তিন

মানিব্যাগ বাইর করেন।

কথাটা বুঝতে পারলেন না লালুবাবু! বললেন, কী বার করবো?

অন্য এক যুবক বলল, বোজেন নাই? মানিব্যাগ বাইর করেন।

লালুবাবু কথা বলবার আগেই চানমিয়া আপনমনে বলল, কারবার হইয়া গেছে।

তৃতীয় যুবকটি শীতল, নৃশংস চোখে চানমিয়ার দিকে তাকাল। ওই হৌরের পো, কী কইলি?

চানমিয়া ভয়ে একটা ঢোক গিলল। না না আমি কিছু কই নাই। আমি তো আপনেগ চিনছি। চিনছি দেইখাই তো ইশারা করনের লগে লগে রিশকা থামাইয়া দিলাম।

প্রথম যুবকটি লালুবাবুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে চানমিয়ার দিকে তাকাল। তুই আমগ কেমনে চিনছস? কই দেখছস আগে?

না না হেই চিনন না তো! আপনেগ কোনওদিন কোনওখানে আমি দেখি নাই।

তাইলে যে কইলি?

কইলাম অনুমান কইরা। আথকা মুখে আইসা পড়ছে।

দ্বিতীয় যুবকটি আঙুল তুলে কঠিন গলায় বলল, আর একটা কথাও কবি না। রাও শব্দ করলে হান্দাইয়া দিমু।

প্রথম যুবকটির পরনে জিনসের প্যান্ট আর খয়েরি রংয়ের টিশার্ট। দ্বিতীয় যুবকটি বেশ লম্বা। সে পরে আছে টেটরনের কালো প্যান্ট আর অফ হোয়াইট ফুলহাতা শার্ট। শার্টের হাতা গুট্রায়নি সে, হাতার বোতামও লাগায়নি। ফলে হাত নাড়াবার সময় গরুর কানের মতো লতরপতর করছে শার্টের হাতা। অন্য যুবকটির পরনে ঘিয়া রংয়ের ঢোলাপ্যান্ট আর আকাশি রংয়ের ফতুয়া।

তবে জামাকাপড় যাচ্ছেতাই রকম ময়লা তাদের। কোথাও কোথাও ছেঁড়াফাটা, সিগ্রেটের আগুনে পুড়ে ফুটো হয়েছে তিনজনেরই শার্ট-প্যান্ট। কতদিন ধোয়া হয় না এইসব জামাকাপড়, কতদিন বদলানো হয় না কে জানে। বোঝা যায় জামাকাপড়ের ব্যাপারে খুবই উদাসীন তারা। নিতান্তই পরতে হয় বলে যেন পরে আছে।

যুবকদের মাথার চুল রুক্ষ, ধুলো-ময়লায় ঝাকড়মাকড় হয়ে আছে। তৃতীয় যুবকটির তালুর কাছে মৃদু টাক। তিনজনেরই চেহারা খড়িওঠা, ভাঙাচোরা। বয়সের তুলনায় অনেক বেশি বয়স্ক মনে হচ্ছে। শরীর, স্বাস্থ্য দুর্বল ধরনের, বোধহয় তিনবেলা ঠিকঠাক মতো খাওয়া

দাওয়া করে না। লম্বা যুবকটি থেকে থেকে ঠোঁট চাটছে।

কেন?

গলা শুকিয়ে আসছে নাকি?

পিপাসা পেয়েছে!

চোখও কেমন ঢুলুঢুলু করছে তিনজনেরই। যেন গভীর ঘুমে আক্রান্ত হয়ে আছে কিন্তু ঘুমাতে পারছে না।

লালুবাবু অবাক হয়ে যুবকদের দেখছিলেন। ব্যাপারটা কী এদের! চেহারা- পোশাকে তো মনে হচ্ছে ভাল ঘরেরই ছেলে। তাহলে এই অবস্থা কেন? জামাকাপড় ধোয় না, চানফান করে না। ভদ্রলোকের রিকশা থামিয়ে মানিব্যাগ বের করতে বলছে!

এখনও রোদ ওঠেনি, তবে বেশ ফর্সা হয়েছে চারদিক। রাস্তাঘাটে সামান্য কিছু লোকজন, রিকশা এবং দু-চারটা গাড়িও বেরিয়ে গেছে। মর্নিংওয়াকে বেরুনো লোকজনের কেউ কেউ ফিরছে রমনা পার্কের ওদিক থেকে, কেউ কেউ যাচ্ছে। এক ভদ্রলোককে দেখা গেল লালুবাবুর রিকশার উল্টোদিককার ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। পরনে ট্র্যাকস্যুট, কেডস। বোধহয় আজ তার ঘুম ভেঙেছে দেরি করে। তবু স্বাস্থ্যসচেতন বলে সকালবেলার হাঁটা মিস করতে চাননি। একটু দেরিতে হলেও কাজ সারতে বেরিয়েছেন।

দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে ভদ্রলোক একবার লালুবাবুর রিকশার দিকে তাকালেন। তাকিয়ে এমনভাবে চোখ ফেরালেন যেন নিষিদ্ধ কোনও দৃশ্য দেখে ফেলেছেন। হাঁটা আরও দ্রুত করলেন তিনি। দৌড়টা যে কেন দিলেন না বোঝা গেল না। বোধহয় লোকলজ্জা।

কিন্তু জগিংয়ে বেরুনো লোকদের দৌড়াতে লজ্জা কিসের! বুড়াধুড়া লোকগুলোওতো খোলামাঠে, পার্কে লোকজনের চোখের সামনে নেচেকুঁদে শরীর উদ্ধার করে, কই তখন তাদেরকে লজ্জা পেতে দেখা যায় না!

মানুষ সত্যি বড় বিচিত্র। কখন যে তাদের কোন সাইকোলজি কাজ করে কে জানে!

কী হইল, কথা কানে যায় নাই!

লালুবাবু থমতম খেলেন। না মানে ইয়ে, আমি তোমাদের কথা ঠিক বুজদে পারছি না।

যুবকদের পক্ষ নিয়ে চানমিয়া একেবারে তেড়ে উঠল। ওই মিয়া, আপনের সাহস তো কম না। সাবেগ লগে তুই-তুমারি করতাছেন। আপনে কইরা কন, তাড়াতাড়ি আপনে কইরা কন।

হাঁটুর বয়েসী ছেলেপান! ওদেরকে কেন আপনি-আজ্ঞে করতে হবে! তাছাড়া ইয়ে, মানে আমি তো কোনও অন্যায় করিনি।

লম্বা যুবকটি কনুই দিয়ে প্রথম যুবকটিকে গুতা দিল। মাল তো ঘটিরে।

হালুম হুলুম ভাষায় কথা কয়।

লালুবাবু হাঃ হাঃ করে উঠলেন। না না, আমি ঘটি নই গো। বাঙাল, একেবারে কাঠবাঙাল। আমাদের দেশ হচ্ছে গিয়ে ঢাকা বিক্রমপুরে। তবে দেশে এয়েচি…

প্রথম যুবকটি ধমকের সুরে বলল, তর এয়েচির খেতাপুড়ি। তাড়াতাড়ি মানিব্যাগ বাইর কর। ঘড়ি খোল।

ছিঃ ছিঃ, এ কী ভাষা!

ভাষা মাশা বেবাক হান্দাইয়া দিমু। তাড়াতাড়ি মানিব্যাগ বাইর কর।

কেন, মানিব্যাগ বার করবো কেন?

চানমিয়া বলল, বুজেন নাই কির লেইগা বাইর করবেন? প্যাচাইল না পাইরা সাবেরা যা কইতাছে হেইডা করেন। মানিব্যাগ বাইর কইরা টেকা-পয়সা যা আছে দিয়া দেন। নাইলে বিপদ আছে।

লালুবাবু তেড়িয়া গলায় বললেন, কিসের বিপদ? কেন আমি টাকা-পয়ছা ছব দিয়ে দোবো! একী মগের মুল্লুক নাকি?

মৃদু টাকঅলা যুবকটি তার প্যান্টের পকেট থেকে পুরনো ধরনের একটা রিভলবার বের করল। এইডা চিনছ মাঙ্গের পো! মাত্র একখান ফুটুস করুম, লাশটা আস্তে কইরা রাস্তায় পইড়া যাইব।

রিকশার একপাশে এসে রিভলবারটা সে লালুবাবুর পেটে চেপে ধরল। আর একখান কথা কবি, ফিনিশ কইরা ফালামু।

এই প্রথম লালুবাবুর বুকটা ধ্বক করে উঠল, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। দিশেহারা চোখে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগলেন তিনি।

আশ্চর্য ব্যাপার, রাস্তার এদিক-ওদিক দু-চারজন লোক জমে গেছে। দূর থেকে দৃশ্যটি দেখছে তারা। কী হচ্ছে বুঝতে পারছে কিন্তু একজনও এগিয়ে আসছে না। লালুবাবু যে চিৎকার করে ডাকবেন সেই উপায়ও নেই। পেটে রিভলবার ঠেকে আছে, ট্রিগারে আঙুল, চিৎকার করার সঙ্গে সঙ্গে ট্রিগার টানবে যুবক। সঙ্গে সঙ্গে লালুবাবুর লাশ পড়ে যাবে।

প্রথম যুবকটি ততোক্ষণে হ্যাঁচকা টানে লালুবাবুর হাত থেকে খুলে নিয়েছে তাঁর ঘড়িটা। লম্বা যুবকটি হিপপকেটে হাত দিয়ে বের করে এনেছে মানিব্যাগে। ওয়াদুদ খানের দেয়া টাকাটি নিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের প্যান্টের পকেটে রাখল সে। তারপর তন্নতন্ন করে মানিব্যাগের এ-পকেট সে-পকেট খুঁজে দশ-বারোটা ইন্ডিয়ান টাকা পেল, কিন্তু সেই টাকাটা নিল না। মানিব্যাগটা লালুবাবুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, এটা রাইখা দেন। লাগব না। ইন্ডিয়ান টেকা আমগো লাগে না। তা-ও এত কম টেকা। বেশি হইলে রাখতাম। কইলকাত্তা গেলে কামে লাগতো।

রিভলবার ধরা যুবকটি বলল, দ্যাখ, গলায় চেন আছেনি? চেন না থাকলেও সোনার আংটি থাকবোই। হিন্দুগ হাতে সোনার আংটি থাকে।

কিন্তু চেন কিংবা আংটি কিছুই লালুবাবুর কাছে নেই। যুবকরা শুধু ওই এক হাজার টাকা আর ঘড়িটা নিল, নিয়ে মুহূর্তে একটা গলির ভেতর উধাও হয়ে গেল।

ঘোরটা তখনও কাটেনি লালুবাবুর। কাণ্ডটা কী ঘটে গেছে তখনও যেন পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেননি তিনি। ফ্যাল ফ্যাল করে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে তাঁর মনে হচ্ছে তিনি যেন ঘুমিয়ে ছিলেন, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে একটা দুঃস্বপ্ন দেখছিলেন। সেই দুঃস্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবের কোনও মিল নেই। বাস্তবে যেন এমন হতেই পারে না।

চানমিয়া স্বস্তির একটা শ্বাস ফেলে বলল, আপনের ভাগ্যি ভাল সাহেব। অল্পের উপ্রেদা বাঁচছেন। যেই তেড়িবেড়ি শুরু করছিলেন, আট্টু হইলে গুল্লি মাইরা দিত।

এবার যেন ঘোরটা কাটল লালুবাবুর। যেন অন্য এক জগৎ থেকে এই জগতে ফিরে এলেন তিনি। কোলের উপর দুহাতে ধরা মানিব্যাগটার দিকে চোখ পড়ল। বাঁ হাতের কব্জিতে বহুদিনের ব্যবহৃত ঘড়িটা নেই। একই জায়গায় দীর্ঘদিন ধরে একটু টাইট করে ঘড়ি পরার ফলে ঘড়ি এবং চেনের মাঝে সাদামতো একটা দাগ হয়েছে। সেই দাগের দিকে তাকিয়ে মনটা খুব খারাপ হলো। আহা এতদিনের সঙ্গী ওই ঘড়ি কোথাকার কারা এসে ছিনিয়ে নিল। কিন্তু এটা কেমন কথা! দিন-দুপুরে এত লোকজনের চোখের ওপর এরকম একটা কাণ্ড ঘটে গেল। কেউ কোনো কথা বলল না, এগিয়ে এলো না। সবাই মিলে বাধা দিলে ওরকম শুটকো চেহারার তিনটি যুবকের কী করার ছিল! রিকশাঅলাটাও তো লালুবাবুর পক্ষে ছিল না, সে কেমন ওদের পক্ষে চলে গেল। ওদের হয়ে কথা বলল, লালুবাবুর সঙ্গে ধমকা-ধমকি করল। ওই একটা পুরনো রিভলবারের এত শক্তি! রিভলবারটা আসল না নকল তা-ই বা কে জানে! এই ধরনের ছ্যাঁচরা যুবকেরা রিভলবারের মতো একটা দামি অস্ত্র কোত্থেকে কেমন করে যোগাড় করবে! চেহারা-সুরত দেখে তো অসুস্থ এবং ভিখিরি টাইপের মনে হলো। এইসব করেই বোধহয় সংসারধর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।

আর মুখের ভাষাটা কী খারাপ! ছিঃ ছিঃ ছিঃ। বাপ-কাকার বয়েসী, আরে বাপ-কাকার বয়েসী কী, তোদের দাদা-দাদুর বয়েসী একটা লোকের সঙ্গে তুই-তোকারি করলি! ওসব অশ্লীল শব্দ বললি! ছিঃ ছিঃ ছিঃ। ভাল ভাষায় কথা বলে, ভাল ব্যবহার করেও তো কাজটা করা যেতো, না-কি!

তীব্র একটা অপমানবোধে লালুবাবু তখন শরমে মরে যাচ্ছিলেন। আর কেউ না হোক রিকশাঅলাটা তো সব দেখেছে, সব শুনেছে। এই লোকটিকে লালুবাবু এখন মুখ দেখান কেমন করে!

তখনও পর্যন্ত আর একটি বাস্তবচিন্তা মাথায়ই আসেনি লালুবাবুর। রিকশাভাড়াটা তিনি কেমন করে দেবেন? বাংলাদেশী টাকা তো আর একটিও নেই তাঁর কাছে। একশো ডলারের দুটো নোট আছে জয়িতার কাছে। রিকশাভাড়ার জন্য একশো ডলারের নোট ভাঙাবেন! এই ঘটনা জয়িতাকে বলবেনই বা কী করে! এমনিতেই তাকে কিছু না বলে বেরিয়েছেন, তার ওপর এই কাণ্ড। রিভলবারের কথা শুনলে জয়িতা আতঙ্কিত হবে। রাগী ধরনের মেয়ে, শাসনের নামে খুবই গালাগাল করবে লালুবাবুকে।

দূরে দাঁড়ানো লোকগুলো তখন একজন-দুজন করে কাছে আসতে শুরু করেছে, জড়ো হতে শুরু করেছে। কী হইছে ভাই, কী হইছে? চানমিয়া তার মতো করে বলছে, আর কী হইবো? ছিনতাই।

ভিড় করা একজন তাচ্ছিল্যের গলায় বললো, ওঃ ছিনতাই! আচ্ছা! এইটা আর কী এমুন ঘটনা! আমি মনে করছি নতুন কিছু ঘটছে।

লালুবাবু ঠিক বুঝতে পারলেন না, এই ধরনের কাণ্ড ছাড়া নতুন আর কী ঘটতে পারে রাস্তাঘাটে। প্রশ্নটা করতে গিয়েও করলেন না। আচ্ছা বলুন তো দাদা, এই যে তিনটা ছোকড়া রিভলবার না পিস্তল কী একটা দেখিয়ে আমার নগদ এক হাজার টাকা আর শখের হাতঘড়িটা নিয়ে নিল, এরচে’ নতুন ঘটনা আর কী ঘটতে পারে!

লোকটি বলল, নিছে কী কী?

জবাবটা দিল চানমিয়া।

আরেকজন লোক, তার মাথাটা গলাছিলা মুরগির মতো ন্যাড়া, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি রেখেছে, কিন্তু দাড়ির সাইজ গুঁড়ি গুঁড়ি, সে সহানুভূতির গলায় বলল, এইসব নিয়া মন খারাপ কইরেন না ভাই। যান গিয়া।

মধ্য বয়সী কেরানি টাইপের একজন বলল, আপনের কপাল ভাল মাইর-ধইর খান নাই। পঞ্চাশ-একশো টাকার জন্য আইজ-কাইল মানুষ খুন হইয়া যায়। একটা সোনার চেনের জইন্য ভিকারুননেসা ইস্কুলের সামনে এক মহিলাকে ছিনতাইকারীরা গুল্লি কইরা মাইরা ফালাইছিলো। রাস্তাঘাটে বহুত মানুষজন ছিল, কেউ কিছু কইতে সাহস পায় নাই।

আরেকজন বলল, ক্যান কইব কন? জানের দাম আছে না? নিজের জানের রিস্ক কে নিবো?

এসব শুনে লালুবাবু একেবারে হতভম্ব হয়ে গেলেন। বলে কী! দেশে আইন-কানুন নেই? পুলিশ কিছু করে না?

 কেউ কোনও কথা বলবার আগেই চানমিয়া বলল, এইসব প্যাচাইল বাদ দেন। লন আপনেরে হইটালে দিয়াহি।

তারপর কোনও কথা না বলে হঠাৎ করেই যেন রিকশাটা চালাতে শুরু করল। গতিও আগের চে’ অনেক বেশি। যেন যত দ্রুত সম্ভব জায়গাটা সে পেরিয়ে যেতে চায়।

লালুবাবু বললেন, কী গো, তুমি হঠাৎ এমন তাড়াহুড়ো লাগালে কেন?

রিকশায় ওঠার কিছুক্ষণ পর থেকেই চানমিয়ার সঙ্গে বিক্রমপুরের ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছিলেন লালুবাবু, এখন আর সে-কথা মনে নেই তাঁর। কথায় পশ্চিমবঙ্গের টান এবং শব্দ-টব্দ এসে যাচ্ছে।

চানমিয়া ওসব খেয়াল করল না। বলল, জাগাডা ভাল না। এহেনে বেশিক্ষণ থাকন ঠিক হইব না।

ঠিক হবে না মানে কী হবে? ওরা কি আবার আসবে?

না, অরা আর আইব না, অগ মতন অন্য আরেক দল আইতে পারে।

বলো কী?

হ। তয় ঢাকার টাউনের সব জাগার অবস্থাই এই রকম। নিরাপদ জাগা বলতে ঢাকার টাউনে আর কিছু নাই। সব জাগায়ই এই হগল ঘটতাছে। মাস্তান-চান্দাবাজ-ছিনতাইকারী-হিরনচি আর ডাইলখোড়ে দ্যাশটা ভইরা গেছে।

হিরনচি আর ডাইলখোড় শব্দ দুটোর মানে বুঝলেন না লালুবাবু। একটা একটা করে শব্দ দুটোর মানে জানতে চাইলেন। হিরনচি কথাটাতো আগে কোনও দিন শুনিনি। অর্থ কী কথাটার?

হিরোইন চিনেন, হিরোইন?

তা চিনব না কেন? নেশার দ্রব্য। ড্রাগ।

হ। ওই হিরোইন যারা খায় তাগ কয় হিরনচি। মদ খাইলে যেমুন হয় মাতাল, গাঞ্জা খাইলে গাঞ্জুট্টি, হিরোইন খাইলে হয় হিরনচি।

গাঁজাখোড়ের ভাল বাংলা গেঁজেল কিন্তু চানমিয়া বলছে গাঞ্জুট্টি। গাঁজাকে বলছে গাঞ্জা। এইসব শব্দ আগে কোনও দিন শোনেননি লালুবাবু। বেশ লাগছে শুনতে। বাংলাদেশে বহু নতুন নতুন শব্দ তৈরি হয়েছে, বহু নতুন নতুন কাণ্ড হচ্ছে। আজ সকালে এভাবে না বেরুলে বহুকাল আগে ফেলে যাওয়া নিজের দেশটির এই চেহারার সঙ্গে হয়তো পরিচয়ই ঘটতো না তাঁর। যদিও এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত পীড়াদায়ক এবং অপমানকর, যতদিন বেঁচে থাকবেন এই অভিজ্ঞতা মন থেকে মুছবে না, তবুও অভিজ্ঞতা অভিজ্ঞতাই। অভিজ্ঞ মানুষরাই খাঁটি মানুষ।

লালুবাবু বললেন, আর ওই যে ডাইলখোড় না কী যেন বললে, ওটা কী?

চানমিয়া অবাক হলো। আপনে জানেন না?

আরে জানলে তোমাকে জিজ্ঞেস করব কেন?

আপনে কইলকাত্তাইয়া মানুষ, আপনের তো জাননের কথা।

চানমিয়ার কাছে ইন্ডিয়া মানেই কলকাতা। কিন্তু কলকাতার মানুষরাই কি জানে ডাইলখোড় জিনিসটা কী? শব্দটা পরিচিত হলে নিশ্চয় লালুবাবুর কানে আসত।

চানমিয়া বলল, আমগ দ্যাশে ফেনসিডিলরে পোলাপানে আদর কইরা নাম দিছে ডাইল। যারা ফেনসিডিল খায় তাগ কয় ডাইলখোড়।

তার মানে ওটাও নেশার দ্রব্য।

হ। বেবাকতেই খায় আইজকাইল। আমগ লাহান রিশকাআলা, রাস্তাঘাটের ফকির-ফাকরা, টোকাই থিকা শুরু কইরা বড়লোকের পোলাপান, ইসকুল-কলেজ, ইনভারসিটির ছাত্ররা, কে না খায় কন? বেবাক বয়সের মাইনষেই আইজকাইল ফেনসির নিশা করে। সোন্দর সোন্দর মাইয়াডিও খায়। ঢাকার অল্লিগল্লি বেবাক জাগায়ই হিরোইন, ফেনসি এই হগল পাওয়া যায়।

বুঝলাম। কিন্তু তুমি যে বললে কলকাতার লোকদের ফেনসিডিলের কথা জানার কথা, মানে কী গো কথাটার?

আরে ওই জিনিস তো কইলকাত্তা থিকাই আহে। বডার দিয়া কুটি কুটি টেকার ফেনসিডিল আহে। আমি লেখাপড়া জানি না, রিশকা চালাই, তয় দ্যাশের খবর বেবাকই রাখি। কোন কোন জাগায় ওই হগল বেচাকিনি হয়  তা-ও জানি। রিশকাঅলারা হইল সাংবাদিকের লাহান, দ্যাশের বেবাক খবর তাগ কানে আহে।

লালুবাবু টের পেলেন চানমিয়ার সঙ্গে কথা বলতে বলতে ছিনতাইয়ের ধকলটা যেন একটু একটু কমে আসছে। ভেতরে ভেতরে যেন স্বাভাবিক হয়ে উঠছেন তিনি। অপমানবোধটাও যেন আগের মতো নেই। এভাবে গল্পগুজব করতে থাকলে দুটো কাজ হবে। এক, মনের ভেতরকার চাপটা কমে আসবে। দুই, বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থার অনেক কিছুই জানা হবে।

কিন্তু রোদটা এখনও উঠছে না কেন? বেলা তো কম হলো না। বাজে কটা?

ইস! ঘড়িটা হাতে থাকলে টাইম দেখা যেত। যদিও বাংলাদেশে এসে টাইম অ্যাডজাস্ট করা হয়নি, ইন্ডিয়ান টাইমটাই রয়ে গেছে। সেই টাইমের সঙ্গে আধ ঘণ্টা যোগ করে নিলেই হতো।

লালুবাবু আকাশের দিকে তাকালেন। কী রকম ধোঁয়ার মতো কুয়াশা জমে আছে চারদিকে। আকাশটা ঘোলা। কুয়াশার জন্যই বোধহয় সূর্যের আলো পৌঁছাতে পারছে না। পচা নাশপাতির মতো হয়ে আছে চারদিক। তবে আটটার কাছাকাছি যে বাজে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।

চানমিয়া বলল, ফেনসিডিল আছিল সর্দি-কাশির অষইদ। এক শিশির দাম আছিল পাশশিকা। হেই জিনিসের দাম অহন শয়ের উপরে। খাইতে খাইতে দ্যাশের বেবাক পোলাপান নষ্ট হইতাছে। যেই ফিমিলির একজনে ফেনসি ধরে, হেই ফিমিলির বারোটা বাইজ্জা যায়। দ্যাশের মইদ্যে চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই-মিনতাই বেবাকই তো হইতাছে এর লেইগা। ওই পোলা তিনডার চেহারা দেকলেন না! ওইডি তো হিরনচি আর নাইলে ডাইলখোড়।

লালুবাবুর মনে পড়ল, হ্যাঁ, ছেলেগুলোর শরীর-চেহারা তো স্বাভাবিক ছিল না। চোখ ঢুলুঢুলু, চিমসে ধরনের ভাঙাচোরা মুখ, হাত-পা লিকলিকে। তার মানে নেশা করে শেষ হয়ে গেছে তারা। নেশার খরচ জোটাতে ওইসব অপকর্ম করছে! আহা রে! নিশ্চয় ভালঘরের ছেলেপান। নেশার চক্করে পড়ে বখে গেছে, ভদ্রভাষা ভুলে রাস্তাঘাটের অশ্লীল ভাষা ধরেছে।

ছেলেগুলোর জন্য এখন কেমন যেন একটু একটু মায়া হতে লাগল লালুবাবুর। তার মানে ওরা তো স্বাভাবিক মানুষ না। নেশাগ্রস্ত মানুষের দোষ ধরে লাভ কী! না হয় তাঁর এক হাজার টাকা আর ঘড়িটা নিছে। নিক, কী আর করা।

চানমিয়া বলল, এই নিশা যে কী, চোক্কে না দেখলে কেউ বুজব না। টাইম মতন হিরোইন না খাইতে পারলে, ফেনসি না খাইতে পারলে শইল বলে কাঁপতে থাকে, গলা হুকাইয়া যায়, চিক্কর পাইড়া কান্দে হিরনচিরা, মাটিতে পইড়া জব করা মুরগির লাহান দাপড়ায়। বাপের মানিব্যাগ মাইরা দেয়, বাজারের টেকা লইয়া পলাই যায়গা। কত ভদ্রলোকের পোলাপান ছোটখাট জিনিস চুরি কইরা ধরা পড়ে, ভাইরে ছুরি মাইরা দেয়, কত কিছু যে করে! দ্যাশটা শ্যাষ হইয়া গেল এই হগল কারণে। আর এর লেইগা আপনেরা দায়ী।

লালুবাবু চমকালো। আমরা দায়ী মানে? কী বলছ তুমি?

ঠিকই কইতাছি। আপনেরা দায়ী মানি কইলকাত্তার মানুষরা, ভারতদেশের মানুষরা দায়ী। তারা ফেনসিডিল বানাইয়া নিজেরা খায় না, বাংলাদেশে পাডাইয়া দেয়। নিজেগ বিজনিসটা হইল। আর এই দেশের পোলাপানডি যেসব শেষ হইয়া গেল হেইডা লইয়া তাগ কোনও চিন্তা নাই।

চানমিয়ার কথা শুনে দুঃখিত হলেন লালুবাবু। ইন্ডিয়া থেকে যে ফেনসিডিল আসে বাংলাদেশে, বাংলাদেশের এই ক্ষতি যে হচ্ছে এসব কিছুই জানতেন না তিনি। যদি সত্যি এরকম হয় তাহলে সেটা তো বড় অন্যায় কথা। নেশার দ্রব্য বেচে একটি দেশকে ধ্বংস করে দেয়া, না-না সেটা তো ঠিক না।

রিকশা তখন পুরানা পল্টন এলাকায় ঢুকেছে।

লালুবাবু জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় এলে?

আপনের হইটালের সামনে।

এখন কটা বাজে বলতে পার?

আটটার মতন হইব।

তার মানে জয়িতা এখনও ওঠেনি।

কী কইলেন?

লালুবাবু লজ্জা পেলেন। জয়িতাকে চানমিয়া চিনবে কী করে? সে উঠেছে কী উঠেনি তাতে তার কী!

কথা ঘোরালেন লালুবাবু। তোমার তো বোধহয় দু’ ঘণ্টার বেশি হয়ে গেছে।

হ, বেশি হইছে।

কিন্তু এখনই হোটেলে গিয়ে লাভ নেই।

ক্যান?

এখন গেলে তোমার টাকা দিতে পারব না।

চানমিয়া আবার বলল, ক্যান?

বাংলাদেশী টাকা আমার কাছে আর নেই। নাতনির কাছে ডলার আছে। ডলার ভাঙিয়ে দিতে হবে।

দিবেন। ডলার ভাঙান তো কোনও কঠিন কাম না। হইটালেই ভাঙাইতে পারবেন।

তা জানি। তবে মুশকিলটা হলো জয়িতা। মানে আমার নাতনিটা। ও তো এখনও ঘুম থেকেই ওঠেনি। নটা সাড়ে নটার আগে উঠবে না।

তাতেও অসুবিধা নাই। হইটালের ক্যাশ থিকা টেকা লইয়া আপনে আমারে দিয়া দিবেন। আপনে হইটালে থাকেন। চাইলে টেকা তারা আপনেরে দিব।

তা জানি। তারপরও আমি এখন হোটেলে ফিরতে চাচ্ছি না।

তয় যাইবেন কই?

তোমাকে নিয়ে আরও ঘণ্টা দুয়েক ঘুরব। তোমার যেখানে যেখানে ইচ্ছে হয় নিয়ে যাও আমাকে। ঢাকা শহরটা দেখাও হলো, তোমার সঙ্গে গল্প করাও হলো। দেশের অনেক খবর রাখো তুমি। তোমার সঙ্গে গল্প করতে আমার ভাল লাগছে। তবে ভাড়ার টাকা নিয়ে তুমি কোনও চিন্তা করো না। চার-পাঁচ ঘণ্টায় যতো ভাড়া হয় তোমার সব তো দেবোই, বখশিশও দেবো। বুজদে পারছ?

চানমিয়া মাথা নাড়ল। পারুম না ক্যান, পারছি।

তারপর রিকশা ঘুরাল।

কিন্তু আচমকা এই সিদ্ধান্তটা লালুবাবু কেন নিলেন তিনি নিজে তা জানেন না। তবে সিদ্ধান্তটা নেয়ার পর তাঁর কেমন যেন ফুর্তি লাগছে। অত ভোরবেলা ঘুম ভেঙেছে, এতক্ষণে খিদে লাগার কথা, কালনার বাড়িতে সকালবেলার নাশতা আরও আগে দিয়ে দেয় রমা। এতক্ষণে নাশতা সেরে চা-ও খাওয়া হয়ে যেত লালুবাবুর। অথচ আজ খিদেই লাগছে না, নাশতা খাওয়ার কথা মনেই হচ্ছে না। এত কিছু ঘটে গেল তারপরও যেন কীরকম একটা ঘোরমতো লাগছে। চানমিয়া যা বলল তাতে রাস্তাঘাটে এভাবে ঘুরে বেড়ালে যখন-তখন আরও বিপদ ঘটতে পারে। ওরকম নেশাখোড় ছিনতাইকারীর পাল্লায় আবার পড়তে পারেন।

পড়লে কী হবে। টাকা-পয়সা তো তাঁর কাছে আর কিচ্ছু নেই। শুধুমাত্র দশ-বারোটি ওই ইন্ডিয়ান টাকা। ওটুকু যদি কেউ নিতে চায় নিয়ে নেবে।

আর একটা প্রশ্ন এ সময় মাথায় এলো লালুবাবুর। ধরা যাক ছিনতাইকারীরা লালুবাবুকে আজ যেভাবে ধরেছিল এভাবে ধরল কাউকে। কিন্তু তার কাছে কিচ্ছু নেই। টাকা-পয়সা কিছুই পাওয়া গেল না, তখন ছিনতাইকারীদের আচরণ কী রকম হয়?

প্রশ্নটা চানমিয়াকে করলেন তিনি।

চানমিয়া বলল, অমুন হইলেও বিপদ আছে। কিছু না পাইলে তারা চেইত্যা যায়। ছুরি-মুরি মাইরা দেয়। গুল্লিও করতে পারে।

বলো কী?

হ। এমুন কত হয়।

আশ্চর্য ব্যাপার লালুবাবু তারপরও ভয় পেলেন না। কুয়াশায় সাদা হয়ে থাকা সকাল আটটা-সাড়ে আটটার ঢাকা শহরে চানমিয়ার রিকশায় বেড়াতে অসাধারণ এক আনন্দ হচ্ছে তাঁর।

শোন চানমিয়া। তোমাকে দুয়েকখানা কথা জিজ্ঞেস করব?

করেন। কথা জিগাইতে অসুবিধা কী?

তুমি নেশা-টেশা করো না?

কীয়ের নিশা? মদ-গাঞ্জার না-কি হিরোইন-ডাইল? কোনডার কথা জিগান?

না, তুমি যে বললে অনেক রিকশাঅলাও…

হ, অনেক হিরনচি রিশকাঅলা আছে। তয় আমি হেইপদের না।

তার মানে কোনও নেশাই নেই তোমার?

থাকবো না ক্যান, আছে। বিড়ি-সিগ্রেটের নিশা আছে। আমি সিগ্রেট খাই।

কই, এতোক্ষণে তো একটাও খেতে দেখলাম না।

কেমতে দেখবেন? সিগ্রেট খাওনের টাইম পাইলাম কই? আপনেরে লইয়া তো খালি চক্কর মারতাছি।

রিকশা চালাতে চালাতে খাওয়া যায় না?

যাইবো না ক্যান? অনেক রিশকাঅলাই রিশকা চালাইতে চালাইতে ফুক ফুক কইরা সিগ্রেট টানে। আমি ওই কাম করি না। পিসিঞ্জার রিশকায় থাকা অবস্থায় বিড়ি-সিগ্রেট আমি খাই না। অনেক পিসিঞ্জার পছন্দ করে না। আর এমুন কষ্টের কাম করতে করতে সিগ্রেট টানন ভাল না। দম ফুরাইয়া যায়, বুক বেদনা করে। পিসিঞ্জার নামাইয়া আরাম কইরা বইয়া এককাপ চা খাই আমি। তার বাদে সিগ্রেট ধরাই।

রিকশা তখন রমনা থানার পাশ দিয়ে যাচ্ছে।

থানার সাইনবোর্ড দেখে ছিনতাইয়ের ঘটনাটা মনে পড়ল লালুবাবুর। এই ধরনের কাণ্ড ঘটলে থানায় জানানো নাগরিক-কর্তব্য। যদিও তিনি বাংলাদেশের নাগরিক নন তবুও তাঁর উচিত থানায় জানানো। হয়তো থানার সাইনবোর্ড না দেখলে কথাটা মনেই আসত না। এখন হাতের কাছে থানা যখন একটা পাওয়াই গেছে, জানাতে অসুবিধা কী? হয়তো কাজের কাজ কিছুই হবে না, তবু। আর যদি সামান্য কাজও হয় অসুবিধা কী? ওরকম নেশাখোড় ছিনতাইকারী যদি একটাও ধরা পড়ে, একটারও যদি জেল-হাজত হয় তাহলে তো সে বেঁচে গেল। জেল-হাজতে তো আর হিরোইন-ফেনসিডিল পাওয়া যাবে না। নেশা করা যাবে না। নেশার ছোবলে তিলে তিলে না মরে, সমাজ-সংসার না বিষিয়ে জেলে থাকা অনেক ভাল। নিজেও বাঁচলো, সমাজ-সংসারও বাঁচলো।

লালুবাবু বললেন, চানমিয়া, রিকশা থানায় ঢুকাও।

চানমিয়া থতমত খেয়ে লালুবাবুর দিকে মুখ ফেরালো। কী কইলেন? থানায় ঢুকামু ক্যান? থানায় কী কাম?

আছে, কাজ আছে।

কন আমারে কী কাম?

রিপোর্ট লেখাবো। ওই যে ঘটনাটা ঘটলো, ওর রিপোর্ট লেখাবো।

ওইসব রিপোট-মিপোট লেইখা কোনও কাম হইব না। পুলিশ কিছু করে না।

এবার লালুবাবু একটু বিরক্ত হলেন। ওরা কিছু না করলে না করবে, আমি আমার কাজটা করব। তুমি রিকশা ঢুকাও।

খুবই বিরক্ত হয়ে রিকশা থানা কম্পাউন্ডে ঢুকাল চানমিয়া।

লালুবাবু রিকশা থেকে নামলেন। তুমি এখানেই বসবে, আমি কাজটা সেরে আসি।

চানমিয়া মুখটা মরা কাতলা মাছের মতো করে রাখল। লালুবাবু ভেতরে ঢুকে গেলেন।

অল্প বয়েসী ফুটফুটে চেহারার একজন পুলিশ অফিসার নিজের টেবিলে চায়ে টোস্ট বিস্কুট ভিজিয়ে ভিজিয়ে খাচ্ছেন। তাঁর সামনে পিরিচে আরও দু-তিনটি টোস্ট বিস্কুট আর পিরিচ দিয়ে আরেক কাপ চা। খুবই মন দিয়ে খাওয়ার কাজটা সারছিলেন তিনি। লালুবাবু সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন তিনি, বিনয়ে একেবারে গলে গেলেন। আদাব স্যার, আদাব। আপনি হঠাৎ আমার কাছে? বসুন, বসুন।

লালুবাবু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। থানার দারোগা তাঁকে চিনছেন কেমন করে? তিনি দেশে ফিরেছেন ছেচল্লিশ বছর পর। এই দারোগার বয়সই তো ছেচল্লিশ হবে না। বড়জোর পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ। তাহলে?

[চলবে]।