নতুন বাসায় ওঠার দুদিন পর একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটলো। অবশ্য অনেকের কাছে অদ্ভুত নাও মনে হতে পারে, আমাদের মনে হয়েছিল। যে যেমন করে দ্যাখে আর কি! যেমন, নতুন বাসা বলতে অনেকে মনে করতে পারে, ফ্ল্যাট কিনে উঠে পড়েছি। আসলে তা নয়। আগেরটার মতো এটাও ভাড়া বাসা, আমরা এই শহরের চিরস্থায়ী ভাড়াটিয়া। তবে এবারের বাসাটা একটু বিলাসবহুল, খোলামেলা, বড়োসড়ো। ভাড়াও বেশি। এরকম বাসায় আমাদের থাকার কথা নয়, তবুও যে থাকছি, তার পেছনে কারণটি করুণ। ওটা পরেই বলি।
ছুটির দিনে বাসা বদলেছিলাম, একটু গুছিয়ে উঠতেই দুদিন পার হয়ে গেল। বাসা বদলানো যে কী ধরনের ঝক্কির ব্যাপার তা তো জানেনই। তো, পরের দিন সকালবেলায় অফিসে যাওয়ার জন্য বেরুচ্ছি, এগিয়ে দিতে প্রতিদিনের মতো দোলাও এসেছে দরজা পর্যন্ত। দোলা আমার স্ত্রী। দরজা খুলতেই দেখা গেল, একটা বিড়াল বসে আছে। ধবধবে সাদা রং, মায়াকাড়া চেহারা, আমার দিকে তাকিয়ে ছোট করে মিউ বলে ডাকলো। আমিও দু-একটা কথা বলে লিফটের দিকে এগোলাম। কিন্তু লিফট আসার আগেই শুনলাম দোলা বলছে, ‘কী? কী চাও আমার কাছে?’ কথাটা যে আমাকে বলা হচ্ছে না তা তো বোঝাই যাচ্ছে, ফিরে তাকিয়ে দেখলাম, বিড়ালটা মাথা ঘষছে দোলার পায়ে। তার মানে কিছু বলতে চায়, সম্ভবত কোনো আর্জি জানাচ্ছে, এবং সেটা খাবারের জন্য নয়, অন্য কিছু। কীভাবে বুঝলাম? বুঝলাম, কারণ, আমরাও একসময় বিড়াল পুষতাম, আদর করে তার নাম দিয়েছিলাম টুকটুকি, বছর দুয়েক আগে সে চিরদিনের জন্য আমাদের ছেড়ে চলে গেছে, গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে পরিবারের একজন সদস্যের মতো ওকে যত্ন করে ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসেছি। তো, বিড়াল পুষতাম বলে ওদের ভাষা আমরা মোটামুটি বুঝতে পারি। কোনটা যে খাওয়ার আবেদন, কোনটা আদর পাওয়ার আবদার, কোনটা দুষ্টুমি, কোনটা খেলা, আর কোনটা দুঃখের অভিব্যক্তি তা আমাদের জানা হয়ে গেছে। জানা হয়ে গেছে এও, ওরা যখন কোনো আর্তি জানায় – যেমন কোনো বিপদ থেকে বাঁচানোর, কিংবা বাচ্চাকে আশ্রয় দেওয়ার অনুরোধ – তখন ওদের আচরণ কেমন হয়। আমি লিফটে না উঠে ফিরে এসে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী হয়েছে, কী চাও?’ উত্তরে মিউ মিউ করে কিছু একটা বললো, ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। বিড়ালটা তখনো দোলার পায়ে মাথা ঘষে চলেছে। যা বলার দোলাকেই বলছে। এও অস্বাভাবিক নয়। বিড়ালরা, মানবশিশুর মতোই একটা মাতৃচরিত্র খুঁজে নেয়, তার কাছেই আর্তি, আবদার, অনুরোধ জানায়। পিতৃচরিত্রও খোঁজে, তবে তার কাছে আসে বিপদে পড়লে। আবার বাচ্চাদের সঙ্গে বন্ধুর মতো সম্পর্ক পাতায়, তার সঙ্গেই খেলাধুলা-খুনসুটি-দুষ্টুমি করে। অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে, বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারলাম না, বিড়াল-রহস্য অমীমাংসিত রেখেই রওনা দিতে হলো।
অফিসে গিয়েও বিড়ালটার জন্য মন কেমন করতে লাগলো। কী বলতে চাইছিল ও? এমনিতেই আজকাল মন দুর্বল হয়ে থাকে, অল্পতেই চোখে পানি আসে, মানুষ হোক কিংবা অন্য কোনো জীব – যে-কারো দুঃখ-দুর্দশা দেখলে মন আর চোখ দুটোই আর্দ্র হয়ে ওঠে। সব দৃশ্য এখন নিজ চোখে দেখতেও হয় না। ফেসবুকে, ইউটিউবে অজস্র ভিডিও আসে – করুণ, বেদনাবহ, বিষাদমাখা। সেসব দেখেও কখনো কখনো নীরবে চোখ মুছে নিই। ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখ-দুর্দশা, বিষাদ-বেদনা, শোক বা সন্তাপে কখনো কাঁদি না আমি। সত্যি বলতে কি, আমাকে কেউ কখনো কাঁদতে দেখেনি। আমার সব কান্নাই নীরব, একাকী। এই স্বভাব অনেক পুরনো। ছোটবেলা থেকেই আমি এরকম। বই পড়তে পড়তে কাঁদি, সিনেমা বা নাটক দেখতে দেখতে কাঁদি, এমনকি কোনো কোনো গান শুনতে শুনতেও চোখ ভরে ওঠে জলে। ওগুলো একধরনের কান্না, নিজের জীবনের সঙ্গে বাস্তব সংযোগ নেই। ‘শিল্পের আস্বাদনে যে হৃদয় আর্দ্র হয় সেটিই মহত্তম হৃদয়’ – এরকম একটা ভারী কথা পড়েছিলাম কোথাও। নিজেকে মহত্তম হৃদয়ের অধিকারী বলে মনে করি না বটে, তবে কাল্পনিক জগতের বর্ণনা যে আমাকে কাঁদায় তাতে বুকের ভার খানিকটা লাঘব হয়। কিন্তু সমস্যাটা ইদানীং অন্য কারণে প্রকট হয়েছে। বয়স বেড়েছে, অনিবার্য অসুখ-বিসুখও স্বাভাবিকভাবেই সঙ্গী হয়েছে, সেইসঙ্গে ধরা পড়েছে নিরাময়-অযোগ্য এক রোগ। নাম জানার দরকার নেই, শুধু এটুকু জেনে রাখুন, ডাক্তার বলে দিয়েছেন, এ-রোগ সারাজীবনই বয়ে বেড়াতে হবে, তাঁর ভাষায় এটা প্রগ্রেসিভ রোগ, ধীরে ধীরে তীব্রতা বাড়ে এবং…। এবং? ডাক্তার না বললেও তার বিষণ্ন অভিব্যক্তিতে বুঝে নিই, নিরাময় যেহেতু নেই তাই মৃত্যুতেই তার পরিসমাপ্তি ঘটে। হ্যাঁ, দিনে দিনে রোগের তীব্রতা বেড়েছে, শরীর এবং মন দুটোই দুর্বল হয়ে গেছে, হয়তো সেজন্যই, কিংবা কে জানে কেন, আমার এখন পৃথিবীর সব মানুষকে দুঃখী, অসহায় আর অনাথ বলে মনে হয়। তারচেয়েও অদ্ভুত ব্যাপার, নানা ধরনের জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ, পশুপাখির দুঃখ-কষ্টগুলোও আমার চোখে পড়ে। রাস্তাঘাটে চলতে-ফিরতে, বাজারে গিয়ে বা বাসায় বসেও আমি কেবল দেখতে থাকি বিবিধ জীবনের এই অন্তহীন ভোগান্তির ছবি। হয়তো সেজন্যই বিড়ালটার ওই মাথা কুটে আর্তি জানানোর দৃশ্যটা চোখ থেকে সরলো না সারাদিনেও।
বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। দিনের শেষবেলায় ভারি ক্লান্ত লাগে আজকাল। মনে হয়, অনন্তকাল ধরে একটা দুঃসহ জীবনের ভার বয়ে চলেছি। আগে এমন হতো না। অফিস থেকে বেরিয়ে হয়তো কোনো কোনো দিন চলে যেতাম বন্ধুদের আড্ডায়, কোনোদিন সপরিবারে কোনো আত্মীয়ের বাসায়, কোনোদিন হয়তো দোলাকে বলতাম শিল্পকলায় আসতে, বা স্টার সিনেপ্লেক্সে, একসঙ্গে একটা নাটক বা সিনেমা দেখে বাইরেই কোথাও খাওয়া-দাওয়া করে বাসায় ফিরতাম। অসুখটা ধরা পড়ার পর থেকে সব বদলে গেছে। অফিস থেকে বেরিয়ে সরাসরি ফিরে আসি বাসায়, ফেরার সময় গাড়িতে বসে বসে ঝিমাই, ফেরার পরও সরাসরি বিছানায় গিয়ে আরো ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে নিই। ঠিক ঘুমও নয়, ওই ঝিমুনিই, ক্লান্তির ঝিমুনি, তাতে ক্লান্তিটা একটু কাটে। তারপর উঠে হালকা নাস্তা খাই, চা খাই। দোলা যদি বাসায় থাকে, ওর সঙ্গে গল্প করি। বাসায় না থাকলে ওর জন্য অপেক্ষা করি।
আজকে অবশ্য বাসায়ই পাওয়া গেল ওকে। চা খেতে খেতে বিড়ালটার কথা জিজ্ঞেস করলাম। ও বললো, তুমি যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ ওরকম করেছে।
– তারপর?
– অনেক আদর করে বললাম, তবু যায় না। তখন ভেতরে নিয়ে এলাম। খেতে দিলাম, কিন্তু খেলো না। শুধু এ-রুম থেকে ও-রুমে কী যেন খুঁজে বেড়ালো।
– কী খুঁজলো?
– তা কীভাবে বলবো?
– তারপর?
– কিছুক্ষণ পরপর আমার কাছে এসে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, কী যেন বলে।
– এখনো আছে?
– না, চলে গেছে।
– কোথায় গেল?
– কী জানি! সিঁড়ি দিয়ে নিচের দিকে নেমে গেল।
– তাহলে বোধহয় অন্য কোনো বাসার পোষা বিড়াল। ভুল করে এখানে চলে এসেছিল।
বিড়ালটা যে কারো পোষা তা বোঝা যাচ্ছিল। ওর গা ছিল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, তার মানে নিয়মিত কেউ গোসল করায় ওকে। বিড়াল অবশ্য এমনিতেই পরিচ্ছন্ন প্রাণী, নিজের গা নিজেই চেটে পরিষ্কার করে ফেলে, কিন্তু তারপরও রাস্তার বিড়ালদের গায়ে কিছু না কিছু ময়লা থাকেই। আরেকটা ব্যাপার হলো, রাস্তার বিড়ালরা সহজে মানুষের পায়ে মাথা ঘষে না, বরং ভয় পায়। ভয় ওদের সহজাত প্রবৃত্তি, তাছাড়া লাথিগুঁতোও তো কিছু কম খায় না, ভয় পাবেই বা না কেন? কিন্তু পোষা বিড়ালরা তো নিজের বাসা চিনতে ভুল করে না। চৌদ্দতলা এই ভবনে একশ দশটা অ্যাপার্টমেন্ট, এর যে-কোনো একটির বাসিন্দা হলেও সে ঠিক ঠিক নিজের বাসাটি চিনে নিতে পারবে। তাহলে ও এলো কোত্থেকে? কেনই বা এলো? নাহ, দুজনে অনেক ভেবেও কূলকিনারা করতে পারলাম না।
দুই
বাসায় মানুষ বলতে তিনজন। আমরা দুজন আর আমাদের একমাত্র পুত্র রাতুল। সে বড় হয়েছে, বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ে, বাসায় থাকে খুবই কম সময়; সারাদিন, এমনকি রাতেও, টইটই করে ঘুরে বেড়ায়। আমরা কিছু বলি না। পড়াশোনাটা ঠিক রাখতে হবে, কোনো নেশায় আসক্ত হওয়া যাবে না এবং কোনোদিন কোনো মেয়েকে অসম্মান করা যাবে না – এই তিন শর্তে আমরা তাকে অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছি। সে শর্ত মেনে চলে বলেই আমরা তার ঘোরাফেরা-আড্ডাবাজিতে বাধা দিই না। তরুণ বয়সে আমি নিজেও কম আড্ডাবাজ ছিলাম না।
তো, বেশিরভাগ সময় বাসায় থাকি আমরা দুজন। সময়টা যে খুব ভালো কাটে তা নয়। কথাবার্তা খুব বেশি হয় না। বলার মতো কথা তেমন বাকিও নেই। তিরিশ বছরের সংসারযাপন – ঝগড়াঝাটি, মনোমালিন্য, মান-অভিমান সবই পুরনো হয়ে গেছে। দোলা সিনেমা দেখতে পছন্দ করে, দেখেও; আমি বই পড়ি, গান শুনি বা চুপচাপ বসে থাকি। কখনো কখনো সময়টাকে বেশ ভারি মনে হয়, যেন পারই হতে চায় না। বছরদশেক আগে আমার অসুখটা ধরা পড়ার পর থেকেই আমাদের জীবনের স্বাভাবিক গতিপথ পাল্টে গেছে। প্রাথমিক ধাক্কা সামলাতেই বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। আমার তখন কেবলই মনে হতো, আমিই কেন এরকম অনারোগ্য অসুখে আক্রান্ত হলাম! কেবল আমিই নই, পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ যে বিবিধ দুরারোগ্য-অনারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়, হচ্ছে, সে-কথা মনেই হতো না। অন্য সব আত্মকেন্দ্রিক মানুষের মতো আমিও ভাবতাম, আমিই কেন, আমিই কেন? অত দোষ ধরবেন না, ওরকম আপনারাও ভাবেন। ভাবেন না বলুন? তো, পরিবারের একজন মানুষ অসুস্থ হলে শুধু সে-ই ভোগে না, সেই অসুখের ভার বহন করে অন্য সদস্যরাও। দোলা আকস্মিক সিদ্ধান্তে চাকরি ছেড়ে দিলো। আকস্মিক, কারণ, হঠাৎই তার মনে হলো, পরিবারের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ সে দিতে পারছে না। এরকম মনে হওয়ার কোনো কারণ ছিল না, ও খুব সুচারুভাবে সংসার গুছিয়ে রেখেছে, পরিবার পরিচালনা করছে, আমার ভূমিকাই বরং গৌণ। ওর চাকরি ছেড়ে দেওয়ার ব্যাপারটা আমার ভালো লাগেনি, কারণ দুজন মিলে কিছু টাকা জমাচ্ছিলাম, ভেবে রেখেছিলাম, একটু গুছিয়ে একটা ফ্ল্যাট কিনবো দোলার নামে। বারবার বাসা বদলানো আর সারাজীবন ভাড়া বাসায় থাকার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবো। ও চাকরি ছেড়ে দেওয়ার ফলে সেই পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হলো, কিন্তু এ নিয়ে বিশেষ উচ্চবাচ্য করলাম না। তখন আমি নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত, ‘কেন আমার এমন হলো’ এই চিন্তা করতে করতেই অস্থির। ছেলেটা তখন স্কুলে পড়তো, ও অবশ্য মায়ের চাকরি ছেড়ে দেওয়া নিয়ে খুশি, মায়ের সঙ্গে স্কুলে যাচ্ছে, ফেরার সময় মা নিয়ে আসছে, ফিরে এসে মায়ের সঙ্গে স্কুলের হাজারটা গল্প করছে, তার খুশি হওয়ারই কথা। বাবার অসুখের ব্যাপারটা তখনো সে বুঝে উঠতে পারেনি। অবশ্য বড় হয়ে উঠতে উঠতে তাকেও বুঝে নিতে হয়েছে যে, তাদের পরিবারটি ঠিক স্বাভাবিক নয়। এখানে সব আয়োজনের ওপর আসন্ন মৃত্যু তার দীর্ঘ কালো ছায়া বিস্তার করে আছে। শুধু দোলা এবং রাহুল নয়, আমার ভাই-বোন বা শ^শুরবাড়ির পরিবারও এই যন্ত্রণার ভার বয়ে বেড়াতে লাগলো। ভাগ্যিস, আমার মা এবং বাবা আগেই পরপারে চলে গেছেন, তাদের এই ভার বহন করতে হচ্ছে না।
যা হোক, এতদিনে ব্যাপারটা বেশ সয়ে এসেছে। মৃত্যু আসছে, তা মেনে নিয়েছি। ওটা সবারই আসে, তবে একেবারে ঘোষণা দিয়ে আসার ব্যাপারটা বেশ অমানবিক, কিন্তু তাও সহজে গ্রহণ করেছি। তাছাড়া উপায় কী? ডাক্তাররা যখন চিকিৎসাবিদ্যার অপারগতার কথা জানিয়ে দেন, তখন আর কী-ইবা করার থাকে অপেক্ষা করা ছাড়া? অপেক্ষা মানে, ভালো কিছুর জন্য নয়, অনিবার্য পরিণতির জন্য। অবশ্য তারপরও মন মানে না। দোলা হঠাৎ করেই ধর্মেকর্মে মন দেয়, মোনাজাতের সময় কান্নাকাটি করে, মাতৃস্থানীয় গুরুজনদের শিখিয়ে দেওয়া দোয়াদরুদ পড়ে আমাকে ফু দেয়, মুরুব্বিদের কাছে দোয়া চায়, এমনকি কয়েকবার মাজারে গিয়েও দোয়া চেয়ে এসেছে আমার সুস্থতার জন্য। তবে, আমার ইদানীং কেন যেন মনে হয়, দোলা যেন একটু ক্লান্তও হয়ে পড়েছে। স্বাভাবিক। একজনের রোগের ভার অন্য আরেকজন
কতই-বা বহন করতে পারে? কেন ওরকম মনে হয় জানেন? ধীরে ধীরে ওর নীরব এবং উদাসীন হয়ে যাওয়া দেখে। যেন কোনোকিছুতেই কিছু যায়-আসে না। একটা উদাহরণ দিই। আমার রোগের ধরনটাই এমন যে, আমার শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্যথা হয়। একেক সময় একেক জায়গায়। কখনো মাথায়, কখনো বুকে, কখনো পিঠে, কাঁধে, ঘাড়ে, হাতে বা পায়ে। শুরু হয় অল্প দিয়ে, তারপর ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে তীব্র হয়ে ওঠে। আমি মুখ বুজে সহ্য করার চেষ্টা করি, সবসময় পারি না, কাতরধ্বনি বেরিয়ে আসে মুখ থেকে। কিন্তু দোলা একটু ছুঁয়েও দেখে না আমাকে। অথচ একসময় আমার বুকের ওপর হাত না রাখলে ওর ঘুম আসতো না। আমার রোগটা ছোঁয়াচে নয় যে স্পর্শই করা যাবে না, তবু যে ওর এই নিস্পৃহতা, তার কারণ ওই ক্লান্তি। না, ওর দোষ নেই, ওর জায়গায় আমি হলে আমিও ক্লান্ত হতাম। তাছাড়া, এই যে খোদার কাছে ওর অবিরাম কান্নাকাটি, এসব দেখে আমার মনে হয়, ও যেন একটা অলৌকিক সমাধান খুঁজছে।
আমার অবশ্য ধর্মকর্মে মন নেই, তবে মনে মনে যে খোদার কাছে মিনতি করি না তাও নয়। সমস্যা হলো, আমার মন প্রশ্নমুখর, হৃদয় সংশয়ে ভরা। ভাবি, আমরা যে অনাদি-অসীম ঈশ্বরের কল্পনা করি, তিনি আমার মতো ক্ষুদ্র এক প্রাণের আর্তি কেন শুনবেন? কেনই-বা আমার অসুখবিসুখের খবর রাখবেন? এসব রোগবালাই হয় জৈবিক নিয়মে, জীবনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে। এসব বিষয়ে তার হস্তক্ষেপ করার কথা নয়। তারপরও ফের মিনতি করি তার কাছেই! এইরকম আর কি!
আরেকটা পরিবর্তন এসেছে আমার মধ্যে। আগে শুধু টাকা বাঁচানোর চিন্তা করতাম। শহরের প্রান্তবর্তী এলাকায় ছোট একটা বাসায় থাকতাম, অফিসের স্টাফ বাসে অথবা লোকাল বাসে যাতায়াত করতাম, অন্যসব খরচও করতাম খুব হিসাব করে। যদিও আমার বা দোলার চাকরি ছিল যথেষ্ট ভালো, আয়ও করতাম পর্যাপ্ত। ওই যে টাকা জমিয়ে একটা ফ্ল্যাট কেনার সাধ, সেজন্যই এত কৃচ্ছ্র। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে এই আচরণ অন্যায্য নয়। কিন্তু এখন আর সেই সাধ নেই। বরং মনে হয়, এত কষ্ট না করে জীবনটাকে উপভোগ করা যাক। সেজন্য অভিজাত এলাকায় বড় একটা বাসা ভাড়া নিয়েছি। চৌদ্দতলা এই ভবনে একশ দশটা ফ্ল্যাট, চারটা লিফট, দুজন রিসেপশনিস্ট, একজন ম্যানেজার, তেরোজন সিকিউরিটি গার্ড, চারজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী, জেনারেটর, ডিপ টিউবওয়েল সবই আছে। নয়তলার একটা ফ্ল্যাটে আমরা থাকি। প্রচুর আলো-বাতাসভরা এই বাসায় থাকতেও ভালো লাগে। একটা গাড়িও কিনেছি। নিজের গাড়িতে চড়তেও ভালো লাগে। মনে হয়, জীবন এরকমই হওয়া উচিত।
তিন
গল্পটা শুরু করেছিলাম একটা বিড়ালকে নিয়ে। কথায় কথায় কোথায় চলে এসেছি দেখুন। গল্পের স্বভাবই এরকম, শুধু ডালপালা ছড়ায়। যা হোক, আবার ওর প্রসঙ্গে ফিরি। পরদিন সকালে ঠিক একই ঘটনা ঘটলো। অফিসে যাওয়ার সময় দেখলাম ও দরজার কাছে বসে আছে। একইরকম ভঙ্গি, আর্তি, মিনতি, দোলার পায়ে মাথা ঘষা ইত্যাদি। অফিসের তাড়া ছিল বলে সেদিনও বেশিক্ষণ মনোযোগ দিতে পারলাম না। বিকেলে ফেরার পর জানতে পারলাম, বিড়ালটা ভেতরে এসে সেদিন খেয়েছে, অনেকক্ষণ ছিলও, তারপর নিজে থেকেই চলে গেছে। কিন্তু কোত্থেকে যে ও আসে, কোথায় যে যায় তা বোঝা যাচ্ছে না। ওর এই আসা-যাওয়ায় অবশ্য আমরা অবাক হইনি। প্রাণিজগতের অদ্ভুত কিছু অলিখিত নিয়ম আমাদের এতদিনে জানা হয়ে গেছে। যেমন, আপনি যদি একবার একটা বিড়াল পোষেন, সেই বিড়াল হয়তো কয়েক বছর পর মারা যাবে, কিন্তু সারা জীবন ধরে আপনি যেখানেই যাবেন সেখানেই কোনো না কোনো বিড়াল আপনার কাছে আসবে। কুকুরের বেলায়ও তাই। প্রকৃতির অলিখিত নিয়ম। ওরা কীভাবে বোঝে, কীভাবে জানে, কোত্থেকে খবর পায়, সংযোগটা কীভাবে তৈরি হয় তা অবশ্য বুঝে উঠতে পারিনি। সম্ভবত প্রকৃতি তার সব গোপন রহস্য বুঝতেও দেয় না।
যা হোক, এই বিড়ালটা কোত্থেকে আসছে সেই কৌতূহল সরিয়ে রাখা যাচ্ছে না। প্রতিদিনই সে আসছে কেন, চলেই বা যাচ্ছে কেন? রাতে ও ঘুমায় কোথায়? অবশ্য সপ্তাহখানেকের মধ্যে দোলা এইসব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে গেল। এ-বাসায় আমরা নতুন এলেও বিভিন্ন খবরাখবর দেওয়ার জন্য সিকিউরিটির লোকজন এবং বুয়াবাহিনী প্রস্তুত হয়েই ছিল। বিড়ালটা প্রতিদিন আমাদের বাসায় আসছে – সে-খবর দ্রুতই তাদের কাছে পৌঁছে গেল এবং তারা যেচে পড়ে দোলাকে যা জানালো তা হলো এই : ওটা সভাপতি মহোদয়ের পোষা বিড়াল। ফ্ল্যাট-মালিক সমিতির সভাপতি আর কি! না, ঠিক তার নয়, তার স্ত্রীর। আমাদের ঠিক নিচের ফ্লোরে, মানে আটতলায় ওনাদের বাসা। তা, বিড়ালটা বাইরে বাইরে ঘোরে কেন? কারণ, সভাপতির স্ত্রী বাচ্চাদের নিয়ে কানাডায় চলে গেছেন, বিড়ালটাকে রেখে। আর সভাপতি? না, তিনি যাননি। এ-বাসায় তিনি থাকেনও না। আরেকটা বিয়ে করেছেন, নতুন বউ নিয়ে অন্য বাসায় থাকেন। সেজন্যই তার আগের স্ত্রী নিজের সন্তানদের নিয়ে কানাডায় চলে গেছেন, তবে এই ফ্ল্যাটের চাবি তার কাছেই। নিজের হিস্যা তিনি ছাড়েননি। রীতিমতো পারিবারিক ক্লাইমেক্স। এই জটিল ক্লাইমেক্সে বিড়ালটার কোনো জায়গা হয়নি। ভদ্রমহিলা ওকে নিয়েও যাননি আবার কারো কাছে দিয়েও যাননি। তবে, তিনি নাকি ম্যানেজারকে দায়িত্ব দিয়ে গেছেন বিড়ালকে দেখাশোনার জন্য, মাসে মাসে কিছু টাকাও পাঠান। কিন্তু পোষা বিড়ালের তো শুধু খাবার হলেই চলে না। তার আদর লাগে, যত্ন লাগে, সঙ্গ লাগে। সে ওই ফ্ল্যাটের দরজার বাইরে দিনরাত বসে থাকে, মাঝেমধ্যে করুণ স্বরে ডাকে, হয়তো দরজা খোলার আকুতি জানায়, কিন্তু ভেতরে তো কেউ নেই, খুলবে কে?
এইসব বলতে বলতে দোলা আকুল হয়ে কাঁদলো। বলতে লাগলো, মানুষ এত নিষ্ঠুর হয় কীভাবে? কীভাবে ওকে ফেলে রেখে গেল? আমি বুঝে নিলাম, টুকটুকির কথা মনে পড়ছে দোলার। কত যত্ন করেই না ওকে পুষতাম আমরা! কোনোদিন ওকে ছাড়া কোথাও যাইনি আমরা। হ্যাঁ, বিদেশে যাওয়া হতো না আমাদের, কিন্তু গ্রামের বাড়িতে বা অন্য কোথাও বেড়াতে গেলেও ওকে নিয়ে যেতাম। মাঝে মাঝে বরং ও-ই ঘর পালাতো। এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াতো, আর আমরা তিনজন দিনরাত অপেক্ষা করতাম – কখন ফিরবে ও! কখনো কখনো সারা রাত অপেক্ষা করতে হতো। তাও কোনোদিন ওকে অবহেলা করিনি। মাঝে মাঝে মনে হতো, আমরা নই, ও-ই আমাদের পোষ মানিয়েছে। সেই টুকটুকি হঠাৎ একদিন অসুস্থ হয়ে পড়লো, চঞ্চল-দুরন্ত বাচ্চাটা শান্ত-চুপচাপ হয়ে গেল, খেত না, কাছে আসত না, শুধু করুণ চোখে তাকিয়ে থাকত। আমরা একাধিকবার ওকে নিয়ে ভেটেরিনারি চিকিৎসকের কাছে গেলাম, কিন্তু কোনো উন্নতি হলো না। আমাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ও চলে গেল। ওর মৃত্যুশোক আমরা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি।
চার
এর মধ্যে বছর-তিনেক পেরিয়ে গেছে। আমার শরীর-স্বাস্থ্য আরো ভেঙে পড়েছে, প্রায় বিধ্বস্ত জীবন বয়ে বেড়াচ্ছি। প্রার্থনার ইচ্ছাও হারিয়ে ফেলেছি। এরই মধ্যে বিড়ালটি আমাদের আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই আসে সে, খাওয়াদাওয়া করে, ঘুমায়ও, কিন্তু রাতে থাকে না। একবার বিড়ালের মালিক ভদ্রমহিলা দেশে এসেছিলেন। তিনি জেনেছেন, আমরাই এখন ওর যত্নআত্তি করি, বাসায় এসে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে গেছেন। সঙ্গে এও বলেছেন, ও তো এখন আমার কাছে যেতেই চায় না। ও এলে খেতে দেবেন না প্লিজ, তাহলে আমার কাছে যাবে। আমরা আর কী করবো! ওনার বিড়াল, উনি যদি খেতে দিতে মানা করেন তাহলে কীভাবে খাওয়াবো! বিড়ালটা কেন ওনার কাছে যায় না, আমরা বুঝি। খুব অভিমানী প্রাণী ওরা, অবহেলা বুঝতে পারে। ওকে রেখে যে চলে গিয়েছিল, তার কাছে কেন যাবে সে! তিনি অবশ্য বেশিদিন থাকেনওনি। মাস-দুয়েক পর ফিরে গেছেন কানাডায়। বিড়ালটা ফের অনাথ। আবার আমাদের বাসায় যাওয়া-আসা, আমাদের কাছেই থাকা। অবাক ব্যাপার এই যে, ভদ্রমহিলা ওকে রেখে চলে যান কিন্তু মালিকানা ছাড়েন না। অন্যের পোষা বিড়ালকে তো নিজের মনে করে পোষাও যায় না। আমরা বুঝতে পারি, আমাদের সঙ্গে ওর একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে, ও-ই তৈরি করেছে, কিন্তু সত্যি বলতে কী, ওর সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার সাহসও হয় না। দায়িত্ব নেওয়া মানে, ভদ্রমহিলার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে ওকে নিজেদের বলে পোষা। অন্য কিছু নয়, সব ঝামেলা আমরা সইতে পারি, কিন্তু ওদের আয়ু তো বেশি নয়, আরেকটা শোক আমরা সইতে পারবো না। শোকের ভয়ে আমাদের দায়িত্ববোধ ফিকে হয়ে আসে।
আরো বছরখানেক পর, একসময় দেখি ও বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। নিয়মিত আসে না, যখন আসে তখন খেতে দিলে খায় না, হাড্ডিসার হয়ে গেছে। শুধু পায়ে পায়ে ঘোরে, গা ঘেঁষে বসে, কী যেন বলতে চায়। বুঝতে পারি, ও অসুস্থ, ভেটের কাছে নিয়ে যাওয়া দরকার। কিন্তু নিজেকে নিয়েই টানাটানি, ওকে নেবো কীভাবে? রাহুলও ওর পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত। দোলা ব্যস্ত সংসার নিয়ে, আমাকে নিয়ে, রাহুলকে নিয়ে। সত্যি বলতে কী, আমাদের খুব বেশি আন্তরিকতাও ছিল না।
এরপর বেশ কিছুদিন ও আর এলো না। কোথায় গেল, কী হলো ওর, এসব খোঁজ নিতে গিয়ে জানলাম, ও মারা গেছে।
মারা গেছে!
হ্যাঁ। ওর মালিক, সেই ভদ্রমহিলা এখন এখানেই। তিনি আসার পর বিড়ালটা খুব চেষ্টা করেছে ওই বাসায় ঢোকার, কিন্তু তিনি এবার ওকে আর ঢুকতে দেননি। ওর কাকুতি-মিনতিতেও তার মন গলেনি। সম্ভবত তিনি এবার কোনো ঘোষণা ছাড়াই বিড়ালটিকে ত্যাগ করেছিলেন। কোথায় যায়, কী খায়, কেমন আছে ও – এসব খবর রাখতেন না তিনি। ও বুঝতে পারেনি যে ওকে ত্যাগ করা হয়েছে, বোঝেনি যে সে এখন এক পরিত্যক্ত শিশু, সেজন্যই অবুঝের মতো ওই বাসার দরজার সামনে গিয়ে বসে থাকতো, করুণ সুরে ডাকতো, ভেতরে তার মালিক থাকলেও তার সাড়া মিলতো না। আমরা এসব খবর জানতাম না। তিনি যদি এমনকি আমাদেরও বলতেন, আমরা হয়তো ওকে আশ্রয় দিতাম। বিড়ালটা কোথায় যে কী খেয়েছিল, গলায় বোধহয় হাড় বিঁধেছিল, তারপর আর খেতেও পারতো না। ভদ্রমহিলা ওকে সেই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেওয়ারও চেষ্টা করেননি। ভেটের কাছে নেননি, চিকিৎসা করাননি। সব শুনে আমরা বুঝতে পারি, বিড়ালটা আমাদের কাছে আসতো সাহায্যের জন্য। গলায় বেঁধা হাড়টা যেন বের করার ব্যবস্থা করি, সেই আকুতি নিয়ে। আমরা জানতাম না, বুঝতে পারিনি, কিংবা বুঝতে চাইনি। আমরা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, এই নিষ্পাপ-নিরীহ প্রাণের বাঁচার আবেদন আমাদের হৃদয়কে জাগাতে পারেনি।
বিড়ালটা তার মালিকের বাসার সামনে, মানে দরজার সামনেই বসে থাকতো, সেখানেই মরে পড়ে ছিল। অতঃপর পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ওকে নিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে এসেছে। টুকটুকির মতো সৌভাগ্য তার ছিল না, মৃত্যুর সময় আদর তো পায়ইনি, মৃত্যুর পরও পায়নি কোনো ঠিকানা। সব জেনে আমাদের ভেতরে গভীর নীরবতা নেমে আসে। দোলা আকুল হয়ে কাঁদে, রাহুল অপরাধীর মতো মুখ কালো করে ঘুরে বেড়ায়। আর আমি? বাথরুমে ঢুকে, গোসল করার ছলে, শাওয়ার ছেড়ে অঝোরে কাঁদি। যতটা না ওর জন্য, তার চেয়ে বেশি নিজের জন্য। হঠাৎ করেই উপলব্ধি করি, বিড়ালটি যেমন অসুস্থ ছিল, আমিও তেমন; ও যেমন সাহায্যের আকুতি নিয়ে আমাদের কাছে এসেছিল, আমরাও তেমনই আকুতি জানাই খোদার কাছে, সাহায্যের জন্য; আমরা ওকে বাঁচাতে চেষ্টা করিনি, ওর মালিক ওকে ত্যাগ করেছিল, ও ছিল এক পরিত্যক্ত শিশু। আমাকেও হয়তো খোদা ত্যাগ করেছেন, আমিও এক পরিত্যক্ত তুচ্ছ জীব, হয়তো এ-কারণেই আমার সুস্থতার জন্য অজস্র আবেদন-নিবেদন-আকুতি-মিনতি তাঁর কাছে পৌঁছায় না।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.