মহিষীর ব্যক্তিত্ব নিয়েই জীবন থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়েছেন ফ্রঁসোয়াজ জিরু। ৮৬ বছর বয়সে গতবছর ১৯শে জানুয়ারি। সাংবাদিক, সাহিত্যিক, চলচ্চিত্রকর্মী, রাজনীতিবিদ, নারীবাদী – কর্মে ও মেধার সর্বায়তনিক-বিস্তারে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমি। মানুষের মানবিক অধিকার-হননের বিরুদ্ধে যেমন ছিলেন সোচ্চার, তেমনি কেবল নারীর অধিকার ও স্বীকৃতির প্রশ্নে সমাজের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়েছেন। আর তাঁর উপন্যাসসহ বিভিন্ন রচনাবলি ছিল ব্যক্তিসত্তার মনন ও রাজনৈতিক বীক্ষণের অনন্যসাধারণতা প্রকাশের ভিন্ন মাধ্যম মাত্র।
ফ্রঁসোয়াজের শিরায় ছিল প্রায় শতাব্দীর সমান স্মৃতি। জন্ম ১৯১৬ সালে জেনেভায়, আধারুশ-আধাতুর্কি পরিবারে। বাবা সালি জুরজি আর মা এলডা ফ্রাজির দ্বিতীয় কন্যা। বাবার জন্ম বাগদাদে, পড়াশোনা করেছিলেন আইন-বিষয়ে প্যারিসে। সেখানেই তরুণ তুর্কিদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন। পরে বিয়ে করেন তুর্কি সেনাবাহিনীর চিকিৎসক কর্নেলের আকর্ষণীয়া কন্যাকে। পেশায় সাংবাদিক ফ্রঁসোয়াজের বাবা সৃষ্টি করেছিলেন জেনেভার টেলিগ্রাফিক অটোম্যান এজেন্সি এবং তিনি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ছিলেন। বাবার সম্পর্ক ছিল মিত্রবাহিনীর সঙ্গে, আর জার্মানদের পক্ষে কাজ করতে অস্বীকার করেন বলে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে। পরে মাত্র সাত বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে এক জটিল সংগ্রামমুখর শৈশব-কৈশোর অতিক্রমণের পর সত্তার কেন্দ্রস্থলে আবিষ্কার করেছেন নারীর অস্তিত্বকে। রাজনৈতিক ও সামাজিক সমসাময়িক নানা আন্দোলনের ভিড়ে প্রোথিত হয়েছে আত্মসচেতনতার বীজ, ক্রমশ পরিণত হয়েছে ব্যক্তিসত্তার ভিত। কৈশোরের অনিশ্চিত সংকটময় পরিস্থিতির কথা মনে করে বলেছেন, ‘যখন ছোট ছিলাম, ক্লাসের বন্ধুদেরকে তাদের মায়েরা আমার বাসায় আসতে নিষেধ করতেন। কারণ আমি ছিলাম একজন রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীর মেয়ে, সুতরাং বিদেশী। ফরাসিরা বিদেশীদের পছন্দ করত না। পছন্দ করত না প্রথমদেরকে। আমার মা ফ্রান্সকে খুব পছন্দ করতেন এবং তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন পছন্দ করতে। আমি প্রবলভাবে চাইতাম এদেশের সংস্কৃতি, তার ইতিহাস ও সৌন্দর্যকে মানিয়ে নিতে। কিন্তু আমি কখনোই চাইতাম না এর ভেতরে সম্পৃক্ত হতে, মিশে যেতে, যাকে আমরা বলতাম ভালো সমাজ; কারণ আমি দেখেছি, সে-সমাজ ছিল আমার মায়ের প্রতি রূঢ়, ঔদ্ধত্যপূর্ণ, যা বেদনাদায়ক। এ-বিষয়গুলো ভুলব না। যদি সম্মানের কথা চিন্তা করতাম তবে চলচ্চিত্র দিয়ে শুরু করতে পারতাম না। জগৎটা ছিল অদ্ভুত, মজার, সৃষ্টিশীল, পুরোপুরি চেনা-সমাজের বাইরে। এ-জায়গাটা আমার নিজের মনে হতো না। কারণ হয়তো আমার কোনো স্থানই ছিল না।
শিক্ষানবিশকালের এই বছরগুলোতে আমি কিছু বিষয় শিখেছি – তা হলো পৃথিবীটা দুটো ভাগে বিভক্ত, নিয়ন্ত্রক এবং নিয়ন্ত্রিত। একমাত্র নিয়ন্ত্রকরাই পারে নিশ্বাস নিতে।’
পরবর্তীকালে নিজের স্থান নিয়ন্ত্রকদের সারিতে থাকলেও সবকিছু ছিল সমান, বলেছেন তিনি। কারণ তখন দুটো পত্রিকা চালাতেন। প্রথমটি এল (Elle), এ-পত্রিকায় নারীর স্পিরিট আর অনুসন্ধানী মানসের আন্তরিক তাগিদে লিখতে পেরেছেন অনায়াসে – পুরুষরা হলো মহিলাদের প্রভু, প্রভুদের পদানত কর …।
বেঁচে থাকার তাগিদে সেই বিপন্ন কৈশোরেই মনে হয়েছিল আমিত্ব প্রতিষ্ঠিত করার একটি মাত্র উপায় কাজ করা। পরে বলেছেনও, ‘সে-সময় আমি এত স্থির, দৃঢ়চিত্তে কিছুই চাইনি, একটা কাজ ছাড়া। চৌদ্দবছর পার হতেই বুঝেছি মাকে বাড়িতে থাকতে হবে এবং আমাকে কাজে যেতে হবে। আমি টাইপ করা শিখতে শুরু করি।’ পরে পারিবারিক বন্ধু মার্ক আলগ্রের বইয়ের দোকানে একটি কাজ পান। তবে প্রকৃত অর্থে পেশাগত জীবন শুরু করেন ষোলো বছর বয়সে মার্ক আলগ্রেরই চল”ি”ত্রের স্ক্রিপ্ট লেখার কাজ দিয়ে। ১৯৩২ সালে মার্শেল পানিওলের কাহিনী ফানি (Fanû) ছবির মধ্য দিয়ে। চার বছর পর ১৯৩৬ সালে জঁ রনোয়ার সঙ্গে কাজ করেন সহকারীরূপে লা গ্রঁন্দ ইলিশিওতে (La Grande Illusion)। চলচ্চিত্রের প্রতি ছিল অসীম আগ্রহ আর ভালোবাসা। ওই তরুণী বয়সে জঁ রনোয়া তাঁকে কীভাবে শেখাতেন সে-প্রসঙ্গে স্মৃতিচারণ : ‘লোকের কাছ থেকে নিজের জন্য ভালো কাজ পাওয়ার শ্রেষ্ঠ পন্থা হলো – কানদুটোকে সজাগ রাখা। তাঁদের মনে কী আছে তা জানার জন্য।’আর বিখ্যাত অভিনেতা লুই জুভের কাছে শিখেছিলেন – ‘সবচাইতে মহৎ আভিজাত্য হলো বড় কিছুর মতোই ক্ষুদ্র কিছু সহজভাবে গ্রহণের সামর্থ্য, কোনো দৃশ্যের অবতারণা না করে।’
চলচ্চিত্রে রনোয়ার সহকারীরূপে কাজ করেছেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর্বেই। তখন স্টুডিও-গুলো বেশির ভাগ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে কর্মসংস্থান, অর্থ-উপার্জনের নিমিত্তে ছোটগল্প লেখা শুরু করেন। মুক্তাঞ্চল লিওতে পারি-ছোঁয়া-র (Pario-Soir) অফিস স্থানান্তরিত হয়েছে। ফ্রঁসোয়াজ তখন ওই পত্রিকার পরিচালক হার্ভে মিলের কাছে যান। আর মিলেই তাঁকে কাজের সুযোগ করে দেন। এভাবে যুদ্ধশুরুর প্রথম দিকেই সাংবাদিকতায় প্রবেশ। অনেক পরে বর্তমানে বিখ্যাত পারি-ম্যাচ (Pario-Match) পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতাদের একজন এই হার্ভে মিলেই এল (Elle) পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা হেলেন লাজারেফের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন ফ্রঁসোয়াজকে। আর হেলেন অসুস্থ হয়ে পড়লে মাত্র তিরিশ বছর বয়সেই এল পত্রিকার পুরো দায়িত্বভার গ্রহণ করেন তিনি। ১৯৪৫ থেকে ১৯৫৩ পর্যন্ত এই পত্রিকার পরিচালক-সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পর জঁ-জ্যাক সারভোঁ-স্রেব্যের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন লে’ক্সপ্রেস (L Express) পত্রিকা। জঁ-জ্যাক তখন ছিলেন পারি-প্রেসের (Pario-press) বৈদেশিক শাখার প্রধান এবং একজন পলিটেকনিশিয়ান।
আসলেই তিনি তাঁর সময়ের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন – মননে-মেজাজে ও জীবনধারায়, যার কর্মে আন্তরিক তাগিদের সুরে বেজেছে নারীর অস্তিবাদী চেতনা। মুক্ত কণ্ঠস্বর সর্বব্যাপ্ত তাঁর কর্মে, শীলনে, রচিত বইয়ের পৃষ্ঠায়। জিরু (Giroud) তাঁর প্রকৃত নাম নয়। ইউরোপে যখন স্বীয় কাজে প্রতিষ্ঠা এবং সুনাম অর্জন করতে থাকেন, তখন পদবি পরিবর্তন করে নামটি রাখেন। চৌদ্দতে টাইপিস্টের কাজ, আটাশ বছরে প্রতিরোধ-আন্দোলনে যোগদান এবং জার্মান গেস্টাপো-কর্তৃক গ্রেফতার (১৯৪৩), ত্রিশ বছর বয়সে এল পত্রিকার সম্পাদক আর সাঁইত্রিশ বছরে লে’ক্সপ্রেস (LÕ (Express) পত্রিকার পরিচালনা – এ-সবই আমিত্ব প্রতিষ্ঠিত করার স্পৃহার গহ্বর থেকে সূচিত, যা ছিল একদিকে তাঁর সংগ্রাম ও আত্মপ্রত্যয়, আর মুক্ত নারীর পালিত অহংকারের অংশ।
সাংবাদিকতা, সাহিত্যচর্চা, রাজনীতি, মন্ত্রিত্ব থেকে নারীবাদের স্পষ্ট বক্তা – বিচরণের পরিধিবিস্তারে বাধা ঠেলে উজিয়ে গেছেন। প্রার্থিত স্বপ্নের কিনারে দাঁড়িয়ে আপোস করেননি। পৃথিবী ক্রমশ সভ্য হচ্ছে, তবু মানুষের তৈরি সমাজ আর সে-সমাজে বিপর্যস্ত নারীর অধিকার, বঞ্চিত সত্তা, নানা ত্রুটি, চূড়ান্ত বৈসাদৃশ্যগুলো দেখিয়েছেন। বিশ্বাস করতেন স্বাধীনতায়। তাই স্বাধীনতা বা মুক্তচেতনা ছিল তাঁর সংজ্ঞায় – স্বাধীনতা প্রথম আসে মন থেকে। নারী-পুরুষ সবার ক্ষেত্রে মুক্ত মানসিকতা থেকেই স্বাধীনতার জন্ম, ফ্রঁসোয়াজও মুক্তমানবী ছিলেন বলেই তাঁর কলম ছিল বরাবর স্ববশে। এমন নয় যে, খুব চিৎকার করে সমাজকে জানাচ্ছেন। কিন্তু প্রতিবাদের ক্ষেত্রে লেখনীর, যুক্তির জোরটা তীব্র, আন্তরিক ছিল। তাঁর চরিত্রে প্রতিবাদের দাবদাহ যেমন ছিল, তেমনি ছিল মোহনীয় নারীর স্নিগ্ধতা, সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব। তাই রাজনীতির অন্তর্নিহিত সত্য দল, ক্ষমতা কিংবা সামাজিক ব্যাধির প্রতিরোধে বিকল্প ধারার কথাও চিন্তা করেছেন। ১৯৭৪ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পূর্বে এক গোলটেবিল বৈঠকে রাষ্ট্রপতি-পদপ্রার্থী ভ্যালেরি জিসকার দেঁস্তার কাছে সৌজন্যময় উচ্চারণে জানতে চেয়েছিলেন – একটি মেত্রো (পাতালরেল) টিকেটের মূল্য কত? বলাই বাহুল্য, জিসকার দেঁস্তা বিষয়টি অবজ্ঞা করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে বিজয়লাভ করে রাষ্ট্রপতি হবার পর তিনি লিঁজে প্রাসাদে ডেকে পাঠান ফ্রঁসোয়াজকে। অপ্রত্যাশিত হলেও সত্য, তিনি বামদলের এই ব্যক্তিত্বকে আমন্ত্রণ জানান মন্ত্রিসভার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগদানের জন্য। উল্লেখ্য, দেঁস্তা তখন ফরাসি দেশে গর্ভপাত-বৈধকরণ আইন করতে যাচ্ছিলেন। আর এক্ষেত্রে ফ্রঁসোয়াজকে উপযুক্ত, যথার্থ ব্যক্তি ভেবেছিলেন। ১৯৭৪ থেকে ৭৬ পর্যন্ত তিনি জ্যাক শিরাকের মন্ত্রিসভার মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, ১৯৭৬-৭৭ সালে র্যামোব্যার অধীনে সংস্কৃতিমন্ত্রী হয়েছিলেন। ছিলেন ‘একশিঁও আনতারনাশিওনাল কনত্রে ল ফা’-র (action international contre le faim) প্রেসিডেন্ট ১৯৮৪-৮৮ অবধি। দায়িত্বপালন করেছেন (১৯৮৯-৯১) ‘কমিশন টু ইমপ্রুভ সিনেমা টিকেট সেলসে’র (Commission to improve cinema-ticket sales) প্রেসিডেন্ট পদে। দলীয় সতীর্থদের উষ্মা, সমালোচনা, এমনকি কন্যা ক্যারোলিনের ক্রোধকে উপেক্ষা করে তিনি মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। দেঁস্তার সহযোগিতা মনে রেখেছেন সবসময়ে। ফ্রঁসোয়াজের মনে হয়েছে, তিনি ছিলেন প্রথম রাজনৈতিক ব্যক্তি, যিনি বুঝতে পেরেছিলেন, নারীদের বিপ্লব চলছে। রাষ্ট্রের কাছেও যখন নারী দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক, তখন তিনি অধিকার-আদায়ে নিজস্ব রাজনৈতিক মূল্যবোধ ও আদর্শের পাশে দ্বিতীয় লিঙ্গের তাবৎ মানবীয় শর্তকে গুরুত্বপূর্ণ বলে ভেবেছেন। একইভাবে মন্ত্রিপদ থেকে পুনরায় লে’ক্সপ্রেস পত্রিকায় ফিরে এলে বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছিল। সমালোচিত হয়েছিলেন জঁ পল সার্ত্রের অন্তরঙ্গ সুহৃদ রেমো আঁরো প্রমুখদের দ্বারা। কিন্তু বিরোধিতার বাধা ঠেলে জীবনের দ্বিতীয় ভালোবাসা সাংবাদিকতায় ফিরে এসেছেন। তাঁর অবসেশন-প্যাশন সবই ছিল নারীর যন্ত্রণা আর সংকটকে ঘিরে। তাঁকে ডাকাও হতো ‘জান দ্য আর্ক’ (Jeanne d’Arc), যিনি দ্বিতীয় লিঙ্গের মুক্তিচেতনার প্রতীক।
স্বভাবের অমর্ত্য শৃঙ্খল আর সাহস মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে তাঁকে। আর্থুর উ লো বোনঅর দ্য ভিভ (Arthur ou le bonheur de Vivre) বা আর্তুর অথবা বেঁচে থাকার সুখ রচনায় তাঁর স্থায়ী বিশ্বাসের কিরণ-আলোয় ফ্রঁসোয়াজের স্বগত উম্মুখ উচ্চারণ: ‘…Courage Courage Intellectuel, Courage Physique’-এ এক সিংহ। বাকি যা কিছু সব মাধ্যমিক।
মানুষ, সমাজ, রাজনীতি – যা কিছু পর্যবেক্ষণ করেছেন তা-ই ছিল তাঁর বিস্তৃত চৈতন্যের উপর দাঁড়িয়ে। পারমিতাগুণে খাঁটি মানবী, প্রবল সংস্কৃতমোদী, সৌন্দর্য আর বুদ্ধির যুগলবন্ধনে আকর্ষক ব্যক্তিত্ব। জীবনচর্যার ধারা, বোধের প্রখরতা, আর স্নায়ুর তাপটা ধরা যেত আত্মপ্রকাশের রীতিতে। রচিত গ্রন্থ প্রফেশিও জুরনালিস্টে (Profession journalist) লিখেছেন, ‘সাংবাদিকতা ছিল তাঁর কাছে – জীবনের একটা পথ, প্রায় ধর্মের ভিতর ঢুকে পড়ার মতো…। পৃথিবীর সবচাইতে সুন্দর পেশা।’ তাই নীতি, আদর্শ আর সুস্থ-সৎ সাংবাদিকতার প্রশ্নে ছিলেন আপোসহীন।
ফ্রঁসোয়াজ ছিলেন সময়ানুক্রমে সমস্ত ঘটনার ধারাবিবরণীর উৎস – সশ্রদ্ধ উক্তি বিখ্যাত দার্শনিক ব্যার্নার অঁরি লেভির। তাঁর লেখা একই সঙ্গে তীব্র, যথাযথ এবং মুক্ত। সাংবাদিকতায় লেখনীর এক নতুন শৈলী সৃষ্টি এবং আরোপ করেছিলেন। যেমন উপন্যাসে করেছিলেন সাগাঁ এবং দুরা। জিরু তা করেছিলেন সংবাদপত্রে। ফ্রঁসোয়াজ যদি না থাকতেন তবে ফরাসি-সাংবাদিকতা আজকে যা, নিশ্চিত তা হতো না।
প্যারিসের শাঁজে-লিজের কাছে লে’ক্সপ্রেস পত্রিকার অফিস, গ্যারলাঁর জিকি (Jicï) পারফিউমের সুগন্ধে সুবাসিত হতো একসময়ে। সেই সুগন্ধী জানান দিত প্রতি বৃহস্পতিবার বিশেষভাবে ফ্রঁসোয়াজের উপস্থিতি। নিস্তব্ধ নীরবতায় নিমগ্ন সম্পাদকীয় লেখায়।
পঞ্চাশ-দশকের মাঝামাঝি সময়ে আলজেরিয়ার যুদ্ধ, আধিপত্য, অত্যাচার, ঔপনিবেশিকতার বিলুপ্তির দাবি, আর জেনারেল দ্য গলের ক্ষমতায় ফিরে-আসা – সব মিলে এক ক্রান্তিকালের সংবাদ-পরিবেশনেও L’Express ভূমিকা ছিল আঁভা-গার্দের (Avant-garde)। আলব্যার কামু, সার্ত্রে, মার্লো প্রমুখ বুদ্ধিজীবী, দার্শনিক, লেখকদের রচনায় সমৃদ্ধ পত্রিকাটির প্রচারসংখ্যা সপ্তাহে দাঁড়িয়েছিল ৪০০,০০০ ষাটের দশকে।
চল্লিশোর্ধ সম্পাদক ফ্রঁসোয়াজ দেখতে কেমন ছিলেন? বাদামি, খুবই বাদামি গাত্রবর্ণ, ছোট চুল, কালো উজ্জ্বল চোখ, খুব দীর্ঘাঙ্গী নন; চওড়া কাঁধ, সুন্দর বক্ষযুগল, সরু কোমর… খুবই প্রাচ্য-দেশীয়। কণ্ঠস্বর তরল মধুর মতো – স্মৃতিচারণ ফ্রঁসোয়াজের সহকারী ফ্লোরন্স মার্লো আর কাতরিনের।
লে’ক্সপ্রেস পত্রিকায় আলজেরিয়ার স্বাধীনতার পক্ষে সংবাদ, প্রতিবেদন-প্রকাশের কারণে তৎকালীন সরকার দশবার পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। ফ্রঁসোয়াজের বাড়িতে বোমা বিস্ফোরিত হয়েছে। প্রিয় সহকর্মী, বন্ধু জঁ-জ্যাক সারভোঁকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বাধ্যতামূলকভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য, যাতে করে উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং জ্যাকের অনুপস্থিতিতে তিনি পত্রিকার বিপ্লবী, সাহসী ভূমিকা পালন থেকে বিরত থাকেন। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত সরকারি বিধিনিষেধ, হস্তক্ষেপ-সত্ত্বেও তিনি নীতিতে অটল ছিলেন। সচেতন ছিল তাঁর বিবেক। আবার পারি-ম্যাচ (Pario-Match) পত্রিকা ‘৯৪-তে রাষ্ট্রপতি মিতেরঁর অবৈধ কন্যা মার্জারিন এবং তাঁর জীবনের দ্বিতীয় রমণী-বিষয়ে যখন প্রচ্ছদ-প্রতিবেদন করে, তখনো তিনি সমান প্রতিবাদী। স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, অবিবেচকের মতো এ-জাতীয় সংবাদ-পরিবেশন হলুদ সাংবাদিকতার প্রান্ত ছুঁয়ে যাচ্ছে। সাংবাদিকতার মাঝেই পৃথিবীর হৃদস্পন্দন আছে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। তাঁর মৃত্যুতে নুভেল অবজারভেতর লিখেছিল – এটা খুবই অযৌক্তিক হতো যদি তিনি একুশ শতকের আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতেন। যে-শতাব্দী নারীর – তাঁরই শতাব্দী। তিনি ছিলেন একই সঙ্গে ফেমিনিস্ট এবং ফেমিনিন।
সম্প্রতি ফ্রঁসোয়াজ জিরু-উন আমবিশিও ফ্রঁসেজ নামে একটি বই প্রকাশিত হয়েছে। লেখক প্যারিসের প্রখ্যাত সাংবাদিক ক্রিস্টিন ওক্রেন্তঁ জীবদ্দশায় তাঁর সঙ্গে কথা বলে এক অনন্য ভুবনের ঐশ্বর্য নিরূপণ করেছেন। আর ফ্রঁসোয়াজের ইচ্ছানুযায়ী তাঁর মৃত্যুর পরই বইটি বেরুল। খানিকটা বর্ণনা, কখনো গল্পবলার ভঙ্গিতে, কখনো-বা ফ্রঁসোয়াজের মুখে শোনা বিবৃতি মিলিয়ে; প্রকৃত আত্মকথন নয়। কারণ লেখক জানিয়েছেন, ফ্রঁসোয়াজ-সম্পর্কে জিরু সবই লিখেছেন। বিগত সময় ধরে প্রবন্ধ, প্রতিকৃতি, উপন্যাস, আত্মজীবনী রচনা করে গেছেন তিনি অক্লান্ত পর্যটন ও সুতীক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে। প্রকাশিত বইটিতেও ক্রিস্টিনের লেখায় ফ্রঁসোয়াজের অন্তর্লোকের গভীর বিস্তৃতি ও মনীষার আলো এসে লেগেছে।
সংগ্রাম করে গেছেন জীবনভর। ছিলেন ফরাসিদের তারুণ্য। জিরুই ছিলেন একমাত্র উদাহরণ সংবাদপত্রের শীর্ষপদে যোগ্যতম নারীর। তাঁকে দেখে আলব্যার কামুর মনে হয়েছিল – ‘তাঁর দেখা দক্ষ, মহৎ পেশাজীবীদের একজন। আলাপ ছিল সেই তারুণ্যেই অঁন্দ্রে জিদের সঙ্গে। তিনি ফ্রঁসোয়াজকে শিখিয়েছিলেন ইয়োইয়ো খেলা (সুতোর সঙ্গে একটি প্লাস্টিকের চাকতি বেঁধে উপর-নিচ ঘুরিয়ে খেলা)। সখ্য ছিল আন্তোয়ান দ্য সাঁ এক্সুপেরির সঙ্গে (লিটল প্রিন্স খ্যাত) শিল্প-সাহিত্য, রাজনীতির গুণী ব্যক্তিদের তিনি যেমন জানতেন, তেমনি সেসব বিশিষ্টজনও তাঁকে চিনতেন। সযত্নে লালন করেছেন বর্ণময় জীবনে পরিচিত, ঘনিষ্ঠ অগণিত বিখ্যাত সতীর্থ বন্ধুদের কথা স্মৃতিকথা লো তু পারি (Le tout pario, 1963) এবং নুভো পোত্রে (Novueaxu Portraits, 1954)। আপাত কোনো শত্রু ছিল না, কিন্তু থাকলেও তিনি তাঁদের মানবিক বিষয়গুলোই দেখতেন। বাকি সব গৌণ ছিল। চলচ্চিত্রের বিশেষ অনুরাগী ছিলেন বলেই চলচ্চিত্রের অর্থনীতির পাশে তার নন্দনতাত্ত্বিক আবেদনের নিরিখে লিখেছেন – লা নুভেল ভাগ : পোত্রেত দ্য লা জোনেস (La Novuelle Vague : La Portraits de la Jeunesse, 1958) আর ফরাসি-রাজনীতির অন্তরালের চালচিত্র ফুটে উঠেছে কমেডি দ্যু পুভওয়া (১৯৭৭) বইটিতে। লার্জার দ্যান লাইফ – মানুষ হবে যাপিত জীবনের চেয়ে মহৎ, বড়। সেই আবেগ, বিশ্বাসে ব্যক্তিকে উপস্থিত করেছেন আলমা মালের উ লা আর্ট দ্য’এত্র এইমে (Alma Mahler ou l Art detre aimee, 1988)। শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছেন আরেক বিপ্লবী নারীসত্তাকে জেনি মার্কস উ ল কাম দু ডিআবল (Jenû Marx ou la femme du Diable, 1992) দার্শনিক অঁরি ব্যার্নার লেভির সঙ্গে যৌথভাবে রচিত গ্রন্থ লেজ ওম এলে ফাম (Les hommes et les femmes)।
চলচ্চিত্রের বড়পর্দা থেকে ছোটপর্দা সবক্ষেত্রেই ছিল সমান আগ্রহ। লো বোঁ প্লেজি (Le Bon Plaisir) নিজের লেখা প্রথম উপন্যাস চলচ্চিত্রে রূপ দেন ফ্রঁসোয়াজ। নামভূমিকায় ছিলেন বিখ্যাত অভিনেত্রী কাতরিন দোনভ। টেলিভিশনের জন্য সিরিজ ‘মারি কুরি উন ফাম অনরাবল’ লিখে পুরস্কৃত হয়েছেন তাঁরই লেখা মারিকুরি জীবনীগ্রন্থ-অবলম্বনে।
ইমিগ্রে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন প্রতিরোধ বাহিনীর সদস্য, চলচ্চিত্রকর্মী, সাংবাদিক, মন্ত্রী, নারীবাদী – কর্ম ও ব্যক্তিত্বের সমন্বয়ী বিভায় অনন্য। গোটা জীবনটাই ছিল নিরন্তর অভিজ্ঞতার ফল। শৈশবে দেখেছেন বাবা পুত্রকামনায় ব্যাকুল ছিলেন এবং পরে তাঁর মৃত্যুতে বাল্যের সেই অনিশ্চিত দিনগুলো কেটেছে মহিলা আত্মীয়-পরিজনদের দ্বারা। সে-কারণেই হয়তো নারীদের প্রতি ছিল অগাধ আস্থা, নির্ভরশীলতা। বোনের প্রতি অন্ধ ভালোবাসা, মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলেন প্রেরণা। নিজের মতো ভাববার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। ফেলে-আসা দিনগুলোর স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা এসেছে স্বাভাবিকভাবেই রচিত গ্রন্থে। যে-প্যাশন, জীবনতৃষ্ণা, দায়বদ্ধতা ও শক্তি তাঁর কাজের চরিত্রলক্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল Ñ তার সবটাই ছিল জীবন নিংড়ে পাওয়া।
পরিণত বয়সেও ছিল কর্মস্পৃহা ও তারুণ্যের ঝাঁঝ। ৭৫ বছর বয়সেও কাজ করেছেন অঁরি লেভির সঙ্গে বসনিয়া, আফগানিস্তান, সারাজেভোর বিপন্ন মানুষের জন্য। ৮০-তে পা দিয়েও শারীরিক ক্লান্তি বা অসুস্থতার ছায়া পড়েনি। মৃত্যুর কদিন আগে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করেছেন ফরাসি বিশেষ ডিশের রন্ধনপ্রণালি নিয়ে। ৮৬ বছরের পুরনো হৃৎপিণ্ডে ছিল ব্যাকুল আবেগ। বায়োলজিক্যাল অর্থে প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছেও তিনি ছিলেন পরিপাট্য, শ্রমী এক নারী। স্মৃতিগন্ধময় যৌবন নিয়ে যখন বার্ধক্য এসেছে তখন সচেতন মানবীর মতো ভেবেছেন তাঁর বয়স্ক পা আর হাতে বয়সের ছাপ নিয়ে। মৃত্যুর তিনদিন আগে অপেরা-কমিক দেখে মুগ্ধ হয়েছেন, আলিঙ্গন করেছেন অঁরি লেভিকে। ব্যস্ত ছিলেন সদ্যসমাপ্ত বইটির প্রকাশনা নিয়ে।
লো জুরনাল দ্য দিমোস (Le Journal de dimanch) পত্রিকার সাহিত্য-সমালোচক ছিলেন মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত। সাপ্তাহিক কলাম-লেখক ছিলেন লো নুভেল অবজারভেতর (Le Novuelle Ovservator) পত্রিকার। এই ব্যতিক্রমি নারীসত্তার মৃত্যুর পর লো মঁনদ (খব সড়হফব) তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছিল ‘লা জুরনালিস্ট আবসলিউ’ বা ‘দি অ্যাবসোলিউট জার্নালিস্ট’ বলে।
জীবনে স্বীকৃতি, সম্মান, খেতাব উপলক্ষ করে বলেছেন, ‘সাংবাদিকতায় প্রবেশের পর কাজের স্পৃহাই প্রতিকূলতার সিঁড়ি ভাঙার সুযোগ করে দিয়েছে। আর মেধা ও আত্মবিশ্বাসের কারণে সিঁড়ি ভাঙাটা সহজ হয়েছে।’ নিজের ‘লেঁজিও দ্য অনর’ (Legion d-honneur) খেতাব পাওয়ায় স্বদোক্তি’, ‘আমি জানি না ফ্রঁসোয়া মিতেরঁ কেন আমাকে সম্মানিত করলেন। আমি তাঁকে খুব পছন্দ করি। আজকের কালে যে-ভাবে বলা হয় সে-ভঙ্গিতে বলছি না। কিন্তু আমার অন্তত বলা উচিত।’
জীবনের প্রতিকূলতা, জটিলতাকে উজিয়ে ক্রমশ মোহনামুখী হয়েছেন। কিন্তু তাঁর জীবনে সংগুপ্ত ছিল পুত্র-হারাবার করুণ স্মৃতি আর শোক। হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় একমাত্র পুত্র ফ্রঁসোয়া জাভিয়েরের (২৪) মৃত্যু-বেদনা আমৃত্যু লালন করেছেন। পুত্রের জন্ম হয়েছিল যুদ্ধের সময় প্রথাগত বিয়ে ছাড়াই। বৃত্তাবদ্ধ ছিলেন না বলেই কন্যা ক্যারোলিনের জন্ম হয় প্রযোজক আনাতোল এলিয়াশেফের সঙ্গে প্রণয়কালে। পরে অবশ্য উভয়েই পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন ১৯৪৫ সালে। নিজের বিয়ে-সম্পর্কে স্বদোক্তি – আমি বিয়ে করেছি এমন এক ব্যক্তিকে যে সরাসরি দস্তয়ভস্কির উপন্যাস থেকে বেরিয়ে এসেছে…।
আধুনিক রমণীয় আভিজাত্যে লালিত্য এই নারী প্রাণিত হয়েছিলেন আবার ৩৫ বছর বয়সে। তুমুল ভালোলাগা, আবেগে-অনুরাগে সম্পর্কের মসৃণতায় ২৭ বছরের জঁ-জ্যাক সারভোঁ হয়ে উঠেছিলেন তাঁর জীবনের ধীমান পুরুষ। দশ বছর স্থায়ী ছিল সে-সম্পর্ক। প্রিয় পুরুষকে হারাবার কষ্টে হৃদয়ে ছিল অপ্রাপ্তির মৌন ক্রন্দন। সংগোপনে লালন করেছেন সে-আবেগ। দুজনের সম্পর্কচ্ছেদ হয় কোনো জটিলতা, কোনো কান্না ছাড়াই। পরে একসঙ্গে কাজও করেছেন পত্রিকায়। ‘এই বিচ্ছেদ বেদনাদায়ক ছিল না। কিন্তু আমার জন্য ছিল অসহনীয়’- বলেছেন তিনি। তাই পাঁচ টিউব গারডেনাল খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন।
স্মৃতিকথা, আত্মজীবনী, উপন্যাস মিলে রচিত গ্রন্থের সংখ্যা বিশ। তাঁর লেখা শেষ উপন্যাস লে তাস দ্যু লেওপার (Leb Taches du Leopard) বা চিতাবাঘের ছাপ প্রকাশিত হয়েছে মৃত্যুর কিছুদিন পর। বইটির নামেই রহস্যের ছোঁয়া। নায়ক দনিকে জন্মের পরই পরিত্যাগ করেছিলেন মা। আত্মপরিচয়হীন দনির অস্তিত্বের সংকটের পাশে দিয়েছেন স্মৃতি, চিন্তা, তথ্য ও অনুভূতির উপাদান। তত্ত্ব ও তথ্য দেওয়ার ফাঁকে তাতে প্রচ্ছন্নভাবে এসেছে ইতিহাস, রাজনীতি। অদেখা, অজানা মাকে পাবার আকুতি, আর্তিতে দনি স্বপ্ন-কল্পনায় প্রহর গুনেছে। মনে হয়েছে, না-দেখা মা হয়তো রাশিয়ান কোনো অভিনেত্রী। বা হয়তো কোনো পতিতা। অবশেষে নায়ক মাকে খুঁজে পায়। মা সারাহকে পাবার মাঝে আবিষ্কৃত হয় দনির ইহুদিসত্তা, যে-পরিচয়ের অভিশাপ থেকে বাঁচাতে মা নবজাতক পুত্রকে পরিত্যাগ করেছিল। এভাবেই নায়কের অনিবার্য নিয়তিকে নির্ধারিত করে দিয়েছেন ঔপন্যাসিক। দনির আত্মসংকট ও দহন এবং উপন্যাসের নামের রূপক ব্যবহার ফ্রঁসোয়াজের ভাবনা-কাঠামোকে স্পষ্ট করে দেয়। নায়ক দনির সত্তার মাঝে তিনি দুঃখমোচনের উপায় খুঁজেছেন? বার্ধক্যের উঠোনে দাঁড়িয়ে, নিঃসঙ্গ রক্তের ভেতর অনুভূত হয়েছে অভিবাসীর শিকড় উপড়ানো নির্বাসন? বেঁচে থাকলে ফ্রঁসোয়াজ ‘না’ শব্দটিই উচ্চারণ করতেন। কারণ ৭৬ বছর বয়সে লিখেছিলেন – ফ্রান্স… আজকের আমরা কল্পনা করতে পারি না একজন ইমিগ্রের কাছে এই দুটো শব্দ কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল ভালোবাসার গুরুভারে Ñ শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা…। আমার শৈশব থেকে গভীরভাবে যা আমি বহন করে এসেছি এবং আজও যা আমাকে দেয় প্রতিটি মুহূর্তে ফ্রান্সে বসবাসের আনন্দকে।
একবার রাষ্ট্রপতি মিতেরঁ রাষ্ট্রীয় সফরে তুরস্কে নিয়ে যান ফ্রঁসোয়াজকে। তিনি আগে কখনো যাননি। মিতেরঁর প্যাশন ছিল সমাধিক্ষেত্র-দর্শনে। ফলে ফ্রঁসোয়াজকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ইস্তা¤¦ুলের প্রাচীনতম কবরস্থানে তাঁর সঙ্গে যাওয়ার। সেখানে পূর্বপুরুষদের সমাধি খুঁজতে। কিন্তু ফ্রঁসোয়াজ সম্পূর্ণ অসম্মতি প্রকাশ করেন। নিজেকে তিনি প্রগাঢ়ভাবে ভাবতেন ফরাসি। মিতেরঁ জানতে চেয়েছিলেন, আমার বাবা, আমার দাদা চিকিৎসক কর্নেল-সম্পর্কে, যিনি সুলতান রুজের চিকিৎসা করেছিলেন। তিনি সব জানতে চাইছিলেন।
: আপনি এখানে এসে অভিভূত?
: না, সত্যিই না। আমার জন্মের আগেই আমার বাবা স্বদেশ থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। আমার কোনো শিকড় নেই। নেই স্মৃতি।
: আপনার পরিবারের কোনো সমাধি নেই এই কবরস্থানে?
: না। ফ্রান্সেই আমার পরিবারের সবাইকে মাটি দেওয়া হয়েছে।
কৈশোরের বেদনা-দায়ক অভিজ্ঞতা ছাপিয়ে দেশটির প্রতি আনুগত্যে-ভালোবাসায় পূর্ণ ছিল হৃদয়। তাঁর স্থায়ী বিশ্বাসের শিকড়ে আর রক্তের ভেতর প্রতিশ্রুত ছিল তা।
জীবন ও মৃত্যু-সম্পর্কে তাঁর দর্শন প্রাইভেট লেসন বইটিতে চমৎকারভাবে বিবৃত করেছেন। মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া-প্রসঙ্গে একটি প্রবাদের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। প্রবাদটি জুলু উপজাতির।
Ñ তুমি যদি অগ্রসর হও, তুমি মরবে – তুমি যদি পশ্চাদপসরণ করো, তুমি মরবে। সুতরাং কেন পেছনে ফেরা?
ফ্রঁসোয়াজ জিরু কর্মস্পৃহা, সাফল্য, ব্যক্তিত্বের প্রভা আর রওনক দিয়ে গত শতাব্দীর ফরাসি-নারীর ‘আইকন’ হয়ে থাকবেন। আর একুশ শতকের নারীর আরোহণের প্রতীকও।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.