ফারহানা আফরোজ বাপ্পীর মেডিটেশন অব পিস

ছোটবেলায় আমাদের দাদি, নানিদের দেখতাম সূক্ষ্মভাবে কোনো সেলাই করছেন বা পিঠার নকশা কাটছেন বা গৃহস্থালি কাজকে সূক্ষ্ম সৃজনশীল উপায়ে তুলে ধরছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিল্পকলার ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক সঞ্জয় চক্রবর্ত্তী একবার একটি সেমিনারে বলেছিলেন – ‘সূক্ষ্ম কাজ এবং সে সূক্ষ্ম কাজে যদি পুনরাবৃত্তি থাকে তাহলে তার মধ্য দিয়ে মস্তিষ্কের এক ধরনের ব্যায়াম হয়, সেটাও কিন্তু ধ্যান।’

সকল রকম ভাবনা দূরে রেখে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে কোনো একটি সৃজনশীল কাজে মনোনিবেশ করলে এক ধরনের প্রশান্তি মেলে। মানবমনের এ এক স্বাভাবিক প্রবণতা। কর্মব্যস্ত জীবনে হাঁপিয়ে ওঠার আগে দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে নিজেকে ছাড় দিতে হয়। শিল্পীকে তো অবশ্যই সেই ব্যক্তিগত Isolation-এ যেতে হয়।

যদি এমন সময় আসে যে, কোথাও কোনো কর্মব্যস্ততা নেই, একটি ঘরে আটকে থাকতে হচ্ছে, চারদিকে মহামারি, মৃত্যুমিছিল, সংকট, আপনি এমনিতেই মানুষের কাছ থেকে, সমাজের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন, তখন কী ঘটে?

২০২০ সালের মহামারির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে নিশ্চয়ই? জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতাকে যে শিল্পী তুলিতে ধরেন, তাঁর রেখায় ভাবনার বিক্ষিপ্ততার প্রকাশ কী রূপে ঘটতে পারে, আজ বলবো সেসব কথা।

রাজধানীর লালমাটিয়ায় অবস্থিত দ্বীপ গ্যালারিতে চিত্রশিল্পী ফারহানা আফরোজ বাপ্পীর ‘মেডিটেশন অফ পিস’ শীর্ষক প্রদর্শনীটি দেখতে গিয়েছিলাম। গ্যালারিতে ঢুকেই হাতের বাম দিকের ছবিটি দেখে মনে হলো যেন কোনো শিশুর আঁকা গ্রামের দৃশ্য। হরেক রকমের দক্ষতাসম্পন্ন একজন শিল্পীর পক্ষে শিশুর মতো রেখা আঁকা দুঃসাধ্য হওয়ার কথা। কথায় আছে, শিশুরাই হলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চিত্রকর! শিশু তার মনোজগৎকে যেমন সততার সঙ্গে রেখায় প্রকাশ করতে পারে, প্রাপ্তবয়স্করা সে তুলনায় যথেষ্ট আরোপিত এবং সচেতন। ছবিটা দেখতে দেখতেই শিল্পী আমার পাশে এসে দাঁড়ান। আমার জিজ্ঞাসু চোখ দেখে নিজেই উত্তর দিলেন, ‘ছবিটির ঘরগুলো বেশ দূরে দূরে বিচ্ছিন্নভাবে আঁকা। আমি সমাজ থেকে বিচ্যুতি ঘটা মনস্তত্ব বোঝাতে এঁকেছি এমনটা।’

বেশির ভাগ ছবি দেখলাম ২০২০ সালে বা পরবর্তী দু-বছরের মধ্যে আঁকা। অর্থাৎ ছবিগুলো মহামারির সময়কার আঁকা। শিল্পীর ভাষ্যমতে, করোনাকালে মানুষের অসহায়ত্ব এবং সে-অসহায়ত্বকে ঘিরে যে স্বার্থপরতা তৈরি হয়েছিল, তা শিল্পীর মনোজগৎকে ভাবিয়েছিল। তিনি বলেন, ‘সে সময় বাবা-মা মারা যাচ্ছেন, অথচ সন্তান তাদের কাছে যাচ্ছে না। স্বেচ্ছাসেবক দল গিয়ে লাশ তুলে আনছে। স্বামী বা স্ত্রী অসুস্থ হলে দরজার নিচ দিয়ে খাবার দিচ্ছেন, কাছে গিয়ে সেবাযত্ন করতে পারছেন না।’ শিল্পী নেতিবাচক চিন্তা এড়াতে একরকম রেখার পেছন থেকে জালের মতো রেখা টেনে টেনে মেডিটেশন করতেন। লক্ষ করলাম, শিল্পীর ভাষ্যের সঙ্গে চিত্রগুলো সত্যিই মিলেমিশে একাকার। মেডিটেশন সিরিজে অ্যাক্রিলিক রং দিয়ে রঙের গ্রেডিয়েশন তৈরি করতে একটি রঙের মৌলিকত্ব থেকে বেরিয়ে তার সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি রূপটিকে ফুটিয়ে তুলেছেন।

মেডিটেশেন সিরিজের প্রথম চিত্রকর্মে বেগুনি ও গোলাপির আধিক্য দেখা যায়। লালের সঙ্গে নীল মিশিয়ে বেগুনি রং তৈরি করেন। লালের সঙ্গে সাদা মিশিয়ে গোলাপি। এরপর লালের সঙ্গে নীলের কম-বেশি করে বেগুনির বিভিন্ন টারশিয়ারি রং ফুটিয়ে তোলেন। এভাবে সূক্ষ্ম রঙের মিশ্রণ আর তুলির চিকন রেখা যথেষ্ট মনোনিবেশের ফলে ঘটে। একই প্রক্রিয়ায় এই সিরিজের কাজগুলো কখনো হলুদ, বাদামি, সবুজ, নীলের গ্রেডিয়েশন ফুটিয়েছেন।

গ্রামের বর্ষাকালের চিত্রটা নিশ্চয়ই অনেকে জানি। বাড়ির নারীরা যখন গৃহবন্দি থাকতেন, চারদিকে পানি থইথই করে, তখন গ্রামের নারীরা সব নকশিকাঁথা বোনে। ফোঁড়ের পর ফোঁড় তুলে জীবনের গল্প বলে চলেন। একাগ্রচিত্তে করা যে কোনো কাজ জীবনের অসংগতিগুলো থেকে মুক্তির পথ বের করে আনে।  চিত্রকরের চিত্রকর্মগুলোতে সেই ফোঁড় গাঁথার মতো রেখা লক্ষ করলাম। জগৎসংসারের নেতিবাচকতা ভুলে শিল্পী রেখায় একরকম ডুব দিয়েছিলেন বলে জানালেন।

শিল্পী ফারহানা আফরোজের মেডিটেশন সিরিজের রং প্রকৃতির সবুজ, খয়েরি আর নীলের আধিক্যে পরিপূর্ণ। প্রদর্শনীতে ঢুকে দেখি কবি তপন বাগচী বসে আছেন। আমায় জিজ্ঞাসা করলেন, এইখানে আমি লোকশিল্পের কোনো ফর্ম বা মোটিফ খুঁজে পাচ্ছি কি না। অনেক খুঁজেও পেলাম না। অনেকগুলো চতুর্ভুজের প্যাটার্ন ছাড়া। লোকশিল্পে জ্যামিতিক প্যাটার্ন থাকে এবং তা হয় নকশাভিত্তিক। শিল্পীর কাজে কোনো নকশার অবস্থান দেখতে পেলাম না। চাইলে কিছু অবয়ব ভেবে নেওয়া যেতে পারে। রঙের মধ্য দিয়ে শিল্পীর মনের বিক্ষিপ্ত অবস্থা আঁচ করা যায় বরং। সাইকোলজিতে একেক রঙের একেক ব্যাখ্যা আছে। শিল্পী তাঁর মুডের উপর ভর করেও রং নির্বাচন করতে পারেন। মেডিটেশন অফ পিস-২ ছবিতে দেখলাম সবুজের গ্রেডিয়েশন। ক্যানভাসের চারদিক থেকে হরেকরকমের সবুজ এসে মিলিত হলো মাঝের গাঢ় সবুজে, যেন একটি শূন্য গহ্বর।

গ্যালারিতে প্রবেশ করতেই হাতের ডানদিকে চোখে পড়লো, শিল্পী ফারহানা আফরোজের ‘ওয়াটার’ সিরিজের চিত্রকর্মগুলো। মাধ্যম হিসেবে অ্যাক্রিলিকের চাইতে ঢের কঠিন জলরঙের ওয়াশ পদ্ধতি। চারুকলার প্রথম বর্ষে জলরঙের কিছু পাঠ দেওয়া হয়। প্রথম স্তরে পানির পরিমাণে বেশি রেখে হালকা রং, এরপর পানির পরিমাণ কমাতে কমাতে গাঢ় রঙ বের করে আনা হয়। এক্ষেত্রে পানির পরিমাণের উপর ভিত্তি করে রঙের শেড তৈরি করা হয়। সেই শেড কখনো গাঢ়, কখনো হালকা। চিত্রকর্ম দেখে সেই অনুশীলনটি মনে পড়ে গেল। মেডিটেশন বিষয়টি যোগব্যায়াম বা গানের রেওয়াজের মধ্যে দিয়ে হয় সাধারণত। চিত্রকলা চর্চার প্রাথমিক অনুশীলনগুলো দিয়ে ‘ওয়াটার’ সিরিজে শিল্পী নিঃসন্দেহে সফল হয়েছেন ‘মেডিটেশন অব পিস’ প্রদর্শনীতে দশর্ককে একাগ্রচিত্তে কোনো কাজে মনোযোগ স্থাপনের মৌলিক আবহ তৈরি করে দিতে। প্রদর্শনীটি চলেছে আগামী ১২ অক্টোবর, ২০২৫ পর্যন্ত।