মিলু কত্তা

ঝলমলে রোদটা ফিকে হতে হতে কপাল হয়ে নাক পর্যন্ত এসে থমকে দাঁড়াল। রোদটাকে অসহ্য লাগছিল মিলুর। কেমন তেরছা হয়ে রোদটা বুনো মোষের মতো তার পিঠে লাফিয়ে পড়ছিল। ঘামে মিলুর শার্ট ভিজে একসা।

মিলু যখন মায়ের সঙ্গে রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে তখন মধ্যদুপুর।

আনোয়ারা বেগম রান্নাঘরেই ছিলেন। বাড়িতে সবসময় কাছের-দূরের আত্মীয়স্বজন লেগেই থাকে। রান্নাবান্নার চাপটাও তাই তাকে একহাতেই সামাল দিতে হয়। তিনি টের পেলেন, তার মেজো ছেলে বাড়ির দরজা পেরিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে আসছে।

ছেলেটা দিন দিন কেমন যেন বড়দের চেয়ে বড় হয়ে যাচ্ছে। গিয়াসউদ্দিন খান একদিন আনোয়ারাকে বললেন, ‘আইছছা আনু, মিলু কত্তা কি আমগো মাইজ্জা পোলা, না বড় পোলা! অয় দেহি দিনকে দিনকে খালি বড়ই হইতাছে।’ বলে গিয়াসউদ্দিন খান দু-হাত দুদিকে বাড়িয়ে দিলেন।

স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে আনোয়ারা বেগম হাসলেন শুধু। কিছু বললেন না। কী বলবেন!

গিয়াসউদ্দিন খান তার মেজো ছেলেকে আদর করে ডাকেন মিলু কর্তা। বিক্রমপুরের উচ্চারণে কর্তাকে তিনি কত্তা বলেন।

মিলু স্কুল থেকে ফিরল দুপুরের আগে আগে। গেন্ডারিয়া হাই স্কুল। সকালে নাস্তা খেতে ইচ্ছে করেনি বলে সে একটা রুটি চা দিয়ে ভিজিয়ে খেয়েছে। বেলা গড়াতেই মিলুর খুব ক্ষুধা লেগেছে। ক্ষুধা লাগলে মিলুর মাথা লাট্টুর মতো ঘুরতে থাকে। সে সব সহ্য করতে পারে কিন্তু ক্ষুধা সহ্য করতে পারে না। ক্ষুধা লাগলে তার মেজাজটা কেমন যে হয়ে যায়।

স্কুল থেকে ফিরে মিলু রান্নাঘরের দরজাকে আড়াল করে দাঁড়ায়। দরজায় দাঁড়িয়ে থেকে মায়ের দিকে তাকিয়ে মিলু বলল, ‘মা খিদা লাগছে, ভাত দাও।’

মিলুর কথায় মা ঘুরে মিলুকে দেখে হাসলেন। ছোট্ট রান্নাঘর। পাশাপাশি মাটির দুটো চুলা। চুলার ওপর হাঁড়ি। হাঁড়ির ভেতর টগবগ করে ভাত ফুটছে। কেমন ঘন হয়ে পাঁক খেয়ে খেয়ে ভাতের দানাগুলো হাঁড়ির ভেতর থেকে বাইরে পড়ে যাওয়ার উপক্রম।

মা বললেন, ‘তরকারি হয়া গেছে। তুই হাত-মুখ ধুইয়া আয়, আমি তরে খাওন দিতাছি।’

মিলুদের বাড়িটা কাঠের পুলের কাছে। ছোট্ট একটা গলি। এলাকার লোকজন এই গলিটাকে বলে কানাগলি। পুরান ঢাকায় কানাগলি হলো যে-গলির শেষ মাথা দিয়ে আর বের হওয়ার কোনো পথ থাকে না। মিলুদের বাড়িটা গলির একেবারে শেষ মাথায়। ওদের বাড়ির পেছনের দিক দিয়ে আরেকটা ভাঙাচোরা লোহার দরজা আছে। সেই দরজা দিয়ে মিলুরা কখনো কখনো ডিস্টিলারি রোড, বানিয়ানগর, গেন্ডারিয়া, দীননাথ সেন রোড, ডাইলপট্টির রাস্তায় গিয়ে ওঠে। বিকেলে বন্ধুরা দলেবলে ধূপখোলা মাঠে খেলতে যায়।

মিলুদের বাড়িটা বেশ জায়গা জুড়ে। পুরনো আমলের একতলা এল শেপের লম্বা টিনশেডের বাড়ি। একতলা বিশাল বাড়িতে অনেক ভাড়াটে। সারি সারি ঘর। মিলুরা সেই বাড়িতে দুই ঘর নিয়ে থাকে। আট ভাইবোন, নানিকে নিয়ে মিলুদের বড় সংসার। মিলুদের এত্ত ভাইবোনেরই ঠিকমতো জায়গা হয় না, তার ওপর গ্রাম থেকে আসা বাবার দিককার লতাপাতায় জড়ানো আত্মীয়স্বজনও উটকো ঝামেলা হয়ে মিলুদের বাড়িতে বছর জুড়ে থাকে। ডাক্তার দেখানো, চাকরি খোঁজা, ব্যবসার উছিলায় একবার এলে এদের আর যাওয়ার নামগন্ধ থাকে না। মিলুদের বাড়িতে দিনের পর দিন আত্মীয়স্বজনের এভাবে থাকাটা যেন একটা অলিখিত বিধান।

মিলুর বাবাটাও যেন কেমন!

গ্রাম থেকে চিকিৎসার জন্য আসা, ভাগ্যের অন্বেষণে আসা এসব আত্মীয়স্বজনকে বাবা কখনো কিছু বলেন না। গ্রাম থেকে আসা উটকো ঝামেলা এসব আত্মীয়স্বজনকে নিজের বিছানা ছেড়ে দিয়ে বাবা ঘরের মেঝেতে পাটি বিছিয়ে ঘুমান। এসব নিয়ে মা বাবার ওপর রাগ করলে বাবা উল্টো মাকে বুঝসুঝ দিয়ে বলেন, ‘আনু, তুমি রাগ কইরো না। আমি নিজেও ছোটবেলায় এতিম আছিলাম। আমারও তো যাওনের জায়গা আছিল না, খাওনের জায়গা আছিল না। তুমিই কও, আমি না দেখলে ওগোরে কে দেখবো? ওরা কই যাইবো?’

বাবা যখন এরকম করে মাকে এসব বলতেন তখন বাবার ওপর মায়ের জমে থাকা রাগ বরফের মতো গলে উধাও হয়ে যেত। তিনি বাবাকে কিছু বলতেন না।

এলাকার সবাই মিলুদের চেনে। মিলুর এত ভাইবোন দেখে এলাকার লোকজন মুখ চেপে হাসি-মশকরা করে বলে, গিয়াসউদ্দিন সাহেব মিউনিসিপ্যালিটির কেরানির ছোট চাকরি করে যেভাবে সংসার বড় করে চলেছেন তাতে উনার পরিবার কবে না জানি একটা ফুটবল দল হয়ে যায়।

দুই

মিলুদের বাড়ির সামনে একটু খোলামতো জায়গা। বাড়ির ভাড়াটেরা বিকেলে সেই জায়গায় গল্পগুজব করে। পোলাপানরা হা-ডু-ডু খেলে। গোল দাগের ভেতরে ছেলেপেলের দল হাত পেছনে নিয়ে এক পায়ে লাফাতে লাফাতে কক-ফাইট খেলে। কনুইয়ের ধাক্কায় একজন আরেকজনকে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে।

মিলু মাকে বলল, ‘আমার লাইগা বেগুন ভাজছো।’

দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে সে। দুপুরের রোদ মিলুর ঘাড়ের ওপর দিয়ে মায়ের কপালে এসে পড়ছে আর তাতে তার কপাল শঙ্খের মতো চকচক করছে।

– না বাবা, আইজ খালি তরকারি দিয়াই ভাত খাও। বেগুন আনতে ভুইলা গেছি।

নীল কালচে রঙের বড় গোল গোল বেগুন ভাজা হলে মিলুর আর কিছু লাগে না। গরম ভাতের সঙ্গে বেগুন ভাজা মিলুর খুব পছন্দ। ওরকম বেগুন ভাজা পেলে সে মজা করে খায়। সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় মিলু বারবার মাকে বেগুনের কথা বলে গিয়েছিল। আর এখন কি না মা বলে, বেগুন আনতে ভুইলা গেছি!

মিলুর মেজাজটা মুহূর্তে খারাপ হয়ে গেল। সে রেগে গেল। মাকে কিছু না বলে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

মিলু যখন দরজা থেকে সরে গিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যাচ্ছিল তখন পেছন থেকে মা বললেন, ‘মিলুকত্তা, এই দুফুইরা অক্তে না খায়া কই মেলা করছছ!’

ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় মায়ের কথাগুলো মিলুর কানে গেল। কিন্তু গ্রাহ্য করল না সে। ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে মিলু ভাবে, মাও দেখি বাবার দেখাদেখি তাকে এই দুপুরবেলা মিলুকত্তা-মিলুকত্তা বলে ডাকছে। বাবার মুখে মিলুকত্তা ডাকটা শুনলে মিলুর মনে হয়, সে বুঝি অনেক বড় হয়ে গেছে।

মিলু মায়ের কথা শুনল না। সে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে বাড়ির সামনের কানাগলিটা পার হয়ে বড় রাস্তায় এসে দাঁড়াল। দুপুরের এই সময়টায় পুরো এলাকা নীরব থাকে। কোথাও কেউ খুব একটা থাকে না। রাস্তার দু-ধারের বাড়িঘরগুলোও ঠ্যাটা মালেকের মতো নিশ্চুপ থাকে।

বড় রাস্তায় উঠে মিলুর কী হয় সে জানে না। মিলু রাস্তার মধ্যে সটান দাঁড়িয়ে থাকে। তার মেজাজ খুবই খারাপ হয়ে আছে। আর মিলুর মেজাজ খারাপ হয়ে গেলে তার কিছু ভালো লাগে না। কারুর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। মিলু প্রায় সময়ই এটা করে।

মিলু রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইল। এমন সময় কোত্থেকে একটা দমকা হাওয়া গোত্তা খেয়ে তার পায়ের কাছে এসে পড়ে তাকে বলল, ‘মিলুকত্তা, আপনের মনটা কি খুব খারাপ!’

মিলু উত্তর করল না। তার মেজাজ তো আসলেই ভীষণ খারাপ। সে কি এখন দমকা হাওয়াকে বলবে, ‘হ্যাঁ, পবনভাই, আমার মন খুব খারাপ।’ না, মিলু সে-কথা বলবে না। বাবা তাকে সবসময় বলেন, ‘কখনো নিজের মনের কথা কাউকে বলবি না। নিজের সঙ্গে নিজে বোঝাপড়া করবি। নিজের সঙ্গে নিজে যুদ্ধ করবি।’

মিলু বাবার কথা মানে। সে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। দমকা হাওয়া ঘুরপাক খেতে খেতে দূরে চলে যায়।

তিন

পেটে ক্ষুধা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মিলু চলে এলো ধূপখোলা মাঠে। মাঠের পাশে ঔষধালয়। ওখান থেকে দিনমান একটা ভেষজ ঘ্রাণ পুরো এলাকায় ভেসে বেড়ায়।

গন্ধটা ভারি অদ্ভুত। এই ভেষজ গন্ধটা মিলুর খুব ভালো লাগে। বছরের সবসময় এই গন্ধটা বাতাসে বাতাসে মিলুদের পুরো এলাকায় ঘুরে বেড়ায়। মেঘবাদলার দিনে এই গন্ধটা মিলুর আরো বেশি ভালো লাগে।

দুপুরের খাঁ-খাঁ রোদে ধূপখোলা মাঠে তিন-চারটা ছেলে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। নতুন মাঞ্জা দিয়ে সুতা শুকাতে হলে দুপুরের এই সময়ের ধূপখোলা মাঠ পৃথিবীর সেরা জায়গা। দু-এক ঘণ্টা সুতা ছেড়ে ঘুড়ি ওড়ালে পুরো সুতা শুকিয়ে টানটান হয়ে যায়। ধূপখোলা মাঠের শূন্য আকাশে ঘুড়ি আর দীর্ঘ ডানার চিল উড়ে বেড়ায়।

মিলু মাঠের এক কোনায় একটা গাবগাছের কাছে দাঁড়ায়। আশপাশে ঝাকর-মাকড় বেশ কিছু গাছপালা। সামনে সমুদ্রের মতো বিশাল ওই মাঠ। মাঠের শেষ মাথায় সবুজ টিনের চালে ইস্ট এন্ড ক্লাব। তার পাশে দীননাথ সেন রোড। রজনী চৌধুরী রোড। সীমান্ত পাঠাগার। মনিজা রহমান গার্লস স্কুল। ডিস্টিলারি রোড। শিংটোলা। ডাইলপট্টি। তনুগঞ্জ। বানিয়ানগর। বিনতবিবির মসজিদ। নারিন্দা মোড়। দয়াগঞ্জ। শরৎগুপ্ত রোড। বসুবাজার লেন। মনির হোসেন লেন। ঋষিপাড়া। বেগমগঞ্জ। কোম্পানীগঞ্জ। কাউয়ারটেক।

গাবগাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা ধরে গেলে মিলু গাছের নিচে বসে পড়ল। তার বসার ভাবভঙ্গি দেখলে যে কেউ অনায়াসে বলে দিতে পারবে মিলু মনে হয়

দু-একদিনের ভেতরে আর ফিরে যাবে না বাসায়।

খাঁ-খাঁ রোদ্দুরের ভেতর মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মিলু দূরে দেখতে পেল একটা বালুর ঢেউ।

না, ওটা বালুর ঢেউ না। মিলু ভালো করে তাকাল। ভালো করে দেখার ফলে মিলু বুঝতে পারল, তার চোখের সামনে অনেক দূর থেকে বিন্দুর মতো কিছু একটা বস্তু ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

মিলু একটু অবাকই হলো। দূর থেকে ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে ওঠা বিন্দুটা আস্তে আস্তে তার কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠতে লাগল।

কী অদ্ভুত! বিন্দুটা পূর্ণতা পেতেই মিলু পরিষ্কার দেখতে পেল, তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন বাবা। কয়েক দিনের না কামানো দাড়ি-গোঁফে বাবাকে কেমন অপরিচিত লাগছে। বাবার গায়ে হালকা হলদে রঙের খদ্দরের পাঞ্জাবি। সাদা পাজামা ময়লা হয়ে ফিকে হয়ে আছে। বাবার চোখ কেমন গর্তে বসে গেছে। চেহারায় মলিন ভাব।

প্রখর রোদের ভেতর বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। বাবার কপাল বেয়ে দরদর করে ঘাম পড়ছে।

চার

অনেকদিন পর মিলু বাবাকে দেখল। পাওনাদারদের ভয়ে বাবা বাড়ি ফেরেন না। মাঝে মাঝে বাবা অপরিচিত আগন্তুকের মতো বাড়ি ফেরেন, তা-ও অনেক রাতে। বাবা যখন নিঃশব্দে ঘরে ঢোকেন মিলুরা তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মা বাবাকে ভাত খেতে দেন। কয়েকদিনের শেভ না করা বিপর্যস্ত বাবাকে দেখলে মিলুদেরও চিনতে কষ্ট হবে। বাবা কোনোরকমে নাকেমুখে ভাত গুঁজে তাড়াহুড়ো করে চোরের মতো বিদায় নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। বেরিয়ে যাওয়ার সময় বাবা তার ঘুমিয়ে থাকা ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। চলে যাওয়ার সময় বিড়বিড় করে মাকে বলেন, ‘আনু আমার পোলাপাইনগুলারে বইকো না, মাইরো না।’

বাবার কথায় মা কিছু বলেন না। তিনি তার স্বামীকে বিদায় দিয়ে বুকের ভেতর কান্না চেপে রেখে ছেলেমেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তার খুব ইচ্ছে করে ছেলেমেয়েদের ঘুম থেকে ডেকে তুলে তাদের জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কাঁদতে। গিয়াস সাহেবের ওপর যত অভিমান তার তারচেয়ে বেশি অভিমান নিজের ওপর। ফলে তিনি আর কাঁদতে পারেন না।

মিলু যে গাবগাছটার নিচে বসে আছে বাবা ঠিক তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘মিলুকত্তা, এই দুপুর রইদে তুমি এইহানে! চেহারা এইরকম শুকনা দেহাইতাছে ক্যা? ভাত খাও নাই তুমি?’

‘ভাত খাও নাই তুমি?’ বাবার মুখে একথা শুনে মিলুর হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করল। কিন্তু মিলু কান্নাটা চেপে রাখল।

মিলু কি বাবাকে বলবে, মা তার জন্য বেগুন ভেজে দেয়নি। না, এ-কথাটা বাবাকে বলা যাবে না। মা সবসময় মিলুদের একটা কথা মুখস্থ করা নামতার মতো বলেন, ‘তোমাগো যা কিছু কওনের, চাওনের, হেইগুলা শুধু আমারে কইবা, আমার কাছে চাইবা। বাপের কাছে তোমাগোর কিছু চাওন যাইব না। কী কইছি বুচছো?’

মিলুরা মায়ের কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। মায়ের সঙ্গে মিলুর নানিও গলা মিলিয়ে বলেন, ‘নাতি-নাতিনরা, তোমরা আমার আনুর কথামতো চইল্লো কিন্তুক।’ মিলুরা মা আর নানির কথামতো চলে। তারা বাবার কাছে কোনো আবদার-টাবদার করে না।

আর করবেই বা কেমন করে! বাবার মিউনিসিপ্যালিটিতে ছোট চাকরি। একবার কী কারণে বাবার সেই চাকরিটাও চলে গেল। বাবার যে তখন কী অবস্থা!

বাড়িভাড়া, সংসার খরচ, ছেলেমেয়ের খরচ মেটাতে গিয়ে বাবা অনেক ধার-দেনার মধ্যে পড়ে গেলেন। প্রায় সময়ই পাওনাদাররা বাবার খোঁজে বাসায় আসত। বাবা কখনো কখনো ঘরে থেকেও মাকে দিয়ে পাওনাদারদের বলাতেন, জরুরি কাজে গিয়াস সাহেব ঢাকার বাইরে গেছেন। টাকার ব্যবস্থা হলে উনিই আপনাদের সঙ্গে দেখা করে টাকা ফিরিয়ে দেবেন। কষ্ট করে আপনাদের আর বাড়ি পর্যন্ত আসতে হবে না।

‘ধার নিয়ে টাইমমতো যারা টাকা ফেরত দেয় না তারা আবার কিসের সাহেব! যতসব ফালতু কথা।’ – পাওনাদারদের কেউ কেউ মুখ বাঁকা করে মাকে বলতেন।

পাওনাদাররা মায়ের কথা বিশ্বাস করত কি করত না সেটা বোঝা যেত না। তবে টাকা না পেয়ে ফিরে যাওয়ার সময় তারা মাকে একথা বলে যেতে ভুল করতেন না, ‘আপনার গিয়াস সাহেবকে বলবেন দয়া করে আমাদের টাকাগুলো যেন মেরে না দেন। টাকা দিয়ে উপকার করতে গিয়ে কী যে বিপদে পড়লাম’ – বলতে বলতে পাওনাদাররা মিলুদের দরজা থেকে বিদায় নিয়ে গলি দিয়ে বেরিয়ে যেত। যাওয়ার সময় তাদের কেউ কেউ বাবাকে বাটপার, ফালতু, টাউট বলে গালাগালও করত।

মিলুও কয়েকবার বাবার কথামতো পাওনাদারদের বাবা বাড়ি নেই বলে বিদায় করেছে। মিলুর কথায় তারা বিশ্বাস করত; কিন্তু চলে যাওয়ার সময় সন্দেহভরা চোখে তাদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখেছে সে।

পাঁচ

মিলু বাবাকে কিছু বলল না। আগের মতো মুখ ফুলিয়ে বসে থাকল। গরমে ঘামছে। মিলু এমনিতেই বেশ ফর্সা। রোদের আঁচ পেয়ে তার অমন ফর্সা মুখখানা আরো লালচে হয়ে আছে।

‘আমার চাকরিটাও এমন সময় চলে গেল। এখন আমি যে কী করব’ – কথাগুলো যখন বলছিলেন তখন মিলু খেয়াল করল বাবার মুখে, গালে, চোয়ালে, কপালে, গলায়, নাকে, চোখে কোত্থেকে যেন কালো মেঘের ছায়ার মতো প্রলেপ এসে পড়ছে। বাবা আনমনা হয়ে উঠলেন, ‘তোমার মা কত কষ্ট করে সংসার চালান। তোমরা আনুকে কষ্ট দিও না। মা যেভাবে বলবে, সেইভাবে চলবা’ – এতটুকু বলে বাবা থামলেন।

মাঝে মাঝে বাবা মাকে আনু বলে ডাকেন। ত্রস্ত দৃষ্টিতে বাবা ভালো করে এদিক-ওদিক তাকালেন। বাবা কী এই দুপুরবেলাও পাওনাদারদের ভয়ে তটস্থ হয়ে আছেন! বাবা অস্ফুট স্বরে বললেন, ‘মিলু, তর মারে সারাটা জীবন আমি অনেক কষ্ট দিছিরে বাবা। আনুর অনেক কষ্ট, অনেক -’

বাবা বাকি কথা শেষ করতে পারেন না কিংবা তার মুখ দিয়ে আর কথা বের হয় না। তিনি মিলুর দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন।

বাবার কথা শুনতে শুনতে মিলু বুঝতে পারে ধূপখোলা মাঠের এই বিজন দুপুরে কেউ একজন যেন ধীরে ধীরে তার বুকের ভেতরে জায়গা করে নিতে শুরু করেছে। মিলুর কি হয় সে বুঝতে পারে না। তবে সে এতটুকু বুঝতে পারে, হঠাৎ করে সে বড় হতে শুরু করে। সে দেখতে পায়, মাঠের অন্য প্রান্ত থেকে একটা ঠান্ডা বাতাস চক্কর খেতে খেতে তার দিকে ধেয়ে আসে। মিলু যতটা পারল প্রাণভরে নিশ্বাস নেয়।

দুপুরের গা জ্বালা-ধরা গরমটা এখন আর লাগছে না।

ছয়

মিলু দেখল তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ধূপখোলা মাঠের মাঝ বরাবর একজন মানুষ হেঁটে হেঁটে চলে যাচ্ছেন। মানুষটা একসময় অনেক দূর চলে গেলেন। দুপুরবেলার দস্যি হাওয়া তার পাজামা-পাঞ্জাবি ভেদ করে ফুলে ফুলে উঠছে। মানুষটা মিলিয়ে যাচ্ছেন। মিলুর মনে হলো, দূরবর্তী হতে হতে মিলিয়ে যাওয়া মানুষটা কি তার বাবা, নাকি একটা পালতোলা নৌকা!

মিলুর মন ভালো হয়ে যায়। সে আকাশের দিকে তাকায়। শরৎকালের পরিষ্কার আকাশ। মিলু উঠে দাঁড়ায়। দূরে, বহুদূরে মাঠের একেবারে শেষ মাথায় সে একটা বিন্দু দেখতে পায়। মানুষটা ততক্ষণে বিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

বিন্দু দেখতে দেখতে মিলু ঘরের দিকে পা বাড়ায়।

মিলুকে ঘরে ঢুকতে দেখে আনোয়ারা বেগমের মুখে হাসি ফিরে আসে। বাদল, খোকন, আজাদ তিন ছেলেকে দিয়ে মিলু কই গেছে তা তন্নতন্ন করে তালাশ করিয়েছেন। তারা মিলুর সন্ধান দিতে পারেনি।

মিলু যখন ঘরে ঢুকছে তখন তিনি বেশ ভালো করে তাকে দেখছেন।

মায়ের অমন করে তাকানো দেখে মিলু বেশ অবাক হয়ে গেল, আরে! মা এমন করে আমাকে দেখছেন কেন? আমার কি নতুন করে শিং গজাল!

মিলু মায়ের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘খিদা লাগছে। ভাত থাকলে দেও।’

মা বললেন, ‘এই বেলা যা আছে তা দিয়া কষ্ট কইরা খায়া লও বাবা। রাইতের বেলা তোমারে আমি বেগুন ভাজা দিয়া ভাত খাইতে দিমু।’

– আমার বেগুন ভাজা লাগব না।

– লাগব না কিল্লাইগা! তুমি না দুপুরে খাইতে চাইলা।

– ইচ্ছা করলেই কি খাইতে হইব! বেগুন ভাজা দিয়া ভাত না খাইলে কেউ মইরা যায় না।

মিলু কথাটা এমনভাবে বলল, মা বেশ অবাক হলেন। তার স্বামীর কথা মনে পড়ল। মিলু যেন ঠিক ওর বাবার মতো করে কথাগুলো বলল। ওর বাবা তো ঠিকই বলে, ‘আনু, আমার মাইজ্জা পোলাডা হইছে আমার মতোন। দিন দিন মিলু ওর থিকা বড় হয়া যাইতাছে। শরীরে না ওর কথাবার্তা, চলনবলন।’

মা মিলুর কথা শুনে মনে মনে হাসেন আর চাকরি চলে যাওয়া, পাওনাদারদের ভয়ে ঘর থেকে পালিয়ে

এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়ানো স্বামীর কথা ভাবেন।

দুপুরে ভাত খেয়ে মিলু সাধারণত বিছানায় শুয়ে থাকে। বই পড়ে। ভাইবোনদের সঙ্গে গল্প করে। মিলু আজ এসবের কিছুই করল না। ভাত খাওয়ার পর বড় মানুষ যেমন কাজের জন্য বাইরে বের হওয়ার ভঙ্গি করে মিলুও সেরকম একটা ভঙ্গি করে, দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সে এখন বাইরে যাবে। যাবে ধূপখোলা মাঠে।

মা বললেন, ‘ভাত খাইছোছ। অহন একটু জিরা।’

‘না আমার কাজ আছে’, বলে মিলু ঘর থেকে বেরিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়।

মিলুর এই চলে যাওয়া দেখে আনোয়ারা বেগম মনে মনে হাসেন, ‘আমার এই পোলা হইছে অর বাপের মতোন পাগল। আস্তা একটা পাগল!’

অনেকদিন পর আনোয়ারা বেগমের মন ভরে হাসতে ইচ্ছে করে। তিনি না হেসে কায়দা করে হাসি লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন।

দুপুরের রোদ তখন মিলুদের বাড়ির সামনের কানাগলিকে আচ্ছন্ন করে রাখে।