দেশের সীমানা আছে। সংস্কৃতি সেই সীমানা মানে না। এক দেশের মানুষের ভাবনার সঙ্গে অন্য দেশের মানুষের চিন্তা মিশে যাচ্ছে। এ ঘটনা কতকাল ধরে চলছে তা বুঝতে হলে জানা ইতিহাসেরও আগের সময়ের কর্মকান্ডের কথা অনুমান করতে হবে। সংস্কৃতি মানুষ রচনা করে। মানুষ চিরকাল সুদূরের পিয়াসী। মানুষ মূলত একা নয়। মানুষ আরো মানুষের সাথে মিশতে চায়। মানুষের এই নিরন্তর সম্প্রীতির কারণে কোনো জনগোষ্ঠীর বা দেশের সংস্কৃতিকে একান্তভাবে ওই দেশেরই সংস্কৃতি বলে মেনে নেওয়া যায় না ।
শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা রাষ্ট্রের সীমানা তো মানেই না, মহাদেশের সীমানাও তা মেনে নেয় না। যদিও মহাদেশে মহাদেশে মহাসাগরের দূরত্ব। তবু মহাসাগরের জল আটকে দিতে পারেনি মানুষের সম্প্রীতির মহাযাত্রা। মানুষ ঐক্য গড়তে চায়, কিন্তু দূরত্ব সৃষ্টি হয়, ইতিহাসের পরিহাস। মানুষের মৌলিক চিন্তায় অনেক মিল। গৌতম বুদ্ধ, কনফুসিয়াস আর সক্রেটিস এই গোল পৃথিবীর তিন দ্রাঘিমাংশে একই সময় কল্যাণের বাণী শুনিয়েছেন। তবু শান্তি দীর্ঘজীবী হয়নি । ভেদরেখা টেনেছে মানুষ। কুটিল করেছে তার ইতিহাস। দেশ ও মহাদেশের নানা অর্থ হয়েছে। আলেকজান্ডারের গ্রিক নন্দনতত্ত্ব বুদ্ধের আয়নায় মুখ দেখেছে। শিল্পে পূর্ব-পশ্চিম মিশেছে। মিশেছে হয়তো তারও আগে। বুদ্ধের বাণী ভারত ছেড়ে ধ্বনি- প্রতিধ্বনি তুলেছে চীন, ইন্দোচীন, কোরিয়া, জাপানের মনে। মধ্য এশিয়ার মোঘলের রঙের জৌলুসে ভারত অলংকার পরিয়েছে। মোগলের দরবারে পশ্চিমের দূত এসেছে, পাঠ করেছে নতুন সংবাদ। ইতালির রেনেসাঁয় একই সঙ্গে এল জ্ঞানের মুক্তি ও ঔপনিবেশিকতা। পূর্বদেশের সাগরতীরে জাহাজ ভেড়াল পশ্চিমের উচ্চাভিলাষী। নাবিক। সংঘর্ষ ও সম্প্রীতির বিচিত্র ঘটনায় টালমাটাল হলো পূর্ব-পশ্চিমের সাত সাগরের জল। ঐতিহ্যের নানা ধারা তৈরি হলো। তবে মূলত দুটি ধারা: পরম্পরাগত চিরকেলে ধারা এবং নবীনকালের ধারা যাকে আধুনিক বলা হয়। শিল্পের মধ্যেও তার প্রতিফলন স্পষ্ট হলো। এতকিছুর পর এখন আর এশীয় বলে নিরঙ্কুশভাবে মহাদেশের কোনো চরিত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। এই ভাবনায়ই আমাদের শিল্পকলা বিষয়ক কর্মকান্ডের সবচেয়ে বড় আয়োজন ‘এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী’ মহাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছে। পৃথিবী উন্মুক্ত হওয়ার নতুন ডাক শুনে এক মহাদেশের সঙ্গে অন্য মহাদেশের সম্পর্ক অনিবার্য হয়ে পড়েছে। শিল্পকলা একাডেমী আয়োজিত একাদশ এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ, অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশ।
একদিকে প্রাচ্যদেশীয়, এশীয়, ভারতীয়, চৈনিক এসব ভাবনা-বলয়, অন্যদিকে উন্মুক্ত বাজার অর্থনীতি, গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়ন এই সব। কেউ চাইছে মিশে যেতে। একাকার পৃথিবী হোক—এই ভাবনার আন্দোলন শোনা যাচ্ছে। কিন্তু বিশ্বায়নের নামে নিজস্ব সংস্কৃতি বিলিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পরিণামে প্রথম বিশ্বের শিল্পের অনুসরণ করতে হয় এই ভয়ে অনেকে সচেতন । স্বকীয়তা আসে মূলত দেশজ অভিজ্ঞতা থেকে—এই স্বতঃসিদ্ধে আস্থাশীল তারা। কিন্তু শুধু ঐতিহ্যে আবর্তিত হওয়া নয় সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক চিন্তার অগ্রসরমানতার সঙ্গে যুঝতে হয় শিল্পকে। এসব ভাবনার কারণে ‘গ্লোবাল’ ও ‘লোকাল’ এই দুই অভিধার যৌথায়নে তৈরি হলো সূত্র গ্লোকাল। ‘গ্লোকাল’ মতবাদে তাৎপর্য খুঁজছে ঐতিহ্যসমৃদ্ধ অনেক দেশের শিল্পী। এই উত্তরাধুনিক ভাবনার বাইরেও রয়ে গেছে অনেক দেশের চারুশিল্পের চর্চা। অর্থনীতির কুটিল খেলার বাইরে পড়ে আছে যেসব দেশ এবং যেখানে নগরায়ন ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেনি সেখানে পরম্পরাগত গ্রামীণ সংস্কৃতির রঙ ও রূপ এখনো অটুট। সেখানে সময়ের ছাপ নেই। সেখানে শুধু শাশ্বত কাল আছে। প্রতিদিনের জীবনাচরণের অন্তর্গত সুখ-দুঃখ, হাসি- কান্না, উৎসব, সংস্কারের প্রতীক উপচিয়ে ওঠে সেখানে ঋতুর পরিবর্তনে। এমন শিল্পচেতনা এখনো সক্রিয় এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশে। তবে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশ ও অস্ট্রেলিয়ায় তা তেমনভাবে লক্ষ করা যায় না।
একান্তভাবে ঐতিহ্যে আনুগত্য ও বুদ্ধিগত তুরীয় আধুনিকতা—এই দুই ধারার কাজই আছে এবারের এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে। এ আয়োজনের একটা ইতিবাচক দিক অ- ইউরো-মার্কিনি শিল্পভাবনার রূপ প্রত্যক্ষ করার সুযোগ ।
এক সময় আফ্রো-এশীয় ও লাতিন আমেরিকার শিল্পবিচারের জন্য ভিন্ন মানদন্ড স্থির করা ভীষণভাবে প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। এই কিছুকাল আগেও পশ্চিমের পৃথিবীর বাইরে যেমন দেশ রয়েছে সেসব দেশের শিল্পের প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধুনিক ঐতিহ্যের গতিপ্রকৃতি বিষয়ে অনেক সভা-সেমিনার-েগবেষণা-প্রদর্শনী হয়েছে। বর্তমান প্রদর্শনী সেই লক্ষ্যে অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু এই যাত্রা যথেষ্ট বুদ্ধিদীপ্ত নয়। একটা ভালো অ-ইউরো আমেরিকান প্রদর্শনী করতে হলে গভীর গবেষণার প্রয়োজন আছে। আমাদের জানতে হবে বিশদভাবে আফ্রো-এশীয় দেশের প্রাচীন সংস্কৃতির রূপ ও তার আধুনিকতার বিভিন্ন পর্ব। কিন্তু আমরা সেই পথে স্থির প্রত্যয়ে কাজ করছি না।
একাদশ এশীয় দ্বিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছে ৪৪টি দেশ। স্বাগতিক দেশ ছাড়া অন্যান্য দেশের কয়েকজন শিল্পীর দু-চারটি করে কাজ উপস্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশের শতাধিক শিল্পীর দুই শতাধিক কাজ টাঙানো হয়েছে। কিন্তু স্বাগতিক দেশের এত কাজ কেন উপস্থাপিত হবে একটা দ্বিবার্ষিক আয়োজন? এটি একটি আন্তঃদেশীয় আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম। এখানে নিজের দেশ বলে যথেচ্ছ প্রদর্শন করার অধিকার থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। এ আয়োজন দেশের হলেও গভীরতর বিচারে কোনো দেশের নয়। এটি একটি বিশ্বক আয়োজন।
অর্থনীতি মজবুত হলে এবং দেশে সুস্থ রাজনীতি থাকলে ললিতভাবনা অনেক রকম মাত্রা পায়। এ কথার উজ্জ্বল প্রমাণ জাপান, কোরিয়া অস্ট্রেলিয়া এ রকম গুটিকয়েক দেশ। দ্বিবার্ষিক, ত্রিবার্ষিক এসব প্রদর্শনী একটি বিশেষ ধারণা লালন করে। এতে সমকালীন শিক্ষা চর্চার বিকাশ পরিমাপ করার লক্ষ্য থাকে । আমার দেশে যা কিছু অতীতে হয়েছে এবং বর্তমানে চলছে তা নিয়ে হাজির হওয়ার জন্য এসব প্রদর্শনী আয়োজন করা হয় না । অভিনবত্ব ও নতুনত্বের স্বাক্ষর আছে এমন কাজ নিয়ে দ্বিবার্ষিকে আসতে হয় এই কথা মনে রেখে খুব কম দেশই কাজ পাঠায় আমাদের এশীয় দ্বিবার্ষিকে।
জাপান থেকে এসেছে তিন শিল্পীর কাজ। একজনের স্থাপনা, অন্য দুজনের দ্বিমাত্রিক পটের কাজ। তিনজনের কাজেই সময়ের তাপ আছে। মানব অস্তিত্বের অন্তর্গত দাহ আছে। সুবাকি নোবরুর কাজের নাম ‘পেন্টা-ইউএন অ্যাপ্লিকেশন-৭’। এটি একটি রোবট। নামের মধ্যে পেন্টাগন মানে আমেরিকার ইঙ্গিত আছে। পাঁচ অর্থে পেন্টা ব্যবহার করা হয়েছে কারণ রোবটটির পাঁচটি অঙ্গ আছে। তার বাহুতে লেখা আছে ‘আগেনস্ট ল্যান্ডমাইন’। ল্যান্ডমাইন যে আমাদের এই প্রিয় পৃথিবীকে কী ভয়ংকরভাবে কণ্টকিত করে রেখেছে তা আজ সজাগ মানুষের অজানা নয়। একটা ল্যান্ডমাইন বানাতে অনেক অর্থ লাগে । এই ভয়াল যন্ত্রবীজ মাটিতে পুঁতে রাখা খুবই সহজ। কিন্তু তা মাটি থেকে তুলে আনা কঠিন । প্রতিটি মাইনে আছে মৃত্যুঝুঁকি । প্রতিদিন মাইন দুমড়ে দিচ্ছে মানুষকে। মানুষ মরছে, তার অঙ্গহানি হচ্ছে। বিকলাঙ্গ মানুষের প্রতীকের মতো এসেছে সুবাকির স্থাপনা। একটা অসহায় মানুষের মতো যন্ত্র বৃথাই বিচরণ করে এই পৃথিবীতে। মাইন তোলার চেয়ে বেশি প্রতিদিন তা মানুষ রোপণ করে। এই দুঃসংবাদে বিপন্ন সেই রোবট। শান্তি সুদূরপরাহত। আমরা বিমূঢ়। চলি একটা যান্ত্রিক রোবটের মতো। এ শিল্পীর কাজে প্রচন্ড নেতির চাপ আছে। আছে তীব্র অমানবিকতার ইঙ্গিত। এক বিশালদেহী যন্ত্র যখন অসহায়ত্ব প্রকাশ করে তখন মানুষ আরো বেশি হতাশায় তলিয়ে যায়। অনেক গভীর সংবাদ দিতে চেয়েছেন সুবাকি । পৃথিবীর ভারসাম্য নষ্ট হলো । এক মেরুর পৃথিবীতে আমাদের ভাবনার অতীত সব ঘটনা একের পর এক ঘটেই চলছে। এক বিপন্ন বলয় থেকে অন্য বিপন্ন বলয়ে ঢুকতে হচ্ছে। পৃথিবী এগুচ্ছে না পিছিয়ে পড়ছে তা বোঝা যাচ্ছে না। দানবের মতো মার্কিন চেপে আছে পৃথিবীর বুকে। সভ্যতা বোধ হয় আর কখনোই এতটা ব্যর্থ হয়নি তার হিসাব মেলাতে।
নীল-বেগুনির তপ্ত বর্ণতলের ওপর লতিয়ে উঠেছে রেখা। রেখার শীর্ষে ফুলের মতো গড়ন। জাপানি দোমোতো ইউমির কাজের নাম কাজাশি’। ‘কাজাশি একটি ধ্বনিপ্রধান জাপানি শব্দ। এর মানে সুখ ও দুঃখ। দুই-ই এতে এক হয়ে আছে। ওই লতানো মোটিভগুলো আসলে টিউলিপ । টিউলিপ লতা ফুলের ভারে মাটির দিকে নুয়ে পড়ে। তার বিকাশই তার মৃত্যু, বর্তমান পৃথিবীর ইতিহাসের মতো সংবেদ দিলেন দোমোতো। আর কিতাইয়ামা ইয়েশিও বিশালদেহী মানুষ এঁকেছেন জাপানি ওয়াশি কাগজে। তিনটি ছবিতেই নারী-পুরুষের ধস্তাধস্তি। নগ্নদেহ, পেশির উত্তোলন এ সবে আকাঙ্ক্ষার নিরাবরণ রূপ ফুটেছে। মানুষের মধ্যে যখন আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর হয় তখন তা ভায়োলেন্সের মতো ভয়াল রূপ পায়। অস্তিত্বের অন্তর্বীজে যে রিরংসার অণু আছে তা উসকে দিয়েছেন কিতাইমা। কিতাইমা ১৯৮০-তে ভেনিস বিয়েনালে প্রদর্শনী করেছেন । মানুষ মৃত্যুর সঙ্গে পাশা খেলছে বিভিন্ন চালে এই সত্য জানান দিয়ে আরো অনেক প্রদর্শনী করেছেন তিনি।
শুধু বিষয়বৈচিত্র্য নয়, শিল্পমাধ্যমের অভূতপূর্ব প্রয়োগও একটা দ্বিবার্ষিক প্রদর্শনীর দেখার বিষয়। এখন আর প্রথাগত তেলে, জলে, অ্যাক্রিলিকে মনোনিবেশ নেই অনেকের। ফটোগ্রাফি, ভিডিও এসব চারুকলার অন্তর্ভুক্ত। ফটোমিডিয়া নিয়ে এসেছে অস্ট্রেলিয়া। এ দেশে বিত্তবৈভবের কমতি নেই। পরিপাটি দেশ। মানুষের যত্ন তো আছে। আছে নিসর্গ ও পশুপাখির জন্য বিশেষ শুশ্রূষা। এরকম সাজানো দেশেরই তো ছবি তুলতে চায় মানুষ। প্রতিদিনই বিস্ময় জাগিয়ে রাখতে পারে প্রকৃতি। সাজানো-গোছানো নিকানো একটি দেশের ফুরফুরে আমেজের মানুষের ছবি তুলেছেন কোনো শিল্পী। কোনো শিল্পী ফটোগ্রাফির বিশেষ কৌশল আরোপ করে সাদা দেয়ালে আটকানো সাদা দেহের একটি যন্ত্রের ছবি এঁকেছেন । যন্ত্রের একাকীত্বের মধ্যে মানুষের একাকীত্ব নির্দেশিত হয়েছে। কেউ একটি পোকার দেহের অন্তর্লীন সংগঠন সূক্ষ্ম ও স্বচ্ছ লেন্সে তুলেছেন । তবে দেখার বিষয় সমষ্টির একাকীত্ব। অনেক মানুষ পার্কে, সাগরপাড়ে বিচ্ছিন্নতার অভিব্যক্তি নিয়ে বসে আছে। যেন বোবাদের সমবেত হওয়া অস্ট্রেলিয়ার ছবি আলো-বিধৌত, ঝকঝকে- তকতকে ফটোগ্রাফির বিষয় প্রধানত দুটি: এক. সুখের অসুখ। অতিপ্রাপ্তির অলসতা মানুষকে আবার অচেনা প্রান্তরে ঠেলে দিয়েছে। দুই. সুন্দরের নিরপেক্ষতা অন্বেষণ। একটি বিষয়ের সুন্দরকে ওই বিষয়ের মধ্যে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে ডাটা সংগ্রহ করে তত্ত্বের মীমাংসা টানা। মাইকেল রিলে অনেকগুলো ছবি দিয়ে প্যানেল তৈরি করেছেন। তার ছবির নাম ‘মেঘ’। পাতা- পতঙ্গ, পশুপাখি, সবই তিনি মেঘের মতো ভাসিয়েছেন। সুন্দরের রাশিচক্র যেন, রিলের এই ভাবনায় মৌলিকতা তাকে এবার ‘গ্র্যান্ডপ্রাইজ’ পাইয়ে দিয়েছে। সব বস্তুই যে যার কক্ষপথে ভ্রাম্যমাণ এই সংবাদই হয়তো শিল্পী জানাতে চেয়েছেন । সবই স্পেসে ভাসমান মেঘের ইঙ্গিতে তা নির্ণয় করেছেন শিল্পী
আরব বিশ্ব ও মুসলিম দুনিয়া সম্বন্ধে আমাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। এতকাল এদেশের বিজ্ঞজনের ভাবনায় ছিল কাতার, ওমান, ইয়েমেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, ইরান, কুয়েত, সৌদি আরব এসব দেশে বোধহয় আধুনিক শিল্প হয় না। তারা অনেক পিছিয়ে আছে পশ্চিমের থেকে, এমনকি আমাদের থেকেও। বিগত দুটি দ্বিবার্ষিক প্রদর্শনীতে এসব দেশ গ্র্যান্ডপ্রাইজ পেয়েছে, সম্মানসূচক পুরস্কার লাভ করেছে। শুধু আমাদের দেশেই নয়, পৃথিবীর আরো অনেক আন্তর্জাতিক চারুমঞ্চেই সেসব দেশের শিল্পীরাই প্রাধান্য বিস্তার করেছে। পশ্চিমের সঙ্গে মেলামেশা করলে যেমন পরিবর্তন আসে, বিকাশ হয়, ক্ষয় ধরে, তেমনি না করলেও বিকাশের পথ রুদ্ধ থাকে না। নিজের মতো করে হয়ে ওঠার গুরুত্ব অনুভব করা চলে । এভাবেই আরব অনেক এগিয়ে গেছে। আর উপনিবেশের আবেশে আমরা আধুনিকতার নামাবলি চাপিয়ে অগ্রসরমানতার ধুয়া তুলছি। সব দেশ নয়—ইরান, কাতার, ওমান, ইয়েমেন, বিশেষ করে এই চারটি দেশের কাজ এবারের প্রদর্শনী আলোকিত করে রেখেছে।
কেউ কাউকে ডাকছে। মর্মবিদারী ডাক । ধ্বনি-প্রতিধ্বনির মধ্য দিয়ে তা আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাচ্ছে। এটি সিমিন কেরামতির একটি ভিডিও আয়োজন । কালো একটি কক্ষ। তার মধ্যে ঢুকে নিচে ও ওপরে দুটি পর্দা চোখে পড়ে। দুটি পর্দায়ই মানুষের ইমেজ। কেউ যেন বলছে,
বাঁচাও, বাঁচাও। অন্যজন বলছে, এইতো এসে গেছি। কোনো শিশু কি কাঁদছে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য অথবা কোনো নারী কি তার হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে অন্ধকারে হাতড়ে খুঁজছে-ইমেজ আর ধ্বনির শিহরণ এই বর্তমান মনে করিয়ে দেয়। সিমিনের এ কাজটির পাশেই আছে ইরানের আরেক শিল্পী মাহমুদ বক্সীর স্থাপনা ‘হ্যাপেনিং’। জংধরা কিংবা পুড়ে যাওয়া কতকগুলো বিশাল বিশাল লোহার গড়ন। অনেকটা পিরামিড আকৃতির। সাইপ্রাস গাছের মতোও মনে হয় । মনে হয় কোনো শহর পুড়ে গেছে, কিংবা কোনো বনভূমি পুড়ে গিয়ে কয়েকটি দগ্ধ গাছ এখনো দাঁড়িয়ে আছে । দুই সারি এই ধাতববৃক্ষের ভেতর দিয়ে দর্শনার্থীকে হেঁটে যেতে হয়। পায়ের নিচে কাচ মচমচ করে ভেঙে যেতে থাকে একটা ভয়ংকর পটভূমি পাড়ি দেয়ার অনুভূতি আনে শিল্পীর এই কাজ । যুদ্ধদগ্ধ ইরান ও পৃথিবী দুই-ই মনে পড়ে । সিমিন গ্র্যান্ডপ্রাইজ পেয়েছে।
ক্যালিগ্রাফি ভেঙে টুকরো টুকরো হচ্ছে। ক্যালিগ্রাফির গায়ে লাগছে নতুন সময়ের রঙ, নতুন চিন্তার রেখা । ধর্মবাণী ললিত রেখায় আঁকায় আর মগ্ন নয় শিল্পীরা। ওমানের সালেহ বিন জুমা রেখার জটাজালে মরমি স্পেস তৈরি করেছেন। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বর্ণবিন্যাস থেকে গিয়েছেন সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম চিড় ও ফাটলে । তারপর একটু রঙ ঝালকে দিয়ে কম্পোজিশনের সমাপ্তি টেনেছেন।
বর্তমান পৃথিবীতে ছবির বিষয় উপাদানের নির্যাস প্রদর্শন। কাতারের মোহাম্মদ আল আতিক কাদার মতো বর্ণ লেপে দিয়েছেন স্পেসে। কাদা ওপর থেকে গড়িয়ে পড়ছে। সন্নিকর্ষ তৈরি হয়েছে । ছিটকে দেয়া বা লেপ্টে দেয়ার মধ্যে মনে প্রতিক্রিয়া বিধৃত হয় একথা আতিক নিজের মতো করে উপলব্ধি করেছেন এবং দেখাতে পেরেছেন শৈল্পিক পারমিতায়। একজন ব্রিটিশ ডেভিড হকনিকে পৃথিবী চেনে, কিন্তু কাতারের আতিকের খোঁজ রাখে না। শিল্পের ইতিহাসে এ এক চরম ভ্রান্তি ।
সমকালের ইতিহাসে ইতিবোধ নেই । চারদিকে শনৈ শনৈ নেতি। মানুষের সভ্যতা পরিমাপক বাগদাদের জাদুঘর লুট হয়ে গেল। মানুষ প্রতিবাদ করল। কিন্তু তাতে আর কী এসে যায় । জাদুঘর তো পুনর্নির্মাণ সম্ভব নয়। কিন্তু ঋণাত্মক প্রহরে একজন শান্তির বাণী শোনাতে চান । অনেক সময় শান্তির ললিত বাণী ব্যর্থ পরিহাস মনে হয় । নেপালের আশমিনা রঞ্জিতের আহ্বানে তা মনে হয় না। পৃথিবী যত ক্ষত-বিক্ষতই হোক না কেন এখনো বেঁচে যাওয়ার ঔষধি আছে। আমার ক্ষত সারানোর জন্য প্রয়োজন মন্ত্রৌষধি। বুদ্ধের মন্ত্র রক্ষা করতে পারে এই ধ্বংস-উন্মত্ত পৃথিবী, নেপালের আশমিনা তাই-ই মনে করেন। তিনি বুদ্ধমন্ডলী তৈরি করেছেন। বালির স্তূপ মানে বৌদ্ধস্তূপ। আমাদের পাহাড়পুরের মতো। তন্ত্ৰ শিল্পের মতো বৃত্তের মতো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে শীর্ষের দিকে যাওয়া । সেই পিরামিডের মতো গড়নটাকে ঘিরে যে পথ তা তৈরি হয়েছে ছোট শিশি দিয়ে। হোমিওপ্যাথির ওষুধ রাখার শিশি। প্রতিটি শিশির গায়ে বুদ্ধ আঁকা । এই স্থাপনার পাশে লেখা আছে, *আপনি একটি শিশি নিতে পারেন। এভাবে বুদ্ধকে জাগ্রত করার শিল্পিত পারমিতার জন্য আশমিনা গ্র্যান্ডপ্রাইজ-এ ভূষিত হতে পারতেন । কিন্তু তা পাননি, পেয়েছেন সম্মাননা পুরস্কার। দগ্ধকালের পোড়া মানুষের হাতে হাতে বুদ্ধের রক্ষাকবচ ধরিয়ে দেয়ার মধ্যে স্থাপনাশিল্পের এক বিরল ধীর পরিচয় দিয়েছেন আশমিনা। এখানেই ঐতিহ্য সমকাললগ্ন হলো। না তন্ত্র, না পশ্চিম অনুকরণ, কোনো কিছুতেই আটকে থাকা নয়। প্রথাগত শিল্পকে তিনি আধুনিক রূপ দিলেন। এই কালের প্রতিনিধি করে দেখালেন। নেপালের প্রতি মনোযোগ নেই আমাদের। আমরা বলশালীর পূজা করতে অভ্যস্ত। ভালোবাসি পশ্চিম । আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়ার জন্য এরকম কাজ আরো উপস্থাপিত হওয়া প্রয়োজন ।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের মোহাম্মদ ইউসুফ আলীর স্থাপনা ‘প্রকৃতি থেকে প্রকৃতি’ মন কাড়ে না। কেমন যেন শিশুসুলভ। গাছের গুড়ি, শুকনো ডাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে আবার একটা বাগান তৈরি করেছেন ইউসুফ। ফাউন্ডিং অবজেক্ট বা ‘ফেলনা’র শিল্প নতুন কিছু নয়। এ নিয়ে অবনীন্দ্রনাথ কাজ করেছেন। পিকাসোও অভূতপূর্ব কাজ করে গেছেন। তবে মুখের ভিড়, অভিব্যক্তির মুখরতা, এসব বৈশিষ্ট্যের দিকে তাকালে ইউসুফের কাজ বিশেষ দ্রষ্টব্য। আর রিসাইক্লিং-এর বৈশিষ্ট্যও লক্ষণীয়। মরাডালের পুনরুজ্জীবন মানে শিল্পের রূপান্তর ।
ঔপনিবেশিক শিক্ষাটা এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার মানুষের মগজে জট পাকিয়ে দিয়েছে। কলোনি শাসিত হওয়ার পর থেকে পশ্চিমের প্রতি তার মোহ জন্মেছে। যা কিছু বুদ্ধিদীপ্ত, নিরীক্ষানিষ্ঠ, উদার তার সবই বুঝি আসে বৃটেন, ফ্রান্স, স্পেন থেকে, এমন ধারণা শেকড় গেড়ে আছে আমাদের চিন্তায়। অবয়বী হওয়ার পর নিরাবয়ব হতে হয় অর্থাৎ ফিগারেটিভের পর ননফিগারেটিভ আসে এই পশ্চিমী ভাবনায় যত না ভালো হয়েছে তার চেয়ে বেশি খারাপ হয়েছে। মরক্কো, আলজেরিয়া, বাংলাদেশ এসব দেশে এমন অনেক শিল্পী আছেন যারা ক্যানভাসে বা কাগজের তলে রঙ, রেখায় এক স্বতস্ফূর্ত চাল আঁকতে চান। কখনো রঙের ব্যঞ্জনায় সুখের হিল্লোল তোলেন, কখনো রেখার কূটনীতি দিয়ে জানান জটিল মানব অস্তিত্ব। দেশকাল নিরঙ্কুশ এই দ্বিতল পটের কম্পোজিশন এখন আর নতুন মাত্রা পাচ্ছে না। বিমূর্ত বা বস্তু নিরপেক্ষতার পক্ষে গিয়ে খুব কম শিল্পীই নান্দনিক চমৎকারিত্ব ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন । রেখাই শুধু মনের গূঢ়ার্থ ধারণ করবে, কোনো পরিচিত অবয়বে অভিব্যক্তি ফুটবে
না, এমন শৈল্পিক চালে দক্ষতা প্রমাণ পৃথিবীর তাবৎ শিল্প ইতিহাসেই বিরল ঘটনা।
অপরদিকে চেনা অবয়ব এঁকে শুধু দৃষ্টিনন্দন মালদ্বীপ, মাদাগাস্কার, ভিয়েতনাম। গভীর কোনো বেদ নেই, বেদনা নেই সৃষ্টির। মাদাগাস্কার ও তাই। সিরিয়া, তুরস্ক, জর্দান, লেবানন ও পশ্চিমের অনুগমন করেছে। অথচ ইয়েমেনের মাজহার নুজহারের কাজের দিকে তাকালে বিস্মিত হতে হয়। কত রকম মানুষী ও পশুপাখি, লতাপাতা, প্রতীকের গ্রন্থনা তার কাজ। তার প্রাক ইসলামি’শীর্ষক কাজে আছে মরমি আবেশ, আছে অবচেতনের বহুস্তরী উল্লম্ফন যাত্রা, নানা কালের বিশ্বাসের অভিজ্ঞতার সাক্ষী। ইয়েমেনের মাজহারও কি বিজ্ঞ বিচারকদের দৃষ্টি থেকে ফসকে গিয়েছেন? ঐতিহ্যের পুনর্বিন্যাস ও বুদ্ধিদীপ্ত অবলোকনটুকু কিন্তু ভীষণ দামি । এভাবে আধুনিক হয়েছেন আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের অনেক শিল্পী। ভারত থেকে তাৎপর্যপূর্ণ কাজ আসেনি বললেই চলে। এটা একটা বড় দুঃসংবাদ । সারা বছর সম্প্রীতির ঢোল বাজে অথচ প্রতিবেশী দেশে এত নামী-দামি শিল্পী রয়েছেন তাদের কাজ দ্বিবার্ষিক প্রদর্শনীতে আসছে না। পাকিস্তানের অংশগ্রহণও আশানুরূপ মানের নয়। যদিও বিগত দুই/আড়াই দশকে পাকিস্তানে অনেক মেধাবী নারী শিল্পীর আবির্ভাব ঘটেছে। উগান্ডা, ঘানা ঐতিহ্যে বলয়িত হয়ে আছে। উগান্ডার উডকার্ভিং কেবলই করণকৌশল, কারখানার নিয়ম। তবে ঘানার কাজে নকশার আতিশয্য, বর্ণের রঙ-চঙা ভাবটা চিত্তাকর্ষক। চীন আমাদের আবারো ঐতিহ্য চেনালো । ঐতিহ্য তার সূক্ষ্মতার বয়নে। কপার এচিং সেই রেখার বুনন দেখতে পেলাম ইয়াং ইউ ও মান কাই হুর কাজে । চীনে অজন্তাশৈলীর নারীদেহের মুদ্রা আছে এবং তার পাশে আবার দালির মতো সুররিয়ালিস্ট কাজও আছে। চীন রিয়েল থেকে সুররিয়ালে যাচ্ছে -এই সংবাদ তাদের কাজে ফেডারেশনের কাজ অলংকারবহুল। তবে গভীর মর্মবাণী আছে। মিডিয়া দেখার আনন্দও আছে মানচিকোভা লারিসার মেজোটিন্টে। চীনের মতো কৃষ্ণ ও এখন আহার অচেনা অলিন্দের কপাট খুলে দিচ্ছে। লারিসার কাজের নাম করিকে নববর্ষের বার্তা প্রফিক্সের সুগ্ধতা আছে তাতে। নির্ভেজাল সংবেদনশীলতা অনুভূত হয় কাগজের সাদায়, মেজোটিন্টের কালোয়।
সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা থেকেও উঁচু নান্দনিক বোধের কাজ আসেনি। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া পণ্যে ভাসছে। পণ্যের মোড়ক, সিল, ছাপ সব মিলিয়ে এক বিজ্ঞাপনী বাস্তবতার মধ্যে জীবনের আবর্তন চলছে। মালয়েশিয়ার মোহাম্ম ফওজি সেলান সেইসব পণ্যের মার্কা নিজে সাজিয়েছেন স্পেস। তার ছবির জমিন ও তন্ত্রের মতো, রাশিচক্রের মতো। এখানে সমাই তন্ত্র, পণ্যই মন্ত্র।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর বিভিন্ন প্রজন্মের শিল্পীরাই প্রধানত এই দ্বিবার্ষিক প্রদর্শনীতে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন। পুরস্কার পেয়েছেন নব্বুইয়ের দশকের শিল্পী তৈয়বা বেগম লিপি। আশাক, লিপি, মাহবুব প্রমুখ নবীন প্রজনের শিল্পীরা শুরু থেকেই নিরীক্ষাধর্মী। তারা প্রথাগত বিমারিক পটে ইমেজ আঁকেন না। লিপিকে নারীবাদী শিল্পী বললে ভুল হয় না। পুরুষশাসিত সমাজে নারী বিশেষ দ্রষ্টব্য। নারী পুরুষের হাতের ক্রীড়নক, এসব লিপিকে কাঁদায়। তিনি নিজেরই ফটোগ্রাফিক ইমেজ নানাভাবে সেঁটে আত্মজৈবনিক স্থাপনা গড়েন। এবার নিজের মুখের ওপর বসিয়েছেন অনেকগুলো পুতুল। নাম দিয়েছেন আমার ছেলেবেলা”। এ কাজের জন্য লিপি এ্যান্ডপ্রাইজ অর্জন করেছেন। তার এর চেয়েও গভীর নিরীক্ষার কাজ আমি দেখেছি।
দ্বিমাত্রিক পটে ইমেজ আঁকলেই ছবিতে নি থাকবে না এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। জামাল আহমেদ, রোকেয়া সুলতানা, ঢালী আল মামুনের কাজেও আছে বিষয়ের বিশেষ অবলোকন ও মাধ্যমের স্বকীয় পরিমার্জনা। জামাল আপাতদৃষ্টে প্রতিকৃতির শিল্পী। কিন্তু বর্ণের পুরুত্বে তিনি প্রকৃতিকে অভিব্যক্তি জর্জর করেন। একটা মুখেই সেই মানুষের পুরো বৃত্তান্ত প্রকাশ পায়। সেই বৃত্তান্ত টেক্সারের জোরে তুমুল হয় ও নাটকীয়তার স্পর্শ দেয় মনে যখন হঠাৎ একটু লাল কারও ঠোঁটে বা গালে ঝলকে বেরিয়ে আসে। জামালের শিল্পীচেতনার মধ্যে একটা দেহজ আকাঙ্ক্ষার চাপ আছে। তিনি প্রতিকৃতির মধ্যে প্রথাগত কোনো নীরব অভিব্যক্তি ধরতে চান না। সলাজ নারী আঁকেন না, বাসনায় আকুল করেন। তাকে কোনো বৃদ্ধের রূপ আঁকলেও তা বিঘোষিত করেন রেখার সন্নিপাতে ও বর্ণের টেক্সচারে। আমাদের নয়ন সুখকর নন্দন ভাবনার বিপরীতে তারি চালাচ্ছেন জামাল। একই প্রজন্মের ইউনুসের মধ্যেও আছে উগিরণের মতো প্রকাশিত হওয়ার তাগিল। তিনি প্লাস্টিকের ডেউটিন একটি বর্ণিল স্পেসে সেঁটেছেন। সেই টিন আগুনে পুড়িয়ে দক্ষীভূত হওয়ার প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছেন। ইউনুস যদিও অন্তরের দাহ উজিয়ে দিতে চেয়েছেন এই শৈল্পিক পরিমার্জনায় তবু তাতে আগুনের সুন্দর আছে। ক্ষয়ের মধ্যেও সুন্দরের সূত্র তিনি খুঁজে পেয়েছেন। বর্ণের বুনট বা টেক্সচারে সবার ভরসা। এর কারণ কী? বাংলাদেশের ছবি দেখলে এ প্রশ্ন সবার মনে জাগবে। সহজ একটা উত্তর বারবারই দেয়া হচ্ছে যে মনোলোক দুষ্পাঠ্য। বর্তমান সময়ের ঘটনা বিশ্লেষণ অতীত হয়ে পড়ছে বলেই ওই টেক্সচার মাহাত্ম্যে অস্তিত্বের সংকট বোঝানো হচ্ছে। দুর্ভেদ্য অন্তরলোক আর ব্যাখ্যাতীত বর্তমানকে বোঝানোর জন্য কি স্পষ্ট ইমেজে ছবি আঁকা চলে না। বিমূর্তনের পথে পঞ্চাশের ষাটের দশকে একবার এবং এ টেক্সচার আসক্তিতে বাংলাদেশের শিল্প বেপথু হয়ে। পড়েছে এ কথা একজন একনিষ্ঠ দর্শকের নান হওয়া অসঙ্গত নয়।
তবে রোকেয়া সুলতানা, তরুণ ঘোষ দুয়েকজন বর্ণব্যঞ্জনার সঙ্গে ইমেজের আশির উপস্থিতিতে মনের গহনতা বোঝাতে পেরেছেন মাটি, জল, বায়ু সিরিজের কাজে তার বিশেষ সংযোজন নেই। তার আগের কাজেরই অনুবর্ত তরুণ অবশ্য ‘বেহুলা’ পর্ব নিয়ে স্নিগ্ধ হয়েছেন বর্ণ ও গড়নের আরো পরিশ্রুতি এসেছে তার কাজে। ঢালী আল মামুন ব্যক্তিমানুষের সংকটের রূপ তুলে ধরতে চাননি। তিনি দেশের ও বিশ্বরাজনীতির অমানবিক ঘটনায় ক্ষুব্ধ। সাম্প্রতিক কালে আফগানিস্তান ও ইরাকে যেভাবে মু থুবড়ে পড়ল মানবিকতা, যেভাবে উড়িয়ে দেয়া হলো মানুষের সমাজ-সভ্যতা ডালীর ছবির বিষয়। ছবির নাম ঘটনার পর এবং তারপর’। ফটোগ্রাফিক ইমেজের মতো করে তিনি প্রথম বর্ণতল তৈরি করেন। এই ‘আউট অফ ফোকাস’ বর্ণন জার্মান নিউ এক্সপ্রেশনিস্ট শিল্পী রিটারের কাজ মনে করিয়ে দেয়। তবে ওই ইমেজের ওপর মারণাস্ত্রের ড্রইং এঁে যুদ্ধআক্রান্ত সময়কে তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে চেয়েছেন। মসৃণ চিক্কন বর্ণতল এবং তার বিপরীতে স্পষ্ট রেখার ড্রইং স্পেসে সংঘর্ষের সূত্র নির্দেশ করে। দৃশ্যগত পরিমার্জনায় কোনো ধোঁয়াটে ব্যাপার নেই ঢালীর কাজে। বক্তব্য তার স্পষ্ট।
এ প্রদর্শনীতে অনেক দেশই প্রথাবহ শিল্পকর্ম নিয়ে অংশগ্রহণ করেছে। কোনো কোনো দেশ পরস্পরাগত লোকশিল্পে ঐতিহ্যের অনুগামী। লোককলায় অপার শ্রদ্ধা আছে ধীমান সকলের। কিন্তু একটি দ্বি-বার্ষিকের নীতিমালার সঙ্গে এরকম অংশগ্রহণ কি সঙ্গতিপূর্ণ? বাংলাদেশের শিল্পীদের অংশগ্রহণেও বিশেষ মনোযোগ লক্ষ করা যায়নি। বিগত কয়েক বছর ধরে যে যা আঁকছেন তারই একটি উপস্থাপিত করে যেন বলছেন, বিয়েনালে শরিক হলাম। অবশ্য গুটিকয়েক ব্যতিক্রম আছে। যে যা-ই বলুক না কেন, নতুন নিরীক্ষা যেসব কাজে আছে তা-ই শুধু প্রদর্শিত হওয়া উচিত। এটাই দুনিয়াজুড়ে দ্বিবার্ষিক, ত্রিবার্ষিক ও পঞ্চবার্ষিক প্রদর্শনীর অভীষ্ট। যে দেশে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিল্প দেখার কোনো মিউজিয়াম নেই সেই দিক বিবেচনা করলে এরকম দ্বিবার্ষিক দর্শকদের শিল্প দেখার পিপাসা আংশিকভাবে হলেও মেটাবে।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.