সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জীবনে ইউনেস্কো অবিমিশ্র হিতকারী ভূমিকায় ছিল না; এক পর্বে তা লেখক হিসেবে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বেলায় অনুঘটকের ভূমিকা পালন করলেও তাঁর জীবনের অন্তিম পর্বে আশাভঙ্গকারী বিপর্যয়ের সূত্রপাত করেছিল। তাঁর জীবনের শেষ দশকটিকে প্যারিসের দশক হিসেবে চিহ্নিত করলে ইউনেস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ এর গোড়া থেকেই ছিল। দশকের শেষ অর্ধেকে এসে ওয়ালীউল্লাহ ইউনেস্কোর কর্মী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। পাকিস্তান দূতাবাসের চাকরি রেখে এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটির কাজে যোগ দেওয়াটা তাঁর নিকট তুলনায় পছন্দের ছিল। যদি এই মনোভাব তাঁর অভিজ্ঞতায় সমর্থিত হয়নি, বরং বিরাট বৈষম্যের শিকার হয়েছিলেন। বাংলাদেশ ওয়ালীউল্লাহর জীবনকালে ইউনেস্কোর সদস্য হয়নি। যেজন্য তাঁর পক্ষে সুবিচার পেতে নিজের দেশকে পাশে পাননি; ততদিনে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের কাছে ওয়ালীউল্লাহ বৈরী আচরণ পেতে শুরু করেছিলেন। প্রকৃত কী ঘটেছিল তাঁর জীবনের অন্তিম পর্বে – এর প্রকৃত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি। নিজের প্রতি করা অবিচারের প্রতিকার চেয়ে ওয়ালীউল্লাহ আন্তর্জাতিক আদালতেও গিয়েছিলেন। তাতে ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। তাঁর মৃত্যুর পরে অ্যান মারি ক্ষতিপূরণ দাবি করে আবেদন করেও কোনো রকম সুবিচার পাননি। এই আবেদনে ওয়ালীউল্লাহর শেষ জীবনের স্বাস্থ্যভঙ্গের পেছনের কারণ হিসেবে ইউনেস্কোর তরফে অনড় ভূমিকার বরাত দেওয়া হয়। প্রকৃত কী ঘটেছিল সেটা উন্মোচিত না হওয়ার অধ্যায়টি প্রসঙ্গে অনুসন্ধান রয়েছে এই আলোচনায়। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনা পরম্পরাকে তুলে ধরার চেষ্টা করব।
বাংলা একাডেমি-প্রকাশিত সৈয়দ আকরম হোসেনের ওয়ালীউল্লাহ জীবনীতে (১৯৮৮) দেওয়া বিবরণ এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিরোধের উল্লেখ রয়েছে, তবে এর প্রারম্ভিক পৃষ্ঠপোষকতার বয়ান নেই। ‘শেষজীবন ও মৃত্যু’ শিরোনামীয় অধ্যায়ে বলা হয়, ‘১৯৬৭ সালে ইউনেস্কোর প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট হিসেবে যোগদানের পর থেকেই পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর মতান্তর শুরু হয়।’ এর পেছনে কারণ হতে পারে পাকিস্তান দূতাবাসের চাকরি থেকে অব্যাহতি না নিয়ে ইউনেস্কোর চাকরিতে যোগ দেওয়া; দূতাবাসের চাকরির মতো তা স্থায়ী চাকরি ছিল না, নির্দিষ্ট সময় অন্তর চাকরিতে নতুন চুক্তি করা হতো। এক কথায় তা ছিল চুক্তিভিত্তিক। তবে তাতে নিয়মিত সময়সীমা বর্ধিত হওয়ার দৃঢ় সম্ভাবনা ছিল। যে-কারণে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ বিভিন্ন দেশে পোস্টিং পাওয়ার পরে প্যারিসের উপকণ্ঠে ম্যুদঁ শহরে ফ্ল্যাট কেনেন এই ভরসাতেই। জীবনের অন্তিমে এসে তাঁর অধ্যাপক মাহমুদ শাহ কোরেশীকে লেখা এক পত্রে পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে :
প্যারিস,
১৭ মে ১৯৭১
কিছু ঘুরে আপনার তিন তারিখের চিঠি এই মাত্র হাতে পেলাম। দেরীর কারণ ইউনেস্কোতে আমি আর নেই, আগের বাড়িও ছেড়েছি। কন্ট্রাক্ট শেষ হবার পরে দেশে ফিরবার আগে কিছু ছুটি নিয়েছিলাম। তারপরে পশ্চিমীদের আক্রমণ শুরু হলো। ফিরতে হলে পশ্চিমে ফিরতে হবে, এমতাবস্থায় না ফেরাই মনস্থির করেছি। ফেরা অসম্ভব। চাকরি হয়তো থাকবে না। কিন্তু এভাবে কী চাকরী করা কখনো সম্ভব? বস্তুত এখন বেকার আছি সপরিবারে। ইউনেস্কো আবার নেবে কিনা সন্দেহ। পশ্চিমীদের মতবিরুদ্ধ ও-কাজ করবে না। ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে কিছু ভাবি না। তমসাচ্ছন্ন মনে হয়।
আমার কথা আগেই বললাম কারণ সেখানে কোনো সম্ভাবনা নেই তা যেন বুঝতে পারেন। দেশের জন্যে, সকলের জন্যে, আত্মীয় স্বজনের জন্যে চিন্তার শেষ নেই।
৩১শে ডিসেম্বর ১৯৭০ সালে ওয়ালীউল্লাহর সঙ্গে ইউনেস্কোর চুক্তি শেষ হয়ে যায়; তারপরে আপিল করেন, যার সিদ্ধান্ত তার পক্ষে যায়। ইউনেস্কো তা না মানলে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করলে আপিল খারিজ হয়। এই অবস্থায় তাঁর সামনে পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। সেজন্য নিজের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যেও প্যারিসে বাংলাদেশের হয়ে জনমত সংগঠন করছিলেন; এই চিঠিতেই তার বিবরণ রয়েছে :
এখানে কিছু কিছু দল জুগিয়েছি, খবরের কাগজে লেখালিখির ব্যবস্থা করেছি। কিন্তু সে-সবে বিশেষ কিছু হবে ব’লে মনে হয় না। ফরাসিরা আমাদের বিষয়ে উদাসীন হয়ে পড়েছে। ওখানে কিছু একটা না করতে পারলে দুনিয়ার উদাসীন ভাব স্বাভাবিক। আমি বিশেষ ক’রে খবরশূন্য বোধ করছি। কিছু খবর পাঠাও। কিছু যোগাযোগ দরকার। … যাঁরা জান দিয়েছেন তাঁদের নামের ফর্দও পাওয়া দরকার।
ব্যক্তিগত জীবনের দুঃসহ অবস্থার ছায়াপাত এতে নেই। এই সময়েই সংসার চালাতে অ্যান মারি ওয়ালীউল্লাহ ‘সিএনআরএস’ নামে গবেষণা প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে যোগ দেন। সৈয়দ আকরম হোসেন এই চুক্তিভিত্তিক চাকরিকাল সমাপ্ত হওয়ার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে বাঙালিদের জাতিবৈরিতাকে দায়ী করেছেন আরেক ওয়ালীউল্লাহ-গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদের বরাত দিয়ে। স্বাভাবিকভাবে পাকিস্তান দূতাবাসের প্রেস অ্যাটাশে হিসেবে বিভিন্ন দেশে পোস্টিং নিয়ে ওয়ালীউল্লাহ চাকরি করে লব্ধ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ইউনেস্কোর প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট হিসেবে চাকরি পান। এটি ছিল তাঁর প্রেস অ্যাটাশে হিসেবে কাজের থেকে আলাদা ধরনের এবং চাকরির পদ হিসেবে পি-৫ গ্রেডের চাকরি। এতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রফেশনালদের অন্তত ১০ বছরের কাজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। এটি প্রফেশনাল স্তরে সর্বোচ্চ ধাপ, এর উপরেই ডিরেক্টরিয়াল স্তরের স্টাফ রয়েছে। এতে প্রবল বিশ্লেষণী ও যোগাযোগের দক্ষতা চাওয়া হয়, টেকসই অভিজ্ঞতা ও দৃঢ় নেতৃত্বের সামর্থ্য; এতে প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট থেকে অপারেশন বিশেষজ্ঞ হয়ে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ, তথ্য সিস্টেম প্রফেশনালসহ অন্যান্য ক্ষেত্রের লোকও থাকে। এই পদে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধাসহ আন্তর্জাতিক সিভিল সার্ভেন্টদের থেকে নিযুক্ত করা হয় ও অহরহ এখানে-সেখানে বিভিন্ন অঞ্চলে ও পরিবেশে যে-কোনো মানবতাবাদী জরুরি অবস্থায়। কাজ করার প্রত্যাশা করা হয়।
দূতাবাসের চাকরিতে ওয়ালীউল্লাহর হাঁপিয়ে ওঠার কারণ সম্পর্কে অ্যান মারি ওয়ালীউল্লাহ স্মৃতিচারণ করেছেন :
However, he got tired of his job as a ‘Salesman for Pakistan’ repeatiting over and over the same thing in which he no longer believed, organizing Iqbal Day every year. The great expectations of the first years following the creation of Pakistan, if he ever had them had vanished long ago.
In 1967 he was appointed in Unesco as P5 in Mass Media department. He was overjoyed to leave his job as a ‘Salesman for Pakistan’ and join the prestigious Cultural organization. He accompanied the DG to Afghanishtan and to Nepal, preparing a conference on Mass Media and violence.
However, although he was given the high grade of P5 he was not given the corresponding responsibilities and felt somewhat ostracized by the department in which he was arbitrarily posted by the DG, against the wish of the head of the Mass Media department who had his own candidates. When the situation became obvious to him he filed a case against the Unesco which he won in the first instance. We then went on leave home in December 1969.
….his contact with Unesco was terminated in December 1970, he was therefore jobless at the beginning of 1971 and he thought of reintegrating the Pakistan government pending the result of his case which was to take place at the end of 1971 in Geneva.
He was soon to be appalled by the frightful tragedy : the war with Pakistan that followed. He felt terribly frustrated not knowing what to do to help apart from contracting Malraux and some French journalists. There was , of course, no longer any question of returning to Pakistan.
ইউনেস্কো পর্বটি একের পর এক দুঃখের উপলক্ষ হয়ে এলেও সূচনাতে ইউনেস্কো তাঁর জন্য স্বীকৃতির বিরাট পরিমণ্ডল সৃষ্টি করেছিল, যে-পর্বে ট্রি উইদাউট রুটস ইউনেস্কো থেকে প্রকাশিত হয়। তাঁর মৃত্যুর পরে ওয়ালীউল্লাহর প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ চেয়ে অ্যান মারি মামলা করলে তাও প্রত্যাখ্যাত হয়। এ-সম্পর্কে অ্যান মারি নিজেও চেয়েছেন, ইউনেস্কো ট্রাইব্যুনালের মতো জটিল ব্যাপারটি সম্পর্কে সঠিক রিপোর্ট প্রকাশিত হওয়া বাঞ্ছনীয়।
(সূত্র : আবদুল মতিন)
এক.
দ্য ট্রি উইদাউট রুটস-এর ইউনেস্কো থেকে প্রকাশিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতকে লক্ষ করা যাক। প্রেক্ষাপট হিসেবে ইউনেস্কো কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, এর কাজের পরিধি কী? অনুবাদের গুরুত্ব দিয়ে ইউনেস্কো বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিত্বশীল লেখকদের রচনা প্রকাশ করে, সেই সূত্রে লাল সালুর অনুবাদ হিসেবে বইটি প্রকাশ পায় ও অভিনন্দিত হয়।
ইউনেস্কো জাতিসংঘের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিক্ষা, কলা বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিশ্বশান্তি প্রসারের লক্ষ্যে কাজ করে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রকে সদস্য হিসেবে নিয়ে ইউনেস্কো সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করে। একদিকে সেভ দ্য চিলড্রেনসের মতো সংস্থায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করা, আরেকদিকে নীল নদের স্রোতে আবু সিম্বল পাহাড়ের ভেসে যাওয়া থেকে আসওয়ান বাঁধ নির্মাণও তার কাজের অন্তর্গত। বিভিন্ন সৌধ ও ঐতিহাসিক নির্মাণকে নতুন ঠিকানায় ঠাঁই দিয়েছে সংস্থাটি। বিশ্বের সাংস্কৃতিক ও প্রাকৃতিক হেরিটেজ রক্ষার জন্য কনভেনশন অনুষ্ঠান ও কমিটি গঠন করার সঙ্গে আমরা পরিচিত। ১৯৬৮ সালে ইউনেস্কো প্রথম আন্তর্জাতিক কনফারেন্স আয়োজন করে পরিবেশ ও উন্নয়নের মধ্যে মিটমাট করানোর লক্ষ্যে; যে-সমস্যাকে টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে অব্যাহতভাবে বিবেচনা করা হয়। এই কনফারেন্সের ফলেই ইউনেস্কোর ম্যান অ্যান্ড বায়োস্ফিয়ার প্রোগ্রাম সৃষ্টি করা হয়।
যোগাযোগের ক্ষেত্রে ‘কথা ও ইমেজের দ্বারা আইডিয়ার অবাধ প্রবাহ’ ইউনেস্কোর প্রতিষ্ঠা থেকেই এর সংবিধানে ছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতার পরে আগ্রাসনের জন্য জনসংখ্যার ইনডক্ট্রিনেশনের মধ্যে তথ্যের নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বছরগুলোতে মাস মিডিয়ার পুনর্গঠন এবং এর উপায়ের চাহিদাকে শনাক্ত করায় মনোনিবেশ করা হয়। ১৯৫০-এর বছরগুলোতে ইউনেস্কো সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ ও শিক্ষার আয়োজন করে। ‘নতুন বিশ্ব তথ্য ও যোগাযোগ শৃঙ্খলা’র প্রতি সাড়া দিয়ে ১৯৭০-র দশকের শেষে ইউনেস্কো যোগাযোগের সমস্যা স্টাডি করার জন্য কমিশন গঠন করে, যার থেকে ১৯৮০-র ম্যাকব্রাইড রিপোর্ট সৃষ্টি হয়। একই বছরে গঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল প্রোগ্রাম ফর দ্য ডেভেলপমেন্ট অফ কমিউনিকেশন (আইপিডিসি)। উন্নয়নশীল দেশগুলির মিডিয়ার উন্নয়নকে প্রসার করতে এই সংস্থা গড়া হয়। ১৯৯৩ সালে মিডিয়ার স্বাধীনতা ও বহুত্ববাদের বিষয়ে ‘উইন্ডহক ঘোষণা’ করা হয় ইউনেস্কো সাধারণ অধিবেশন থেকে। এই সূত্রে জাতিসংঘ ৩রা মে’কে ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে’ হিসেবে গ্রহণ করে।
ইউনেস্কোর নতুন আইডিয়ার অবাধ প্রবাহের জন্য কথা ও ইমেজের মাধ্যমকে কাজে লাগানোর সূত্রেই বিশ্ব ক্ল্যাসিকসের ভাণ্ডার হিসেবে বিভিন্ন দেশের কবি-মনীষীদের রচনার অনুবাদ প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে যোগাযোগের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের উপরে গুরুত্ব দেওয়ার প্রোগ্রামে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ যুক্ত হন। এই যুক্ততার সূচনা হয় ট্রি উইদাউট রুটস-এর প্রকাশনা দিয়ে। উপন্যাসটি ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হলেও এই উদ্যোগ আয়োজন আরো অনেক আগেকার হওয়ার কথা। অন্তত যে খসড়াটিকে ভিত্তি করে লা’রবর সঁ রাসিন প্রকাশিত হয় ১৯৬৩ সালে, ইংরেজি রচনাটি অন্তত এই দশকের শুরুতে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
দুই.
অনুবাদ সম্পর্কে ইউনেস্কোর দৃষ্টিভঙ্গি উচ্চারিত হয় এর মুখপত্র দ্য ইউনেস্কো কুরিয়ার-এর সম্পাদকীয়তে : আমরা যত বেশি করে অন্য জনগণের সাহিত্য সম্পর্কে জানব, ততই বেশি করে তাদের জীবনযাপন রীতিকে অনুধাবন করতে পারব। এই সর্বজনবিদিত নীতির স্বীকৃতি ভিনদেশি সাহিত্যের রচনার অনুবাদকে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পারস্পরিক উপভোগের জন্য ইউনেস্কোর অন্যতম প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।
এই সূত্রে ইউনেস্কো প্রতিবছর অনূদিত সাহিত্যের তালিকা হিসেবে ‘ইনডেক্স ট্রান্সলেশনাম’ প্রকাশ করে। তাতে উঠে আসে ইউনেস্কোর সদস্য-রাষ্ট্রগুলোতে অনুবাদ কর্মকাণ্ডের চিত্র। তাতে কোনো সাহিত্যের অন্য ভাষায় অনূদিত হওয়ার পরিমাণ, প্রাচ্য ও প্রতীচ্য সাহিত্যসমূহের মধ্যে আদানপ্রদান ও প্রভাবের সমস্যা, বিশ্বের দেশগুলোতে অনুবাদের উদ্যোগ নেওয়া প্রতিষ্ঠানের বিবরণ, প্রাচ্য সাহিত্যের পাশ্চাত্য অনুবাদকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, এর বাইরে অনুন্নত দেশগুলোর অনুবাদকদের আর্থিকভাবে সহায়তা দেওয়া, নামমাত্র মূল্যে সম্ভব হলে কপিরাইটের অর্থ পরিশোধ করা ইত্যাদি বিষয় ছিল।
‘গত দুইশো বছর ধরে সভ্য দুনিয়া একক ভাষায় প্রকাশিত সাহিত্যকে অপর সমস্ত ভাষায় অনুবাদ করার ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ শক্তি ব্যয় করছে।’ – সিনোলজিস্ট ও অনুবাদক জর্জ মার্গনলেস এই সময়ের বিশেষ সমস্যার প্রতি এমনই বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন। আধুনিক বিশ্ব অনুবাদকে যে-চোখে দেখে এর নিদর্শন রয়েছে ১৯৫৮ সালে ইউনেস্কো-প্রকাশিত ইনডেক্স ট্রান্সলেশনাম থেকে – ‘১৯৫৬ সালে বিশ্বে ২৭০১৭টি রচনা অনুবাদ হয়েছে।’ এই উপাত্ত বিশ্বমানচিত্রের কয়েকশ’র কাছাকাছি দেশের মধ্যে মাত্র ৫২টি দেশের।
প্রকাশিত রচনাগুলি আধুনিক সময়ে বিশ্বে চলতে থাকা অনুবাদের ছোট একটি অংশ মাত্র। সৃজনশীল অনুবাদের মতোই টেকনিক্যাল অনুবাদের পরিমাণ, যেখানে বিভিন্ন উপলক্ষের অনুবাদগুলি বইয়ের দোকানে দেখা যায়। টেকনিক্যাল অনুবাদ কাজ করে সাময়িকী, পেটেন্ট, নির্দেশিকা, ক্যাটালগ প্রভৃতির প্রবন্ধের উপরে, আর সেসব শ্রমের ফলাফল আস্থাপূর্ণভাবে কমই সঞ্চালিত হয়। মাইক্রোফিল্ম বা টাইপ করা কপিতে থেকে যায় ভিন্ন তথ্য কেন্দ্র বা প্রাইভেট অফিসের সূত্রে। এতে অনামা বাণিজ্যিক অনুবাদের কোনো বিবেচনাই করা হয় না, সিভিল সার্ভিসে বা দ্বিভাষিক সচিবের কাজে – বর্তমানে যা বিশাল অনুবাদ ইন্ডাস্ট্রির চেহারা নিয়েছে। যেমন অজস্র সংগঠন, সোসাইটি, অ্যাসোসিয়েশন, ইউনিয়ন ও অধিবেশন রয়েছে যারা তাদের করা অনুবাদ প্রকাশ করে না। দ্বিভাষিক বা বহুভাষিক সাময়িকী প্রকাশ করা প্রতিষ্ঠানের তালিকা হাজারের উপরে, কংগ্রেস, কনফারেন্স বা সিম্পোজিয়াম তালিকাবদ্ধ করে মাত্র।
সবাক ছবির সংলাপের অনুবাদের পরিমাণগত তালিকা নেই; এসব সুপরিচিত অনুবাদের পরিমণ্ডল ছাড়াও মানুষের কর্মকাণ্ডের এমন কোনো শাখা নেই আজকে যাতে অনুবাদকে অপ্রয়োজনীয় বলা যেতে পারে। ১৯৫৬ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই অনূদিত বইয়ের সংখ্যা আগের পঁচিশ বছরের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। বিদেশি অনূদিত নাটকের সংখ্যা কয়েকগুণ হয়েছে। পঞ্চাশ বছর আগে এত বেশি পরিমাণে আন্তর্জাতিক কনফারেন্স হতো না প্রতিবছর এবং তারা দোভাষী ব্যবহার করত না। কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে অনুবাদের ভূমিকা নানা দিগন্তে প্রসারিত হয়েছে।
তিন.
ইউনেস্কো তার লক্ষ্য পূরণের কাজে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে দেখেছে অনুবাদকে। বিশ্বের বিভিন্ন
সংস্কৃতির মধ্যে মেলবন্ধনের জন্য তাই কথা ও ইমেজের মধ্য দিয়ে আইডিয়ার অবাধ প্রবাহ চালু করতে চেয়েছে। তারই খোঁজে বিশ্ব ক্ল্যাসিকসের লাইব্রেরিকে অনুবাদ করে হাজির করেছে।
ইউনেস্কোর চৌদ্দটি প্রকল্পের মধ্যে সবার দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকের উপরে প্রভাব থাকা ও আমাদের সত্তালাভের সবচেয়ে ব্যক্তিগত সীমাতেও – যা কালচার অ্যান্ড দ্য ফিউচর নামে পরিচিত; যাতে আমাদের সংস্কৃতির ও সাংস্কৃতিক হেরিটেজের প্রত্যেক মুখ বেষ্টন করে, সৃষ্টি ও সৃজনশীলতার, এবং সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক আন্তরসম্পর্কেরও।
হুলিও কোর্তাসারের কথায়, ‘সংস্কৃতি বলতে যাকে নাম দেওয়া হয় মূলত সমস্ত ক্ষমতায় আমাদের আত্মপরিচয়ের উপস্থিতি ও অনুশীলন মাত্র।’ এই উপস্থিতির শেকড় পোতা রয়েছে আমাদের আত্মপরিচয়ের যে-কোনো বিবেচনার জন্য প্রস্থানবিন্দুর জ্ঞান, ইতিহাসের মধ্যে; ‘নিজেকে জানো’র নিয়মে ও ইতিহাসের মাধ্যমে কেবল, আমাদের শেকড়ের পরীক্ষার মাধ্যমে, আমাদের সত্তালাভের গভীরে পৌঁছতে পারি এবং বিশ্বের মধ্যে আমাদের মৌল বিষয়কে আবিষ্কার করতে পারি।
আমাদের আত্মপরিচয়ের অনুবর্তী চর্চা বা অনুমান এই উপাদানের মূল্যায়ন ও পুনর্মূল্যায়নে সম্পৃক্ত। যাকে আমাদের সংস্কৃতির গঠনকারী উপাদানে শনাক্ত করি। এসব উপাদানের মধ্যে তালিকা করতে পারি, তার মধ্যে রয়েছে সাহিত্যিক উপাদান পরীক্ষা করা; আর ১৯৪৮ থেকে ইউনেস্কো তার প্রকাশিত প্রতিনিধিত্বশীল রচনার অনূদিত সংকলন প্রকাশের মাধ্যমে সেই কাজ করে চলেছে।
এই প্রকল্প দুটি আন্তর্জাতিক ভাষায়, ইংরেজি ও ফরাসিতে, অনুবাদে রচনাগুলি সুলভ করা, বিশ্বসাহিত্যের মাস্টারপিসসমূহকে উপস্থিত করে। পাঠকের কাছে তা গুণে ও বিষয়বস্তুতে সন্দেহাতিরিক্ত দিগন্তকে উন্মোচিত করে।
এই প্রতিনিত্বিশীল রচনার সংগ্রহ সম্পর্কে এটুকু বলাই যথেষ্ট নয়; এই সংগ্রহ সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ও আন্তঃসাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদার করার ইউনেস্কোর প্রকল্পের কেন্দ্রে রয়েছে;
কারণ লোকে তাদের নিত্যদিনের জীবনের ইতিহাসের ঘটনার বাইরেও জানতে চায়, তাদের পথচলা ও লোকাচারের বাইরে, তাদের ট্রাডিশনস, বিশ্বাস মূল্যবোধ ছাড়িয়ে, যা বিশ্বে তাদের অস্তিত্বকে আরো উত্তমভাবে নিশ্চিত করবে এবং বিশ্বজনীন ঐকতানে তাদের স্থানকে দৃঢ়তর করবে।
একে অতীতের প্রতি আকুলতা আর বর্তমানকে প্রত্যাখ্যান সূচক হিসেবে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রত্যেক মানবগোষ্ঠীরই প্রয়োজন তার শেকড়ের খোঁজ করা সমকালীন পরিবর্তমান বিশ্বকে আরো ভালো করে বুঝতে ও তার সঙ্গে নিজের শর্ত স্থাপন করতে; এবং অপরের সঙ্গে সম্পর্ক ও বিনিময়ের মাধ্যমে আসা সমৃদ্ধিকে দু-হাত বাড়িয়ে গ্রহণ করতে; এসব কর্মকাণ্ড দ্বন্দ্ব সংঘাতের পরিপ্রেক্ষিতে কার্যকর হতে পারে না; একমাত্র নিজের মূল্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে সমান আস্থার সংস্কৃতির মধ্যে শান্তিপূর্ণ সংযোগ পরস্পরকে সমৃদ্ধ করতে পারে। পারমাণবিক অস্ত্রের আবহাওয়ার মধ্যে এবং কয়েকশ’ বছর প্রাচীন মানবপ্রতিভার দ্বারা গড়ে তোলা হেরিটেজকে দেখা উধাও হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইউনেস্কো কাজ করে যাচ্ছে।
অতীতের পুঞ্জীভূত সমৃদ্ধির মধ্যে, যাতে বর্তমান অব্যাহতভাবে যোগ করছে, বিশ্বজুড়ে ভিন্ন সাহিত্যসমূহকে গণ্য না করে উপায় নেই, পরিমাণকে অস্বীকার করা চিরবর্ধমান সম্পদ। তাতে বহুবিস্তৃত পরিসরে মৌখিক ও লিখিত সাহিত্যও অন্তর্ভুক্ত। সব রকমের প্রকরণের ও প্রকরণ ছাড়িয়ে থাকা সমস্ত রচনাকে।
এর মধ্যে রয়েছে সুইডিশ নোবেল বিজয়ী লেখক পার লাগেরভিস্টের দুটি উপন্যাসের ফরাসি অনুবাদ – আমেস মাস্কুয়েজ (১৯৭৪) ও টেক্সিল দ্য লা তের (১৯৭৭)। রবীন্দ্রনাথের একাধিক উপন্যাস ও নাটক ফরাসি ও ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশ পায়। ফরাসি লেখক আলবেয়াও কাম্যুর লা পেস্ত উপন্যাসের ইন্দোনেশিয়ার ভাষায় অনুবাদ প্রকাশিত হয়। ফরাসি নোবেল বিজয়ী দার্শনিক অঁরি বের্গসের সন্দর্ভ লে’ভুল্যশন ক্রিয়াত্রিস-এর আরবি অনুবাদ প্রকাশ পায়। নোবেল বিজয়ী গ্রিক কবি চার্চ সেভেরিসের কবিতার সংকলন প্রকাশ পায় ইংরেজি অনুবাদে; গ্রিক কবি অদেসসিউস এলাইতিসকে তুলে ধরা হয়েছে সিক্স পোয়েটস অব মডার্ন গ্রিস (১৯৬০) নামের সংকলনে। যুগোম্লাভিয়ার লেখক ইভো আন্দ্রিচ কথাসাহিত্যের সংকলন সার্বো ক্রোয়েশিয়া থেকে ফরাসিতে অনুবাদ হয়। জাপানি ঔপন্যাসিক ইজানুনারি কাওয়াবাতার উপন্যাস ইংরেজি ও ফরাসিতে অনুবাদ হয়। হিস্পানি কবি ভিসেন্তি আলেকসান্দওর কবিতা ফরাসি অনুবাদে প্রকাশ পায়। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের রচনা এই সংগ্রহে প্রকাশিত হয়।
আলোচক এদুয়ার্দ জে ম্যনিক মন্তব্য করেন : ‘কবি ও লেখকদের ভূমিকার আবশ্যক দিক হলো – যা তিনি যোগাযোগ সম্পন্ন করেন ও তাই করে আমাদেরকে একত্রে আনেন – যাকে কখনো অতিমাত্রায় ঝোঁক দেওয়ার উপায় নেই। প্রতিনিধিত্বশীল রচনার ইউনেস্কো সংগ্রহ হলো ফোকাল পয়েন্ট, যাতে রচনাসমূহ মিলিত হয়ে অনুবাদের পরে বিস্তৃততম পাঠকের নিকট সুলভ হবে।’ কারণ এই সংকলন ইংরেজি ও ফরাসি অনুবাদেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং কম পরিচিত ভাষাসমূহের একটি থেকে অপরটিতেও অনুবাদ করা হয়। যেমন সংস্কৃত উপনিষদের জার্মান অনুবাদ, পাকিস্তানের কবি আহমেদ ফয়েজের কবিতা উর্দু থেকে হাঙ্গেরীয় ভাষায় এবং অ্যারিস্টটলের দ্য কনস্টিটিউশন আরবিতে অনুবাদ করা হয়।
অর্থাৎ প্রকাশনা জগতে যেমন প্রতীচ্য সাহিত্য বা ইউরোকেন্দ্রিকতার প্রাবল্য দেখা যায়, তার তুলনায় বহু বিস্তৃত হয়ে পড়ে এর পরিধি। ১৯৮৫ সাল নাগাদ এতে প্রায় পঁয়তাল্লিশটি সাহিত্যের ৯০০-এর কাছাকাছি শিরোনামে অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তাতে পঞ্চাশটির মতো প্রাচ্যের ভাষা, বিশটির মতো ইউরোপীয় ভাষা, একইভাবে একাধিক আফ্রিকান ও আইসল্যান্ডিক ভাষা ও সাহিত্যকে রিপ্রেজেন্ট করে।
এতে এই কথা স্পষ্ট, এই সংগ্রহের জন্য রচনার নির্বাচন সহজ ছিল না; কিন্তু সাহিত্য বহু শত বছরের কিছু অপেক্ষাকৃত হালের; তাই মৌল মূল্যবোধকে প্রকাশ করা রচনার তালিকা করতে গেলে বিচিত্র শিরোনামে বিপুল সম্ভাবের সামনাসামনি হতে হয়; নির্বাচনের জন্য কিছু নীতিমালা স্থির করতে হয়; তাতে ব্যতিক্রমকে বাছাই করার জন্য সামান্যই অবকাশ থাকে। ইতোমধ্যে অনূদিত রচনাকে এই অনুবাদের জন্য নির্বাচিত করা হয় না এবং কম পরিচিত লেখকের জন্য নির্বাচিত হওয়াটা কমই ঘটে; এর কারণ এই সংগ্রহ এমন রচনার প্রতিনিধিত্বশীল উদাহরণ হাজির করতে চেয়েছে যা উপস্থিতভাবে ধারণাযোগ্য মানদণ্ড পূরণ করেছে।
তারপরেও এতে এক ধরনের আশ্চর্য করা উন্মোচনও রয়েছে – এমন লেখককে বাছাই করেছে যাঁরা পরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে, অনূদিত হওয়া রচনা বিশ্বসাহিত্যের অঙ্গনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।
বাস্তবে কীভাবে এই নির্বাচন হয় : প্রথমে সদস্য রাষ্ট্রগুলিতে ন্যাশনাল কমিশনস ফর ইউনেস্কো তাদের সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বশীল রচনার নাম প্রস্তাব করে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকেও এমন তালিকা চাওয়া হয়; সঙ্গে বিশেষ রচনার অনুবাদ প্রকাশেও আগ্রহী প্রকাশকদের থেকেও পরামর্শ চাওয়া হয়।
প্রকাশক ও ইউনেস্কোর মধ্যে যৌথ প্রকল্পও অন্যতম গুরুত্বের ছিল। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা অনুবাদের ব্যয় বহন করে, ইউনেস্কো প্রধানত প্রকাশক নয়; যৌথ প্রকাশনা ছাড়া প্রকাশনার এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। এই ধরনের প্রকাশনা ইংরেজি বা ফরাসি ভাষী পাঠকের কাছে পুরোপুরি অজানা কোনো সাহিত্যের রচনার অনুবাদকে প্রকাশ করা সহজ নয়।
অনেক পরে সিদ্ধান্ত হয়েছে ইউনেস্কোর নাম প্রকাশিত গ্রন্থটির প্রচ্ছদে সহযোগী প্রকাশকের পাশে ছাপা হবে। কখনো কনইসঁস দ্য ল’রিয়েঁ সিরিজ হিসেবে, কখনো গালিমার-ইউনেস্কো পেপারব্যাক নামে প্রকাশনা হয়। ফলে ইউনেস্কোর এই সংগ্রহ আন্তর্জাতিক, বহুভাষিক ও বহু সাংস্কৃতিক, কার্যত লাইব্রেরি অফ লাইব্রেরিজ। তাতে কবিতাকে বিশেষ আগ্রহ নিয়ে দেখা হয়; প্রকাশনা জগতে কবিতার স্থান সংকুচিত হলেও এই সংগ্রহ কবিতাকে মর্যাদার স্থান দেয়; বিচিত্র কবিতার শত সংকলন প্রকাশ করেছে।
এই সংগ্রহে আর্থিক সহযোগিতা করেছে অনুবাদের ব্যয় জুগিয়ে, জাপান, কোরিয়ার প্রজাতন্ত্র এবং বিভিন্ন ফাউন্ডেশন; সেই সঙ্গে অনুবাদকদের অর্থ সহযোগিতাও করে থাকে। অনুবাদের আশ্রয়ে এই প্রকল্প পরিচালিত হয়। জঁ ককতো এর মূল্যায়ন করেন, ‘আমাদের বিশ্বে পারস্পরিক উপলব্ধি অর্জন করা চরম শক্ত যেখানে ভাষা রচনাসমূহের মধ্যে অলংঘনীয় প্রতিবন্ধক হাজির করে; অনুবাদকে কেবল একটা বিয়ের চেয়ে বেশি কিছু বলতে হয়। তা ভালোবাসার যুগল গঠন করে।’
এই সিরিজেই প্রকাশিত হয় লা’রবর সঁ রাসিন ও ট্রি উইদাউট রুটস; প্রকাশের পরে বিশ্বের বিভিন্ন সাময়িকীতে তার প্রশংসা হয় এবং বিশে^র আরো ভাষায় অনূদিত হয়। উপন্যাসটি দেশবিভাগের পরে ১৯৪৮ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় এবং ১৯৬০ সালে ঢাকা থেকে দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এটি প্রথম প্রকাশের পরে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। ১৯৬১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কার লাভ করে উপন্যাসে। এই পুরস্কারের স্বীকৃতি ও ন্যাশনাল কমিশনস ফর ইউনেস্কোর পাকিস্তান শাখা উভয়ই এই মনোনয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। যে-কোনো বিচারেই তা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সেরা উপন্যাস। ফলে ভারতে প্রকাশিত হওয়ার এটি পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্বশীল উপন্যাস হিসেবে ইংরেজি ও ফরাসি অনুবাদে প্রকাশিত হয় যথাক্রমে ১৯৬৭ ও ১৯৬৩ সালে। এর পরের ইতিহাস রচনাটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভেরই ইতিহাস। বিভিন্ন সাময়িকীতে প্রকাশিত রিভিউ ও একাধিত ভাষার অনুবাদ তারই প্রমাণ।
লাল সালুর ইংরেজি অনুবাদে চারজন অনুবাদকের নাম উল্লেখ রয়েছে – কায়সার সাইদ, অ্যান মারি তিবো, জেফ্রি গিবন ও মালিক খৈয়াম। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ওয়ালীউল্লাহ নিজেই কায়সার সাইদ নামে অনুবাদের মূল খসড়া দাঁড় করান। তারপরে অন্যরা যুক্ত হয়। এটিই অন্যান্য অনুবাদের ভিত্তি হয়ে থাকবে। এভাবে নতুন উপসংহারসহ লাল সালুর রূপান্তরিত সংস্করণ ট্রি উইদাউট রুটস জন্ম নেয়।
লাল সালুর ফরাসি অনুবাদ প্রকাশিত হলে ১৯৬৩ সালে এবং তা ফ্রান্সের জাতীয় দৈনিক ও ফরাসি সাময়িকীগুলিতে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। লে নুভেল লিতেরেইর, ল্য ফিগারো লিতেরেইর, ল্য মঁদ, ফোর্সে নুভেল, ল্য প্রগ্রে দিমঁশ, বুলেত্যাঁ দ্য লেৎর, ল্য জুর্নাল দ্য জেনেভ, ল্য গ্যশ, আসপেক্তস দ্য লা ফঁস, অরিয়েঁ, ল্য ক্রোয়া, বুলেত্যাঁ দ্য ক্রিতিক দ্যু লিভর রাদিও ল্যসান, ল্য লিভর বেলজিক প্রভৃতি সাময়িকী ব্যাপকভাবে প্রশংসা করে। এই পরিচিতি ওয়ালীউল্লাহকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেয় এবং সে-পরিচয় তাঁর ইউনেস্কোতে নিয়োগের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রেখে থাকবে বলে ধারণা করা যায়।
চার.
এই সম্পর্ক এতটাই নিবিড় হয় যে ওয়ালীউল্লাহর কাছে কূটনৈতিক সার্ভিসের চেয়ে ইউনেস্কোর প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট হওয়াটা অধিক কাক্সিক্ষত বোধ হয়। শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে কাজ করতে থাকেন। ‘পাকিস্তানের ফেরিওয়ালা’র ভূমিকা ঝেড়ে ফেললেন। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের পক্ষ হয়ে কাজ করতে গিয়ে পক্ষ ত্যাগ করাটার পূর্বাভাস দেখা গিয়েছিল এই পর্বেই। তাই ইউনেস্কোর সঙ্গে মামলা চালালেও বা আপিল করলেও পাকিস্তানের চাকরিতে তাঁর মন উঠে গিয়েছিল। কিন্তু ইউনেস্কোর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটলেও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আস্থা রাখতে চেয়েছিলেন।
৮ই আগস্ট ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি থাকা অবস্থায় ইউনেস্কোর প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট হিসেবে নিযুক্ত হন; সংস্থাটির কমিউনিকেশন সেক্টরে মাসমিডিয়া বিভাগে নিয়োগ পান। এটি ছিল পি৫ পদে। এই পদে থেকে সময় সীমা এক্সটেনশন করে ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত চাকরি করেন। ওয়ালীউল্লাহ অভিযোগ করেন, কিছু সময় পরে তাকে প্রায় কোনো কাজই দেওয়া হয় না; বারবার তাগাদা দেওয়ার পরে স্বল্প মেয়াদে বা একদিনের উপযুক্ত অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হয়, যা তাঁর নিযুক্ত পদের অনুযায়ী নয় ও তাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মানানসই নয়। তাও দেওয়া হয় বারবার তাগাদা দেওয়ার পরে। তারপরেও তিনি সফলভাবে এই প্রবেশন পিরিয়ড সমাপ্ত করেন। তাঁকে কাজ না দিয়ে বসিয়ে রাখাকে নিজের জন্য অমর্যাদার বলে গণ্য করেন। এমন হওয়া সম্ভব ইউনেস্কো তাঁর কর্মসূচি সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল; বা ১৯৬৮-এর ছাত্র-বিক্ষোভের পরিস্থিতিতে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কাজের সম্ভাবনা প্রশ্নের সামনে পড়েছিল। এর বাইরেও অন্যতর সম্ভাবনা থাকতে পারে। তবে এই সময়েই অর্থাৎ এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর ১৯৬৮ তাঁর পারফরম্যান্স রিপোর্ট প্রতিকূল মূল্যায়নের সামনে পড়ে। এই ১৯৬৮ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর ১৫তম সাধারণ অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন। প্যারিসে ১৫ই অক্টোবর থেকে ২০শে নভেম্বর ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত সাধারণ অধিবেশনে ১২২টি সদস্যরাষ্ট্র যোগ দেয়; তার মধ্যে ৩৯টি আফ্রিকার রাষ্ট্র অন্তর্ভুক্ত ছিল; এর বাইরে বারবাডোস, মরিশাস ও ইয়েমেনকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়; ক্যামেরনের শিক্ষা,
শিল্প-সাহিত্যের মন্ত্রী ডব্লিউ এ এটেকি-বৌমোয়া সভাপতি নির্বাচিত হন। প্রথম একজন আফ্রিকান হিসেবে তাঁর প্রেসিডেন্টের ভাষণে আফ্রিকার মৌখিক সাহিত্য সংস্করণ করার আহ্বান করেন এবং এজন্য উন্নয়নশীল দেশসমূহকে উন্নত দেশের আরো বেশি সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার উল্লেখ করেন। পরের বছর ৫ই মে ওয়ালীউল্লাহ তাঁর শাখার ডিরেক্টর জেনারেলকে লিখিতভাবে অভিযোগ করেন তাঁকে ‘অড জব’ করতে দেওয়া হচ্ছে বলে তাঁর সামর্থ্য সম্পর্কে যথার্থ অভিমত তৈরির অবকাশ নেই। তিনি তাঁর চাকরির কর্তৃপক্ষের গোপনীয় মতামত সম্পর্কে অবহিত হয়ে থাকবেন; তাঁর কথায়, ‘I am compelled to wonder I have not been a victim of misunderstanding. I have learnt recently that my department considered me to be a ‘political’ appointment and that there was a strong resentment about my appointment’-এর কারণেই তার যোগ্যতা ও বঞ্চনা বস্তুনিষ্ঠভাবে মূল্যায়িত হতে পারেনি।
উপরওয়ালার সঙ্গে এই টানাপড়েন চলছিল; সরাসরি তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। এবং তাঁর চাকরিকাল বারদুয়েক বাড়ানো হয়। প্রথম দফায় সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ ও পরের ধাপে ১৪ই আগস্ট ১৯৭০ পর্যন্ত। এরই মধ্যে ১৪ই আগস্ট ১৯৬৯ সালে ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইনস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফ কালচারাল টুরিজম বিভাগে তাঁকে বদলি করা হয়। পরের বছর ২১শে মে তাঁকে নতুন সৃষ্ট একটি পদে বদলি করা হয় তাঁর পুরনো পোস্টটি স্থগিত করে দিয়ে। ১৯৭০ সালে জানুয়ারিতে তাঁর দপ্তরের নতুন নাম হয় প্রটেকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফ কালচারাল হেরিটেজ এবং সোশ্যাল সায়েন্সেস, হিউম্যান সায়েন্সেস অ্যান্ড কালচার সেক্টরের অধীনে ন্যস্ত হয়। ১২ই জুলাই ১৯৭০-এ ওই দপ্তরের এক কর্মকর্তা ওয়ালীউল্লাহকে জানান, তাঁর পদটি বিলুপ্ত হয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে কোনো পদ খালি হবে কি না নিশ্চিত নয়। জুন ১৯৭০ সালে ওই কর্মকর্তা ওয়ালীউল্লাহর জন্য জরুরি ভিত্তিতে কোনো কাজের ভার দিতে বলেন; তাঁকে সংস্থাটির সাধারণ অধিবেশন সচিবালয়ে প্রোগ্রাম কমিটির সচিব হিসেবে বদলি করা হয় অক্টোবর/ নভেম্বর ১৯৭০ নাগাদ; অক্টোবর ১৯৭০ সালে তাঁকে জানিয়ে দেওয়া হয়, ৩১শে ডিসেম্বর ১৯৭০-এর পরে তাঁকে চাকরিতে থাকা বলে গণ্য করা হবে না। এই ধরনের অমর্যাদাকর বদলিতে ওয়ালীউল্লাহ সম্মত হননি স্বাভাবিকভাবেই। ১৯৭০ সালের ২০শে নভেম্বর ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা তাঁকে জানিয়ে দেন – এই বিষয়ে ওয়ালীউল্লাহর দরখাস্ত তাঁরা পেয়েছেন এবং তিনি যোগদানে সম্মত না হলে স্টাফ রুল ১০৪.৬ (বি) অনুসারে নির্দিষ্ট মেয়াদে নিয়োগের নিয়ম অনুসারে চাকরিচ্যুত করা হবে। লক্ষ করা যায়, পি৫ গ্রেডের মতো আন্তর্জাতিক নাগরিকদের মধ্যে নিয়োগকৃত এই পদে খণ্ডকালীন চাকরির নিয়মে ছাঁটাই বরা হয়। ইউনেস্কোর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার চাকরিতে প্রাপ্য মর্যাদার এই লঙ্ঘনকে চ্যালেঞ্জ করলেন ওয়ালীউল্লাহ।
১১ই ডিসেম্বর ১৯৭০-এ তিনি প্রতিবাদ করেন; ১২ই জানুয়ারি ১৯৭১-এ এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকে; এর বিরুদ্ধে ওয়ালীউললাহ আপিল করেন; আপিল বিভাগ দুই কারণে তাঁর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মেয়াদের চাকরির শর্ত অপ্রযোজ্য বলে গণ্য করেন : তার একটি হলো – মূল নিয়োগের শেষ সময়সীমা ‘না বাড়নো হয়েছে বা না পরিবর্তন করা হয়েছে সেভাবে ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ পর্যন্ত এক মাসের জন্য ব্যতিক্রম ছাড়া’ এবং তিনি একাধিকবার বদলি হয়েছেন। তাই আপিল বিভাগ রায় দেন তাঁকে সংস্থাটির চাকরিতে রাখা আদৌ সম্ভবপর না হলে তাঁকে ১৯৭২ সালের ৩১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত চাকরির সময়সীমা বৃদ্ধি হিসেবে ধরে নিয়ে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের ২৩শে আগস্ট ডিরেক্টর জেনারেল তাকে অবহিত করেন আপিল বিভাগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তাঁরা অসমর্থ; তবে এক গ্রেড নিচে পি৪ পদে ব্যাংককে ইউনেস্কো অফিসে এক বছরের জন্য নিয়োগ দিতে পারে। এই নিয়োগ শুরুতে দুই বছরের হবে এবং ওয়ালীউল্লাহর আগের নিয়োগের সমানই বেতন হবে।
একে অনাকাক্সিক্ষত পদাবনতি গণ্য করে ওয়ালীউল্লাহ অ্যাডমিনস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেন ৩০শে অঅগস্ট ১৯৭১-এ। তাঁর আবেদন ছিল ইউনেস্কোর সিদ্ধান্ত দুটি কোয়াশ করার এবং তাঁর মূল নিয়োগ অনুসারে চুক্তির নবায়ন। তা অসম্ভব হলে ওই সিদ্ধান্তের দিনে প্রাপ্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়। এই ক্ষতিপূরণ হবে মূল নিয়োগের সময়ে ধার্য বেতনের দুই বছরের বেতনের সমান। সংস্থাটি আর্থিক সংকটে পড়লে তা যেন এক বছরের হয়। এর বাইরে মামলার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৬০০০ ফ্রাঁ দাবি করেন।
এই বছরের ১০ই অক্টোবর তিনি মারা যান; তাঁর পক্ষে অ্যান মারি আবেদনটি চালু করেন একই দাবিগুলোসহ। এই মামলার রায় তাঁর স্বাস্থ্যভঙ্গের কারণ হয়েছিল জানিয়ে বাড়তি ক্ষতিপূরণসহ। সংস্থা এসব দায় অস্বীকার করেও কোনো রকম ক্ষতিপূরণে সম্মত হয় না।
অ্যাডমিনস্ট্রেটিভ ট্রাইব্যুনালের ২৮তম সাধারণ অধিবেশনে হওয়া এই রায় (১৯০নং) ওয়ালীউল্লাহ ট্রাইব্যুনাল নামে পরিচিত। তাতে ওয়ালীউল্লাহর মূল নিয়োগকে খণ্ডকালীন হিসেবেই গণ্য করা হয়, স্টাফ রেগুলেশনের আওতার বাইরেই গণ্য করা হয়। তাতে অ্যাসাইনমেন্ট প্রদান ও বদলিকে নিয়মসিদ্ধ হিসেবেই দেখা হয়। সময়সীমা বর্ধিত করার কোনো রকম প্রতিশ্রুতি অস্বীকার করে এবং প্রস্তাবিত পি৪ পদটিকেও পদাবনতি গণ্য করে না, নতুন নিয়োগ হিসেবে দেখে। তাই অ্যান মারির আবেদনও খারিজ হয়।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তাঁর জীবনের শেষ কয়েক বছরে ইউনেস্কোর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার তরফে এই ভাবে বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হন। হতে পারে বিদ্যমান পরিস্থিতি, বা তার একজন বাংলাদেশি বা এশীয় পরিচয় এই বঞ্চনা ও ছলনার শিকার করেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাটি এক্ষেত্রে সংকীর্ণ ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মতোই আচরণ করেছে। আপিলের রায় ওয়ালীউল্লাহর পক্ষে যাওয়া নিশ্চিত দেখায় তাঁর ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার পাওয়া যায়নি।
তাঁর মৃত্যু তিথিতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
তথ্যসূত্র
১. সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, সৈয়দ আকরম হোসেন, ঢাকা, ১৯৮৮।
২. সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জীবন ও সাহিত্য, সৈয়দ আবুল মকসুদ, ঢাকা, ২০০৮।
৩. সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্যে পাশ্চাত্য প্রভাব, শামসুদ্দিন চৌধুরী, ঢাকা, ২০০৭।
৪. ওয়ালীউল্লাহ : হাই হাজব্যান্ড অ্যাজ আই স হিম, অ্যান মারি ওয়ালীউল্লাহ, ঢাকা, ২০২২।
৫. ইউনেস্কো কুরিয়ার।
৬. ইন্টারনেট : https://webapps.ilo.org/dyn/triblex/triblexmain.fullText?p_lang=en&p_judgment_no=190&p_language_code=EN.


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.