মায়াবী বন্ধন

সামনে যেতে-যেতে লোকটা বারবার কেন যে

থেমে গিয়ে

ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায়,

আমরা ভেবে মরি, কিন্তু আসমান-জমিন

ভেবেচিন্তে কিচ্ছুই বুঝি না।

ও কি কোনো দরকারি কাগজপত্র কিংবা ডাকে ফেলবার লেফাফা,

কিংবা অন্য-কিছু –

এই যেমন টিপিনের বাক্স, ছাতা, ঘড়ি,

রুমাল, ডট-পেন,

প্লাস-পাওয়ারের চশমাজোড়া,

কিংবা ওইরকমই কোনো দরকারি জিনিস –

ভুল করে বাড়িতে

ফেলে পথে বেরিয়েছে নাকি?

অথবা ট্যাক্সি কি মেট্রো কিংবা মিনিবাসের ভাড়াটা

হয়তো সঙ্গে আনা হয়নি এই কথা হঠাৎ

মনে পড়ে গেছে।

আর তাই লোকটা কি হাঁটতে-হাঁটতে ওইরকম

থেমে গিয়ে

একবার পকেটে হাত ঢোকাচ্ছে, একবার

কাঁধের ঝোলায়?

তা নইলে অমন করে পিছনে বারবার

তাকাচ্ছে কেন হে?

দেওয়ালের ক্যালেন্ডার নিঃশব্দ চিৎকারে বলছে, ‘ওহে,

এখন শ্রাবণ মাস, ভরা বর্ষা, গাঁয়ে-গঞ্জে এবং শহরে

উদয়াস্ত শুধু

অঝোরে বৃষ্টির ধারা ঝরিয়ে এখন

মানুষকে ঘরবন্দি করে রাখবার সময়।’

অথচ আকাশে

আদিগন্ত কালি লেপে দিয়ে

জলভরা মেঘের সেই আড়ম্বর দেখছি না কোত্থাও।

আদৌ হচ্ছে না বৃষ্টি তা বলছি না, তবে

নিয়মরক্ষার মতো নিতান্ত এক-আধ পশলা বৃষ্টির পরেই

রাস্তাঘাট

রোদ্দুরে ঝলমল করে ওঠে,

আকাশের গামলা থেকে উপচে পড়ে নীল, মনে হয়

ভুল করে বর্ষার মঞ্চে শরৎ ঢুকেছে,

গোটা দৃশ্যপট পালটে যায়।

আমরা এই ফ্ল্যাটবাড়ির ছোট্ট বারান্দায়

দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখি; যেমন আকাশ, রাস্তাঘাট,

ঘরবাড়ি, রোদ্দুর,

তেমনি ওই আলাভোলা লোকটিকেও দেখি।

লোকটি আজও হাঁটতে-হাঁটতে থেমে গিয়ে ঢোলা পাঞ্জাবির

পকেট হাতড়েছে আর কাঁধের ঝোলাতে

কিছু-একটা খুঁজেছে। (সেটা কী,

তা একমাত্র ঈশ্বর জানেন।) তারপর

একবার মাটিতে চোখ নামিয়ে, একবার

আকাশে চোখ তুলে

ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাচ্ছে রোজকার মতো পিছনের দিকে।

কে জানে ও সামনে আর না হেঁটে এখন

ফিরতে চাইছে কি না।

কী যে খুঁজছে, কী যে চাইছে, আমরা বিন্দুবিসর্গ জানি না।

মানুষের মন বোঝা কি সহজ ব্যাপার?

যাঁর কাছে সহজ, সেই অশীতি-উত্তীর্ণা পিতামহী

সহাস্য বললেন, “এতে এত

বুঝবার কী আছে? ওই খোঁজাখুঁজি তো আর কিছু না,

মস্ত একটা ছল।

আসলে লোকটা ওর বাড়ি থেকে বেরিয়ে তবুও

চক্ষের আড়ালে যেতে চাইছে না মোটেই,

ঘোরাঘুরি করছে সারাক্ষণ

কষ্ট করে গড়ে তোলা ঘর-সংসারের কাছাকাছি,

যার শেকড় ছড়িয়ে গিয়েছে ওর মনে।

ও তো দূরে কক্ষনো যাবে না,

ও আটকে রয়েছে ওরই সংসারের মায়াবী বন্ধনে।”

কথাটা শেষ করে তিনি একটু হেসে বললেন, “যেমনআমিও আটকে পড়ে আছি।”