মঙ্গলবার যথারীতি সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এসেছিলেন কালি ও কলম অফিসে। ছিলেনও অনেকক্ষণ। তারপর বেলা ১টার দিকে চলে গেলেন – যেমন সবসময় যান। এমনটাই হয়ে আসছে। আমরা জানতাম – আগামী মঙ্গলবার মনজুর আবার আসবেন। কালি ও কলমের লেখাগুলি দেখবেন। যথেষ্ট কাটাছেঁড়া করবেন। ভুলগুলি ঠিক করে দেবেন। যেমনটা তিনি নিয়মিত করেন।
এইটিই ছিল মনজুরের বিশেষত্ব। যখন যে-কাজ করতেন – দায়িত্বের সঙ্গে করতেন। কোনো ফাঁক রাখতেন না। সে-কাজ যত বড় বা যত ছোটই হোক না কেন। কাউকে সাহায্য করার প্রয়োজন হলে আগ বাড়িয়েই সেটা করতেন। একজন দায়িত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে এটিই ছিল তাঁর বিশেষত্ব। তবে তিনি তো গড়পড়তা মানুষের মতো ছিলেন না। ছিলেন বিশেষ মানুষ। শিক্ষক হিসেবে, লেখক হিসেবে। এবং তার যা যা কিছু বলা যায়।
বৃহস্পতিবার রাতে ছোট বোন আলপনা ফোন করে বলল : ‘দাদা, আপনি কি জানেন, মনজুরুল ইসলাম স্যার তো অসুস্থ। হসপিটালে।’
পরদিন খবরটা দেখলাম পত্রিকার পাতায়। কিন্তু তেমন শঙ্কিত হইনি। নিশ্চয়ই ভালো হয়ে কয়েকদিনের মধ্যে আবার এসে যাবেন আমাদের সঙ্গে। না, আর হলো না। মনজুর আর আসবেন না। কালি ও কলম অফিসে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আর কখনো আসবেন না। আমাদের মঙ্গলবারের দেখা-সাক্ষাৎ, আলাপ-আলোচনা, আড্ডা আর কিছুই তেমনভাবে হবে না।
অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের অবর্তমানে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম কালি ও কলমের সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন। আবুল হাসনাতের অবর্তমানে সম্পাদকের দায়িত্ব যেমন আমাকে পালন করতে হচ্ছিল। তবে মনজুরের সঙ্গে আমার আগে থেকে পরিচয় ছিল। ঘনিষ্ঠতাও। আমেরিকান ঔপন্যাসিক টম উলফের লেখা দি রাইট স্টাফ উপন্যাসটির বঙ্গানুবাদ করেছিলাম আমি। অনেক পরে মনজুর আমাকে বলেছিলেন, আমেরিকান সেন্টার বইটি অনুবাদের জন্য তাঁকেই প্রথমে অনুরোধ জানিয়েছিল। বইটি হাতে পাওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন যে, বিজ্ঞানের কোনো ছাত্র যদি সেটি অনুবাদ করেন তাহলে ভালো হয়। তিনি আমেরিকান সেন্টারকে আমার কথা বলেছিলেন। – আমি তা জানতাম না। কিন্তু জানার পর মনে হয়েছিল – এটিই মনজুরের স্বভাব। অন্যের কাজের গুণকে তিনি সবসময় গুরুত্ব দিতেন। স্বীকৃতিও। যা সাধারণত আমরা দিতে চাই না তেমন। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম মঙ্গলবারে আর আসবেন না কালি ও কলম অফিসে। এটিই সত্য। বাস্তব। এখন থেকে তিনি শুধু স্মৃতি হয়ে থাকবেন তাঁর আপনজনদের কাছে। এই তো মানুষের জীবন। আমাদের সবারই!


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.