নতুন উপলব্ধির বিস্তার

রেনেসাঁস ও রবীন্দ্রনাথ

রাজীব সরকার – কথাপ্রকাশ – ঢাকা, ২০২৩

– ২৫০ টাকা

আর্থসামাজিক ব্যবস্থার উন্মেষ ও বিকাশের মধ্য দিয়ে মধ্যযুগের শেষ পর্যায়ে ইউরোপের সামাজিক জীবনে
যে-ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা হয়, রেনেসাঁস বা নবজাগরণ বলতে তাই বোঝানো হয়। পঞ্চদশ শতাব্দীতে রেনেসাঁসের সূচনা। মূলত রেনেসাঁস

জ্ঞানভিত্তিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রয়াস। চিন্তা-চেতনা, ধর্ম ও সমাজজীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রক্রিয়া। অষ্টাদশ শতক থেকে বিশ শতক পর্যন্ত বাংলার নবজাগরণ ঘটে। সমাজ সংস্কারক রামমোহন রায়, কবি ও লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং পদার্থবিদ সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মতো প্রভাবশালী ব্যক্তির আবির্ভাবে এর উত্থান সম্ভব হয়।
এ-নবজাগরণের সঙ্গে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে কবি ও সংগীতজ্ঞ কাজী নজরুল ইসলাম, নারী জাগরণের অগ্রদূত রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, মীর মশাররফ হোসেন, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নাম উল্লেখযোগ্য।

‘মানুষের সার্বিক মুক্তির সংগ্রামে রবীন্দ্রনাথ বাংলার রেনেসাঁসের শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি’ – এ-প্রত্যয়ের ভিত্তিতে প্রাবন্ধিক রাজীব সরকারের লেখা রেনেসাঁস ও রবীন্দ্রনাথ গবেষণাগ্রন্থ। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, মাইকেল ও বঙ্কিমচন্দ্র – এই চতুর্ভুজ সমীকরণে রেনেসাঁসের পরিপূর্ণ সৌধ করেন রবীন্দ্রনাথ। দশটি প্রবন্ধে এর ইতিহাস ও পর্যালোচনা তুলে ধরতে প্রয়াসী হয়েছেন সাহিত্যচিন্তক রাজীব সরকার। এ-বইয়ে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিসম্ভারের মধ্য দিয়ে বাংলার রেনেসাঁসকে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণে সবচেয়ে উজ্জ্বল উপস্থিতি রবীন্দ্রনাথের। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাস ও কর্মে প্রমাণিত হয়েছে যে, মানবসভ্যতার ঐক্য এবং বুদ্ধির স্বাধীনতা ও শিক্ষা ছাড়া মানবমুক্তি সম্ভব নয়। তাই রেনেসাঁসের পুরোধা পুরুষ রবীন্দ্রনাথ।

যুক্তিনিষ্ঠ গবেষণা পদ্ধতিতে রাজীব সরকার গ্রন্থের বিষয়গুলি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি ‘ইতালীয় রেনেসাঁস ও বাংলার রেনেসাঁস : একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা’ প্রবন্ধে বলেছেন, চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতক পর্যন্ত ইতালির রেনেসাঁস-পরবর্তী জার্মান রিফরমেশন, ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব ও চীনে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটে। লেখক রাজীব সরকার এ-প্রবন্ধে উল্লেখ করেন, উনিশ শতকের দুজন বাঙালি মনীষী রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নতুন চিন্তা তথা নবজাগরণের ধারক ও বাহক ছিলেন। ইতালি ও বাংলার নবজাগরণের মধ্যকার অমিলগুলি তিনি স্পষ্ট করেছেন। নবজাগরণ ও সমাজবিপ্লবের পার্থক্য তুলে ধরেছেন। বলা বাহুল্য, খণ্ডিত হলেও বাংলার রেনেসাঁস ছিল সামন্ততান্ত্রিক মধ্যযুগ থেকে ধনতান্ত্রিক আধুনিক যুগে উত্তরণ। রেনেসাঁসের প্রভাবেই তখন বাংলায় শিক্ষা ও রাজনীতি সচেতন দেশপ্রেমিক গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। রেনেসাঁসের ধারাবাহিকতায় ঢাকায় বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন, ভারতের স্বাধীনতা অর্জন, ভাষা-আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় সম্ভব হয়। তাই জাতীয় জীবনে এসবের অনুঘটক বাংলার নবজাগরণকে নতুন করে বোঝা দরকার।

গ্রন্থের দ্বিতীয় প্রবন্ধ ‘রেনেসাঁস ও বাংলা সাহিত্য’। এতে মোটাদাগে ঐতিহাসিক তথ্যসমূহ হচ্ছে, ইতালিতে চিত্রকলা এবং বাংলায় বাংলা সাহিত্য ছিল রেনেসাঁসের ভিত্তিমূল। তাতে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের বিপরীতে যুক্তিবাদী পন্থায় পুরাণ ও মহাকাব্যের চরিত্রগুলির আধুনিকায়ন ঘটালেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। বাংলা সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে সংযুক্ত হলো। রামমোহন রায়ের গদ্যসাহিত্যের উদ্দেশ্য ছিল নিজের সমাজকে প্রগতির পথে উদ্বুদ্ধ করা এবং কুসংস্কার থেকে নিবৃত্ত করা। রেনেসাঁসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ‘রিভাইভাল অফ লার্নিং’ অর্থাৎ ধ্রুপদী বিদ্যার পুনর্বাসন। এসময় পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রভাবে সৃষ্টিশীল সাহিত্য বাংলা সাহিত্যের প্রকরণ ও প্রকাশশৈলীকে বিপুলভাবে পরিগঠিত করে।

ইতিবাচক জীবনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও সৌন্দর্যচেতনা রেনেসাঁসের অন্যতম অবদান। গ্রন্থকার রাজীব সরকারের ভাষায় ‘রেনেসাঁসের কালবোশেখি ঝড় রামমোহন, ডিরোজিও, ইয়ংবেঙ্গল, মাইকেল হয়ে আঘাত হেনেছিল চিরায়ত বাঙালি জীবনধারাকে। … এই বৈপরীত্যকে অতিক্রম করে রবীন্দ্রনাথ রেনেসাঁসকে কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছে দেন।’
এ-প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক মন্তব্য হলো, ‘রবীন্দ্রনাথে সেই বৌদ্ধিক ও নান্দনিক উৎকর্ষের চূড়ান্ত সাহিত্যিক প্রকাশ যেভাবে ঘটেছে তার কোনো তুলনা বিশ্বসাহিত্যে নেই। … শতবর্ষের বাংলা সাহিত্যের এমন আশ্চর্য সিদ্ধির মর্মমূলে যে সাংস্কৃতিক রহস্য ক্রিয়াশীল ছিল তার নামই রেনেসাঁস। রেনেসাঁসের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য।’

রাজীব সরকার সুচিন্তিত ও প্রাসঙ্গিক অবতারণায় আলোচ্য বইয়ের তৃতীয় প্রবন্ধ ‘রবীন্দ্রনাথের রামমোহন মূল্যায়ন’ উপস্থাপন করেন। এতে ছেঁকে তোলা তথ্যননী পরিবেশনায় উপস্থাপন করেছেন রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য :

বাংলার রেনেসাঁসের সূচনা পুরুষ রাজা রামমোহন রায়। … একদিকে নানা কুসংস্কার ও অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হিন্দু সমাজ, অন্যদিকে সাতসমুদ্রের ওপার থেকে পাশ্চাত্য স্রোতধারার প্রবল বন্যা। এই যুগসন্ধিক্ষণে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন রামমোহন। … ধর্ম, শিক্ষা, ভাষা, সাহিত্য, রাজনীতি – সমস্ত ক্ষেত্রে তিনি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। … রামমোহন ভারতবর্ষে নতুন যুগের প্রবর্তক ছিলেন। … রবীন্দ্রনাথের ভাষায় – রামমোহনের যুগে সমগ্র পৃথিবীতে একমাত্র তিনিই আধুনিক যুগের প্রকৃতার্থ পরিপূর্ণভাবে উপলব্ধি করিয়াছিলেন …।

‘রবীন্দ্রনাথের চোখে বিদ্যাসাগর’ শিরোনামে চতুর্থ প্রবন্ধও বেশ প্রাণবন্ত। প্রাবন্ধিক লেখেন, ‘বিদ্যাসাগরের প্রধান পরিচয় তিনি রেনেসাঁস মানব। … রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে বিদ্যাসাগরের প্রধান কীর্তি বাংলা ভাষার পূর্ণাঙ্গ অবয়ব নির্মাণ। … বিদ্যাসাগর পাশ্চাত্যের নিত্যনতুন বিদ্যা আয়ত্ত করার পক্ষপাতী ছিলেন। কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসের পরিবর্তে মুক্তচিন্তা ও ইহজাগতিকতার বিকাশ ঘটানোর জন্যে তিনি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রম সংস্কার করেছিলেন। …’

গ্রন্থের পঞ্চম প্রবন্ধ ‘মাইকেল ও রবীন্দ্রনাথ’। ১৮৬১ সালে মেঘনাদবধ মহাকাব্য বাংলা কাব্যে আধুনিকতার সূত্রপাত ঘটায়। রবীন্দ্রনাথ বলেন, মধুসূদন আধুনিক বাংলা কাব্যসাহিত্যের প্রথম দ্বার উন্মোচনকারী। আসলেই মধ্যযুগের অবসান ঘটিয়ে আধুনিকতায় শুভ উত্তরণ। এভাবে মাইকেল মূল্যায়নে রবীন্দ্রনাথ তাঁর রেনেসাঁস ভাবনারই পরিচয় দিয়েছেন। আর ১৮৬১ সাল ইতিহাসে মেঘনাদবধ ও রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাবকাল। ‘রবীন্দ্র বীক্ষণে বঙ্কিম মনীষা’ প্রবন্ধে রাজীব সরকারের বীক্ষণও যথার্থ। বাংলার রেনেসাঁসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অবদান সম্পর্কে তিনি উল্লেখ করেন, ‘তাঁর (বঙ্কিমের) জাদুকরী সৃষ্টিশীলতায় একদিকে যেমন বাংলা কথাসাহিত্যে রেনেসাঁস ঘটে, অন্যদিকে পাশ্চাত্য দর্শন ও বিজ্ঞানরসে জারিত তাঁর মননশীলতা বাঙালির চিন্তাজগতে অভূতপূর্ব আলোড়ন তৈরি করে।’

সম্পাদক, ঔপন্যাসিক ও প্রাবন্ধিক – এই তিন ভূমিকায় তিনি আত্মনিবেদন করেছেন বাংলা সাহিত্যে নবজাগরণের উন্মেষ ঘটাতে। বাংলা গদ্যসাহিত্যে রেনেসাঁস এসেছে বঙ্কিমচন্দ্রের হাত ধরেই। এ-পর্যালোচনার সঙ্গে প্রাবন্ধিক যোগ করলেন এ-বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের পর্যবেক্ষণ – ‘বিপন্ন বঙ্গভাষা আর্তস্বরে যেখানেই তাঁহাকে আহ্বান করিয়াছে সেখানেই তিনি প্রসন্ন চতুর্ভুজ মূর্তিতে দর্শন দিয়াছেন।’ এখানে রাজীব সরকার আরো বলেন, বৈশ্বিক মানদণ্ডে বাংলা সাহিত্যকে উন্নীত করেছিলেন তিনি। এটি সম্ভব হয়েছিল রেনেসাঁসবাহিত পাশ্চাত্য বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্যের সঙ্গে বঙ্কিমের নিবিড় সম্পর্কের কারণে।

গ্রন্থের প্রতিপাদ্য অনুসরণে সন্নিবেশনায় পরবর্তী প্রবন্ধ ‘রবীন্দ্রকাব্যে রেনেসাঁস চেতনা’। রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যচেতনা, মর্ত্যপ্রেম ও ধর্মবিশ্বাস মানবমুখী। জীবন ও জগতের প্রতি রবীন্দ্রনাথের এই অনুরাগ পরবর্তীকালে গভীরতর হয়েছে। মায়াবাদ ও বৈরাগ্যসাধন কখনো রবীন্দ্রনাথের চিন্তালোকে ঠাঁই পায়নি। সোনার তরীতে, ছিন্নপত্রতে, চৈতালিতে, চিত্রায় সর্বত্র এই মন্ত্রধ্বনি শোনা যায়। সর্বক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ মানবমুক্তির একজন শ্রেষ্ঠ সাধক। রবীন্দ্রনাথের চিন্তাজগতে বাউল সম্প্রদায়ের বিশেষ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এ প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক যোগ করলেন, মন্ত্রবর্জিত, নিপীড়িত মানুষের কাছ থেকেই ধর্মের প্রকৃত পাঠ গ্রহণ করেছিলেন মহাপুরুষেরা। ব্রাত্য, অন্ত্যজ ও শোষিত মানুষের পক্ষে চিরকাল সোচ্চার ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মনুষ্যত্বের দীপ্তিতে ভাস্বর ‘এবার ফিরাও মোরে’ কবিতায় বঞ্চিতজনদের প্রতি – ‘… এই সব মূঢ় মøান মূক মুখে -/ দিতে হবে ভাষা – এই সব শ্রান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে -/ ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা …’

সাম্প্রদায়িকতার আঘাতে জর্জরিত ভারতবর্ষে ঐক্যের সাধনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ। যেমন ‘ভারততীর্থ’ কবিতায় – ‘দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে -/ এই ভারতের মহামানবের সাগর তীরে।’ এ-প্রবন্ধটি প্রাসঙ্গিক

তথ্য-উপাত্তে সুসমৃদ্ধ। রাজীব সরকার এ-প্রবন্ধে লেখেন, ‘রেনেসাঁসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রতি সশ্রদ্ধ অবলোকন। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটেছিল ইতালীয় রেনেসাঁসে। তখন ইতালি প্রাচীন গ্রিক ও লাতিন সংস্কৃতির নিবিড় চর্চায় নিয়োজিত ছিল। রামমোহন বেদান্ত ও উপনিষদ অনুবাদের মধ্য দিয়ে যার সূচনা করেছিলেন বিদ্যাসাগর, মাইকেল ও বঙ্কিম তাঁদের অনুবাদমূলক ও সৃজনশীল গদ্য-পদ্য চর্চার মধ্য দিয়ে যে বিস্মৃতপ্রায় প্রাচীন মনন ও সৌন্দর্য চর্চাকে পুনর্জীবিত করতে চেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ একে পরিপূর্ণতা দান করেছেন তাঁর জীবনব্যাপী সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সাধনার মাধ্যমে।’

‘রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে রেনেসাঁস ভাবনা’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের তিনটি উপন্যাসে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা ও উগ্রবাদ সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। তাঁর বলিষ্ঠ সৃষ্টি গোরা। এ-উপন্যাসে মানুষে মানুষে ভেদাভেদের সংকীর্ণতার প্রাচীর ভেঙে দিয়েছিল রেনেসাঁসের আবির্ভাব। লেখক গোরার দেশপ্রেম এবং অসাম্প্রদায়িকতার অসাধারণত্ব তুলে ধরেন। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ – এই অনন্য উপলব্ধিতে ভাস্বর গোরা। ভারতে মুসলিম সংস্কৃতি লালনে রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে এবং চতুরঙ্গ উপন্যাসের উদ্ধৃতিগুলো পাঠককে বিস্তারিত পড়ার অনুরোধ জানাব।

‘রেনেসাঁসের চেতনার উজ্জ্বল স্মারক রবীন্দ্র নাটক’ প্রবন্ধে বিসর্জন, অচলায়তন, মুক্তধারা, রক্তকরবী প্রভৃতি মহৎ নাট্যসাহিত্যে সত্য ও শুভবোধের চিরকালীন বাণী উচ্চারিত হয়েছে। উল্লিখিত হয়েছে মনুষ্যত্বের জয়ধ্বনি। এতে প্রাবন্ধিক যোগ করেন, ‘বাংলা নাটকের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথের অবদান তুলনারহিত। … তবে তাঁর মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল রেনেসাঁস বাহিত মানবসত্তা।’

গ্রন্থের সর্বশেষ প্রবন্ধ ‘রবীন্দ্র প্রবন্ধে রেনেসাঁস চেতনার দীপ্তি।’ এই প্রবন্ধে রাজীব সরকার লিখেছেন, রেনেসাঁসের মানবতাবাদের কেন্দ্রীয় সত্য হচ্ছে মানুষ। মুক্তি, স্বাধীনতা, ইহজাগতিকতা রেনেসাঁস হিউম্যানিজমের মূলকথা। রবীন্দ্র আধুনিকতার মূলকথাও তাই। রবীন্দ্রনাথের ‘কালান্তর’, ‘সাহিত্যসৃষ্টি’, ‘পল্লীপ্রকৃতি’ প্রভৃতি প্রবন্ধে রেনেসাঁস ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে। এ-কথা লেখক প্রতিটি প্রবন্ধেই জোর দিয়ে বলেছেন।

রাজীব সরকার কৃতী প্রাবন্ধিক। বাংলা সাহিত্যে রেনেসাঁস ও রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে তাঁর এ-গ্রন্থটি রবীন্দ্র আলোচনার এক মূল্যবান সংযোজন। রবীন্দ্রনাথের সংগীত সৃষ্টির উদাহরণও প্রাবন্ধিক এখানে নিয়ে এলে আমরা রেনেসাঁস সৃষ্টিতে পূর্ণাঙ্গ রবীন্দ্রনাথকে পেতাম। অপরাপর ভাষা ও সাহিত্যের উদ্ধৃতি রবীন্দ্র রেনেসাঁসের পক্ষে থাকলে সেসব তথ্যও টানা যেত। পাঠক ও গবেষকদের কাছে আমাদের বিশ্বাস, এই গ্রন্থটি সাদরে গৃহীত হবে।