আমার যে কী আনন্দ লাগজে! জয়িতা মুখ ঘুরিয়ে লালুবাবুর দিকে তাকাল। বুঝলুম তো ! না না তুই আসলে বুজদে পারছিস না। ছেচল্লিশ বছর পর নিজের মাটিতে এসে পা দিলুম। সেই যে আটান্ন সালে চলে

গিয়েছিলুম…..

হয়েছে। এখন দয়া করে একটু চুপ করো। টিকিট হাতে পাওয়ার পর কালনা থেকে বকবকানি শুরু করেছ। কালনা থেকে ট্রেনে কলকাতা, কলকাতা থেকে দমদম এলুম ট্যাক্সিতে, দমদম এয়ারপোর্ট থেকে প্লেনে করে ঢাকায় এসে নামলুম, একটুক্ষণের তরে এই বকবকানি তুমি থামিয়েছ কি না বলো তো! আমার যে কানের পোকা খসে যাচ্ছে!

নাতনির বিরক্তিটা পাত্তা দিলেন না লালুবাবু। নির্মল মুখ করে হাসলেন। মুশকিলটা হয়েছে এই আবেগটা তুই বুজবিনে। এ একেবারে অন্তরের ভেতরকার আবেগ। যার যার তার তার। আপন মাটি ছেড়ে যাওয়া মানুষের সেই মাটিতে ফিরে আসার আবেগ তুই কী করে বুজবি! তুই ছেলেমানুষ। জন্মেছিস কালনায়। তোর তো এই অনুভূতি হবেই না। হ্যাঁ হবে, তবে কখন হবে জানিস, কালনা থেকে চলে গিয়ে কালনায় যদি তুই আবার আমার মতো বুড়ো বয়সে ছেচল্লিশ বছর পর ফিরে আসিস।

জয়িতা এবার চোখ পাকালো। শোনো বুড়ো, এখন থেকে একদম চুপ। এখন চুপচাপ ইমিগ্রেশানের কাজ সারবে। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে না চড়া পর্যন্ত আর কোনো কথা নয়।

লালুবাবু হাসলেন। আচ্ছা ঠিক আছে। যা শুনলুম তোর কথা। লাইনটা তখন একটু একটু করে এগুচ্ছে। একে একে পাসপোর্টে সিলছাপ্পড় মেরে একজন একজন করে বেরিয়ে যাচ্ছে। বেশিরভাগ যাত্রীর হাতেই ব্যাগ। লালুবাবুর হাতে কোনো ব্যাগ নেই। জয়িতার হাতে মাঝারি সাইজের একটা মেয়েলি ব্যাগ।

ইমিগ্রেশান এরিয়া পার হয়ে লাগেজের জন্য এল ওরা। এই ফাঁকে জয়িতা একটা ট্রলি টেনে নিয়েছে। হাতব্যাগটা রেখেছে ট্রলিতে। লালুবাবু

তখন উদগ্রীব হয়ে প্যাসেঞ্জার রিসিভ করতে আসা লোকজনের দিকে তাকাচ্ছেন। চোখে মোটা কাচের চশমা। তারপরও এতটা দূর থেকে পরিচিত কোনো মুখ তিনি দেখতে পেলেন না। ভেতরে ভেতরে চিন্তিত হলেন। কিন্তু জয়িতার ভয়ে মুখ খুললেন না।

লাগেজ আসতে সময় লাগছিল। ট্রলির হ্যান্ডেল ধরে বেল্টের দিকে তাকিয়ে উৎকণ্ঠিত মুখে দাঁড়িয়ে আছে জয়িতা। যাদের লাগেজ আসছে তারা ব্যস্তভঙ্গিতে থাবা দিয়ে লাগেজ নামাচ্ছে, ট্রলিতে তুলছে। যাদেরটা আসতে সময় লাগছে তারা জয়িতার মতো উদগ্রীব।

কিন্তু লালুবাবুর এসব দিকে খেয়াল নেই। জয়িতার পাশে দাঁড়িয়ে তিনি তখনও আগের মতোই তাকাতাকি করছেন। কই রিসিভ করতে আসা লোকজনের মধ্যে সেই পরিচিত মুখ দুটো তো নেই। তারা এখনও এসে পৌঁছায়নি নাকি! নাকি কোথাও কোনো গণ্ডগোল হলো। যদি কেউ রিসিভ করতে না আসে ……

লালুবাবু একটু অস্থির প্রকৃতির মানুষ। ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা বাড়ছে তাঁর। খুব ইচ্ছে করছে ব্যাপারটা জয়িতার সঙ্গে শেয়ার করেন। তাহলে অস্থিরতা একটু কমবে। কিন্তু জয়িতা তাঁকে কথা বলতে বারণ করেছে।

এই অবস্থায় প্রায় একই সঙ্গে দুটো কাণ্ড ঘটল। লালুবাবু এবং জয়িতার সুটকেস দুটো একটার পেছনে আরেকটা বেল্ট বেয়ে এল। জয়িতা এগিয়ে গিয়ে চটপটে হাতে সুটকেস দুটো ট্রলিতে মাত্র তুলেছে, রিসিভ করতে আসা লোকজনের মধ্য থেকে কালো রঙয়ের সুট পরা এক ভদ্রলোক তাদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়তে লাগল। মুহূর্তেই মানুষটিকে চিনতে পারলেন লালুবাবু। আবদুল ওয়াদুদ খান। তার পাশে খোকন ছেলেটিকেও দেখতে পেলেন তিনি। লালুবাবুকে তাকাতে দেখে হাসিমুখে খোকনও হাত নাড়ছে। জামাল খানের সঙ্গে এই দুজনও তাদের কালনার বাড়িতে নিমন্ত্রণ করতে গিয়েছিল। গতরাতে ওয়াদুদ খান টেলিফোনও করেছিল। এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে আসবে বলেছিল।

মানুষ দুজনকে দেখে আনন্দ উত্তেজনায় বুক ভরে গেল লালুবাবুর। হাসিমুখে অস্থির ভঙ্গিতে তিনিও হাত নাড়তে লাগলেন। জয়িতার দিকে তাকিয়ে বললেন, ওই তো ওরা এসেছে!

নিয়ম।

জয়িতা গম্ভীর গলায় বলল, তাতো দেখতেই পাচ্ছি।

এবার লালুবাবু একটু বিরক্ত হলেন। কিন্তু তুই এতো গম্ভীর কেন? এখান থেকে না বেরোনো পর্যন্ত গম্ভীরই থাকব আমি।

কেন?

এটা আমার স্বভাব। কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত গম্ভীর থাকি। কাজ তো শেষই।

না এখনও বাকি আছে।

এখন আর কী বাকি ?

কাস্টমস।

ওখানে সময় লাগবার কথা নয়।

কেন ?

আমার সঙ্গে নিজেদের কাপড়চোপড় ছাড়া আর কিছু নেই।

তবুও সময় লাগবে। ব্যাগ সুটকেস ওঁরা খুলবেন। চেক করবেন। এটা নিয়ম।

কিন্তু কাস্টমসে কোনো সময়ই লাগল না। কাস্টমস এরিয়াতে আসার সঙ্গে সঙ্গে সাদা পোশাকের এক ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন ওঁদের সামনে। বিনীত গলায় বললেন, দাদা, আপনার নাম কি লালুদাস ?

লালুবাবু চমকালেন। হ্যাঁ, কেন বলুন তো!

আপনারা আমার সঙ্গে আসুন।

জয়িতা বলল, আমাদের কাস্টমস করাতে হবে না?

না। আমরা গ্রিন চ্যানেল দিয়ে চলে যাব।

শুনে অনেকক্ষণ পর জয়িতার মুখে হাসি ফুটল। লালুবাবুর দিকে

তাকিয়ে বলল, তার মানে ওঁরা ব্যবস্থা করে রেখেছেন।

এল।

লালুবাবু অহঙ্কারী গলায় বললেন, নিশ্চয়।

চলো তাহলে।

যাচ্ছি তো।

ভদ্রলোকের পেছন পেছন দাদু নাতনি দুজন গ্রিন চ্যানেল দিয়ে বেরিয়ে

ওদেরকে দেখেই ওয়াদুদ খান এবং খোকন সামনে এসে দাঁড়াল। ব্যস্তভঙ্গিতে জয়িতার ট্রলির হ্যান্ডেল ধরল খোকন। তুমি ছাড়ো। এটা আমি ঠেলে নিবনে।

জয়িতা মিষ্টি হেসে সরে দাঁড়াল। ভালো আছেন, খোকনদা? খোকনও হাসল। এই তো আছি।

লালুবাবু তখন ওয়াদুদ খানের সঙ্গে কথা বলছেন। ওয়াদুদ খান জিজ্ঞেস করেছেন, রাস্তায় কোনো অসুবিধা হয়েছে কি না!

লালুবাবু বিগলিত গলায় বলছেন, আরে না না! কিসের অছুবিধা! বেশ ভালোভাবে এলুম। তোমরা তো দাদা এমন ব্যবস্থা করে রেখেছ যে আমাদের লাগেজ পর্যন্ত খোলেনি। গ্রিন চ্যানেল দিয়ে বেরিয়ে এলুম।

ওয়াদুদ খান তাঁর স্বভাবসুলভ হাসিমুখে বললেন, আমাদের এক ছোটভাই কাস্টমসের খুবই অনেস্ট অফিসার হিসেবে পরিচিত। নাম হইতেছে হুমায়ুন হাফিজ। আপনেরা আসবেন শুইনা সে সব ব্যবস্থা কইরা রাখবে।

ওয়াদুদ খানের কথা শুনে হাসি আনন্দে ভরা মুখটা আরো উজ্জ্বল হয়ে গেল লালুবাবুর। বিগলিত গলায় বললেন, এই তো আমাদের বিক্রমপুরের ভাষা শুনতাছি। আহা বুকটা ভইরা গেল।

ওয়াদুদ খান বললেন, আমি শুদ্ধভাষা কইতে চাই না। বিক্রমপুরের ভাষায় কথা কইয়া আরাম পাই।

যতদিন থাকুম আমিও ওই ভাষায়ই কথা কমু।

জয়িতা বলল, তবে আমার সঙ্গে নয়।

খোকন বলল, ক্যা?

বিক্রমপুরের সব শব্দের অর্থ আমি বুঝব না।

লালুবাবু বললেন, তুই বুজবি কেমতে? তুই কি আর বিক্রমপুরের মাইয়া? তুই হইলি ইন্ডিয়ান। কালনার মাইয়া। ঠিক আছে, তর লগে আমি হালুম হুলুম ভাষায়ই কথা কমুনে। আমি তো ঘটিভাষাও মন্দ জানি না। কথা বলতে বলতে গাড়ির কাছে এল ওরা।

গাড়ি রাখার লাইনে ঝকঝকে নূতন একটা মাইক্রোবাস দাঁড়িয়ে আছে।

ড্রাইভার বিনীত ভঙ্গিতে সুটকেস দুটো তুলে রাখল কেরিয়ারে। খোকন বসল ড্রাইভারের পাশের সিটে। পেছনে জয়িতা, লালুবাবু আর ওয়াদুদ খান।

মুহূর্তে এয়ারপোর্ট এরিয়া থেকে বেরিয়ে এল গাড়ি।

গাড়ির জানালা দিয়ে মুগ্ধচোখে ঢাকা শহর দেখছিলেন লালুবাবু। জয়িতাও দেখছিল। কিন্তু লালুবাবুর মতো মুগ্ধতা ওর চোখেমুখে ছিল না। এয়ারপোর্ট রোডের দুপাশ দেখতে দেখতে লালুবাবু বললেন, এই ঢাকা আমি দেখি নাই। আমি দেখছি পুরান ঢাকা।

ওয়াদুদ খান বললেন, আমরা পুরান ঢাকায়ই যাইতাছি। কোথায়?

পুরানা পল্টন।

আরে পুরানা পল্টন তো বিখ্যাত জায়গা। বুদ্ধদেব বসু থাকতেন।

ও আইচ্ছা। তয় সেই পুরানা পল্টনও আর নাই। দেখলেই বুজতে

পারবেন।

জয়িতা বলল, আমরা কি কোনো বাড়িতে উঠব না হোটেলে? হোটেলে। খুব ভালো হোটেল। নতুন হইছে। থ্রি স্টার।

কী নাম?

গ্র্যান্ড আজাদ হোটেল।

তারপর ওয়াদুদ খান বললেন, লালুদা, আপনের লগে গোবিন্দর কথা হয় নাই?

হইছে। কাইল রাইতে তোমার ফোনের পর গোবিন্দ ফোন করছিল। কী কইলো?

কইলো তালুকদার ফ্যামিলি লইয়া কাইল আসব ওরা।

হ তা আমিও জানি। আমার লগেও কথা হইছে।

সামনের সিট থেকে খোকন বলল, জলধর ডাক্তারের লগে আপনের কথা হয় নাই?

হইছে।

কী কইলো?

আসতে পারব না যে, এর লেইগা মন খারাপ করছে।

ওয়াদুদ খান বললেন, তার লেইগা আমরাও মন খারাপ করতাছি। এলাকার বেবাক মাইনষে চাইছে আর যে আসুক না আসুক জলধর ডাক্তার য্যান আসে। সে তো আমগ এলাকার খুব পপুলার ডাক্তার আছিল।

আরে আমারে আর সেইটা কী কইবা? তাকি আর আমি জানি না। আমি তোমগ থিকা অনেক ভালো জানি। আমরা যখন দেশ ছাড়ি জলধর ডাক্তার তখনও দেশে। তখনও দাপটের সঙ্গে এই গ্রাম সেই গ্রামে ডাক্তারি কইরা বেড়ায়। মাইনষে বহুত সম্মান করত তারে।

লালুবাবুর কথাবার্তা শুনে মুখ টিপে টিপে হাসছে জয়িতা। হঠাৎই ব্যাপারটা খেয়াল করলেন লালুবাবু। বললেন, কী রে, হাসতাছস ক্যা?

তোমার কথা শুনে। বিক্রমপুরের ভাষা খুবই ভালো বলতে পারছ। পারুম না? যতদিনই যাউক আপনভাষা কি কেউ ভোলে! এটা অবশ্য আমি সেদিনই বুঝেছিলাম।

কোনদিন?

খোকনদারা যেদিন আমাদের কালনার বাড়িতে গেল।

ও । অগ লগে কথা কইতে দেইখা বুজছিলি?

হ্যাঁ। মুহূর্তে আমাদের ভাষা ভুলে বিক্রমপুরের ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছিলে তুমি।

কিন্তু দাদু নাতনির কথা যেন শুনতে পাচ্ছিলেন না ওয়াদুদ খান। আবার জলধর ডাক্তারের প্রসঙ্গে ফিরলেন তিনি। জলধর ডাক্তারের কালনার বাড়িতে তো দুইবার গেলাম আমি, তয় দেশ ছাইড়া সে না গেলেও পারত। দেশে থাকলে সে অনেক আরামে থাকত। কালনায় তার বাড়িঘর, কাপড়চোপড় আর অন্যান্য অবস্থা দেইখা আমরা বুজছি, ওইখানে সে ভালো নাই।

লালুবাবু বললেন, তা ঠিকই কইছো। দেশে তাগো যেই অবস্থা আছিল ওইটা কালনায় কই পাইবো!

খোকন বলল, তয় সে গেল ক্যা?

গেছিল অভিমান কইরা।

কিয়ের অভিমান?

দেশে কারা কারা বলে তারে অপমান করছিল।

ওয়াদুদ খান বললেন, হ এইটা আমরাও শুনছি। সাতঘইরা না শিমইল্লা কোন গ্রামে মাত্র হইছে এমুন বাচ্চা চিকিৎসা কইরা বাঁচাইতে পারে নাই দেইখা ওই বাড়ির একজনে বলে তার গায়ে হাত তুলছিল। এইটা তার খুব সম্মানে লাগছিল।

খোকন বলল, লাগনের তো কথা ঐ।

এর লেইগাই চইলা গেল।

তয় এইবার আসনের খুব ইচ্ছা আছিল। তাগো বাড়ি কাজির পাগলা গ্রামে, কাজির পাগলা স্কুলের ছাত্র আছিলেন, পরে গভার্নিং বডির মেম্বার। আবার কাজির পাগলা বাজারেই ডাক্তারি করছেন। ডিসপেনসারি আছিল বাজারে। এত স্মৃতি যেইখানে সেইখানে মাইনষে না আসতে চায়নি।

লালুবাবু বললেন, মনে হয় তার ছেলেরা আসতে দেয় নাই। বিরাশি তিরাশি বছর বয়স হইছে, এই বয়সে একদেশ থিকা আরেক দেশে আসা! তয় দাদার খুব ইচ্ছা আছিল। এই জীবনে তো আর আসা হইব না। এইটা একটা সুযোগ আছিল। কাজির পাগলা স্কুলের শতবর্ষপূর্তি। এলাকার মানুষজন কলকাতা কালনা এই সমস্ত জাগায় গিয়া স্কুলের পুরানা ছাত্রগ খুঁইজ্জা বাইর করছে, প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের লোকজনরে খুঁইজ্জা বাইর করছে, দাওয়াত দিছে, প্লেনে আসা যাওয়ার টিকিট পাঠাইছে, এই আন্তরিকতা কী আর কেউ কোনোদিন পাইবো!

ওয়াদুদ খান বললেন, তবে গোবিন্দর সাহাইয্য ছাড়া আপনেগ বিচড়াইয়া আমরা বাইর করতে পারতাম না। গোবিন্দ খুব খাটছে। নিজের ব্যবসা বাণিজ্য ফালাইয়া আমগ লগে স্কুলের কামে দৌড়াদৌড়ি করছে।

খোকন বলল, কইলকাতায় থাইক্কাও গোবিন্দদায় কইলকাতাইয়া হইয়া যায় নাই। অহনও বিক্রমপুইরাই আছে। একদোম আমগ মতন। টেকা পয়সার হিসাব করে না। দমদমের সামনে গোবিন্দ ঘোষগ বাড়িরে সবাই কয় জাপানী বাড়ি। বাড়িড়া সবাই চিনে। তারা অহন ম্যালা টেকা পয়সার মালিক।

ওয়াদুদ খান বললেন, গোবিন্দ খুব ভালো ব্যবসা করে। দিনে ওর অন্তত তিনশো ট্রাক বাংলাদেশে আসে। কয়দিন আগে পশ্চিমবঙ্গের বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ডেলিকেট হিসাবে বাংলাদেশে আসছিল।

লালুবাবু বললেন, অর বাপের কথা তোম মনে আছে?

খোকনের থাকনের কথা না। আমার আছে।

খোকন হৈ হৈ করা গলায় বলল, আমারও আছে। কাজির পাগলা বাজারে গোবিন্দদার বাবা গান্ধি ঘোষের মিষ্টির দোকান আছিল। এই মোটা কালা শ‍ইল লইয়া গান্ধি ঘোষ মাঝে মাঝে আইয়া দোকানে বইত। দেখছি না তারে।

ওয়াদুদ খান বললেন, আসল জিনিসটা কলাম কইলা না। কোনডা?

গান্ধি ঘোষের চুল যে লাম্বা আছিল…

হ হ খোপা কইরা রাখত।

গাড়ি তখন মহাখালি এলাকায় এসেছে। এদিকটায় বিশাল ফ্লাইওভার হচ্ছে। রাস্তাঘাট এলোমেলো। মাথার ওপরে ফ্লাইওভারের কাজ চলছে, বিশাল একটা জ্যামও লেগে গেছে কোন ফাঁকে। বেশ অনেকক্ষণ ধরে আটকে রইল গাড়িটা।

লালুবাবু বললেন, ঢাকা তো এক সময়কার কইলকাতারেও ছাড়াইয়া গেছে। রাইত হইয়া গেছে তাও রাস্তায় এমুন জাম আর এত লোকজন! খোকন বলল, ঢাকায় এখন লোক থাকে কত জানেন দাদা? না। কত?

অনুমান করেন তো?

পঞ্চাশ ষাইট লাখ।

এক কুটি বিশ লাখ।

কথাটা শুনে আঁতকে উঠলেন লালুবাবু। কী?

হ। এক কুটি বিশ লাখ লোকের টাউন এখন ঢাকা। সর্বনাশ! তয় তো এমুন হইবঐ।

ওয়াদুদ খান বললেন, তাও রাইত দেইখা আপনে কিছু টের পাইতাছেন না। আপনে তো একদিন আগে আইছেন, কাইল দিনের বেলা ঢাকা শহরে বাইর হইলে টের পাইবেন কী পরিমাণ লোক আর কী পরিমাণ জাম। কোনো কোনো রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বইসা থাকতে হয়। আমি তো কাপোড়ের বিজনিস করি, আমার একটা অফিস হইল ইসলামপুরে। ইসলামপুরটা হইল বাংলাদেশের সবথিকা বড় কাপোড়ের ব্যাবসার জাগা। তয় দাদা, ওই এলাকায় গাড়ি লইয়া যাওন যায় না।

লাগে।

কেন?

জাম। গুলিস্তানের পর থিকা যে শুরু হয়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বইসা থাকন

জয়িতা বলল, তাহলে যাওয়া আসা করেন কী করে?

ওয়াদুদ খান হাসলেন। আমি থাকি ধানমন্ডিতে। ওখান থিকা গাড়ি লইয়া গুলিস্তান তরি যাই। তারপর গাড়ি ছাইড়া রিকশা লই। যতটা পারি রিকশায় যাই। বেশি জাম থাকলে রিকশা ছাইড়া হাঁটি। তারপর আবার রিকশা আবার হাঁটা এইভাবে যাই।

লালুবাবু বললেন, যেভাবেই যাইতে হোক পুরানা ঢাকায় আমি যামু ঐ। দরকার হইলে রিকশাও লমু না, হাঁইটা যামু।

খোকন বলল, যাইতে চান কই কই? তাঁতীবাজার, সদরঘাট, শ্যামবাজার, গেন্ডারিয়া। জাগাগুলি সব কাছাকাছিই। যাইতে চান কবে? কাইল ঐ।

হ আপনের তো একখান সুবিদা আছে। আপনে আইছেন একদিন আগে। আমগ অনুষ্ঠান হইল পোনরো ষোল্লো দুইদিন। আপনে আইলেন আইজ তেরো তারিখ। কাউলকার দিনডা আপনে পাইতাছেন।

ওয়াদুদ খান বললেন, কিন্তু কাইল বিয়ালেই আমরা বিক্রমপুর চইলা যাইতে চাই।

হ তাতো যামু ঐ।

তয় দাদার কাইল পুরানা টাউন দেখতে যাওনের কাম নাই। কাইল রেস্ট নেউক। অনুষ্ঠান শেষ হওনের পরও তো দাদায় আরও পাঁচদিন থাকব। তহন তারে পুরা ঢাকা টাউন ঘুরাইয়া দেহামুনে।

অনেকক্ষণ পর জয়িতা এবার কথা বলল, হ্যাঁ, সেটাই ভালো হবে। দেখা গেল আমরা পুরনো ঢাকা দেখতে বেরিয়ে টাইমলি আর ফিরতেই পারলাম না। সব গুবলেট হয়ে গেল।

লালুবাবু বললেন, কিন্তু আমার তো তর সয় না।

একটু কষ্ট করে চেপে থাকো। তরটা তো সওয়াতে হবে।

গাড়ি হোটেলের সামনে এসে দাঁড়াল সোয়া আটটার দিকে। হোটেলের জাঁকজমক দেখে জয়িতা এবং লালুবাবু মুখ চাওয়া চাওয়ি করলেন। পাশাপাশি দুটো সিঙ্গেল বেডের রুম দাদু নাতনির জন্য। রুম দেখে লালুবাবু বললেন, এত দামি হোটেল আমগ লেইগা নেওনের কী কাম আছিল! আমরা আরো ছোট হোটেলেও থাকতে পারতাম।

খোকন বলল, আপনেরা দাদা আমগ গেস্ট। আমরা আপনেগ ভালো জাগায় ঐ রাখতে চাই।

লালুবাবু একটু মন খারাপ করলেন। গেস্ট বইলো না ভাই। শোনলে মনডা খারাপ হয়। গেস্ট তো আছিলাম না, আছিলাম তো আপনা মানুষ। অহন গেছি পর হইয়া। নিজের দেশও এখন আর নিজের দেশ না। নিজের দেশে আইছি গেস্ট হইয়া।

লালুবাবুর দুঃখটা বোধ হয় অন্য তিনজন সেভাবে বুঝল না।

ওয়াদুদ খান বললেন, দাদা, গরম পানি দিয়া গোসল কইরা ফালান। আরাম লাগবো। জয়িতা, তুমিও ফ্রেস হইয়া নেও। তারপর নিচের রেস্টুরেন্টে গিয়া ডিনার সারব আমরা। যদি বাংলাদেশী খাবার খাইতে চাও তাইলে যাইতে হইব নিচের রেস্টুরেন্টে আর চাইনিজ খাইতে চাইলে পোনরো তালায়। ওইখানে সোন্দর চাইনিজ রেস্টুরেন্ট আছে।

জয়িতা বলল, ওসব পরে ভাবা যাবে। আগে ফ্রেস হই। জয়িতা তার রুমে চলে গেলে।

কিন্তু জয়িতা খেতে চাইল চায়নিজই। বাংলাদেশের চায়নিজের কী রকম স্বাদ এটা তার জানা দরকার। কালনায় ফিরে গিয়ে বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে গল্প করতে হবে না! একুশ বছর বয়সের টগবগ করে ফুটতে থাকা মেয়ে। সব কিছুতেই গভীর আগ্রহ। তার আগ্রহের কারণেই লালুবাবু বাধ্য হয়েছেন সঙ্গে আনতে। স্কুলের শতবর্ষপূতি অনুষ্ঠানে তিনি আসবেন শুনেই জয়িতা তাঁকে ধরেছিল। আমাকেও সঙ্গে নিতে হবে।

লালুবাবু অবাক হয়েছিলেন। তোকে নেবে কেমন করে? ওরা তো একজনের টিকিট দেবে।

কী দেবে না দেবে আমি জানি না। আমাকে নিতে হবে।

সমস্যাটা মিটিয়েছিল লালুবাবুর মেয়ে, জয়িতার মা রমা। সে বলেছিল, তুমি ওদেরকে বলো তোমার বয়স হয়েছে। একা চলাফেরা করতে পারো না। এজন্য যেখানে যাও জয়িতাকেও সঙ্গে নিয়ে যাও। সে তোমার দেখাশোনা করে।

সেভাবেই ওয়াদুদ খানদেরকে কথাটা ফোনে বলেছিলেন লালুবাবু। যদিও বলতে ভালো লাগেনি, মনে হয়েছে দেশের মানুষের সঙ্গে একটা চালাকি করছেন তিনি। মনের ভেতরটা খুঁতখুঁত করেছে।

কিন্তু ওয়াদুদ খানরা এটাকে কোনো ব্যাপারই মনে করেননি। দুজনের টিকিট এবং অন্যান্য খরচের জন্য দুশো ডলারও পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। সেই ডলার ভাঙাবার সুযোগও পাননি লালুবাবু। কালনা থেকে কলকাতা, কলকাতা থেকে দমদম নিজের পকেটের টাকায়ই এলেন। আর ঢাকায় এসে নামার পর থেকে তো ওয়াদুদ খানদের সঙ্গেই।

তবে গ্র্যান্ড আজাদ হোটেলের চায়নিজ রেস্টুরেন্টের জাঁকজমক আর ফুড কোয়ালিটি দুটোই জয়িতাকে খুব মুগ্ধ করেছে। গভীর আগ্রহ নিয়ে রেস্টুরেন্টের ইন্টেরিয়ার ডেকোরেশান খেয়াল করল সে, প্রতিটি খাবার মুগ্ধ হয়ে খেল।

লালুবাবুর মুগ্ধতাও কম ছিল না। দুজন মানুষের এইসব মুগ্ধতা ওয়াদুদ খান এবং খোকন খুবই এনজয় করছিল।

খাওয়া দাওয়া শেষ করে রুমে ফিরতে ফিরতে পৌনে দশটা। ওয়াদুদ খান আর খোকন রুমে ঢুকল না। লালুবাবুর রুমের সামনে দাঁড়িয়ে ওয়াদুদ খান বললেন, আমরা সকালবেলা আর আসুম না। তিনটার দিকে খোকন একটা গাড়ি লইয়া আসবো, আপনেগ বিক্রমপুর লইয়া যাইবো। সকালের নাস্তা, দুপুরের খাওয়া আপনেরা আপনেগ পছন্দমতো খাইয়া লইবেন। কোনোখানে কোনো বিল দিতে হইব না। বিলে শুধু সই কইরা দিবেন। হোটেলের মালিক আজাদ সাহেব আমার পরিচিত। আমি সব ব্যবস্থা কইরা রাখছি।

তারপর পকেট থেকে খুচরো কিছু টাকা বের করে লালুবাবুর হাতে দিলেন। এইখানে হাজারখানি টাকা আছে। এইটা রাখেন।

লালুবাবু অবাক। এইটা ক্যা?

রাখেন। যদি দরকার টরকার হয়। আপনেগ লগে আমার দেখা হইব কাইল রাইতে, আপনেগ গ্রামে। মানে কুমারভোগে?

হ। শতবর্ষপূর্তি উদযাপন কমিটির চেয়ারম্যান ওসমান গনি তালুকদার সাবরে তো চিনেন।

হ চিনি। দ্বিতীয়বার তোমার লগে কালনায় আমগ বাড়িতে গেছিল তো! সঙ্গে আবুল বাসার সাহেবও আছিলেন।

হ। সে হইল স্কুল ম্যানেজিং কমিটির চেয়ারম্যান।

জয়িতা বলল, তবে তাঁরা দুজনেই খুব ভালো মানুষ।

ওয়াদুদ খান বললেন, ওসমান গনি তালুকদার সাবের বাড়ি কুমারভোগ। কলকাতার গেস্টরা অনেকেই থাকব তার বাড়িতে। শুধু শ্যামলাল দাস থাকবেন আমগ বাড়িতে। কেউ কেউ আবার মেদিনী মণ্ডলের আউয়াল তালুকদার সাবের বাড়িতেও থাকব।

মোট গেস্ট কতজন?

তিরিশজনের মতন। যাহোক, কাইল বিকালেই সব গেস্ট আইসা পড়ব। আমি তাগো লইয়া কুমারভোগ চইলা যামু। আপনেগ লইয়া যাইব খোকন।

আইচ্ছা।

তারপর দাদু নাতনি যে যার রুমে ঢুকে শুয়ে পড়েছে।

জয়িতার একটু বেলা করে ওঠার অভ্যেস। ঘুম ভাঙার পর সকালবেলার কাজগুলো সারতে সারতে সাড়ে নটা বেজে গেছে। তারপর দাদুর রুমে ফোন করেছে সে। এখন নিচে গিয়ে নাশতা করবে।

কিন্তু ফোন বেজে যায়, কেউ ফোন ধরে না।

তার মানে কী? দাদু কি তাহলে বাথরুমে! কিন্তু এসময় তো বাথরুমে তাঁর থাকার কথা না। তিনি ঘুম থেকে ওঠেন খুব সকালে। বাড়ির অন্যান্য লোকজন ওঠার আগে তিনি তাঁর সব কাজ সেরে ফেলেন। এমন কি সকালবেলার ঘণ্টাখানেক বেড়ানো পর্যন্ত।

আজ তাহলে এখন ফোন ধরছেন না কেন? হয়তো বাথরুমেই আছেন। মিনিট পাঁচ সাতেক পর আবার ফোন করল জয়িতা। রিং বেজে যাচ্ছে। একবার দুবার তিনবার। ফোন ধরছেন না লালুবাবু।

এবার খুবই চিন্তিত হলো জয়িতা। কী ব্যাপার? দাদু কি তাহলে রুমেই নেই? কিন্তু কোথায় যাবেন তিনি? একা একা কোথায় যাবেন! জয়িতাকে ফেলে নিশ্চয় নাশতা খেতে যাবেন না। যদি খিদে লেগে থাকে তাহলে তো জয়িতার রুমে ফোন করে তার ঘুম ভাঙাতেন! চিন্তিত ভঙ্গিতে রুম থেকে বেরুল জয়িতা। দাদুর রুমের সামনে দাঁড়িয়ে ডোরবেল বাজাতে লাগল। কিন্তু লালুবাবু দরজা খুললেন না।