আমি যখন তাঁকে দেখি টেলিভিশনের পর্দায়, সেই সুদূর ১৯৭৬/৭৭-এ, তখন তেপ্পান্ন পুরো হয়েছিল হয়তো-বা। তবে আলোকচিত্র কি টেলিভিশন প্রতারণা করে। বয়েস বেশি মনে হয় আসলের চেয়ে। কিন্তু দেখতে তিনি সুদর্শন ও সুখী। পুরুষ মানুষ বলতে যা বোঝায় : রূপ ঠিক মুখের শ্রী বা ছাঁদে ততখানি নয়, যতটা ডৌলের ভাঙাচোরায় চিত্রিত ব্যক্তিত্বের স্পর্শে। দশাসই অবয়বে পাহাড়ি কাঠামো ধরা পড়ে। শরীরের ধাঁচে পৃথুল স্বাস্থ্যের স্বাভাবিক দীপ্তি। ঈগলচঞ্চু নাসার কাঠিন্য মুছে গেছে ভরাট চিবুক ও কপোলের সুসঙ্গত ভারসাম্যে। মাথার চুল সরল ও পর্যাপ্ত, কিন্তু ছোট ছোট – কদমছাঁটেরই লম্বিত সংস্করণ যেন। সব মিলিয়ে পরিতৃপ্ত, অভিযোগহীন, আনন্দসৌম্য সুষমা ঘিরে থাকে মুখে। কেমন যেন প্রসন্ন দাদু-দাদু চেহারা : যেন যে-কোনো মুহূর্তেই এক পাল নাতি-নাতনী এসে আব্দারে রঙ্গরসে হাজারো বায়নাক্কায় ঘিরে ধরবে, আর ওই মানুষটি জীবনের প্রতি স্থিতধী বিনয়ে হাসিমুখে সব মানবেন। নাতি-নাতনীর দল থাকলেও ছিল হয়তো-বা। ছেলে তো নেই, শুধু তিন কন্যা : জারেমা, পতিমাৎ, সুলিমাৎ। স্ত্রী পতিমাৎ-এর (মধ্যমা আত্মজা ও তাদের জননীর নাম হুবহু এক; জানি না, হতেও পারে দাগেস্তানী ঐতিহ্য) খ্যাতি আছে সুন্দরী বলে : দিঘলকেশী, কালো চোখের রূপসী। ছোটখাটো নির্ঝঞ্ঝাট সংসার কাস্পিয়ান-তীরবর্তী রাজধানী শহর মাখাচ্-কালায়। বাড়ির দরজা সর্বদা খোলা অতিথি অভ্যাগতদের ভিড় নিরন্তর লেগে আছে : পাহাড়ি জীবনচর্চায় অতিথি চিরকাক্সক্ষণীয়, চিরপ্রণম্য। লোকশিল্পের সুন্দর একটি সংগ্রহ আছে নিজের, কেউ গেলেই দেখান, চোখে আনন্দ ঝলমল করে। সেখানে আছে কত রকমের ছোট-বড়ো নানান ধরনের ছোরা, আছে ঘোড়সওয়ারের নানান ধাঁচের পরিচ্ছদ, আছে কারণপানের জন্য – না, মাথার খুলি নয় তান্ত্রিকের যেমন – শিঙা : বন্য পশুদের শিং দিয়ে তৈরি, আর অজস্র মরচে-রঙা মৃৎপাত্র। তাহলে আর কী চাই, এরও বেশি? সত্যিই হামজাতফের কোনো অভিযোগ নেই। কার কাছে, কীসের জন্য অভিযোগ? জীবনের কাছে তাঁর কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই, দেশমৃত্তিকার দেহ বারংবার স্পর্শ করেন গভীর শ্রদ্ধা ও মমতায়, মাতৃস্বরূপা জন্মভূমি ও পরমাত্মীয় সোভিয়েত দেশ (সেই রাষ্ট্রেই তো তাঁর জন্ম ও বেড়ে-ওঠা) ও সোভিয়েত মানুষের সামনে প্রণত হন ঋণ ও বিবেকমুক্তির আন্তরতাগিদে।
বাবা তাঁর ছেলের নাম রেখেছিলেন ‘রসুল’। রসুল হামজাতফ্ সে-কথা পাঠককে অনিবার্যভাবেই মনে করিয়ে দেন, কৃতজ্ঞচিত্তে বলে ওঠেন : জানেন তো ‘রসুল’ মানে প্রতিনিধি।
বাকিটা বুঝে নিতে হয় আমাদের, প্রতিনিধিত্বের সামগ্রিক চেহারা স্পষ্ট হয়ে ফুটে ওঠে তাঁর কবিতা পড়তে-পড়তে, অপরূপ ঈর্ষণীয় গদ্যে রচিত আত্মজৈবনিক প্রসঙ্গাদির সান্নিধ্যে গেলে। এমন একটি স্নিগ্ধ সমর্পিতচিত্ততা ছড়িয়ে থাকে, তাঁর সব কিছুতেই : মনুষ্যজন্মলাভে তিনি ধন্য, তিনি তাঁর পার্বত্য গ্রামের সন্তান হতে পেরে ধন্য, ধন্য তিনি দাগেস্তানের মানুষ হতে পেরে, সোভিয়েত নাগরিক হতে পেরে, এমনকি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য (অন্তত সে-আমলে) হওয়ার জন্যও। নিরঙ্কুশ কৃতজ্ঞতাবোধই তাঁকে দায়িত্ব চিনিয়ে দেয়। কবি ও সামাজিক ব্যক্তিমানুষ হিসেবে তিনি সে-দায়িত্ব অপরিসীম নিষ্ঠায় পালন করে যান। তিনি প্রতিনিধি তাঁর গ্রামের, তাঁর জন্মভূমি দাগেস্তানের, তিনি প্রতিনিধি ছিলেন সোভিয়েত সমাজ, মানুষ ও আদর্শের এবং সর্বোপরি জীবন ও কবিতাশিল্পের। “আমার প্রধান বিষয়বস্তু হচ্ছে দাগেস্তান। আমার প্রেম বৃহৎ হোক বা ক্ষুদ্র হোক, আমার সত্য তুচ্ছ হোক বা গভীর হোক, আমার অনুভূতি বর্তমানের জন্য হোক বা অতীতের জন্য হোক, আমি কেবল তোমার বিষয়েই লিখি – আমার দাগেস্তান, যখন আমি কলম ধরি কাগজের ওপর তখনই অজ্ঞাতসারে কলম কাঁপে আমার হাতে।” হেন-স্বীকারোক্তিতে যাঁর এত আনন্দ, আশ্চর্য নয়, তিনি প্রতিনিধিত্ব করবেন স্বদেশ জন্মভূমির।
দুই
রসুল হামজাতফের জন্ম ১৯২৩-এর ৮ই সেপ্টেম্বরে, উত্তর-পূর্ব ককেশাসের ৎসাদা নামে এক পাহাড়ি গ্রামে। বাবা-মায়ের চার সন্তানের মধ্যে তৃতীয়; বড়ো দু’ভাই বীরের মতো মৃত্যুবরণ করেন গৃহযুদ্ধের সময়ে। বাবা হামজাৎ ৎসাদাসা নিজেও ছিলেন কবি। রসুল এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন : “আমি একটি কবি-পরিবারে জন্মেছি এবং বড়ো হয়ে উঠেছি। খুব ছোটবেলা থেকেই আমি কবিতা লিখতে শুরু করি।” তখন তাঁর বয়স এগারো, গাঁয়ের স্কুলে পড়াশোনা করছেন। পিতা-পুত্র উভয়েই কবি – এই আকস্মিক সমাপতন কনিষ্ঠ কবির জন্য কম দুর্ভোগ আনেনি : দীর্ঘকাল লোকে বলাবলি করেছে – বাবাই ছেলেকে লিখে দেন, বা ছেলে পিতৃদেবের সম্পত্তি হাতসাফাই করে। তখন তিনি নিজের নাম লিখতেন রসুল ৎসাদাসা, কেননা তাঁদের পারিবারিক পদবি (ংঁৎহধসব) ৎসাদাসা। কিন্তু হঠাৎ একবার আবিষ্কার করে বসেন যে, তাঁর কবিতাকেও লোকে তাঁর বাবার বলে ভুল করছে, ‘ৎসাদাসা’ পদবি দেখার পরে পূর্ববর্তী শব্দটি হামজাৎ না রসুল – তা চোখ খুলে কেউ যেন দেখতেই চাইছে না। মনের দুঃখে ঠিক করলেন – আর না, যথেষ্ট হয়েছে, নাম পাল্টাতেই হয়। পারিবারিক পদবি ত্যাগ করে পিতৃনাম থেকে নিজের পদবি-নির্মাণে মনস্থ করলেন। ফলে বাদ পড়ে গেল ‘ৎসাদাসা’ পদবি। বাবার নাম হামজাৎ থেকে তৈরি হলো হামজাতফ্। এবার তো কেউ ভুল করবে না! রসুল ৎসাদাসা রূপান্তরিত হলেন রসুল হামজাতফ্-এ। কবি হামজাৎ ৎসাদাসার পুত্র কবি রসুল হামজাতফ্। সব সমস্যার সমাধান! ১৯৪০ সালে শিক্ষক-প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থেকে পাশ করে বেরিয়ে তিনি মাস্টারি নিলেন সেই স্কুলেই, ছেলেবেলায় যেখানে তাঁর হাতেখড়ি হয়েছিল। তখন তিনি ভেবেছিলেন – লেখাপড়ার এই-ই শেষ, এখন শুধু কবিতা রচনা। কিন্তু জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেন একজন। তাঁর নাম এফ্ফেন্দি কাপিয়েফ্। ইনিও ছিলেন দাগেস্তানী কবি ও লেখক, রসুল হামজাতফের বয়োজ্যেষ্ঠ। দাগেস্তান, রাশিয়া ও বহির্বিশ্বের সংস্কৃতি ও সাহিত্যের সেতুবন্ধরূপে কনিষ্ঠ কবির জীবনে এঁর আবির্ভাব। এঁরই উৎসাহ ও প্ররোচনায় রসুল মস্কো গিয়ে সেখানকার সাহিত্য ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। সে-কাহিনীও তিনি মজা করে রসের ভিয়েনে চড়িয়ে ব্যক্ত করেছেন :
“মাখাচ্-কালার রাস্তায় একদিন এক ঝাঁক লেখকের সঙ্গে আমার দেখা হয়ে গেল, সঙ্গে তিনি [এফ্ফেন্দি কাপিয়েফ্]। সত্যি বলতে তিনিই আমাকে, উদীয়মান কবি তো বটে, থামিয়েছিলেন। তাঁরা সবাই তাঁর এক পুরনো বন্ধুর ওখানে যাচ্ছিলেন, আমাকেও সঙ্গে যেতে বললেন। বন্ধুটি শিল্পী ও সঙ্গীতজ্ঞ মাহোমেদ ইউনুসইলাউ। সেখানে পালাক্রমে কবিদের কবিতাপাঠ শোনা হলো, আমাকেও বলা হলো কবিতা পড়তে। বেশ কয়েকটি পড়লাম, সেগুলো আগেই রুশ ভাষায় তর্জমা হয়ে গেছে। কাপিয়েফের দিক থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া লক্ষ করলাম না। উপস্থিত একজন জিজ্ঞেস করলেন তাঁকে : ‘কই, কেমন লাগল, আপনি কিছু বলুন।’ উনি বললেন, ‘মন্দ নয়।’ আরেকজন কেউ মন্তব্য ছুড়ে দিল : ‘উনি যদি আর্ভা-এ পড়তেন তো শুনতে আরো ভালো লাগত।’ এফ্ফেন্দি চিন্তিতভাবে বললেন : ‘তা হতে পারে। তবে কিনা, সময়টা তো এখন আলাদা, তাই এখনকার জন্যে দরকার অন্য ধরনের কবিতা, অন্য রকমের কবি। রসুল, শোনো, তোমাকে আরো পড়াশোনা করতে হবে, মস্কো না গেলে তোমার চলবে না। …”
এভাবেই মস্কো যাওয়া, এবং একজন ‘দাগেস্তানী’ কবির অতঃপর দেশবরেণ্য ‘সোভিয়েত’ কবিরূপে ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হতে-থাকা।
পার্বত্যধূসর ককেশাস অঞ্চলের ছোট একটি প্রজাতন্ত্র দাগেস্তান্। জনসংখ্যা বছর তিরিশেক আগে ছিল তিরিশ লাখ, এখন কিছুটা নিশ্চয়ই বেড়েছে। বহুজাতিক মানুষের বাস, লোকে কথা বলে ছত্রিশটি ভাষায়। একচিলতে জায়গায় এতগুলো ভাষাভাষী মানুষ পুরাণোক্ত বাবেলের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তুলনামূলকভাবে সমৃদ্ধতরদের দলে পড়ে আর্ভা, লেজ্গিন্, কুমিক্ এবং দার্গওয়া ভাষা। হামজাতফের মাতৃভাষা আভারে কথা বলে মাত্র তিন লক্ষাধিক লোক। এবং আশ্চর্য, মুষ্টিমেয় এই জনসংখ্যার প্রতিনিধি, তাদের ভাষার প্রতিনিধি, এই ব্যক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নে এক সময়ে ছিলেন সর্বাধিক জনপ্রিয় কবি। লোকপ্রিয়তার নিরিখে একথা এখন সবাই মেনে নিয়েছে যে, গত শতকের সত্তর দশকে অন্তত সোভিয়েত দেশে সবচেয়ে বিখ্যাত কবি ও কথাসাহিত্যিক যে-দুই ব্যক্তি, তাঁরা উভয়েই ছিলেন অ-রুশ : একজন আর্ভা, কবি রসুল হামজাতফ্, আরেকজন কির্গিজ্ কথাসাহিত্যিক চেঙ্গিস্ আইৎমাতফ্।
তখন তাঁর বয়স চৌত্রিশ, কবি হিসেবে তখনই প্রতিষ্ঠিত। তখন, ১৯৫৭-য়, একটি নাতিদীর্ঘ আত্মজৈবনিক স্মৃতিচারণ লিখেছিলেন হামজাতফ্ : ‘নিজেকে নিয়ে’। একজন কবির উপলব্ধি ও আন্তরমাধুরীতে অনবদ্য সে-রচনা। সেই গদ্য একজন কবির গদ্য। গদ্যে তিনি আরো লিখবেন তখনই বোঝা গিয়েছিল। পূর্ণাবয়ব গ্রন্থ আমার দাগেস্তান্-এ (রুশী অনুবাদে মোই দাগেস্তান্) ভেতরের কারণ আরো স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন : ‘এখন আমি জানি, যেখানেই আমি গিয়ে থাকি, যে-গানই আমি গেয়ে থাকি, সর্বদাই ঈগলের আশ্রয়ের জন্য একটা পাহাড় অপেক্ষমাণ। দরজায় করাঘাত করবার মতো একটি বাড়ি সর্বদা অপেক্ষমাণ; কবির জন্য সর্বদা গদ্য অপেক্ষা করে থাকে।’ অনবদ্য এই বইটির অসামান্য এক বঙ্গানুবাদ, অবশ্যই ইংরেজি অনুবাদ থেকে ভাষান্তর, বেরিয়েছিল পঁচিশ বছর পূর্বে। ঢাকা থেকেই। প্রকাশ করেছিল জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ১৯৭৮-এর নভেম্বরে। কথাসাহিত্যিক আকবরউদ্দিন ও কবি আবুল হোসেনের যুগ্ম তর্জমায় তখন বইটির নাম হয়েছিল আমার জন্মভূমি। বাজার থেকে নিঃশেষিত সে-কবেই! এত সুখপাঠ্য ও মর্মস্পর্শী রচনা পুনঃপ্রকাশিত কেন হয় না, জানি না। পাঠকের রুচিভেদ মানতে হলে সিদ্ধান্তে আসতেই হয় যে, আজ সে-রুচি ক্রমনিম্নগামী। আমার এই খেদোক্তির কারণ, রসুল হামজাতফের কোনো কাব্য বাংলায় অনূদিত হয়নি, অন্তত যে-একখানি গদ্য রচনার অনুবাদ আমরা পেয়েছিলাম তা নানা কারণে উপকারী ও প্রয়োজনীয় হওয়া সত্ত্বেও পাঠকের মূঢ়তাপ্রসূত অবহেলায় আজ প্রায় সম্পূর্ণ বিস্মৃত।
হামজাতফের কবিতার স্বাদ একেবারেই অন্যরকম। ইউরোপীয় ধাঁচের কবিতাই সে নয়। কাব্যে আধুনিকতার যে-নমুনা অর্থাৎ মডেল আমরা আদর্শ ও অর্জনযোগ্য মনে করি তার অন্যপ্রান্তে তার অবস্থান। ভারতবর্ষীয় উপমহাদেশে কবি ও কাব্যভোক্তার যে প্রত্যক্ষ ও উষ্ণ সম্পর্ক ঐতিহ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে, উর্দু-হিন্দিতে যে-উত্তরাধিকার এখনো বহমান, বাংলাতে অবশ্য নয়, আর্ভা কবির মধ্যে তার সাক্ষাৎ মেলে। এদিক থেকে তাঁর কবিতা প্রাচ্যগন্ধী। তিনি মনে করেন, কবিতার লক্ষ্য বিচ্ছিন্ন নিঃসঙ্গ পাঠক নয়, নির্জনে পঠিত হওয়া তার ভবিতব্য নয়; কবিতা স্বননের শিল্প, শোনাতে হবে, লোকে শুনবে। এই ধর্ম চারণকবির। হামজাতফ্ চারণকবিই, তাঁর পিতা হামজাৎ ৎসাদাসাও তা-ই ছিলেন। পাহাড়ি মানুষের পাহাড়ি কবিতার ধর্ম সমতলভূমির বড়ো ও ছড়ানো জনপদের সগোত্র হওয়ার কথা নয় – এ কথাটিও নিশ্চিতই তিনি মনে রাখতেন। তাঁর কাব্যভাবনার কিছুটা খেই মেলে এ-রকম আত্মবিশ্লেষণে :
“লোকেরা বলে যে, তোমার ডানা দু’পাশে আরো যত ছড়াবে আরো বেশি ফাঁকা জায়গা তোমার দখলে আসবে। তো এ-কারণেই আমার প্রজাতন্ত্রের তরুণ কবিকুল মস্কোয় পড়তে যাওয়ার জন্যে ছটফট করত, ইচ্ছে – সবকিছুর ঠিক মধ্যিখানটায় থাকে, স্বদেশ ও বিশ্বের সংস্কৃতিজীবনের ডামাডোলের ভিতরে। শহরে যাওয়ার পর তাদের অবস্থা হয় খড়ের গাদায় সুঁচ পড়লে যেমনটি হয় – নিশ্চিহ্ন, হারিয়ে যায়, ওদেরও তেমনই আর কোনো খোঁজ মেলে না। সবকিছু একসঙ্গে পেতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত কিছুই আর পাওয়া হয় না – সে ভুলে যায় তার গাঁয়ের সুর, তার নিজের মানুষজন চিন্তার বিশেষ ধরনের যে-বুনোটে নিজেদের ভাবনা ছড়াতে অভ্যস্ত সে-সবও হারিয়ে ফেলে। ওদের ধরনে আমার মনে পড়ে যায় নাচুনি মেয়েদের কথা – যারা নানা রকমের নাচ নাচতে পারে : “কেন, আমরা তো যে-কোনো নাচই নাচতে পারি। আজ নাচলাম লেজ্গিন্কা, কালকে নাচব ট্যাঙ্গো কি মোল্দাভীয় কোনো নাচ, কিংবা ধরো টুইস্ট কিংবা ওয়ালৎস্ – সবই পারি, যেমন ইচ্ছে!’ ঠিক আছে, নাচিয়ে মেয়েদের জন্যে না হয় ঠিক। কিন্তু কবির কাজ তো নাচ দেখানো নয়, কি সার্কাসের কসরত দেখানোও নয়।
আমার নিজের ঐতিহ্য-চালচিত্র থেকে আমিও আলাদা হয়ে পড়েছিলাম বৈ কি, আমার নিজের দেশের পাহাড় থেকে বিচ্ছিন্ন। মাথাগরম ড্রাইভার যেমন বেপরোয়া গাড়ি চালায় অনেকটা সে-রকম। মস্কোয় ছাত্রাবস্থায় কবিতা বেরুচ্ছে আমার – খবরের কাগজে, সাময়িকীতে, রুশ অনুবাদে; বইও বেরিয়ে গেল, আলোচকদের বাহ্বাও কুড়াল। আমাকে আর পায় কে, ভাবতে শুরু করে দিলাম যে আমার লেখা আমাদের পার্বত্য কাব্যভুবনে একেবারে নতুন কিছু।
অসূয়াপ্রবণ যারা একসময়ে বলত যে, আমার বাবা আমার কবিতা লিখে দেন, এখন বলতে শুরু করল – দেখ কাণ্ড, ছেলেটা তো এখন আর বাবাকেও মানতে চাইছে না, এবং আমার কবিতা নাকি অনুবাদেই ভালো শোনায়। এসব মন্তব্য আমায় ভারি বিচলিত করে তুলত, বিশেষ করে পরের দিকের কবিতা নিয়ে যদি হতো। কারণ এ নয় যে, আমি স্পর্শকাতর ছিলাম, চলার পথে কুটোটি পড়লেও হোঁচট খেতাম; না, তা নয়। আসলে, ওই মন্তব্য আমার কাছে খুব বড়ো, প্রণিধানযোগ্য একটা সমস্যার চেহারা দেখায়। ব্যাপারটা ভীষণ জরুরি, আর আমাদের কবিতার জন্য তা খুবই দরকারি। প্রশ্নটি হলো ঐতিহ্য ও ঐতিহ্যচ্ছিন্ন নবনির্মাণ, শিল্পের ভিতরে জাতীয় চরিত্র ও আন্তর্জাতিক উপাদান – এ দুয়ের আন্তর্বিরোধঘটিত সমস্যা নিয়ে।”
এই সমস্যার সমাধান কীভাবে তিনি করেন তা বলেননি, কিংবা বললেও আমার তা জানা নেই। কিন্তু তাঁর কবিতার দিকে তাকালে দেখতে পাই স্বভাবকবির চেহারা সেখানে স্পষ্ট, তাঁর নিজের জনগোষ্ঠীর প্রাচীন সহজসরল লোকপুরাণের ঐতিহ্য সেখানে পূর্ণমাত্রায়, কিন্তু সে-সবের সঙ্গে আধুনিক নাগর-জীবনের সাহিত্য-সংস্কৃতির সংযোগজনিত এক অপূর্বতারও দেখা মেলে সেখানে। তাঁর কবিতায় বিষয়বৈচিত্র্য অনুপস্থিত নয় ঠিকই, তার পরেও নির্দিষ্ট কিছু কাব্যবিষয় থাকে তাঁর – যেমন এককালে সব কবিরই কাব্যবিষয় ছিল চাঁদ, ফুল, পাখি, নারী, এ-রকম ধরনের। সেখানে লক্ষ করি, ‘সময়’ একটি বড়ো বিষয় যা তাঁর চিন্তা অধিকার করে থাকে। এখানে তিনটি কবিতা – আমারই অনুবাদে, রুশ ভাষান্তর থেকে তর্জমা – উদ্ধৃত করতে চাই; তিনটিরই বিষয় হলো সময়। যেমন :
১
হয়তো যারও-বা দু’মিনিট বাকি মোটে
পৃথিবীর আলো চোখ মেলে দেখবার,
সেও তো ব্যস্ত; পড়ি-মরি করে ছোটে –
যেন বাকি শতবর্ষের আয়ু তার।
দেখ বহুদূরে লাখো বছরের ভারে
স্থবির পাহাড় : হিমানীকরুণ, তা কি
দ্যাখে হেলাভরে দুনিয়ার মানুষেরে –
সাকুল্যে যেন দু’মিনিটই তার বাকি!
২
তোরই ছায়া সবে – সময়, এ-কথা ভেবে
আমাদের কাছে বড়াই রাখ্ তো তোর!
এমন লোকও তো ঢের আছে পৃথিবীতে
যাদের জীবনে শিকড় প্রোথিত তোর।
ঋণী তুই সে তো কবি, ভাবুকের কাছে,
বীরের কাছেও – যাঁদেরে আলোক মানি।
তোর যত জ্যোতি ছিল বা এখনো আছে
সে তো তোর নয়, সে তাঁদের আলোখানি।
৩
আমার উপর, সময়, তোর কী বিষ –
ঘৃণাভরে দিস শাস্তি যাতনা কেন?
বিগত দিনের ভুল নিয়ে খোঁচা দিস,
মোহমায়া মোর ভাঙিস কেল্লা যেন।
বল্ কে জানত, সত্যেরও নড়ে মূল?
হাসিস কেন রে চড়িয়ে আমাকে শূলে?
করেছিনু সে তো তোরই ভুল দেখে ভুল,
তোরই কথা সব নিয়েছিনু জিভে তুলে।
এইরকম কবিতা তাঁর, অসংখ্য, সবই আট পঙ্ক্তির, আর চারিত্র্যে শিলালিপি জাতীয়। প্রসঙ্গত, এ-ধরনের লিপিকা ককেশীয় অঞ্চলের পাহাড়ি মানুষ তাঁদের পাথুরে ঘরবাড়ির খিলানে, সমাধিপ্রস্তরে, তরবারির হাতলে এবং ঘোড়ার জিনের ওপরে খোদাই করে থাকেন। ঐতিহ্যটি সেখান থেকে নেওয়া। তিনি বলেছেন : “আমি যখন একেবারে ছোট্টটি, আমার বাবা ছাগলচামড়ার চাদরে আমাকে জড়িয়ে নিয়ে কবিতা শোনাতেন আমাকে, সেগুলো আমার কণ্ঠস্থ হয়ে গিয়েছিল – তখনও আমি ঘোড়ায় চড়া শিখিনি কি কোমরবন্ধ কীভাবে বাঁধতে হয় জানি না, এতই ছোট ছিলাম।”
হ্যাঁ, দীর্ঘ কবিতাও তাঁর রয়েছে। আয়তনে খুব বড়ো বলা যাবে না, নাতিদীর্ঘ কবিতা। কিন্তু তাঁর স্ফূর্তি ক্ষুদ্রাকার কবিতায়। তিনি জানাতে ভোলেন না যে, তাঁর তুলনামূলক দীর্ঘ কবিতা পত্রিকা-সম্পাদকেরা ফেরত পাঠাতেন, বলতেন, ‘বড়ো কবিতা লোকে পড়ে না।’ এটাও হয়তো-বা একটা কারণ। কেননা, তিনি তো আর্ভা কবি, লেখেন আর্ভা ভাষায়, আর্ভাদেরই জন্য।
সম্মান তো জীবনে কম পাননি : দাগেস্তানের ‘জাতীয় কবি’র রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি, দাগেস্তান লেখক ইউনিয়নের সভাপতি, সোভিয়েত সুপ্রিম সোভিয়েত সম্পাদকমণ্ডলীর উপসভাপতি, লেনিন পুরস্কার (১৯৬৩) অর্জনের সম্মান ইত্যাদি।
গত বৎসর ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে আশি বছর পার করে যখন লোকান্তরিত হলেন তখন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হলো, সারা দেশ ও জাতি রাষ্ট্রীয় শোক পালন করল। ততদিনে সোভিয়েত দেশ ভেঙে গেছে। এখন রুশ অনুবাদে তাঁর কবিতা বা কাব্যগ্রন্থ কী পরিমাণে প্রকাশিত হয়, জানি না। কিন্তু তিনি কাউকেই কখনো ভুলতে দেননি যে তিনি দাগেস্তানের কবি এবং আর্ভা কবি।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.