ছোট্ট একটা জীর্ণ টিনের ঘর। খুব বিপন্ন একসময়ে পথের বিড়ালমাতার মতো তিনটা বাচ্চা নিয়ে এই ঘরে এসে আশ্রয় নিয়েছে জোহরা। অবশ্য এরকম বিপন্নতা তার জীবনে নতুন নয়। জন্ম থেকেই বিবিধ প্রকারের সংকট ও দুর্দশার সঙ্গে ক্রমাগত বসবাস করতে করতে এসব তার গা-সহা হয়ে গেছে। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে সে যতদূর মনে করতে পারে, মা নামের একটি রুগ্ণ পীড়িত মøান প্রাণী যে কি না তাঁকে জন্ম দেওয়ার পর থেকেই অসুস্থ। মলিন শতচ্ছিন্ন কাপড় পরা মায়ের ভাঙাচোরা পক্ষাঘাতগ্রস্ত দুর্বল দেহটাকে ধরে টেনে খালাম্মা কোনোরকমে বড় রাস্তার পাশে লোকচলাচলের পথে একটা ছেঁড়া চটের ওপর সামনে একটা ভাঙা টিনের থালা দিয়ে বসিয়ে দিত। দুই হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে নীরবে বসে থাকা সেই মায়ের সঙ্গে সারাদিন রোদ, বৃষ্টি, শীত, গরম সব উপেক্ষা করে শিশু জোহরাও পেটে ক্ষিদে নিয়ে শুকনো মুখে চুপ করে বসে থাকতো। দয়াপরবশ হয়ে পথচারীদের কেউ সিকিটা, আধুলিটা কখনোবা এক-দুই টাকা ভিক্ষা দিয়ে যেত। মা মাঝে মধ্যে মাথাটা তুলে ঘড়ঘড়ে গলায় বলতো, ‘কী রে খিদা লাগছে নি?’
জোহরা দুই দিকে মাথা নেড়ে বলত – ‘না।’
মা টিনের থালা থেকে একটা দুটো সিকি বা আধুলি ওর হাতে তুলে দিত।
‘যা একগুন রুডি কিনি খা!’
বাপকে কখনো চোখের দেখাও দেখেনি জোহরা।
‘তর বাপ দইর্যাত ডুবি মরছে।’ খালা মুখ ঝামটা দিয়ে বলতো।
মা কিছু বলতো না, তার চোখ বেয়ে তখন শুধু অশ্রু বইতো। একটু বড় হয়ে পাড়ার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দৌড়ে দৌড়ে দরিয়ার কাছে গেছে জোহরা। কী বিরাট সেই দরিয়া! যতদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। এই অথই পানির নিচে কোথায় ডুবে আছে তার বাবা, একা অথবা একা না, তার সঙ্গে হয়তো মাছেরা আছে, দরিয়ার নিচের লতাপাতা আছে। মায়ের চোখের জল আর জোহরার অন্তরের ডাক সেইখানে পৌঁছায় না, পৌঁছাবে না কোনোদিন।
‘মা ও মা’, আয়শা ক্ষীণ গলায় ডাকে।
‘কী হইছে মণি? পেশাব করবা?’
‘না, বুকের মধ্যে জানি কেমন করে! ধপপার ধপপার!’
‘ঠিক হই যাইব। তুমি অহন ঘুমাও।’
মেয়ে ছটফট করে, পাশে জোহরাও নিদ্রাহীন। আয়শা জন্ম থেকেই ব্যারাইম্যা। গেন্দাবেলায় চিৎকার দিয়া কানলেই পুরো শরীর নীল হয়ে যেত। বিশেষ করে ঠোঁট দুটো যেন কালা ছাই। হাঁটতে শুরু করল অনেক দেরিতে। তা-ও হাঁটতো না। শীতকাতুরে মুরগির মতো হাত-পা গুটিয়ে এক জায়গায় ঝিম মেরে বসে থাকতো। দৌড়াদৌড়ি তো দূরের কথা, একটু হাঁটলেই বেচারির চোখ-মুখ নীল হয়ে হাঁপাতে থাকতো, মুখ বিকৃত হয়ে যেত যন্ত্রণায়। ভালো করে কিছু বুঝিয়ে বলতে পারতো না, শুধু চোখ দিয়ে আপনাআপনি ঝরঝর করে পানি বেরিয়ে আসতো। মা হয়ে জোহরা শুধু এইটুকু বুঝতো যে, ওর মেয়ের কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এই কষ্টের কারণ উদ্ঘাটন করতে পারতো না সে। মেয়ের বাবাকে বলতো, ‘চলেন, ওরে একটু ডাক্তার দেখাই আনি। কী সমস্যা তো বুঝি ন!’
জোহরার শ^শুর মসজিদ থেকে পানি পড়া এনে দিত। ‘হুজুরে কইছে, এই পানি খাওয়াইলে ঠিক হই যাইব।’
ননাস মুখ বেঁকিয়ে বলল, ‘কত টেকাঅলা বড়লোকরে … ডাকতরের কাছে যাইব! হুম! হেতির টেহা গড়াগড়ি যায়! আঁরার মাইয়া-পোলার আর অসুখ অয় না নি!’
শাশুড়ি কোথা থেকে যেন নাতনির জন্য তাবিজ এনে দিলো। আয়শার হাতে, গলায়, কোমরে কালো সুতায় বাঁধা নানা রকম তাবিজ দুলতে থাকল; কিন্তু মেয়ের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হলো না। একে তো সে দুর্বল, তার ওপর তাবিজের ভারে তার নাজেহাল অবস্থা।
একরাতে এমন শ্বাস উঠল মাইয়ার, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে চোখ উল্টে যায় যায় অবস্থা। বাড়িঘরের আত্মীয়, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই এসে উঁকি দিয়ে দেখে বলাবলি করল, ‘এই রাইতটা টিকে কি না … অবস্থা তো খারাপ …’
পরদিন সকালে জোহরা ঘোষণা দিলো – ‘আর না। আঁই আঁর মাইয়ার চিকিস্সা করামু, যেমনে পারি, আপনেরা চাই আইয়েন আর না আইয়েন, আঁই হেতিরে হাসপাতালে লই যামু …’
শরীরে বোরকা চাপিয়ে স্বামীকে ঘরে রেখে মেয়েকে কোলে নিয়ে একাই হাঁটা দিলো জোহরা। ওর পেটে তখন আরেক বাচ্চা। ছয় মাস চলে। পেছন পেছন ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে নূরুদ্দিন মিয়াও গেল। ভূঁইয়ার হাটে গিয়ে বড় বাসে চড়ে সোজা মাইজদি সদর হাসপাতাল। কোলে পুঁটলির মতো গুটিয়ে থাকা আয়শার গলা দিয়ে তখন কান্নার আওয়াজও আর বের হচ্ছে না। শুধু বুকের সামান্য ওঠানামায় বোঝা যাচ্ছে এখনো সে প্রাণে বেঁচে আছে।
‘এউকগা ভালা ডাকতার হাইছিলাম। হেতি আঁর মাইয়ারে পথ্থম দেখি কইল, এর তো হার্টের সমস্যা।’
ওই সময়ের কথাগুলো মনে পড়লে এখনো শিউরে ওঠে জোহরা। কত টেস্ট, কত পরীক্ষা, নিরীক্ষা, কত ওষুধপত্র। শেষমেশ ডাক্তার বললো, ‘অপারেশন করতে হবে। নইলে মেয়ে ভালো হবে না।’
‘তে করি হালান অপারেশন।’
বললেই তো হবে না, টাকা লাগবে। অপারেশন করতে
নগদ পঞ্চাশ হাজার আর ওষুধপত্রের খরচ আলাদা। হায় হায়, এত টাকা কই পাবে জোহরা? চিক্কুর দি কানলেও তো কেউ তারে এত টাকা দিবে না। নুরুদ্দিন মুখ কাঁচুমাঁচু করি কয়, ‘আয় আগে বাড়িত যাই!’
বাড়ি তো সেই ভাঙা বাড়িই, যেখানে সাত বছর আগে খালা ধরেবেঁধে বিয়ে দিয়েছিল।
যার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল সেও সম্পূর্ণ মানুষ নয়, এক হাত আর এক পা যার অকেজো বাল্যকালের রোগ থেকেই। একটা পা টেনে হাঁটতে পারতো; কিন্তু বেঁকে যাওয়া সরু হাতে কোনো কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এমনিতে বসে থাকলে নুরুদ্দিনকে স্বাভাবিক মানুষই মনে হয়, দেখতে শুনতেও সে মন্দ নয়। বাপের ভিটাবাড়ি আছে, সামান্য জমিও আছে, চাষবাস করে অভাবে স্বভাবে দিন চলে যায়। তাছাড়া ইনকামও আছে, চেয়ারম্যান সাহেব ব্যবস্থা করে দেওয়ায় নুরুদ্দিন তিন মাস পরপর সরকারের দেওয়া প্রতিবন্ধী ভাতা পায়।
বিয়ের আগে জোহরার বিমর্ষ মুখ দেখে খালা মুখ বাঁকিয়ে বলেছিলেন, ‘আইছেন নি জমিদারের ঝি! রাজার পুত আইবেন তার লাইগা, মা-বাপ ছাড়া এতিম, ফকির, মানুষের বাড়ির বান্দিরে যে হেই বেডা বিয়া করতো রাজি হইছে, এইডাই তো শুকরিয়া!’
শুকরিয়া তো বটেই। জোহরা সুবর্ণচরের মেয়ে, এখানকার বাস্তবতা সে বোঝে। খালা যে দায়মুক্তি পেতে ওই ছন্নছাড়ার ঘাড়ে ওকে চাপাতে চাইছে তা না বোঝার মতো বোকা তো সে নয়। সব বুঝেও কোনো উপায় না থাকায় সে চুপ করেই থাকে।
মা মরে যাওয়ার পর খালা যখন সারা দিনরাত এক পেট আধপেট ভাত খাওয়ায়ে উঠতে বসতে ভাতের খোঁটা দিতে থাকতো, তখনই জোহরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এই গেরামে সে আর থাকবে না। শহরে যাবে। মানুষের বাড়িতে কাজ করে খাবে, সেও ভালো। খালার প্রতি রাগ বা ক্রোধ থেকে না, খালার বোঝা হালকা করার জন্য কিংবা নিজেকে এই জীবন থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য এছাড়া আর কোনো পথ জানতো না জোহরা।
একদিন যখন মুন্সীবাড়িতে মাইক্রো নিয়ে শহর থেকে কুটুমরা বেড়াতে এলো আর তারা বাসাবাড়িতে কাজ করার জন্য ছোট মেয়ে খুঁজতে লাগল, ছেঁড়া, ময়লা ফ্রক পরা, মাথায় উকুনভর্তি উস্কোখুস্কো চুলের ১১ বছর বয়সী (কিন্তু পুষ্টির অভাবে যার বয়স দেখায় আরো কম) সেই জোহরা তখন স্বেচ্ছায় বুক চিতিয়ে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বলল, ‘আঁই যামু! আঁরে আন্নেগো লগে লই যান!’
দুই
মাইজদি শহরে রাস্তার পাশে একটা তিনতলা বাড়ি। এই বাড়ির একতলা আর দোতলায় একটা মিনি মার্কেট। তিনতলায় থাকেন হেলাল সাহেব। জোহরাকে আনা হয়েছে তার দুটো ছোট ছেলেমেয়েকে দেখাশোনার জন্য। এষা আর এমিল মিষ্টি, গুল্লুমুল্লু দুটো দুরন্ত বাচ্চা। জোহরা তখন দুই বেলা দুই মুঠো ভাতের ক্ষুধায় পথের নেড়ি কুকুরের মতো কাঙাল হয়ে আছে, খালার বাড়ির মতো উপোস করতে হবে না – এই শর্তে সে যে-কোনো কাজ করতে রাজি আর এ তো শুধু ঘরের ভেতর মানুষের দুইটা ফুটফুটে বাচ্চা লালনপালন।
বাড়ির মহিলাটা ভালো। বাচ্চারা কখন কী খায়, কখন কী খেলে – এসব ভালো করে বুঝিয়ে বলে। জোহরাকে একটা নতুন জামা দেয়। এক জোড়া স্যান্ডেল দেয়। চুলে মাখার তেল দেয়। সবশেষে পাতলা ডাল আর পাতিলের নিচে পড়ে থাকা মাছের ঝোলে একথালা ভাত মেখে তৃপ্তি ভরে খেয়ে ভরা পেটে ছেঁড়া তোষকে শুয়ে শুয়ে জোহরা স্বপ্ন দেখে মাকে।
মা আর ওরকম রুগ্ণ পীড়িত কংকালসার চেহারায় নেই। তাকে দেখাচ্ছে রাজরানীর মতো, এই বাড়ির টেবিলে ফলের ঝুড়িতে রাখা আপেলের মতো লাল টসটসে গাল, কমলালেবুর মতো ভেজা ঠোঁট, পরনে ঝিকিমিকি জড়ির পোশাক।
জোহরা আনন্দে চিৎকার দেয়, ‘মা তুমি বাঁচি আছো?’
মা বলে, ‘হ! দেখ তোর বাপও দইজ্জাত্তে উঠি আইছে!’
জোহরা দেখে মায়ের পেছনে একজন লম্বা পুরুষ মানুষের অবয়ব। অস্পষ্ট চেহারা।
‘আব্বা আন্নে কোনায় আছিলেন অত দিন? দরিয়াত কত খুঁইজছি আফনেরে …’
আব্বা মোটা গলায় বলেন, ‘আর যাইতন্ন তোঁয়ারে ছাড়ি … এমি আয়, আঁর কাছো আয় …’
আব্বার কাছে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালে কেউ একজন জোহরার পা চেপে ধরে। জোহরা এগোতে চায়; কিন্তু পারে না। সে ঝটকা মেরে তার পায়ের বাঁধন ছুড়ে ফেলতে চাইলেও পারে না, মনে হয় কেউ অনেকগুলো হাত দিয়ে তার পা পেঁচিয়ে ধরছে। মুক্ত হওয়ার জন্য এবার আরো জোরে পা ছোড়ে সে।
‘এই ছেঁড়ি লাত্থি দেস কেন? ঠ্যাং সরা হারামজাদি, কুত্তি…’
জোহরা বোঝে এটা ওর পাশে শুয়ে থাকা ওর মতোই আরেকজন কাজের মেয়ে শিল্পীর গলা। শিল্পী জোহরার চেয়ে কয়েক বছরের বড়। তবে ওদের মধ্যে বয়সে যে সবার বড় সেই মরিয়ম ঘুমানোর জন্য একটা চৌকি পেয়েছে। জোহরা আর শিল্পী সেই চৌকির পায়ের কাছে তোশক পেতে ঘুমায়। ছোট্ট একটা ঘর তাতেই ঠাসাঠাসি করে এই তিনজনের ঠাঁই। মরিয়ম এখানকার পুরনো ও স্পেশাল কাজের লোক। সে শুধু রাঁধে, ঘরবাড়ি গুছিয়ে রাখে আর হেলাল সাহেবের বৃদ্ধা মায়ের দেখাশোনা করে। শিল্পী তার সহকারী। কাটাকাটি, বাছাবাছি, ঘর মোছা, বাসন মাজা সবই শিল্পীর কাজ।
এই বাড়িতে দুদিন থাকার পরই জোহরা বুঝে যায় এ-বাড়িতে মরিয়মের স্থান ভিন্ন, মরিয়ম আসলে তাদের সরদারনি। শিল্পী মুখ বেঁকিয়ে বলে, ‘হে অইল আমাগো বস!’
বসের মতোই সেজেগুজে ফিটফাট পরিপাটি হয়ে থাকে মরিয়ম। শিল্পী কাজে ফাঁকি দিলে তার ওপর চোটপাট দেখায়। জোহরার কাজেরও তদারকি করে সে। সকালবেলা বেগম সাহেবা অফিসে যায় আর একটু বেলা করে নাস্তা খেয়ে হেলেদুলে হেলাল সাহেব তখন নিচতলায় তার টাইলস আর স্যানিটারি সামগ্রী বিক্রির শোরুমে যায়। বেলা প্রায় পড়ে এলে ৩টার দিকে ভাত খেতে আসেন হেলাল সাহেব। মরিয়ম তখন দাঁড়িয়ে থেকে সাহেবকে নিজ হাতে বেড়ে খাওয়ায়, খাওয়া শেষে সাহেব তার মায়ের ঘরে গিয়ে কিছুক্ষণ বসেন, এষা আর এমিলের খোঁজখবর নেন, তারপর ওদের সঙ্গে কিছুক্ষণ খেলাধুলা করে দোকানে ফিরে যান। তবে কোনো কোনো দিন আবার খাওয়া-দাওয়ার পর তিনি মরিয়মকে ডাকেন।
মরিয়ম হাতে করে এক গ্লাস পানি বা পিরিচে করে একটু দই-মিষ্টি নিয়ে সাহেবের শোবার ঘরে ঢুকলে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ হয়ে যায়। সেসব দিনে বাচ্চারা যদি বাবার কাছে আরেকটু যাওয়ার বায়না ধরে আর জোহরাও সামলাতে না পেরে ওদের নিয়ে ডাইনিং স্পেস পার হয়ে হেলাল সাহেবের শোবার ঘরের দিকে রওনা হয়, শিল্পী তখন দ্রুত জোহরাকে হাতের ইশারায় ডাকে, ‘এই ছেড়ি, কই যাছ? বাচ্চাগো নিয়া এই দিকে আয়!’
‘কিল্লাই আফা? হেতারা বলে ড্যাডির সঙ্গে আরো খেইলবো!’
শিল্পী তখন দৌড়ে এসে জোহরা আর বাচ্চাদের প্রায় টেনে অন্য ঘরে নিয়ে গিয়ে ঠোঁটের ওপর আঙুল দিয়ে চুপ করার ইঙ্গিত দেয়। তারপর এষা আর এমিলের সামনে খেলনার বাকসো ঢেলে দিয়ে বলে, ‘ড্যাডির এখন মাথা বেথা হইছে। অনেক অসুখ। বুঝছো? মরিয়ম আন্টি তার মাথায় ওষুধ দিতাছে। তোমরা খেলো।’
বাচ্চারা খেলনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লে জোহরা শিল্পীর মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।
‘সাহেবের মাথা বেথা নি? কী অসুখ?’
শিল্পী মুখ টিপে হাসে।
‘তুই বুঝতি না। বেডাগো এই অসুখ হয়!’
‘ডাক্তারের কাছে যাইতে হারে ন? মরিয়ম আফা কী অষুধ দেয়? মাথা টিফি দেয়?’
জোহরা এবার মুখ ঝামটা দেয়, ‘অতো কথা তুই জিগাছ কিল্লাই? এই বাড়িত থাকতে চাইলে চুপ করি থাকবি, নাইলে কিন্তুক বিদায় করি দিবো!’
আপাতত তিন বেলা খাবার পাওয়ার নিশ্চয়তা ছেড়ে জোহরা যেতে চায় না বলে সে চুপ করে থাকে। কিন্তু তার মনের কৌতূহল নিবৃত্ত হয় না। তিন-চার মাসের মাথায় সে টের পায় বেগম সাহেবা বাচ্চাদের নিয়ে কয়েকদিনের জন্য বাপের বাড়ি বেড়াতে গেলে রাতের বেলাও হেলাল সাহেবের শোবার ঘরে মরিয়মের ডাক পড়ে।
শিল্পী তখন কুটকুট করে হাসে।
‘এই ছেড়ি আয়, মরিয়ম আফার টেরাংকে কী আছে দেহি…’
জোহরা ভয় পায়, যদি মরিয়ম আপা চলে আসে!
‘আরে দেরি আছে! ফজরের আগে হেতি আইতো না!’
ছোট্ট ঘরের দরজা বন্ধ করে চৌকির নিচ থেকে মরিয়মের ফুল পাতা আঁকা, জায়গায় জায়গায় রং চটে যাওয়া টিনের ট্রাঙ্ক টেনে বের করল শিল্পী। মরিয়ম খুব গুছিয়ে রেখেছে তার জিনিসপত্র। পাঁচটা শাড়ি, চারটা ব্লাউজ আর তিনটা পেটিকোট, দুইটা ব্রা। শিল্পী একটা ব্রা তুলে তার নিজের বুকের ওপর ধরে। জোহরা এতে শরম পেয়ে মুখ নিচু করে হাসে। শিল্পী বলে, ‘হাসোছ কেন? তোর বুক হইলে তুইও পিনবি!’
জোহরা বলে, ‘তুমি পিন্ধো?’
শিল্পী একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে, ‘মরিয়মের জায়গায় গেলে আমিও পিনদুম! অহন একটা আছে, পুরান ধুরান! মরিয়ম ফালায়া দিছিলো…’
জোহরা বোঝে না, বলে, ‘মরিয়ম আফার জায়গায় তুমি কেমনে যাইবা?’
শিল্পী সেই প্রশ্নের উত্তর দেয় না। ট্রাঙ্কের কাপড় সরিয়ে পাওয়া যায় কয়েক গোছা ইমিটেশনের চুড়ি, দুইটা লিপস্টিক, পুঁতির মালা, একটা প্রায় ফুরিয়ে যাওয়া বডি স্প্রে। প্যারাসিটামল ট্যাবলেটের পাতা। এক প্যাকেট স্যানিটারি ন্যাপকিন।
‘দেখছস, আমরা পুরান কাপড় দিয়া ছিপি বন্ধ করি আর হেয় পায় প্যাড! বেগম সাহেব যেমন প্যাড লাগায় হেও সেই রকম…’
জোহরা জানে মেয়েদের মাসিক হয়, ওর-ও হবে। তখন পুরনো কাপড় দিয়ে মাসিকের রক্ত আটকাতে হবে। মরিয়ম আপা তাইলে রক্ত মুছতে এই নরম তুলার মতো সাদা লম্বা জিনিসটা ব্যবহার করে! জোহরা শিল্পীর হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখে। ট্রাঙ্কের কোনায় ওরা একটা বাদামি রঙের ভ্যানিটি ব্যাগও খুঁজে পায়। সেই ব্যাগের ভেতর কাপড়ের পুঁটলিতে বাধা কিছু টাকা। একটা বাচ্চা মেয়ের ফটো। শিল্পী বলে, ‘এইটা মরিয়মের মাইয়ার ছবি। গেরামে নানির লগে থাকে। ওরে ফালায়া মরিয়ম এই বাড়িতে কাম করে!’
‘মরিয়ম আফার জামাই?’
‘হেই বেডা নিরুদ্দেশ! বউ-বাচ্চা ফালায়া ভাগছে!’
রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে রাস্তা দিয়ে একটা ট্রাক চলে যাওয়ার গোঁ-গোঁ আওয়াজ পাওয়া যায়। জোহরা আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল। হঠাৎ দরজার কাছে ঠুক করে একটা শব্দ হয়। হায় হায় মরিয়ম এসে পড়ল নাকি? শিল্পী চাপা গলায় বলে, ‘তুই তাড়াতাড়ি এইডি গুছা, আমি দেখতাছি…’
বাইরে হেলাল সাহেবের মায়ের গলা শোনা গেল, ‘আমারে একটু পানি দে রে মরিয়ম!’
ঘরের ভেতর থেকে জোহরা শিল্পীর গলাও শুনতে পেল, ‘খালাম্মা মরিয়ম তো বাথরুমে গেছে। আসেন আমি আপনেরে পানি দিতেছি।
তিন
ইমন ভাতের থালাটা ঠেলে মায়ের দিকে ছুড়ে দেয়, ‘খালি আলু ভত্তা দি ভাত খাইতাম না!’
‘ইহ! নবারের পুলা আইছে, খালি মোরগ খাইতো চায়, তোর বাপরে ফোন কর, মোরগ ফাডাই দিবো নে…’
আয়শা খলখল করে হাসে। ‘আব্বা মোরগ দিবো নি?’
রিমন লাফ দিয়ে উঠে চৌকির ওপর রাখা তাদের একমাত্র সম্পদ স্মার্টফোনটা হাতে নেয়। মায়ের দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসে। বলে, ‘দিতাম নি? আব্বারে ফোন … দেই …’
ইমন আর আয়শাও হাসে। এবার জোহরা রেগে যায়, ‘ফোন রাখ হারামজাদা, ভাত খা …’
‘খানকির ঝি, তুই না কইলি ফোন দেওনের লাই …’
জোহরা উঠে ছেলের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নেয়। তারপর গলায় যথাসম্ভব আদর ঢেলে বলে, ‘আইজ্জা এডি দি ভাত খাও। কাইল্লা আমি যে বাড়িত কাম করি হেই ম্যাডামরে কমুনে একটু তরকারি দেওনের লাই।’
‘কাইল্লা আঁই তোঁয়ার লগে যামু, যে-বাড়িত কাম করো হেই বাড়িত …’
আয়শাও বায়না ধরে মায়ের সঙ্গে সেও যেতে চায়।
‘অনেক দূর তো, তুই হাঁটি যাইত পারতি না।’
ইমন ঘোষণা দেয়, ‘আমি হেতিরে কোলো করি লই যামু!’
‘হায় কপাল! তরা তিনগারে লই গেলে আর চাকরি থাকব নি?’
‘একটুকখানি যাই, দেখি, আঁই পড়মু!’
পরদিন আয়শাকে কাঁখে নিয়ে আর দুই ছেলেকে হাঁটিয়ে নতুন কাজের বাসায় যায় জোহরা। ওই বাসার গৃহকর্ত্রী সেলিনা পারভীন একটা পত্রিকায় কাজ করে। জোহরা শুনেছে উনি ‘সম্বাদিক।’ ওদের গ্রামে ‘সম্বাদিক’দের সঙ্গে একবার জোহরার দেখা হয়েছিল, তবে সেই ‘সম্বাদিক’রা ছিল পুরুষ। এই বাসার ম্যাডাম আর সাহেব দুজনেই নাকি ‘সম্বাদিক’।
জোহরাকে কাজে নেওয়ার সময় ম্যাডাম ওর আইডি কার্ডের ফটোকপি রেখেছে। মোবাইল ফোন দিয়ে ছবিও তুলেছে। জিজ্ঞাসাবাদ করেছে – পরিবারে কে কে আছে তার, ছেলেমেয়ে কয়জন? তাদের বাপ কোথায়?
সব প্রশ্নেরই উত্তর দিয়েছে জোহরা। এর মধ্যে কথায় কথায় আয়শার হার্টের সমস্যার কথাও বলেছে। এ-কথা শুনে ম্যাডাম আর সাহেব দুজনেই বলেছে, ‘একবার নিয়ে আইসো তোমার মেয়েকে। দেখবো।’ সেজন্যই আজ আয়শাকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে জোহরা। কিন্তু এই দুই বিচ্ছুও যে সঙ্গে আসছে। না জানি ম্যাডাম আবার রাগ করে! জোহরার একটু ভয় লাগে। সব বিবিসাহেবই দোষ ধরতে ওস্তাদ।
‘এই তরা কইলাম এট্টুও দুষ্টামি করবি না, ভালা হৈয়া থাকবি!’
জোহরা ছেলেদের সতর্ক করলে ছেলেরা মাথা নাড়ে। তাদের কাছেও এই শহর নতুন। কত্ত বড় বড় বাস, গাড়ি, দালানকোঠা এই শহরে! আবার শহরের মানুষগুলির মুখের ভাষাও তাদের কাছে অচেনা। কিছু বোঝা যায় আর কিছু তারা বোঝে না। বড় ছেলে রিমনের মনে পড়ে, গ্রামে দাদা, দাদি, জেঠা, জেঠি, চাচা, ফুফুদের সঙ্গে এক বাড়িতে থাকতো তারা। আলাদা আলাদা ভাঙাচোরা টিনের ঘর কিন্তু একটা উঠান। আব্বার এক হাত আর এক ঠ্যাং আছিল লুলা। ঠিকমতো হাঁটতে পারত না। কাজকাম করতে পারত না। আম্মাই সারাদিন এনো উনো কাজকাম করি তাগোরে ভাত আনি খাওয়াইত। মায় দূরে কোনোখানে কামে গেলে কোনোদিন দাদাগো ঘরে, কোনোদিন চাচিগো ঘরে নিয়া আব্বা ভাত খাওয়াইত।
‘ও আম্মা, আঁরা আবার আগের মতোন থাকতাম পারি না? গেরামে, বেক্কের লগে…’
হাঁটতে হাঁটতে মাকে বলে রিমন। সাঁই করে ধুলা উড়িয়ে ওদের পাশ দিয়ে একটা বাস চলে গেলে ছেলের কথা শুনতে পায় না জোহরা।
‘কিয়া কছ? বুঝি ন।’
‘লন আঁরা গেরামে চলি যাই, আগের মতো, বেক্কের লগে…’
ছেলের কথা শুনে একটু থমকে দাঁড়ায় জোহরা। আয়শাকে কোল থেকে নামায়। নিজের গায়ের জামাটা টেনেটুনে ঠিক করে, মাথায় ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে নেয়। তারপর আয়শাকে আবার কোলে নিয়ে হাঁটা শুরু করে। ইচ্ছা করে তো নয়, কি পরিস্থিতিতে সে ঘর ছেড়েছিল বা ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল, তা তো সে জানে। রিমনও জানে। ছেলের প্রতি একটু অভিমান হয় তার।
‘কিয়ের লাই ইয়ানে আইছি, তুই জানোছ না নি? আঁই কি শখ করি ইয়ানো আইছি, ক চাই! তুই তো বেক্কি দেখছছ!’
রিমন গলা নিচু করে বলে, ‘জানি তো। বেক্কেই তো ভুল করে, হেতাগো মাফ করি দেওন যায় না?’
জোহরা এবার আর কিছু বলে না। বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস উঠে আসে তার। কত কষ্ট করে অপদার্থ স্বামীর ভিটায় ঘরবাড়ি জুড়াইছিল সে। চেয়ারম্যানরে হাতে-পায়ে ধরি, চক্ষের পানি ছাড়ি, রিলিফের টিন আনছিল, মেস্তরিগো টেকা দিতে না পাইরা তিন বেলা ভাত রাইন্ধা খাওয়ায়া ঘরের কাজ করাইছিল। তার চোখে ছায়াছবির মতো সেই ঘটনাগুলো ভাসে। আয়শার অসুখের চিকিৎসা না করাতে পেরে সেবার মাইজদি থেকে ফিরে এসেছিল ওরা।
বাড়ি ফিরে জোহরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে করেই হোক মেয়ের চিকিৎসার টাকা জোগাড় করবেই সে। শরীরে এখনো জোর-বল আছে, খাটতে পারবে। পরিশ্রম করে টাকা রোজগার করবে। কাজের খোঁজ দিয়েছিল বাজারের জয়নাল দোকানদার। ঢাকার এক বড়লোকের বাড়িতে থাকতে হবে, ঘরের কাজ রান্নাবান্না সব করলে মাসে দশ হাজার টাকা বেতন।
বাচ্চা তিনটারে শাশুড়ি-জায়ের হাতে সোপর্দ করে জোহরা আল্লাহর নাম নিয়ে ঢাকার বাড়িতে কাজ করতে চলে যায়। এক মাস ভালোই গেল। টাকাও জমলো কিছু। সেই সময়ই বেগম সাহেব তাকে একটা মোবাইল কিনে দেয় বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য। দুই মাস যেতে না যেতেই বাড়ি থেকে ফোন, ‘মাইয়ার অসুখ। বাড়িত আয়।’
জোহরার বুক মোচড় দিয়ে ওঠে। ‘হায় হায়, আমার মাইয়া কি বাঁচি আছে, না মরি গেছে?’
নুরুদ্দীন পরিষ্কার করে কিছু বলে না, শুধু গম্ভীর গলায় বলে, ‘তুই বাড়ি চলি আয়।’
বেগমসাহেবকে বলেকয়ে ছুটি নিয়ে বাসে চড়ে সুবর্ণগ্রাম এসে নামে জোহরা। বাসস্ট্যান্ডে স্বামী-শ্বশুরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার বুকের কাঁপুনি আরো বেড়ে যায়।
‘কী হইছে আঁর আয়শার?’
স্বামী বা শ্বশুর কিছু বলে না। জোহরা চিৎকার করে কেঁদে ফেললে স্বামী শুধু বলে, ‘আগে বাড়িত চল।’
বাড়ির উঠানে পা দিয়ে জোহরা দেখে বাচ্চারা দিব্যি খেলছে। মাকে দেখে দুই ছেলে ছুটে আসে। আয়শাও আসে, তবে সবার শেষে, আস্তে আস্তে, জোরে হাঁটলেই তার বুকে ব্যথা করে। বাচ্চাদের আদর করে ঢাকার বেগমসাহেবের দেওয়া নিজের পুরনো স্মার্ট মোবাইল ফোনটা বড় ছেলের হাতে খেলতে দিয়ে জোহরা এবার গোখরা সাপের মতো ফণা তোলে, ‘আঁরে মিছা কথা কই বাড়িত আনলেন কিল্লাই?’
স্বামী মাথা নিচু করে থাকে। শ্বশুর চাপা কণ্ঠে হুংকার দিয়ে বলে, ‘খানকি মাগির ঝি, ঢাকা শহরে তুই কিয়া করোছ? আঁরা বেক খবর পাই গেছি! বেশ্যাগিরি কইরানি টেহা কামাছ? মানসম্মান নাই, খানকি …’
জোহরা এই কথা শোনার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না। সে নুরুদ্দীনের দিকে তাকায়, ‘কিয়া কয়, এই বেডা, এ্যাঁ, ও রিমনের বাপ, আফনেও ইয়া বিশ্বাস করেননি?’
‘বাজারের বেকতে এই কথা কইতাছে, জয়নাল মাইয়াগো দি ব্যবসা করায় …’ নুরুদ্দিন মিনমিন করে বলে। হইচই শুনে এরই মধ্যে প্রতিবেশীরা উঠানে এসে দাঁড়িয়েছে তামাশা দেখার জন্য।
জোহরা তার শীর্ণ হাত দুটো মেলে ধরে, হাতের এখানে-ওখানে শুকিয়ে আছে পোড়া দাগ, নখের কোনায় হলুদের ছাপ, ‘এই যে চাই দেহেন, আগুনের ধারে রানতে রানতে কয়বার আঁর হাত পুড়ি গেছে, হলুদের রং ধরি গেছে, গতর খাইট্টা রুজগার করি …’
জোহরার কথা শেষ হতে পারে না, নুরুদ্দিনের বড়ভাই ছুটে এসে পেছন থেকে চুল ধরে হ্যাঁচকা টানে জোহরাকে মাটিতে ফেলে দেয়, ‘ফকিন্নির ঝি, আঁরার মুখোত চুন-কালি লাগাইছস, তরে আইজ মারিই ফালাইমু …’
অবিরাম কিল-থাপ্পড়, লাত্থিতে বিপর্যস্ত জোহরার কান্না ও চিৎকারে ছেলেমেয়েরাও কাঁদতে শুরু করে। নুরুদ্দিনের বড় বোন জোহরার ননাস এসে গালিগালাজ করতে করতে উঠানে গড়াতে থাকা আহত, রক্তাক্ত, মলিন ধুলোমাখা জোহরাকে টেনেহিঁচড়ে ঘরের দাওয়ায় নিয়ে গেলে বংশের ইজ্জত ডোবানোর অভিযোগে দেবর ওকে বারান্দার বাঁশের খুঁটির সঙ্গে শক্ত করে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে।
রিমন ততক্ষণে টিপাটিপি করে মায়ের স্মার্ট মোবাইল ফোনখানা চালানো শিখে গিয়েছিল, এবার সে ক্যামেরা খুলে একটু দূর থেকে ঠিক এই দৃশ্যগুলোই সবার অগোচরে রেকর্ড করে ফেলে। তারপর কেউ কিছু টের পাওয়ার আগেই দৌড় দেয় পাশের গ্রামে জোহরার খালাতো ভাই অটোরিকশাচালক রশিদের বাড়ির দিকে।
জোহরার এই ভাইটা আগে থেকেই তার এতিম খালাতো বোনটির প্রতি খানিকটা স্নেহপরায়ণ ছিল। রিমনের হাতের এই ভয়ংকর ভিডিও নিয়ে সে সোজা রওনা দিলো পুলিশ ফাঁড়ির দিকে। কনস্টেবল রমজানের সঙ্গে তার আগে থেকেই একটু-আধটু পরিচয় ছিল। সেই সূত্রে দারোগা সাহেবের কাছে একেবারে ভিডিওর প্রমাণসহ হাজির হলে এবং হাতে তেমন কোনো চাঞ্চল্যকর কেস না থাকায় ফোর্স নিয়ে দারোগা সাহেব স্বয়ং হাজির হয়ে যান মধ্যমপাড়ায় জোহরার শ্বশুরবাড়িতে।
তখনো জোহরা ছিল খুঁটির সঙ্গে বাঁধা। সেই অবস্থায় নিস্তেজ, নিপীড়িত জোহরাকে উদ্ধার করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করে, তার স্বামী, শ্বশুর, দেবর, ভাশুরকে ধরে বেঁধে থানায় নিয়ে যান ওসি সাহেব। যথারীতি নারী নির্যাতনের কেসে চারজনকেই কোর্টে চালান দিয়ে দেন তিনি।
সেই সময়ই ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ও থানায় কয়েকজন ‘সম্বাদিক’ ক্যামেরা নিয়ে হাজির হয়। তারা জোহরাকে নানা রকম প্রশ্ন করে এবং রিমনের করা ভিডিওটি কপি করে নেয়। পরদিন ঢাকার একটি টেলিভিশনের গ্রামবাংলার সংবাদে এবং স্থানীয় পত্রিকাগুলিতে খবর বের হয় ‘পরকীয়ার অভিযোগে স্বামী ও শ্বশুর কর্তৃক গৃহবধূ নির্যাতন।’


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.