মাছ খেতে খেতে তিনি তর্ক তুললেন সাতকাহনের দীপাবলীকে নিয়ে। আমি অবাক। পড়ার সময় পেলেন কখন? ওঁর বোন আবার অনুযোগ করলেন বইয়ের শেষের সঙ্গে পত্রিকায় প্রকাশিত ধারাবাহিকের মিল নেই কেন? আমি চমৎকৃত।
একদিন ধানমন্ডির বন্ধুর বাড়িতে বসে আছি, দুজন যুবক-যুবতী এলেন। এসে পরিচয় দিলেন তাঁদের নাম মাধবীলতা এবং অনিমেষ, ভাবলাম রসিকতা করছেন, কিন্তু ভুল ভাঙল। ওঁরা বিটিভিতে কাজ করেন। ছেলেটি মুসলমান, মেয়েটি হিন্দু। কালবেলা ওঁদের এত আপ্লুত করেছে যে নিজেদের ওইসব চরিত্র ছাড়া ভাবতে পারেন না। পারিবারিক বাধা থাকায় বিয়ে করতে পারছেন না। তাতে কি, অনিমেষ-মাধবীলতাও তো বিয়ে করেনি।
দ্বিতীয় ঘটনাটি একটু মর্মান্তিক। বাংলাদেশ সরকারের একজন উচ্চপদস্থ অফিসারের তরুণী কন্যাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। অনেক চেষ্টার পরে পুলিশ তাকে চট্টগ্রামের জঙ্গলে খুঁজে পায়। মেয়েটি ফিরতে চায়নি। সে নাকি গর্ভধারিণী উপন্যাসের জয়িতার মতো পাহাড়িদের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিল। ঢাকায় ফিরিয়ে আনার পর সে কথা বন্ধ করে দেয়। অনেক চিকিৎসাতেও কোনো কাজ হয় না। মানসিক রোগী হয়ে পড়ে সে। আমি তার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু সুযোগ পাইনি। ঘটনাটি বেদনাদায়ক।
তৃতীয় অভিজ্ঞতা চমৎকার। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে খিদে পেয়ে গিয়েছিল। সামনেই একটা রেস্তোরাঁ পেয়ে ঢুকে
গেলাম। দেখলাম খদ্দেররা সবাই আমেরিকান। কিন্তু পরিবেশনকারীদের এশিয়ান বলে মনে হলো। অর্ডার দেওয়ার সময় জানতে পারলাম তারা বাংলাদেশের মানুষ। খাওয়ার পর বিল মেটাতে গিয়ে বেয়ারার কাছে শুনলাম, ‘স্যার, আপনি কি ইন্ডিয়ান? কলকাতার মানুষ? আপনি কি সমরেশ মজুমদার?’ তিনটি উত্তরে হ্যাঁ বলায় সে আমায় অনুরোধ করল যদি একবার কিচেনে যাই, আপা আমার জন্যে সেখানে অপেক্ষা করছেন। কে আপা, কেন অপেক্ষা করছেন, জানি না! গেলাম। একজন মধ্যবয়সী, পরনে কাজের পোশাক, নমস্কার করে আমার দিকে একটা বই এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘একটা অটোগ্রাফ।’ চমকে উঠলাম, ওঁর হাতে আমার লেখা কালপুরুষ বইটি। আমি এখানে আজ আসব তা আমিই জানতাম না। উনি কি করে জানলেন? বললাম, ‘এটা আপনি এখানে এনেছেন কেন?’
‘কাজের ফাঁকে ফাঁকে সময় পেলেই পড়ি।’
‘আপনি আমাকে কী করে চিনতে পারলেন?’
‘বাঃ ! আপনার লেখা পড়ি না? আমি তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ, বিমল মিত্র, হুমায়ূন আহমেদ- সবাইকে চিনি।’
সেদিন অটোগ্রাফ দিয়ে ধন্য হয়ে গিয়েছিলাম।
আচ্ছা, বাংলাদেশের বাঙালি পাঠকদের গ্রহণ করার ক্ষমতা কতখানি? এ প্রশ্ন অনেকেই আমাকে করে থাকেন। ব্যাপারটা ভাবতেই আমি লজ্জিত হই। আমাদের গল্প-উপন্যাসে তুলসিতলা, লক্ষ্মীর ঘর, বিভিন্ন পূজা বা পৌরাণিক কথাবার্তা থাকে। বাংলাদেশের পাঠকদের মধ্যে মুসলমানরাই সংখ্যাগুরু। তাঁরা অবলীলায় সেগুলো পড়ে থাকেন। সাহিত্যের একটা অঙ্গ বলেই মনে করেন তাঁরা। গ্রামের মা তুলসিতলায় প্রদীপ জ্বালছেন, শাঁখ বাজাচ্ছেন, এতে তারা অনাত্মীয়তা বোধ করেন না। বরং কাহিনীর সঙ্গে সংগতি থাকলে রস গ্রহণ করে খুশি হন। তা নাহলে আমাদের বই হাজার হাজার কপি ওখানে বিক্রি হতো না। ওখানকার খবরের কাগজে বেরিয়েছিল, গর্ভধারিণীর পাইরেট কপি বিক্রি হয়েছে এক লক্ষ। হিন্দুদের নিজস্ব কথা যদি মুসলমান পাঠকরা পড়তে না চাইতেন তাহলে কি এত বিক্রি হতো? হোক না পাইরেট এডিশন!
ঠিক এর উলটো চিত্র পশ্চিমবাংলায়। নায়ক মুসলমান হলে হিন্দু পাঠক খুব অস্বস্তিতে পড়েন। সে নামাজ পড়ছে, সালাম ওয়ালেকুম বলছে, এরকম গল্প-উপন্যাসে ওঁরা স্বচ্ছন্দ বোধ করেন না। আমার প্রিয় বন্ধু এবং ভাই হুমায়ূন বাংলাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয়, কিন্তু তাঁর বই এদেশের পাঠক বোধহয় এই কারণে গ্রহণ করেননি। অথচ আমার তো খুব ভালো লাগে ওঁর বই পড়তে। এটা অত্যন্ত লজ্জার বিষয়। এর আগে যখন মুজতবা আলী লিখেছেন তখন হিন্দু পাঠকরা তাঁকে গ্রহণ করেছিলেন। মানুষটি আরবি, ফারসি, সংস্কৃতে প-িত ছিলেন এবং তাঁর লেখা পড়েই মনে হতো তিনি না হিন্দু- না মুসলমান। সেই সঙ্গে থাকত অফুরান রসের জোগান আর নতুন নতুন খবর। কিন্তু গৌরকিশোর ঘোষের প্রেম নেই অথবা বাসারের ফুলবউ অত্যন্ত ভালো লেখা হওয়া সত্ত্বেও এদেশীয় পাঠক তেমন আগ্রহ দেখাননি। তাই অপ্রিয় হলেও স্বীকার করতে হচ্ছে, বাংলাদেশের শিক্ষিত পাঠকদের গ্রহণ করার ক্ষমতা পশ্চিমবাংলার পাঠকদের থেকে অনেক বেশি। আমরা প্রায়ই মৌলবাদের কথা বলি। কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ অশিক্ষিতদের উসকে দেন পরধর্মীদের বিরুদ্ধে। তাঁদের বুঝি। কিন্তু এটা বুঝতে পারি না। তাই লজ্জিত হই।
এমনকি এদেশীয় সম্পাদকরাও আমাদের অনুরোধ করেন, যেন মুসলমান চরিত্র বা তাঁদের জীবনযাপন নিয়ে উপন্যাস না লিখি। অতীত অভিজ্ঞতায় তাঁরা জেনেছেন, উপন্যাসে ওরকম কিছু থাকলেই বাংলাদেশ সরকার পত্রিকাকে সীমান্ত পার হতে দেন না। তাঁদের ভয়, হিন্দু
লেখক না জেনে এমন কিছু লিখে ফেললে বাংলাদেশে প্রতিক্রিয়া মারাত্মক হবে। কিন্তু ওঁরা জানেন না, পাঠকের কোনো ধর্মান্ধতা নেই – একথা বাংলাদেশের পাঠকরা ইতোমধ্যে প্রমাণ করে দিয়েছেন।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.