ছবি আঁকায় নিবেদিতপ্রাণ শিল্পী সুনীল কুমার পথিক। আঁকাআঁকিতেই তাঁর সময় কাটে। নিজে আঁকেন এবং আগ্রহী শিক্ষার্থীদের আঁকতে শেখান।
প্রায় দুই যুগ ধরে সুনীলকে চিনি। চিত্রবিদ্যা শিখেছেন বাংলাদেশের প্রধান দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। অংকন ও চিত্রায়ণে স্নাতক করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, স্নাতকোত্তর করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। চারটি চিত্রপ্রদর্শনী করেছেন। প্রথম দুটি প্রদর্শনী অনেক আগে হয়েছে। এ-দুটি প্রদর্শনীর কাজে তাঁর অংকনরীতিতে অ্যাকাডেমিক শিক্ষার প্রভাব ছিল অধিকতর। সে-সময় তাঁর আঁকা ছবিতে দৃষ্টিনন্দন নিসর্গ ও নারীর সুললিত ফিগার দেখেছি। শিল্পীর তৃতীয় একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে এ-বছরের মে মাসে ঢাকার লালমাটিয়ায় গ্যালারি ভূমিতে।
সম্প্রতি ঢাকার গুলশানে ভারতীয় হাইকমিশনের ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের আয়োজনে সুনীল কুমারের চতুর্থ একক চিত্রপ্রদর্শনী চলছে। তিন সপ্তাহব্যাপী এই প্রদর্শনী গত ১৮ই সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে চলেছে ১০ই অক্টোবর পর্যন্ত।
১৮ই সেপ্টেম্বর বিকেলে দেশের নবীন-প্রবীণ শিল্পী ও বিশিষ্টজনদের উপস্থিতিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা প্রদর্শনীটি উদ্বোধন করেন। ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পরিচালক আন মেরি জর্জের সঞ্চালনায় এতে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন বরেণ্যশিল্পী মনিরুল ইসলাম।
এছাড়া উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে শিল্পী সুনীল কুমার তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করেন এবং প্রধান অতিথি প্রণয় ভার্মা ও আন মেরিকে তাঁদের প্রতিকৃতি উপহার দেন। দর্শকসারিতে উপস্থিত অগ্রজ শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন আবদুল মান্নান, নাসিম আহমেদ নাদভী, অধ্যাপক নাঈমা হক, আইভি জামান, রেজাউন নবী, অশোক কর্মকার, রফি হক প্রমুখ।
প্রকৃতি ও নগরসংলগ্ন মানুষ নিয়ে যাঁরা ছবি আঁকছেন সুনীল তাঁদের অন্যতম। গত প্রায় এক দশক ধরে দেখছি মানুষের দেহপ্রধান চিত্রচর্চায় স্বাতন্ত্র্যের সন্ধান করছেন তিনি। আর এক্ষেত্রে সুনীলের কাজের প্রধান চরিত্র নারী। নারী সৌন্দর্যের বয়ান শুধু নয়, শিল্পী নারীর সামাজিক অন্তরায় ও তাকে আবদ্ধ রাখার নানা বিধিবিধানকে প্রতীকীভাবে তুলে এনেছেন ছবিতে। নারীত্বের মাহাত্ম্য তিনি উপলব্ধি করেছেন শিল্পীসুলভ মানসিকতা দিয়ে। নারীর প্রতিবাদী সত্তাকে তিনি চিত্রিত করেছেন সংবেদনশীল একজন মানুষ হিসেবে।
এমনই এক অংকনপ্রধান চিত্রকর্ম ‘নারী ও ফুলের গল্প’ শিরোনামের চিত্রকর্মের কেন্দ্রস্থলে খোঁপায় গোঁজা ফুলসমেত হাজির এক তরুণী অবয়ব। তাঁর চোখের দিকে এক তরুণের পুষ্পাঞ্জলি। তরুণীর সামনে পেছনে আরো পুরুষ অবয়ব। চারকোল ও পেনসিলে আঁকা এই চিত্র ছাড়াও এমনতর বিষয় আমরা দেখতে পাই অন্য কয়েকটি চিত্রকর্মে।
সভ্যতার পাশাপাশি অসভ্যতারও বিস্তার ঘটেছে দুনিয়ায়। মানুষ তার মানবিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুত হয়ে ক্রমশ যান্ত্রিক হয়ে উঠছে। এজন্য মানুষী দেহের জ্যামিতিক উপস্থাপন শিল্পীর কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়েছে। এমনকি তাঁর অাঁকা নারী ও পুরুষের শরীরের অস্থিসন্ধিতে স্ক্রু ও নাটবোল্টের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। এ যেন মানুষের যান্ত্রিক হয়ে-ওঠার এক ধরনের প্রতীকচিহ্ন। তাঁর এসব কাজ যেন একালের এই সময়ের পোস্টমর্টেম।
নারীকে টোপ দেওয়া, লোভ দেখানো, নারীর প্রতি সহিংসতা, নারীকে বিভ্রান্ত করা, ধর্ষণ, খুন এসব অপরাধকে মাথায় রেখে শিল্পী তাঁর চিত্রপটে নারীদেহকে কেন্দ্রে রেখে নানাবিধ অভিব্যক্তির অনেক পুরুষ অবয়ব স্থাপন করেন। হিন্দু মিথে রাবণের অনেক অবয়বের অভিব্যক্তির সঙ্গে এসব তুলনীয়। সেইসঙ্গে ফুল-পাখি ও প্রাণীর অবয়বকেও কোথাও কোথাও প্রয়োগ করেছেন স্পেসকে যথাযথ মূল্য দিতে। রিয়ালিস্টিক ফর্মের সঙ্গে কিউবিক ফর্মের মেলবন্ধনের পরেও কেমন একটা সুররিয়ালিস্টিক মেজাজের দেখা মিলছে তাঁর চিত্রকর্মে।
যেমন বড় ক্যানভাসে তেলরঙে আঁকা ‘অপেক্ষা’ চিত্রটিতে অস্তগামী সূর্যের লালচে আভার মৃদু আলোয় শিল্পী এক অপেক্ষমাণ সুন্দরী নারী ও তার ছায়ামূর্তির ছবি এঁকেছেন। এই দুই ছায়া যেন তাঁর আরো দুটি অস্তিত্ব বহন করছে। প্রথম ছায়াটি সামনের সুসজ্জিত নারীর পেছনে স্থির হয়ে দূরের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আর অন্যজন পূজার থালায় নৈবেদ্য সাজিয়ে পা বাড়ানো এক নারী পূজারি। চিত্রে মানব অস্তিত্ব ও মনের একাধিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে।
শারদোৎসবের সময় প্রদর্শনী আয়োজনে দেবী দুর্গার অসুর বধের দৃশ্যসংবলিত এক তৈলচিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণির অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে উপজীব্য করে আঁকা ছবিও এখানে স্থান দিয়েছেন শিল্পী।
এর বাইরে সুন্দরের প্রতি শিল্পীর মনের টান ও আবেগের স্ফুরণ প্রত্যক্ষ করি কোনো কোনো চিত্রে। এমনতর চিত্রে আমরা শিল্পীর রোমান্টিক মনের সন্ধান পাই, অপরিসীম দরদে প্রেমিকের মন দিয়ে তিনি নারীর সৌন্দর্য ও কমনীয়তাকে চিত্রিত করেছেন, বার্তা দিয়েছেন – সৌন্দর্যের প্রতীককে যেন অবহেলা, অবজ্ঞা, অসম্মান না করি, অন্তর দিয়ে ভালোবাসি, তাকে সুরক্ষা দিই, তার সঙ্গে মানবিক আচরণ করি। যেমন তিনি এঁকেছেন
প্রেমিক-প্রেমিকা ও দম্পতির প্রেমময় অভিব্যক্তির ছবি।
অংকনপ্রধান এসব চিত্রকর্ম তাঁর সাম্প্রতিক কাজ, অংকনের দৃঢ়তা আনতে প্রচুর রেখা ব্যবহার করেছেন। এঁকেছেন কাগজে চারকোল, পেনসিল, জলরং ও ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক রঙে। তাঁর কাজ বাস্তবতার কাছাকাছি হলেও চিত্রে বর্ণ-আলিম্পন ঠিক বাস্তবানুগ নয়, পাত্র-পাত্রীর দেহ-অবয়ব নীলচে, তামাটে ও হলদেটে। কামরুল হাসান, কাইয়ুম চৌধুরী, মুর্তজা বশীর প্রমুখ বরেণ্য শিল্পী এবং আমাদের প্রাচ্য চিত্রকলার শিল্পীদের চিত্রে আমরা এসব বর্ণের বহুল ব্যবহার দেখি। শিল্প-সমালোচক অধ্যাপক মঈনুদ্দীন খালেদের ভাষায় – তাঁর ছবির নীল-সবুজে যে লাল ছোপ তা শুধু ফুল ফোটার বার্তা দেয় না, তা কালের রাগ ও রক্তের কথাও বলে।
শিল্পী ভালোবাসেন তাঁর দেশ, দেশের প্রকৃতি ও দেশের মানুষকে, দুনিয়ার সৃষ্টিকে। তাঁর চিত্রকর্মে আমরা এই দেশাত্মবোধের পরিচয় পাই; দেখি দেশপ্রেমিক হয়েও দরদি মন নিয়ে তিনি হাঁটেন আন্তর্জাতিকতার পথে, মানবমুক্তির কল্যাণচিন্তায়।
সুনীলের তৃতীয় ও চতুর্থ একক চিত্রপ্রদর্শনীর কাজ দেখে আমার ধারণা হলো – তাঁর শিল্পপ্রয়াসের বাঁকবদল ঘটেছে। দীর্ঘদিন ধরে তাঁর অংকনচর্চা ও শ্রমসাধ্য সৃজন-সাধনার সুফল ডানা মেলতে শুরু করেছে। এরই স্বাক্ষর – তৃতীয় আয়োজন শেষ হওয়ার মাত্র তিন মাস পর ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের উদ্যোগে তাঁর চতুর্থ একক প্রদর্শনী। পরিশেষে আমার শুভকামনা – শিল্পী সুনীল কুমার পথিকের জয় হোক, জয় হোক আমাদের চারুশিল্পের।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.