বাঁশরি ও রণতূর্য

আচার্য নন্দলাল গাছের মধ্যে শক্তির প্রকাশ | দেখতে পেতেন। একে বলা যায় উত্থানের শক্তি—মাটি ফুঁড়ে গগনস্পর্ধী প্রকাশ। তাঁর শিল্পীজীবনের প্রায় পুরোটাই কেটেছে শান্তিনিকেতনে, যেখানে দীর্ঘকাণ্ড উন্নতশির শালের ছড়াছড়ি। তিনি প্রচুর এঁকেছেন শালগাছ, প্রচলিত নিয়মে উপর থেকে নিচের দিকে না টেনে কাণ্ডের রেখা টানতেন উল্টো, নিচের থেকে ওপরের দিকে। তাতে আচার্য নন্দলালের মতে, গাছের upward thrust ভালো প্রকাশ পায়। [চিত্র ১/

শিল্পাচার্য জয়নুল প্রথম জীবনে মন্বন্তরের ছবি এঁকে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন কলারসিকদের মধ্যে। কাগজের ওপর মানুষের মরণদশার নানা বাস্তব ছবি ফুটিয়েছেন বলিষ্ঠ রেখায় চিত্র ২। মোটা ব্রাশের দাপট ফুটিয়ে রেখাঙ্কনের শক্তি ও কুশলতা দেখিয়েছেন শিল্পী-মৃত্যু ও মরণদশা একেবারে জীবন্ত হয়েছে! একি তিনি মৃত্যুর নাকি জীবনের শক্তির প্রকাশ ঘটালেন? মৃত্যু যে মহাশক্তিধর সে তো মানুষই সবচেয়ে ভালো জানে, কারণ মৃত্যুর প্রতিটি অভিজ্ঞতাই তার ঘটে জীবনেরই বিনিময়ে। আর জীবন? টিকে থাকা ও সাফল্যের জন্যে তারও প্রাথমিক নির্ভর শক্তি, জীবনীশক্তি।

কিন্তু মানুষ তার জীবনে সুন্দরের পূজারী, লাবণ্য ও মাধুর্যের কাঙাল। সে কেবল আদমের পাশে হাওয়াকে, মহাশক্তিধর ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরদের পাশে উর্বশী-রম্ভা- মেনকার মতো অপ্সরীদের কিংবা জিউস হারকিউলিস- অ্যাপোলোদের মতো পুরুষকার-নির্ভর দেবতার পাশে আফ্রোদিতি-ডায়ানা-ভেনাসের মতো রূপসী দেবীদের কল্পনা করেনি, একের ভিতরেই শক্তি (force) ও মাধুর্যের (grace) সমন্বয় দেখতে পেয়েছে। যিনি ধ্বংস ও প্রলয়ের রূপকার শিব তিনিই নৃত্যকুশল নটরাজ চিত্র ৩), যিনি শানিত-ধী চতুর যোদ্ধা পার্থসারথী কৃষ্ণ তিনিই নৃত্যগীতকুশল বৃন্দাবনের ত্রিভঙ্গমুরারী, যিনি ধ্বংস ও মৃত্যুর কারবারি ভয়ঙ্করী চামুণ্ডা তিনিই আবার অন্নদায়িনী প্রসন্নমতি অম্লদা।

একই সূত্রে বহু প্রাচীন এবং অধুনাবিসৃত দুই দেব- দেবীর প্রসঙ্গও মনে আসে রুদ্র শিব এবং ভদ্র কালী । মানুষ শিবের রুদ্র রূপকে যেমন ভক্তি করে স্মরণ করেছে তেমনি ছিন্নমস্তা ভয়ঙ্করী কালীর ভদ্র শ্যামা রূপটি স্মরণ করে ভাবে গদগদ হয়েছে। ওল্ড টেস্টামেন্টের যে জিহোবা ইহুদিদের পক্ষপাতদুষ্ট নিষ্ঠুর ঈর্ষাপরায়ণ ও বলিপ্রিয় দেবতা তিনিই যিশুখ্রিষ্টের প্রেমময় উপদেশে সর্বমানবের প্রেমে দেবতা রূপে প্রকাশিত হন দেখি।

দেখি যুদ্ধে এবং সঙ্গীতে সমান কুশল অর্জুন ও অর্ফিউসকে, দেখি কঠিন ও ললিত মানসের অধিকারী কৃষ্ণ ও কিউপিডকে। বিপরীতে পাই দুর্গাকে—যিনি স্নেহে মমতায় বরাভয়ে মাতৃরূপেন সংস্থিতা তিনিই আবার মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গতিনাশিনী শক্তিরূপেন সংস্থিতা।

মানুষের এই পৃথিবীটাই, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, বিপরীত ললিতে কঠোরে—’ডান হাতে পূর্ণ কর তুমি সুধা/বাম হাতে চূর্ণ কর পাত্র।’ যেমন এই পৃথিবী তেমনি তার সৃষ্টির জগৎ কখনো শক্তি ও মাধুর্যের আশ্চর্য সমন্বয় ঘটায়, কখনো শক্তিকে বিয়োজিত করে মাধুর্যের বিকাশে। কখনোবা শক্তি-মাধুর্যের কুশলী বিন্যাসে ব্যবহারে প্রকাশ ঘটায় তৃতীয় আরেক বাস্তবতার সে হলো সত্য। এ প্রসঙ্গ আমরা পরে আলোচনা করব।

আসলে সৃষ্টি প্রধানত প্রাণশক্তিরই প্রকাশ, যার বিকাশ ঘটে কল্পনা ও মননশক্তির প্রভাবে, পূর্ণতা মেলে বেদনশীলতা ও রসবোধের আশ্রয়ে। ভাবের ভ্রূণকে পত্রপল্লবে বিকশিত করবার এরাই তো শক্তি। না হয় কি বলা সম্ভব-রুদ্রবেশে কেমন খেলা কালোমেঘের ভ্রুকুটি (রবীন্দ্রনাথ)। না হয় কি ভাবা সম্ভব-বিকেলের শিশুসূর্যকে ঘিরে মায়ের আবেগে করুণ হয়েছে ঝাউবন (শিরীষের ডালপালা / জীবনানন্দ)। না হয় কি নৃমুণ্ডধারী রক্তজিহ্ব বিকটদর্শন কালী শ্যামা মায়ের রূপ ধরে ভক্তিরসের উৎস হন—’পাতার কোলে কুঁড়ির সম জাগ হৃদয়ে কলম-সম’ (নজরুল/প্রথম পঙক্তি- নিশি-কাজল শ্যামা আয় মা নিশীথ রাতে)। বিদ্রোহী নজরুলের যথার্থ রূপ এই মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরি। আর হাতে রণতূর্য’ (বিদ্রোহী) যথার্থই তিনি ‘তন্বী নয়নে বহ্নি’ (ঐ)। তন্বী এবং বহ্নি উভয়েরই আধার যেন শক্তি, আধেয় রূপমাধুরী। রহস্য করে বলা যায়, উভয়েই অধরা মাধুরী।

আবার সাঙ্গীতিক কাঠামোগত দিক থেকে কোনো রাগে রুদ্র রূপ প্রকাশ পায়, কোনো রাগে প্রকাশিত হয় কোমল ভাব। আফতাব-এ-মৌশিকি ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ সাহেবের মর্দানা ঢঙের গাম্ভীর্যের পরে খান সাহেব আবদুল করিম খানের গান করুণ রসের মাধুরীতে মন ভিজিয়ে দেয়। কেশরবাঈ কেরকারের গলার জোয়ারিতে যে রস হীরাবাঈ বরোদেকরের মধুকণ্ঠে তা নয়, মেলে অন্য কিছু। নৃত্যে লাস্য ও তাণ্ডবে যেন ভিন্ন ভিন্ন রূপ ও ভাব ফোটে তেমনি মুদ্রার বিভিন্নতায় কখনো নাচ শক্তির প্রকাশ কখনোবা মাধুর্যের এবং প্রায়ই বীর্য ও মাধুর্যের সমন্বয়ে নাচের লাবণ্য পায় শক্ত ঠাঁই।

শক্তি ছাড়া সৃষ্টির প্রকাশ ঘটে না। কিন্তু স্রষ্টা অর্থাৎ শিল্পী, শক্তিরই প্রকাশ ঘটাতে চান কদাচিৎ, প্রায়শ তাঁর লক্ষ্য সুন্দর, অথবা সত্য, বিশেষত রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘যথার্থ সত্য হয়ে ওঠা’। এখানে বলে রাখা ভালো, সত্য অনেক সময় নির্মম, আবার কখনো সততার গুণে সুন্দর। এই সূত্রে মনে পড়া স্বাভাবিক রবীন্দ্রনাথের স্মরণীয় পঙক্তি- ‘সত্য যে কঠিন/কঠিনেরে ভালোবাসিলাম/সে কভু করে না বঞ্চনা…’ (কপ- নারানের কূলে)। এখানে বক্তব্যের নিরাভরণ জীবন সম্পর্কে নির্মোহ সত্যোপলব্ধি আমাদের সততায় শ্রোতা শুধু চমকিত হন না, মুগ্ধও হন। অন্তরকে ঋদ্ধ করে, এক অনির্বচনীয় বোধ আমাদের মনের প্রাত্যহিক ক্ষুদ্রতার গ্লানি মোচন করে মনকে শুদ্ধ ও মহৎ বোধের জন্যে তৈরি করে। মহত্তর বোধে আমরা উন্নীত হই চেতনার চিত্তলোকে তাকে সৎ ও শুদ্ধ বলেই সুন্দর বলতে গভীরলোকে। এই সত্যবোধ যে সমৃদ্ধি আনে ইচ্ছে করে। এর সূত্র ধরে বলতে পারি সত্য কখনো সুন্দর-নিরপেক্ষ নয়, নয়ত বিকৃতি (distortion) এবং কদাকৃতি (ugliness) প্রকাশেও কুণ্ঠিত হয় না কেন। সত্য এতটাই শক্তিমান যে সে তা পারে। তবে পারে কেবল শিল্পের রূপ ধরে। পিঠে মস্ত কুঁজ নিয়ে কদাকার মানুষ কোয়াসিমদো মহৎ উপন্যাসের নায়ক হয়েছেন ফরাসি কথাশিল্পী ভিক্টর হুগোর কল্যাণে। জীবনের মহৎ সত্যের সৌকর্যে সে শক্তিমান, আর সত্যের শক্তিতে বলীয়ান সে সুন্দর- নিরপেক্ষ হতে পারে বলে অসুন্দরের দোষ তাকে যেন স্পর্শ করে না। এ প্রসঙ্গে কিটস-এর বহু ব্যবহৃত পঙক্তিটি স্মরণ করা যায়—

“Beauty is truth, truth beauty”,- that is all

Ye know on earth and all ye need to know.

[Ode on a Grecian Urn] এইখানে একটা প্রসঙ্গ বলে রাখি। আদিরস যেমন শিল্পে গ্রাহ্য তেমনি আদিমতাও। আদিম এবং পরিশীলিত—শিল্প উভয়ই হতে পারে; পারে উভয়ের নানামাত্রিক মিশ্রণ ও ভূমিকায় স্বকীয় স্বতন্ত্র মাত্রা অর্জন করতে। মনে রাখা দরকার, আদিম শিল্প সবসময় আদিম শক্তির প্রকাশ ঘটায় না, তা সুবেদী কমনীয়ও হতে পারে।চিত্র ৪৷৷ শিল্পে আদিম (primitive), এমনকি বন্য (wild) শক্তির প্রকাশ ঘটলেও, যেমনটা আমরা কোনো কোনো ছবিতে পাই চিত্র ৫), কোনশিল্পেই পাশবশক্তির (savage, brute force) প্রকাশ স্থায়ীভাবে হয় না। যা ঘটে তা ভাবে কিংবা রূপে সত্যের মূল্যে সুন্দর কিংবা সুন্দর-নিরপেক্ষ সত্যে উন্নীত/রূপান্তরিত এক ভাষ্য। সেটাই সৃষ্টি, শিল্প।

ভাবের ক্ষেত্রে শক্তি (force) সহজেই রূপান্তরিত হয় মাধুর্যে (grace) – আদ্যাশক্তিকে নিয়ে সঙ্গীত ভাবের ক্ষেত্রে ভক্তিরস সৃষ্টি করে এবং ভক্তিরস ও সাঙ্গীতিক শক্তির (যা গায়ন দক্ষতায় প্রকাশ পায়) সমন্বয়ে প্রকাশ পায় অপরূপ সাঙ্গীতিক পরোৎকর্ষ (musical excellence), তাতে শ্রবণ ধন্য হয়। সুর রসের মাধুর্যে সুন্দরের জন্ম দিল।

ভাবের ক্ষেত্রে যত স্বাভাবিক এ সমন্বয়, রূপের ক্ষেত্রে—যা মূলত দেখার এবং দেখে অনুভব করার ও বোঝার তা কি সহজ? নাকি জটিল, নাটকীয় ?

নন্দলালের দৃপ্তভঙ্গির শাল আমরা দেখেছি। দেখে রাখি জয়নুলের বিদ্রোহী ষাঁড় । চিত্র ৬/– ন্যূনতম রঙে আর ক্ষীপ্র রেখার দীপ্রপ্রভায় কী বলিষ্ঠ প্রকাশ! বলিষ্ঠ এবং সুন্দর। এই বলিষ্ঠতা ও এই সৌন্দর্যের ভিত্তিভূমি হলো এর সততা এবং সত্যতা। দৃশ্যত এই যা বলিষ্ঠ, যার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা হলো শক্তি তা কিন্তু মোটেও থাকেনি পেশিশক্তি, হয়নি ‘পাশব’ শক্তি (যদিও ষাঁড়টি পশুই); শিল্পীর অঙ্কনে ষাঁড়টি একটি বিশেষ দুর্লভ ব্যতিক্রমি উচ্চতর ভাবের (এক্ষেত্রে বিদ্রোহ) দ্যোতক ভঙ্গিতে যথার্থতায় ধরা পড়েছে। একটা রূপের জন্ম হয়েছে যা এক বা একাধিক ভাবের জন্ম দিতে পারে, যা কি-না হতে পারে চিরকালীন মহৎ অভূতপূর্ব কোনো ভাব ও ধারণা। তাই তো জয়নুল তাঁর ষাঁড়ের ছবির নাম দিয়েছিলেন ‘বিদ্রোহী’। বাস্তবে বাঘ কিংবা সিংহের শক্তিময় সৌন্দর্যের ‘রাজসিক রূপ’ দেখে কে না অভিভূত হয়। পিকাসোর রাগী মোরগ চিত্র রামকিংকরের দুষ্টু বিড়াল, নন্দলালের বুনো শূকর বা জয়নুলের ধূর্ত কাক । চিত্র

৮। আমাদের মনে দাগ কেটে রাখে। অর্থাৎ ছবিগুলো সার্থক। এর কারণ, প্রথমত, অঙ্কন খুবই সৎ-ষাঁড়, মোরগ, খরগোশ, বিড়াল, শূকর, কাককে তাদের বিশেষ কোনো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পীরা। দ্বিতীয়ত, অঙ্কন খুবই দক্ষ—প্রাণীগুলো জড়মূর্তি নয়, বরং স্বমূর্তিতে জীবন্ত। তৃতীয়ত, অঙ্কনেই অর্থাৎ দৃশ্যেই ছবি সীমাবদ্ধ নয়, ভরে ওঠে রসে ও ভাবে, যা প্রাণীকে চিত্রে বা শিল্পে উন্নীত করে, তাদের ইতরতা তুচ্ছতা ও ক্ষণতা ঘুচিয়ে উচ্চতর ভাবের রোশনাই জ্বেলে তাদের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। এভাবে শৈল্পিক চিরকালীনতার জন্ম হয়। মূলত সত্য হয়েই ছবি দর্শনীয় হয়ে ওঠে; আর ভাব ও চরিত্রের ভূষণে রীতিমতো সুন্দরও হয়ে ওঠে।

আদিম যেমন সুন্দর হতে পারে তেমনি হতে পারে ইতর ও তুচ্ছও, যেমন জয়নুলের কাক। একইভাবে শক্তি ও সুন্দরের মধ্যেও বিরোধ নেই। এইখানে বলা দরকার মাধুর্য সব সময় সুন্দর হলেও সুন্দর সব সময় মধুর নয়। মাধুর্য এমন একটি দৃশ্যগত বৈশিষ্ট্য যার আবশ্যিক শর্ত হলো সুন্দর হওয়া, বিশেষত যা সচরাচর গণ্ডিবদ্ধ মানবীয় সৌন্দর্যে, আরো নির্দিষ্টভাবে, নারীর সৌন্দর্যে যা মূলত শরীরী, দৈহিক । এই বিচারে মাধুর্য সুন্দরের তুলনায় সীমিত ও সঙ্কীর্ণ। সুন্দর মাধুর্যের গণ্ডি ছাপিয়ে সত্যের অঙ্গনে এবং ভাব ও মূল্যের জগতে স্বচ্ছন্দে বিহার করে। সুন্দর এমনকি দৃশ্যত অসুন্দরকেও অবলম্বন করে সততা, উচ্চ ভাব ও মূল্যের বুনিয়াদে চমৎকার ফুটে ওঠে। অর্থাৎ দৃশ্যগত অসুন্দরের আভরণ হয়ে জায়গা নেয় উচ্চ ভাব ও মূল্য। ছবি হয়ে যায় সুন্দর। এইখানে বলে রাখি, মানুষের জগতে যা কিছু দৃশ্যমান তা সাধারণত মূল্য-নিরপেক্ষ ( value neutral) নয়। বস্তুত মানবসমাজ কখনোই মূল্য-নিরপেক্ষ অবস্থান নেয় না।

সুন্দরের যে সনাতন ধারণা তার তোয়াক্কা করেননি পিকাসো প্রতিবাদের ছবি গের্নিকায় (চিত্র ৯। বর্বর শক্তির বিরুদ্ধে এ ছিল শিল্পীর শক্ত প্রতিবাদ। কিন্তু ক্রোধ ও প্রতিবাদকে দৃশ্যশিল্পে তাঁর তুরীয় দক্ষতায় চমৎকার ভারসাম্যে প্রকাশ করেছেন শিল্পী। কাটাকাটা রেখাগুলো স্পষ্ট ও বলিষ্ঠ, প্রায়শ তির্যক ও কৌণিক, এবং তৈরি করেছে কর্তিত অঙ্গের অবিন্যস্ত ফর্মে সহিংস আখ্যান, সঞ্চারিত করেছে সংঘাতের শঙ্কা। প্রতিবেশকে টানটান করে তুলেছে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ। এ ছবি সনাতন অর্থে সুন্দর নয়, মাধুর্যের ধারেকাছেও নেই; কিন্তু এটি সৎ ছবি, সাহসী ছবি। সৎসাহসকে অসুন্দর বলি কী করে! আসলে সততা বা সৎসাহস সমীহ জাগায়, শ্রদ্ধা কাড়ে, গুরুত্ব পায়। গের্নিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছবি – সততার জোরে অমর অক্ষয় এবং মহৎ এ ছবি। সমঝদারের নজর এড়ায় না এর সুষমা ও সৌষ্ঠব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, একটা ভাব ঘনীভূত হয়ে ফুটে ওঠে। সেই ভাবের গুরুত্ব ও যাথার্থ প্রশ্নাতীত, আর তার নাটকীয়তা ও সংবেগ ঐতিহাসিক প্রাসঙ্গিকতার দিকটি তুলে ধরে। এ ছবি শক্তির প্রকাশ ঘটায় ঠিকই, কিন্তু এর গুরুত্বটা বিষয়বস্তুর ঐতিহাসিক মাহাত্ম্যে এবং ভাবের যথার্থ ও সৎ অঙ্কনে প্রতিষ্ঠিত হয়। যুগ যুগ ধরে এ ছবি সত্যের নির্ভীক (শক্তিমান) প্রকাশ হিসেবে সুন্দরের স্বীকৃতি পাচ্ছে।

এই সূত্রে আমরা আরেকটু উজিয়ে মনে করতে পারি ইতালীয় চিত্রকর কারাভাজ্জিওর কথা, বিশেষত তাঁর তিনটি ছবির প্রসঙ্গ, যথা— সেইন্ট জন দ্য ব্যাপটিস্টের শিরশ্ছেদ (Beheading of St. John the Baptist), ইব্রাহিমের ত্যাগ (Sacrifice of Abraham, 1603-4) এবং হলফোর্নিসের শিরশ্ছেদ করছে জুডিথ (Judith Be heading Holforneice, 1598-99) [চিত্র-১০)৷ দুটি সাক্ষাৎ খুনের ছবি, মাঝেরটিতে হত্যার পূর্বমুহূর্ত বিবৃত। ছবিগুলো দৈহিক (physical), বর্বর, নির্মম—অন্তত খুনের ছবি দুটিতে বর্বর পশুশক্তির জয়জয়কার স্পষ্ট। ইহুদি নায়িকা জুডিথ রীতিমতো করাত চালাচ্ছে শত্রু সেনাপতি হলফোর্নিসের গলায়। এত নৃশংসতা শিল্প কীভাবে ধারণ করল? নৃশংসতা সচরাচর বলপ্রয়োগেই ঘটে থাকে যা শক্তির বহিঃপ্রকাশ বটে। তবে মানবের ক্ষেত্রে বল নয় চারিত্রিক শক্তিই মনুষ্যত্বের বিচারে শরীরী মুখ্য বিবেচ্য বিষয়। নৃশংসতাকে শিল্পের উপজীব্য হিসেবে ভাবা মুশকিল এবং কারাভাজ্জিও তাঁর নিপুণ দক্ষতায় আমাদের সমূহ বিপদে ফেলে দেন। তাঁর ছবিতে একদিকে আছে বিষয়বস্তুর ঐতিহাসিকতা, তার সাথে ঘটনার নাটকীয়তা যুক্ত হয়েছে, আর অন্যদিকে আলো-আঁধারির চমৎকার ব্যবহারের সাথে অভিব্যক্তির প্রকাশে শৈল্পিক নৈপুণ্য মিলে ছবিগুলো স্মরণীয় হয়ে আছে। যদিও Ruskin এই চিত্রকরের মধ্যে ‘definite signs of evil mind’ দেখতে পেয়েছেন, দেখেছেন * perpetual seeking for and feeding upon horror and ugliness, and filthi- ness of sin’ তবুও ছবির প্রকরণগত দক্ষতায় সৃষ্ট দৃশ্যগত রূপ এবং ভাবগত অভিঘাত মিলে ছবিগুলো যেমন দর্শনীয় তেমনি স্মরণীয় হয়ে আছে সে কথা অস্বীকার করা যায় না। একেবারে বর্বর শক্তি ও বীভৎস রসের প্রকাশেও কোথায় যেন চারুকলার মাধুৰ্যটুকু সঙ্গীতের স্পর্শস্বরের মতো অন্তলীন হয়ে আছে। নতুবা এসব ছবি কালের উজান বেয়ে এতদিন টিকে থাকে!

ইম্প্রেশনিস্টরা ছবিতে মস্ত বড় গুণগত পরিবর্তন এনেছেন। তাঁদের পরেই পশ্চিমা ছবির বিশ্বজয় ও আধিপত্য শুরু হয়। পশ্চিমের ছবি এতকাল বহুলাংশে ছিল বিষয় ও ভাবাশ্রয়ী পুরাণ ও ইতিহাসের সূত্র ধরে ঘটনা ও চরিত্র নির্ভর কিংবা সাহিত্যের অনুসরণে মানুষ মানবিক গুণবৈশিষ্ট্যের মুখাপেক্ষী। যে চিত্রভাষা মুখ্যত রেখা ও রঙের নির্মিতি তাদের অমৃত বৈচিত্র্যকে সাধারণত পরিণতি দেওয়া হয়েে ঐতিহাসিক ধর্মপৌরাণিক বা সাহিত্যিক ভাষা রচনায়। দৃশ্যশিল্প ( visual art) হিসেবে চমৎকার ও মহৎ সব চারুকলার কথা আমরা জানি, তবে তারা কদাচিৎ ব্যক্তি বা ঘটনানিরপেক্ষ, ইতিহাস ও সাহিত্য গুণ-নিরপেক্ষ স্বাবলম্বী।

ইম্প্রেশনিস্টরা ও তাঁদের সমকালীন এবং পরবর্তী অনেকেই অবয়ব (figure) এঁকেছেন। কিন্তু ততদিনে ইতিহাস ও সাহিত্যের মুখাপেক্ষিতাও শিল্পীর কেটে গেছে। দুটি বড় ঘটনার অভিঘাত তাঁদের ওপর পড়েছে এবং তাঁদের মাধ্যমে চিত্রজগতে স্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। ভাবগত দিক থেকে বলতে হয় ফরাসি বিপ্লবের কথা আর বস্তুগত দিক থেকে বলা যায় আলোকবিজ্ঞানের ক্রমবিকাশের কথা। এই বিজ্ঞানের প্রভাবে মানুষের ধারণা ও ভাবজগতে ব্যাপক ও গুণগত পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে, যা অন্য শিল্পীদের মতো, বা তাদের চেয়েও বেশি চিত্রকরদের বিশেষভাবে আলোড়িত করেছে। এ পর্যায়ে শিল্পী মানুষ আঁকেন ঐতিহাসিক চরিত্র বলে নয় (হলেও সেটাই মুখ্য নয়), নিতান্ত ছবিরই প্রয়োজনে; তিনি সাহিত্যের বা ধর্মীয় কাহিনীর অনুকরণে প্রেম বা বাৎসল্য বা অন্যান্য রস ও নাটকীয়তা ফোটান না, তিনি তৈরি করেন দৃশ্যগত বোধ—রঙ, রেখা, ফর্মের কারসাজিতে। ছবি হঠাৎ যেন স্বাধীনতা পেয়ে গেল—ইতিহাস, পুরাণ সাহিত্য বা সনাতন ধারণার হাত থেকে মুি পেল। মনের (Monet) যে সূর্যোদয়ের নিসর্গচিত্রটি চিত্র-১১। ইম্প্রেশনিজমের মাইলফলক ছবি সেখানে দেখি রঙের প্রাধান্যে একটি আবহ তৈরি হয়েছে। তার রস শান্ত এবং মধুর।

ছবির দুই প্রধান কাণ্ডারী রেখা ও রঙের মধ্যে যেন রঙ বেশি মাত্রায় গুরুত্ব পেতে থাকল। এবা রঙকে বিশ্লেষণ করলেন। ইম্প্রেশনিস্টদের রাজা পল সেজান লিখলেন ‘painting is recording of coloured sensations’। রঙের রয়েছে অনুভূতি (feelings) ও মেজাজের (mood) তারতম্য যা প্রকাশ পায় তাদের উষ্ণ (warm) এবং শীতল (cool) এই দুই প্রধান ভাগে চিহ্নিত হওয়ার মাধ্যমে। আবার রঙ ও রেখা উভয়েরই রয়েছে মূল্যগত (value based) ব্যাখ্যার সুযোগ। তাতে আমরা দেখি ভ্যান গঘ রঙের নির্বাচন ও প্রয়োগে শক্তির প্রকাশ ঘটান [চিত্র-১২], তুলনায় দেগা ও রেনোয়ার ঝোঁক মাধুর্যের দিকে।চিত্র-১৩৷৷

এখানে ছবির জগতে বিজ্ঞানের হস্তক্ষেপের কথাটা উঠবে। নিউটনের আলোকবিজ্ঞান (opti cal science) এবং তারই সূত্রে রঙ সম্পর্কে বিপ্লবী ব্যতিক্রমি ধারণাগুলো শিল্প-সংস্কৃতির জগতে ধীরে ধীরে গ্রাহ্য হতে ও গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে। এতে আগের মোটামুটি কল্পনাপ্রসূত ধারণানির্ভর (conceptual) তত্ত্ব থেকে প্রত্যক্ষ উপলব্ধ (perceptual) তত্ত্বের উদ্ভব হয়েছে রঙ নিয়ে। শিল্পী বিশ্লেষণের দিকে এগোলেন। মাতিস, রঙের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ আরেক শিল্পী, কত গভীর ও অনুপুঙ্খ (minutely ) রঙ ও রঙের ব্যবহার নিয়ে ভেবেছেন। তিনি বলছেন, If upon a white canvas I set down the sensations of blue, of green, of red, each new stroke diminishes the importance of the preceding ones. Suppose I have to paint an interior. I have before me a cupboard; it gives me a sensation of vivid red and I put down a red which satisfies me. A relation is established between this red and the white of the canvas-let me put a green near the red and make the floor yellow; and again their will be relationships between the green or yellow and white of the canvas which will satisfy me.

মাতিসের Music অথবা Dance কিংবা পল ব্রি-র Sub-tropical Landscape দেখুন [চিত্র-১৪), যেন রঙের চিত্রকলা। তাতে চিত্রটি রঙেরই মাধুর্যে শক্তিশালী দৃশ্যপট তৈরি করে। অনেকটা নাচের কার্যকারিতার মতো মাধুর্যময় প্রকাশেই সৌন্দর্যের শক্তির বিকাশ ঘটতে থাকে।

ভ্যান গঘের মনের অস্থিরতা ও সংবেগ যেন রঙের মধ্যে শক্তিমত্তা খুঁজেছে। রঙ (colour) নয় রঙের রঞ্জকের (pigment) বুনট (tex- ture) এবং তার ভিত্তিতে তৈরি করেছেন তীব্রতা, দাহ, জ্বালা। ছবি যেন জ্বলছে—তবে এর মধ্যে শিল্পীর অন্তর্দাহ ঢাকা পড়ে না। শক্তির এই অনন্য প্রকাশে জ্বলন্ত ছবি যেন মাধুর্যকে ছাইপাশ বানিয়ে ছাড়ে। নাকি অন্তর্দাহের আভাসটুকু অন্তর্হিতপ্রায় মাধুর্যকে আরো কাম্য করে তোলে, যেমন শেলীর কবিতায় শুনি- ‘Heard melodies are sweet, but those unheard are sweet- er? এ তো রোমান্টিক ভাবাবেগ (passion); romantic agonyও তো রোমান্টিকই। রগচটা ভ্যান গঘও তাহলে মর্মে মর্মে জাত রোমান্টিক!

রঙের প্রাধান্য তা বলে একচেটিয়া হলো না। চিত্রকর কি তার প্রথম পাঠ রেখাকে ছাড়তে পারে? ডাকাবুকো আধুনিক পিকাসো জীবনটাকে ষোলো আনাই পৌরুষের জৌলুসে মাতিয়েছেন। তাঁর বিভিন্ন পর্বের ছবিতেও পুরুষকারের স্বর বেশ শোনা যায়। সেই তিনি যখন নৃত্যপর ব্যালেরিনাদের আঁকেন, তখন কী সযত্ন প্রয়াসে লাবণ্য ও মাধুর্য নিশ্চিত করেন। রেখা কমনীয় শরীর এবং মোহনীয় নৃত্য উভয়কেই বাঙ্ময় করে তোলে-রেখায় গতি ও স্থিতি, সারল্য ও বঙ্কিমতা, চলা ও বাঁক, পেশি ও খাঁজ, অঙ্গ ও ভঙ্গি সবই ফুটে ওঠে। নৃত্যে-ব্যালেতে বটেই—প্রচণ্ড শক্তির প্রয়োজন; কিন্তু তবুও সব মিলে সে ফোটায় ফলায় মাধুর্য। এই অপ্সরীতুল্য ব্যালেরিনা চতুষ্টয়ের ছবি দেখতে দেখতে মনে পড়ে যায় কবিতার পঙক্তি- দেহ তো নয় মোমের ক্ষরণ (ঘুম / আলোকঞ্জন দাশগুপ্ত)। মসৃণ, পেলব, নমনীয়, গতিশীল, ছন্দোময় এবং দৃশ্যত অসীম ও অফুরন্ত।

রেখাকে একেবারেই ভিন্নভাবে ব্যবহার করলেন এডভার্ড মুঙ্ক তাঁর দ্য কিস (The Kiss) ছবিতে চিত্র ১৫। ছাপচিত্রের বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে চুম্বনের অধরা মাধুরীর রহস্য বেশ জমিয়েছেন। রোমান্টিক আশ্লেষে বলতে হবে মধুর তোমার শেষ যে না পাই’। তুলনায় রদ্যার বিশাল ও শক্তপোক্ত ভাস্কর্য চুম্বনে তনুমনের মাধুর্যই ঝরে পড়ে। বৈষ্ণব কবির সুরে বলা যায়- প্রতি অঙ্গ কাঁদে প্রতি অঙ্গ লাগি। কিংবা-লাখো লাখো যুগ হিয়ে হিয়া রাখনু তবু হিয়া জুড়ানো ন গেল।

পরাবাস্তববাদীরা দেখিয়েছেন কল্পনার শক্তি। তবে ছবি তো আর শুধু কল্পনা দিয়ে হয় না, কল্পনার সাথে পাল্লা দিতে বস্তুর (object) যে রূপান্তরিত অভিনব ভাষ্য কিংবা উদ্ভট প্রকাশ ও বিন্যাস ঘটিয়েছেন তার পেছনে সৃজনশীল দক্ষতাই মূল। এসব ছবিকে ভাব বা রসে মধুর বলা যাবে না, এতে এমন মনোভাবের প্রকাশ ঘটে যা ভাবনার চেয়ে কল্পনাশ্রয়ী, যে কল্পনায় ভাবনা ভ্রূণাবস্থায় বিরাজ করে। ছবিতে অনৈক্যের সামঞ্জস্য, বস্তুর ভরহীন ভাসমানতা, অর্থ ও তাৎপর্যের বিশৃঙ্খলার বিন্যাস, প্রলাপের সংলাপ প্রতিষ্ঠিত হতে দেখি। এ যেন শক্তি ও মাধুর্যের দুর্লভ ব্যতিক্রমি সমন্বয়।

ছবি ক্রমেই বিমূর্ত হতে থাকল, বিশুদ্ধ রঙের রূপ (form), সংকেত (sign), প্রতীক (sym bol) তো তৈরি হলো, এমনকি বর্ণের মাত্রা, ঘনত্ব, বল এবং বর্ণের আভা (hue), মূল্য (value) ব্যঞ্জনা (nuance), মেজাজ (mood), রস চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে থাকল। বর্ণ ও রেখার বস্তুনিরপেক্ষ স্বাবলম্বী ভূমিকা চিত্রে এনেছে অজ্ঞাতপূর্ব স্বাদ। আধুনিক জীবন জটিল, দ্রুত ধাবমান, অস্থির, উত্তাল, সংঘাতময় এবং ঘিঞ্জি, অনচ্ছ (opaque), অনিশ্চিত। ছবি এই জীবনকে ধারণ ও রূপায়ণ করতে গিয়ে নিজেই হয়েছে জটিল, জটিলতর ভাবের সন্ধান ও সংস্থান করতে করতে। ধর্ম- পুরাণ, ইতিহাস ও সাহিত্যকে সরাসরি আশ্রয় করার দাবি আগেই ছেড়েছে ছবি, এবার যেন বস্তু ও বাস্তবের স্থূল দৃশ্যজগৎকে ছেড়ে বোধ ও অনুভবের সূক্ষ্ম জগতে পাড়ি দিল মূলত রেখা ও রঙের মতো নিরঙ্কুশ চিত্রভাষার ওপর ভর করে।

কিন্তু এই বিমূর্ত ছবিতেও কেবল কল্পনার বা অঙ্কনের নয়-ভাব ও রসের দিক থেকেও কখনো শক্তি কখনো মাধুর্যের প্রাধান্য, কখনও উভয়ের সূক্ষ্ম সমন্বয় ও ভারসাম্য গড়ে উঠতে দেখি। গগনেন্দ্রনাথ তাঁর একটি বিমূর্ত ছবির নাম দিয়েছেন হাসি (চিত্র-১৬৷৷ বলাই বাহুল্য এই হাসিটি মধুর; ইতিবাচক হাসি জীবনীশক্তিরই প্রকাশ ঘটায়। তার মধ্যে মাধুর্যের সাথী সেই শক্তিকেও আমরা অনুভব করি তির্যক ত্রিভুজের কাটাকুটির মধ্যে।

ছবি অতীতেও আঁকা হয়েছে, এখনও আঁকা হচ্ছে, ভবিষ্যতেও নিশ্চয় আঁকা হবে। অন্যান্য শিল্পের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। হয়তো জীবন নতুন নতুন উপাদানে সমৃদ্ধ কিংবা দীন হবে, পরিবর্তনের অমোঘ পদপাত জীবনকে অন্যতর ব্যঞ্জনা দেবে, মানুষের অভিজ্ঞতার জগৎ হয়তো বা আমূল পালটে যাবে। সব শিল্পের জগতে নাড়া খাবে নিশ্চয়। নতুন পরিস্থিতি ও বাস্তবতাকে বুঝে নিতে, তার প্রবণতা ও চাহিদা অনুধাবনে সৃজনশীল মেধা মাথা খাটাবে, হৃদয়মন নিষ্ঠায় মনোযোগী হবে। শিল্প নতুন নতুন বাঁক নেবে। আজ শিল্পজগতে উপকরণের ক্ষেত্রে যেমন যন্ত্রের নানামুখী ব্যবহার বাড়ছে তেমনি ভাবনার জগতে এসেছে তাৎক্ষণিকতার বোধ, অস্থিরতার পাশাপাশি অনিত্যতার চাপ। কম্পিউটার গ্রাফিক্স, ফটোগ্রাফির অসীম সম্ভাবনা কেবল দৃশ্যশিল্পের জগতে গুণগত পরিবর্তনের তাগিদ তৈরি করেনি, অন্যান্য শিল্পেও পরিবর্তন এবং সম্প্রসারণের তাগাদা নিয়ে এসেছে। নতুন নিরীক্ষা চলছে, তা হয়তো আরো ব্যাপক ও মৌলিক হবে।

তারও চেয়ে বড় কথা, শিল্পের ক্ষেত্রে মানুষ যেমন শক্তির তাগিদ ও প্রবণতা অনুভব করবে তেমনি তার থাকবে মাধুর্যের জন্যে আকুতি ও পক্ষপাত ।

সুন্দরের অন্বেষণে নেমে সত্যের প্রসাদ সে পাবে, বিলাবে। ‘সত্য হয়ে ওঠার’ চেষ্টা থেকে তার শিল্পচর্চা। তার জীবনে এত আড়াল এত কপটতা এতই মিথ্যার জঞ্জাল জমে যে সত্যের অন্বেষণ ভাঙা ও গড়ার মতো প্রচণ্ড শক্তির যোগান ছাড়া সার্থক হতে পারে না। শিল্প একে কল্পনাশক্তি ও সৃজনশক্তির মুখাপেক্ষী তায় আবার জীবনের কৃত্রিম সব আভরণে চাপা পড়ে দিনে দিনে আরো বাড়তি শক্তির মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ছে। যে-কোনো শিল্পীকে সে দায় নিতেই

হবে।

সত্য সম্পর্কে সমাজে এত সংস্কার তৈরি হয়েছে, সংস্কৃতির নানা উপচার ও মোড়কে সত্যের এত রকমারি ভাষ্য তৈরি হয় যে, সত্য কি তা অনন্ত জিজ্ঞাসা ও অনিঃশেষ তর্কেরও জন্ম দেয়। জীবনে তাই সত্য প্রতিষ্ঠিত করা খুবই কঠিন, তুলনায় শিল্প মানুষের মনে সহজে সত্য

হয়ে ধরা দেয়। তবুও মানুষ খুব সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করেই তারপর বলতে পারে- Beauty is truth, truth beauty-র মতো কথা। সৎ জীবন নিশ্চিত হবে জীবন সুন্দর হলে, কিংবা তার বিপরীতভাবেও বলা যায়, সুন্দর জীবন নিশ্চিত হবে সৎ জীবনযাপন করলে। তবে সুন্দরের চরম ও নিরঙ্কুশ দৃশ্যায়ন ঘটে মাধুর্যে। আর সত্যের? সেটা দৃশ্যে নয় ভাবে সুন্দর হয়ে ওঠে। তখন হয়তো মানতে হবে শুধু দৃশ্যমানতা শিল্পের মোক্ষও নয় মুখ্যও নয়। অন্তরের তথা গভীরের মহৎ বোধ ও ভাবেই তার মূল্য।

মানুষ এর জন্যে তৃষিত থাকে আর সেই তৃষ্ণা তার শিল্পে প্রকাশিত হয় অকাতরে। কিন্তু তার ভাবগত প্রকাশ মাধুর্যের মুখাপেক্ষী না হয়ে সত্যের অমধুর কোনো রূপের প্রতি দায়বদ্ধ হতে পারে। সততার দায় মানুষকে দেহ-মন ও চরিত্রের শক্তি অর্জনে উদ্বুদ্ধ করে। বরাবর এই দোলাচল এই টানাপোড়েন সৃজনশীল সত্তাকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করেছে, পথ চলতে প্রেরণা দিয়েছে। তাকে বরাবর বাঁশরি ও রণতূর্যকে মেলাতে হয়। অতীতের এই রেশ আরো দীর্ঘ অনাদিকাল টিকে থাকবে বলে মনে হয়।