মানুষ আজকাল যে ধরনের বিজ্ঞানচর্চায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে সেটি কিন্তু তুলনামূলকভাবে বেশ নতুন। আগে খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ কিছু একটা বলতেন, সবাই সেটাকেই মেনে নিত। এরিস্টটল তাঁর সময়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ একজন জ্ঞানী মানুষ ছিলেন। তিনি বলেছিলেন ভারি জিনিস হালকা জিনিস থেকে তাড়াতাড়ি নিচে পড়ে । কেউ কোনো রকম আপত্তি না করে সেটা মেনে নিয়েছিল। দুই হাজার বছর পর একজন বিজ্ঞানী (গ্যালেলিও গ্যালিলি) ব্যাপারটা একটু পরীক্ষা করতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন, ব্যাপারটি সত্যি নয়! ভারি এবং হালকা জিনিস একই সাথে নিচে এসে পড়ে। বিজ্ঞানের একটা ধারণাকে যে গবেষণাগারে পরীক্ষা করে তার সত্য-মিথ্যা যাচাই করে দেখা যায়, সেটি মোটামুটিভাবে বিজ্ঞানের জগত্টাকেই পাল্টে দিল। এই নতুন পদ্ধতিতে বিজ্ঞানচর্চার কৃতিত্বটা দেওয়া হয় নিউটনকে (আইজাক নিউটন)। বর্ণহীন আলো যে আসলে বিভিন্ন রঙের আলোর সংমিশ্রণ- সেটা নিউটন প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন। সেই সময়ের নিয়ম অনুযায়ী এই তত্ত্বটা প্রকাশ করার পর অন্য সব বিজ্ঞানীর সেটা নিয়ে আলোচনা করার কথা ছিল, কারো কারো এর পক্ষে এবং কারো কারো এর বিপক্ষে যুক্তিতর্ক করা এবং মতামত দেয়ার কথা ছিল। নিউটন এইসব আলোচনার সুযোগ দিলেন না, একটা প্রিজমের ভেতর দিয়ে বর্ণহীন সূর্যের আলো পাঠিয়ে সেটাকে তার ভেতরের রঙগুলোতে ভাগ করে দেখালেন। শুধু তা-ই না, সেই ভাগ হয়ে যাওয়া রঙগুলোকে দ্বিতীয় একটা প্রিজমের ভেতর দিয়ে পাঠিয়ে সেটাকে আবার বর্ণহীন সূর্যের আলোতে পাল্টে দিলেন। পরীক্ষাটি এত অকাট্য যে তাঁর তত্ত্বটা নিয়ে কারো মনে এতটুকু সন্দেহ থাকার কথা নয়- সেই সময়কার বিজ্ঞানীরা কিন্তু এই ধরনের বিজ্ঞানচর্চায় অভ্যস্ত ছিলেন না এবং নিউটন যে তাঁর তত্ত্ব নিয়ে তর্কবিতর্ক করার কোনো সুযোগ দিলেন না- সে জন্যে তাঁর ওপর খুব বিরক্ত হয়েছিলেন। তাদের মনে হয়েছিল, নিউটন কোনোভাবে তাদের ঠকিয়ে দিয়েছেন! সেই সময়কার বিজ্ঞানীরা ব্যাপারটাকে যত অপছন্দই করে থাকুন না কেন- বর্তমান বিজ্ঞানচর্চা কিন্তু এভাবেই হয়। বিজ্ঞানীরা আমাদের চারপাশের জগৎটাকে বোঝার চেষ্টা করেন, প্রকৃতি যে নিয়মে এই জগৎকে পরিচালনা করে, সেই নিয়মগুলোকে যতদূর সম্ভব স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার চেষ্টা করেন। গণিতের ভাষা থেকে নিখুঁত আর স্পষ্ট ভাষা কী হতে পারে? তাই বিজ্ঞানের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রকৃতির সূত্রগুলোকে গাণিতিক কাঠামো দিয়ে ব্যাখ্যা করা। ‘বস্তুর ভর আসলে শক্তি’ না বলে বিজ্ঞানীরা আরো নিখুঁত গাণিতিক ভাষায় বলেন, ‘বস্তুর ভরের সাথে আলোর বেগের বর্গের গুণফল হচ্ছে শক্তি’২। বিজ্ঞানের এই সূত্রগুলো খুঁজে বের করা হয় পর্যবেক্ষণ কিংবা পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে। মাঝে মাঝে কেউ কেউ শুধুমাত্র চিন্তা-ভাবনা করে একটা সূত্র বের করে ফেলেন, অন্য বিজ্ঞানীদের তখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সেটার সত্য- মিথ্যা খুঁজে বের করতে হয়।
পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানের কোনো রহস্য বুঝে ফেলার একটা উদাহরণ তৈরি করেছিলেন কোপার্নিকাস। যারা চাঁদ এবং সূর্য কিংবা অন্য গ্রহ- নক্ষত্রকে আকাশে উদয় হতে এবং অস্ত যেতে দেখেছে- তারা ধরেই নিয়েছিল সবকিছুই পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরছে। নিজের চোখে সেটা দেখছে অস্বীকার করার উপায় কী? কিন্তু কোপার্নিকাস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সবকিছু লক্ষ্য করলেন এবং বুঝতে পারলেন আসলে ব্যাপারটি অন্যরকম, সূর্য রয়েছে মাঝখানে তাকে ঘিরে ঘুরছে পৃথিবী এবং সবগুলো গ্রহ। প্রায় সাড়ে চারশ বছর আগে কোপার্নিকাস প্রথম যখন ঘোষণাটি করেছিলেন, সেটি তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি। একশ বছর পর গ্যালেলিও যখন সেটাকে গ্রহণ করে প্রমাণ করার চেষ্টা করতে লাগলেন, তখন ধর্মযাজকরা হঠাৎ করে তাঁর পেছনে লেগে গেলেন। তাদের ধর্মগ্রন্থে লেখা আছে, পৃথিবী সবকিছুর কেন্দ্র। সেই পৃথিবী সূর্যকে ঘিরে ঘুরছে ঘোষণা করা ধর্মগ্রন্থকে অস্বীকার করার মতো। ভ্যাটিকানের পোপেরা সে জন্যে তাঁকে তখন ক্ষমা করেননি। ব্যাপারটি প্রায় কৌতুকের মতো যে গ্যালেলিওকে ভ্যাটিকান চার্চ ক্ষমা করেছে মাত্র বছর দশেক আগে। তাদেরকে দোষ দেয়া যায় না। ধর্মের ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাস, কাজেই ধর্মগ্রন্থে যা লেখা থাকে, সেটা নিয়ে কেউ কখনো প্রশ্ন করে না। গভীর বিশ্বাসে গ্রহণ করে নেয়। বিজ্ঞানে বিশ্বাসের কোনো স্থান নেই। বিজ্ঞানের যে কোনো সূত্রকে যে কেউ যখন খুশি প্রশ্ন করতে পারে। যুক্তিতর্ক, পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিয়ে সেটা তখন প্রমাণ করে দিতে হবে। কাজেই কেউ যদি বিজ্ঞান ব্যবহার করে ধর্মচর্চা কিংবা ধর্ম ব্যবহার করে বিজ্ঞানচর্চা করার চেষ্টা করে, তাহলে বিজ্ঞান বা ধর্ম কারোই খুব একটা উপকার হয় না। গবেষণা করে দেখা গেছে, চতুরতার সাথে দুর্নীতি করা হলে আইনের সাথে কোনো ঝামেলা ছাড়াই বড় অঙ্কের অর্থ উপার্জন করা সম্ভব। এরকম একটি ‘বৈজ্ঞানিক তথ্য উপস্থিত থাকার পরও আমরা কিন্তু সব সময়ই সবাইকে সৎভাবে বেঁচে থাকার একটি ‘অবৈজ্ঞানিক উপদেশ দিই। নিজেরাও অবৈজ্ঞানিকভাবে সৎ থাকার চেষ্টা করি। পৃথিবীতে বিজ্ঞান একমাত্র জ্ঞান নয়। যুক্তিতর্ক, পর্যবেক্ষণ বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রমাণ করা যায় না এরকম অনেক বিষয় আছে, আমরা কিন্তু সেগুলোর চর্চাও করি। বিজ্ঞানের পাশাপাশি শিল্প-সাহিত্য দর্শন এরকম অনেক বিষয় আছে এবং সব মিলিয়েই সৃষ্টি হয়েছে পৃথিবীর জ্ঞানভাণ্ডার এবং সভ্যতা। কাজেই সবকিছুকে বিজ্ঞানের ভাষায় ব্যাখ্যা করতে হবে, সেটিও সত্যি নয়।
কোপার্নিকাস গ্রহ-নক্ষত্র এবং চন্দ্র-সূর্যকে পর্যবেক্ষণ করে একটি বৈজ্ঞানিক সূত্রে উপস্থিত হয়েছিলেন, বিজ্ঞানীরা সবসময় এরকম পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভর করেন না। যেটা পর্যবেক্ষণ করতে চান সম্ভব হলে সেটি গবেষণাগারে তৈরি করে সেটাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে থাকেন। এক সময় মনে করা হতো সমস্ত বিশ্বজগৎ-গ্রহ-নক্ষত্র সবকিছু ইথার নামে অদৃশ্য এক বস্তুতে ডুবে আছে। পানিতে যেরকম ঢেউ তৈরি করা হয়, আলো সেরকম ইথারের মাঝে তৈরি করা ঢেউ। বিজ্ঞানীরা তখন একটি চুলচেরা পরীক্ষা করতে শুরু করলেন। পরীক্ষার উদ্দেশ্য ইথারের মাঝ দিয়ে পৃথিবী কত বেগে ছুটে যাচ্ছে সেটা বের করবেন। মাইকেলসন (আলবার্ট এ মাইকেলসন) এবং মোরলীর (এডওয়ার্ড ডাব্লিউ মোরলী) পরীক্ষায় দেখা গেল, ইথার বলে আসলে কিছু নেই। (অনেক কবি-সাহিত্যিক অবশ্য এখনো সেই খবরটি পাননি। তারা তাদের লেখালেখিতে এখনো ইথার শব্দটি ব্যবহার করে যাচ্ছেন!) ইথারের মতো এরকম গুরুত্বপূর্ণ একটা ধারণা বিজ্ঞানীরা যেরকম একটা পরীক্ষা করে অস্তিত্বহীন করে দিয়েছিলেন সেরকম আরো অনেক ধারণাকে পরীক্ষা করে সত্য প্রমাণ করেছেন। পৃথিবীর নতুন বিজ্ঞান এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞানচর্চার একটা বড় অংশ এখন গবেষণাগারের ওপর নির্ভর করে। তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক বিজ্ঞান এখন একটি আরেকটির হাত ধরে অগ্রসর হচ্ছে। একটি ছাড়া অন্যটির এগিয়ে যাবার কথা আজকাল কেউ কল্পনা করতে পারে না।
পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াও অবশ্য বিজ্ঞানীরা সবসময়ই যুক্তিতর্ক ব্যবহার করে প্রকৃতির রহস্যকে বুঝতে চেষ্টা করেন। বড় বড় বিজ্ঞানীর এক ধরনের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় থাকে। সেই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে তারা অনেক কিছু ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন- যা হয়তো সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারে না। মাইকেলসন এবং মোরলী একটি চুলচেরা পরীক্ষা করে ইথারকে অস্তিত্বহীন করে দিয়েছিলেন। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন সেই একই কাজ করেছিলেন সম্পূর্ণ অন্যভাবে। ইলেকট্রো ম্যাগনেটিজমের কিছু সূত্রকে সমন্বিত করার জন্যে তিনি তাঁর জগদ্বিখ্যাত আপেক্ষিক সূত্র বের করেছিলেন পুরোপুরি চিন্তা-ভাবনা এবং যুক্তিতর্ক দিয়ে। তাঁর আপেক্ষিক সূত্র সরাসরি ইথারকে বাতিল করে দিয়েছিল এবং মাইকেলসন-মোরলীর পরীক্ষাটি ছিল তার প্রমাণ।
কাজেই বলা যেতে পারে, আমাদের আধুনিক বিজ্ঞানচর্চা এখন পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা যুক্তিতর্ক—এই তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে। বিজ্ঞান ব্যাপারটি আমরা সবাই সরাসরি দেখতে পাই না কিন্তু বিজ্ঞানের ব্যবহার বা প্রযুক্তিকে (টেকনলজি) বেশ সহজেই দেখতে পাই। এটি এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই, প্রযুক্তির মোহ আমাদের অনেক সময় অন্ধ করে ফেলছে। আমরা অনেক সময় কোন্টা বিজ্ঞান আর কোনটা প্রযুক্তি- সেটা আলাদা করতে পারছি না। বিজ্ঞানের কৃতিত্বটা প্রযুক্তিকে দিচ্ছি কিংবা প্রযুক্তির অপকীর্তির দায়ভার বহন করতে হচ্ছে বিজ্ঞানকে।
ভোগবাদী পৃথিবীতে এখন খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিকে আলাদা করে দেখা। তা না হলে আমরা খুব বড় বিপদে পড়ে যেতে পারি।
১. ভারি বস্তু এবং হালকা বস্তু যে একই সাথে নিচে পড়বে সেটা কোনো পরীক্ষা না করে শুধুমাত্র যুক্তিতর্ক দিয়েই বের করা সম্ভব। ধরা যাক ভারি বস্তু তাড়াতাড়ি এবং হালকা বস্তু ধীরে ধীরে নিচে পড়ে। এখন একটি ভারি বস্তুর সাথে হালকা বস্তু বেঁধে দিলে হালকা বস্তুটি ভারি বস্তুটিকে তাড়াতাড়ি পড়তে বাধা দেবে। কাজেই দুটি মিলে একটু আস্তে পড়বে। কিন্তু আমরা অন্যভাবেও দেখতে পারি, ভারি এবং হালকা মিলে যে বস্তুটা হয়েছে, সেটা আরো বেশি ভারি। কাজেই আরো তাড়াতাড়ি পড়া উচিত। একভাবে দেখা যাচ্ছে আস্তে পড়বে, অন্যভাবে দেখা যাচ্ছে দ্রুত পড়বে এই বিভ্রান্তি মেটানো সম্ভব যদি আমরা ধরে নিই, দুটো একই গতিতে নিচে পড়বে।
২. আইনস্টাইনের বিখ্যাত সূত্র E = mc2


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.