সৈকতের মোবাইলে অচেনা একটা নাম্বার থেকে ফোন এলো। ফোন ধরার পর মিষ্টি আর মিহি নারীকণ্ঠ শুনে মনে হলো কণ্ঠটা তার চেনা। নারীকণ্ঠ বলল,
আপনার সঙ্গে একটু বসতে চাই। মে বি অ্যারাবিকা কফি হাউজে আমরা সন্ধ্যায় বসতে পারি।
– আপনি? আমি ঠিক চিনতে পারছি না।
– আমি লেভেল টু’র ভাড়াটিয়া। নাদিয়া শ্রাবন্তী।
– ওহ, স্যরি। আপনার ফোন নাম্বারটা আমার কাছে ছিল না।
নাদিয়া শ্রাবন্তীর সঙ্গে একদিনই দেখা এবং কথা হয়েছে। তার বাসায় ডাকাতি হওয়ার পর বিল্ডিং কমিটির ডাকা মিটিংয়ে তিনি প্রথমেই নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন, আমি নাদিয়া শ্রাবন্তী। একটা শিপিং কোম্পানির চেয়ারম্যান ম্যাডামের সেক্রেটারি। পড়েছি চার্টার্ড অ্যাকাউন্টিং নিয়ে। এই বাসা আমি ভাড়ার জন্য পছন্দ করেছিলাম বাইরের বাগানের দারুণ সব গাছ দেখেই। আর সেই বাগানটার প্রতিটি গাছ গোড়া থেকে রফিক ভাই কেটে ফেলেছেন বলে আজ এই মিটিং। একজন ভাড়াটে হিসেবে আপনাদের ফ্ল্যাট ওনারদের মিটিংয়ে আমার থাকার কথা নয়। কিন্তু রফিক ভাই, আমাকে বারবার অনুরোধ করেছেন যেন আজ এখানে আমি উপস্থিত থাকি। আসলে … কী বলব, আমার বাসায় চুরি, না ঠিক চুরি নয় – আমি বলব যে, এক প্রকার ডাকাতি হওয়ার পর রফিক ভাই-ই বারবার আমাকে ফোন করে সান্ত্বনা দিয়েছেন, সাহস জুগিয়েছেন। আমার ডায়মন্ডের সব হার, সোনাদানা, আলমারিতে রাখা আট লাখ টাকা ক্যাশ ডাকাতরা সব নিয়ে গেছে …
সৈকত তাকে থামিয়েছিল। জিজ্ঞাসা করেছিল, ডাকাতরা কি মধ্যরাতে এসেছিল?
হঠাৎ এ-প্রশ্নে কিছুটা বিব্রত শ্রাবন্তী বলল, না। রাত; ঠিক রাত না … সন্ধ্যা বলা যায়। আটটা, সোয়া আটটার দিকে তারা বাসায় ঢুকেছে। পেছনের গাছপালার আড়াল নিয়ে ব্যালকনিতে উঠেছে, তারপর থাই গ্লাসের হ্যাচ বোল্ট ভেঙে ফেলেছে। আসলে, আমি কীভাবে বোঝাই! আমার পঞ্চাশ লাখ টাকা নিয়ে যেত কিন্তু আমার গহনাগুলো যদি ফেরত পেতাম তাহলে এত কষ্ট হতো না।
এ-কথায় সৈকত কৌতূহলী হয়ে উঠল। প্রশ্ন করল, কেন?
– ওগুলো আমার প্রথম স্বামীর দেওয়া উপহার ছিল।
কথাটা বলে শ্রাবন্তী বাকরুদ্ধ হচ্ছিল। তার কণ্ঠ ভারী হয়ে উঠছিল। এত অভিজাত, সুন্দরী, মেধাবী অথচ কম বয়সী একজন নারীর আবেগ আলোচনায় অংশ নেওয়া সবাইকে স্পর্শ করেছিল।
– আপনি মনে হয় তিন-চার দিনের ছুটিতে গিয়েছিলেন?
– না। আমি একদিনের জন্যই কুমিল্লায় গিয়েছিলাম। পরের দিন ভোরে এসে দেখি এই ঘটনা।
– আপনি তাহলে কীভাবে নিশ্চিত হলেন, চোর সন্ধ্যায় আপনার বাসায় ঢুকেছে?
– পুলিশ এসে পাশের বাসার সিসি টিভি ক্যামেরার রেকর্ড নিয়েছে, বলে শ্রাবন্তী তার মোবাইলে ভিডিও করে নেওয়া রেকর্ড দেখাল। বস্তুত দামি হলেও গাছগুলোর আড়াল নিয়েই চোরেরা সন্ধ্যারাতে অমন একটা কাজ করতে পেরেছে – যার কারণে রফিক সাহেব তার সব রাগ গাছগুলোর ওপরই ঝেড়েছেন। তার পক্ষে সাফাই গাইতে মাত্র কয়েক মাস আগে দোতলা ভাড়া নেওয়া এবং সেজেগুজে আসা শ্রাবন্তী কমিটির আলোচনায় ছিলেন অনাহূত সদস্য। সেই সন্ধ্যায় বিল্ডিং পরিচালনা কমিটির পুরুষ সদস্য, ফ্ল্যাট ওনারগণ সবাই রফিকের ওপর ভীষণ ক্ষিপ্ত থাকলেও লাস্যময়ী শ্রাবন্তীর উপস্থিতি তাদের আগুন-মেজাজে জল ঢেলে দিলো। মিটিং এজেন্ডা নিয়ে মাথা ঘামানোর চেয়ে স্ত্রীদের সামনে কতটা আড়াল নিয়ে মাঝে মাঝে শ্রাবন্তীকে দেখা যায় – এই চিন্তায় ডুবে গেল।
দুই
সুতরাং আপাতত মিস শ্রাবন্তীর নিমন্ত্রণে তেইশ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় অ্যারাবিকা কফি শপে যেতে এসবই সৈকতের মনে পড়ছিল। অভিজাত এবং অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সী একজন নারীর সঙ্গ এবং তার সঙ্গে সময়টা কীভাবে ম্যানেজ করা যায় তা নিয়ে সে গভীরভাবে ভাবছিল। নারীরা যতটা রহস্যময় তার চেয়ে বেশি রহস্য নিজের মধ্যে ধরে না রাখলে, সৈকতের মনে হয় – তারা ধরা দেয় না। কিন্তু সে কেন শ্রাবন্তীকে ম্যানেজ করতে চাইছে? পনেরো বছর আগে মালদ্বীপের নির্জন সাগরদ্বীপে রেখে আসা কয়েকটা দিন-রাতের স্মৃতি সে এখনো কোনোভাবেই ভুলতে পারে না। সেই থেকে সাগরের ধ্বনি যে তাকে গ্রাস করে আছে – তা থেকে মুক্তিও মিলছে না।
কোনো নারীর আমন্ত্রণে তার কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার এই প্রবণতা কি দুনিয়ার সকল নারীকে নিজের মনে করার এক অভিশপ্ত পৌরুষভ্রমণের অংশ? একটা রিকশা টুং শব্দ করে তার প্রায় শরীর ঘেঁষে দ্রুত পার হয়ে গেল। সৈকত দ্রুত সরে এসেই বাজে এবং অশ্রাব্য ভাষায় তবে অশ্রুতস্বরে তাকে গালি দিলো।
অ্যারাবিকা কফি হাউজে আগের মতো ভিড়ভাট্টা নেই। বাইরে চিকন বাঁশগুচ্ছ দিয়ে সাজানো করিডোরে
টেবিল-চেয়ারগুলোর মধ্যে সে অপেক্ষাকৃত নিরিবিলি একটা টেবিলে গিয়ে বসল। সাত-আট মিনিট পার হয়ে গেলেও শ্রাবন্তীর খবর নাই। সে ফোন করতে গিয়েও থামল। মেয়েদের প্রথম প্রথম পাত্তা দিলে পরে পাত্তা পাওয়াটা জটিল হয়ে যায়। তার জীবনাভিজ্ঞতা এ-ব্যাপারে কম নয়। সে বারান্দার ছোট ছোট ঘন বাঁশগুচ্ছের ভেতর সাজানো একটা কফি টেবিলে বসে ছিল। কোনো খোঁজাখুঁজি ছাড়াই শ্রাবন্তী সৈকতের সামনে এসে বসল। জিজ্ঞাসা করল, কফির অর্ডার দিয়েছেন?
অপরিচিত কোনো নারীর সঙ্গে এমন একান্তে সাক্ষাৎ না করা সৈকত হতচকিত হলো কিছুটা। নারীর মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে ভাবতে গিয়ে তার মনে হলো, আগ্রহ অথবা কোনো পুরুষের ব্যাপারে তাদের মনলোকে এক ধরনের নিরাপত্তাবোধ না থাকলে একজন নারী অন্তত কারো সঙ্গে একান্তে কফি খেতে চায় না। তার ধারণা, কোনো পুরুষের ব্যাপারে আকর্ষণ তৈরি না হলে – নারীরা তার সামনে যাওয়ার আগে সাজেও না। তাদের সময়কাল ভেবেই এসব মনে হলো তার। তাহলে শ্রাবন্তী এত স্মার্টলি ড্রেসআপ কেন করেছে? হালকা মেকআপ নিয়েছে? অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সী নারীরা আজকাল কি পঞ্চাশোর্ধ্ব পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়? নাকি এই বয়সী পুরুষদের প্রতিই তাদের আগ্রহটুকু বেশি? নাকি কোথাও যাওয়ার আগে সে এই সময়টুকু বেছে নিয়েছে? এই বয়সে এসে এখনকার সময়ের নারী-মনস্তত্ত্ব এবং সময়কে ধরতে কি সে ব্যর্থ হচ্ছে? যা হোক, শ্রাবন্তীকে নিয়ে এত কিছু কেন ভাবছে সে? বেচারা! কতই বা বয়স? সাতাশ/ আটাশ? কফির অর্ডার প্রসঙ্গ আসায় সে লাজুক স্বরে বলল, না। আমি আসলে আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। বুঝতে পারছিলাম না, আপনি আসবেন কি না!
মুখে রহস্যময়, স্মিত হাসি এনে, গালে টোল ফেলে শ্রাবন্তী বললেন, কেন মনে হচ্ছিল আমি আসব না?
– তা মনে হয়নি। তবে, আপনি অনেক সুন্দরী নারী তো … নায়িকাদের মতো যারা তারা তো কল্পনায় থাকে; সুতরাং তারা আমার মতো মানুষের চিন্তাতে অধরাই।
– আপনার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে, আপনি নারী পটানোর মাস্টার। আপনার চোখে তো ছুরি লুকানো। মেয়েদের চোখ না পেট কোনটা কাটার চাকু সেটা, নাকি প্রথমত মন তারপর পেট – তা কে বলতে পারে!
শ্রাবন্তীর কথায় চোখ যেন ঢেকে এলো সৈকতের। মনে হলো, এই প্রজন্মের নারীদের থেকে তার ব্যবধান বেড়ে গেছে দূরের এক দিগন্ত পর্যন্ত। তবু, আশ্চর্য! শ্রাবন্তীর তীর্যক কথাগুলো ভেতর থেকে তাকে উদ্দীপ্ত এবং প্রাণবন্ত করছে। সে দ্রুত কফির মেনু কার্ড খুলে বলল, ক্যাপাচিনো, ল্যাটে নাকি …
– আমাকে দেখে ক্যাপাচিনো টাইপের রস-কষহীন মনে হয়? নাকি ল্যাটে ল্যাটে মানে মিষ্টি মিষ্টি একটা মেয়ে বলেই মনে হয় … হি হি …
এই নারী সত্যিই তার বাড়িতে ডাকাতির মতো একটা ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করতে এসেছে, অথচ সৈকতের মনে হচ্ছে সে ডেটিংয়ে এসেছে। তার জীবন থেকে বৈচিত্র্য শব্দটা হারিয়েই গিয়েছিল। কিন্তু আজ শ্রাবন্তীর কথাগুলো তাকে চনমনে করছে। জীবন বৈচিত্র্যময় এমন ইঙ্গিতও দিচ্ছে। সাগরদ্বীপে কাটানো তার সময়গুলোকে ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ তুলে একাকার করে দিচ্ছিল। সে ল্যাটে কফির সঙ্গে কোনো এক অজানা উত্তেজনায় গ্রিলড্ বিফ এবং গার্লিক নান অর্ডার করল এবং তা করল শ্রাবন্তীর সঙ্গে তার আর কোনো মতামতের অপেক্ষা না করেই।
শ্রাবন্তী এবার বলল, বিফ, গার্লিক … দারুণ। কেমন একটা পুরুষালি খাবার। আর আমি কিশোরী বয়স থেকে এমন একজন পুরুষের কথা জীবনসঙ্গী হিসেবে ভাবতাম, যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় একদম মহাবীর হেক্টরের মতো। কাপুরুষ প্যারিসের মতো ‘প্রেমিক’ সুন্দরী হেলেনদের জীবনে বিরাট অভিশাপ।
সৈকত স্মিত হেসে প্রশ্ন করল, আপনার থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। আপনার স্বামী কি অমন ছিলেন? সিদ্ধান্ত নেওয়ার বেলায় খুব স্থির, কারো তোয়াক্কা করেন না?
– না। ও বরং কিছুটা ইলিয়াড মহাকাব্যের হেলেনকে নিয়ে পালিয়ে আসা প্যারিসের মতো। সারাদিন আমার ঘ্রাণ নিতে পছন্দ করতো। সুন্দরী নারীর ঘ্রাণেও গন্ধম থাকে। জানেন তো?
এ কথায় সৈকত এবার সত্যিই লাজুক হয়ে উঠল। তার গভীর দৃষ্টি শ্রাবন্তীর ঝলমলে অথচ নিরীহ, মায়াবী অথচ দুষ্টুমিতে ভরা চাউনির সঙ্গে বিনিময় হয়ে গেল। এ সময় শ্রাবন্তীর দৃষ্টি এমনভাবে সংকুচিত হলো যেন তা গভীরভাবে সৈকতের ভেতর কিছু একটা খুঁজতে গিয়ে লজ্জা পেয়েছে। তাদের এই দৃষ্টিবিনিময় দুজনেরই হৃৎস্পন্দনকে দ্রুততর করল। সৈকতের হৃদয় শান্ত হওয়ার আগেই গার্লিক নান আর বিফ এনে ওয়েটার তাদের সামনে রেখে দিয়ে বলল, স্যার কতক্ষণ পর কফি দেব? সৈকত কিছু বলে ওঠার আগেই শ্রাবন্তী বলল, যত দেরিতে পারো। আমার এই খাবার শেষ করতেই লাগবে এক ঘণ্টা। আমি ধীরে ধীরে খাই তো!
ওয়েটার চলে যাওয়ার পর শ্রাবন্তী জিজ্ঞাসা করল, আপনার সমস্যা নেই তো? নাকি বউ পায়ে এখনো সময়ের শিকল পরিয়ে রাখে?
– বউরা কেমন – সে তো আমার চেয়ে আপনিই ভালো বলতে পারবেন।
– শোনেন মিস্টার, মানুষের জীবনে সবচেয়ে অর্জনই বলেন অথবা প্রয়োজনই বলেন – সেটা কী হতে পারে বলে আপনার ধারণা?
– সুস্থতা।
– আরে মিয়া, আপনি তো দেখি বৈদ্যদের বৈদিক শাস্ত্রের মতো কথা বলেন।
– তাহলে, আপনার বিবেচনায় সেটা কী?
– স্বাধীনতা মশায়, স্বাধীনতা। না করার সম্ভাবনা বেশি থাকলেও যদি আবার কখনো বিয়েও করি, স্বামী কেন জগতের কেউ আমার স্বাধীনতায় হাত দিলে আমি তাকে খুন করে ফেলব।
সৈকতের এতক্ষণ পর মনে হলো – সে একজন ভয়ংকর নারীর মুখোমুখি বসে আছে। এমন একজন রোমাঞ্চকর চরিত্রের সঙ্গে দেখা হবে, বাজারের গলির মোড়ের পরিচিত জ্যোতিষী হাত দেখে তাকে আগেই জানিয়েছিল। সৈকত আসলে মৌরিনের খোঁজ জানতে জ্যোতিষীর কাছে গিয়েছিল। জীবনে একবার মৌরিন এসে তার সমস্ত কিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে গেছে। অনেক অনেক বছর ধরে সে মৌরিন-ঘোরে আক্রান্ত। ঝড়ের মতো কয়েক দিন-রাতের জন্য মৌরিন এসেছিল তার জীবনে। তারপর মেয়েটা তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ, সংযোগের সামান্য কোনো চিহ্নও পৃথিবীর কোথাও রাখেনি। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম সব যোগাযোগ মাধ্যমে এই নামটা ধরে ধরে সার্চ দিয়ে শত শত মৌরিনের প্রোফাইল সে খুঁজেছে।
না, কেউই তার সেই মৌরিন নয়! ঢাকা শহর, দেশের সব শহর তো বটেই পৃথিবীর অন্যান্য শহরের যত দালানকোঠা, সাগরদ্বীপ অথবা সৈকতের সব কটেজ, হোটেল, মোটেল দেখেছে – সবগুলোর দিকে নিরীহ, বিস্ময়ভরা, অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে সৈকত তাকিয়েছে – এগুলোর কোথাও কোনোদিন কি মৌরিনের পায়ের স্পর্শ পড়েছে! সামান্য কয়েকটা দিন-রাত অথচ তার জীবনের সবচেয়ে আলোকিত, আশ্চর্যজনক সময়গুলোর স্মৃতিকাতরতা রয়ে গেছে মৌরিনের সঙ্গে। মেয়েটা সারাজীবন তা কি বুঝলই না? যে-কালে একজন মানুষের হারিয়ে যাওয়া কঠিন সেই সময়ে সে মৌরিনকে কোনোভাবেই খুঁজে পাচ্ছে না! কিছুই না, যদি সে মৌরিনের কণ্ঠটুকু শুনতে পেত? তাকে বলার অনেক কথা তো রয়েই গেল! জীবনের শেষদিন পর্যন্ত অদ্ভুত এই হাহাকার নিয়েই তাকে কি জীবন পার করতে হবে?
শ্রাবন্তী কি মৌরিনের প্রেতাত্মা হয়ে তার সামনেই বসে আছে? কী এক ঘোরের বশে মাঝে মাঝেই বাজারের গলি-মোড়ে জ্যোতিষীর কাছে যায়। একটা দ্বীপে কাটানো সময়ে মৌরিনের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া তার জীবন নিয়ে তার কাছে জানতে চায়। জ্যোতিষীকে সে মৌরিনের চুলের একটা মামুলি সুতার সঙ্গে চকমকে পাথর জুড়ে দেওয়া ব্যান্ড দেখায়। যেটা দিয়ে মৌরিন তার কালো বিস্তৃত কেশগুচ্ছকে শাসাত। সেই চুলের ব্যান্ড সে তার পর থেকেই ডান হাতে পড়ে ঘুরছে। ব্যান্ডটা দেখিয়ে জ্যোতিষীর কাছে সে জানতে চেয়েছিল, – এই ব্যান্ডে সাগর জলের নোনার সঙ্গে একজন নারীর চুলের ঘ্রাণ লুকিয়ে আছে। আপনি কি বলতে পারবেন, মেয়েটা এখন কোথায় আছে? পৃথিবীর কোন প্রান্তে? অথবা অ্যাটলিস্ট, সে কেমন আছে?
সেই জ্যোতিষী মুঠোর মধ্যে ব্যান্ডটা নিয়ে, কলকাতার ভাষায় শব্দে টান দেওয়ার মতো করে নাকের কাছে নিয়ে লম্বা করে ঘ্রাণ নিয়ে কোনো ঘ্রাণ না পেলেও এমন ভঙ্গি করেছিল যেন এইমাত্র মেখে দেওয়া কোনো সৌরভ তাকে আচ্ছন্ন করছে। জ্যোতিষী তাকে বলেছিল, আছে, আছে। সে খুব ভালো আছে।
মৌরিনের ভালো থাকার খবরই জানতে চেয়েছিল সৈকত। কিন্তু তবু কেন তার ভালো থাকার খবরে এখনো তার বুকে অমন ঝড় ওঠে? জ্যোতিষী তখন বলছে, – আরো নারী তোমার জীবনে আছে। সত্যিই আছে। মধ্যবয়স পার হওয়ার পর যে ভয়ংকর নারী তোমার কাছে আসবে, মনে রেখো, তার সৌন্দর্যটুকু বিষাক্ত সাপের মাথার ফণায় অংকিত ফুল! জ্যোতিষীর কথার একটা বাক্য-বিসর্গ বিশ্বাস না করলেও তার কাছেই কয়েক মাস পরপর সৈকত ফিরে ফিরে আসে। ব্যান্ডটা খুলে তার হাতে দেয়। আর ঘ্রাণ-গন্ধহীন চুলের ব্যান্ডটা এমনভাবে জ্যোতিষী শুঁকতে থাকে যেন এই জগতের গোপন যত ঘ্রাণ, মায়ের গর্ভ থেকে যে ঘ্রাণ নিয়ে মানুষ পৃথিবীতে আসে, তার গোপন সব রহস্য সে ওই ব্যান্ডটাতে খুঁজে পেয়েছে। জ্যোতিষীর এমন অভিব্যক্তিতে সে আবেগাপ্লুত হয়। কেননা সেও একই আবেগ আর অনুভূতিতে, ভেতর থেকে একই অভিব্যক্তিতে খুঁজে ফিরছে মৌরিনকে। তাকে বিশ্বাস না করলেও এই কারণেই জ্যোতিষীকে টাকা দিতে তার মোটেও বাধে না। তার মনে হয়, জগতের সব মানব-মানবী তাদের রূপ-রস-গন্ধহীন জীবনটার অন্তরালে এভাবেই গোপন-গহিন রহস্যময় কিছু খুঁজছে – কল্পনার চোখে, না-জানা নামের ঘ্রাণে, পূর্বাহ্নের উদাসী হাওয়ায়, বিকেলের ম্লান আলোয় অথবা বৃষ্টিস্নাত মেঘলা দিনে, রংধনুর জেগে ওঠা সাত রঙে।
তিন
– কী হলো, কই হারালেন আপনি?
সৈকত অবাক হয়ে শ্রাবন্তীর দিকে তাকাল। তার টলটল মায়াবী চোখের ভেতর তুষের আগুনের মতো কামনাটুকু যেন দেখে নিল। কিন্তু সাবধান হওয়ার বদল সে আনন্দ-শিহরিত কণ্ঠে বলল, গ্রেট।
– কী গ্রেট?
– আপনার ভাবনা এবং স্বাধীনতার বোধ।
– তাহলে আপনার উচিত নিজেও তাকে ধারণ করা। আজ এখানে দুই ঘণ্টা সময় গেলেও এখানে ভদ্র ছেলেটির মতো বসে থাকবেন।
খেতে খেতে সৈকতই ডাকাতির প্রসঙ্গ তুলল, আপনার বাসায় ডাকাতির ব্যাপারটা …?
– আহা, ডাকাতগুলো যদি আপনার মতো হতো?
– মানে?
– দেখুন না, ওরা কেমন কাছামারা লুঙ্গি পরা। আচ্ছা বেটাছেলেগুলো লুঙ্গি পরে কীভাবে দোতলায় দেয়াল বেয়ে উঠে যেতে পারে?
– সবাই তো পারে না। সবাই লুঙ্গি পরেও না।
– লোকটাকে আমার ঘাপলা মনে হয়।
সৈকত আগ্রহভরে জিজ্ঞাসা করল, কোন লোক?
– ওই যে আটতলার রফিক সাহেব।
– কেন?
– বয়সের তুলনায় অনেক ছোট একটা মেয়েকে বিয়ে তো করেছেই, আগের ফ্ল্যাট বিক্রি করে এখানে আসার কারণও আছে। লোকটা সবার সঙ্গে ফ্যাসাদ তৈরি করেছিল। ওখানে কেউ তার সঙ্গে কথা বলত না। এখানে আসার এটাও একটা কারণ।
– চুরির ঘটনা আপনি প্রথমে রফিক সাহেবকে কেন জানালেন?
– এ-প্রশ্নে এই প্রথম বিব্রত শ্রাবন্তী বলল, তিনিই প্রথম আমাকে ফোন করে অনেকভাবে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন।
– সেটা কয়টার সময়?
– ভোর রাতে?
– আপনি আগে কখনো তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন?
– না।
– বেশ, রহস্যজনক।
– কেন?
– আপনার ফোন নাম্বার আমাদের কারো কাছে না
থাকলেও উনার কাছে আছে। মানে, লোকটা সেটা গার্ডদের কাছ থেকে জোগাড় করে রেখেছে। স্ট্রেঞ্জ!
– স্ট্রেঞ্জ কেন?
– এই দালানে একবার এক বাচ্চা ঘরের মধ্যে লকড হয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করছিল। বাড়িতে তার বাবা-মা ছিল না। আমরা সবাই অস্থির হয়ে দরজার লক ভেঙে বাচ্চাটাকে উদ্ধার করার সময়ও রফিক সাহেব নির্বিকার ছিলেন। তার জাপানি বউ তাকে তালাক দিয়ে ইউনিভার্সিটিতে পড়া বাচ্চা নিয়ে জাপানে একাই থাকে। জাপানি মেয়েরা স্বামীকে অনেক ভক্তি করে। তার সঙ্গেও তার হয়নি। বিল্ডিংয়ের ট্রান্সফর্মার একবার বার্স্ট হয়ে পুরো দালান বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হলো। আমি ডেসকো, মিস্ত্রি এসব নিয়ে পাগল হলাম। ফ্ল্যাট মালিকদের মধ্যে সবচেয়ে বয়সী আউয়াল সাহেবকেও অনেক দায়িত্ব দিলাম। কিন্তু রফিক সাহেবকে কোনোভাবেই নড়ানো গেল না। সেই মানুষ আপনার বাসায় ডাকাতির কারণে ভোররাতে আপনাকে ফোন করেছে? রিয়েলি, স্ট্রেঞ্জ!
– সুন্দরী মেয়েমানুষ বলে হয়তো বেচারার একটু দয়া উথলে উঠেছে, বোঝেন না। পুরুষ মানুষের কুড়কুড়ানির নাম হলো মেয়েদের জন্য মায়া উথলে ওঠা। সেই মেয়েটার জানা-অজানার বাইরে, অনেক কিছু নিয়ে গবেষণা করা। বোঝেন তো এসব, নাকি? আপনাকে দেখেও একটু ঘাপলা, ঘাপলা মনে হয়। চেহারা খুব নিরীহ হলেও তলে তলে তলবাজ কি না বোঝা কঠিন।
লম্বা সময় ধরে খেতে খেতে এমনসব কথায় শ্রাবন্তীকে ঠিক বুঝতে পারল না সৈকত। নারীটির জন্য ভয়, মায়া, রহস্য, উত্তেজনা সবই অনুভব করল সে। এবার সাহস সংগ্রহ করে সে তাকে জিজ্ঞাসা করল, আমি তলবাজ যদি হই, তাতে আপনার কী এসে যায়?
এ-কথায় একদম থেমে গেল শ্রাবন্তী। তার সব কথা যেন হারিয়ে গেল। তার দু-চোখ যেন একটু ছলছল করে উঠল। তার ঠোঁট দুটোও যেন কাঁপছে। শ্রাবন্তীর এমন অভিব্যক্তি সৈকতকে বিপাকে ফেললেও এতক্ষণ পর নারীটাকে যেন চেনা চেনা লাগছে। শ্রাবন্তী এবার সত্যিই চোখ মোছার জন্য টিস্যু নিল। বলল, না, তুমি তা হতে পারো না। তাহলে আমার চেয়েও অনেক বয়সের ব্যবধানের একজন পুরুষকে আমি অতটা ভালোবাসতে পারতাম না।
সৈকত চমকে গেল। এই কণ্ঠ এতক্ষণ পর তার চেনা চেনা মনে হচ্ছে।
– আমি শ্রাবন্তী নই। এটা আমার ফেক নাম। আমি মৌরিন। তোমার সেই মৌরিন! মাত্র তিনশ ত্রিশ ঘণ্টার সহযাত্রী হয়ে যে নারী তোমাকে সব উজাড় করে ভালোবেসেছিল।
আমাদের মিলন হয়েছিল, ফিহালহোলি আইল্যান্ডে।
– মৌরিন!
– আমাকে চিনতে তোমার এত সময় লাগল? পুরুষরা এমনই হয়। আমি কয়েকটা ঘণ্টার স্মৃতি নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছি, আর তুমি তা মনেই করতে পারছ না! আসলে সমাজটা এখন এমন হয়েছে যে, নাম বদলে ফেললে, মানুষও অচেনা হয়ে যায়। অবশ্য সামান্য চেনাতেই যে নারী কোনো পুরুষকে সব দিয়ে দেয় – সে তো সস্তাই হয়ে যায়, না? তাকে মনে রাখার কী-ই বা প্রয়োজন।
কী আশ্চর্য! পনেরো বছর আগের মৌরিন এখনো একটুও বদলায়নি? তার উদ্ভিন্ন শরীরের ভাঁজগুলোর কোথাও একটু পরিবর্তনও হয়নি!
চার
পনেরো বছর আগে …
একটা ফোন এলো। সৈকত ফোনটা ধরতেই অপরপ্রান্তের নারীকণ্ঠ বলল, সাগরের ছপাৎ ছপাৎ জলে নীল নীল আকাশটা যেন তার দিগন্তবিহারী ডানাগুলো ঝাঁপটিয়ে নিচ্ছে। আর জলের ভেতর থেকে কোরাল অথবা জেগে ওঠা সাদা বালুর স্তর অগভীর জলের স্তর থেকে মুখ উঁচিয়ে আকাশের ডানায় লেপ্টে থাকা নীল রঙে নিজের সাদাটুকু লুকাতে চাইছে। সাগরের এই দ্বীপটা থেকে দূরে আরো অনেক দ্বীপ। যেন নীল জগতের উচ্ছলতার ভেতর
এক-এক টুকরা সবুজ সবুজ শাড়ির আঁচল বিছানো তিলোত্তমা কোনো নারীর ইচ্ছাভুবন সেগুলো। দ্বীপটাতে সারাদিন অনেক দর্শনার্থী ছিল। বিকালের পর তাদের নিয়ে বড় বড় স্পিডবোট অথবা প্রবল গতিসম্পন্ন ছোট ছোট যাত্রীবাহী জাহাজ ফিরে গেছে। এই সাগর দ্বীপের ভেতরে কয়েকটা হোটেল আছে। সেখানে না থেকে জলের ওপর বৃত্তাকারে গড়ে তোলা কটেজগুলোর দুটো ভাড়া করেছে সৈকত। একটা তার জন্য আর একটা মৌরিনের জন্য।
সূর্য মাত্র অস্ত গিয়েছে। সৈকত তার কটেজের পেছনে পানির ওপর ঝুলন্ত সাঁকোটায় বসে জলের ভেতর পা ডুবিয়ে বসে অবাক হয়ে মাত্র রুপালি আস্তরণ ছড়ানো চাঁদের আলোয় সাগর, দূরের পাহাড় আর এই পৃথিবীর সৌন্দর্যটুকু দেখছিল। এমন অপার্থিব একটা জগৎকে এভাবে একা দেখতে গিয়ে জীবনের সব স্মৃতি, সব অনুভব একসঙ্গে যেন দোল দিচ্ছে। কোনো কোনো স্মৃতি ঝলছে উঠছে। কিছুদিন আগে হারিয়ে যাওয়া তার অসুস্থ নানার মুখ ভেসে উঠল। এক কিলোমিটার দূরের বাসা থেকে তিনি তাকে দেখতে এসেছিলেন। কাঁপা কাঁপা ধীর পায়ে নানার ফিরে যাওয়া, অনেক বছর আগে হারিয়ে যাওয়া বাবার মুখের হাসি – এই জোছনার ময়দামাখা আলোতে জ্যান্তব অবয়ব নিয়ে যেন তার চোখের সামনে ভাসছে। পৃথিবীর জন্মলগ্ন, জনমানবহীন এই মহাবিশ্ব এসব নিয়ে তার ভেতরটা দার্শনিক ভাবনার চেয়ে স্নিগ্ধ কিছু অনুভবে আক্রান্ত। কতক্ষণ ওভাবে গেল তা তার আর খেয়াল নেই। এই হালকা শীত অথচ সাগরের এই অংশের স্থির জলের উপরি অংশ পায়ে আরাম আরাম অনুভূতি দিচ্ছে। ফিরে যাওয়া
দুই-একটা ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ জলের স্পর্শ করছে তার দুই পা। প্রেমিকার মোহময় স্পর্শের মতো। আহা, জীবনটা যদি এমনই হতো!
কে একজন পাশে এসে বসল। সৈকতের মনে হলো আকাশ থেকে কোনো মানবীর ছায়া এসে পড়েছে তার পাশে। কিন্তু সেই ছায়াটার ভারে তার বসে থাকা বাঁশের মাচাটা একটু কাঁপল। কস্তুরিফুলের সঙ্গে কাঠগোলাপ আর রজনীগন্ধার সঙ্গে রাশিয়ায় জন্মানো ড্যাফনে ফুলের ঘ্রাণে চারদিকটা যেন ভরে গেল। অপূর্ব ঘ্রাণময় ছায়াটা এবার বলল, আপনি পারেনও! আচ্ছা, আমাকে কি আপনার সুন্দরী নারী মনে হয় না?
– মৌরিন?
– হুম, আমি। বলেন দেখি, আমি কেমন সুন্দর?
– এই যেমন ঘ্রাণে আচ্ছন্ন হলাম, তুমি তেমন সুন্দর।
– মিনস, আপনি বলছেন, আই’ম সেক্সি!
– ছি, ছি … আমি তা কি বলেছি?
– আমি যে সেন্ট ইউজ করেছি – তা বড্ড সেক্সি …
মৌরিনের কথায় সৈকত একটু লজ্জাই পেল। জিজ্ঞাসা করতে চাইল, তা এই সন্ধ্যাবেলায়, নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত একজন একাকী পুরুষের কাছে এ-ধরনের সেক্সি সেন্ট মেখে আসার কারণ কী? এ-কথা সে মুখ ফুটে বলতে পারল না। বয়সে দশ-বারো বছরের ছোটই হবে মেয়েটা। একটা গবেষণার কাজের ফাঁকে এখানে এসেছে। এই বেড়ানোর আড়ালে সৈকতকে তার গবেষণার জন্য দরকারও বটে। ভদ্রলোকের কিছু বইপত্র আছে। সেসব গ্রন্থ খুব পরিচিতি না পেলেও বেশ বিতর্কিত, তার অদ্ভুত সব দৃশ্যকল্প আর চিন্তার কারণে। তিনটা বই মৌরিন জোগাড় করে পড়েছে। তার একটা উপন্যাসে নারী-পুরুষের সম্পর্ক মূলত কেন স্থায়ী হয় তার একটা ভিত্তিমূল আছে। একজন নারীর প্রতি বছরের পর বছর যৌন আকর্ষণে আক্রান্ত যে পুরুষের চরিত্র তিনি এঁকেছেন – তার মূলটা তিনি কোথায় পেয়েছেন – এই ব্যাপারটা জানার প্রবল আগ্রহ জন্মেছে মৌরিনের। নারী-পুরুষ সম্পর্কের হদিস নিয়েই মৌরিনের গবেষণা। উপন্যাসটা মৌরিনকে ভীষণভাবে আলোড়িত করেছিল। সেজন্য সৈকতকে সোশাল মিডিয়ায় খুঁজে বের করে যোগাযোগ করল একদিন,- আপনার সঙ্গে দীর্ঘ সময় আমার আড্ডা দেওয়া এবং আলাপ করা প্রয়োজন।
– কেন, বলুন তো?
– আপনি তো সম্পর্ক আর সেক্স এক্সপার্ট। আমাদের দেশে এসব নিয়ে কেউ মুখ খোলে না। বিষয়টা নিয়ে আমার কাজ ছিল। সেজন্যই এত দূর থেকে আপনাকে ধরতে এখানে আসা এবং আপনাকে এমন একটা নির্জন সাগরদ্বীপে পাওয়াটা আমার জন্য দারুণ সৌভাগ্যের।
– তুমি তো বিদেশের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ নিয়ে কাজ করছ। সেখানে এসব নিয়ে তো কারো তেমন মাথাব্যথা নেই।
– কিন্তু আমার থিসিসে অঞ্চলভিত্তিক ব্যাপার আছে। এই গবেষণা এবং আমার সন্দর্ভের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় অনেক খরচ করছে। আমি এই অঞ্চলের নারী-পুরুষের সম্পর্কে তাদের শরীর এবং মনস্তত্ত্ব খুঁজতে চাই, যা আপনিই হয়তো ভালো বুঝবেন। না হলে অমন একটা কাজ কীভাবে করলেন?
তারপরই মৌরিন মাঝে মাঝেই সৈকতের সঙ্গে আড্ডায় বসছে।
– আপনার উপন্যাসের চরিত্রগুলোর নাম – মাটি, শস্য, ফড়িং, নীল, গঙ্গা, লাঙল, বসুধা এসব নামে প্রথমেই খটকা লাগলেও বুঝেছিলাম – এইসব রূপক নাম ব্যবহারের কারণ কী। আপনি এক রূপকল্প তৈরি করে সকল প্রাণী, বিশেষত মানুষের, উন্নততর জন্মপ্রবাহে সম্পর্কের গভীরতা, প্রকৃতির নস্টালজিক আবহ কীভাবে প্রভাব ফেলে তা দেখিয়েছেন। যৌনসম্পর্কের সময় গভীরতর ভালোবাসা এবং অনুভবের সমান্তরালে বংশগতি যে বদলে যায় – এটা ভুল তথ্য হলেও আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। সাধারণ অনেকের কাছেই এসব বোধগম্য হবে না।
– আমাদের আলোচনা সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছে।
– হুম। আমার থিসিস পেপারের বিষয়টা আপনার বইটা পাঠের পর জটিল হয়ে গেছে। কিন্তু আপনার ফিকশনে বসুধার এত এত নারীর সঙ্গে সম্পর্ক করলেও কেন মাটির জন্য এত প্রাণপাত? সব পুরুষের জীবনেই কি এমন হয় যে, তার এমন একজন নারী থাকে যে তাকে মানসিক এবং শারীরিকভাবে অমন প্রবল আকর্ষণে আজীবন টানতেই থাকে?
– আই থিংক সো।
– আপনার অমন কেউ আছে?
– নেই।
– তাহলে? অভিজ্ঞতা না থাকলে এমন কিছু কেন সৃষ্টি করলেন?
– আমার জীবন তো মাত্র চল্লিশের কাছে। বসুধার অভিজ্ঞতা অর্জনে তো সত্তর বছর বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে!
– না, এই যে চল্লিশ বছর বয়স আপনার – এই বয়স পর্যন্তই এমন কেউ কি আছে? আই মিন, স্ত্রীর বাইরে?
– আরে না। বউ কল্লা রাখবে?
– কী আশ্চর্য, তাহলে আপনি এত বিশাল ক্যানভাসে অমন গাঁজাখুরি একটা উপন্যাস লিখলেন? কোনো রেফারেন্স কি আছে?
– আমার তো তাই-ই মনে হয়। মানুষের জীবনের চেয়ে রেফারেন্স কি বড়? আসলে প্রেম-যৌনতা, সম্পর্ক নিয়ে আমার কোনো ডিগ্রি নেই। ডিগ্রি দিয়ে জগতে কিছুই সৃষ্টি করা যায় না। সৃষ্টি হয় অন্তর্দৃষ্টি এবং জীবনকে সামনে থেকে দেখে এবং ভেতর থেকে কল্পনা দিয়ে তার নতুনতর রূপায়ণতার সক্ষমতা দিয়ে।
– আমাদের প্রাচীন ভারতবর্ষ তো একটা সেক্স ভাইব্রেন্ট কান্ট্রি। খাবার সেখানে একটা বড় ভূমিকা রাখে।
– এটা ঠিক। জগৎজুড়ে নারী-পুরুষের সম্পর্কে জৈবিকতা একটা বড় ইস্যু, মৌরিন। তবে, ছোটবেলা থেকে সামাজিক ধারণা এই সম্পর্কে প্রভাব ফেলে বলে অঞ্চলভেদে কিছু তারতম্য থাকে। সেটা তেমন কিছু নয়। এই ধরো, শিকার করার ধরন শুধু বদলে যায়।
– শিকার মানে?
– প্রথমত নারীর মন জয় করার কৌশল তারপর তাকে নিজের করে নেওয়া।
– আপনি আমাকে শিকার করার কথা ভাবছেন? তার জন্য কী কৌশল অবলম্বন করছেন?
– কিছুই করছি না।
– মানে আমাকে একা এভাবে, এই নির্জন রাতে, সাগরের মাঝে একটা কটেজে একা পেয়েও প্রেম জাগছে না?
– সেটা তোমার আর এই পরিবেশটার দয়ার ওপর নির্ভর করছে। তোমার আমার বয়সের ব্যবধান কম করে হলেও চৌদ্দ-পনেরো বছর। তুমি কি সহজে আমাকে গ্রহণ করবে? নারী পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমার ধারণা, নারী আগে নিশ্চিত হতে চায় যে, সেই পুরুষ তাকে তুমুল বাজালেও মেয়েটাকে পরিশেষে দেবী ভাববে কি না। মানে, তাকে সম্মান, শ্রদ্ধা এসব করবে কি না।
চাঁদের ময়দামাখা আলো মৌরিনের চোখ-মুখ এক অপার্থিব সৌন্দর্যে ভরিয়ে দিয়েছে। সাগর এখানে গভীর নয়। ঢেউগুলো তাই প্রবল নয়। গভীর সাগরে উথলে ওঠা ঢেউ এখানে বরং মিলিয়ে যাচ্ছে। এই মিলিয়ে যাওয়া ঢেউ, বালুর বুকে কুলকুল শব্দ তুলে জোছনার আলোয় সমর্পিত জল যেন জল নয় তা হয়ে উঠেছে জলচ্ছবি। দূরের পাহাড় অথবা জেগে ওঠা দ্বীপে দু-একটা আলোর বাতি দেখা যাচ্ছে। সেই বাতির আলো আগুন হয়ে, এই সাগরের কুলকুল তানে ফিরে যাওয়া জলের প্রবাহ ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ছে মৌরিনের বুকে। সাগর জল আর একজন দেবীতুল্য নারীর রাত-ঘ্রাণে সৈকতের নিজেকে গঙ্গাফড়িং মনে হচ্ছে। যে গঙ্গাফড়িং কার্তিকের ধানের শীষের শিশিরমাখা ডগায় শিকার ধরার নেশায় রাজকীয় ভঙ্গিতে বসে থাকে।
মৌরিন আর কী প্রশ্ন করা যায় ভাবতে ভাবতে যেন ভাষাটুকুই হারিয়ে ফেলেছে। নারী-পুরুষের সম্পর্ক নিয়ে আর কোনো জ্ঞানগর্ভ আলোচনায় যেতে ইচ্ছা করছে না। প্রকৃতি আর পরিবেশ যে মানব-মানবীর সম্পর্কে ভয়াল প্রভাব ফেলে এই উপলব্ধি তার স্পষ্ট হচ্ছে। মৌরিন রাখঢাক ছাড়াই সৈকতকে তুমি সম্বোধন করে বলল, তোমার শরীরে শিশিরভেজা সবুজ ধানের ডগায় বসে থাকা গঙ্গাফড়িংয়ের ঘ্রাণ। আমাকে অবশ করছে।
– মানে?
– মানে, তুমি আমার গঙ্গাফড়িং। গতিসম্পন্ন এক প্রবল পুরুষ।
এই সাগর-প্রকৃতির অনন্ত সৌন্দর্যের মায়া, অবারিত আর উদার নির্জন দিগন্তে দুজন নর-নারী নিজেদের ভাষা যত হারাতে থাকল, তারা তাদের চোখের ভাষা ততই পাঠ করতে থাকল। নিজেদের ভেতর যে একাকিত্বকে কাটাতে তারা আরো নিবিড় হয়ে নিজেদের কাছে আপন কিছু খুঁজতেই থাকল। মৌরিন এবার নির্ভারচিত্তে মাথাটা সৈকতের কাঁধে এলিয়ে দিলো। তার চুল-ত্বকের সঙ্গে মিশে যাওয়া সৌরভে সাগরমাঝিদের ফেলে যাওয়া মাছধরা জালের ঘ্রাণ মিশে মিশে সৈকতকে উন্মাতাল করল। জলে কোথাও মাছ নেই। তবু আঁশটে ঘ্রাণে মিশে থাকা জিরা মসলা জাতীয় কিছু একটা কেন মৌরিনের শরীরে মিশে থাকা অনন্য সৌরভে মিশে গেছে। মৌরিন ফিসফিস করে নিজেকে নিজেই বলল, মানুষের উন্নততর জন্মপ্রবাহে, প্রকৃতির নস্টালজিক আবহ কীভাবে সম্পর্কের গভীরতায় প্রভাব ফেলে, গভীরতর ভালোবাসার অনুভব যৌনসম্পর্কের সময়ও নির্ধারণ করে দেয়।
মৌরিন আরো কাছে এলো। সৈকত নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। মৌরিনের ভাঁজময় এলায়িত শরীরটা দু-হাতে তুলে নিয়ে কটেজে ফিরে এলো। মৌরিন নিজেকে অবারিত করতেই থাকল, বাইরে চাঁদের রুপালি আস্তরণ যেভাবে তার মায়া ছড়িয়ে রেখেছে সাগরে-পাহাড়ে। যেভাবে তার প্রায় অদৃশ্য আলোর খেলা সাগরের অশান্ত ঢেউয়ের সঙ্গে মেতে আছে ছলাৎ ছলাৎ খেলায় – তারা দুজন তেমনি মেতে থাকল – একে অন্যের সত্তার ভেতর আত্মাকে যেন খুঁজে খুঁজে ফিরল। সৈকত মৌরিনকে ‘মৌরি’ বলে সম্বোধন করল এবং তার ত্বকে মৌরিফুলের ঘ্রাণ খুঁজল। মনে হলো, এই মৌরিনের এই নামটাও তাদের আজকের সম্পর্কের মসলা এবং মাধুরিকা হয়ে কাজ করছে। মৌরি শব্দের অর্থ কোনো একটা মসলা এবং মাধুরিকা! সারাজীবন প্রবল আত্মবিশ্বাসী মৌরিন এত দ্রুত কাউকে এত তীব্র আবেগে গ্রহণ করে জীবনের সব হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে দেবে ভাবেনি।
তিন ঘণ্টা পর তারা হোটেলের রেস্তোরাঁয় এলো। মোমবাতির আলোয় বসে তারা প্রচুর খাবার খেল। সি ফিশ, ঝিনুকের স্যুপসহ সাজিয়ে রাখা সমস্ত খাবারকে মৌরিনের অমৃত মনে হলো। রাতের খাবার শেষ করে তারা আবার মেতে উঠল একজনের ভেতর নিজেকে আবিষ্কারের ভয়াল নেশায়। সাগরের মৃদু ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ের ভেতর চাঁদ হয়ে প্রতিফলিত সূর্যের কোনো কোনো আলোককণা যেন খুঁজছে সাগরের গভীর তলটুকু। মৌরিন জীবনে প্রথম জৈবিক অথচ অপার্থিব, প্রকৃতির সান্নিধ্যভরা তবু ঘরের মৃদু নীল নীল নিয়ন আলোয় নরম বিছানার পালকের ভেতর দলিত-মথিত, ঘামভেজা দুই শরীরের মাঝে অদ্ভুত এক জীবনকে আবিষ্কার করল। চির অচেনা অথচ নিজের ভেতর বাস করা উন্মাতাল এমন একটা জগতের সন্ধান পেয়ে তার মরে যেতে ইচ্ছা করল – সেই রকম মরে যাওয়া যা তুমুলভাবে বাঁচতে শেখায়। পরের তিনটা রাত তাদের এভাবেই কাটল যেন কোনো এক অদৃশ্য জাদুবলে অথবা এই সাগরের অভিশাপে তাদের ভেতর থেকে জেগে ওঠা শরীরী ঘোর এবং আকর্ষণ আর কিছুতেই কাটছে না। মনে আছে শেষবার মৌরিন তাকে বলেছিল, আমার একটা ছেলে সন্তান হবে – আমি জানি। আমি চাই, জীবনে একবারের জন্য হলেও সে যেন কোনো নারীকে এমন তুমুল আবেগ আর অবিনাশী আকর্ষণে আদর করতে সক্ষম হয়। তাহলেই এই জীবনটার নস্টালজিয়া মৃত্যুকেও তার কাছে তুচ্ছ করে তুলবে।
পাঁচ
কী আশ্চর্য! পনেরো বছর আগের মৌরিন এখনো একটুও বদলায়নি? তার উত্তরে সৈকত কী বলবে, ভেবে পাচ্ছিল না। কিছুক্ষণ পর সে কিছু বলার যেন যোগসূত্র পেল,
– আমি তোমাকে অনেক খুঁজেছি।
– হ্যাঁ, আমি জানতাম। তুমি খুঁজবে। সেজন্য তোমাকে নামটা ছাড়া সব ভুল তথ্য দিয়েছিলাম।
– কেন?
– কারণ, তোমাকে আমি সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছিলাম। আমি আমার দুর্মর প্রথম প্রেমকে সামলাতে পারিনি। প্রথম প্রেমের এমন অবাধ আর তোলপাড় ঢেউ কেমন হয় – তা আজকালকার কোনো কৈশোর পেরোনো তরুণী যদি জানত! এখন কোনো তরুণীর জীবনে মনে হয় এই স্বর্গীয় অথচ উন্মাতাল অনুভব আসে না। সেই অনুভব নিয়েই আমি দূরে সরে যেতে চেয়েছিলাম। সমাজের কাছে আমি আসলে তোমাকে ছোট করতে চাইনি। এই সমাজ ভালোবাসাহীন বিয়ে এমনকি গণ্ডগোল ফ্যাসাদের সম্পর্ককেও স্বাভাবিকভাবে নেয়; কিন্তু বিয়ের বাইরে মধুর অথবা মন কেমন কেমন করা ভালোবাসা, প্রাণ উজাড় করা প্রেম – কোনোকিছুই গ্রহণ তো করেই না উলটো নিগৃহীত করে। এ ফাকেন স্কাউন্ড্রেল সোসাইটি।
সৈকতের ভাবনা দুলে উঠল। চোখের সামনে থেকে স্মৃতিকাতর দৃশ্যকল্পগুলো কাঁপতেই থাকল। কেউ একজন বলল,
– এ ফাকড্ আপ স্কাউন্ড্রেল সোসাইটি – আপনি এই সোসাইটির হয়ে আনমনে কী ভাবছেন আমি তা জানি।
– মৌরিন!
– মৌরিন? ওরে বাবা – আপনি শ্রাবন্তীর সামনে বসে এতক্ষণ মৌরিনের কথা ভাবছিলেন? আপনি পারেনও! আচ্ছা, আমাকে কি আপনার সুন্দরী নারী মনে হয় না?
ছয়
সৈকতের মোবাইল ফোনটা বেজেই চলছে। পকেট থেকে সে ফোন বের করে দেখল, ভিসা লাউঞ্জ নামে ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস অফিস থেকে হোয়াটসঅ্যাপে কল করছে শাহনাজ নামের মেয়েটা।
– হ্যালো শাহনাজ …
– স্যার, আপনি ভ্রমণ করা দেশগুলোর তালিকায় মালদ্বীপের নাম উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আপনার তিনটা পাসপোর্টের কোনোটাতেই মালদ্বীপ ভ্রমণের অ্যারাইভাল বা ডিপারচার সিল নাই। পাসপোর্ট স্ক্যান করে ওরা ভুল কিছু পেলে ভিসা তো দেবে না! আমেরিকার যে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চাইছেন সেই বিম্ববিদ্যালয় থেকে কি ইনভিটেশন লেটার পেয়েছেন?
সৈকত টেবিলের অন্যপ্রান্তের চেয়ারটায় তাকাল। আশ্চর্য! সেটা ফাঁকা। শ্রাবন্তী তাহলে কই গেল? অ্যারিবিকা কফি শপের বারান্দায় ঘন করে লাগানো বাঁশগুচ্ছের ছোট ছোট বাঁশপাতায় মৃদু বাতাসের কাঁপন নামের অদ্ভুত এক সঙ্গম। কেমন একটা হাহাকার জেগে উঠল সৈকতের হৃদয়ে। কফির কাপে শেষ চুমুক দেওয়ার পর সে বাড়ির দিকে পা বাড়াল। মনে হলো তার স্ত্রী অবন্তিকা তার জন্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু তখনই একটা দৃশ্য তার মনে উঁকি দিলো। ঠিক ষোলো বছর আগে ক্যান্সার আক্রান্ত অবন্তিকাকে গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে কবরস্থ করে ঘরে ফেরার পথে ঘন বাঁশ আর গাছগুলোর মাঝে কেটে ফেলা একটা গাছের গুঁড়িতে সে অবশ হয়ে বসেছিল দীর্ঘক্ষণ।
সূর্যাস্তের আগে কেউ একজন এসে তাকে ডাকলে আকাশের দিকে তাকাতে গিয়ে সে দেখেছিল – ঘন বাঁশ আর গাছের পাতায় বাতাসের সেই মৃদু কাঁপন।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.