মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর বিকশিত রঙীন আখরের চিহ্ন

জীবনের সংকীর্ণ বৈষয়িক পাওয়া, যাকে বলা যায় মানুষের নিত্যদিনের প্রয়োজনের পাওয়া, তাকে রবীন্দ্রনাথ অভিহিত করেছিলেন ‘আংশিকভাবে পাওয়া’ হিসেবে। তাঁর বিবেচনায় সেই ‘প্রয়োজনের জন্যে আমরা যাকে পাই তাকে তো কেবল প্রয়োজনের মতোই পাই, তার বেশি তো পাইনে।’ সেইজন্যেই তিনি মনে করতেন, শুধু মনে করাই নয়, বিশ্বাস করতেন যে, ‘পাওয়া বলতে যদি আমরা এই বুঝি তবে ঈশ্বরকে পাওয়া হতেই পারে না … তিনি আমাদের পাওয়ার সম্পূর্ণ অতীত। তিনি আমাদের বিষয়-সম্পত্তি নন।’ আর সে-কারণেই রবীন্দ্রনাথ এই আংশিক পাওয়ার চেয়ে পূর্ণাঙ্গ হওয়ার সাধনার দিকে জোর দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, ‘ও জায়গায় আমাদের কেবল হওয়া, পাওয়া নয়। তাঁকে আমরা পাব না, তাঁর মধ্যে আমরা হব। আমার সমস্ত শরীর মন হৃদয় নিয়ে আমি কেবলই হয়ে উঠতে থাকব।’ কীভাবে সেটি সম্পন্ন হবে? রবীন্দ্রনাথের মতে, ‘ছাড়তে-ছাড়তে বাড়তে-বাড়তে মরতে-মরতে বাঁচতে-বাঁচতে আমি কেবলই হব। পাওয়াটা কেবল এক অংশে পাওয়া, হওয়াটা যে একেবারে সমগ্রভাবে হওয়া – সে তো লাভ নয়, সে বিকাশ’ (রবীন্দ্রনাথ, ষোড়শ খণ্ড, ২০২৬ : ৫৬৮)। বিকাশের পথ

পদে-পদে রুদ্ধ হয়ে যায় দেখেই সম্ভবত ১৮৩৯ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি দিনেমার দার্শনিক সোরেন কিয়ের্কেগার্ড তাঁর দিনলিপিতে লিখেছিলেন, ‘In our times the teleological factor, which belongs to every view of life, is more and more obscured among the educated classes.Õ (Soren Kierkegaard, 1951 :71)।

দুই

মানুষ হিসেবে এই বিকশিত হওয়ার প্রসঙ্গে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর কথা নানা কারণেই আমাদের মনে পড়ে। সেটা শুধুই এ-কারণেই নয় যে, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মেধাবী শিক্ষক ছিলেন; একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন – কারণ শুধু সেটিও নয়; তিনি বিস্তর লেখালেখি করেছেন – কবিতা-গল্প, গান-নাটিকা-প্রবন্ধ – সেটিও একমাত্র কারণ নয়। সব মিলিয়ে সেটির মূল কারণ হচ্ছে, তাঁর সাধনা ছিল সেই সমগ্রভাবে হয়ে-ওঠার সাধনা। সন্জীদা খাতুন এ-প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘মনের ঐশ্বর্য দিয়ে বাস্তবের কঠোরতার মধ্যে পথ করে নিয়েছেন তিনি। বিশেষত প্রথম ভাগে তাঁর মধ্যে এই দুঃখজয়ী সজীবতা আমরা লক্ষ করেছি। এই সজীবতার দরুন তাঁর বিশ্বাস ছিল, যে-কোনো বিষয় যুক্তিসম্মতভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপন করলে বিষয়গুণে তা সকলের গ্রাহ্য হতে পারে। এ হলো মানুষের প্রতি বিশ্বাস – সব মানুষের অন্তর্গত মৌলিক মানবতাগুণে বিশ^াস’ (সন্জীদা, ২০০০ : ১০৫)। এই বিশ্বাসে ভর দিয়ে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী একেবারে নিজস্ব জগতের একটি বলয় নির্মাণ করেছিলেন। তাঁর সেই জগতের বড়-একটা অংশ জুড়ে রয়েছে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর রচনাসম্ভার। তাঁর সেই রচনাসম্ভার থেকে একটি গ্রন্থ – রঙীন আখর [প্রথম প্রকাশ : শ্রাবণ, ১৩৭০] নিয়ে আমাদের টুকরো কিছু ভাবনা উপস্থাপনের চেষ্টা।

তিন

মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী তাঁর গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছিলেন তাঁর প্রয়াত ‘সাহিত্যরসিক পিতা জনাব বজলুর রহিম’কে। বইয়ের ভূমিকায় তিনি জানিয়েছিলেন, ‘এই রচনাগুলি আমার নিতান্তই নিভৃত চিত্তের আলাপন। অন্য গুরুতর কাজের অবসর মুহূর্তে নিজের মনকে নিয়ে খেলা করতে করতে লেখা। কোন বিশেষ ভাব বা তত্ত্ব প্রকাশ এ রচনাগুলির উদ্দেশ্য নয়’ (মোফাজ্জল হায়দার, ১৯৭৮ : ৪৫৯)। এখানে যে-লেখাগুলি স্থান পেয়েছে, সেগুলোর শিরোনাম – ‘সৃষ্টির অবসর’, ‘উৎসব’, ‘আমাদের নববর্ষ উৎসব’, ‘শরৎ’, ‘ফুল’, ‘উৎসবের নক্শা’, ‘রুচি’, ‘আলোকের এই ঝরণা ধারায়’, ‘ছবি আর গান’, ‘লেখার উৎস’, ‘গীতিকাব্য’ এবং ‘রঙীন আখর’। লেখকের ‘ভূমিকা’ থেকেই আমরা বুঝতে পারি যে, এগুলোকে তিনি ব্যক্তিগত প্রবন্ধের শাখায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। সাহিত্যের এই শাখা সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে কবি শামসুর রাহমান বলেছিলেন, ‘ব্যক্তিগত প্রবন্ধের এই এক মস্ত সুবিধা, কোনো বাঁধাধরা খাতে রচনা প্রবাহকে বইয়ে দেবার তাগিদ নেই। কেউ আমার কলমের ঘাড় ধরে তাকে একটা নির্দিষ্ট গণ্ডিতে ঘোরাফেরা করতে হুকুমজারি করবে না। একটি আলপিনের পতনের কথা উল্লেখ করে প্রবন্ধ ফাঁদা চলে, তারপর ভাবনা যদি গিবন সাহেবের রোমক সাম্রাজ্যের পতনের দিকে ধাবিত হয়, তবু বাধা দিতে আসবে না কেউ। তবে তা বলে আবোল-তাবোল বকে গেলে সেই বকুনির শ্রোতা মেলা ভার। হ্যামলেটের পাগলামির ভেতর যেমন একটা মেথড আছে তেমনি ব্যক্তিগত প্রবন্ধের খেয়ালিপনার মধ্যেও একটা মেথড থাকা দরকার। নইলে রচনার হবে ভরাডুবি’ (শামসুর রাহমান, ২০১৭ : ৪২-৪৩)। আবার এর পাশাপাশি তিনি এ-কথাও বলেন, ‘ব্যক্তিগত প্রবন্ধ লেখার ব্যাপারে সুবিধার কথা বলেছি। এই সুবিধা শব্দটি প্রত্যাহার করতে ইচ্ছে হচ্ছে এখন। কারণ, কাজে লাগাতে না পারলে কোনো সুবিধাই শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয় না। রসোত্তীর্ণ ব্যক্তিগত প্রবন্ধ লেখার জন্য কল্পনার যে ঐশ্বর্য এবং লিপিকুশলতার চমৎকারিত্ব থাকা দরকার তা আদৌ সুলভ নয়। তাই সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অনেক লেখকের রচনা-তরী ঠেকে আঘাটায়।’ শামসুর রাহমান তাঁর সেই আলোচনায় এ-প্রসঙ্গও উত্থাপন করেছিলেন যে, একজন লেখকের পক্ষে জীবনের ‘সব অভিজ্ঞতাই কি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব’ কি না (ওই, ৪২-৪৩)।

এই প্রশ্ন সম্ভবত সব লেখককেই ভাবায়, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকেও ভাবিয়েছে। সেটির নমুনা তাঁর রচনাগুলোর মধ্যেই নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর এই গ্রন্থে লেখক জানিয়েছিলেন, ‘জীবনে অনেক দুঃখে দুঃখী আমি। পিতৃহারা ছেলে, দুঃখ কষ্ট অনাদরে মানুষ হয়েছি। কিন্তু অন্তরে বিধাতা আমার কোনো দৈন্য রাখেননি। বাইরের দুঃখ সেইখানে পুষিয়ে দিয়েছিলেন। তাই আমাদের বাহির বাড়ীর উঠোনের পাশের বুড়ো কামিনী ফুলের গাছ দুটির সঙ্গে ঘটেছিল আমার মিতালি। বেশ সকালে উঠতাম তখন। উঠোনে এসে দেখতাম, ছোট ছোট সাদা সাদা ফুলের পাপড়ি ঝরে পড়ে কামিনী ফুলের গাছের তলাটা ছেয়ে আছে। …আর অন্তর আমার ভরে যেত। যেন কি অপরূপ যাদু স্পর্শে আচ্ছন্ন হয়ে যেতাম। সেই অনুভূতি বুঝি ভাষায় ব্যক্ত করা যায় না’ (মোফাজ্জল হায়দার, ১৯৭৮ : ৪৯৭)। এ-প্রসঙ্গে আপাতত শুধু জার্মান চিন্তাবিদ ও লেখক লিশটেনব্যর্গ (Georg Christoph Lichtenberg)-এর কথা আমাদের স্মরণে আসে। এই জার্মান পণ্ডিতের মতে, ‘মানুষের মধ্যে ঘুমন্ত চিন্তাপ্রণালি জাগিয়ে তোলার উৎকৃষ্ট উপায় লিখন, আর যারাই কখনো কিছু লিখেছেন তাঁরাই আবিষ্কার করেছেন যে, লিখন সবসময়ই আমাদের মধ্যে সেইসব বোধ জাগ্রত করে থাকে যা আমাদের ভেতর নিহিত থাকে’ (লিশটেনব্যর্গ, ২০২৩ : ৬৫)। সেইসব বোধ জাগ্রত থাকা সত্ত্বেও আমরা তাদের ঠিকঠাক চিনে নিতে পারি কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছিলেন লেখক।

চার

মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী তাঁর রঙীন আখর গ্রন্থের মধ্যে আমাদের সেই বোধের জাগরণ ঘটাতে চেয়েছিলেন। বইয়ের শুরুতেই ‘সৃষ্টির অবসর’ রচনায়, তিনি তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার শীর্ষভূমি থেকে বলেছেন, ‘কোনো এক অখ্যাতনামা পল্লীর গাঁয়ের মাঠের কাঁচা সড়ক বয়ে চলেতেছিলুম। শরৎকাল, পথে বেশী কাদা নেই, মাঠও পানিতে টইটম্বুর নয়। হঠাৎ এক জায়গায় চোখে পড়ল – একটা ছোট্ট জলাশয়, তাকে পুকুরও বলতে পারেন, আবার আয়তনের দিক থেকে ততটুকু সম্মান নাও দিতে পারেন। কিন্তু তার বুকের জলটুকু স্থির, আকাশের নীল আর গাছের ছায়া পড়ে তার রঙ গাঢ়, গভীর। সব পানিটুকু মিলে যেন একটি নীল ফলক।’ সেই দৃশ্য অবলোকনের পরেই লেখক বলেন যে, ‘থমকে দাঁড়ালুম। সামনে পরিপূর্ণ সৌন্দর্যের একখানি ছবি।’ তাঁর পরিশীলিত মনে এই কথাটিই প্রতিধ্বনিত হয়েছে যে, ‘সত্যিকারের সৌন্দর্যের বস্তু এমনি চির আনন্দময়।’ তাঁর এই বক্তব্যের কৈফিয়তস্বরূপ যেন পাঠকের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমি এখানে কোনো পুরনো তত্ত্ব বা থিওরী আওড়াবার চেষ্টা করছি না। অনুভব এবং সৃষ্টির সাধারণ কথাটাই নিজের মতো করে বুঝাবার চেষ্টা করছি।’ কী সেই কথা? মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর মতে, ‘সৃষ্টির অন্তরে রয়েছে একটি অচঞ্চল স্থৈর্য, একটি অনাহূত শান্তি। সেই শান্ত সরোবরের বুকে প্রস্ফুটিত, স্থির অচপল কুমুদ … জল সেখানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তাই রূপশ্রী তার পাপড়ি মেলেছে যেখানে, সৌন্দর্যের লক্ষ্মী এসে পেতেছেন আসন। চঞ্চল স্রোতের জলে শ্যাওলাই ভেসে চলে, পদ্মফুল ফোটে না’ (মোফাজ্জল হায়দার, ১৯৭৮ : ৪৬৩-৪৬৪)। আর ফোটে না বলেই লেখকের মনে পড়ে যায় আমাদের সাহিত্যের দীনতার কথা; সেইসঙ্গে লেখক-পাঠক-সমালোচকের পাঠের অভিজ্ঞতার অপূর্ণতা, তাঁদের মনের সংকীর্ণতা – এসবও তাঁর চিন্তার রাজ্যে এসে ভিড় জমায়। ভিড়ের সেই প্রকাশ ঘটেছে এইভাবে – ‘আমাদের হৃদয় বোধহয় এখনও ভরে ওঠেনি, তাই আমাদের সৃষ্টির দীনতা। আরও পড়াশোনা, চিত্তের আরও সমৃদ্ধি আর বিস্তৃতির প্রয়োজন আমাদের। বিশ্বসাহিত্যের অকুণ্ঠরস পানে আমাদের অন্তঃকরণ পুষ্ট হয়ে উঠুক, দেশ-বিদেশের সাহিত্যের আনন্দিত সঞ্চয় আমাদের হৃদয় আরও ভরে তুলুক, তবেই সৃষ্টির ক্ষেত্রে দানেরও আমরা উপযুক্ত হব’ (ওই : ৪৬৪)। পাঠের সঞ্চয় আর ঐশ^র্যকে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী সবসময়ই মান্যতা দিয়ে গিয়েছেন। লিশটেনব্যর্গ যেমন মনে করতেন, ‘যা পড়ি তার অধিকাংশই ভুলে যাই, ঠিক যেভাবে যা খাই তার বেশির ভাগই খেয়াল থাকে না। কিন্তু এটা জানি যে এ-দুটো যথাক্রমে আমার মন ও দেহে যথেষ্ট পুষ্টি জোগায়’ (লিশটেনব্যর্গ, ২০২৩ : ৬৭)। তাঁর নিজের উপলব্ধির সেই জায়গা থেকেই মোফাজ্জল বলেছিলেন, ‘আমাদের আজকের এই বিক্ষুব্ধ ঘোলাটে কাদা-মাটির পানি কোনদিন শান্ত স্থির হয়ে নির্মল অচঞ্চল সরোবরের রূপ ধারণ করবে তারই প্রতীক্ষায় আছি। বিশ্ব-সাহিত্যের বিচিত্র ঐশ্বর্য আহরণে সমৃদ্ধ, অন্তরের আনন্দরসে উদ্দীপিত সাহিত্যিক তখনই সার্থক সৃষ্টিকার্যে আত্মনিয়োগ করতে পারবেন। সেদিনই হবে সৃষ্টির যথার্থ অবসর’ (মোফাজ্জল হায়দার, ওই : ৪৬৬)।

পাঁচ

আমাদের বিভিন্ন ধর্মীয় এবং সামাজিক উৎসবের কথা বলতে গিয়ে লেখক শুরুতেই জানিয়েছেন, ‘পঞ্জিকার তারিখ মিলাইয়া চলিতে চলিতে একেকটা দিন সামনে আসিয়া পড়ে, যেদিনটাকে আমরা বলি উৎসবের দিন। সেই দিনটিকে আমরা বিশেষভাবে চিহ্নিত করিয়া রাখি, সেদিন আমাদের লাল আখরের দিন। পঞ্জিকার অন্য তারিখগুলি হইতে এই বারটি স্বতন্ত্র।’ নানা কারণে উৎসবের গুরুত্বকে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী স্বীকার করতেন। তার একটা বড় কারণ ছিল এই – ‘উৎসব আমাদের প্রতিদিনের সেই ক্ষুদ্র সীমানার বাইরে আসিয়া দাঁড়ানো। এই দিনে আমরা অন্য দিন হইতে বড় হই।’ গুরুত্বের কথা বিবেচনা করতে গিয়ে তাঁর আরো মনে হয়েছে যে, ‘দৈন্যের দায়ে প্রতিদিনের জীবন যেখানে দুর্বহ, নীরস, প্রেমহীন কলরব; যেখানে মিলিত জীবন শ্রীহীন, সেখানে আনন্দের অবকাশ কোথায়? কিন্তু জীবনে এসব আছে বলিয়াই তো উৎসবের আরও প্রয়োজন। আমাদের আনন্দ উৎসব যত ক্ষুদ্রতার বিরুদ্ধে মানব মহিমার জয় ঘোষণা।’ মহিমার সেই বিজয়ের কথা বলতে গিয়ে সামাজিক উৎসবের পাশাপাশি ধর্মীয় উৎসবের গুরুত্বকেও মর্যাদা দিতে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী কখনোই দ্বিধাগ্রস্ত হননি। সে-কারণেই তিনি বলতে পেরেছিলেন, ‘ঈদের পবিত্র উৎসব আমাদের কাছে এই বাণী লইয়া আসে। এই উৎসবের দিনে আমরা সুন্দর হইব, সকল হিংসা দ্বেষ বিসর্জন দিয়া সমস্ত মানুষকে ভাই বলিয়া আলিঙ্গন করিব – এই উৎসবের ইহাই তাৎপর্য। এক কথায় এই উৎসব আমাদিগকে মহৎ মনুষ্যত্বের দিকে অঙ্গুলী নির্দেশ করিতেছে। তাই তো ‘সিয়ামের’ সাধনা, এক মাসব্যাপী কঠোর তপস্যা। রমজানের কৃচ্ছ্র-সাধনার মধ্য দিয়া আমাদের সকল কালিমাকে ধুইয়া মুছিয়া ফেলিয়া এই মহত্ত্বের উপযুক্ত হইতে হয়। … তবেই আমাদের উৎসব সার্থক হইবে’ (মোফাজ্জল হায়দার, ওই : ৪৬৬-৪৬৯)। প্রখ্যাত মার্কিন চিন্তক-প্রাবন্ধিক এমারসন (Ralph Waldo Emerson) অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবেই জানিয়েছিলেন যে, লক্ষ্য, জ্ঞানের প্রতি বিশুদ্ধ ভালোবাসা, প্রকৃতির প্রতি প্রেমের অভাব – এইসব কারণেই একজন লেখকের কল্পনাশক্তি নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকে, যা কি না তাঁর বোধশক্তির শিথিলতারও অন্যতম একটি কারণ। এমারসনের ভাষায় বিষয়টা এভাবে বর্ণিত হয়েছে – ‘In the absence of the highest aims, of the pure love of knowledge and the surrender to nature, there is the suppression of the imagination, the priapism of the senses and the understanding.Õ (Emerson, 1950 :659)। দ্বিধাহীনভাবেই আমরা বলতে পারি যে, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর এই রচনাগুলো সেইসব প্রতিবন্ধকতাকে জয় করতে পেরেছে।

আবার আমরা দেখি যে, নববর্ষের উৎসবের কথা বলতে গিয়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে লেখক জানিয়েছিলেন, ‘চৈত্র মাসের সঙ্গে সঙ্গে বৎসর শেষ হইতে চলিল, নববর্ষ আসিতেছে। বৎসরের শেষে প্রকৃতি তাহার জীর্ণ পাতা খসাইয়া নবীন হইয়া উঠিয়াছে, গত বর্ষের সমস্ত হিসাব নিকাশ চুকাইয়া দিয়া নববর্র্ষের জন্য তার আয়োজন সম্ভার প্রস্তুত করিয়াছে।’ এই উৎসবের সঙ্গে ধর্মীয় উৎসবের কোনো রেষারেষিকে তিনি স্বীকার করেননি। এ-বিষয়ে তাঁর মতামত ছিল এমন, ‘প্রত্যেক জাতিরই একটি নিজস্ব স্বতন্ত্র এবং বৈশিষ্ট্যময় জীবনধারা আছে। ইহাই তাহার সংস্কৃতি। এই সংস্কৃতি লইয়া যদি সে বাঁচিতে না পারে তবে উহা সেই জাতির পক্ষে পরাধীনতা। পারসিক জাতি যদি নওরোজে উৎসব করিতে পারে তবে আমরা বাঙালীরা পহেলা বৈশাখ করিতে পারিব না কেন?’ পারতে যে হবেই তার কারণ দেখাতে গিয়ে লেখকের বারেবারে এটিই মনে হয়েছে, আমাদের রাষ্ট্রে, সমাজে, পরিবারে ‘আমাদের জীবন কতো মালিন্য, তুচ্ছতায় ভরে উঠেছে। আজ তাকে সযত্নে মুছে ফেলে তার উপর একটুখানি সুষমার রেখা ফুটিয়ে তুলতে হবে।’ তিনি এ-ও বিশ্বাস করতেন যে, ‘প্রকৃতির বুকে যে পরিবর্তন এসেছে, বিশ^ছবির দ্রষ্টা হিসাবে আমরা তাকে উপেক্ষা করতে পারি না। প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গে আমরাও যদি নবীন প্রাণশক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে উঠতে পারি, তবেই আমাদের নববর্ষের উৎসব সার্থক হবে।’ (মোফাজ্জল হায়দার, ওই : ৪৬৬-৪৭২)

রবীন্দ্রনাথ ‘উৎসবে’র কথা বলতে জানিয়েছিলেন, ‘সংসারে প্রতিদিন আমরা যে সত্যকে স্বার্থের বিক্ষিপ্ততায় ভুলিয়া থাকি উৎসবের বিশেষ দিন সেই অখণ্ড সত্যকে স্বীকার করিবার দিন – এইজন্য উৎসবের মধ্যে মিলন চাই। একলার উৎসব হইলে চলে না।’ তাঁর কথাকে আরো খানিকটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘উৎসবের দিনে আমরা যে সত্যের নামে বহুতর লোকে সম্মিলিত হই, তাহা আনন্দ, তাহা প্রেম। উৎসবে পরস্পরকে পরস্পরের কোনো প্রয়োজন নাই – সকল প্রয়োজনের অধিক যাহা, উৎসব তাহাই লইয়া। এইজন্য উৎসবের একটা প্রধান লক্ষণ প্রাচুর্য। এইজন্য উৎসবদিনে আমরা প্রতিদিনের কার্পণ্য পরিহার করি প্রতিদিন যেরূপ প্রয়োজন হিসাব করিয়া চলি, আজ তাহা অকাতরে জলাঞ্জলি দিতে হয়। দৈন্যের দিন অনেক আছে, আজ ঐশ্বর্যের দিন।’ শুধুই ঐশ্বর্যের দিনই নয়; রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, উৎসবের দিনটি হচ্ছে ‘সৌন্দর্যের দিন। সৌন্দর্যও প্রয়োজনের বড়ো। ইহা আবশ্যকের নহে, ইহা আনন্দের বিকাশ’ (রবীন্দ্রনাথ, ষোড়শ খণ্ড, ২০১৬ : ১৮৭)। বিকাশের এই

ক্রম-অগ্রসরতাই ছিল মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর জীবনের অন্যতম সাধনার জিনিস।

ছয়

‘শরৎ’ ঋতুর কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ আমাদের জানিয়েছিলেন যে, ‘প্রাণের একটি রং আছে। তা ইন্দ্রধনুর গাঁঠ হইতে চুরি করা লাল নীল সবুজ হল্‌দে প্রভৃতি কোনো বিশেষ রং নয়; তা কোমলতার রং। সেই রং দেখিতে পাই ঘাসে পাতায়, আর দেখি মানুষের গায়ে। জন্তুর কঠিন চর্মের উপরে সেই প্রাণের রং ভালো করিয়া ফুটিয়া ওঠে নাই সেই লজ্জায় প্রকৃতি তাকে রং-বেরঙের লোমের ঢাকা দিয়া ঢাকিয়া রাখিয়াছে। মানুষের গা-টিকে প্রকৃতি অনাবৃত করিয়া চুম্বন করিতেছে।’ তাঁর এই কথার বিস্তারে রবীন্দ্রনাথ শরৎ-প্রসঙ্গে আরো বলেন, ‘শরতের রংটি প্রাণের রং। অর্থাৎ তাহা কাঁচা, বড়ো নরম। রৌদ্রটি কাঁচা সোনা, সবুজটি কচি, নীলটি তাজা। এইজন্য শরতে নাড়া দেয় আমাদের প্রাণকে, যেমন বর্ষায় নাড়া দেয় আমাদের ভিতর-মহলের হৃদয়কে, যেমন বসন্তে নাড়া দেয় আমাদের বাহির মহলের যৌবনকে। বলিতেছিলাম শরতের মধ্যে শিশুর ভাব। তার, এই-হাসি, এই-কান্না’ (রবীন্দ্রনাথ, সপ্তদশ খণ্ড, ২০১৭ : ৬৪৫)।

আমাদের চারপাশের প্রকৃতিকে গভীরভাবে ভালোবেসেছিলেন মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী। মানুষ-মাটি-পৃথিবী – এসবই ছিল তাঁর সবিশেষ আগ্রহের জায়গা। সেই আগ্রহ থেকেই প্রকৃতির ঋতু-পরিক্রমাকে খুবই মনোযোগের সঙ্গে তিনি খেয়াল করেছেন দিনের পর দিন। শরতের আবির্ভাবে তাঁর মনে যে-আবেগের সঞ্চার ঘটেছে তাকে প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের এই শরৎ যেমন একদিকে আনন্দের তেমনি প্রাচুর্যেরও। এই সময়ে এই দেশের শ্যামল প্রকৃতির আঁচল যেন ফসলে ভরে ওঠে। দীর্ঘ পরিশ্রমের অন্তে চাষী পাকা ধানে ঘর বোঝাই করে – যা তার সারা বৎসরের অন্ন আর বিত্ত। আত্মীয়-পরিজনের মুখে তুলে দেয় নবান্ন। তার মুখে ফোটে হাসি।’ সেই অনাবিল আনন্দের দিগন্ত জুড়ে পরিভ্রমণরত লেখকের মনে হয়েছে এইসব সাধারণ কিন্তু অসামান্য সব কথাবার্তা – ‘শরতের নিস্তেজ রৌদ্রের বিকেলগুলির মধ্য দিয়ে কখন যে শরৎ গড়িয়ে হেমন্ত এবং হেমন্ত গড়িয়ে শীত চলে আসে, টেরই পাওয়া যায় না। এক সময়ে দেখা যায় উত্তর থেকে হাওয়া বইছে। বেশ শিরশির করে গায়ে লাগছে আর শুকনো পাতা সব আস্তে আস্তে ঝরে গিয়ে গাছের তলায় ছড়িয়ে পড়ছে। আমরা অবাক হয়ে ভাবি – এরই মধ্যে তাহলে শীত এসে গেল!’ (মোফাজ্জল হায়দার, ওই : ৪৭৫-৪৭৬)। এ-কথা তো অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনায় আপ্লুত। আমরা জানি, তাঁর জীবনের একটা সময় কেটেছে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে, সেখানকার উৎসারিত জীবনবোধ তাঁর চিন্তা-চেতনায়, মনোজগতে আমৃত্যু বজায় ছিল। রবীন্দ্রনাথ ফুলের সৌন্দর্যের বৈচিত্র্যকে সম্মান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘ফুল যদি সুন্দর না হইত, তবু সে আমার জ্ঞানগম্য হইত, ইন্দ্রিয়গম্য হইত – কিন্তু ফুল যে আমাকে সৌন্দর্য দেয়, সেটা অতিরিক্ত দান।’ রবীন্দ্রনাথের মতে, ‘ এই বাহুল্যদানই আমার নিকট হইতে বাহুল্য প্রতিদান গ্রহণ করে – সেই যে বাহুল্য প্রতিদান, তাহাই প্রেম।’ তিনি এটিও মনে করতেন যে, ‘একদিকে এই বাহুল্য সৌন্দর্য, আর একদিকে এই বাহুল্য প্রেম, ইহা লইয়াই জগতের নিত্যোৎসব – ইহাই আনন্দসমুদ্রের তরঙ্গলীলা’ (রবীন্দ্রনাথ, ষোড়শ খণ্ড, ২০১৬ : ১৮৭)।

রবীন্দ্রনাথের মনোজগতের সেই চেতনায় ভর দিয়ে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী বলেছিলেন, ‘ফুলকে আমি মনে করি সুন্দরের দূত। সে যেন স্বর্গের বার্তা নিয়ে আসে আমাদের মাটির পৃথিবীতে। অবশ্য এটি শুধু আমার কথা নয়, আমার আগে বহু সৌন্দর্যের পূজারী এই কথা বলে গেছেন, এবং আরও উচ্ছ্বসিত ভাষায় ফুলের প্রশস্তি গেয়েছেন। আমি নিজে সত্যি করে যেটা অনুভব করছি, সেটা ফুলের মধ্যে একটা অনির্বচনীয় অপার্থিবতা।’ একেবারে অকপটে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘আমার কেবলি মনে হয়ে ফুলের দেহের সঙ্গে সঙ্গে তার একটা দেহাতীত সত্তা আছে, যা সীমাহীন। ফুলের দিকে আমি যতোই তাকাই, তার মধ্যে কেবলি একটা অশেষের ব্যঞ্জনা যেন শুনতে পাই’ (মোফাজ্জল হায়দার, ওই : ৪৭৭)। এই ব্যঞ্জনা শুধুই ফুলের রূপের, গন্ধের ব্যঞ্জনা নয়, সেটি বিভিন্নভাবে লেখকের কাছে বাঙালির আত্মপরিচয়ের স্বরূপ হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। এ-প্রসঙ্গে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছিলেন। তাঁর মতে, ‘মানুষের অনেক রকম পরিচয় রয়েছে। অবস্থাভেদে কিংবা প্রসঙ্গানুযায়ী কেউ তার কোনো একটি পরিচিতির উল্লেখ করে কিংবা একটি পরিচিতির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে। তার অর্থ এই নয় যে, সেটিই তার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ পরিচিতি। যখন অনেকে একই পরিচয়ে পরিচিত হতে চায়, তখন তা তাদের সমষ্টিগত পরিচয়ে পরিণত হয়। সেই সমষ্টিগত পরিচয়ের মধ্যে কিন্তু বহুত্বের একটা স্বাভাবিক সুযোগ নিহিত থাকে’ (আনিসুজ্জামান, ২০১৫ : ১২)। এই চরম সত্যিটা আমরা বারবার ভুলে যাই বলেই বিভ্রান্তির করালগ্রাসের মুখে আমাদের পড়তে হয়। সেই দিক থেকে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ছিলেন পরিচ্ছন্ন এবং শাণিত চেতনার অধিকারী। তাই তো ‘উৎসবের নক্শা’ প্রবন্ধে তাঁর পক্ষে এভাবে বলা সম্ভব হয়েছিল যে, ‘বাঙালী ভাবুক ও শিল্পী চিরদিন। পূর্ববঙ্গের ঘরে ঘরে, হাটে মাঠে ঘাটে সর্বত্র রয়েছে তার নিদর্শন। …  প্রতিদিনের নিত্য ব্যবহার্য তুচ্ছ জিনিস থেকে আরম্ভ করে উৎসবের দিনের দামী আভরণ আর সাজ-সজ্জা – সবকিছুতেই তার শিল্পীপ্রাণের স্পর্শ লেগেছে, এবং এক অপরূপত্ব লাভ করে তারা সামান্য থেকে অসামান্যত্বের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে’ (মোফাজ্জল হায়দার, ওই : ৪৮০)। সেই গৌরবময় অতীত থেকে বর্তমানে এসে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন, আজকের বাঙালি সমাজের আড্ডায় ‘কথাবার্তা বলছিলেন সবাই কিচির মিচির করে – বক্তা প্রায় সবাই। শ্রোতার সংখ্যা খুবই কম, বোধ হয় সেই মেয়েটি আর আমি ছাড়া একেবারে খানিকক্ষণের জন্যও কেউ চুপ করে ছিল না।’ তথাকথিত আধুনিকতার নামে রুচির বিকার হায়দারের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। তাঁর অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করেছিলেন এভাবে – ‘দেখে শুনে অনেক কিছুই মনে হ’ল। সভ্যতা কী, রুচি কী, আমার রুচিটাই কি সত্যি, না অধিকাংশ লোকে যে দিকে ঝুঁকেছে সেটাই সত্যি। পোশাক পরিচ্ছদ, হাল-চাল, আহার-বিহারে আমরা কাদের অনুকরণ করছি – আমাদের আদর্শই বা কী, কিংবা আদৌ আমাদের কোনো আদর্শ আছে কি না’ (মোফাজ্জল হায়দার, ওই : ৪৮৬)। এখানে বলে রাখা দরকার যে, ভারতবর্ষের যে-সাধনার কথা রবীন্দ্রনাথ তাঁর সারা জীবন ধরে নানাভাবে বলে গিয়েছেন, সেসব হায়দারের কাছে মূল্যবান বলে মনে হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাস করতেন যে, ‘বহুর মধ্যে আপনাকে বিক্ষিপ্ত করিয়া ফেলা ভারতবর্ষের স্বভাব নহে, সে এককে পাইতে চায় বলিয়া বাহুল্যকে একের মধ্যে সংযত করাই ভারতের সাধনা। ভারতের অন্তরতম সত্যপ্রকৃতিই ভারতকে এই সমস্ত নিরর্থক বাহুল্যের ভীষণ বোঝা হইতে বাঁচাইবেই। তাহার ইতিহাস তাহার পথকে যতই অসাধ্যরূপে বাধাসংকুল করিয়া তুলুক না, তাহার প্রতিভা নিজের শক্তিতে এই পর্বত-প্রমাণ বিঘ্নব্যূহ ভেদ করিয়াই বাহির হইয়া যাইবে – যত বড়ো সমস্যা তত বড়োই তাহার তপস্যা হইবে। যাহা কালে কালে জমিয়া উঠিয়াছে তাহারই মধ্যে হাল ছাড়িয়া ডুবিয়া পড়িয়া ভারতবর্ষের চিরদিনের সাধনা এমন করিয়া চিরকালের মতো হার মানিবে না। এরূপ হার মানা যে মৃত্যুর পথ।’ রবীন্দ্রনাথ এটিও মনে করতেন যে, ‘নীচের প্রতি যাহা প্রশ্রয় উচ্চের প্রতি তাহাই বঞ্চনা; – কখনোই তাহাকে ঔদার্য বলা যাইতে পারে না; ইহাই তামসিকতা – এবং এই তামসিকতা কখনোই ভারতবর্ষের সত্য সামগ্রী নহে’ (রবীন্দ্রনাথ, সপ্তদশ খণ্ড, ২০১৭ : ৫৯২-৫৯৩)।

সাত

আদর্শবাদের জায়গা থেকেই, বলা যায়, শ্রেয়োবোধের বিষয়ে একটি পরিচ্ছন্ন ধারণা ছিল বলেই মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী আমাদের পরিবারে-সমাজে-রাষ্ট্রে সর্বত্রই কালোর বিপরীতে সাদাকে, অন্ধকারের বিপরীতে আলোর উৎসবের কামনা করতেন। ‘আলোকের এই ঝরণা ধারায়’ প্রবন্ধে তিনি পুরনো কথাগুলোই আবার নতুনভাবে বলেছিলেন, ‘সৃষ্টির আদিতে নাকি ছিল শুধু অন্ধকার, অনন্তয়ারী গাঢ় তমিম্রা। দুর্ভেদ্য দুর্লঙ্ঘ্য এবং নিরেট। তখন বিশ্বে ছিল না কোনো জনপ্রাণী, ছিল না কোনো গাছপালা-তৃণ-লতা, পুষ্প। কেবল ছিলেন সেই অনাদি ইচ্ছাময় বিধাতা নিঃসঙ্গ, একা। এক সময় ইচ্ছাময় বিধাতা বললেন ‘আলোক আবির্ভূত হোক’ (Let there be light)। … সমগ্র বিশ্ব-চরাচরে জাগল সাড়া, পৃথিবী মুখরিত হল জীবনের জয়গানে, মাটির বুক থেকে উদ্ভিন্ন হল তৃণগুল্মলতা। নবীন কিশলয়ে জাগল মর্মর-ধ্বনি, মঞ্জরিত হয়ে উঠল বনে বনে ফলের কুঁড়ি, সুপ্ত প্রাণের সুবাসে ভরা। দীর্ঘ অন্ধকারের শূন্যতার পরে আলো আনল জীবন, আনল নতুন আশা। আর সেই থেকে আলো-অন্ধকারের পালাক্রমে আবর্তন চলছে ধরণীর বুকে, দিন এবং রাত্রির নিয়মিত পর্যায়ক্রমের মধ্য দিয়ে।’ তাঁর কাছে মনে হয়েছে, ‘আলোকের আশীর্বাদে জীবজগতের প্রাণ-চাঞ্চল্য, তার কোলাহল। … আলো দেয় জ্ঞান, আলো দেয় মুুক্তি।’ শুধু

তা-ই নয়; নিজের বক্তব্যকে আরো খানিকটা প্রসারিত করে তিনি বলেছিলেন, ‘এই ‘কালো’র ওপরে ‘সাদা’কে, অন্ধকারের ঊর্ধ্বে আলোকে জয়ী করে তোলবার প্রেরণা থেকেই মানুষের ধর্মবোধের উদ্ভব। মন্দকে বর্জন করে ভালোকে গ্রহণ করাই ধর্মের মূলকথা। এ ক্ষেত্রে বিবেচ্য-আপাত রমণীয়তা নয়, সামগ্রিক কল্যাণ; প্রেয়ের পরিবর্তে শ্রেয়ঃ। এই শ্রেয়োবোধ মানুষকে ক্রমশ মহত্তম সোপানে উন্নীত করে তোলে। ধার্মিকতা অর্থ তাই’ (মোফাজ্জল হায়দার, ওই : ৪৮৮-৪৮৯)। তিনি জীবনে শ্রেয়োবোধকে, আলো এবং সত্যকে কামনা করেছিলেন বলেই কবিতার রাজ্যে নিজেকে এইভাবে সমর্পণ করেছিলেন। কেননা, তাঁর মনে হয়েছে, ‘কবির কাব্য এমনি এক রাজ্যের আভাস এনে দিতো আমার কাছে, আর তারি দূরশ্রুত বাঁশীর সুর অন্তরকে কেবলি ব্যাকুল করে তুলতো।’ তিনি এ-ও জানিয়েছেন, ‘রবীন্দ্রনাথ একবার বলেছিলেন : কবিতা তো বোঝবার জন্য নয়, কবিতা বাজবার জন্য। রবীন্দ্রনাথের কবিতা বিশেষ করে শিশু কবিতা সম্পর্কে এ-কথা সত্য নিশ্চয়ই। রবীন্দ্রনাথের কবিতা বাজে বই কি’ (মোফাজ্জল হায়দার, ওই : ৪৯১)। শুধুই রবীন্দ্রনাথের কবিতা নয়, গীতিকবিতার ধরনটাই হচ্ছে এই বেজে-ওঠার ধরন। মোফাজ্জল হায়দার সে-কারণেই মনে করতেন, ‘গীতিকাব্য অর্থাৎ আবেগপ্রধান সুর-সংযুক্ত কবিতা পৃথিবীর সব সেরা সাহিত্যেরই প্রধান অংশ। … কবিতাগুলি সাধারণত গাওয়া হয় না, কিন্তু যে গভীর হৃদয়ভাব তাদের কবিতাগুলিতে প্রকাশ পেয়েছে তাতে সেগুলি গান না হয়েও গীতি, কেননা তাতে উৎসারিত হয়ে উঠেছে মানবাত্মার নিরুদ্ধ ক্রন্দনধ্বনি, যে কান্না তার হৃদয়ের গোপন কন্দরে বিচিত্র মূর্চ্ছনায় নিয়ত গুমরে উঠেছে। যে কবিতায় এই হৃদয়ভাবের সার্থক পরিচয় পাই, তাই সার্থক গীতিকবিতা। আজকের গীতিকবিতার যাচাই করবার এই হলো মানদণ্ড।’ এই গীতিকবিতার প্রসঙ্গে তিনি ‘মানুষের বেদনার রূপায়ণের উপরই বেশি জোর’ দিয়েছিলেন। কারণ তাঁর মনে হয়েছে যে, ‘বেদনা হৃদয়ের যে অন্তরতম তন্ত্রীটিতে আঘাত করে – আনন্দ তার থেকে অনেক দূরে, তাইতো আনন্দের কথাও যখন গভীরে গিয়ে পৌঁছায়, তখনই চোখের জল উথলে ওঠে।’ সার্থক গীতিকবিতা এই চোখের জলের গভীরতার যতটা কথা শিল্পিতভাবে বলতে পারে, আনন্দের কথা ততোটা হয়তো নয়। এ-প্রসঙ্গে তিনি মধ্যযুগের বৈষ্ণব কবিদের সহৃদয়তার প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে ভোলেননি (মোফাজ্জল হায়দার, ওই :

৫০৩-৫০৫)। সাহিত্যের এই পথ ধরেই যে আমাদের আত্মপরিচয় ধীরে-ধীরে পরিস্ফুট হয়েছে, সেটি প্রাবন্ধিক বিশ্বাস করতেন। এই  ক্ষেত্রেও তিনি রবীন্দ্রনাথের চিন্তার উত্তরাধিকার বহন করেছেন। তাঁর ‘আত্মপরিচয়’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘আমাদের পরিচয়ের একটা ভাগ আছে, যাহা একেবারে পাকা – আমার ইচ্ছা অনুসারে যাহার কোনো নড়চড় হইবার জো নাই। তাহার আর একটা ভাগ আছে যাহা আমার স্বোপার্জিত – আমার বিদ্যা ব্যবহার ব্যবসায় বিশ্বাস অনুসারে যাহা আমি বিশেষ করিয়া লাভ করি এবং যাহার পরিবর্তন ঘটা অসম্ভব নহে। যেমন মানুষের প্রকৃতি, তাহার একটা দিক আছে যাহা মানুষের চিরন্তন, সেইটেই তাহার ভিত্তি, – সেইখানে সে উদ্ভিদ ও পশুর সঙ্গে স্বতন্ত্র, কিন্তু তাহার প্রকৃতির আর-একটা দিক আছে যেখানে সে আপনাকে আপনি বিশেষভাবে গড়িয়া তুলিতে পারে – সেইখানেই একজন মানুষের সঙ্গে আর একজন মানুষের স্বাতন্ত্র্য।’

মানুষে-মানুষে স্বাতন্ত্র্যের সেই বাস্তবতাকে স্বীকার করে নিয়েও রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘যে আপনাকে পর করে সে পরকে আপনার করে না, যে আপন ঘরকে অস্বীকার করে কখনোই বিশ্ব তাহার ঘরে আতিথ্য গ্রহণ করিতে আসে না; নিজের পদরক্ষার স্থানটুকুকে পরিত্যাগ করার দ্বারাই যে চরাচরের বিরাট ক্ষেত্রকে অধিকার করা যায় এ কথা কখনোই শ্রদ্ধেয় হইতে পারে না’ (রবীন্দ্রনাথ, সপ্তদশ খণ্ড, ২০১৭ : ৬০৬)। ব্যক্তির আত্মপরিচয়ের সূত্র ধরে তার আত্মমর্যাদার এই বৃহত্তর পরিসরকে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী কখনোই অস্বীকার করেননি। শুধুই একজন অধ্যাপক কিংবা লেখক হিসেবে নয়, সমাজের একজন মর্যাদাবান মানুষ হিসেবেও এখানেই তাঁর স্বাতন্ত্র্য।

আট

এই গ্রন্থের সর্বশেষ রচনা ‘রঙীন আখর’; লেখকের তরুণ বয়সের গ্রামের ‘প্রেয়সী’র জীবন-মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে লেখা এক অতি-আবেগময় ধারাভাষ্য। লেখক জানিয়েছেন, সেই তরুণীর অকালমৃত্যুর পরে ‘চুপি চুপি তার কবরের কাছে গিয়ে হাজির হলাম দুই বন্ধু মিলে। পাষাণে বাঁধা সেই কবর। রঙের বাক্স খুলে দুই বন্ধু লিখলাম, নিজের নিজের নাম – তার কবরের দুই পাশে। তাকে ডেকে বললাম, জীবনে তোমাকে আমরা আমাদের কথা জানাতে পারিনি। আজ মৃত্যুতে তাই লিখে দিলাম – রঙীন আখরে। মৃত্যুর পরপারে তা কি তোমার কাছে গিয়ে পৌঁছবে?’ এই রচনার একেবারে শেষ বাক্যে সেই অতি-নাটকীয়তার সমাপ্তি ঘটেছে এইভাবে, ‘হায়রে তুলির লিখন, হায় রঙীন আখর। দশ বছর পরে আজ তোমাকে দেখতে এসেছিলাম। কিন্তু কোথায় সেই কবর, কোথায় সেই ভাঙা শহর। আজ সেখানে বিস্তৃত নদীর চর ধু ধু করছে’ (মোফাজ্জল হায়দার, ওই : ৫০৯)। এ-প্রসঙ্গে একটি কথা বলে নেওয়া জরুরি। তরুণ বয়সের এই ভাবালুতা থেকে এই লেখায় কখনো-কখনো ভাবুকতার ছটাও আমরা লক্ষ করেছি। রবীন্দ্রনাথের বয়ানে আমরা দেখতে পাই, যেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘ভাব জিনিসটা অক্ষুণ্ন অক্ষত। এই জন্য যাহারা ভাববিলাসী তাহারা কর্মকে অবজ্ঞা করে অথবা ভয় করিয়া থাকে। তেমনি আবার বিশুদ্ধ কেজো লোক আছে তাহারা ভাবের ধার ধারে না, তাহারা কর্মের কাছ হইতে খুব বড়ো জিনিস দাবি করে না বলিয়া কর্মের কোনো অসম্পূর্ণতা তাহাদের হৃদয়কে আঘাত করিতে পারে না।’ এর পাশাপাশি তিনি এটিও আমাদের স্মরণ করিয়ে দিকে ভোলেননি যে, ‘ভাবুকতা যেখানে বিলাসমাত্র নহে, সেখানে তাহা সত্য, এবং কর্ম যেখানে প্রচুর উদ্যমের প্রকাশ বা সাংসারিক প্রয়োজনের সাধনামাত্র নহে, যেখানে তাহা ভাবেরই সৃষ্টি, সেখানে তুচ্ছও কেমন বড়ো হইয়া উঠে এবং অসম্পূর্ণতাও মেঘপ্রতিহত সূর্যের বর্ণচ্ছটার মতো কিরূপ সৌন্দর্যে প্রকাশমান হয়’ (রবীন্দ্রনাথ, সপ্তদশ খণ্ড, ২০১৭ : ৬২১)। মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর গ্রন্থের সর্বশেষ রচনায় আমরা ভাবালুতার পাশাপাশি ভাবুকতার সেই সৌন্দর্যের প্রকাশ দেখতে পাই। এবং সব মিলিয়ে লেখকের প্রবল চিত্তশক্তির যে-প্রকাশ প্রতিটি রচনায় পাঠকের চোখে ধরা পড়ে, তাকে তবে সব মিলিয়ে বলা যায়, এই রঙীন আখর একজন সংবেদনশীল লেখকের অভিজ্ঞতার একটি শৈল্পিক রেখাচিত্র।

নয়

নিজের লেখালেখির উৎস সম্পর্কে বলতে গিয়ে মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী জানিয়েছিলেন, ‘আমার লেখার উৎস আনন্দ এবং বেদনা। যে আনন্দে আমার শৈশবের এবং কৈশোরের দিনগুলি মধুময় হয়ে উঠেছিল, তার কথা বুঝি বলে কিছুতেই বোঝাতে পারব না। এখনও আমার মনে পড়ে চার-পাঁচ বছর বয়সের কথা।’ লেখকের সেই বয়সে ‘দ্বিপ্রহরের অবসর সময় মা আমায় শুইয়ে রাখতেন, বাইরে যেন দুষ্টুমি করতে যেতে না পারি। ঘরের বারান্দায় চিৎ হয়ে শুয়ে শুয়ে চেয়ে থাকতুম আকাশের দিকে। নীল স্বচ্ছ আকাশের ওপর দিয়ে সাদা সাদা মেঘ ভেসে চলে যেত। আমার মনে হত এরাও এক রকম প্রাণী, কিংবা বুঝিবা মেঘরাজ্যের শিশু।’ সেই বালকের তখন মনে হতো যেন-বা ‘গল্প করতে করতে কিংবা কথা বলতে বলতে, ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে। … নির্জন দুপুরের শান্ত আকাশের সেই অলস মেঘগুলির সঙ্গে সঙ্গে আমায় ক্ষুদ্র শিশু চিত্তখানিও উড়ে চলে যেত কোন্ সুদূরে যেন পাড়ি দিতে’ (মোফাজ্জল হায়দার, ওই : ৪৯৬)। এ-কথা আমরা তো বলতেই পারি যে, আমাদের প্রবন্ধ-সাহিত্যে চিন্তা ও আবেগের

যে-ঐতিহ্য দেখা যায়, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী সেই ধারাটিকেই বরাবর অনুসরণ করে গিয়েছেন। তবে সেইসঙ্গে এটিও মানতে হয় যে, তিনি সবক্ষেত্রে ধরাবাঁধা গতের ছকের পথকে অবলম্বন করতে চাননি। আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা এই যে, এইসব লেখার মধ্যে লেখকের আত্মবিস্মৃতি কিংবা আত্মগরিমার কোনো ব্যাপার কখনোই ফুটে ওঠেনি। এটি একজন প্রাবন্ধিকের ক্ষেত্রে সামান্য কোনো অর্জন নয়, বেশিরভাগের মধ্যেই দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই প্রবণতা আমরা দেখতে পাই। সার্থক শিল্পের কাজ তার ঐতিহ্য-পরম্পরাকে ঋজু করে তোলা – সেটি বিষয় এবং শৈলী দুয়ের বেলায় প্রযোজ্য। তার মধ্যে সত্যের প্রকাশ যেমন থাকে তেমনি থাকে লেখকের শক্তির উদ্ভাসন – যা রঙীন আখরের মধ্যে বিচিত্রভাবে আমরা দেখতে পেয়েছি।

দশ

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পূর্বমুহূর্তে আমরা মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে হারাই। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এদেশীয় সহযোগীদের হাতে তিনি নিহত হন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘আমার দুই শিক্ষক মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর দেহাবশেষ পাওয়া যায়নি’ (আনিসুজ্জামান, ২০১৫ : ১৭)। এই শহিদ অধ্যাপক সম্পর্কে ড. নীলিমা ইব্রাহিম তাঁর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছিলেন – ‘শান্ত, ভদ্র, বিনয়ী এবং পরিশীলিত রুচির কোনও ব্যক্তি সম্পর্কে চিন্তা করতে গেলে অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর কথাই বিশেষভাবে মনে পড়ে। নিজের স্বভাবসুলভ কমনীয় আচরণে তিনি ছিলেন সবার প্রিয়। অজাতশত্রু অধ্যাপক চৌধুরী এমন নির্মমভাবে নিহত হবেন একথা কেউ কখনও ভাবতে পারেনি’ (সিদ্দিকা মাহমুদা, ১৯৮৭ : ৫১)। অন্যদিকে, মননশীল সাহিত্যিক-প্রাবন্ধিক অধ্যাপাক ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘দুঃখ, খুব বড় দুঃখ, নিতান্তই কম আসে – আসেই না। যখন এল তখন মৃত্যু, বিরহ, না-বোঝার দুয়ার দিয়েই এল।’ সেইসঙ্গে তিনি এটিও বলেছিলেন, ‘কিন্তু মৃত্যু, বিরহ কদিনের জন্যেই-বা! না-বোঝার আঘাত প্রায় জন্মাবধি। সেটা ক্ষমা করা যায়, ভোলা যায় না’ (ধূর্জটিপ্রসাদ, ১৯৮৭ : ৩০৩)। মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে আমরাও ভুলতে পারিনি। ২০২৬ সালের জুলাই : এ-বছরটিতে প্রতিভাবান এই অধ্যাপক-গবেষক-সাহিত্যিকের জন্মের শতবর্ষ পূর্ণ হবে। মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।

সহায়ক উল্লেখপঞ্জি

১. আনিসুজ্জামান, ২০১৫। আত্মপরিচয় ভাষা-আন্দোলন স্বাধীনতা, চন্দ্রাবতী একাডেমি, ঢাকা।

২. আনিসুজ্জামান, ২০১৫। বিপুলা পৃথিবী, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা।

৩. গেয়র্গ ক্রিস্টফ লিশটেনব্যর্গ, ২০২৩। বাতিল পুথি (তরজমা : শান্তনু গঙ্গোপাধ্যায়), বইপত্তর, কলকাতা।

৪. ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, ১৯৮৭। ধূর্জটিপ্রসাদ রচনাবলী :

তৃতীয় খণ্ড, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা

৫. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ১৯৭৮। মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী রচনাবলী : প্রথম খণ্ড (সংকলন ও সম্পাদনা : মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান), বাংলা একাডেমি, ঢাকা।

৬. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ২০১৬। রবীন্দ্র-রচনাবলী : ষোড়শ খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা।

৭. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ২০১৭। রবীন্দ্র-রচনাবলী : সপ্তদশ খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি, কলকাতা।

৮. শামসুর রাহমান, ২০১৭। একান্ত ভাবনা (প্রথম প্রকাশ : ২০০১), কথাপ্রকাশ, ঢাকা।

৯. সন্জীদা খাতুন, ২০০০। রবীন্দ্রনাথের হাতে হাত রেখে, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা।

১০. সিদ্দিকা মাহমুদা, ১৯৮৭। মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।

১১. Ralph Waldo Emerson, 1950. The Complete Essays and Other Writings of Ralph Waldo Emerson (Edited by Brooks Atkinson), The Modern Library, New York.

১২. Soren Kierkegaard, 1951. The Journals of Soren Kierkegaard (First Published : 1938), (Edited and Translated by Alexander Dru), Oxford University Press, London.