অনুবাদ : সুব্রত বড়ুয়া
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, দর্শনশাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত, লেখক ও রাজনীতিক অধ্যাপক হুমায়ুন কবির ১৯৬৭ সালে আমন্ত্রিত হয়ে আমেরিকার ম্যাডিসনের ইউনিভার্সিটি অব ভিসকনসিন-এ ‘টেগোর মেমোরিয়াল লেকচার’ প্রদান করেন। তাঁর এই চারটি বক্তৃতা পরবর্তীকালে ১৯৬৮ সালে The Bengali Novel নামে কলকাতা থেকে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। এটিও মোট চারটি অংশে উপস্থাপিত হয়েছে। সে অংশগুলি হলো যথাক্রমে : (১) Bankimchandra and the birth of the Bengali Novel; (২) Rabindranath Tagore; (৩) Sarat Chandra Chatterjee and the Realistic Novel; এবং (৪) The Novel in Contemporary Bengal। হুমায়ুন কবিরের জন্ম ১৯০৬ সালে, মৃত্যু ১৯৬৯ সালে।
কালি ও কলম-এর এই সংখ্যায় গ্রন্থটির প্রথম অংশটির বঙ্গানুবাদ পত্রস্থ করা হলো।
গল্প বলার বিষয়টি প্রায় মানুষের আবির্ভাবের মতোই পুরোনো। সভ্যতার সূচনার পূর্বে, আদিম মানুষেরা দিনের বেলায় শিকারকার্যে ব্যস্ত থাকত, রাত নেমে এলে তারা শিকারজীবী প্রাণীদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য দলবদ্ধভাবে কোনো গুহা বা অন্য কোনো আশ্রয়স্থলে আশ্রয় নিত। শিকারজীবী প্রাণীদের দূরে সরিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে আগুন জ্বালিয়ে রাখা হতো এবং স্ত্রী-পুরুষ সকলেই সেই আগুনের চারপাশে জড়ো হতো উষ্ণতা, নিরাপত্তা ও সঙ্গলাভের জন্য। নারীরা তাদের শিশুদের ঘুমিয়ে না পড়া পর্যন্ত ব্যস্ত রাখার জন্য গল্প বানিয়ে বলতে থাকত অথবা নিছক আনন্দলাভের জন্য নিজেরা গল্পগুজব করত অথবা ঝগড়া-বিবাদ করত নিজেদের মধ্যে। পুরুষেরা সময় কাটানোর জন্য গল্প তৈরি করত অথবা কখনো কখনো বীরত্ব ও সাহসিকতার মোড়কে পুরে নিজেদের সেদিনের রোমহর্ষক ঘটনাগুলি বর্ণনা করত। এভাবেই জন্ম হয়েছিল গল্পবলিয়ের গল্প বলার শৈল্পিক দক্ষতা এবং তখন থেকেই এটি হয়ে উঠেছিল বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও ব্যাপকভাবে সমাদৃত শিল্পমাধ্যম।
পুরুষ ও নারীদের আগুনের পাশে বসে গল্প বলার এসব সরল কাহিনিই কালক্রমে হয়ে উঠেছিল শিল্পের একটি জটিল ধরন। সেগুলির কেন্দ্রে ছিল মানুষের জীবন ও কাজ এবং সেগুলি পরতে পরতে জড়িয়ে গিয়েছিল তাদের ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলির সঙ্গে। সেগুলির মধ্যে ছিল মানুষের কল্পনায় যতটা সম্ভব সেই পরিমাণ বৈচিত্র্য রূপ গ্রহণ করে সেগুলি হয়ে উঠেছিল আরো অধিক জনপ্রিয়। যেখানে প্রকৃতি অনুকূল ছিল সেসব স্থানে এই শিল্পপ্রকরণটির বিকাশ হয়েছিল আরো বেশি দ্রুততার সঙ্গে এবং বাঙলা ছিল সেসব সৌভাগ্যবান অঞ্চলগুলির মধ্যে অন্যতম যেখানে তা ঘটেছিল। এমনটি ঘটার পেছনে যেসব কারণ ছিল সেগুলি খুঁজতে যাওয়ার জন্য খুব বেশি দূরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। আমাদের ইতিহাসের শুরু থেকেই বাঙলা ছিল প্রধানত একটি কৃষিকেন্দ্রিক দেশ। এর জমি উর্বর এবং মানুষেরা তাদের পানির সরবরাহের জন্য প্রধানত নির্ভর করে বর্ষাকালের বৃষ্টির ওপর। এর ফলে তাদের কাজ হয়ে পড়ে ঋতুভিত্তিক। তাই যখন জমিতে চাষ দিতে হয় এবং বীজ বুনতে হয় কেবল তখনই বেড়ে যায় তাদের কাজের চাপ। এর পরে দীর্ঘ একটা সময় ধরে তাদের আর তেমন কোনো কাজ থাকে না, কেবল প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ এবং রোপিত বীজ বা চারা পাকা শস্য না হয়ে ওঠা পর্যন্ত। এভাবে দিনের পর দিন ও সপ্তাহের পর সপ্তাহ অলস সময় কাটাতে হয় বলে গড়পরতা গ্রামবাসী জীবন, মৃত্যু ও ভাগ্যের ভাবনায় জড়িয়ে পড়ত এবং সাধারণত কোনো কোনো ধর্মীয় বা নৈতিক বিষয় নিয়ে নানারকম গল্প তৈরি করত। তাদের তৈরি গল্পগুলোর মধ্যে যেমন থাকত শিশুদের শোনানোর মতো গল্প, তেমনি থাকত বুদ্ধি ও হাস্যরসের গল্প অথবা রাজা ও রাজপুত্রদের বীরত্বের কিংবা প্রণয় ও পরিণয় সম্পর্কিত দুঃসাহসিক অভিযানের কাহিনি। গল্পগুলি সবই প্রাণবন্ত এবং উপভোগ্য, কিন্তু অধিকাংশ গল্পেই ছিল বাস্তবসদৃশতার অভাব এবং আমরা আজ যাকে উপন্যাস নামে জানি সেগুলির সঙ্গেও সম্পর্ক নিতান্ত ক্ষীণ।
উপন্যাসের একটি অপরিহার্য চরিত্র হচ্ছে, এতে অবশ্যই অন্তর্দৃষ্টি ও পরিকল্পনা – উভয়ই থাকতে হবে। এর মূল নিহিত থাকবে সমাজের মধ্যে এবং উপন্যাসে শিল্পের অন্য যে-কোনো মাধ্যমের চেয়ে অধিকতর বিশ্বস্ততার সঙ্গে সামাজিক সচেতনতার বিকাশের অবস্থা প্রতিফলিত হবে। ভারতে সামাজিক জীবন ছিল অপরিহার্যভাবে ঐতিহ্যবাহী ও রক্ষণশীল। এখানে নতুনত্ব বা অ্যাডভেঞ্চারের সুযোগ ছিল সামান্য। এই বাস্তবতা এবং নারী-পুরুষের বিচ্ছিন্নতা হলো ভারতীয় সাহিত্যে উপন্যাসের বিলম্বিত আগমনের কারণ এবং বাঙলা সাহিত্যও এর ব্যতিক্রম ছিল না। এই বিলম্বিত সূচনা ও বিকাশ কোনো বিস্ময়ের ব্যাপার নয়, যেহেতু উপন্যাসের জন্য প্রয়োজন একটি স্ব-সচেতন ও পরিশীলিত সমাজ, যেখানে ব্যক্তিগত মর্যাদা ও অধিকারসমূহের স্বীকৃতি থাকে। বুদ্ধের সময়ে বৈদগ্ধ্য বা পরিশীলিততার বিকাশ ঘটা সত্ত্বেও এই স্বীকৃতি তেমন জোরালো ছিল না। সেখানে অবশ্য জাতকের গল্পগুলি ছিল, যেগুলির মধ্যে কিছু গণতান্ত্রিক মনোভাব অবশ্যই ছিল, কিন্তু বাস্তবতা ও অলৌকিকতা সেগুলিতে পরস্পর এমনভাবে মিশ্রিত ছিল যে, সেগুলিকে উপন্যাসের পূর্বসূরি হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। এছাড়াও সেগুলি অপরিহার্যভাবে উপদেশাত্মক এবং সেজন্য সেগুলি উপন্যাসের মৌলিক ধারণা থেকে ভিন্ন। ভারতের অন্যান্য অংশের মতো বাঙলাকেও তাই বাঙলা উপন্যাসের সূত্রপাতের জন্য ইউরোপীয় সাহিত্যের অভিঘাতের অপেক্ষা করতে হয়েছে।
অতএব এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই যে, বাঙলা উপন্যাসের সূচনা ও বিকাশের জন্য এত দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়েছে। অথচ বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, বাঙলায় ধর্মনিরপেক্ষ কাহিনির আবির্ভাব ঘটেছে মধ্যযুগে। এর কারণ ছিল ইসলামের অভিঘাত এবং পাঠান শাসকদের বাঙলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা। তাঁরা শুধু মহৎ সংস্কৃত মহাকাব্যগুলি ও ফারসি ধর্মনিরপেক্ষ কাহিনিগুলির বঙ্গানুবাদকেই উৎসাহিত করেননি বরং সংস্কৃত ও ফারসি ভাষায় রচিত ধর্মনিরপেক্ষ গল্পগুলির অনুবাদকেও উৎসাহ জুগিয়েছেনে। তাঁরা ব্রাহ্মণবাদের শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকারের মাধ্যমে পরোক্ষভাবেও সাহিত্যরচনার এই প্রয়াসকে সহায়তা দান করেছেন। এভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রভাবমূলক কর্তৃত্ব শিথিল হয়ে পড়লে, বহু ধরনের জনপ্রিয় ধর্মের আবির্ভাব ঘটে এবং তা লোকধর্মের সাহিত্য নামে অভিহিত হতে পারে – এমন সাহিত্যকর্ম হিসেবে রূপ লাভ করে। এই সাহিত্যকর্মের প্রধান বিবেচ্য নিহিত সাধারণ মানুষের জীবনের যে বিশদ চিত্র তা তুলে ধরে তাতে। এতে দেব-দেবীর মাহাত্ম্যকীর্তন রয়েছে, তবে প্রায়শ সে-দেবতা একজন বর্ধিষ্ণু কৃষক ছাড়া অন্য কেউ নন এবং দেবীর মধ্যে চিত্রিত হয়েছেন যিনি তিনিও গ্রামবাংলার নিবেদিতচিত্ত গৃহবধূ ছাড়া অন্য কেউ নন। যে-কাব্যে সাধারণ মানুষের আনন্দ-বেদনার কথা সরল ও ধর্মনিরপেক্ষভাবে বর্ণিত হয়েছে সেই ধর্মীয় লোককাব্য থেকে এর দূরত্ব সংক্ষিপ্ত একটি ধাপ মাত্র। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে মাত্র সাম্প্রতিককালে এই সাধারণ মানুষ সম্মানের আসন পেয়েছে। একথা উল্লেখযোগ্য যে, ষোড়শ অথবা সপ্তদশ শতকেই বাঙলায় এই গণতান্ত্রিক চেতনাকে ধারণ করে রচিত হয়েছে বহু লোককাহিনি।
সমভাবে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, সেই দ্রুততা, যে দ্রুততার সঙ্গে বিকাশ ঘটেছে বাঙলা উপন্যাসের, পাশ্চাত্যের সাহিত্যের প্রভাবে যার সূচনা ঘটে। আগেকার দিনে, এশিয়া অথবা অন্যত্র যেখানেই হোক না কেন, গল্পের বিষয় ছিল প্রধানত ঘটনা। সেগুলির আগ্রহের বিষয় কেন্দ্রীভূত ছিল ঘটনায়। কদাচিৎ কোনো চরিত্র বা ব্যক্তিবিশেষের ওপর আগ্রহ কেন্দ্রীভূত থাকত। শিল্প-কারখানা স্থাপন, গণতন্ত্র ও ধর্মীয় উদারতার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে ইউরোপে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে থাকে। শিল্পের একটি বিশেষ প্রকরণ হিসেবে উপন্যাসের আবির্ভাব ছিল যুগপৎ এমন একটি ঘোষণা যে, একক ব্যক্তি দাবি জানাচ্ছে দল থেকে বাইরে আসার স্বাধীনতার এবং জোর দিচ্ছে তার ব্যক্তিগত জীবনের অধিকারের ওপর। পশ্চিমের এই শিল্পরীতির বিকাশের দ্বারা প্রভাবিত ভারতীয় সাহিত্যের মধ্যে বাঙলাই ছিল প্রথম এবং বিকাশের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য দ্রুততা প্রদর্শন করেছিল বাঙলাই। বাঙলা কবিতায়ও এর অভিঘাত এসে পড়েছিল এবং দ্রুত তা পৌঁছে গিয়েছিল বিশ^মানে। এর কারণ, বাঙলা কাব্যের রয়েছে এক সুদীর্ঘ ঐতিহ্য এবং এমনকি এর আগেও তাতে ছিল সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন বহু গীতিকবিতা। সে-তুলনায় উপন্যাসের আগমন ঘটেছে বিলম্বিত আগন্তুক হিসেবে এবং সন্দেহ রয়েছে, এমনকি আজও, বাঙলা উপন্যাস বিশ^মানের পর্যায়ে পৌঁছাতে পেরেছে কি না।
উপন্যাস, অতএব, অনিবার্যভাবে শিল্পের একটি আধুনিক মাধ্যম এবং ইউরোপে একটি অধিকতর গণতান্ত্রিক মনোভাব পরিব্যাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত এর আবির্ভাব ঘটত না। রেনেসাঁস ও সংস্কার-আন্দোলন পুরোনো সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিসমূহ ভেঙে না ফেলতে সহায়তা জুগিয়েছিল এবং ব্যক্তিসত্তার বিকাশে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। ইউরোপীয় অভিঘাত ভারতের ক্ষেত্রে অনুরূপ অবস্থা সৃষ্টিতে সহায়ক হয়েছিল এবং বাঙলায় সে-পরিবর্তন হয়েছিল সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী। অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাঙলায় নবাব, রাজা ও সাধারণভাবে সামন্ত অভিজাততন্ত্রের ক্ষমতা ও মর্যাদার পতন ঘটেছিল। তাঁদের অবস্থান ধীরে ধীরে গ্রহণ করেছিল একটি নতুন শ্রেণি, যার সদস্যরা তাদের নিজেদের সমৃদ্ধির জন্য নির্ভর করেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ওপর। এর প্রতিফলন দেখা যায় দেওয়ান, বণিক, মুৎসুদ্দি ও বাড়িওয়ালাদের ক্রমবর্ধমান সমৃদ্ধির মধ্যে, যাদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল বাঙলার নব্য ধনিক শ্রেণি। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে এক নতুন শ্রেণির জমিদারেরও উদ্ভব ঘটে, যা সূচিত করে বিপুলসংখ্যক মধ্যস্বত্বভোগী সৃষ্টির মাধ্যমে মধ্যবিত্ত শ্রেণির দ্রুত প্রসার। মুদ্রণযন্ত্র স্থাপনের ফলে এই নতুন গড়ে উঠতে থাকা শ্রেণির চাহিদাপূরণে বইপুস্তক সরবরাহের সুযোগও সহজ হয়ে ওঠে। এর ফলে উপন্যাসের বিকাশের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়, যা নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক মনোভাব সৃষ্টির পক্ষে অপরিহার্য। এটিই সামন্ততান্ত্রিক সমাজ থেকে দূরে সরে যাওয়া ও এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছিল। নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণিগুলি জোর দিয়েছিল এবং মানুষের মর্যাদার উপর। অতএব এটিই স্বাভাবিক যে, তাদের প্রধান সাহিত্যপ্রকরণ উপন্যাসের বিষয় হওয়া উচিত, আগেকার দিনের গল্পকাহিনির নায়ক রাজপুত্র ও রাজারাজড়াদের বিপরীতে, সাধারণ মানুষজন। উপন্যাসে যেহেতু সাধারণ মানুষের কথাই বলা হয় অতএব ঔপন্যাসিককে অবশ্যই তীক্ষè পর্যবেক্ষণশক্তির অধিকারী হতে হবে, যে-শক্তির দ্বারা একজন ব্যক্তিকে অপর একজনের থেকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায়। এর ফলে, জীবন যেহেতু অধিকতর স্থিত হয়ে আসে এবং অসাধারণ ঘটনা ঘটার সুযোগ বিরল হয়ে ওঠে, ঔপন্যাসিককে অবশ্যই জীবনের ক্ষুদ্র ঘটনাগুলিকে আকর্ষণীয় ভাবে তুলে ধরার ক্ষমতার অধিকারী হতে হয়।
এটি কোনো দুর্ঘটনা নয় যে, উপন্যাসের বিকাশ সব দেশে সম্পর্কিত ছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণির গড়ে ওঠার সঙ্গে। শিল্পবিপ্লবের পূর্বে সমাজ বিভক্ত ছিল অভিজাত শ্রেণি ও শ্রমজীবী শ্রেণি প্রধানত এই দুই শ্রেণির মধ্যে। অভিজাত শ্রেণি, তাঁরা সামন্তপ্রভু অথবা ব্যবসায়ী শ্রেণির সদস্য যা-ই হোন না কেন, তাঁদের প্রিয় সাহিত্যপ্রকরণ হিসেবে বিকাশ ঘটিয়েছিলেন মহাকাব্যের উচ্চ শ্রেণির নারী ও পুরুষদের প্রেমপরিণয়ভিত্তিক রোমান্টিক সাহিত্যকর্মের। একইভাবে শ্রমজীবী মানুষদের, যাঁদের মধ্যে ছিলেন শুধু কৃষক ও কারুশিল্পীরাই নন, বরং প্রজাসাধারণ ও ক্রীতদাসেরাও, নিজস্ব সাহিত্যপ্রকরণ ছিল লোককাহিনি ও লোকগাথা। এই লোকসাহিত্য প্রায়শ ছিল বাস্তব জীবনের অধিকতর কাছাকাছি এবং তাতে একধরনের জাতিতত্ত্বগত উপাদানও থাকত। উভয় ধরনের সাহিত্যেরই অবশ্য বৈশিষ্ট্য ছিল উদ্দাম কল্পনা, যেখানে প্রাকৃতিক ও অতিপ্রাকৃতের মধ্যেকার ব্যবধান অবশ্যই প্রায়শ বিবেচনার মধ্যে থাকত না। আমাদের অবশ্যই ভুলে যাওয়া উচিত হবে না যে, এটি ছিল সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের কোনোরূপ গুরুত্বপূর্ণ অভিঘাত সৃষ্টির পূর্বেকার বিশ্বাসকেন্দ্রিক যুগ।
প্রাকৃতিক নিয়মসূত্রাদি সম্পর্কে সীমিত জ্ঞান এবং ততোধিক সীমিত অনুধাবন মানুষকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করত এমনসব শক্তির উপর যা ছিল অভিজ্ঞতা ও সাধারণ বিবেচনার পরিধির বাইরে এবং এর ফলে সেই সময়কার সাহিত্য ছিল যাকে আমরা এখন অসম্ভাব্যতা মনে করি সেরূপ অবাস্তবতায় পূর্ণ। উপন্যাসের বিকাশ সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক মেজাজে গড়ে ওঠা এবং মধ্যবিত্তের উদ্ভবের সঙ্গে। উপন্যাস অনিবার্যভাবে জীবনের একটি প্রতিবেদন এবং তা সেজন্যই দাবি করে ঘটনাবলির প্রতি বিশ্বস্ততা ও ব্যক্তিসত্তার প্রতি আগ্রহ। মহাকাব্য ও রোমান্টিক সাহিত্যে নায়ক-নায়িকারা হয়ে থাকে অ-সাধারণ গুণাবলির অধিকারী, যাদের সাক্ষাৎ বাস্তব জীবনে আমরা কদাচিৎ পেয়ে থাকি। তাদের অসামান্য দুঃসাহসিক ও বীরত্বপূর্ণ কাজগুলি দৈনন্দিন জীবনের গতানুগতিক অভিজ্ঞতার বাইরের বিষয়। এমনকি লোকসাহিত্যেও প্রকৃত জীবন থেকে অনেক দূরে সরে যাওয়ার প্রয়াস দেখা যায়। লোকসাহিত্যে মহাকাব্য ও রোমান্টিক কাহিনির অভিজাত সাহিত্যের চেয়ে অধিকতর বাস্তবতা থাকতে পারে, কিন্তু এতেও বাস্তবসদৃশ্যতার অভাব থেকে যায়। মধ্যবিত্ত শ্রেণিসমূহের উদ্ভব উচ্চতর শ্রেণিসমূহ ও শ্রমজীবী মানুষের মধ্যেকার সুস্পষ্ট পার্থক্য ভেঙে ফেলে। জীবন হয়ে দাঁড়ায় অধিকতর স্থিত ও গতানুগতিক। এই নতুন পরিবেশে সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ ধরে রাখা যেত কেবল সাধারণ মানুষ ও নারীদের ব্যক্তিক প্রকাশবৈশিষ্ট্যকে উজ্জ্বলতর আলোকদীপ্ততার মধ্যে নিয়ে এসে। ইউরোপে উপন্যাসের শ্রীবৃদ্ধি ঘটে মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এবং বাঙলায়ও যেহেতু একই ঘটনা ঘটে সেহেতু ভারতীয় ভাষাগুলির মধ্যে বাঙলাতেই প্রথম একটি স্বতন্ত্র ও সুনির্দিষ্ট সাহিত্যপ্রকরণ হিসেবে উপন্যাসের আবির্ভাব ঘটেছিল।
ব্রিটিশ শাসন সংহত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঙলায় জীবনের ধরন হয়ে দাঁড়ায় স্থিত ও গতানুগতিক। পুরোনো সামন্তবাদ ভেঙে পড়ে এবং ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাদের জায়গায় উদ্ভব ঘটে একটি আগ্রাসী ও উচ্চাভিলাষী শ্রেণির যাদের প্রধান আগ্রহ ছিল বস্তুগত সুখ ও পার্থিব জীবনের প্রতি। এভাবেই বাঙলা উপন্যাসের আবির্ভাবের মঞ্চ প্রস্তুত হয়েছিল এবং এটি গুরুত্বপূর্ণ যে, এর প্রথম খসড়াগুলি প্রকাশিত হওয়া উচিত ছিল জার্নাল ও সাময়িকপত্রের প্রতিবেদনগুলোর মাধ্যমে। যদিও সংবাদপত্রগুলির মূল বিবেচনার মধ্যে থাকে প্রধান প্রধান ঘটনা ও বিখ্যাত ব্যক্তিদের কথা, তবুও সেগুলি অপ্রধান ঘটনাসমূহ ও ব্যক্তিদের সম্পর্কে প্রতিবেদন ও তাদের বিবেচনার মধ্যে নিতে আনন্দ পেয়ে থাকে। তারা তাদের প্রতিবেদনের কাজগুলিকে আরো বেশি সুন্দর ও আকর্ষণীয় করার জন্য ক্রমাগত চেষ্টা করে যায় যাতে তাদের পাঠকেরা গতানুগতিক ঘটনাগুলিতেও আগ্রহ বোধ করতে পারেন। সমাচার দর্পণে ১৮২১ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি তারিখের সংখ্যায় প্রকাশিত ‘বাবুর উপাখ্যান’কে বাঙলা ভাষায় প্রথম আধুনিক উপন্যাসের সূচনারূপে বিবেচনা করা যেতে পারে। এই রচনাটি এবং পরবর্তীকালে ৯ই জুন তারিখের সংখ্যায় প্রকাশিত একটি নকশাধর্মী রচনায় যেসব উঠতি মধ্যবিত্তের সম্পদ অর্জনের সঙ্গে ব্রিটিশদের ব্যবসার সম্পর্ক ছিল তাদের সম্পর্কে তীক্ষè ব্যঙ্গধর্মী রচনা প্রকাশিত হয়। তারা স্বাভাবিকভাবেই যেমন তাদের ব্রিটিশ প্রভুদের অনুকরণ করতে উৎসাহী ছিল, তেমনি পুরোনো সামন্ত অভিজাতরা যে বিলাসিতা ও সামাজিক অগ্রাধিকার ভোগ করত সেসবের জন্যও লালায়িত ছিল। এই রচনার লেখক ছিলেন বাহ্যত প্রমথনাথ শর্মা, যিনি ‘নব বাবু বিলাস’ এবং ‘কলিকাতা কমলালয়’-এরও লেখক ছিলেন।
বাবুদের এই নকশা বর্ণনা করেছিলেন রেভারেন্ড জেমস লং ১৯৮৫ সালে ‘৩০ বছর আগে কলকাতার বাবুরা যেমন ছিলেন সেই রূপে বাবুদের উপর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যঙ্গাত্মক রচনা’ হিসেবে এবং সেটিই ছিল আলালের ঘরের দুলাল, হুতুম প্যাঁচার নকশা এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত-এর পূর্বসূরি। দু-বছর পর ১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রমথনাথ শর্মা লিখেছিলেন নব বাবু বিলাস। বহু বিদ্বান ব্যক্তিই মনে করেন যে, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ই উক্ত ছদ্মনামে সেটি লিখেছিলেন। যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে বাঙলার নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি সম্পর্কে তাঁর তীব্র আক্রমণাত্মক শ্লেষের ব্যাখ্যা এতে পাওয়া যায়। ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সমাচার চন্দ্রিকা এবং সংবাদ কৌমুদীর সম্পাদক। উভয় পত্রিকাই ছিল মারাত্মকভাবে হিন্দু গোঁড়ামির প্রতিনিধি। তিনি অবশ্যই বাবুদের তাঁর আক্রমণের লক্ষ্য হিসেবে খুঁজে পেয়েছিলেন এবং তা আরো বেশি সম্ভব হয়েছিল যেহেতু বাবুদের কতিপয় পাপমুক্তিমূলক বৈশিষ্ট্যও ছিল। বিলাসিতা ও উচ্ছৃঙ্খলতায় তাদের আসক্তি পাশ্চাত্য-শিক্ষার ফল ছিল না, বরং তা ছিল তৎকালে যারা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পরিচালনা করত সেই বেতনভোগী কর্মচারীদের নিম্নরুচি ও কুরুচিপূর্ণ জীবনযাপনের প্রত্যক্ষ প্রতিফলন। নব বাবু বিলাস-এর বাবু ছিল তৎকালীন ইয়ং বেঙ্গল-এর প্রতিনিধিদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং বস্তুত প্রায় বিপরীত। যাঁরা নিজেদের ইয়ং বেঙ্গল বলে পরিচয় দিতেন তাঁরা ছিলেন বিনা প্রশ্নে পাশ্চাত্যের মূল্যবোধকে গ্রহণ এবং ভারতীয় কুসংস্কার ও বিশ্বাসসমূহকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান ভিত্তিক রেনেসাঁসের পরমোৎসাহী অনুসরণকারী। তাঁরা আরো ছিলেন জাতীয়তাবাদে একনিষ্ঠ বিশ্বাসী, যাঁরা প্রাচীন ঐতিহ্যসমূহের নবমূল্যায়ন চাইছিলেন। নব বাবু বিলাস-এর বাবুর কোনো ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বা নৈতিকতাভিত্তিক নীতিসমূহের প্রতি সামান্য আগ্রহ ছিল অথবা কোনো আগ্রহই ছিল না। এই বাবুরা শুধু আগ্রহী ছিলেন অর্থোপার্জনের প্রতি এবং বিলাসিতাপূর্ণ ও কুরুচিকর জীবন নির্বাহের জন্য তা ব্যয় করার প্রতি।
এখানে মিসেস হারা ক্যাথেরিন মুলেন্স-রচিত করুণা ও ফুলমতী নামক উপন্যাসটির কথাও উল্লেখ করতে হয়, যেটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৫২ সালে এবং অধিকাংশ আধুনিক সমালোচকের মতে, প্রথম যথার্থ বাঙলা উপন্যাস। উপন্যাসটির লেখিকার অনেক বেশি কৃতিত্ব প্রাপ্য এজন্য যে, তিনি কেবল একটি বিদেশি ভাষার উপর দক্ষতাই অর্জন করেননি, বরং এদেশের সাধারণ মানুষের জীবনের গভীরেও প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ভাবব্যঞ্জকতার দিক থেকে ব্যাপকভাবে নীতিগর্ভ এই উপন্যাস বর্ণনা করে দুটি ভারতীয় পরিবারের কাহিনি, যারা খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেছিল। ফুলমতী একজন নিষ্ঠাবতী খ্রিষ্টান এবং তার পুরো জীবনই নিয়ন্ত্রিত হয়েছে উচ্চ নৈতিক আদর্শ দ্বারা। অন্যদিকে করুণা নামমাত্র খ্রিষ্টান। ফুলমতীর গভীর বিশ্বাস এবং করুণার বিশ্বাসের ঘাটতি তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে প্রতিফলিত হয়। এর কাহিনি খুব সাধারণ হতে পারে, কিন্তু বইটি এ-কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে, এটি ভাগ্য ও শ্লেষকে বাতিল করে দিয়েছে এবং সহানুভূতি ও অন্তর্দৃষ্টির সঙ্গে সাধারণ নারী-পুরুষের নিতান্ত সরল আনন্দ ও দুঃখের কথা বর্ণনা করেছে।
চার্লস ডিকেন্স কীভাবে বাবু বিষয়ের প্রথমদিককার হালকা ব্যঙ্গাত্মক রচনাসমূহকে প্রভাবিত করেছেন সে-বিষয়টি নিয়ে এখানে কিছুটা চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে। এসব রচনার সঙ্গে অবশ্যই বজ (Boz)-রচিত Sketches-এর সাদৃশ্য রয়েছে, তবে বাবুবিষয়ক দুটি নকশাই লেখা হয়েছিল ডিকেন্সের রচনাটি প্রকাশিত হওয়ার আগে। এই দুয়ের মেজাজও ভিন্নতর, কারণ ডিকেন্স এমনকি যখন ব্যঙ্গবিদ্রূপ করেছেন তখনো যাকে নিয়ে তিনি ব্যঙ্গ করেছেন তার প্রতি তাঁর নির্দিষ্ট কিছু সহানুভূতিমূলক অনুভূতি থেকে গেছে। অন্যদিকে শর্মার ঘৃণা ছিল সর্বাত্মক এবং কোনো মানবিক সহানুভূতি ব্যতিরেকে সীমাহীন ও নিরবচ্ছিন্ন। ডিকেন্সের প্রভাব পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বইটির উপর থাকার সম্ভাবনা যেটি বাঙলায় উপন্যাসের বিকাশের বিষয়টিকে চিহ্নিত করে। এটি হচ্ছে প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল (Of spoiled child of the Rich Family), যা পরবর্তী পর্যায়ে ‘আলাল’ নামে উল্লিখিত হয়েছে। এর প্রকাশকাল ১৮৫৭ সাল অনেক অর্থে প্রতীকী উল্লেখের চাইতে বেশি। ১৮৫৭ সাল ছিল ভারতে সামন্ত পুনর্জাগরণের চূড়ান্ত পরাজয়ের কাল এবং সেটি চিহ্নিত করেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিশুদ্ধ বেনিয়া রাজত্বের সমাপ্তি। এটি ছিল তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠারও বৎসর, যেগুলি দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনে নতুন একটি দিকের সূচনার পথও খুলে দিয়েছিল। ভারত তখন সচেতনভাবে অর্থনীতি, রাজনীতি ও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে আধুনিক যুগের দিকে পথচলা শুরু করেছিল। সমসাময়িক গ্রাম ও শহর, বিদ্যালয় ও আদালতের এবং সামাজিক ও পারিবারিক বিষয়াদির ক্ষেত্রে বাস্তবমুখী চিত্র রূপায়ণের মাধ্যমে আলাল বাঙলা সাহিত্যে একটি নতুন ও সুস্থ যুক্তিবাদিতা প্রদর্শন করে। এর নায়ক মতিলালের পাশ্চাত্য শিক্ষার কিছু ভড়ং ছিল যেহেতু সে মি. শেরবর্ণ নামে এক ব্যক্তির দ্বারা পরিচালিত বিদ্যালয়ের একজন ছাত্র ছিল একদা। অল্প কিছু ইংরেজি শব্দ এবং কিছু ইংলিশ রীতিনীতির সঙ্গে সামান্য পরিচিতির বাইরে তার মধ্যে কদাচিৎ পাশ্চাত্যের বিশ্বাস ও আদর্শসমূহের প্রভাব দৃষ্ট হয়। ১৮৬২ সালে প্রকাশিত কালীপ্রসন্ন সিংহের হুতুম প্যাঁচার নকশাও একইভাবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছত্রছায়ায় গড়ে উঠতে থাকা নব্য ধনী আধা-বণিক শ্রেণিকে নিয়ে রচিত একটি ব্যঙ্গাত্মক রচনা। নকশায় রয়েছে নব্য ধনীদের জাঁকজমক ও বিলাসিতার অসংযত ও সংস্কৃতিবর্জিত প্রকাশসহ ক্রমিক চিত্রসমূহ। তৎকালীন অবনতি-ঘটা ইউরোপীয় সমাজের বাহ্যিক প্রকাশের অনুকরণকারী নারী ও পুরুষদের ব্যঙ্গ করার কাজটি ছিল সহজ।
বাঙলা উপন্যাসের বিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রথমদিককার এসব কাজের নিশ্চয়ই একটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে এবং সেগুলি নিশ্চয়ই প্রাসঙ্গিক উল্লেখের দাবি রাখে। এই কাজগুলির মধ্যে আলাল-কে শ্রেষ্ঠ বলা যায় অনায়াসে। এতে শুধু রাস্তার মানুষজনের ভিড়গুলিই বর্ণিত হয়নি, বরং পারিবারিক জীবনের আকর্ষণীয় চিত্রও উপস্থাপিত হয়েছে। বেশ্যালয়গুলি এবং আদালতের কার্যকলাপের বর্ণনার মাধ্যমে সমাজের অসুন্দর দিকগুলিও বর্ণিত হয়েছে এতে। আবার কাব্যচর্চার প্রতিযোগিতা ও সামাজিক সমাবেশগুলির বিবরণ তুলে ধরার মাধ্যমে এতে তৎকালীন সাংস্কৃতিক জীবন সম্পর্কে কিছু অন্তর্দৃষ্টিমূলক অবলোকনও এতে তুলে ধরা হয়েছে। প্যারীচাঁদ মিত্র, এছাড়াও, পূর্ববর্তী একশ বছর ধরে বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলাহীন ও নৈরাজ্যকবলিত অবস্থার পর ব্রিটিশদের দ্বারা ধীরে ধীরে আইনশৃঙ্খলার যে বাতাবরণ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল সে-বার্তা প্রদানেও সফল হয়েছেন। মিত্র কোথাও কোথাও ডিকেন্সের ব্যঙ্গাত্মক রচনাভঙ্গির অনুসরণে কলকাতার জীবনধারার সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরারও চেষ্টা করেছেন। তাঁর কাজে অবশ্যই সেই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী হিন্দু সমাজ ও নব্য ধনিক সমাজ এবং বিদ্রোহী বাঙলার শক্তি ও দুর্বলতার ভারসাম্যমূলক চিত্র উঠে এসেছে।
তবে তাঁর তীক্ষè ব্যঙ্গবিদ্রূপ ও পর্যবেক্ষণের সুতীক্ষ্ণ শক্তি সত্ত্বেও প্যারীচাঁদ মিত্র বাঙলার প্রথম ঔপন্যাসিক হওয়ার দাবি করতে পারেন না। এর কারণ হলো, তাঁর মধ্যে গল্পবলিয়ের শিল্পকুশলতা ছিল না এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, তিনি কোনো চরিত্রকেই জীবন্ত করে তুলতে পারেননি। তারা রয়ে গেছে বিমূর্ত এবং কখনো ব্যক্তিসত্তা হয়ে উঠতে পারেনি যেমন হতে পেরেছে ডিকেন্সের বইয়ের চরিত্রগুলি, যারা গতানুগতিক ধরনের হওয়া সত্ত্বেও ব্যক্তিসত্তা রূপে বিকশিত হয়েছে, লেখকের জীবনের প্রতি অসামান্য ভালোবাসার কারণে। সম্ভবত প্যারীচাঁদ মিত্রের বাঙলা উপন্যাসের বিকাশে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল কথ্যভাষার সুসংগতির ওপর তাঁর অসাধারণ দক্ষতা। এক্ষেত্রে তিনি তাঁর সময়ের চাইতে অনেক বেশি অগ্রগামী ছিলেন এবং বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়সহ তাঁর সমকালীন সবাইকে অতিক্রম করে গিয়েছিলেন। তাঁর দৃষ্টান্ত সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা উপন্যাসের ভাষা হয়ে ওঠার জন্য বাঙলা উপন্যাসকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো প্রতিভার আবির্ভাবের জন্য।
পাশ্চাত্যের অভিঘাতের কারণে সৃষ্ট নতুন জীবনাদর্শ ও চিন্তাধারার সঙ্গে বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসা পুরোনো ঐতিহ্যবাহী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেকার সংঘাত উপন্যাসের জন্য সমৃদ্ধ উপাদান উপহার দেয়। অস্থির ও অধৈর্য নতুন প্রজন্ম মগ্ন ছিল পশ্চিমী সংস্কৃতির মাদকের উন্মাদনায়। অপরদিকে দৃঢ় মনোভাবাপন্ন পুরোনো প্রজন্মের লোকের এই নতুন চ্যালেঞ্জের বিরোধিতা করে; কিন্তু তারা বুঝতে পারছিল না কী তাদের করা উচিত। এসব সংঘাত উপন্যাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের জোগান দেয় এবং এসব উপাদানের কিছু কিছুর প্রতিফলন ঘটে প্যারীচাঁদ মিত্রের রচনায়। তবে উপন্যাস রচনার সময় তখনো হয়নি এবং প্যারীচাঁদ মিত্র ও তাঁর সমসাময়িকরা কেউই এসব চ্যালেঞ্জ দ্বারা সৃষ্ট অন্তর্গত সংঘাতের প্রতি যথার্থভাবে সচেতন হতে পারেননি। প্যারীচাঁদ মিত্রের প্রধান উপন্যাসের নায়ক মতিলাল সংস্কার কাজে ব্রতী হয় কোনো সচেতনতার সংকট থেকে নয়, বরং বাইরের পরিস্থিতির চাপ থেকে। এই সময়কার কোনো লেখকের লেখাতেই জীবনের দীর্ঘ বিস্তার ও বিরাটত্বের বিষয়ে কোনো সচেতনতা দৃষ্ট হয় না। তাঁরা আচ্ছন্ন থাকেন দৈনন্দিন জীবনের তুচ্ছ ঘটনাবলি নিয়ে, কিন্তু জীবনকে তাঁরা সুস্থিত ও সামগ্রিকভাবে দেখতে ব্যর্থ হন।
এই প্রেক্ষাপটের বিপরীতে ১৮৬৫ সালে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রকাশ করেন তাঁর ঐতিহাসিক প্রণয়োপাখ্যান দুর্গেশনন্দিনী। বইটি এক কথায় ঝড় তুলেছিল সারা বাঙলায়। দুর্গেশনন্দিনী যখন প্রকাশিত হয় তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন নিতান্তই একজন বালক। কিন্তু তাঁর কৈশোরকাল দীপিত হয়েছিল বঙ্কিমের প্রতিভার আলোয়। তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেতন বঙ্কিমের আবির্ভাবের ফলে যে আলোড়ন সৃষ্ট হয়েছিল তার কথা। বাঙলার পাঠক সমাজের চোখের সামনে বঙ্কিম তুলে ধরেছিলেন এক নতুন দৃশ্যপট। এর আগে পর্যন্ত হাস্যরসকে কদাচিৎ ভাঁড়ামি থেকে আলাদা করা যেত। গল্পগুলি ছিল হয় অসংযত রোমান্স অথবা কেবল দৈনন্দিন জীবনের ঘটনাবলির বিবরণ মাত্র। বঙ্কিম দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতার উপর চড়িয়েছিলেন কল্পনার আচ্ছাদন এবং দেশের ইতিহাসে লুকিয়ে থাকা রোমান্সের অনাবিষ্কৃত সম্ভাবনাগুলিকে আবিষ্কার করেছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম স্নাতকদের একজন এবং পাশ্চাত্যের শিক্ষাসংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর ঘনিষ্ঠ ধারণা ছিল। আধুনিক বাঙলা সাহিত্যের বেশ কয়েকজন বড় লেখকের মতো, যেমন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, তিনিও তাঁর সাহিত্যজীবন শুরু করেছিলেন ইংরেজি রচনার মাধ্যমে, কিন্তু দ্রুত তিনি বুঝতে পারলেন যে, যদি সাহিত্যে প্রকৃতই কোনো অবদান রাখতে হয় তবে তাঁকে অবশ্যই বাঙলা ভাষাতেই লিখতে হবে। অপরিহার্যভাবে একজন রোমান্টিক লেখক হিসেবে বঙ্কিম বাঙালির রোমান্টিক আশা-আকাক্সক্ষাকে সাহিত্যে রূপদান করেছিলেন। যেহেতু সমসাময়িক জীবন রোমান্সের সুযোগ খুব কমই উপহার দিতে পারত, সেজন্য তাঁর অর্ধডজনেরও অধিক উপন্যাসে তিনি আখ্যানের জন্য ইতিহাসের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। এ-বিষয়ে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও তিনি স্যার ওয়াল্টার স্কটের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং তাঁর খ্যাতির প্রধান দাবিটিই নির্ভর করবে সেইসব উপন্যাসের ওপর যেগুলিতে তিনি মধ্যযুগের সাধারণ নরনারীদের জীবনকে চিত্রিত করেছেন।
কেউ কেউ বঙ্কিমের ইতিহাস-আশ্রয়ী উপন্যাসগুলির সমালোচনা করেছিলেন এই বিবেচনা থেকে যে, সেগুলি রোমান্স ও ইতিহাসের এমন এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ যেখানে সত্যকে বলি দেওয়া হয়েছে শিল্পের বেদিতে। অন্যরা তাঁর সমালোচনা করেছেন এই কারণে যে, তিনি ইতিহাসকে তাঁর নায়ক-নায়িকাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে তুলে ধরেন না। প্রথম সমালোচনা আংশিকভাবে সত্য মাত্র, কারণ বঙ্কিম প্রকৃত ঘটনাবলির যথেষ্ট কাছেই নিজেকে ধরে রাখেন। সেখানে অবশ্য বিকৃতি ও ভিন্নতা রয়েছে, কিন্তু সেগুলির পরিমাণ যেমন বহু নয়, তেমনি সেগুলি গুরুতরও নয়। দ্বিতীয় ত্রুটি শুধু বঙ্কিম নয়, তাঁর সমকালীন অন্য লেখকদের অধিকাংশের মধ্যেও ছিল। এটি একটি প্রকৃত ত্রুটি এবং তা ছিল ইতিহাসের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে যেখানে রোমান্টিকতা ও ভাবোচ্ছ্বাস ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে পরাস্ত করে। বঙ্কিম ইতিহাসকে মনে করতেন প্রেক্ষাপট, যার বিপরীতে তিনি নর-নারী কাহিনি চিত্রিত করতে পারতেন; কিন্তু তিনি ইতিহাসে খুঁজে পাননি সেই অন্তর্দ্বন্দ্ব যা একজন ঔপন্যাসিকের প্রাথমিক কৌতূহলের বিষয়। এর কারণ হলো, তিনি ভুলে থাকতে চান যে, ইতিহাস হচ্ছে মানুষের ক্রিয়াকলাপের একটি লিপিবদ্ধ দলিল আর ইতিহাসের এই জীবন্ত নিশ্বাসই তাঁর উপলব্ধির বাইরে থেকে গিয়েছিল। যে-অন্তর্গত দ্বন্দ্ব ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ডের গতি নির্ধারণ করে তার চেয়ে বরং ঘটনাবলির রোমান্স নিয়ে অধিকতার ব্যাপক থাকার ফলে তিনি বুঝতে পারেননি যে, অতীতকে ফিরিয়ে আনার কাজটি হচ্ছে প্রায় মৃতকে পুনরুজ্জীবিত করার মতো একটি বিষয়। এই প্রেক্ষাপট নিয়ে, এটি কোনো বিস্ময়ের ব্যাপার নয় যে, অতীতকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য বঙ্কিমের প্রয়াস আমাদের কাছে হয়ে উঠেছে নিষ্প্রাণ।
ইতিহাস-আশ্রয়ী ঔপন্যাসিক হিসেবে বঙ্কিমের ব্যর্থতার আরো একটি কারণ রয়েছে। এটি হচ্ছে, বিভিন্ন সময়কাল বা যুগের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব এবং এই অভাব আজকের দিনেও রয়েছে। প্রাচীন অথবা মধ্যযুগের ভারতের চরিত্র সম্পর্কে তাঁর কোনো স্বাতন্ত্র্যসূচক ধারণা ছিল না এবং একটি সময়কে অপর সময় থেকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে তাঁকে নির্ভর করতে হয়েছে পোশাক বা পরিধেয় বস্ত্রাদি অথবা খাদ্যের মতো বাহ্যিক বিষয়গুলির ওপর। এমনকি প্রতিটি যুগের মধ্যেও একটি ধূসর সমরূপতা বিভিন্ন শতককে আবৃত করে রেখেছে এবং সেগুলির স্বাতন্ত্র্যসূচক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমরা খুব কমই জানি। বিভিন্ন সামাজিক অবস্থানের মধ্যে পার্থক্যকরণ সম্পর্কেও বঙ্কিমচন্দ্রের কোনো পরিষ্কার ধারণা ছিল না। এমনকি বিভিন্ন চরিত্র যখন একই সম্প্রদায় বা সময়কালের অন্তর্ভুক্তও হয়, তখনো একটি চরিত্রকে আলাদা করে চিহ্নিত করতে হয় সেই চরিত্রের বাহ্যিক লক্ষণসমূহ দ্বারা। ঐতিহাসিক উপন্যাসের ক্ষেত্রে এটি একটি মারাত্মক দুর্বলতা, কারণ তৎকালীন শাসকের উল্লেখ ব্যতীত একটি সময়কাল বা চরিত্রকে চিহ্নিত করার মতো অন্য কিছু বঙ্কিমের হাতে ছিল না। অতএব ইতিহাস-আশ্রয়ী ঔপন্যাসিক হিসেবে বঙ্কিমের ব্যর্থতার মূলে রয়েছে ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতের অভাব এবং এ থেকেই বাঙলা ভাষায় সামাজিক উপন্যাসের বিবর্তনের ক্ষেত্রে বিলম্বের ব্যাখ্যা মেলে।
উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণির যথার্থ প্রতিনিধিদের অন্যতম বঙ্কিমের এই ব্যর্থতাই ব্যাখ্যা করে কেন কয়েক দশক ধরে বাঙলার মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাদের পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পায়নি। এটিই আবার অন্যতম কারণ কেন বাঙলায় উপন্যাস রচনার প্রথম প্রয়াসগুলি এমন উদ্ভট রূপ গ্রহণ করেছিল। সমাচার দর্পণ-এ বাবুর নকশা অথবা প্যারীচাঁদ মিত্রের আলাল-এর চরিত্রসমূহ – সে যাই হোক না কেন, সেগুলি রক্তমাংসের নারী-পুরুষ নিয়ে রচিত উপন্যাসের চাইতে বরং সমকালীন সমাজের ব্যঙ্গচিত্রের সঙ্গেই অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। তাদের সর্বপ্রকার বুদ্ধি ও বক্রাঘাতসহ তারা সেজন্য মানবহৃদয়ের তন্ত্রীগুলিকে স্পর্শ করতে পারেনি। সেগুলি কেবল বুদ্ধিবৃত্তির এমন চর্চা যা জীবনের উপরিতলকে এড়িয়ে চলে গেছে। বঙ্কিমের অতীতযাত্রা এবং তাঁর কল্পনাশ্রয়ী রোমান্টিকতার সম্ভবত প্রয়োজন ছিল উপন্যাসকে ঊষর বুদ্ধিবৃত্তিক গোলকধাঁধা থেকে রক্ষার জন্য, যেখানে তা পড়ে গিয়েছিল।
ইতোমধ্যেই আমরা নির্দেশ করেছি যে, নতুন পশ্চিমী দৃষ্টিভঙ্গি এবং পুরোনো ঐতিহ্যবাহী জীবনের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব উপন্যাসের উদ্ভবের জন্য প্রয়োজনীয় রসদের জোগান দিয়েছিল। বাঙলার উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণি জোগান দিয়েছিল প্রয়োজনীয় পাঠকশ্রেণির। সময় ও পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল এবং সেখানে প্রয়োজন ছিল শুধু একজন সাহিত্যপ্রতিভার আবির্ভাবের যিনি পালন করবেন একটি স্ফুলিঙ্গের ভূমিকা। এই কাজটি করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র যিনি শুধু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজনই ছিলেন না, বরং ভারতীয়দের মধ্য থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত সিভিল সার্ভিসের প্রথম কর্মকর্তাদেরও একজন ছিলেন। এটি ছিল সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের যুগ, আশা ও প্রত্যাশার যুগ এবং উদীয়মান মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে বঙ্কিম সহানুভূতিশীল হতে পেরেছিলেন এর অনেক আশা-আকাক্সক্ষার প্রতি। এর প্রথম পর্বে ইউরোপীয় সংস্কৃতির প্রভা ও ঔজ্জ্বল্য বাঙলার শিক্ষিত মানুষদের অভিভূত করেছিল। তাঁদের মনোভাব ছিল আশাবাদ ও প্রাণশক্তির এবং সেখানে পূর্বের গৌরবের দিনগুলির দিকে ফিরে তাকানোর অবকাশ বা সময় ও প্রবণতা ছিল খুবই কম। বঙ্কিম যখন লিখতে শুরু করেছিলেন তখন প্রথমদিকবার উৎসাহ কিছুটা কমে এসেছিল। বঙ্কিমের রচনাগুলি তাই সাধারণভাবে আশা ও প্রাণশক্তির উদ্দীপনাপূর্ণ বৈশিষ্ট্যধর্মী। কিন্তু আমরা সেগুলিতে বর্তমান ও অতীতের মধ্যে তুলনার একটি মনোভাবের সূচনা খুঁজে পাই। একজন অগ্রসরচিন্তা ও আধুনিকমনস্কতার অধিকারী মানুষ হিসেবে তিনি একই সঙ্গে প্রাচীন ভারতের মূল্যবোধসমূহের প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করতেন এবং এটি তাঁকে তাঁর সাহিত্যপ্রয়াসে প্রয়োজনীয় পরিস্তরণ তথা ভারসাম্য জুগিয়েছিল। তিনি এমন একসময়ে সাহিত্যকর্মে অগ্রসরতা লাভ করতে পেরেছিলেন যখন ঐতিহাসিক বিচারের প্রতি প্রণোদনা কেবল জাগ্রত হতে শুরু করেছে, কিন্তু সে-ধরনের বিচারের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ তখনো সংগৃহীত হয়নি। তাঁর জীবনের সর্বাধিক গঠনকাল কেটেছিল ব্রিটিশ রাজত্বের স্বার্থে ভারতীয় ইতিহাসের প্রতি কালিমালেপনের আবহের মধ্যে। এর ফলে তিনি কোনো প্রশ্ন ব্যতিরেকেই এমনসব বিষয় গ্রহণ করে নিয়েছিলেন যেগুলি আজকালকার দিনে এমনকি স্কুলগামী বালকেরাও প্রত্যাখ্যান করবে।
বঙ্কিম যখন তাঁর প্রথম ঐতিহাসিক উপন্যাসটি রচনা করেন, তখন সামন্তবাদের স্মৃতি বিবর্ণ হয়ে আসছিল। এর কঠোরতা ও নিষ্ঠুরতা ছিল তাঁর অভিজ্ঞতার বাইরে। অন্যদিকে এর বীরধর্ম ও মহিমা তখনো জাগরূক ছিল উচ্চশ্রেণিভুক্তদের মনে। এটি বস্তুত রোমান্টিকতার সঙ্গে এর অনুষঙ্গতার মাধ্যমে একধরনের স্মৃতিকাতরতামূলক আবেদনও সৃষ্টি করতে পেরেছিল। সেজন্য বঙ্কিমের প্রথমদিকের উপন্যাসগুলি পরিপূর্ণ রয়েছে অবক্ষীয়মান সামন্তবাদের দ্যুতিতে। নায়ক ও নায়িকারা হৃদয়াবেগ দ্বারা মথিত এবং এমনকি প্রতিনায়ক-প্রতিনায়িকাদের মধ্যেও রয়েছে একধরনের মহাকাব্যিক বিশালতা। বঙ্কিম প্রথমত কোনো কবি ছিলেন না; কিন্তু তাঁর উপন্যাসে তখনকার সময়ের অধিকাংশ কবিতার চাইতে অধিকতর পূর্ণভাবে ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে সেই সময়ের ভাবব্যঞ্জনা প্রতিফলিত হয়েছে।
বঙ্কিমের রোমান্টিক সামন্তবাদ আরো দৃঢ়রূপ পেয়েছে স্যার ওয়াল্টার স্কটের প্রভাবে। অতএব এটি কোনো বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল না যে, বঙ্কিমের প্রথম উপন্যাসগুলি, স্যার ওয়াল্টার স্কটের ঐতিহ্য অনুসরণে হবে ঐতিহাসিক উপন্যাস। তবে দুই লেখকের ভিন্ন পটভূমি এবং ইতিহাসের গুরুত্ব বিষয়ে বঙ্কিমের অসম্পূর্ণ সচেতনতার কারণে সেগুলির মধ্যে ভিন্নতা থাকবে। তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলি বস্তুত প্রেমকাহিনিই যেখানে কল্পনা বাধাবন্ধনহীন এবং তা সত্ত্বেও এসব রচনায় ইতিহাসের বিচ্যুতি ও বিকৃতি যেমন মোটেই অনেক নয়, তেমনি গুরুতরও নয়।
বঙ্কিমের প্রথম তিনটি উপন্যাস – দুর্গেশনন্দিনী, কপালকুণ্ডলা ও মৃণালিনী – পাঠকদের জন্য তাঁর রোমান্টিক উচ্চাভিলাষের অবাধ প্রকাশ ঘটিয়েছিল। কপালকুণ্ডলা অবশ্য ভিন্ন, কারণ বিষয় ও অভিপ্রায়ের দিক থেকে এটি প্রধানত কাব্যধর্মী। অপর দুটি উপন্যাস এগিয়েছে ঐতিহাসিক রোমান্সের ক্ষেত্রে স্কটের ঐতিহ্যের মূল সূত্রটি ধরে এবং সেগুলি হচ্ছে – ইংরেজি রোমান্টিক সাহিত্য, চিরায়ত সংস্কৃত মহাকাব্যসমূহ এবং বাঙলা ভাষায় জয়দেব ও ভারতচন্দ্রের মতো কবিদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত তীব্রভাবে ভাবোচ্ছ্বাসমূলক ঐতিহ্যের একটি অভূতপূর্ব সমাহার। এমনকি রোমান্টিক উদ্ভটতাযুক্ত প্রথমদিককার এসব উপন্যাসেও বঙ্কিম কাহিনি-কথক হিসেবে তাঁর দক্ষতার পরিচয় তুলে ধরেছেন। এ-বিষয়টির উল্লেখও কৌতূহল উদ্রেককর যে, যেসব চরিত্র এসব রচনায় জীবন্ত হয়ে উঠেছে সেগুলিও নায়ক-নায়িকাদের চরিত্র নয়, যারা প্রধানত নির্দিষ্ট কিছু গুণ বা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীক হয়ে রয়েছে, বরং সেসব চরিত্র হচ্ছে সাধারণ সব মানুষ যাদের বঙ্কিম চিন্তাশীল মানুষ অথবা বিশদভাবে চিত্রণের উপযুক্ত বলে মনে করেননি। দুর্গেশনন্দিনীতে তিলোত্তমা বা আয়েশার চাইতে বরং বিমলাই রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে আমাদের মনে বেশি ছাপ ফেলেছে।
বঙ্কিমের মধ্যে একটি প্রবল কবিশক্তি ছিল যা বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয় তাঁর প্রথমদিককার উপন্যাসগুলিতে। দুর্গেশনন্দিনীতে ইতিহাসাশ্রয়িতার মধ্যে কিছুটা সীমা রক্ষিত হলেও কপালকুণ্ডলায় বঙ্কিম তাঁর কল্পনার সীমা পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। এতে তাঁর নায়ককে তিনি উপস্থাপিত করছিলেন বাহ্যত প্রতীয়মান মধ্যবিত্ত হিন্দু পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি নির্মাণ করেছেন এমন এক কল্পনার জগৎ যার সঙ্গে বাস্তবতার সম্পর্ক সামান্যই। আনন্দমঠ-এর শুরু এক বাস্তব বর্ণনার মধ্য দিয়ে এবং তাতে এমন এক সমাজের চিত্র ফুটে ওঠে যে-সমাজ প্রায় আধুনিক এক সমাজ। প্রথম চারটি অধ্যায়ে চিত্রিত হয়েছে ভয়াবহ ও ভীতিকর এক বাস্তবতার ছবি। মহেন্দ্র ও কল্যাণী অপরিহার্যভাবে উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণিসমূহের প্রতিনিধি; কিন্তু অতি শীঘ্র বঙ্কিমের রোমান্টিক কল্পনা তাঁকে তাঁর পায়ের নিচের মাটি থেকে সরিয়ে নিয়ে যায় এবং তা আমাদেরও নিয়ে যায় এক উদ্ভট কল্পনার জগতে। তিনি বিদ্রোহ ও সংগ্রামের যে-চিত্র এঁকেছেন বাস্তবে তার কিছু ভিত্তি আছে, তবে এ-বিষয়ে সন্দেহ থেকে যায় যে, তাঁর চরিত্রেরা যে মনোভাব প্রকাশ করেছে তা সে-যুগে সত্যিই উপলব্ধ হয়েছে কি না। প্রকৃতপক্ষে যে জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেম উপন্যাসটির মর্মকথা তার উদ্ভব ঘটেছিল উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মাত্র। অতএব আনন্দমঠ-এর বিষয়বস্তু একটি ঐতিহাসিক কালবিপর্যয় দোষে দুষ্ট; কিন্তু এতদ্সত্ত্বেও বাঙলা উপন্যাসের বিকাশ ও বিবর্তনের ক্ষেত্রে বইটির একটি ভূমিকা আছে, অংশত এর গঠনকাঠামোর কারণে এবং অংশত এটি বিকাশশীল মধ্যবিত্ত শ্রেণির আশা-আকাঙ্ক্ষা এত বিশ্বস্ততার সঙ্গে তুলে ধরতে পেরেছে বলে।
বঙ্কিমের মধ্যে ছিল কবির কল্পনাশক্তি এবং দার্শনিকের ক্ষুরধার ধীশক্তি। কপালকুণ্ডলার মতো একটি চরিত্র নির্মাণ অবশ্যই কবিজনোচিত সৃষ্টি। কৃষ্ণ চরিত্রে তিনি কৃষ্ণের চরিত্রের যে-বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন তাতে তাঁর উচ্চতম মানের ধীশক্তির পরিচয় সুস্পষ্ট। তবে যে-কারণেই হোক না কেন, তাঁর কল্পনাশক্তি ও ধীশক্তির যথার্থ সমন্বয় কখনো ঘটেনি। সে দুটি পরস্পর বিচ্ছিন্নই রয়ে গেছে এবং তাঁর পৃথক পৃথক কাজে পৃথকভাবে তা প্রকাশ পেয়েছে। আরো বিস্ময়ের যে ব্যাপার তা হলো, নৈতিকতার প্রতি তাঁর প্রচারিত মনোভাবের অনুসরণ, যা বারবার প্রকাশ পেয়েছে সামান্যতম প্ররোচনায়ও নৈতিকতার উপদেশবর্ষণের প্রতি তাঁর আসক্তিতে। এটি একটি মারাত্মক দুর্বলতা এবং এই দুর্বলতা তাঁর অত্যন্ত আকর্ষণীয় কয়েকটি উপন্যাস, যা হয়ে উঠতে পারত, সেই সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দিয়েছে।
বাঙলা উপন্যাসের বিকাশের ক্ষেত্রে দেবী চৌধুরানী একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা, যেহেতু বঙ্কিম এই উপন্যাসে যে-সমাজের চিত্র এঁকেছেন তা প্রায় আধুনিক একটি সমাজ। এর কাহিনি শুরু হয়েছে সামাজিক কারণে পরিত্যক্তা এক নির্দোষ নারীকে কেন্দ্র করে, যে-বিষয়বস্তু আধুনিক বাঙলা উপন্যাসে বারবার পুনর্ব্যবহৃত হয়েছে। সচরাচর স্বামী কর্তৃক স্ত্রী পরিত্যাগের যে ঘটনা ঘটে সেদিকে না গিয়ে বঙ্কিম সেই পরিত্যক্তা স্ত্রীকে একটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক আন্দোলনের নায়িকায় রূপান্তরিত করে একটি অপ্রত্যাশিত বাঁকবদল ঘটিয়েছেন। এমনটি তাঁর রচনার ক্ষেত্রে প্রায়শ ঘটেছে। এই ক্ষেত্রেও এক আদর্শ রমণী চরিত্র সৃষ্টির প্রয়াস শেষ হয়েছে অহংকারী নীতিবাগীশ একটি চরিত্র নির্মাণে। বঙ্কিম চেয়েছিলেন দেবী চৌধুরানী হবেন সাহসী ও দৃঢ় সংকল্পবদা এবং সেইসঙ্গে নেতৃত্বের উচ্চগুণধারিণী অথচ প্রেমময়ী ও স্নেহময়ী পত্নী যিনি গার্হস্থ্য জীবনেরও উপযুক্তা হতে ইচ্ছুক ও অধীরা। কিন্তু সমস্ত গুণ থাকা সত্ত্বেও সে-চরিত্রটি থেকে যায় প্রত্যয়ের অযোগ্য ও অবাস্তব। পিতার আদেশে তার স্বামী যখন তাকে প্রত্যাখ্যান করে তখন যে মনোভাব ও মেজাজ তার মধ্যে দেখা যায় তার সঙ্গে সেই একই স্বামীকে যখন বন্দি হিসেবে তার সামনে আনা হয় তখনকার অনুবর্তিতা মেলে না। স্বামী মানুষটি তখনো পর্যন্ত এমন কিছু বলেনি বা করেনি যার কারণে সে তার স্ত্রীর ভালোবাসা ও আনুগত্য পুনরায় লাভ করতে পারে। বস্তুত তাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক তৈরির জন্য নির্ধারিত সামাজিক আচার সম্পন্ন হওয়া ব্যতীত তেমন আর কোনো নৈকট্য ছিল না। অতএব এটি পাঠকের বিশ্বাসপ্রবণতার উপর একটি চাপ তৈরি করে যখন আমাদের বিশ্বাস করতে বলা হয় যে, একটি পুরোপুরি ঐতিহ্যগত ও সাংসারিক পরিবারে ব্রজেশ্বরের অনেক স্ত্রীর একজন হতে পেরে দেবী পরিতৃপ্তি ও সন্তুষ্টি লাভ করতে পেরেছে।
বিপরীতক্রমে তার স্বামী ব্রজেশ্বর নিজের সকল সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অধিকতর বলিষ্ঠ একটি চরিত্র। তাকে বর্ণনা করা যেতে পারে স্ত্রীর জন্য প্রেম ও পৈতৃক চাপের প্রতি তার আত্মসমর্পণের মধ্যে পিষ্ট হতে থাকা আধুনিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষদের উদাহরণের মধ্যে একজন হিসেবে। বাঙালি সমাজপ্রাপ্ত ও বাঙলা উপন্যাসের জনপ্রিয় অনুরূপ বহু দুর্বল হৃদয়ের চরিত্রদের মধ্যে একজন হিসেবেই তিনি আমাদের মনে থেকে যান। অবশ্যই ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক তিনি এবং তাঁর পরিহাস অনুধাবনের ক্ষমতা ও সামাজিক সীমাবদ্ধতাসমূহ মেনে নেওয়ার সদাপ্রস্তুতির দ্বারা তিনি ভণ্ডামিমূলক কপটতা থেকে রক্ষা পেয়েছেন। এমনকি, আরো যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো নিজেকে নিয়ে এবং তাঁর সামাজিক পরিমণ্ডল নিয়েও পরিহাস করতে পারেন তিনি। দুর্বলচিত্ত ও দোদুল্যমান একজন মানুষ তিনি, তা সত্ত্বেও তিনি একজন বাস্তব মানুষ, বঙ্কিমের সৃষ্ট চরিত্রগুলির মধ্যে যাদেরকে আমরা রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি তাদের মধ্যে প্রথমদিকের একটি চরিত্র এই ব্রজেশ^র।
ব্রজেশ^র যেখানে তার রসিকতার কারণে একজন কপটচারীর ভাগ্যবরণ করাকে এড়িয়ে যেতে পেরেছে, সেখানে নায়িকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বঙ্কিমের সংকীর্ণ ও প্রচলিত সামাজিক নীতিবোধের প্রতি অত্যধিক মনোযোগের দ্বারা। এ-কথা সত্য যে, সে সীতারাম উপন্যাসের শ্রী’র মতো একজন শুষ্ক অহংকারী নীতিবাগীশ হয়ে ওঠেনি, কিন্তু তার সকল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সে জলাঞ্জলি দিয়েছে প্রচলিত পত্নীধর্মের বেদিতে। এ-বিষয়টি কখনো বঙ্কিমের মনে আসেনি যে, প্রফুল্লর চরিত্রের যে পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে এবং যেভাবে তার শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ তাকে দেবী চৌধুরানীতে রূপান্তরিত করেছে তা আপাতগ্রাহ্যতার সীমা লঙ্ঘন করেছে এই চিন্তা থেকে যে, সে আবার একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের অনেক পত্নীর একজন হিসেবে হেরেমের জীবনযাপন করতে পারে।
প্রচলিত ধারার নীতিবাগীশের কাছে ঔপন্যাসিকের এই আনুগত্য স্বীকার এমনকি আরো স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে সীতারাম উপন্যাসে, যেটি হতে পারত মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্বসম্পন্ন একটি মহৎ উপন্যাস। এই উপন্যাসটির নায়ক এসেছিল মধ্যবিত্ত শ্রেণিসমূহ থেকে, ভাগ্য ও পরিস্থিতি যাকে নিয়ে এসেছিল অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার জগতে। কোনো কোনো বিবেচনায় সীতারাম চরিত্রটিকে ম্যাকবেথ চরিত্রটির সঙ্গে তুলনা করা যায়। উভয় চরিত্রো মধ্যেই সুপ্ত/ রুদ্ধ উচ্চাভিলাষ নিজেকে অতিক্রম করার দিকে তাড়িত করে। ম্যাকবেথ চরিত্রে আমরা দেখি যে, উচ্চাভিলাষ তাকে একটি অপরাধ থেকে আরেকটি অপরাধের দিকে নিয়ে যায়; কিন্তু সীতারাম চরিত্রে উচ্চাভিলাষ পরাজিত হয় নারীর প্রতি তার অপরিমিত যৌনকামনার কাছে। রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও দৈহিক কামনার পরস্পরবিরোধী টানের কারণে সীতারামের ব্যক্তিত্বের বিভাজন লেখককে চরিত্রের নকশা অংকন ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের যে বিরাট সুযোগ এনে দিয়েছিল, বঙ্কিম দুর্ভাগ্যবশত তা পুরোপুরি হারিয়েছেন প্রচলিত সামাজিক নিয়মনীতি ও চিরাচরিত নৈতিক ভাবনাসমূহের প্রতি তাঁর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের কারণে। তিনি ছিলেন অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টি বিশ্লেষণ ক্ষমতার অধিকারী। অতএব এটি বিস্ময়ের বিষয় যে, কৃষ্ণচরিত্র এবং কমলাকান্তের দপ্তর রচনাদ্বয়ে তাঁর পর্যালোচনার একমাত্র ব্যতিক্রম ব্যতীত তিনি কখনো তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতাকে হিন্দু সামাজিক নীতিশাস্ত্রকে পরীক্ষা করে দেখার জন্য ব্যবহার করেননি। এটি কেবল তাঁর সামাজিক বিশ্লেষণের মূল্যকেই কমিয়ে দেয়নি, বরং ঔপন্যাসিক হিসেবে তাঁর সাফল্যের পথে বিরাট অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
চন্দ্রশেখর, কয়েকটি বিবেচনায়, বঙ্কিমের সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপন্যাসগুলির মধ্যে একটি। এটি ইতিহাস ও রোমান্সের একটি মিশ্রণ এবং ঐতিহাসিক রোমান্টিক উভয় উপাদান এতে থেকে যায় কাহিনির বাইরের বিষয় হিসেবে। এটি অনিবার্যভাবে একটি সামাজিক উপন্যাস, এর ঐতিহাসিক বৈধতা এই সত্যে নিহিত যে, এর ঘটনাবলি তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক এবং বঙ্কিমের নিজের অভিজ্ঞতার প্রায় কাছাকাছি। উপন্যাসটির কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্ব ইতিহাসগত কোনো বিষয় নয়, কিন্তু ইতিহাস বাঙলার সমাজজীবনের ধীরগতি ও এমনকি প্রবাহকেও নাড়া দিয়েছে ও ওলটপালট করে দিয়েছে। এতে সামাজিক রীতিনীতির প্রতি অটল আনুগত্য ভারতীয় চরিত্রগুলির ক্রিয়াকর্মের স্বাধীনতাকে সীমিত করে দিয়েছে, অন্যদিকে ভিত্তি থেকে ছিন্নমূল হওয়ার কারণে বিদেশিদের জানা ছিল অল্প কিছু বাধানিষেধ। এর ফলে ব্রিটিশ অভিযাত্রী-ভাগ্যান্বেষীদের দৃঢ়সংকল্পবদ্ধতা, সাহস ও বিবেকবোধের অভাবের বিপরীতে ভারতীয় চরিত্রগুলির অনেকের মধ্যে দোদুল্যমানতা ও দ্বিধা, অবীরোচিত ও কখনো কখনো কাপুরুষোচিত মনোভাব দেখা যায়। চন্দ্রশেখর, বঙ্কিম যাকে একটি আদর্শ চরিত্র রূপে আঁকার চেষ্টা করেন, পাঠকের মনে একজন হৃদয়হীন এবং অহংকারী নীতিবাগীশ ও গোঁড়া ব্যক্তি হিসেবে ধরা দেয়। প্রতাপ, যে তার নামের মতোই একজন মহান নেতার আদলে চিত্রিত, সে থেকে যায় একজন দাম্ভিকতাপূর্ণ বোকা মানুষ – আমাদের শ্রদ্ধার পরিবর্তে দয়ার পাত্র হয়ে। অন্যদিকে তার সব দোষ-নিষ্ঠুরতা, লালসা ও বিবেকহীনতাসহ চন্দ্রশেখর হয়ে ওঠে প্রতাপ বা যে কারো চাইতে অধিকতর সবলচিত্ত ও মানবিক চরিত্র।
ভারতীয় চরিত্রগুলির মধ্যে যে-দুটি চরিত্র সবচেয়ে উজ্জ্বল শুধু এ-উপন্যাসটিতে নয়, বরং বঙ্কিমের তারকাপুঞ্জের মধ্যেও, সে-দুটি চরিত্র হচ্ছে – শৈবলিনী ও দলনী বেগম। দলনী বেগম প্রধান কোনো চরিত্র নয়, কিন্তু মাত্র তুলির কয়েকটি আঁচড়ে সে-চরিত্র এমন দক্ষতা ও সহানুভূতির সঙ্গে আঁকা হয়েছে যে তা থেকে বুঝতে পারা যায় বঙ্কিম কি করতে পারতেন যদি তিনি তাঁর সংকীর্ণ সামাজিক পূর্বধারণাগুলি থেকে বেরিয়ে আসতে পারতেন। বাঙলা উপন্যাস সাহিত্যে প্রথম বাস্তব নারী চরিত্রগুলির মধ্যে শৈবলিনী অন্যতম। সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক আদর্শসমূহ থেকে মুক্ত ও আধুনিক মূল্যবোধসমূহের বুদ্ধিবৃত্তিক গ্রহণের ক্ষেত্রে তার স্বাধীনচেতা দৃষ্টিভঙ্গি ও আধুনিক মূল্যবোধ গ্রহণসহ শৈবলিনী মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিত্বই করে বেশি, বঙ্কিমের সৃষ্ট অন্যান্য চরিত্রের চেয়ে। প্রফুল্লর মতো শিক্ষা ও বিদগ্ধতা যেমন সে লাভ করেনি, তেমনি কপালকুণ্ডলার মতো সহজ স্বাভাবিকতা ও নিষেধসমূহ থেকে মুক্তিও সে পায়নি। তবে তার মধ্যে রয়েছে ভারসাম্য ও স্থৈর্য, যা স্বাভাবিক নায়িকা হিসেবে তার বৈশিষ্ট্যকে চিহ্নিত করে। সে তার মনের যে দ্বন্দ্ব তা গোপন করে না। বাল্যকাল থেকেই সে আবেগপূর্ণভাবে প্রতাপকে ভালোবেসে এসেছে। সামাজিক বিধিনিষেধ যদি তার সামনে এসে দাঁড়ায় তবু সে তার হৃদয়াবেগকে ধারণ করতে ভীত নয়। তাদের দুজনের মধ্যে জাতিগত পার্থক্য কিংবা চন্দ্রশেখরের সঙ্গে তার বিবাহ কিছুই তাকে প্রতাপের প্রতি তার প্রেম থেকে নিবৃত্ত করতে পারত না যদি প্রতাপ তাতে ইচ্ছুক থাকত। অনড় নীতিবাদী প্রতাপ অবশ্য শৈবলিনীর প্রবল আবেগকে প্রতিহত করে, এমনকি যদিও সে তাদের দুজনের মধ্যেকার প্রেমকে স্বীকার করে ও শৈবলিনীর জন্য প্রাণ দিতেও রাজি।
শৈবলিনী অবশ্য প্রতাপের জন্য মরতে আগ্রহী নয়। সে বরং তাকে অনেক বেশি জীবিতই দেখতে চায়। যখন প্রতাপের কাছাকাছি হওয়ার ব্যাপারে তার চেষ্টাগুলি ব্যর্থ হয় তখন সে এমন একটি কাজ করে যা প্রচলিত নৈতিকতার প্রায় প্রতিটি বাক্যকেই লঙ্ঘন করে। রাজনৈতিক ঘটনাবলির অভিঘাত তার পারিবারিক জীবনকে তছনছ করে দিতে উদ্যত হলে দমে যাওয়ার পরিবর্তে সে পরিস্থিতিকে তার নিজের উদ্দেশ্য সাধনে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। যখন ফস্টার তার সৌন্দর্যে আত্মহারা হয়ে তাকে ভোগ করতে উদ্যত হয়, তখন সে তার কামচাহিদাকে একটা পর্যায় পর্যন্ত পূরণ করতে ইচ্ছুক হয়, কিন্তু তা ফস্টারের খেলার মাত্র একটি বোড়ে হিসেবে নয়। তার সৌন্দর্য এবং ফস্টারের কামনা মিলিত হয়ে তার জন্য একটি সুযোগ সৃষ্টি করে – সন্দেহজনক ও ঘোরালো – প্রতাপের প্রতি তার প্রবল অনুরাগ-তৃষ্ণা প্রশমিত করার জন্য। অতএব সে তার স্বামীগৃহ ত্যাগ করতে সম্মত হয়, তবে তাতে ফস্টারের রক্ষিতা হওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছাও ছিল না। সে তার (ফস্টারের) কামনানুরাগ অগ্রাহ্য করার ব্যাপারে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ ছিল, আবার একই সঙ্গে স্বামীগৃহ ত্যাগ ও প্রতাপের সন্নিধানে পৌঁছার জন্য তাকে (ফস্টার) ব্যবহার করতেও দৃঢ়ভাবে ইচ্ছুক ছিল। প্রতাপের জন্য তার উদগ্র কামনা যদি না থাকত তাহলে সে যেমন ঘর ছেড়ে বেরুত না, তেমনি পক্ষান্তরে ফস্টারের প্ররোচনা ব্যতীতও সে হয়তো ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসত না। ফস্টার ও শৈবলিনী উভয়ে একে অপরকে ব্যবহার করতে চেয়েছিল এবং এটি শুধু একটি দুর্ঘটনা ছিল, যা শৈবলিনীকে বিরত রাখতে পেরেছিল তার নিজ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য ফস্টারকে নিজের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা থেকে।
এ-পর্যন্ত শৈবলিনীর চরিত্রচিত্রণ বিশ্বাসযোগ্য এবং তাতে প্রতিভাত হয় গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও দক্ষতাসম্পন্ন একজন শিল্পী। এরপর বঙ্কিমের নীতিবাগীশ সত্তা আবার জাগ্রত হয় এবং পরাজিত হয় শিল্পীসত্তা। যে রমণী তার কৌশলগুলি এতো দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারে এবং ফস্টারের মতো একজন ধূর্ত ও বিবেকবর্জিত ব্যক্তির সঙ্গে সমান তালে যুঝতে পারে সে হঠাৎ এবং কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই কি করে পুরোপুরি নিরেট নৈতিকতার কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারে। তার অনুতাপ ও মানসিক ভারসাম্য হারানোর গল্পটি যেমন বিশ্বাসযোগ্য নয় শুধু, বরং কিছুটা হাস্যকরও। সমভাবে মাত্রাছাড়া হচ্ছে তার দুঃস্বপ্নের বিবরণ, যেখানে সবচেয়ে বেশি অস্বাভাবিক ঘটনাবলি ঘটে। কল্পনার মধ্যে চিন্তাচর্চা অথবা সম্ভবত দান্তে ও মিল্টনকে তাঁদের নরকের বর্ণনার ক্ষেত্রে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য বঙ্কিমের আকাঙ্ক্ষা ব্যতীত এর অন্য কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া যায় না। সম্ভবত এর আসল ব্যাখ্যা হচ্ছে বঙ্কিমের অনিবার্যভাবে রক্ষণশীল মনোভাব এবং তাঁর দৃঢ়সংকল্প যে, শেষ পর্যন্ত ধর্মেরই জয় হবে।
বিশ্বমানের নিরিখে বিচার করতে গেলে একজন কথাশিল্পী হিসেবে বঙ্কিমের ঊণতা সত্ত্বেও সমকালের অনেকের চাইতে তাঁর অগ্রবর্তিতার পরিচয় এমনকি চন্দ্রশেখরেও পাওয়া যায়। আমরা যদি বঙ্কিমের কাজকে শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের ফুলজানির সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে আমরা এমনকি তাৎক্ষণিকভাবেও এই পার্থক্য লক্ষ করি। ফুলজানি উপন্যাসের সরল ও ছলাকলাহীন নায়িকার জীবনে যে-বিপর্যয় নেমে এসেছিল ইতিহাসের অগ্রগতি ব্যতীত তার অন্য কোনো কারণ ছিল না। সে এই বিপর্যয়ের কারণ নয়, বরং শিকার; অন্যদিকে শৈবলিনীর ভাগ্য নিহিত ছিল তার নিজের চরিত্রের মধ্যেই। ইতঃপূর্বে যেমনটা বলা হয়েছে, সে কোনো পরিস্থিতির দ্বারা সৃষ্ট ছিল না, বরং সে নিজ উদ্দেশ্য সাধনে পরিস্থিতি তৈরি করতে চেয়েছে। চরিত্র ও ভাগ্যের মধ্যে যে অবিচ্ছেদ্য সংযোগ তা বঙ্কিমের পরবর্তী উপন্যাসগুলিতে আরো জটিল হয়েছে। সন্দেহ নেই, যখনই কোনো সংকটের সম্মুখীন তিনি হন তখনই তিনি দৈবের শরণাপন্ন হন; কিন্তু এতদ্সত্ত্বেও তিনি তাঁর সৃষ্ট চরিত্র সম্পর্কে একটি ধারণা তুলে ধরেন, যেমনটি তাঁর সমকালীনদের মধ্যে খুব অল্প কয়েকজনই মাত্র করতে পেরেছেন।
প্রতাপ ও শৈবলিনীর প্রেমের সঙ্গে রমেশচন্দ্র দত্তের মাধবী কঙ্কণ গ্রন্থের নরেন্দ্র ও হেমলতার প্রণয়ের তুলনা করার কাজটি কৌতূহল উদ্রেককর হবে। রমেশচন্দ্র দত্তের কল্পনা উদ্দীপ্ত হয়েছিল ইতিহাসের সংঘাত ও বিশৃঙ্খলা দ্বারা। বঙ্কিম ইতিহাসের বৃহৎ ঘটনাপ্রবাহ দ্বারা তুলনামূলকভাবে তেমন প্রভাবিত হননি। ইতিহাসের প্রতি রমেশচন্দ্র দত্তের অনুরাগ ছিল অনেক বেশি এবং তিনি ছিলেন একজন তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক, কিন্তু নিজের সৃষ্ট চরিত্রগুলির সঙ্গে বঙ্কিমের মতো কল্পনাশ্রয়ী একাত্মতাবোধ তাঁর ছিল না। দত্তের চরিত্রগুলি প্রায়শ বিশ্বস্ত, কিন্তু কদাচিৎ গভীরতাধর্মী। দত্ত ছিলেন অধিকতর ক্ষমতাসম্পন্ন ইতিহাসবিদ এবং সম্ভবত বঙ্কিমের চেয়ে ভালো একজন ইতিহাস-আশ্রয়ী ঔপন্যাসিক। নিশ্চয়ই তিনি ব্যর্থ প্রেমের আরো বেশি ভালো চিত্র তুলে ধরেন। বঙ্কিমের রচনায়, শৈবলিনীর নিয়ন্ত্রণহীন প্রেমাকুলতা, বাঁধভাঙা রোমান্টিক আচরণ ও উদ্ভট প্রত্যাশার সঙ্গে সাধারণ একজন নারীর জীবনের কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় না। রমেশচন্দ্র দত্তের উপন্যাসে নরেন্দ্রর উদ্দাম প্রেম, এমনকি তাদের বাল্যকালেও হেমলতার মনে সাড়া তুলেছিল; অন্যদিকে শ্রীশের নিরেট ও শান্ত ভালোবাসা তার হৃদয়ে শুধু শ্রদ্ধা ও সম্মানের ভাবই জাগিয়েছিল। এটি তার জীবনের দুর্ভাগ্য যে, শ্রী’র প্রতি তার আনুগত্য ও সম্মানবোধকে ভালোবাসা বলে ভুল ভাবা হয়েছিল। অন্যদিকে নরেন্দ্রর প্রতি তার নীরব ও গোপন অনুরাগ তার নিকটজনদের দৃষ্টি এড়িয়ে গিয়েছিল। রমেশচন্দ্র দত্ত স্বাভাবিক মানবিক সম্পর্কের প্রতি অধিক বিশ্বস্ততা প্রদর্শন করলেও তাঁর রচনা দুটি বড় কারণের জন্য তুলনামূলকভাবে দুর্বল প্রতিপন্ন হয়। বঙ্কিম ছিলেন একজন অসাধারণ গল্পবলিয়ে এবং তিনি তাঁর পাঠকদের শুধু বর্ণনার স্রোতধারার মাধ্যমেই ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারতেন। একই সঙ্গে, তাঁর রয়েছে কল্পনাশক্তির বলিষ্ঠ ক্ষমতা যা তাঁর চরিত্রগুলিকে বৃহত্তর জীবনবোধ ও প্রাণশক্তি দান করেছে। দত্ত মানুষ ও মানুষের আচার-ব্যবহারের বর্ণনা দিয়েছেন যথাযথ ও নির্ভুলভাবে। বঙ্কিম এক্ষেত্রে প্রায়ই ভুল ও অযথার্থ ছিলেন, কিন্তু কল্পনার প্রবাহ তাঁর রচনাকে প্রাণবন্ত ও বর্ণাঢ্য করে তুলেছে।
এক মুহূর্তের জন্য হয়তো কেউ বঙ্কিম ও রমেশচন্দ্রকে ঐতিহাসিক ও সামাজিক ঔপন্যাসিক হিসেবে তুলনা করতে পারেন। আমরা দেখেছি যে, বঙ্কিমের কল্পনাশক্তি অধিকতর প্রবল, কিন্তু দত্তের ছিল অধিকতর ঐতিহাসিক বিশ্বস্ততা। দত্তের পর্যবেক্ষণ ছিল নিবিড় ও নিখুঁত এবং দারিদ্র্য ও কষ্টের প্রতি ছিল তাঁর গভীর সহানুভূতি। কিন্তু বঙ্কিমের ক্ষেত্রে তাঁর সমাজ সংস্কারমূলক অত্যুৎসাহ প্রায়শ শৈল্পিক সত্তাকে অতিক্রম করে গেছে। বস্তুত, বাস্তবতা থেকে বঙ্কিমের বিচ্যুতিগুলির অধিকাংশই ছিল সীমার মধ্যে, কিন্তু দত্তকে প্রায়শই ভাসিয়ে নিয়ে গেছে তাঁর নিজের সংস্কারবাদিতার অত্যুৎসাহ। যেমনটা আমরা দেখব যখন আমরা বিষবৃক্ষ এবং কৃষ্ণচরিত্র নিয়ে আলোচনা করব। বঙ্কিমের মধ্যে বিধবাবিবাহ সম্পর্কে প্রচলিত হিন্দু-প্রতিরোধ ছিল এবং সীমা লঙ্ঘনকারীদের শাস্তি প্রদান না করা পর্যন্ত তিনি কখনো সন্তুষ্ট হননি। দত্ত অন্যদিকে চরম বিন্দু পর্যন্ত গিয়েছিলেন। বিধবাবিবাহ অথবা আন্তঃবর্ণ বিবাহ সংঘটনের আয়োজন সম্পূর্ণ করার পর তিনি তদ্পরবর্তীকালের ঘটনার ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন এবং গোঁড়ামির বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ দ্বারা যেসব সমস্যা সূচিত হয়েছিল সেগুলি সম্পর্কে অসচেতন ছিলেন। বঙ্কিম এসবের ফলাফল মোকাবিলা করার চেষ্টা করেছিলেন, এমনকি যদিও তা ছিল প্রচলিত পদ্ধতিতে এবং সেক্ষেত্রে দত্ত কিংবা তাঁর সমসাময়িক অন্য যে-কারো চাইতে অধিকতর আবেগমূলক গভীরতা ও বাস্তবতার পরিচয় দিয়েছেন।
বঙ্কিমের কল্পনার ব্যাপ্তির পরিচয় পাওয়া যায় তাঁর বিষয়বস্তুসমূহ ও চরিত্রগুলির মধ্যে। তিনি শুরু করেছিলেন ইতিহাস-আশ্রয়ী প্রেমোপাখ্যান দিয়ে এবং এরপর খুব শীঘ্রই সৃষ্টি করলেন কপালকুণ্ডলার কাব্যিক চরিত্র। ইন্দিরা ও রজনী সাধারণ জীবনের সরল গল্প। ইন্দিরা দস্যুদের দ্বারা অপহৃতা হয় এবং উপন্যাসটিতে বর্ণিত হয়েছে স্বামীর সঙ্গে তার পুনর্মিলনের চেষ্টার গল্প। উপন্যাসটিতে প্রধানত স্ত্রী চরিত্রগুলি প্রধান এবং এদের বিন্যাস ও বর্ণনা নিম্নলয়ের। তবে এতদ্সত্ত্বেও এটিতে উঠে এসেছে ইন্দিরার পরিহাসমূলক ভালোবাসা এবং সুভাষিণীর সহানুভূতিপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। বঙ্কিম এ-উপন্যাসে একটি নতুন রচনারীতি ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন, কারণ উপন্যাসটি পুরোপুরি বর্ণিত হয়েছে ইন্দিরার বয়ানে। এর সাফল্যে উদ্দীপ্ত হয়ে তিন রজনীতে আরো উচ্চাভিলাষী রচনারীতি ব্যবহার করেছেন যেখানে কাহিনি বর্ণিত হচ্ছে বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে তাদের নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে। উপন্যাসে এই রীতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বঙ্কিম অবশ্যই Wilkey-এর Woman in White দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। এর সাফল্য নির্ভর করে একই ঘটনাবলি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এমনভাবে উপস্থাপন করার উপর যেখানে বিভিন্ন চরিত্রকে সজীব করে তোলা হয় উপস্থাপন-কৌশলের উপস্থাপনের মাধ্যমে। দুর্ভাগ্যক্রমে, বঙ্কিমের চরিত্রসৃজন যথেষ্ট স্বচ্ছ নয় এবং এমনকি বিভিন্ন চরিত্র যে-ভাষায় কথা বলে তাও তাদের উপযোগী নয়।
যদিও বঙ্কিমের অর্ধেকেরও বেশি উপন্যাসের কাহিনি ইতিহাস-আশ্রয়ী, তবুও তিনি ছিলেন অবশ্যই একজন সামাজিক বিষয়নির্ভর ঔপন্যাসিক। তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল সীমিত এবং ঐতিহাসিক কল্পনার শক্তি তাঁর ছিল না, যা অতীতের সমাজ বা সময়কালগুলি সৃষ্টি করতে পারে। আমরা এও দেখেছি যে, তাঁর বইগুলি চরিত্রের অন্তর্গত বিকাশ অথবা কোনো সময়কালের ভাবাদর্শের চিত্রণ থেকে তাদের ঐতিহাসিকতা গ্রহণ করেনি, বরং নিয়েছে রাজা-বাদশাদের অথবা অন্যান্য ঐতিহাসিক চরিত্রের সূত্রনির্দেশ থেকে। এমনকি ইতিহাস-আশ্রয়ী উপন্যাসগুলিতেও চরিত্রগুলি সেজন্য বস্তুত প্রধানত বঙ্কিমের সমসাময়িক কালের। তারা সজ্জিত থাকতে পারে জাঁকজমকপূর্ণ পোশাকে এবং বাস করতে পারে রাজপ্রাসাদে বা দুর্গে; কিন্তু তাদের কথাবার্তা ও কাজকর্ম অনিবার্যভাবে ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের মধ্যবিত্ত শ্রেণির বাঙালিদের মতোই। সমসাময়িক ঘটনাবলির বিবরণ হিসেবে তাঁর উপন্যাসগুলির প্রামাণিকতা অনেক বেশি, কিন্তু আমরা যখন সেগুলিকে ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করি, তখন সেগুলির অবাস্তবতার আবহের কারণে উপন্যাসগুলি আমাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারে না। বিষবৃক্ষ এবং কৃষ্ণকান্তের উইল-এর বিষয়বস্তু সমকালীন সমাজের। সেজন্যই সেগুলির সূচনা আনুকূল্য পায়। এই দুটি উপন্যাসে বঙ্কিম ঔপন্যাসিক হিসেবে তাঁর অর্জনের চূড়ায় পৌঁছেছেন।
দুটি উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে একটি অভিন্ন বিষয়বস্তু; নারীসৌন্দর্যের সর্বনাশা আকর্ষণ এবং পুরুষ তাদের তীব্র কামনা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার কারণে পরিবারসমূহে ভাঙন। সমসাময়িক সমাজের প্রেক্ষাপটে স্থাপিত উভয় উপন্যাসের বিষয়বস্তুতেই ঔপন্যাসিকের জন্য ছিল বিরাট সম্ভাবনা; কিন্তু দুটি উপন্যাসেই বঙ্কিম তাঁর অনড় সামাজিক ধারণাগুলিকে, তাঁর শৈল্পিক সহানুভূতিসমূহকে নস্যাৎ করে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। সমসাময়িক হিন্দু সমাজ বিধবাদের পুনর্বিবাহ সমর্থন করত না এবং সেজন্য বঙ্কিমের কাছে তা ছিল পাপ, এমনকি যে বিধবা পুনর্বিবাহ করছে সে যদি নিতান্ত শৈশবেও তার স্বামীকে হারিয়ে থাকে। বিষবৃক্ষে সূর্যমুখী ও নগেন্দ্র একটি দৃষ্টান্তমূলক দাম্পত্য জীবন যাপন করেছে কুন্দর প্রতি নগেন্দ্রর প্রেমোন্মাদনা তার অবসান ঘটানো পর্যন্ত। বঙ্কিম চেষ্টা করেছেন সূর্যমুখীকে একটি আদর্শ চরিত্র হিসেবে চিত্রিত করতে, কিন্তু সে থেকে গেছে একটি প্রথাগত চরিত্র ও কামশীতল। নগেন্দ্রকে তার ত্রুটির জন্য কোনো কারণ দর্শায় না, কিন্তু তার পরিচারিকা হীরা অথবা এমনকি বালিকা-বিধবা কুন্দর প্রতি সে যথাসম্ভব শীতল ও যথাযথ ব্যবহার দেখায়।
কুন্দ, তার সৌন্দর্য ও সারল্য সত্ত্বেও, আমাদের ভালোবাসার পরিবর্তে দয়ারই উদ্রেক করে। একজন বালবিধবা হিসেবে সে যাপন করেছে কঠিন জীবন এবং নরেন্দ্র যখন তার প্রতি স্নেহ ও মনোযোগ প্রদর্শন করেছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সে আপ্লুত হয়ে পড়েছে। তার শ্রদ্ধা নিতান্ত অসচেতনভাবে ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে, কিন্তু সে সহজে নগেন্দ্রর কাছে নিজেকে সমর্পণ করেনি। সূর্যমুখী যখন এতে হস্তক্ষেপ করেছে ও তাকে বিয়ে করার জন্য নগেন্দ্রকে অনুরোধ করেছে কেবল তখনই কুন্দ নতি স্বীকার করেছে। বিয়ের পর সে বুঝতে পারে না কেন তার প্রতি নগেন্দ্রর আকর্ষণ হঠাৎ শেষ হয়ে গেল। এতে নগেন্দ্র সূর্যমুখীর অনুপস্থিতি আরো তীব্রভাবে অনুভব করতে পারে। সূর্যমুখীর জন্য নগেন্দ্রর আকুলতা যতই বাড়তে থাকে, কুন্দর কষ্টও ততই বৃদ্ধি পায়। হারিয়ে যাওয়া ও বিভ্রান্ত একটি শিশুর মতো সে ভাগ্যের এই পরিহাসকে মেনে নিতে ব্যর্থ হয়। এরপর হীরা যখন তাকে প্ররোচিত করে এবং তার জীবন শেষ করে দেওয়ার উপায় বলে দেয়, তখন সে আত্মহত্যার মাধ্যমে তার জীবনাবসান ঘটানোর একটি সহজ উপায় গ্রহণ করে।
এ-উপন্যাসে নগেন্দ্র, সূর্যমুখী ও কুন্দ – সবাই একক মানবসত্তা হয়ে ওঠার পরিবর্তে বরং একঘেয়ে বৈচিত্র্যহীন চরিত্রই থেকে যায়। এটা খুবই অদ্ভুত ব্যাপার যে, উপন্যাসটিতে প্রথমদিকের দুটি প্রাণবন্ত চরিত্রই খলচরিত্র। এটা কি ছিল বঙ্কিমের একই বিষয় নিয়ে পড়ে থাকার কিছুটা ক্ষতিপূরণের মতো যে, তাঁর গোপন সহানুভূতি থাকতে হবে সন্দেহজনক চরিত্রের পুরুষ ও নারীদের প্রতি? যে যাই হোক, বিষবৃক্ষের দেবেন্দ্র তার সব ব্যর্থতা ও দুর্বলতা সত্ত্বেও একটি প্রাণবন্ত চরিত্র, তবে উপন্যাসটির আসল নায়িকা হচ্ছে সূর্যমুখীর পরিচারিকা হীরা। মনের দিক থেকে বিদ্রোহী সত্তার অধিকারিণী হীরা গরিব হলেও গর্বিতা এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, তার মালকিনের চেয়ে শ্রেয়তর না হলেও সে তার সমকক্ষ। অল্প বয়সে বিধবা হওয়ার কারণে সে তার স্বাভাবিক যৌনসুখ থেকে বঞ্চিত হয়ে দেবেন্দ্রের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। দেবেন্দ্র অবশ্য তার প্রতি আকৃষ্ট হয়নি, কিন্তু কুন্দকে পাওয়ার জন্য শুধু তাকে ব্যবহার করতে চেয়েছে। এ-কারণে সে কুন্দর প্রতি তীব্র ঈর্ষা পোষণ করেছে এবং স্থির করেছে যে, একটি আঘাতের দ্বারাই সে কুন্দ ও সূর্যমুখী উভয়ের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করবে। তার তীব্র কামনাবেগ তাকে দেবেন্দ্রর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছে, কিন্তু সে বুঝতে পেরেছে যে, দেবেন্দ্র তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। ইতোমধ্যে সে সূর্যমুখীর সুখ ধ্বংস করে দিয়েছে এবং এখন বিষ প্রয়োগে মৃত্যু ঘটানোর মাধ্যমে কুন্দর উপরও প্রতিশোধ নিয়েছে।
একজন বিধবার স্বাভাবিক জীবনের জন্য আকাঙ্ক্ষা এবং সে কারণে যেসব দুঃখজনক পরিণতি ঘটে সেটি কৃষ্ণকান্তের উইল উপন্যাসেরও বিষয়বস্তু। সেখানে অবশ্য চরিত্রচিত্রণের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কিছু অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। বিষবৃক্ষের সূর্যমুখীর অনুরূপ নয় কৃষ্ণকান্তের উইল-এর ভ্রমর। সে ঈর্ষা ও সন্দেহের বিষয়ে স্পর্শকাতর। ভ্রমর গৎবাঁধা ধরনের স্ত্রীরও প্রতিমূর্তি নয়। চিরাচরিত হিন্দু স্ত্রী’র বিপরীত ধরনে সে স্বামীকে বিচার করে দেখতে চায়। সূর্যমুখী কখনো বলতে পারত না যেমন ভ্রমর বলেছে, ‘আপনি আমার শ্রদ্ধার যোগ্য নন।’ ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ধারণা ভ্রমরের দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দিয়েছে এবং সে অন্য এক স্ত্রীর সঙ্গে স্বামীকে ভাগ করে নিতে প্রস্তুত নয় এবং তার চেয়েও কম প্রস্তুত তার ঘরণী হয়ে থাকতে। বস্তুত স্বামীর প্রতি তার সার্বক্ষণিক সন্দেহই তার স্বামীর পতনের আংশিক কারণ। সে যে কৃষ্ণবর্ণ ও প্রচলিত মানবিচারে সুন্দরী নয় – এ বিষয়ে সে সচেতন। সব সুন্দরী রমণী তার সুন্দর স্বামীকে প্ররোচিত করার জন্য মুখিয়ে রয়েছে – এই চিন্তায় সে ভীতা!
গোবিন্দলালকে লেখক চিত্রিত করেছেন প্রচলিত নৈতিক আদর্শসম্পন্ন একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে। যদি তার জীবনে প্রলোভন না আসত তাহলে সে একজন বিশ্বস্ত স্বামী হিসেবেই থেকে যেত। যদি ভ্রমর তার অহমিকায় আঘাত না করত তাহলে সে একজন শান্তচিত্ত স্বামী হিসেবে তাকে ভালোবেসে যেত। রোহিণী যখন প্রথম তার জীবনে এলো তখন গোবিন্দলালের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল সহানুভূতি। রোহিণীর ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থার জন্য সে দুঃখ পাচ্ছিল এবং তাকে বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করার চেষ্টা করেছিল। রোহিণী ছিল স্নেহ-ভালোবাসার কাঙাল এবং গোবিন্দলাল তার প্রতি যে সহানুভূতি দেখিয়েছিল তাতে ভালোবাসার আবেগে সে ভেসে গিয়েছিল। কিন্তু প্রথমদিকে গোবিন্দলালের সুখী সংসার ভাঙার কোনো ইচ্ছা তার ছিল না। যখন সে বুঝতে পারল যে, গোবিন্দলালকে সে ভালোবেসে ফেলেছে, তখন সে সঙ্গে সঙ্গে ভ্রমরের উপদেশ মেনে নিয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছে। এই চেষ্টাই তাকে এমন এক পরিস্থিতিতে নিয়ে যায় যেখানে তার সৌন্দর্যে গোবিন্দলাল বিমোহিত হয়েছে। এর আগে পর্যন্ত তারা দুজনেই ঐতিহ্যগত নৈতিকতাকে আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু এখন প্রেমাবেগ তাদের পরাস্ত করেছে। তবে ঘটনার দুঃখজনক পরিণতি হয়তো তখনো এড়িয়ে যাওয়া যেত। কিন্তু ভ্রমরের ঈর্ষা ও গর্ব এবং গোবিন্দলালের আত্মশ্লাঘা একত্র হয়ে গোবিন্দলালকে রোহিণীর বাহুযুগলের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
চন্দ্রশেখর-এর শৈবলিনীর মতো রোহিণী চরিত্রও প্রথমদিকে চিত্রিত হয়েছে অনেক বেশি শৈল্পিক অন্তর্দৃষ্টি ও সহানুভূতির সঙ্গে। চন্দ্রশেখর-এর মতো এতেও নীতিবাদীর হস্তক্ষেপ ঘটেছে এবং এর ফলে এটি একটি মহৎ উপন্যাস হয়ে ওঠার যে সম্ভাবনা ছিল তা নষ্ট হয়ে গেছে। একথা সত্য যে, কৃষ্ণকান্তের উইল-এ বঙ্কিম রোহিণী চরিত্রটিকে এমনভাবে নির্মাণ করেছেন যেন অন্তিম গ্রন্থিমোচন কম অসম্ভাব্য হয়ে পড়ে। রোহিণী কখনো নতি স্বীকারের ধারণায় তার বৈধব্যকে মেনে নেয়নি। সাধারণ সব হিন্দু বিধবার মতো বৈধব্যবেশ ধারণ না করে সে বেশ ভালো কাপড়চোপড়ই পরত এবং অলংকারের প্রতিও তার বিরাগ ছিল না। আর সমাজের অনুমোদিত নৈতিক রীতি ও আচারাদি লঙ্ঘন করতেও সে ভয় পেত না। হরলাল তাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়েছিল বলেই সে কৃষ্ণকান্তের উইলটি চুরি করতে সম্মত হয়েছিল। অতএব বিধবার পুনর্বিবাহ নিষিদ্ধ প্রথাটির বিরুদ্ধে গিয়ে সেটি ভেঙে ফেলতে অথবা নিজ উদ্দেশ্যসাধনে চৌর্যবৃত্তিতে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারেও তার কোনো দ্বিধা ছিল না। পরবর্তীকালে যখন গোবিন্দলাল তার প্রতি অনুকম্পা দেখিয়েছে, তখন হরলালকে যে কথা দিয়েছিল তার অন্যথা করতে ও গোবিন্দলালের স্বার্থের অনুকূল মূল দলিলটি পুনরায় যথাস্থানে রেখে আসার ব্যাপারে তার মধ্যে কোনো দ্বিধাবোধ কাজ করেনি। যখন সে গোবিন্দলালের প্রতি অনুরাগ অনুভব করেছে তখন এমনকি ভ্রমরের কাছে তা প্রকাশ করতেও সে দ্বিধা করেনি, যদিও সে জানত যে, এটি ভ্রমরকে গভীরভাবে আহত করবে এবং সম্ভবত গোবিন্দলালের সুখের নীড় ধ্বংস করে দেবে। যখন গোবিন্দলাল তাকে জলে ডুবে মরা থেকে রক্ষা করল, তখনই সে হয়ে পড়ল প্রণয়িনী। সেটি যতখানি বেশি প্রেমানুরাগের কারণে ততখানি কৃতজ্ঞতাবোধের কারণে নয়।
বঙ্কিম এসব বিভিন্ন ইঙ্গিতের মাধ্যমে রোহিণীর অন্তিম পতনের ব্যাপারে আমাদের প্রস্তুত থাকার জন্য চেষ্টা করেছেন, কিন্তু যেভাবে সেটি ঘটে তা আমাদের ধাক্কা দেয়। হয়তো এমন হতে পারে যে, রোহিণী গোবিন্দলালকে নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল এবং নতুন প্রেমিক পেতে চেয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও গোবিন্দলালের প্রতি তার ভালোবাসা যেভাবে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল তা দাবি করে যে, তার থেকে রোহিণীর মোহমুক্তিও ক্রমলয়ে ঘটা উচিত ছিল। তবে যা ঘটেছিল তা অনেকটা যেন টুপির ভেতর থেকে খরগোশ বের করার মতো। গোবিন্দলাল ও রোহিণী মোটামুটি সুখী জীবনই যাপন করছিল এবং তাদের পারস্পরিক সাহচর্যের মধ্যে সাংগীতিক লয় ও মাধুর্য উভয়ই ছিল। নিশিকান্ত এসে উপস্থিত হয় এই সুখী পরিবারজীবনে এবং রোহিণী তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নেয় গোবিন্দলালকে ছেড়ে নিশিকান্তের কাছে যাওয়ার। গোবিন্দলাল তা জানতে পারে এবং সস্তা নাটকের চিরচেনা নায়কের মতো গুলি করে রোহিণীকে অনতিবিলম্বে হত্যা করে। গোবিন্দলাল যদি প্রকৃতই রোহিণীর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলত, যেমনটা বঙ্কিম বলার চেষ্টা করেছেন, তাহলে ঈর্ষার এই আকস্মিক উন্মাদনা মনে হয় যথার্থ কারণসম্মত নয়। পক্ষান্তরে যদি গোবিন্দলাল তখনো রোহিণীকে ভালোবাসত, তাহলে সে অন্তত চেষ্টা করত এ-ধরনের নাটকীয় গুলি চালানোর আগে রোহিণীর কাছ থেকে ব্যাখ্যা শোনার।
বাঙলা উপন্যাসের ছাত্রদের উপর বঙ্কিমের দুটি দাবি আছে। তিনি ছিলেন পথিকৃৎ এবং মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবন নিয়ে প্রথম শ্রেণির উপন্যাস রচনার সম্ভাব্যতার পথনির্দেশ তিনি করেছিলেন। একই সঙ্গে বাঙলা উপন্যাসকে তিনি এমন এক পর্যায়ে উন্নীত করেছিলেন যেখানে তা বাঙলার সবচেয়ে সম্ভাবনাশীল লেখকদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছিল। তাঁর প্রধান কৃতিত্ব অতএব এই যে, তিনি বাঙলা উপন্যাসের সূচনা করেছিলেন এবং এর ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পথনির্দেশও করেছিলেন। সমকালীন বাঙালি সমাজকে বেঁধে-রাখা সংকীর্ণ প্রচলিত রীতিনীতি সম্পর্কে সচেতন থাকার ফলে তিনি চমকপ্রদ ঘটনাবলি ও বিষয়ের সন্ধানে ইতিহাসের আশ্রয় নিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক কল্পনাশক্তির অভাব থাকায় তিনি অবশ্য অতীত যুগগুলির মর্মকথা পুনরাবিষ্কার করতে পারেননি। ভারতীয় অর্থনীতির পরিবর্তন সাধনকারী ও নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণি সৃষ্টিকারী নতুন শিক্ষাব্যবস্থার ফসল বঙ্কিম তাঁর সব মনোভাব ও মতামতের দিক থেকে ছিলেন অনিবার্যভাবে একজন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। তাঁর ঐতিহাসিক চরিত্রগুলি চূড়ান্ত বিশ্লেষণে রাজা-রানী এবং লর্ড ও লেডিদের পোশাক ও প্রতীকী সাজপোশাক সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত মধ্যবিত্ত নারী ও পুরুষ। তাঁর ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলিতে প্রকৃত বীরত্বব্যঞ্জক কোনো চরিত্র নেই এবং আসল নায়ক-নায়িকারা সবাই মধ্যবিত্ত শ্রেণিরই প্রতিনিধি।
এই একই বক্তব্য আবার অন্যভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে একথা বলে যে, বঙ্কিম অনেক ঐতিহাসিক চরিত্র তাঁর উপন্যাসে নিয়ে এসেছেন, কিন্তু তাঁর উপন্যাসগুলি অনিবার্যভাবে সামাজিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার উপন্যাস। যেখানে তাঁর সামাজিক উপন্যাসগুলির মধ্যে বিষয় ও মর্মবস্তুর সমন্বয় ঘটেনি সেখানে ফলাফল সন্তোষজনক হওয়ার চেয়ে অনেক দূরে রয়ে গেছে। এমনকি সেসব উপন্যাসে মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতি তাঁর প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গি ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির নৈতিকতার প্রতি সমর্থন উপন্যাসের চরিত্রের স্বাভাবিক/ অবাধ বিকাশকেও ব্যাহত করেছে। এমনকি দেবী চৌধুরানী বা শ্রী’র মতো রোমান্টিক চরিত্রও শেষ পর্যন্ত লয়প্রাপ্ত হয় মধ্যবিত্ত শ্রেণিসুলভ নৈতিকতা দ্বারা। এদের সবার মধ্যে সবচেয়ে রোমান্টিক কপালকুণ্ডলা এর থেকে বেরিয়ে যেতে পারত শুধু মৃত্যুর হাত ধরেই। প্রকৃত অর্থে সবল চরিত্র শৈবলিনী বা রোহিণী নিজেদের দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেছিল বঙ্কিমের প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঔপন্যাসিক বঙ্কিমের ওপর জয়ী হন নীতিবাদী বঙ্কিম এবং তাদের দুজনের একজনকে উন্মাদিনীতে পরিণত করেন ও অপরজনকে মৃত্যুপথে ঠেলে দেন।
সকল সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বঙ্কিমের মধ্যে কল্পনাশক্তি সংবলিত অন্তর্দৃষ্টি ছিল, যা একজন ঔপন্যাসিকের জন্য আবশ্যিক গুণ। এসব গুণ তাঁর সব রচনার মধ্যে স্পষ্টতা ও দৃঢ়তা যুক্ত করেছিল এবং সেগুলিতে অন্তর্জীবনের স্পর্শও দিয়েছিল। তিনি পাশ্চাত্যের চ্যালেঞ্জ বিষয়ে সচেতন ছিলেন এবং নিজেদের জাতীয় পরিচয় বর্জন না করেই তাঁর রচনায় একে স্থান দিতে চেয়েছিলেন। তিনি বাঙলার জায়মান রেনেসাঁসে অংশ নিয়েছিলেন এবং পাশ্চাত্যের অনেক মূল্যবোধ গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। তাঁর সমকালীন অন্যদের মতো তিনিও জীবনের সকল দিকের একটি সংশ্লেষণ অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। যখনই তিনি কোনোকিছু পছন্দ করার জায়গায় পৌঁছেছেন, তখনই তিন তাঁর নিজ দেশের অতীত ঐতিহ্যগুলির প্রতি ফিরে তাকিয়েছেন। এটিই তাঁর মূল প্রোথিত করেছিল ভারতীয় ঐতিহ্যে এবং তাঁর শক্তি ও প্রাণশক্তির আধার হয়ে উঠেছিল।
বঙ্কিমের উপন্যাস কখনো কখনো ইউরোপীয় ট্র্যাজেডিগুলির বৈশিষ্ট্যসমূহকে ধারণ করেছে। ট্র্যাজেডির নির্যাস নিহিত মানবিক প্রয়াসের অসারতায়, যেখানে এমনকি মহত্তম চরিত্রটিও পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণ করে। মানুষ অবশ্য মর্যাদা অর্জন করে অপরিবর্তনীয় ভাগ্যকে অগ্রাহ্য করার মাধ্যমে। বঙ্কিম ইউরোপীয় ট্র্যাজেডির এই বৈশিষ্ট্য দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছিলেন। তবে তিনি অবশ্য নিঃশর্তে একে গ্রহণ করতে পারেননি, যেহেতু হিন্দু দৃষ্টিভঙ্গিতে বলা হয় ধর্ম অবশ্যই অধর্মের বিরুদ্ধে জয়ী হন। বঙ্কিম এই দ্বন্দ্ব অতিক্রম করতে চেয়েছিলেন কোনো ক্রিয়ার মাধ্যমে নয়, বরং পরিস্থিতির ওপর অধিক জোর প্রদানের মাধ্যমে। কপালকুণ্ডলা এবং পরবর্তী উপন্যাসগুলিতে আমরা ট্র্যাজেডির অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব দেখতে পাই না, কিন্তু তার ক্ষতিপূরণ করা হয় মানবিক প্রয়াসের অসারতার ভাব ও অতিপ্রাকৃতিক শক্তিসমূহের মহাকাব্যিক মহিমময়তার দ্বারা। সীতারাম উপন্যাসে শ্রী’র দাম্পত্য ভালোবাসাই তার নায়কের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এটি একটি কারণ যার জন্য কিছু সমালোচক বলেন যে, আধুনিক ধারণামানের বিচারে বঙ্কিম কোনো উপন্যাস লেখেননি। তাঁর উপন্যাসগুলি সত্যিকার অর্থে রোমান্টিক ট্র্যাজেডি, কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সেগুলি ইউরোপীয় ঐতিহ্য থেকে দূরে সরে গেছে। ইউরোপীয় ট্র্যাডেজিতে পরাজয়ে, এমনকি চরম সর্বনাশেও, একটি গৌরব থেকে যায়। বঙ্কিমের ক্ষেত্রে ভালোর বিষয়টি পেছন থেকে উঁকি মেরে থাকে এবং অবশ্যই অন্তিমে জয়ী হয়। তিনি মানবিক পূর্ণতা কামনা করেছেন প্রায়োগিকভাবে গ্রহণের মাধ্যমে এবং এক্ষেত্রে ইউরোপ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। একই সঙ্গে প্রয়োগবাদকে তিনি স্থাপন করতে চেয়েছেন জ্ঞান, প্রেম ও ক্রিয়াকর্মের সার্বিক উপলব্ধির ভিত্তির ওপর যার প্রেরণা তিনি আহরণ করেছিলেন তাঁর ভারতীয় ঐতিহ্য থেকে। ইউরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি সম্মুখদৃষ্টিমূলক, যেখানে উপনীত হওয়ার চেয়ে ভ্রমণই শ্রেয়তর। এর ক্ষেত্রে সব অভিজ্ঞতাই হচ্ছে একটি খিলানাকৃতি তোরণের মতো, যেটির কিনারাগুলি অস্পষ্ট হয়ে যেতে থাকে চিরতরে যখন আমরা তার নিচ দিয়ে এগিয়ে যাই। ভারতের ক্ষেত্রে নতুনত্বই যথেষ্ট নয় এবং এর ভিত্তি হতে হবে সমগ্রতার গভীরতর উপলব্ধি বা স্বজ্ঞা। এটি বঙ্কিমের কৃতিত্ব যে, তিনি এই পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে একটি আংশিক সাযুজ্য নিয়ে আসতে পেরেছিলেন। এই অর্জন এবং গল্পবলিয়ে হিসেবে তাঁর দক্ষতার কারণেও, অনেক ত্রুটিবিচ্যুতি থাকা সত্ত্বেও, বঙ্কিম স্মরণীয় হয়ে আছেন আধুনিক ভারতের প্রথম মহান ঔপন্যাসিক হিসেবে। তিনিই প্রথম বাঙালি লেখক যিনি বাঙলা উপন্যাসকে একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.