আবুল হাসনাত স্মারক বক্তৃতা : ‘মানুষের সম্মিলনের ভিত্তিতেই সম্ভাবনা তৈরি হয় গণমানুষের মুক্তির’

কালি ও কলমের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক আবুল হাসনাত স্মরণে গত ১লা নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ‘আবুল হাসনাত স্মারক বক্তৃতা’। রাজধানীর ধানমণ্ডিতে বেঙ্গল শিল্পালয়ে বিকেল ৫টায় আয়োজিত এবারের বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘সাহিত্য ও গণমুক্তির সাধনা’।

এই আয়োজনে মূল বক্তা ছিলেন কবি ও প্রাবন্ধিক আবুল মোমেন। আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন কথাসাহিত্যিক ওয়াসি আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কালি ও কলমের সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি এমেরিটাস অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন কালি ও কলমের সম্পাদক সুব্রত বড়ুয়া এবং অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য লুভা নাহিদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানের শুরুতে আবুল হাসনাতের স্মৃতিচারণ করেন তাঁর সহধর্মিণী সাংবাদিক নাসিমুন আরা হক।

স্বাগত বক্তব্যে সুব্রত বড়ুয়া বলেন, আবুল হাসনাতকে স্মরণ করার সময় সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার দীর্ঘ সময়কে স্মরণ করি আমরা। এতে নিজেদের পথচলা কতটুকু হলো, তাও বুঝতে পারি। তিনি আরো বলেন, কালি ও কলম পত্রিকার যে-ধারা আবুল হাসনাত সৃষ্টি ও রক্ষা করেছিলেন; সেটাই বজায় রাখার চেষ্টা করছি আমরা। এ সময় তিনি আবুল হাসনাতের চরিত্রমাধুর্য এবং সাহিত্যানুরাগের কথা উল্লেখ করে বলেন, তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ও বন্ধুত্ব গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে। তাঁর আহ্বানেই আমার কালি ও কলমে যোগ দেওয়া এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে পত্রিকাটি চালিয়ে নেওয়ার গুরুদায়িত্ব বহন করা।   

মূল প্রবন্ধে আবুল মোমেন বলেন, গত শতকের ষাটের দশক ছিল আমাদের প্রজন্মের জেগে ওঠার কাল। কৈশোর পেরোতে পেরোতে আমরা জেনেছি, এ-জগৎ স্বপ্ন নয়, আন্দোলন-সংগ্রামে সত্যিই রক্তের অক্ষরে লেখা হচ্ছিল আমাদের কালের রূপ। তিনি আরো বলেন, আমাদের ষাটের দশক এবং তার আগের পঞ্চাশের দশককে বাঙালি মুসলমানের জাগরণের কাল আখ্যায়িত করেছিলেন অনেকে। এই দুই দশকের জাগরণের কালে হাসনাত ভাই এবং তাঁদের পেছন পেছন আমরাও, পরিবারের গণ্ডি ভেঙে দেশ এবং বিশ^জগতের প্রতি উন্মুখ জিজ্ঞাসা নিয়ে পথ চলতে শুরু করি।

তিনি বলেন, সংস্কৃতি নিছক আর্ট বা শিল্পকলা নয়; এর বিস্তার নিত্যদিনের প্রতিটি কাজ-সাজ, চলা-বলা, শখ-প্রবণতাসহ সব কর্মকাণ্ডেই প্রকাশ পাবে। কিন্তু আমাদের পরীক্ষানির্ভর মুখস্থবিদ্যার ফলাফলকেন্দ্রিক শিক্ষায় বৈচিত্র্য ও বহুত্বের স্বাদ-সামর্থ্য নিয়ে সংবেদনশীল, রুচিশীল, আত্মবিশ্বাসী মানুষ হয়ে ওঠার কোনো অবকাশ রাখা হয়নি। মানববিকাশের এই সংকট গভীর হলে সে-সমাজে গণতন্ত্র যথার্থ রূপে বিকশিত হতে পারে না এবং গণতন্ত্রের অভাবে অনেক সময় রাষ্ট্র ও সমাজ একাকার হয়ে মত প্রকাশের অধিকার কেড়ে নিয়ে মানবিক বিকাশের সর্বনাশ ঘটায়।

প্রবন্ধে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বের সংস্কৃতির রাজনীতির বিভিন্ন সংকট তুলে ধরে আবুল মোমেন বলেন, বিচ্ছিন্নতা, আত্মকেন্দ্রিকতার খোলস ভাঙতে হবে। সাহিত্য, সংগীত, চিত্রকলা, নাটক, চলচ্চিত্র, স্থাপত্য, ভাস্কর্যের রস-রূপের খোঁজ পেতে হবে, জীবনের দায় হিসেবেই এসবেরও চর্চায় মেতে উঠতে হবে নতুন প্রজন্মকে। তিনি বলেন, মানুষের সম্মিলনের ভিত্তিতেই সম্ভাবনা তৈরি হয় গণমানুষের মুক্তির।

আলোচনাকালে আবুল হাসনাতকে ‘লাজুক’ মানুষ উল্লেখ করে ওয়াসি আহমেদ জানান, তিনি ব্যক্তিত্বের বর্ম পরে থাকলেও তাঁর বেলায় সেটা ভেঙে দিয়েছিলেন। তিনি আরো বলেন, লেখালেখির শুরুতে আবুল হাসনাত তাঁকে উজ্জীবিত করেছেন এবং তাঁর তাড়নাতেই তাঁর সাহিত্যচর্চা বেগবান হয়েছে।

পঠিত প্রবন্ধ প্রসঙ্গে ওয়াসি আহমেদ বলেন, ‘গণমুক্তি ও মানুষের মুক্তির সাধনা’ প্রবন্ধে মানুষের মুক্তির সঙ্গে রাষ্ট্রকাঠামোর প্রতিটি দিক কতভাবে সম্পৃক্ত, তা তুলে ধরা হয়েছে। পরিবেশের আনুকূল্য না থাকায় যে বিপর্যয় ঘটছে, তা-ও উল্লেখ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সমাজে বৃহত্তর পরিসরে মুক্ত আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি। ওয়াসি আহমেদ বলেন, আমার মনে হয়, ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমাদের সবার শিল্প-সাহিত্যের চর্চা ও মনন বিকাশের জন্য কাজ করে যাওয়া উচিত। তাহলেই হয়তো একটি সত্যিকারের মুক্ত পরিবেশ আমরা পাব।

সভাপতির বক্তব্যে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, আবুল হাসনাত চিন্তার অনেক স্মৃতি ও সূত্র রেখে গেছেন, যা সামনের পথ দেখায়। তিনি বলেন, আবুল হাসনাত অনেক মানুষকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছেন। সাহিত্যের গভীরে যেসব বিষয়ের সংযোগ থাকে তা তিনি নিজের মাঝে ধারণ করতেন।

সত্তরের দশক থেকে তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের কথা উল্লেখ করে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, একটি দেশের সংস্কৃতি একদিনে গড়ে ওঠে না। বহুজনের থাকে নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আবুল হাসনাত ছিলেন তেমনই একজন মানুষ।

অনুষ্ঠানে পঠিত প্রবন্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, গণমুক্তি অর্থ শুধু রাজনৈতিক মুক্তি নয়; মানুষের চিন্তার মুক্তি। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, আমাদের জ্ঞানমুক্তির হাতিয়ার বদলে গেছে। বইয়ের জায়গা দখল করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কিন্তু এসবের ভালো-খারাপ নির্ণয় করার চিন্তা নিরপেক্ষভাবে আমরা করতে পারছি না।  ফলে মানুষ এককেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে, যা মননশীল সমাজ ও রাষ্ট্রের বিকাশের অন্তরায়।

আবুল হাসনাতের সহধর্মিণী নাসিমুন আরা হক বলেন, আবুল হাসনাতের সারাজীবনই নিবেদিত ছিল সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে। কাজেই ছিল তাঁর আনন্দ। যখন যে-কাজ করেছেন, তা আনন্দেই করেছেন। ছাত্র-আন্দোলন থেকেই আবুল হাসনাতও ছিলেন দেশের মুক্তবুদ্ধি চর্চার নিরলস কর্মী।

অনুষ্ঠানের শুরুতে আবুল হাসনাতের কর্মময় জীবনের পরিচিতি তুলে ধরেন লুভা নাহিদ চৌধুরী। তিনি বলেন, এদেশের সাহিত্যের পরিচর্যায় আবুল হাসনাত ছিলেন অক্লান্ত।

প্রসঙ্গত, ২০২০ সালের ১লা নভেম্বর পরলোকগমন করেন কবি, কথাসাহিত্যিক, শিল্প-সমালোচক এবং সর্বোপরি সফল সম্পাদক আবুল হাসনাত। তিনি দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে সম্পাদনা করেছেন দৈনিক সংবাদ-এর ‘সাহিত্য সাময়িকী’ এবং একসময় তা হয়ে উঠেছিল এদেশের সাহিত্যের দর্পণ। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে নানা পত্রপত্রিকা ও সাহিত্যপত্র সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালির প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে তিনি দৃঢ় ভূমিকা রেখেছেন। আবুল হাসনাত এদেশের শিল্প-সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। তাঁকে স্মরণ করে প্রতিবছর এই স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করে থাকে কালি ও কলম।