ফোকলোর-চর্চার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও রূপান্তরের ধারা

সাম্প্রতিক কালে পাশ্চাত্যবিশ্বে বিশেষ করে ইউরোপের স্ক্যানডিনেভিয়ান অঞ্চল, মধ্য ও উত্তর-পূর্ব ইউরোপের হাঙ্গেরি, | রাশিয়া, উত্তর-পশ্চিম ইউরোপের এস্তোনিয়া, পশ্চিম ইউরোপের জার্মানি এবং উত্তর আমেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিলে ফোকলোরের ধারণাগত এবং গবেষণার গুরুত্ব পরিবর্তনের (shift of emphasis) ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গেছে। ফোকলোর (Folklore) শব্দটির উদ্ভাবনা অবশ্য ইংল্যান্ডে, ১৮৪৬ সালে। এর আগের অ্যান্টিকুইটি (Antiquity) শব্দটি শুধু পুরাতত্ত্বকে বোঝাত না, ফোকলোর-এর ধারণাকেও এর মধ্যে চিহ্নিত করা হতো। এই অস্পষ্টতার বৃত্ত ভেঙে উপযুক্ত অ্যাংলো-স্যাকশন শব্দ Folklore-এর উদ্ভাবন করেন। বৃটিশ পুরাতাত্ত্বিক উইলিয়াম জন থমস (William John Thoms ) । ফোকলোরের অস্তিত্ব যে এর আগে ছিল না এমন নয়, বলা হয় দুহাজার বছর আগে চীন দেশে ফোকলোরের এক ধরনের ব্যবহার ছিল। হান রাজবংশ তাদের শাসনকাজের সুবিধার্থে জন-মানসিকতাকে বোঝার জন্য শাসিতের

ফোকলোরের ওপর কিছুটা নির্ভর করত বলে জানা যায়। তবে ওই বিচ্ছিন্ন চর্চার ইতিহাসগত কিছু মূল্য থাকলেও ধারাবাহিকতাগত, তাত্ত্বিক ও অ্যাকাডেমিক কোনো তাৎপর্য নেই বললেই চলে।

‘ফোকলোর’ শব্দের উদ্ভাবক উইলিয়াম থমস ও তাঁর উদ্ভাবিত শব্দটি অবশ্য ঐতিহাসিক, তাত্ত্বিক ও অ্যাকাডেমিক সকল রকম গুরুত্বই পেয়েছে। শুধু বৃটেনে নয় তাঁর উদ্ভাবিত শব্দটি এখন প্রায় গোটা বিশ্বের (ফ্রান্সে অবশ্য traditions popularaise বলে) বিদ্বজ্জন ও সংস্কৃতি অনুরাগীদের মধ্যে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। থমস ফোকলোর বলতে বুঝিয়েছেন, ‘পুরনো দিনের ব্যবহার, রীতি-পদ্ধতি, অনুষ্ঠান ও পর্বাদির উদযাপন, সংস্কার, গীতিকা, প্রবাদ ইত্যাদি।’

উনিশ শতকে ফোকলোর শব্দটির উদ্ভাবনের সুবাদে থমস বিখ্যাত হয়ে গেলেও অষ্টাদশ শতকের শেষ দিকেই গোছালোভাবে ফোকলোর চর্চার সূচনা হয় জার্মানিতে এবং কিছু পরে ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইডেন প্রভৃতি দেশে।

ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের অবসানের পরে শিল্পবিপ্লব, পুঁজিবাদী অর্থনীতি ও নতুন স্বাদেশিক বুর্জোয়া শ্রেণি ও গণতন্ত্রের বিকাশের ফলে যে নতুন সেক্যুলার জাতীয়তাবাদ, জাতিরাষ্ট্র ও নগরকেন্দ্রিক শিল্প-সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে তার ফলে প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা ঐতিহ্যগত গ্রামীণ কৃষিভিত্তিক সমাজের বিলীয়মান সংস্কৃতিই ফোকলোর হিসেবে চিহ্নিত হয়। রোমান্টিক জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নতুন জাতিরাষ্ট্রের নবশিক্ষিত ও নগরবাসী মধ্যবিত্ত সমাজ শিকড় সন্ধানের লক্ষ্যে স্বদেশের প্রাচীন ঐতিহ্য-অনুসন্ধান প্রবণতা থেকেই ফোকলোরকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে। নতুন আর্থসামাজিক ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠা নাগরিক সমাজ প্রাক্তনের স্মৃতি (nos- talgia) তাড়িত হয়ে ফোকলোর সম্পর্কে এই নবচেতনা লাভ করে। ইংল্যান্ডে থমসের ফোকলোর শব্দের উদ্ভাবনার পর যে স্বতঃস্ফূর্ত ফোকলোর অনুরাগ লক্ষ করা যায় তা বিশ্বব্যাপী নতুন গতিবেগই শুধু লাভ করেনি ফোকলোর চর্চার প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো নির্মাণেও মনোযোগী হয়েছে। তার প্রমাণ ১৮৭৮ সালে বৃটিশ ফোকলোর সোসাইটি ও ১৮৮৮ সালে আমেরিকান ফোকলোর সোসাইটির প্রতিষ্ঠা। ইংরেজি ভাষার বিশ্বব্যাপী প্রসারের কারণে মধ্য উনিশ শতকে বৃটেনের ফোকলোর চর্চা একটা আন্তর্জাতিক আবহ তৈরি করলেও অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে জার্মানিতেই ফোকলোর চর্চা গভীরতর মাত্রা ও ব্যাপ্তি লাভ করে। জার্মানির এই প্রগাঢ় ফোকলোর অনুরাগের ফসল জার্মান দার্শনিক ও সংস্কৃতি তাত্ত্বিক ইয়োহান ফন গডফ্রিড হার্ডারের (Johann Gottfried von Herder, 1744- 1803) কিছু চাবি শব্দের (keywords) উদ্ভাবন যথা: volkslid (folksong), volks- glaube (folk belief) ও volksseele (folk- soul) ইত্যাদি। এবং তাঁর লোকসঙ্গীতের বিখ্যাত সংগ্রহ Stimmen der volker in Liedern (১৭৭৮-৭৯) প্রকাশ। মনে হয় এর ফলে রোমান্টিক ধারণাজাত das volk থেকে volkskunde শব্দের সৃষ্টি। গ্রিম ভ্রাতৃদ্বয়ের জগদ্বিখ্যাত রূপকথা সংকলন Kinder und Hausmarchen (১৮১২) প্রকাশিত হবার পর ফোকলোর একটা বিষয়গত রূপ নিতে থাকে। জার্মান শব্দ das volk, volkskunde (লোক, ফোকলোর) প্রভৃতি শব্দের অনুষঙ্গে থমস Folklore শব্দটি প্রচলন করেন বলে ধারণা করা হয়। Volkskunde ও Folklore একই অর্থ বহন করে। হার্ডার রোমান্টিক জাতীয়তাবাদের অনুকূলে ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য এবং মতাদর্শের সমন্বিত কল্পচিত্র (unified vision) হিসেবে das volk, volkskunde শব্দসমূহের প্রবর্তন করেন। একালের প্রখ্যাত ফোকলোর-তাত্ত্বিক Richard Bauman বলেছেন, ‘In Herder’s conception, culture and tradition found their highest and truest expression in the poetry of the folk, its folksong and folklore.’ জার্মানির ফোকলোর চর্চায় যেমন হার্ডার ও দুই গ্রিমভাই অগ্রনায়ক ছিলেন তেমনি সমসাময়িক কালে ফিনল্যান্ডে পোর্খান, লনরুট (কালেভেলার আবিষ্কারক) এবং ফিনিস লিটারেচার সোসাইটি (১৮৩১) এবং সুইডেনে সি. ডাৰু ভন সিডোর অবদান অসামান্য। যাহোক, হার্ডার-পরবর্তীকালে নৃতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান ফোকলোর, ভাষাতত্ত্ব ও সাহিত্য সমালোচনা প্রভৃতি স্বতন্ত্ৰ বিদ্যাশাখা (discipline) হিসেবে গড়ে ওঠায় ফোকলোর আর সমন্বিত কল্পচিত্র থাকেনি। প্রতিটি বিদ্যাশাখাই নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে ফোকলোরের ব্যবহার ও এর সংজ্ঞা নির্ণয় করায় এ পর্যন্ত ২৪টি সংজ্ঞা সৃষ্টির পরও ফোকলোরের সংজ্ঞা-সমস্যার মীমাংসা হয়নি। culture-এর সংজ্ঞা সম্পর্কে একজন সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানী যেমন বলেছেন: সম্ভবত যতজন নৃবিজ্ঞানী আছেন culture-এর নৃবৈজ্ঞানিক সংজ্ঞা তার চেয়ে বেশি। ফোকলোনের সংজ্ঞা সম্পর্কেও একথা খাটে। এটা অবশ্য দোষের ব্যাপার নয়, বিষয়ের প্রাণবন্ততারই পরিচয়বহ।

দুই

ঊনবিংশ শতকের ধারণায় ‘ফোক’ (folk) বা লোক বলতে বোঝায় সমাজের নিচু তলার মানুষকে অর্থাৎ উঁচু তলার মানুষ বা শিক্ষিত সংস্কৃতি ও রুচিমান সভ্য মানুষও তখন সমাজে আছে। তাদের বিপরীতে অবস্থান হলো ফোক বা লোকের। তবে তারা আদিম (primitive) মানুষ যেমন নয়, আবার সভ্যমানুষও নয়। তাদেরকে বলা হয়েছে সভ্যসমাজে অসভ্যতার উপাদান (uncivilized elements in a civilized society)। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় ‘লোক’ বলতে barbarians দেরও বোঝায়। কারণ সমাজবিবর্তনে বন্য (savages) বা আদিম (primitive), অসভ্য (barbarians) ও সভ্য এই তিন ধরনের মানুষের মধ্যখানে অবস্থানকারীরাই লোক বা ফোক। অন্য কথায়: ‘Folk occupied a kind of middle ground between the civilized elite and

uncivilized savage’। অর্থাৎ তারা হলো, ‘Illiterate in a liter- ate society’। তারা অশিক্ষিত, প্রান্তিক ও পশ্চাৎপদ; সামাজিক অবস্থানের বিবেচনায় গ্রাম্য ও কৃষিজীবী। তাদের মধ্যে আদিম জীবনধারার নানা উপাদান-সংস্কার প্রতীক-জাদুবিশ্বাস এখনো রয়ে গেছে। সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার জন্য সেসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে দেখার তাৎপর্যও আছে। তাই নবোখিত নগরবাসী শিক্ষিত সমাজের বাসিন্দা নৃতত্ত্ব ও ফোকলোরবিদগণ তাদের অব্যবহিতপূর্ব অবস্থানের মানুষের জীবন-জীবিকা ও আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে অধ্যয়ন-অধ্যাপনা ও চর্চা-গবেষণা করেছেন। সেকালের বৃটিশ ফোকলোরের খ্যাতিমান প্রতিনিধি অ্যান্ড্রু ল্যাং (Andrew Lang) তাঁর প্রভাবশালী রচনা The Method of Folklore – এ (Custom and Myth, London, 1884) বইতে যা বলেন, তার মর্মার্থ হলো, প্রত্নতত্ত্বের গবেষণায় প্রাচীন মানুষের পুরাতাত্ত্বিক বস্তুগত নিদর্শন (material relics), যথা- কুঠার, তারের মাথার অংশ ইত্যাদি সংগ্রহ করে তুলনামূলক আলোচনা করা হয়। অন্য দিকে ফোকলোর গবেষণার পদ্ধতিতে পুরাতত্ত্বের অবস্তুগত নিদর্শন যথা টিকে থাকা কুসংস্কার, কিংবদন্তি, রীতিনীতি, বিশ্বাস ইত্যাদি সংগ্রহ ও তা নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা করা হয়। এই সব উপাদান যে ফোক বা লোকের তারা শিক্ষার দ্বারা পরিবর্তিত হয়নি বা তাদের মধ্যে প্রগতির ছোঁয়া লাগেনি। এই সব কথা বলে অ্যান্ড্রু ল্যাং ফোকলোর চর্চার ধরন নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন: ‘The student of folklore is, thus led to examine the usages, myths, and ideas of savages, which are still retained in rude enough shape, by European peas- antry।’ ল্যাং-এর আলোচনা থেকে আমরা যে সিদ্ধান্ত টানতে পারি তা হলো সেকালে ‘ফোক’ (folk) বলতে বোঝানো হতো নিম্নশ্রেণির অর্থাৎ কৃষকদের, যারা শিক্ষাহীন ও প্রগতির ছোঁয়া বঞ্চিত। ফলে ফোকলোর নিয়ে কিছু তুচ্ছতাচ্ছিল্য হতো। এখনো সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্ব সম্পর্কে অনভিজ্ঞ সংস্কৃতি ভাবুকদের মধ্যে হয়। তাই আধুনিক, শিক্ষিত ও প্রগতিবাদীরা ফোকলোরের বিষয় হিসেবে myth, superstition ইত্যাদি যুক্ত থাকায় তাদের দৈনন্দিন জীবনেও কোনো ভুল বা অবিশ্বাস্য বা অবাস্তব ব্যাপারকে ঠাট্টা করে বলেন, oh, that is folklore ! অর্থাৎ ভুল-ভ্রান্তি, কুসংস্কার এই সবই হলো ফোকলোর। এমনকি myth-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও reality-র বিপরীত শব্দ হিসেবে প্রচলিত হয়ে গেছে এবং এখনো চালু আছে। কোনো মিথ্যা বা অহেতুক গড়ে ওঠা কোনো বিশ্বাস বা ধারণাকে ভেঙে দেয়াকেও মিথ হিসেবে আখ্যাত করা হয়। অ্যান্ড্রু ল্যাং বলেছেন: ‘Our method throughout will be to place the usage, or myth, which is unintelligible when found among a civilized race, beside the similar myth which is intelligible enough when it is found among savages. A mean term will be found in the folklore preserved by the non-progressive classes in a progressive people.’ ল্যাং-এর ফোক সম্পর্কে এই ধারণাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ ও ফোকলোর বিজ্ঞানী অ্যালান ডান্ডেস (Alan Dundes) ব্যাখ্যা করেছেন, ‘The folk possessed a “mean term”, the intellectual link between civilized and primitive.’

উনিশ শতকের পণ্ডিতেরা ফোক-এর বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করেছিলেন এভাবে:

Savages or Primitive Folk or Peasant Civilized or Elite Pre or non-literate

Illiterate                   Literate

Rural                       Urban

Upper Stratum        Lower Stratum

মানবসমাজের এ ধরনের সম্পর্ক বিভাজন ও বৈশিষ্ট্য নিরূপণের ফলে সভ্য ও অভিজাত সমাজের অস্তিত্ব না থাকলে ফোক বা লোকসমাজও থাকতে পারে না। আর যেহেতু অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকের ethnocentric ইউরোপিয়ান বুদ্ধিজীবীদের দৃষ্টিতে বিশ্বের বিরাট অংশেই শিক্ষা, সভ্যতা ও প্রগতির বিকাশ হয়নি, তাই তাদের ফোকলোরও নেই। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের রেড ইন্ডিয়ান, আফ্রিকান নেটিভ এবং অস্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীদেরও ফোকলোর নেই। তারা আদিম অধিবাসী এবং তাদের প্রাচীন সংস্কৃতি আদিম সংস্কৃতি (primitive culture) লোকসংস্কৃতি বা ফোকলোর নয়। ইউরোপের ethnocentric ও eurocentric বুদ্ধিজীবীরা বিশ্বের বৃহৎ অংশকেই সভ্য নয় বলে মনে করতেন। ফোকের প্রাথমিক ধারণায় কেবল ইউরোপীয় কৃষককেই বোঝানো হতো। এই ধারণা থেকে এখন পর্যন্ত কোনো কোনো ইউরোপীয় ফোকলোরবিদ কৃষক জীবনকেই শুধু ফোকলোর চর্চার অন্তর্ভুক্ত করতে চান। তবে শুধু কৃষকদের গল্পগাথা বা বিশেষ কোনো genre নয় গোটা কৃষকজীবন, তাদের আচার-অনুষ্ঠান বিশ্ববীক্ষা তথা সামগ্রিক সংস্কৃতিচর্চায় উৎসাহী। সুইডেন প্রভৃতি দেশে একে folklife study বলা হতো। সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্বের ভাষায় একে ফোককালচার চর্চাও (folkculture study) বলা যেতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই folklife study-কে নৃতত্ত্ববিদরা ethnography বলে থাকেন। তবে ইউরোপ ও আমেরিকার এ বিষয়ে একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। তা হলো, ইউরোপিয়ানরা শুধু নিজ দেশের কৃষকদের মধ্যে এই বিদ্যার প্রয়োগ করে থাকেন, অন্য দিকে মার্কিনিরা বিশ্বের যে কোনো স্থানে যে কোনো জনগোষ্ঠীর ওপরই এ ধরনের গবেষণা করে থাকেন।

ফোকলোরের প্রতিশব্দ হিসেবে পশ্চিম বঙ্গে ‘লোকসংস্কৃতি’ অর্থাৎ folk- culture ব্যবহার করা হলেও আমরা ‘ফোকলোর’ই ব্যবহার করি তার কারণ উপর্যুক্ত তথ্যের দিকে একটু সতর্ক দৃষ্টি দিলে বোঝা যায়। ফোককালচার নৃতাত্ত্বিকদের ব্যবহৃত একটি শব্দ। একটু আগেই বলেছি ইউরোপীয় কৃষকের whole lifestyle, customs, superstitions, worldview ইত্যাদির সমন্বিত ও সামগ্রিক আলোচনাকেই folkculture study বলা হয়। ফোকলোর শাস্ত্রের genre ভিত্তিক (যেমন—প্রবাদ, ধাঁধা, লোকগল্প, লোককবিতা, লোকবিশ্বাস ইত্যাদি) আলোচনা লোকসংস্কৃতি গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাই আমরা folklore-এর উপযুক্ত প্রতিশব্দ উদ্ভাবন করতে না পেরে বাংলায়ও ফোকলোরই বলি। কারণ ওপরের আলোচনা থেকে ফোক কালচারের যে স্বরূপ ধরা পড়েছে ফোকলোরের সঙ্গে তার পার্থক্য মৌলিক। তাই লোকসংস্কৃতি (folk culture) ও folklore – কে এক জিনিস ভাবা যায় না। যাহোক, ইউরোপিয়ানদের সংজ্ঞায় ফোকলোর থেকে শুধু আদিম সমাজের মানুষকেই বাদ দেওয়া হয়নি, নগর সমাজের মানুষকেও বাদ দেওয়া হয়েছে। আদিম সমাজের মানুষকে ইউরোপীয় তাত্ত্বিকরা নৃতত্ত্ব বা এথনোগ্রাফির আওতায় ফেলেছেন। আর নগর সমাজের মানুষকে যে ফোকলোরের আওতাভুক্ত করা হয়নি তার জন্য আংশিকভাবে ‘Little দায়ী আমেরিকান নৃবিজ্ঞানীরা। ‘Big Tradition’ ও Tradition’ ধারণাদুটির প্রবর্তক বিখ্যাত নৃবিজ্ঞানী রবার্ট রেডফিল্ড ‘নাগরিক ফোকলোর’কে এক অসম্ভব বস্তু বলে আখ্যাত করেছেন। আর ১৯৫৩ সালে জর্জ ফস্টার তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রচনা what is Folk Culture?-এ রেডফিল্ডের ধারণাকেই আরো তীক্ষ্ণ করে তুলে লিখলেন: ফোক সোসাইটি একটি সামগ্রিক সমাজের অংশ (‘a half society, a part of a larger social unit, usually a nation’ ); বৃহত্তর সমাজ থেকে আলাদা বা বিচ্ছিন্ন নয়। আর আদিম সমাজ সম্পর্কে তিনি বললেন: ‘True primitive cultures are excluded from the folk cat- egory-they are, in theory atleast, isolates, which are complete in themselves. ফস্টার এই বলে তাঁর বক্তব্য শেষ করেন : ‘Folk cultures will disappear in those places where a high degree of industrialization developes.-True folk cultures can hardly be said to exist in countries like the United States, Canada, England and Germany… it also seems impossible, in view of the trends of modern world toward industrialization in all major areas, that new folk cultures will arise’ (অর্থাৎ যেসব স্থানে উচ্চ মাত্রায় শিল্পায়ন ঘটবে সেসব স্থানে লোকসংস্কৃতির বিলুপ্তি ঘটবে। প্রকৃত লোকসংস্কৃতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইংল্যান্ড এবং জার্মানির মতো দেশে অস্তিত্ব রক্ষা করবে এমন সম্ভাবনা খুব কম।

আধুনিক বিশ্বের প্রধান অঞ্চলসমূহে শিল্পায়নের প্রতি যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তাতে নতুন করে লোকসংস্কৃতি গড়ে উঠবে এটাও অসম্ভব বলে মনে হয়।

আধুনিক ফোকলোর বিজ্ঞানীরা উপর্যুক্ত মত ও যুক্তি মানেননি। তাঁরা বলেছেন ‘ফোক’কে যদি অশিক্ষিত, গ্রাম্য, পশ্চাৎপদ কৃষক হিসেবে দেখি তাহলে ফোকলোর চর্চা একটা ‘salvage operation’ হয়ে দাঁড়ায়। (আমাদের দেশের মন্ত্রী থেকে ফোকলোর গবেষকও বলেন, যেসব উপাদান বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে তা এখনই ধরে রাখতে হবে! কত রাখবেন, কোথায় রাখবেন, কারা রাখবেন, কীভাবে রাখবেন তা কেউ বলেন না)। এটা পুরাতাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাজের ধরন। কিন্তু ফোকলোর প্রত্নতত্ত্ব বা পুরাতত্ত্বের মতো স্থির (fixed) বা অপরিবর্তনীয় কোনো উপাদান নয়। ফোকলোর প্রবহমান ও বহু ভাষ্যে বিদ্যমান; এর নতুন নতুন রূপান্তরই শুধু হয় না, সময়ের বিবর্তনে গড়ে ওঠে নতুন ফোকলোর।

তিন

এটা ঠিক যে সমাজ সভ্যতার অগ্রগতি ঘটছে এবং গোটা বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিগত ও তথ্যপ্রবাহের ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটে গেছে। ফলে উন্নত বিশ্ব তো বটেই আমাদের দরিদ্র বিশ্বের কৃষকরাও এখন ডিপটিউবওয়েল, স্যালো নৌকা, ট্রানজিস্টর রেডিও ও সেলফোন ব্যবহার করছেন। কিন্তু তাতেই তাদের লোকসত্তা (folk identity) বিলুপ্ত হয়ে যায়নি বা যাবে না। বিষয়টিকে এখন নতুনভাবে দেখতে হবে, বদলাতে হবে দৃষ্টিকোণ। আমেরিকার প্রখ্যাত ফোকলোর পণ্ডিত অ্যালান ডান্ডেস এবং জার্মানির খ্যাতকীর্তি ফোকলোর বিজ্ঞানী এ ব্যাপারে প্রায় একই কথা বলেছেন। প্রফেসর ডান্ডেস বলেন: ‘If we look at the question “who are the folk”? In a new light, we shall see that the folk are not dying out, and that there are folk cultures alive and well in the United States, Canada, and Europe; and that new folk cultures are bound to arise’ (Alan Dundes: ‘Who are the folk’).’ ডান্ডেস সাহেবের উপর্যুক্ত নতুন আলোকে ‘folk’-এর সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে: ‘The term folk can refer to any group of people whatsoever who share atleast one common factor.” এই সংজ্ঞায় folk-এর সম্প্রসারণ ঘটেছে। শহর বন্দর গ্রাম এমনকি মহাকাশেও (নভোচারীরাও এখন folk group ও তাদের ফোকলোর থাকতে পারে)। ফোকলোর এখন তাই group art। এই পরিপ্রেক্ষিতেই ডান বেন আমোস (Dan-Ben-Amos) ফোকলোরের তাৎপর্যময় কিন্তু সংক্ষিপ্ততম সংজ্ঞাটি দিয়েছেন এভাবে, ‘Folklore is artistic communication in small groups’। অন্যদিকে জার্মান প্রফেসর হারমান বসিংগার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশের ফলে যে ফোকলোর বিলুপ্ত হবে না বরং বিস্তৃত হবে সে কথাটি যেভাবে বলেছেন তার বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় এরকম : ‘আধুনিক যুগে ফোকলোর বিলুপ্ত হয়নি, তার রূপান্তর এবং পরিসর বৃদ্ধি ঘটেছে। একবিংশ শতকে প্রযুক্তিগত উন্নতির যুগে ফোকলোরের রূপান্তরিত সত্তার বিপুল বিস্ফোরণ ঘটবে, তৈরি হবে নতুন নতুন ফোকলোর। নগর, শিল্প-কারখানা, বস্তি এবং নানা গোষ্ঠী হবে নতুন বিপুল ফোকলোরের বসতি-স্থান (habitat), প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নতুন ও আধুনিক ফোকলোরকে সামনে আনবে। উনিশ শতকের গ্রামের মতো একুশ শতকের শহর এবং রূপান্তরিত গ্রামই হবে নতুন ফোকলোরের প্রধান কেন্দ্র।’

চার

একবিংশ শতকে বাংলাদেশের ফোকলোর বিষয়গত (contents), ধারণাগত (conceptual) এবং রূপান্তরগত দিক থেকে ভিন্ন চেহারা নেবে। গ্রামবাংলায় সাবেক আমলের জনপ্রিয় ফোকলোর উপাদানগুলো আর্থসামাজিক আদর্শিক কারণে পরিবর্তিত হচ্ছে। যেসব উপাদানের ফাংশন নেই তা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আবার নতুন বসতিগত কারণ ও সামাজিক-মানসিক- মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের কারণে নতুন উপাদান তৈরি হচ্ছে। পেশাগত গোষ্ঠীর পুরনো ফোকলোর উপাদানের রূপান্তর এবং নতুন গোষ্ঠীর

উপাদানও বাড়ছে। গ্রামাঞ্চলে আগের মতো কবিগান, জারি-সারি- বিচারগান এমনকি যাত্রাও তেমন আর অনুষ্ঠিত হয় না, হলেও এককালের আমিনা যাত্রা, গুনাই যাত্রা বা সমসাময়িক বিষয়ভিত্তিক ভাওয়াল যাত্রায় সেকালের বিপুল জনপ্রিয়তা এখন স্বাভাবিকভাবেই নিঃশেষিত। যাত্রায় নতুন বিষয় ও খ্যাতনামা ব্যক্তিদের জীবন রূপায়িত হয়েছে কিন্তু তা-ও গ্রামীণ ও দেহাতি মানুষকে টানতে পারছে না। আধিপত্যবাদী শ্রেণির ধর্মীয় মানসিকতার কারণে কৃষ্ণলীলা, কীর্তন, কথকতা, রামলীলা, পটের গান, ধামাইল, মনসার গান বা বেহুলার ভাসান এখন প্রায় দেখাই যায় না। বিচারগান, দেহতত্ত্ব, মারফতি, মুর্শিদি এমনকি ভাটিয়ালিও কম শোনা যায়। বাউল, গাজীর গান ও পালাগান মোটামুটি অস্তিত্ব রক্ষা করে চলেছে। তবে গ্রামীণ বাংলাদেশে যাতায়াত যোগাযোগ টেলিভিশন, সংবাদপত্র, সেলফোন, ডিপটিউবওয়েল, স্যালো নৌকা ইত্যাদিতে যে ব্যাপক ও দ্রুতগতির রূপান্তর ঘটছে তাতে আধুনিক ফোকলোর গবেষকের জন্য বিপুল উপাদান রয়েছে। শহর ঢাকার জন্মাষ্টমীর মিছিলের আগের সে জৌলুস আর নেই, মহরমের মিছিলও বহুলাংশে ক্ষীয়মাণ। তবে, নগরে ফোকলোর উপাদান বেড়েছে। চুটকি, গুজব, গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান, বিয়ে বাড়ির গেট, আল্পনা, আলোকসজ্জা, দেয়ালচিত্রণ ও দেয়ালের নানা লেখা (graffiti), রাজনৈতিক স্লোগান ও পোলেমিকস, গ্রামীণ উৎসবের নাগরিক উত্থান যথা নববর্ষ ও তার বর্ণাঢ্য মিছিল, একুশের সকালে নগ্নপদে প্রভাতফেরি, নবান্ন, পৌষমেলা, গৃহসজ্জার উপকরণ হিসেবে মৃৎশিল্প, চিত্রিত হাঁড়ি, সরা, শহরে সাম্প্রতিক কালের পুষ্ট ব্যবসার বিপুল সম্ভার, রিকশা আর্ট, কাঁথা শিল্প বিকশিত হচ্ছে। আগের কালের মুদ্রিত ফোকলোর বিয়ের প্রীতি উপহার নেই, এখন পথুয়া কবিতা ও বাথরুম লিখন টিকে আছে। অটোগ্রাফ খাতার লেখা এবং বাগান ও বিনোদন স্থানের বৃক্ষ ও ভবনে বহুজনের হৃদয়ের কথা মুদ্রিত করার প্রচলন হয়েছে। ধর্মীয় ফোকলোর উপাদান হিসেবে শবেবরাত, কুলখানি, চেহলাম আবির্ভূত হয়েছে এবং আগেকার মিলাদ আরো বিস্তৃত পরিসর লাভ করেছে। অন্যদিকে ইন্টারনেট চ্যাট, ফ্যাক্সলোরও নতুন ফোকলোর হিসেবে উঠে এসেছে। আরো বহু নতুন উপাদান আছে এবং নতুনতর বিষয় উঠে আসবে।

বাংলাদেশে সদ্য চালু হওয়া একটি চুটকি বিশ্লেষণ করি। এই চুটকিটি আধুনিক ফোকলোরকে বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বিন্যস্ত করেছে: প্রেসিডেন্ট বুশ আফগানিস্তান ও ইরাক জয়ের পর ভাবলেন, তিনি এখন বিশ্বসাম্রাজ্য গড়তে যাচ্ছেন। তিনি সারা পৃথিবীর মালিক। তাই তাঁকে পৃথিবীটা নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। আর এ উদ্দেশ্যেই পৃথিবীটা ঘুরে দেখা দরকার। যেমন ভাবা তেমন কাজ। বিমান তৈরি হলো। কিন্তু বুশ কি একাই যাবেন? না, তিনি ঠিক করলেন তিনি নিজে তো যাবেনই, তাঁর যুদ্ধজয়ের সৈনিকদের প্রতিনিধি একজন জেনারেল যাবেন, নতুন পৃথিবী নির্মাণের স্থপতি হিসেবে একজন ইনজিনিয়ার/স্থপতি যাবেন; ধর্মকর্ম করার জন্য সঙ্গে নেয়া হবে মহামান্য পোপকে, আর যাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতিনিধি একজন স্কুল বালক। তো, আকাশে জাহাজ উড়ছে। হঠাৎ পাইলটের ঘোষণা: আমরা বিপদগ্রস্ত। ইনজিন বিকল হয়ে গেছে। যে কোনো মুহূর্তে বিমান ভূপাতিত হবে, আমরা পাইলট, পেশায় ঢুকেছি মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েই। তাই বিমানে যে ৪টি প্যারাসুট আছে তা নিয়ে আপনারা চার জন বেঁচে যেতে পারেন।

জেনারেল বললেন, আমি আগে একটা নিয়ে নিচে নেমে যাই, না হলে সাদ্দাম আবার ইরাক পুনর্দখল করবে। স্থপতি বললেন, আমিও আর একটা নিয়ে নেমে যাই, তা না হলে প্রেসিডেন্ট সাহেবের নতুন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন ব্যর্থ হবে। বুশ দেখলেন লোক বেশি, প্যারাসুট কম। তাই কোনো কথাবার্তা ছাড়াই একটা নিয়ে তিনিও নেমে গেলেন। তখন পোপ বললেন, প্রেসিডেন্ট তো আমি ধর্মগুরু বা তুমি শিশু কারও কথাই ভাবলেন না। যা হোক, আমি বৃদ্ধ হয়েছি, তোমার সামনে দীর্ঘ জীবন পড়ে আছে, তুমিও চতুর্থ প্যারাসুটটা নিয়ে সুন্দর পৃথিবীতে নেমে যাও।

শিশুটি বলল : না ফাদার, প্যারাসুট এখনো দুটো আছে। আমরা দুজনেই বাঁচতে পারব। পোপ বললেন, এই ছেলে, তুমি তো অঙ্কে খুব কাঁচা হে! চারটা প্যারাসুট। তিনটা নিয়ে তিনজন নেমে গেছে। দুটো থাকে কী করে? আছে তো মাত্র একটা। স্কুল বালক: না ফাদার, দুটোই আছে। প্রেসিডেন্ট বুশ তাড়াহুড়ায় প্যারাসুট না, আমার স্কুলব্যাগ নিয়ে নেমে গেছেন।

এটা একটা নতুন নাগরিক ফোকলোর। ফোকলোর যে সামাজিক মনস্তত্ত্বকে কী তীক্ষ্ণ, তির্যক ও অমোঘভাবে প্রকাশ করতে পারে এ তারই নজির। শুধু তাই না। এই ফোকলোরটির আরো তাৎপর্য আছে। এটি গ্রামে বা কৃষি সমাজে তৈরি হয়নি। আমি এটি বাংলাদেশের এক সাবেক রাষ্ট্রদূতের কাছে শুনেছি। অতএব, এটি এক নাগরিক বুদ্ধিদীপ্ত গোষ্ঠীর তৈরি করা ফোকলোর। এই ফোকলোর উপাদানটিতে তাই আন্তর্জাতিকতা ও বিশ্ব পরিস্থিতি স্থান পেয়েছে। এর মাধ্যমে ফোকলোরের নতুন উদ্ভাবক গোষ্ঠী (group) ও নতুন বসতি স্থানকে চেনা যাচ্ছে। সেই সঙ্গে এর বিষয়গত ও উপস্থাপনাগত সফিসটিফিকেশন যেমন লক্ষ করার মতো তেমনি এর সঙ্গে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের চিন্তাচেতনার সঙ্গে নাগরিক বৈদগ্ধযুক্ত চিন্তাধারার সাজুয্যও লক্ষযোগ্য। পার্থক্যটি মর্মবস্তুতে নয়, প্রকাশশৈলী ও উপস্থাপনায়। বাংলাদেশের সাধারণ লোক (common folk group) বলেছে: “বাপের বেটা সাদ্দাম’, একে আরো সূক্ষ্ম, তির্যক ও বুদ্ধিদীপ্ত সামগ্রিকতায় উপস্থাপন করেছে নাগরিক ও আন্তর্জাতিক পরিবেশে অবস্থানকারী আরেকটি গোষ্ঠী।

ফোকলোর উপাদান মূলত বহুভাষ্যে বিন্যস্ত, এর রূপান্তর স্বাভাবিক তাই তা সাহিত্যের মতো স্থির (fixed) কিছু নয়; অন্যদিকে ফোকলোর ধারণ করে বেসরকারি এবং দলিলীকরণহীন (unrecorded) উপাদান। এতে সামাজিক মনের অন্দরমহলের গুরুত্বপূর্ণ এবং সংগুপ্ত বহু উপাদান থাকে যা ফোকলোরবিদরা এথনোগ্রাফিক পদ্ধতিতে ধারণ না করলে দেশের সাধারণ মানুষের এবং তৃণমূল পর্যায়ের বাস্তব ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়। বিশ্ব পর্যায়ের ইতিহাসচর্চার সমস্যায় এ বিষয়টি এখন গুরুত্ব পাচ্ছে। আমেরিকার আধুনিক ফোকলোর চর্চার স্থপতি রিচার্ড ডরসন (Richard Dorson ) একালের oral history চর্চাকেও elitist বলে খারিজ করেছেন। কারণ এতেও সাধারণ মানুষ নয় বিশিষ্ট জনের সাক্ষাৎকারই শুধু নেয়া হয়। তবে বাংলাদেশের ফোকলোর চর্চায় এধরনের অ্যাপ্রোচ ও প্যারাডাইম (approach and paradigm ) এখন পর্যন্ত তেমন জোরালোভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। এথনোগ্রাফিক পদ্ধতিতে গ্রাম বা শহরের বেদে সমাজ, কুমার, বস্তিজীবন বা রিকশা আর্ট শিল্পী বা সাধারণ কৃষকদের সঙ্গে থেকে তাদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তাদের দৈনন্দিন জীবনধারা, কর্মপদ্ধতি এবং উৎসব উপাসনা ও পর্বাদির নিবিড় ও অনুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ অংশগ্রহণের মাধ্যমে

রেকর্ড করে (performance centred field work) তাদের ফোকলোরের প্রাসঙ্গিক পটভূমি (context) অর্থ (meaning) ও প্রতীক (symbol) সম্পর্কে তাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বুঝে নিয়ে তারপর পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করার পদ্ধতি এখানে অনুসৃত হচ্ছে না। তাই আমাদের বর্তমান ফোকলোর চর্চাকে বৈজ্ঞানিক বা আধুনিক বলা যায় না। আমাদের চর্চাকে বলা যায় Butterfly Collection পদ্ধতি অর্থাৎ উড়ে এ গাছে একটু ও গাছে একটু বসে মধু সংগ্রহ করার মতো। এ পদ্ধতিকে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও জনগণের প্রাথমিক উৎসক্ষেত্র থেকে সংগ্রহ (empiri- cal research) করা বলে না। আমাদের গবেষণা elitist এবং এফ. রিটসন যাকে ঠাট্টা করে বলেছেন creative archaeology সেই ধরনের কাজ করেন নানান দ্বিতীয় বা তৃতীয় সূত্র (ছাপানো উৎসসহ) থেকে কিছু মিশিয়ে একটা প্রবন্ধ লেখা বা বই বের করাই এখানে ফোকলোর গবেষণা। লোক গান, ছড়া, প্রবাদ ইত্যাদি সংগ্রহ করে তাতে আপন মনের মাধুরী অন্যদিকে ড. দীনেশচন্দ্র সেন, ড. সুখময় মুখোপাধ্যায়, অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাই ও ড. আশরাফ সিদ্দিকী পর্বতপ্রমাণ ভ্রান্তির প্রমাণ রেখে বাংলা ফোকলোর চর্চার যথেষ্ট ক্ষতি করে গেছেন। ড. সেন জীবনে ময়মনসিংহ গীতিকা-অঞ্চলে যাননি, সে ত্রুটি ছাড়াও চন্দ্রকুমার দের সংগ্রহ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোথাও সংরক্ষণ না করায় এখনকার গবেষকরা সেকালে জীবন্ত অবস্থায় সংগৃহীত উপাদানগুলোকে তাদের দ্বিতীয় জীবনে (second life) আর্কাইভসে দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই তাঁর প্রচণ্ড পরিশ্রম করে ময়মনসিংহ গীতিকা সম্পাদনার গৌরব এখানে বহুলাংশে ম্লান হয়ে গেছে। এর ফলে বিশ্বাসের সংকট ও সত্যাসত্যের (authentic- ity) প্রশ্ন দেখা দেয়। সে সমস্যার সমাধান করেন চেক পণ্ডিত দুশান জবাভিতেল তাঁর বিখ্যাত বইয়ের মাধ্যমে (Folk Ballads from Mymensing and the Problems of Their Authenticity, Calcutta University, 1963)। ড. সুখময় মুখোপাধ্যায়, ইতিহাসের পণ্ডিত, কিন্তু ময়মনসিংহ গীতিকার যৌগিক text নির্মাণ করে এর ফোকলোর বৈশিষ্ট্য ও এর text-এর রূপান্তর প্রক্রিয়াকে মধ্যযুগের সাহিত্যের মতো স্থির করে দিয়েছেন। ড. আশরাফ সিদ্দিকীও ড. দীনেশ সেনের সম্পাদিত ময়মনসিংহ গীতিকাকে হুবহু সম্পাদনা করে প্রকাশ করায় ফোকলোরের পদ্ধতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত হয়েছেন। ক্ষিতীশ মৌলিক বরং পরবর্তীকালের পাঠ-বিবর্তন ও নতুন পাঠ যুক্ত করে ওই গীতিকাগুলো প্রকাশ করে কাণ্ডজ্ঞান ও বিবেচনাশক্তির পরিচয় দিয়েছেন। অধ্যক্ষ মুহম্মদ আবদুল হাই সাহেব মনসুর উদ্দীন-সংগৃহীত হারামণির কথাকথিত অমার্জিত অংশ সম্পাদনা করে বাদ দিয়ে অবিবেচনার কাজ করেছেন।

ফোকলোর কোনো জনগোষ্ঠীর দেশীয় সংস্কৃতি পদ্ধতি ও জ্ঞানকে (indegenous cultural system and knowledge) বোঝার জন্য এক উপযোগী বিদ্যাশাখা (discipline)। ফোকলোরের মাধ্যমে কোনো দেশের বহু মত, বহু মন ও বহু অঞ্চলের বাস্তবিক, বস্তুগত, আত্মিক, আধ্যাত্মিক জীবনযাত্রার পরিচয় পাওয়া যায়। আসলে একটি জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক পরিচয়ের জন্য তাদের ফোকলোরকে জানা ও বোঝা অপরিহার্য। সেজন্যেই ইউরোপ ও আমেরিকার পণ্ডিতেরা যেমন ডেভিড ক্যাসিন (বাংলা), হেনরি গ্লাসি (বাংলা), ক্যারল সলোমন (বাংলা), ব্রেন্ডা বেক (তামিল), জর্জ হার্ট (তামিল), পিটারক্লস (টুলু), সুসান ওয়াডলি (হিন্দি), ভেদ ভাটুক (হিন্দি) প্রমুখ উনিশ শতকের মতো সংস্কৃত ভাষা শিখে নিজ দেশে বসে Indology-র চর্চা না করে ‘Many Indians’-কে জানার জন্য এদেশে এসে স্থানীয়ভাবে অবস্থান করে Indology নয়, ফোকলোর চর্চা করছেন। ফোকলোর যেমন জাতীয় আত্মপরিচয়ের প্রতীক তেমনি সামগ্রিক জনজীবনেরও পরিচায়ক। কোনো জাতি, তার সামগ্রিক মানসিকতা, রুচি, সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে গভীরভাবে বুঝতে গেলে ফোকলোর চর্চা তাই অপরিহার্য। ফোকলোরকে বাদ দিয়ে নাগরিক ও বিচ্ছিন্ন শিক্ষিত মধ্যবিত্তের জীবন ও ইতিহাসচর্চা তাই অপূর্ণাঙ্গ ও একপেশে।