সাক্ষাৎকার গ্রহণ : রফি হক
সালটা সম্ভবত উনিশশ চুরান্নব্বই। তুখোড় আবেগের বয়েস তখন আমাদের। আমরা বলতে – আহমেদ নাজীর, রশীদ আমীন, মোস্তাফা জামান আর আমি। মাথার ওপর ছাতা মেলে আছেন রোকেয়া সুলতানা। ‘Dhaka Print Makers’ নামে একটি ছাপচিত্রের দল গঠন করেছি। চোখের মণিতে জ্বলজ্বলে স্বপ্ন আমাদের। বতিচেল্লির ‘venus’-এর পাখায় ভর করে আসে আবেগী কল্পনা। দূর… বহুদূর যেতে হবে, স্বপ্নের কাছাকাছি। তখন আমাদের কাছে, আমার কাছে প্রিন্টমেকিংয়ের আরাধ্য মানুষ মনিরুল ইসলাম। শুনেছি তাঁর স্ত্রী মেলা ( গবষধ) স্প্যানিশ শিল্পী এবং লোরকার আত্মীয়া। দেশে খুব-একটা আসেন না। তাঁকে নিয়ে মিথ অনেক, ‘মনির উড়োজাহাজে বসে চায়ের লিকার দিয়ে ছবি আঁকেন’- এইসব। এরও আগে আমেরিকা থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত একটি জার্নাল Art in America পত্রিকায় পৃষ্ঠা জুড়ে তাঁর অনবদ্য এচিং দেখেছি। বাংলাদেশী শিল্পী অৎঃ রহ অসবৎরপধ-র পাতায়! বিস্ময়ে ঘোর লাগে!
এই সময়ে ছিপছিপে বৃষ্টিস্নাত এক বিকেলে মোল্লার ক্যান্টিনে আড্ডার এক ফাঁকে শুনলাম, ‘মনিরুল ইসলাম আসতাছে। ওয়ার্কশপ করাবো।’
বুকের ভেতর মেঘ গুড়গুড় ডাক। এই ওয়ার্কশপ করতে না পারলে মানবজনম বৃথা! তার আগে যাঁকে নিয়ে এত কথা তাঁর দেখা পেতে হবে। খোঁজ-টোজ নিয়ে জানা গেল, তিনি উঠেছেন ঝিগাতলায়, বোনের বাসায়।
মনে পড়ে, আমার তখন ব্যক্তিগত সংকটের কাল। জীবন এফোঁড়-ওফোঁড় করা শূন্যতায় নিমজ্জমান। এক সকালে তাঁকে দেখব বলে চলেছি। মনিরুল ইসলাম? দেখা করবেন তো উনি? সামনা-সামনি দেখতে পাব, এমনকি কথাও বলতে পারব তাঁর সঙ্গে?
কিছু ভয়, কিছু কৌতূহল, কিছু-বা অনিশ্চয়তা – সব মিলিয়ে অদ্ভুত এক শিহরণ। নিজের শরীর যেন-বা আরেকটি শরীর!
খুলে গেল দরজা। খুলে দিলেন যিনি, আগে কখনো না দেখলেও বুঝতে ভুল হলো না ইনিই মনিরুল। আমরা মুখোমুখি, মাঝখানে তিন ফুট ফাঁকা জায়গা। পরনে লুঙ্গি, গায়ে ঢিলে-ঢালা জামা। জামার বোতাম এলোমেলো লাগানো। ঠিক ঘরে ঠিক বোতামগুলো না লেগে বোতামের বে-ঘর অবস্থা। ছোটখাট মানুষ। মাথাভর্তি কাঁচা-পাকা চুল। মুখে জ্বলন্ত সিগারেটের ডগায় দু-আঙুল লম্বা ছাই। যে-কোনো সময় পড়বে টুপ করে। তাঁর ড্রইংয়ের মতো একটি টেনশান ক্রিয়েট করছে ওই ছাইটুকু। তার চেয়ে টেনশন বেশি আমার ভেতর। হাত বাড়িয়ে দিলেন।
– ক্যামুন আছো?
চাঁদপুরের স্বরভঙ্গিতে কথা বলে পরিচয়ের মুহূর্তেই কাছের করে নিলেন। ডাইনিং টেবিলে ছবি আঁকছিলেন, সেখানে পাশে বসিয়ে জেনে নিতে চাইলেন আমাকে। একফাঁকে বললেন, তোমার লগে ওই গুলান কী?
– কিছু ওয়াটার কালার, প্রিন্ট Ñ আপনাকে দেখাবো বলে Ñ
– দেখাও দেহি।
আমার কাজ, উনি দেখবেন? কাজগুলো দেখবার পর আমার দিকে সিগারেটের প্যাকেট বাড়িয়ে দিলেন। আমি ইতস্তত দেখে বললেন, ‘শ্রদ্ধা বা সম্মানটা অন্য জায়গায়। পেছন থাইক্যা লাথি মাইরো না কারও।’
আমার সিগারেটে অগ্নিসংযোগের সময় আরেকটি কথা বললেন :
‘দৌড়াইতে হইলে চ্যাম্পিয়নের পেছনে যাইতা… ল্যাংড়ার পেছনে যাইতা না। হা হা হা… এইডা আমার কথা না, আবেদিন স্যারের কথা। হি ওয়াজ এ ওয়াইজ ম্যান।’
সেই থেকে তিনি আমার শিক্ষক, বন্ধু। চুরান্নব্বই থেকে দুই হাজার চার, এক দশক প্রায়। এর মধ্যে যতোবার দেশে এসেছেন ডেকে নিয়ে পরম স্নেহে কাজ শিখিয়েছেন। হাতে ধরে প্রথম বর্ণমালা শেখাবার মতো করে। তাঁর স্টুডিওতে গেলে ছবি আঁকবার ফাঁকে ফাঁকে আমাদের দীর্ঘ আলাপচারিতা হয় Ñ ছবির বিষয়, ম্যাটেরিয়াল, সমসাময়িক শিল্পভাবনা ইত্যাদি নানা বিষয় নিয়ে। গত বছরের অক্টোবরে গিয়েছিলাম মাদ্রিদ। মাদ্রিদের কেন্দ্রস্থলে মনিরের নিজস্ব বাড়ি ও স্টুডিও। সেখানে তাঁর রয়েছে আলাদা শিল্পজগৎ। একেবারে সাম্প্রতিক এবং সমসাময়িক বিশ্ব চিত্রকলার সঙ্গে তাঁর রয়েছে নিবিড় যোগাযোগ।
স্পেনের মাদ্রিদে মনির আছেন দীর্ঘদিন থেকে। তিন যুগ পার করেছেন ইতোমধ্যে। তিনি শিল্পী হিসেবে ইউরোপীয় জলবায়ুতে বেড়ে উঠলেও বাংলাদেশের ইসলামপুর-চাঁদপুর, মেঘনা-ব্রহ্মপুত্র-যমুনা তাঁর হৃদয়ে প্রোথিত।
পিকাসো, দালি ও মিরোর দেশ স্পেন। সেখানে শিল্পী হিসেবে মনির অগ্রগণ্য সারির একজন। ছাপচিত্রী হিসেবে তাঁর অবস্থান শীর্ষে। ছাপচিত্রী হিসেবে মনির স্পেনের সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মান পেয়েছেন। দেশ থেকেও তিনি পেয়েছেন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান, ‘একুশে পদক’।
সম্প্রতি ধানমণ্ডির শিল্পাঙ্গন গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল শিল্পী মনিরুল ইসলামের একক চিত্রকলা-প্রদর্শনী। মিশ্রমাধ্যমে আঁকা পঞ্চাশের অধিক শিল্পকর্ম নিয়ে দুই সপ্তাহব্যাপী এই আয়োজন সকলকে চমৎকৃত করেছে।
মনিরের সাম্প্রতিক কাজে পরিবর্তন এসেছে।
মূল পরিবর্তনটি মিডিয়ামগত। প্রিন্টমেকিংয়ে যাঁর ঈর্ষণীয় দক্ষতা, সেই তিনি প্রিন্টের ঘেরাটোপে নিজেকে আটকে না রেখে পেইন্টিংয়ের বিশাল জগতে নিজেকে মেলে ধরেছেন। চিত্রকলা এখন আর কেবল আবেগনির্ভর মাধ্যম নয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ইন্টেলিজেন্স Ñ টেকনিক। পশ্চিমে চিত্রকলায় সম্প্রতি যোগ হয়েছে ডিজিটাল ইমেজ। মনিরের অভিমত, যোগ-বিয়োগ যা কিছুই হোক না কেন – শিল্পীকে থাকতে হবে সকল কিছুর উপরে।
আমার চোখে, (সমগ্র প্রদর্শনী কয়েকবার দেখার পর মনে হয়েছে) মনিরের প্রকাশভঙ্গি ভীষণই অন্তর্মুখীন। বাইরের সকল কোলাহল থেকে, বাইরের জীবনের সকল কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখে ছবিতে নিজেরই সঙ্গে আলাপের প্রয়োজনবোধ করেছেন। অনেকটা আত্মনেপদী নীরব কথোপকথনের মতো। মনিরকে ছবির জীবননান্দ বললে অত্যুক্তি করা হবে না।
জীবনানন্দের সকল উপকরণই তাঁর কাজের মধ্যে এসেছে প্রবলভাবে। সেমিকোলন, ড্যাশ, স্ল্যাশ-এ সবকিছুই মনির ব্যবহার করেছেন কবিতার মতো। জীবনানন্দের ভাষারীতি যেমন রবীন্দ্রনাথের থেকে অনেক দূরের, মনিরের শিল্পভাষারীতিও অন্য সকলের চেয়ে ভিন্ন এবং দূরের। শিল্পকলা কেবল উপভোগের নয়, দেখবারও নয় নিছক – চিত্রকলা পড়বারও বিষয় Ñ এ-সত্য মনির উচ্চারণ করেছেন বারংবার।
মনিরের প্রদর্শনী দেখতে দেখতে চকিতে আলোক-ঝলকানির মতো বোধ হলো, তাই তো Ñ জীবনানন্দ পড়া থাকলে আরেক স্প্যানিশ শিল্পী মিরোকে (গরৎড়) চিনতে পারা যায় সহজে আপাত দুর্বোধ্যতার পর্দা সরিয়ে। মিরোর ছবিতে নীল কস্তুরি আভার চাঁদ, রূপালি আগুনে ভরা নক্ষত্র, অনন্তরৌদ্রের অন্ধকার, যাদের মাথার চুলে কেবলি রাত্রির মতো চুল, সেইরকম অদ্ভুত সব নারী ও মানুষ আর উৎসারিত অন্ধকার, জলের মতো রাত্রি আসা-যাওয়া করে বারবারই। তিনিও বিষণ্ন, নক্ষত্র ও নারীর মাঝখানের না-ঘোচা দূরত্বে। জীবনানন্দ দেখেন আকাশের ওপারে আকাশ। মিরোও দেখেন সেইভাবে হয়তো। আরো চমকিত হই, যখন মনির বলেন, ‘আকাশ আমাকে বিচলিত করে সবচেয়ে বেশি।’ কী অদ্ভুত যোগাযোগ!
মনিরের আরেক প্রিয় শিল্পী – মোহাম্মদ কিবরিয়া। কিবরিয়াকে তিনি রাখতে চান অ্যান্থনি তাপিসের কাতারে। তাঁর মতে, ‘কিবরিয়া একজন সাধক পেইন্টার।’ তিনি বলেন, ‘প্রদর্শনীর পূর্বে আমার সকল কাজ নিয়ে কিবরিয়া স্যারের কাছে গেছি…’ – এ কেবল নিছকই কাজ দেখানোর অভিলাষ নয়, এর সঙ্গে রয়েছে কিবরিয়ার প্রতি মনিরের সংবেদীমনের ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাবোধ।
শিল্পাঙ্গন আয়োজিত এ-প্রদর্শনীতে কোনো প্রথাগত নিয়ম মনির মানেননি, অথচ নান্দনিক কাণ্ডজ্ঞান তাঁর আশ্চর্য প্রখর। ছবির রঙিন দেহে ডিমের খোসা থেকে চালের গুঁড়া, লোহার গুঁড়া, নষ্ট কাগজের খণ্ড জমি, সবই আছে। তাঁর কাজে নতুনত্ব আছে কিন্তু চমক বা গিমিক নেই।
তাঁর সাম্প্রতিক শিল্পভাবনা প্রকাশের ক্ষেত্রে মিডিয়াম হঠাৎই পরিবর্তন হয়নি। ভেতরে ভেতরে পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলেছে দীর্ঘ সময় ধরে। একজন ছাপচিত্রী হিসেবে আমার মনে হয়েছে সব অনুভূতি প্রিন্টমেকিংয়ের মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। প্রিন্টের পাশাপাশি দরকার শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমগুলোর। এ-প্রসঙ্গে শিল্পী মনিরের অভিমত – ‘পিকাসো নানা মাধ্যমে কাজ করেছেন। পেইন্টিংয়ের পাশাপাশি এচিং করেছেন, সিরামিক্সে কাজ করেছেন, ভাস্কর্য গড়েছেন কখনো আবার কোলাজও করেছেন। যখন যে-মাধ্যম তাঁর শিল্পভাবনা প্রকাশের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে বলে ভেবেছেন – তখন সেই মাধ্যমকে তাঁর উপযোগী করে নিয়েছিলেন। তাঁর মতো এতো বড় শিল্পপ্রতিভা আর দ্বিতীয়টি নেই। আবার তিনি ব্যক্তিগত সংকটকালে হাতে তুলে নিয়েছিলেন কাগজ আর কলম। লিখেছেন, অন্যরকমের কবিতা, যেমন আমাদের রবীন্দ্রনাথ। তাঁর মতো বিশাল সাহিত্যপ্রতিভা – একসময় হাতে নিয়েছেন রং-তুলি। সৃষ্টি করেছেন অসাধারণ চিত্রমালা। আমি বলি খসড়া পেইন্টিং।’
মনির রং-ব্যবহারে খুব সংযমী না হলেও একটি সংহতির প্রকাশ রয়েছে সর্বত্র। প্রধানত তিনি কালো, লাল, নীল আর হলুদ রঙের মধ্যেই নিজেকে ব্যক্ত করেছেন। প্রিন্টের মতো পটে লেয়ার সৃষ্টি করেছেন, যার ফলে মধ্যবর্তী উচ্চকিত রং চাপা স্বভাবের রূপ নিয়েছে তাঁর ছবিতে কখনো কখনো। টিটিনাম সাদা ছবির মাধুর্য এবং পরিমিতি বাড়িয়েছে, অতিকথন থেকে নিজেকে দূরে উপস্থাপিত করেছে।তাঁর ছবিতে কালো রঙের অপূর্ব ব্যবহার গহনতার দিকে ইঙ্গিত করে। কালো তাঁর কাছে অন্ধকার, অখণ্ড এবং ভয়ের প্রতীক। লাল রঙের তাৎপর্য – উষ্ণতার সঙ্গে এর সম্পর্ক, লাল রঙে আছে উত্তাল অবস্থানের ইঙ্গিত। ক্রোম ইয়েলোতে খুঁজে পান অম্লান আশার আলো, টিটিনাম হোয়াইট আত্মার বিশুদ্ধতা।
সমসাময়িক চিত্রকলায় অনুসরণ-অনুকরণের প্রসঙ্গে মনিরের খোলামেলা উচ্চারণ, অপরিণত শিল্পীরা নকল করে, পরিণত শিল্পীরা চুরি করে, খারাপ শিল্পীরা যা নেয় তাকে বিকৃত করে এবং ভালো শিল্পীরা তাকে নতুন করে দেয় বদলিয়ে অথবা অন্যরকম।
এ-প্রসঙ্গে একটি কথা মনে এল – যদিও ব্যাপারটি সাহিত্যের তথাপি এখানে উল্লেখ প্রাসঙ্গিক হবে। আইরিশ কবি ডায়েলের ইন্টারভিউ পড়েছিলাম। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনার লেখায় অন্য কারো প্রভাব-সম্পর্কে আপনি কি সচেতন?
ডায়েলের উত্তর, কী জানো, ওই শব্দটি-সম্বন্ধে আমি যে খুব সচেতন তা নয়। কারণ আমার যা ভালো লাগে তাই কপি করি। খামচে তুলে নিই।… তুমি যখন Influence কথাটি ব্যবহার করো, তার মানে দাঁড়ায় আমি যেন অর্ধেক সচেতন হয়ে অন্যের রচনা আত্মসাৎ করেছি নিজের বলে। কিন্তু আমি শুধু পড়ার আনন্দের জন্যই পড়ি না। পড়ি একজন ভ্রমণকারীর ভঙ্গিতে, যখন ভালো কিছু পাই অনুশীলন করি, ভাবি আর চেষ্টা করি রিপ্রোডিউস করতে। যারা আমার পূর্বসূরি তাঁদের লেখা থেকে চুরি করি… সেই অর্থে আমি ডাকাত।
অনেকেই আমার প্যানিক ¯িপ্রং বইটির খুব প্রশংসা করেন। আসলে ওই বইটি একটি সংকলন। হাক্সলি থেকে নিয়েছি পাঁচ পাতা, এডিংটন থেকে তিন, রবার্ট গ্রেভস থেকে দুই, এভাবে অনেকের থেকে… যাঁদের কাজ আমার ভালো লাগে। কিন্তু তাঁরা আমাকে প্রভাবিত করতে পারেন না, শুধু efect-টা নিই – ডায়েলের কথা বলার ধরনই এমন, ছলাকলাহীন। মনিরের কথা বলার ধরনটিও এমন ছলাকলাহীন, অকপট।
তাঁর সাম্প্রতিক শিল্পভাবনা নিয়ে, সমকালীন শিল্পকলার ধারা, গতি-প্রকৃতি নিয়ে একদিন সারারাত তাঁর ঢাকার স্টুডিওতে আমরা দুজন কথা বলেছি।
ধানমণ্ডির স্টুডিওর সর্বত্রই ছবি। টেবিলের ওপর ছবির নানা উপকরণ। সরল সাদা ছিমছাম স্টুডিও। কিন্তু মনিরুল ইসলামের হৃদয় উত্তাপে ভরা। যে-কোনো মানুষ মনিরের সঙ্গে কথা বললেই বুঝবেন, এই মানুষ হৃদয়ের কারবারি। ইনি ভঙ্গিতে বিশ্বাসী নন। কথায় কথায় বললাম, আপনার মতো মগ্নশিল্পীদের ক্ষেত্রে একটি বিপদ প্রায়ই হয়। সেটি হলো অকারণ বিষণ্নতা আর একাকীত্বের বোধ। হয় না?
মনির : এমন তো হয়। আবার অনেক লোকের মধ্যে থেকেও কখনো কখনো ভীষণ একা বোধ হয়। তবে একজন শিল্পীর জন্য একা হয়ে যাওয়ার প্রয়োজন আছে। শিল্পীরা খুব একটা সোশাল নন। শিল্পীদের বন্ধু-বান্ধব লিমিটেড। অনেক বন্ধু-বান্ধব, অনেক মানুষ, সোশাল প্রোগ্রাম এসব থেকে শিল্পীদের দূরে থাকতে হয়। না হলে শিল্পীর কাজের জন্য সেটি ক্ষতিকর।
রফি : পিকাসোর একটি ঘটনার কথা সম্প্রতি কোনো-এক জার্নালে পড়েছি, তাঁর প্রাণের বন্ধু অ্যাপলিনিয়র মারা গেছেন। খবরটি যখন পিকাসোর কাছে পৌঁছল, গোঁফ-দাড়ি কামাচ্ছিলেন আয়নার সামনে বসে। শোনামাত্রই মুখে ছড়িয়ে পড়ল আষাঢ়ে-মেঘ। মনের মধ্যে হয়তো শ্রাবণের তুমুল বর্ষণ। বেদনায় বেঁকে-চুরে, দুমড়ে-মুচড়ে গেল মুখটা, যেমন বেঁকে-চুরে দুমড়ে-মুচড়ে যায় মানুষের মুখ তাঁর কিউবিক ছবিতে। আয়নার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে হাতের রেজার নামিয়ে রেখে তুলে নিলেন কাগজ আর চারকোল। আঁকতে বসে গেলেন আয়নার ভেতর দেখা সেই মুখখানিকে। যাকে চেনে কেবল তাঁর আত্মার ভেতরের আলোড়িত আবেগ।
মনির : পিকাসোর জিনিয়াসের এটিও একটি বড় দিক। বন্ধুর মৃত্যুসংবাদ পেয়েও অবিচলিত নিজের সৃষ্টিতে। সোশাল মানুষ এইরকম কিছু কল্পনাও করতে পারে না। এইখানেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে শিল্পীদের সূক্ষ্ম পার্থক্য।
রফি : মৃত্যুশোক এসেছে আপনার জীবনে?
মনির : একাধিকবার এসেছে। বাবার মৃত্যু। এছাড়া আমার বন্ধু দেলোয়ারের মৃত্যুতেও আমি খুব কষ্ট পেয়েছিলাম, দেলোয়ার আমার বন্ধুর চেয়েও বড় ছিল। ওর মুখটি খুব মনে পড়ে।
রফি : মৃত্যুভাবনা কখনো হয় কি?
মনির : কাজ করতে করতে কখনো এক লহমার মতো মৃত্যুর কথা মনে হয়। তখন খুব ভাবিত হই, ভয় পেয়ে যাই। মাঝে মাঝে মনে হয় মৃত্যুর অ্যাপলিকেশনটি কী? এটির রূপটিই বা কী?
ভিস্যুয়ালি দেখি, একটি মানুষ মারা গেছে, তার মরদেহ কফিনে পুরছে, কবর দিচ্ছে… এর পরেরটি তো আর জানি না। কেউ জানে না। এইটিই একটি ফিকশান।
রফি : ফিকশান?…
মুনির : মানুষের জীবনটিই একটি ফিকশান। আমি স্পেনে গিয়েছিলাম কালচারাল এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে, একবছরের জন্য। আজ চৌত্রিশ বছর হয়ে গেল। জীবনে কখনো ভাবিনি এচিং করব। এচিং কী সেটিই পরিষ্কার জানা ছিল না। আমার ফিলিপিনো রুমমেটের কাছ থেকে উৎসাহিত হই এচিং করতে। এখনো ভাবলে অবাক লাগে।
রফি : ছবি আঁকার প্রেরণা পেয়েছিলেন কার কাছ থেকে?
মনির : ঠিক সেভাবে প্রেরণা পাইনি কারো কাছ থেকে। ছেলেবেলায় সিনেমার রঙিন পোস্টার দেখে আন্দোলিত হয়েছিলাম। ছবি আঁকার প্রতি ঝোঁক ছিল। নিজেই বুঝেছিলাম অন্যকিছুর থেকে ছবি আঁকাটাই ভালো পারি।
রফি : জীবনে ছবি ছাড়া আর কীসের প্রতি আকর্ষণ বেশি?
মনির : ছবি আঁকাটাই ভালোবাসার ক্ষেত্র। পরিবার-পরিজনের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার, স্নেহের সম্পর্ক আছে। এখন যখন পিছনে ফিরে তাকাই, মনে হয়, পরিজনদের জন্য অনেক কিছু করার ছিল, যা আমি করতে পারিনি। খুব অপরাধী মনে হয় নিজেকে।
রফি : ছবি ছাড়া অন্যভাবনা?
মনির : না, ছবিই আমার প্রাত্যহিক জীবনের অনুষঙ্গ। একদিন ছবি আঁকতে না পারলে খুবখারাপ লাগে। তবে সৃষ্টিশীল মানুষদের কখনো কখনো বন্ধ্যাত্ব আসে, তখন উচিত কাজ না করে মিউজিয়াম দেখা, ভালো থিয়েটার দেখা বা একটি ভালো বই পড়া।
এখন শুধু ঘরে বসে ছবি আঁকলেই হয় না, ইন্টেলেকচুয়াল ইন্টারেকশনটা খুব জরুরি।
রফি : একসময় ফরাসি দেশে কবিরাই ছিলেন প্রধান শিল্প-সমালোচক। যেমন, বোদলেয়ার, অ্যাপলিনিয়র, পল এলুয়ার।
মনির : কবি-সাহিত্যিক-শিল্পী Ñ এরা হাত ধরাধরি করে একটা সময় এগিয়েছে। কবিদের বিরাট কনট্রিবিশন।
রফি : মনে করুন, দাদাইস্টরা; কী দারুণ হৈচৈ একসঙ্গে, ইম্প্রেশনিস্টরাও তাই। তারপর সুররিয়ালিস্টদের কথা ভাবুন।
মনির : অনেক সুররিয়ালিস্ট পেইন্টার সুইসাইড করেছেন। ওরা অন্য চোখে জগৎকে দেখতেন। ওই যে ওয়াইন গ্লাস, টেলিফোন, ঘড়ি গলে পড়ছে Ñ এগুলো তো শুধু ফ্যান্টাসি নয়। এর ভেতরেও রয়েছে মেসেজ।
শিল্প কোনো চমক নয়। শিল্পে চমকের কোনো স্থান নেই। শিল্পীর দায়িত্ব সততার সঙ্গে তাঁর সময়কে ধরে রাখা। সততা শিল্পের বড় বিষয়। আর্ট সার্কাসের খেলা নয়। সার্কাসে যারা খেলা দেখান তাঁরা স্কিলড। স্কিল দিয়ে কখনো আর্ট হয় না। যদিও স্কিল ছাড়া আর্ট হয় না তার পরও স্কিল আর্ট নয়। আর্টটা ভেতর থেকে আসে।
রফি : রবীন্দ্রনাথ অনেকটা এমন কথা বলেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ছবি দেখেছেন তো…
মনির : রবীন্দ্রনাথের সকল ছবিই আমার কাছে খসড়া ছবি মনে হয়। কিন্তু উনি সময়কে ধরেছিলেন এটি ওঁর বড় গুণ। ওঁর মতো বিশাল প্রতিভার মানুষ ছবি আঁকার জন্য সময় দিয়েছিলেন ভাবা যায়! ফিনিশড নয় ওঁর ছবি। ওঁর কাজের যে-ইমেজ… কনটেম্পরিয়ান একজন পেইন্টার রবীন্দ্রনাথের মতো কাজ করছেন, নামটি মনে করতে পারছি না। …ইউরোপের বেশ নামকরা পেইন্টার। …না, মনে করতে পারছি না।
রফি : ভারতীয় শিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্য একটি ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথ কোনো পেইন্টার ছিলেন না। কারণ তিনি পেইন্টিং শেখেননি। অন্য সকল মিডিয়ামে যদি চর্চা ও সাধনার দরকার হয়, তাহলে পেইন্টিংয়ে কেন হবে না? আমার পয়সা আছে, ক্যানভাস-রং-তুলি কিনলাম আর অমনি পেইন্টার হয়ে গেলাম? রবীন্দ্রনাথ সেই অর্থে পেইন্টার ছিলেন না।’
মনির : পৃথিবীতে অনেক বড় বড় শিল্পী আছেন, যাঁদের কোনো অ্যাকাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। যেমন ধরুন, এন্থনি তাপিস। রবীন্দ্রনাথের অ্যাকাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল না বলেই গতানুগতিকতা ভাঙতে পেরেছিলেন।
রফি : ওঁর ছবি নিয়ে রামকিংকরের দারুণ কমেন্ট আছে : ‘গুরুদেব হঠাৎ যখন বুড়ো বয়সে ছবি আঁকতে শুরু করলেন, তখন আমরা আড়ালে হাসাহাসি করতাম। এটাকে প্রথমে আমরা ওঁর পাগলামি ভেবেছিলাম। পরে অবশ্য বুঝেছি কবিতা, প্রবন্ধ বা অন্যান্য লিখিত শিল্পমাধ্যমে ওঁর অনেককিছু প্রকাশ বাকি থেকে যাচ্ছে – সেই জন্যই এত তাড়ায় ছবি আঁকছেন।
মনির : ঠিকই বলেছেন। আমার তো মনে হয় প্রত্যেক ক্রিয়েটিভ মানুষ ক্রিয়েশনের জায়গাটি ঠিক রেখে মিডিয়াম পরিবর্তন করলে দারুণ একটি চেঞ্জও আসে।
রফি : আমাদের অবস্থান কোথায় দেশের বাইরে?
মনির : আমাদের অবস্থান শূন্যের কোঠায়। শুধু আমাদের নয়, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকার অবস্থানও একই রকম। ইউরোপ-আমেরিকায় কেউ কাউকে জায়গা দেয় না, করে নিতে হয়। সে-ক্ষমতা সবার নেই। নতুন ধরনের, নতুন ইমেজের দিগন্ত সৃষ্টিকারী কাজ দেখাতে না পারলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাত্তা পাওয়া যায় না।
রফি : আপনার নতুন কাজ-সম্পর্কে বলুন।
মনির : দীর্ঘদিন এচিং করেছি। এখন মিক্সড মিডিয়াতে কাজ করছি। এটি একটি চেঞ্জ। পিকাসো নানা মাধ্যমে কাজ করেছেন। সিরামিক করেছেন, প্রিন্ট, কোলাজ। নানা কিছু। এটি অনেকটা সাহিত্যের মতো যে, কবিতা লেখেন তিনি, অনেক সময় গল্প বা প্রবন্ধ লেখায় মনোনিবেশ করেন নিজেকে। পিকাসো সকালে ছেলের রিয়ালিস্টিক পেইন্টিং করেছেন, দুপুরে বুলফাইট এঁকেছেন, রাতে কিউবইজম করেছেন। এটিই ওঁর পারসোনালিটি।
রফি : শিল্পী-সমালোচকরা বলেন, আপনার ছবি কবিতার মতো। আপনার কী মনে হয়?
মনির : মাঝে মাঝে আমি কবিতা পড়ি। কবিতার কোনো লাইন থেকে হঠাৎ ইনস্পায়ারড হয়েছি। আমার কাজে কবিতার অ্যাটমসফিয়ারটা রাখি। জীবনানন্দ আমাকে দারুণ অনুপ্রাণিত করেন। রবীন্দ্রনাথ, লোরকাও পড়ি। তবে আমি কবিতার নিয়মিত পাঠক নই। ওই যে বললাম কবিতার আবহটা ধরতে চাই। গোলাপকে আঁকতে চাই না, গোলাপের গন্ধটা ধরতে চাই।
আমার ছবি অনুভূতিনির্ভর। নন অবজেক্টিভ। ছবির ভাষা বোবা। ছবি উপভোগ করতে হয় বোবা হয়ে। ছবির রিডিং জরুরি।
রফি : বাংলাদেশের চিত্রকলা-সম্পর্কে আপনার ধারণা?
মনির : কয়েকজন ছাড়া বেশিরভাগ শিল্পীর কাজ ওভার কুকড। স্পাইসি। এটি পরিবেশগত কারণে হয়ে থাকে। আমাদের জীবনযাত্রার মধ্যে ফাঁকা জায়গা নেই। আমরা রান্না করি অনেক মশলা দিয়ে। হলুদ, মরিচ, জিরা – নানা উপাদান। আমাদের স্থাপত্যেও স্পেসের ব্যবহার নেই বললেই হয়। এখন কিছু ভালো কাজ হচ্ছে। স্পেস ক্রিয়েশন ইজ ভেরি ইমপরট্যান্ট। আরেকটি জিনিস – থামতে জানাটা জরুরি। একটি ছবি কখন শেষ করতে হবে শিল্পীকে সেটি জানতে হবে। না হলে ওভার কুকড হবে।
একজন শিল্পীকে প্রতিদিন কিছুক্ষণের জন্য মরে যেতে হয়, নতুন উদ্যমে কাজ করার জন্য। এই মৃত্যুটি দরকার। একটা কাজ শেষ করার আনন্দ আছে। শুরু করারও আনন্দ আছে। ওই যে কিছুক্ষণ মৃত্যুর কথা বললাম, ওটি খুব সিম্বোলিক।
রফি : শিল্পীদের প্রতিটি মুহূর্তই স্ট্রাগলের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। একটি কাজ শেষ করে নতুন একটি কাজ শুরু করার স্ট্রাগল আছে।
মনির : ব্যাপারটি সর্বত্রই ঘটে। একটু আগে আর্ট ক্রিটিসিজমের কথা বলছিলে না? আমি বলি কি, আর্টের জন্যে ক্রিটিসিজমের দরকার নেই। অনুভূতিনির্ভর ছবির কী সমালোচনা করবে? শিল্পী যে-ইমোশনে কাজ করেন ওই ইমোশনটির মধ্যে ক্রিটিক যেতে পারে না। তবে, শিল্পীর আত্মসমালোচনাটা প্রয়োজন।
অনেকে খারাপ কথাবার্তা এটা-ওটা লেখে। এটি ক্রিটিকের প্রফেশনাল অ্যাটিচ্যুড নয়। শিল্পী যদি সৎ হয়, তাহলে এতে করে শিল্পীর কিছুই যায় আসে না। কেননা একজন শিল্পী জানেন, তিনি কতটা যেতে পারেন, যেতে পারবেন।
রফি : আপনার এবারের প্রদর্শনীতে ছোট কাজের বেশ প্রাধান্য…
মনির : ছোট কাজ, ছোট নয়। ছোট কাজের আবেদনটা অনেক বড় হতে পারে। আবার পাশাপাশি অনেক বড় কাজ কিন্তু ভীষণই ছোট।
রফি : এ-প্রদর্শনীতে বেশকিছু ইরোটিক কাজ রয়েছে। এটি কি অবচেতন?
মনির : ঠিকই বলেছ। সেক্সটা আমাদের জীবনের অনুষঙ্গ। আমরা অনেক কিছু অবদমন করি। এর ফ্রডীয় ব্যাখ্যা-ট্যাখ্যা আছে হয়তো। শিল্পীর অবচেতন মন থেকে অনেক কিছু উঠে আসে, যেটি সম্পর্কে শিল্পী নিজেও অবহিত নন। পিকাসোর প্রচুর ইরোটিক ওয়ার্ক আছে। আমাদের মুঘল মিনিয়েচার, কামসূত্র…।
তুমি প্রথম দিকে জানতে চেয়েছিলে আমার অন্য কোনো আগ্রহ আছে কি-না ছবি ছাড়া। ফিজিক্স নিয়ে আমার ভীষণ আগ্রহ, যদিও পড়াশুনো তেমন নেই। মিস্ট্রি আমাকে ভীষণই নাড়া দেয়। একটি জায়গায় গিয়ে সকলকে থেমে যেতে হয়, সায়েনটিস্ট বলো, আর্টিস্ট বলো, রাইটার বলো…।
রফি : ধর্মটা কীভাবে দেখেন?
মনির : ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। আমি সকালে নামাজ পড়ি নিয়মিত। ধর্মটা আসলে খুব ব্যক্তিগত।
রফি : একজন শিল্পীকে কি স্বার্থপর হতে হয়?
মনির : শিল্পজগৎটাই এমন যে, পরিবেশ স্বার্থপরতার দিকে শিল্পীকে ঠেলে দেয়। এখন আমি যদি প্রতিদিন সোশাল ওয়ার্ক করি, আমার তো ছবি আঁকা হবে না। ক্রিয়েশনটা আগে, পরে অন্যকিছু।
রফি : আপনি শিল্পী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছেন বিদেশে। দেশের কোনো স্ট্রাগল আপনাকে স্পর্শ করেনি। দীর্ঘ বছর পর দেশে ফিরেছিলেন। একাত্তর, মুক্তিযুদ্ধ আপনি দেখেননি।
মনির : ওখানে প্রতি মুহূর্তে স্ট্রাগল করতে হয়। এখানকার মতো সহজ নয় ওখানের জীবনযাপন। একদিন ছবি না আঁকতে পারার অর্থ হচ্ছে তুমি একদিন পিছিয়ে গেলে অন্যদের থেকে। এক মাদ্রিদ শহরেই শিল্পী আছেন বিশ-বাইশ হাজার। সেখানে কেবল ছবি এঁকে টিকে-থাকা ভাবতে পারো?
দেশের জন্য খুব ফিল করি। আমি ত্রিশ ডলারের ভাতা পেতাম মাসে। ওই কয়টি ডলার দিয়ে দেশে ফেরার কথা চিন্তা করা যায় না।
মুক্তিযুদ্ধ আমাকে ভীষণ নাড়া দিয়েছিল। আমি ওই সময় মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটি প্রদর্শনী করেছিলাম। খুব সাড়া জাগিয়েছিল প্রদর্শনীটি। আটটি শিল্পকর্ম নিয়ে সিরিজ অব ওয়ার্ক ছিল তাতে। বিখ্যাত স্প্যানিশ শিল্পী ফ্রান্সিস গয়্যা ফরাসি বিপ্লবের ওপর অনেকগুলো এচিং করেছিলেন, যেগুলো পরবর্তী সময়ে গয়্যা’র কালোত্তীর্ণ শিল্পকর্ম হিসেবে খ্যাতি পায়। তো, ওই এচিংগুলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাকেও কিছু করতে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে। ওই ছবিগুলোর ইনস্পিরেশনে আমি মুক্তিযুদ্ধের কাজগুলো করেছিলাম।
রফি : আপনি খ্যাতির মোহে আটকে পড়েছেন?
মনির : গত শতাব্দীতে সংস্কৃতি ও শিল্পবিপ্লবের ফলে শিল্পীরা কেউ কেউ প্রাচুর্যের মুখ দেখেছেন। খ্যাতি, টাকা, প্রাচুর্য শিল্পীরাও চান। শিল্পীদের স্বীকৃতি দেওয়াটা খারাপ কিছু না। একটি পুরস্কার শিল্পীকে অনুপ্রাণিত করতে পারে। যদিও পুরস্কার কোনো যোগ্যতা-বিচারের মানদণ্ড নয়। এটি অক্সিজেনের মতো।
রফি : একটি সুন্দরী নারীও তো অনুপ্রাণিত করতে পারে।
মনির : তা পারে, সেটির একটি পারপাজ থাকে। দেলাক্রয়া, গয়্যা অনুপ্রাণিত হওয়ার জন্য সুন্দরী মেয়ে রাখতেন। এদেরকে গঁংধ বলে। তো এদের সঙ্গে শিল্পীদের কোনো শারীরিক সম্পর্ক থাকত না, শিল্পীরা কেবল সৌন্দর্যটা উপভোগ করতেন। ছবিতে সেই সৌন্দর্যটা ধরতে চাইতেন। ওরা যত না সুন্দর তার চেয়েও বেশি সৌন্দর্য আরোপ করে উপস্থাপন করা হতো।
তুমি শিল্পীদের কমফোর্টের কথা বলছিলে, শিল্পীর কমফোর্ট দরকার কিন্তু কখনো কখনো কমফোর্ট শিল্পীকে মেরে ফেলে। শিল্পীর তৃষ্ণা থাকতে হবে, কিন্তু তৃপ্ত হলে বিপদ।
রফি : এখন তো দুই হাজার চার সালের মাঝামাঝি। নতুন শতাব্দীতে এসে পড়েছি। এই সময়ে ছবির জগৎটা কী রকম!
মনির : এটি ডিজিটাল যুগ। ইউরোপে অনেকে ডিজিটাল ইমেজ নিয়ে কাজ করছে। অনেকে এর বিরোধিতা করেন, আমি মনে করি, সেটি ঠিক নয়। প্রযুক্তির সুবিধাটুকু নিয়ে নিজের মতো করে ইমেজ তৈরি করা যেতে পারে। একটি নতুন ইমেজ সৃষ্টির জন্য শিল্পীদের এত সংগ্রাম। সবাই নতুন কিছু সৃষ্টি করতে চায়, সবাই সমুদ্রের মাঝখানের বাতিঘরটি ছুঁতে চায়, যে যতটুকু যেতে পারে।
রফি : আপনার মধ্যে কোনো দাহ নেই? মানে যন্ত্রণা?
মনির : সৃষ্টির যন্ত্রণা তো আছে। আমি বলি, গর্ভযন্ত্রণা। মনের মধ্যে ছবিটিকে যেমন দেখতে পাই ঠিক তেমনটি আঁকতে না পারা। অনুভূতি একটি ব্যাপার। একটি অনুভব নিয়ে ছবি শুরু করি, যে-অনুভবের কোনো শেপ নেই, রূপ নেই। একটি সময় ছবির ওপর আর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তখন মনে হয় রং, রেখা এ-সবই নিজের নিয়মে গড়ে উঠতে চাইছে, আমি সেখানে যন্ত্রের মতো ব্যবহৃত হচ্ছি… দারুণ মিস্ট্রি (Mystery)…।
কথাগুলো বলতে বলতে তাঁর গলা জড়িয়ে আসছিল। তিনি পৌঁছুতে চেষ্টা করছিলেন শিল্পের আরো গভীরে। ততক্ষণে ভোর হয়ে এসেছে। সেদিন রাতে মনিরুল ইসলামের সঙ্গে আরো অনেক কথা হয়েছে। সেগুলো অপ্রকাশিত থাকলে ক্ষতি নেই। সে-রাতে হৃদয় খুলে কথা বলেছিলেন শিল্পী মনির।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.