ফ্রিডরিখ হোল্ডার্লিন ও তাঁর একটি কবিতার অনুবাদ

এক

জন ক্রিস্টোফার ফ্রিডরিখ হোল্ডার্লিনের জন্ম দক্ষিণ জার্মানির সোবিয়ার লফেন এম নেকারে, ১৭৭০ সালের ২০শে মার্চ। জার্মানিতে তিনি মূলত গীতিকবি হিসেবে সুপরিচিত। তবে তাঁর আরো একটি পরিচিতি আছে। জার্মানিতে আঠারো শতকে যে রোমান্টিক আন্দোলন হয়েছিল, তিনি ছিলেন তার অগ্রপথিক। কেবল সাহিত্য রচনায়ই যে তিনি সীমাবদ্ধ ছিলেন তা নয়, জার্মানির চিরায়ত দর্শনের উন্নতিতেও তাঁর বিশেষ অবদান আছে। বিশেষ করে জার্মান আদর্শবাদের উন্নতিতে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। এ-কথা বিখ্যাত দার্শনিক জর্জ উইলহেম ফ্রিডরিখ হেগেলও স্বীকার করেছেন, তাঁর লেখাজোখায়।

মাত্র দুই বছর বয়সে তিনি পিতাকে হারান। মাতা দ্বিতীয় বিবাহ করেন। হোল্ডার্লিনের বয়স যখন মাত্র নয় বছর সে-সময় তিনি তাঁর বিপিতাকেও হারান। ফলে তাঁর শৈশব কাটে মায়ের শাসনে। গোঁড়া প্রোটেস্ট্যান্ট মা তাঁকে ধর্মযাজক বানাতে চেয়েছিলেন। তাই তাঁর মা তাঁকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন স্থানীয় ধর্মীয় বিদ্যালয়ে। তবে ধর্মীয় বিদ্যালয়ে শিক্ষার পূর্বে তিনি নুরটিনিগেনের একটি গ্রামার স্কুলে কিছুদিন পড়ালেখা করেন। ১৭ বছর বয়সে বিয়ের কথা হয়েছিল এক কিশোরীর সঙ্গে। কিন্তু এক বছরের মাথায় নিজেই সে-সম্পর্ক ভেঙে দেন। এরপর ভর্তি হন জার্মানির টুবিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। অধ্যয়নের বিষয় ছিল ধর্মতত্ত্ব। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তিনি পরিচিত হন জর্জ উইলহেম ফ্রিডরিখ হেগেল (১৭৭০-১৮৩১) ও উইলিয়াম ভন শিলিং (১৭৭৫-১৮৫৪)-এর সঙ্গে। পরে তাঁরা তাঁর খুবই ভালো বন্ধু হয়ে ওঠেন। হোল্ডার্লিনের সাহিত্যিক জীবনেও এঁদের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

যে-সময় হোল্ডার্লিন কবিতা রচনা করছেন, সে-সময় জার্মানিতে আলোকপ্রাপ্তির (Enlightenment) যুগ চলছে। এই সময়েই জার্মানিতে সাহিত্য, সংস্কৃতি, দর্শন, ইতিহাস, সংগীতসহ নানা বিষয়ের সর্বোচ্চ উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিল। আর এই যুগেই আবির্ভূত হয়েছিলেন হোল্ডার্লিন। ফলে তাঁর সাহিত্যকর্ম যুগের এই সমস্ত আলোড়ন, আলোড়ন-প্রসূত বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে ধারণ করেছিল। হোল্ডার্লিনের লেখকসত্তার বিকাশে আরো যিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, তিনি হলেন ফ্রিডরিখ শিলার (১৭৫৯-১৮০৫)। শিলারের সঙ্গে সাক্ষাৎ তাঁর জীবনের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৭৯৪ সালে তিনি জেনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পাঠ্য বিষয় হিসেবে বেছে নেন পূর্বের বিষয় – ধর্মতত্ত্ব। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তিনি পরিচিত হন জন উলফগং ভন গ্যাটের (১৭৫৯-১৮৩২) সঙ্গে। তাঁর সাহিত্যিক জীবনে গ্যাটের ভূমিকাও কম নয়।

দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়ার পর তিনি যাজকবৃত্তি করে ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি নিঃসন্দেহ ঈশ্বরভক্ত ছিলেন। কিন্তু চার্চ বা ধর্মযাজকবৃত্তিকে তিনি কোনোদিনই সমর্থন করেননি। পেশা হিসেবে তিনি যে-কাজ বেশ কিছুদিন করেছিলেন, তা হলো টিউশনি। সে-সময় জার্মানির বহু অভিজাত পরিবারে তিনি টিউশনি করেছেন। তবে টিউশনিতেও তিনি ঠিকমতো মনস্থির করতে পারেননি। ফলে দায়িত্বমাফিক কাজ না করার কারণে তিনি একটি পরিবারে বেশিদিন টিউশনি করাতে পারেননি। কিছুদিন তাঁর দায়িত্বশীলতার অভাবে তাঁকে সকলে বিদায় করে দিত। এমনকি একসময় অর্থকষ্টে ভুগে তিনি টিউশনি করার জন্য সুইজারল্যান্ডের হপ্টাইলে গিয়েছিলেন। সুনির্দিষ্ট কোনো পেশা না থাকায় তিনি অধিকাংশ সময়েই আর্থিক দীনতায় ভুগতেন। ওই বিপদের সময় তাঁর মা তাঁকে সাহায্য করতেন।

আর যিনি তাঁর দিকে সাহায্যের একটা হাত বাড়িয়ে রাখতেন, তিনি তাঁর অগ্রজ কবি শিলার। শিলার একজন অভিভাবকের মতো তাঁকে সাহায্য করেছেন, নানা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। আর্থিকভাবে যতটা পেরেছেন সাহায্য করেছেন। কিন্তু হোল্ডার্লিন এই আর্থিক দীনতা কাটাতে পারবেন না, এ-ব্যাপারে যেন নিশ্চিত ছিলেন। নিজের অবস্থা নিজে পরিবর্তন না করে আর্থিক দীনতায় ভুগবেন, এ যেন ছিল তাঁর এক বিশেষ সিদ্ধান্ত। জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি এই আর্থিক দীনতা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। টিউশনি করাতে গিয়ে ব্যাংকার জোসেফ গনটার্ডের স্ত্রী সুজেট গনটার্ডের প্রতি প্রণয়াসক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তবে তাঁর কাছে তেমন কোনো অর্থকড়ি ছিল না, যা দিয়ে তিনি ওই মহিলাকে নিজের করে রাখবেন। তিনি নিজেই বলেছেন, আমার তেমন কোনো অবস্থা নেই যা দিয়ে আমি কোনো স্ত্রীকে ঘরে রাখতে পারবো। সুজেট গনটার্ডই পরে তাঁর ‘ডিয়োটিমা’ (‘Diotima’) কবিতার ডিয়োটিমা হিসেবে এসেছেন।

১৮০২ সালে হোল্ডার্লিন ফ্রান্সের বোর্ডাতে অবস্থান করেছিলেন। সেখানে তিনি হ্যামবার্গের কনসাল ও মেয়ার নামের একজন মদ ব্যবসায়ীর বাচ্চাদের পড়াতেন। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি তাঁর পিতৃভূমিতে ফিরে আসেন। এর মাঝে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হয়, এবং সুজেট গনটার্ড মৃত্যুবরণ করেন। এ-সময় তিনি বেশ ভেঙে পড়েছিলেন। ফলে তিনি তাঁর মায়ের কাছে নুরেনটেনে চলে আসেন এবং পিন্ডার ও সফোক্লিসের সাহিত্য অনুবাদ শুরু করেন।

হেসে-হ্যামবার্গের প্রধান, তাঁর বন্ধু সিনক্লেয়ার ১৮০৪ সালে তাঁকে সেখানকার কোর্ট লাইব্রেরিয়ান হিসেবে নিয়োগ দেন। এসময় প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘হাভস্ অফ লাইফ’ (‘Halves of Life’)। সামান্য কিছুদিন তিনি আর্থিক কষ্ট থেকে মুক্ত থাকলেও শেষমেশ এই চাকরিই তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। চাকরির কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর বন্ধু সিনক্লেয়ারকে দেশদ্রোহী হিসেবে আটক করা হয়। এর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে টুবিঙ্গেন হোল্ডার্লিনকেও আটক করা হয়, স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর যদিও তাঁকে উন্মাদ হিসেবে মুক্তি দেওয়া হয়। তাঁকে টুবিঙ্গেন অথেনরিথ ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয়। এ-ক্লিনিক টুবিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। হাসপাতাল থেকে ১৮০৭ সালে তাঁকে আর্নেস্ট জিমার নামে এক ছুতোর মিস্ত্রির বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তিনি আমৃত্যু বসবাস করেছিলেন। তিনি ছোট একটি ঘরে থাকতেন, যা পরে ‘হোল্ডার্লিন টাওয়ার ইন জিমারস হাউস’ (Holderlin Tower in Zimmer’s House) নামে পরিচিতি পায়। এখানেই ১৮৪৩ সালের ৭ই জুন ফ্রিডরিখ হোল্ডার্লিন মারা যান।

দুই

হোল্ডার্লিনের সবচেয়ে বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম তাঁর উপন্যাস হাইপেরিয়ন (Hyperion, ১৭৯৭-১৭৯৯)। এই উপন্যাসটি তিনি গ্রিক মিথলজি অবলম্বনে রচনা করেছিলেন। ভাষা, কাহিনি, কাঠামো – তিন দিক থেকেই উপন্যাসটি ছিল শিল্পসফল। তাঁর এই উপন্যাস রচনার পূর্বে ও পরে তিনি অনেক কবিতা রচনা করেছেন। তাঁর বিখ্যাত কিছু কবিতা ‘ইস্তার’ (‘Der Ister’), ‘মানুষ’ (Der Mench’), ‘প্রভাত’ (‘Des Morgens’), ‘শীত’ (‘Der Winter’), ‘যৌবন’ (‘Die Jugend’), ‘হাইপেরিয়ন-এর অদৃষ্টের গান’ (‘Hyperions Schiksaalslied’), ‘ডিয়োটিমা’ (‘Diotima’), ‘মধ্যজীবন’ (‘Haelfte dess Lebens’) ইত্যাদি। পূর্বেই বলা হয়েছে, তিনি অনুবাদক হিসেবেও সফল ছিলেন। ১৮০৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর অনূদিত সফোক্লিসের নাটক।

নিজ জীবনের অভিজ্ঞতা ও চারপাশের মানুষের নানা অভিজ্ঞতা তিনি তাঁর সাহিত্যে নিয়ে এসেছেন, ভাষার ব্যাপারেও তিনি ছিলেন এই একই ধারণা-অনুবর্তী। ভাষার ব্যাপারে তিনি সবসময় অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। ফার্দিনান্দ সোসুর বা প্লেটো লিখিত ও মৌখিক ভাষার যে-প্রভেদ দেখিয়েছেন, তা তিনি সাহিত্য সৃষ্টির বেলায় ভেঙে দিয়েছিলেন। ফলে ভাষা-ধারণার বিবেচনায় তাঁর বিপক্ষ শিবিরের লেখকরা তাঁর বিরুদ্ধে নানা মন্তব্য করেছে ক্রমাগত। তবে তা তাঁর বিরুদ্ধে এক ধরনের ভীরু মন্তব্য ছাড়া আর কিছুই হতে পারেনি শেষ পর্যন্ত। ভীরুরাই তো অযথা ভীরু মন্তব্য করে নিজেদের অদক্ষতা ঢাকতে ওস্তাদ!

তাঁর সাহিত্যের বিষয় হিসেবে এসেছে সম্মান, উদ্দেশ্য, গৌরবমুকুট, সাহসিক-পথ ইত্যাদি। তবে এ-সমস্ত বিষয় তো তাঁর নিজেরই বিপরীত! তাহলে কেমন করে তাঁর সাহিত্য তাঁর বাস্তব জীবনাশ্রয়ী? এ-প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন হলেও সহজ এই কারণে যে, কবিদের বাস্তবতা তো তাঁদের অন্তর্গত বাস্তবতা। অর্থাৎ, যে সমস্ত বিষয় হোল্ডার্লিনের সাহিত্যের উপজীব্য, তার সবই ছিল তাঁর নিজের অধরা। আর এই অধরা বিষয়ই বাস্তব হয়ে, তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার সারাৎসার হয়ে ধরা দিয়েছে তাঁর কবিতায়। অনেকে এই বিষয়টিকে তাঁর নিজস্ব আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। নিজ প্রেমিকার কাছে কিংবা বন্ধুদের কাছে তিনি যে সমস্ত চিঠি লিখতেন, তাতেও এই বিষয়সমূহই উঠে এসেছে। কিন্তু অবস্থার বিবেচনায় তাঁর বাস্তবসম্মত কল্পনাগুলো আর বাস্তবের খোঁজ পায়নি, তাঁর মতো মানুষের পক্ষে তা সম্ভবও ছিল না। যে কি না ছিলেন নিজের ও নিজের পেশার ব্যাপারে অতিমাত্রায় উদাসীন, তাঁর জন্য তো বিষয়টি সম্ভবও নয়।

আইডেন্টিটি, অর্থাৎ স্বরূপের সন্ধান তাঁর সাহিত্যের অন্যতম দিক। তিনি নিজেও নিজ আইডেন্টিটির ব্যাপারে বেশ সচেতন ছিলেন। কোনো এক সেমিনারে তাঁকে এক ব্যক্তি অভিবাদন না জানানোয় তিনি ওই ব্যক্তির মাথার টুপি খুলে ছুড়ে ফেলে দেন। এর মাধ্যমেই তাঁর ভেতরের আউডেন্টিটির অহমিকাবোধের বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি অদৃশ্য অহমিকাবোধ, বলা যায় তা তো তাঁর নিজের অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষায় নির্মিত, তা তাঁর অন্তর্গত বাস্তবতায় বিদ্যমান ছিল। বিষয়টিকে যদি বলা হয়, এটা ছিল হোল্ডার্লিনেরই একটি বিপ্লবী মনোভাব, তাহলে তা কোনোভাবেই তাঁর সাহিত্য-মানসের বাইরে যায় না, বরঞ্চ তাঁর সাহিত্য-মানসের সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে মূলত হোল্ডার্লিনের আমিত্বেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বারবার।

অতিশয় ধ্বংসশীলতা তাঁর সাহিত্যের আর একটি বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ, একার্থে তুরীয়বাদী সাহিত্য-বৈশিষ্ট্য তাঁর সাহিত্যে উপস্থাপিত হয়েছে প্রবলভাবে। ধ্বংস আর ধ্বংসের মধ্যেই সমগ্রতার যোগাযোগ ঘটানো এবং তা থেকে পরিত্রাণের বিষয়ও তিনি তাঁর সাহিত্যে যোগ করেছেন। হেগেল তাঁর দার্শনিক রচনাবলির একটি বড় অংশে কথা বলেছেন কেবল আদর্শবাদিতার বিষয়ে। কিন্তু হোল্ডার্লিন কেবল আদর্শবাদিতা নয়, আদর্শের সঙ্গে আদর্শহীনতা, এবং এই দুইয়ের সংযোগ ঘটিয়ে আদর্শবাদিতার বিষয়কে সংশ্লেষিত করে উপস্থাপন করেছেন। তিনি আস্তিক্যবাদী সাহিত্যের সাধনা করেছেন। হেগেলের দর্শন থেকে হোল্ডার্লিনের দর্শনের মৌলিক পার্থক্য তৈরি হয় প্রধানত এই দুটি ধারণার মাধ্যমে।

নস্টালজিক হয়ে স্মৃতিতে বিচরণ করা এবং তা সাহিত্যে উপস্থাপন-কৌশল তাঁর সাহিত্যের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। নস্টালজিক হতে গিয়ে তিনি কোনো সময়-আবেগের বশবর্তী হয়ে যাননি। বরং নিজের ভেতরের যে আইডেন্টিটির অহমিকাবোধ, তা একসঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর সাহিত্যে। ফলে নস্টালজিয়া উতরে গেছে আবেগ থেকে। নস্টালজিয়ার মধ্যে কবি খুঁজে পেয়েছেন তাঁর কাঙ্ক্ষিত বিষয়, যদিও তাঁর নস্টালজিয়া শুধু অতীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তা বিচরণ করেছে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ – তিন কালের ভেতরেই। এই কারণে হোল্ডার্লিনের সাহিত্য-নস্টালজিয়া অন্যদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। হোল্ডার্লিনের নস্টালজিয়া তাঁর মগ্নচৈতন্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তিনি প্রথাগত নস্টালজিয়ার ধারণাই ভেঙে দিয়েছিলেন এইভাবে।

হোল্ডার্লিনের সাহিত্যের বিষয় হিসেবে আরো এসেছে : অসুস্থতাবোধ, তিমিরাচ্ছন্নতা ও কলুষ। নিজের জীবনের
যে-বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে তা তো সাহিত্যে আসবে, এই রীতিতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন, সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন তিনি তাঁর সাহিত্যে ঘটিয়েছেন। যদিও তিনি রোমান্টিক কবি ছিলেন, তবু বাস্তবিক নানা বিষয় তাঁর সাহিত্যে এসেছে – যেমনটা দেখা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যে। রোমান্টিক কবি হলেও সমাজের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের এবং রবীন্দ্র-সাহিত্যের নিগূঢ় সম্পর্ক বিদ্যমান। রবীন্দ্রনাথ সমাজকে বাদ দিয়ে সাহিত্য রচনা করেননি। কারণ সাহিত্য তো পরিপ্রেক্ষিত উতরে যেতে পারে না, যাওয়া সম্ভবও নয়। শিলারকে লেখা চিঠিতে হোল্ডার্লিন নানা হতাশাবাদী ও সংশয়বাদী কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, শীতে জমে যাচ্ছেন এবং আকাশ নোংরায় গড়া। এ সমস্ত বিষয় থেকে তাঁর ভেতরে জমে থাকা সংশয় ও হতাশার নানা চিত্র ফুটে উঠেছে। এসব বিষয়ই তিনি তাঁর সাহিত্যে রূপদান করেছেন। আর এ-সমস্ত বিষয় সমাজ ও দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ধর্মতত্ত্ব নিয়ে নিজে পড়ালেখা করেছেন। ধর্মের প্রতি তাঁর ছিল বিশ্বাস। নিজেই নিজেকে আস্তিক হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। তবে কোনো আধ্যাত্মিকতায় তাঁর বিশ্বাস ছিল না; কিন্তু ছিলেন আস্তিক্যবাদিতায় বিশ্বাসী। নিজে তো চার্চ বা ধর্মযাজকতার তীব্র বিরোধিতা ও নিন্দা করেছেন, পূর্বেই বলা হয়েছে। তিনি তাঁর প্রায় প্রত্যেক কবিতায় বারবার ধর্ম, ঈশ^র, স্বর্গ, এসো, যাও প্রভৃতি শব্দ ব্যবহার করেছেন। এসব শব্দের মাধ্যমে আস্তিক্যবাদী চিন্তারই প্রকাশ পেয়েছে। প্রকাশ পেয়েছে ধর্ম-বিষয়ে তাঁর সুস্পষ্ট অবস্থান।

হোল্ডার্লিন ছিলেন সিজোফ্রেনিয়ার (Schizophrenia) রোগী। ফ্রয়েডীয় ভাষায় বলা যেতে পারে সাইকোসিস (Psychosis)। পরিবেশ থেকে সংযোগ-বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিত্বের বিচ্ছিন্নতা নামক মানসিক ব্যাধিকেই শাস্ত্রে বলা হয় সিজোফ্রেনিয়া। হোল্ডার্লিন এই মানসিক ব্যাধিতেই ভুগেছিলেন আমৃত্যু। অনেক তাত্ত্বিকই একে মানসিক ব্যাধি হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ফ্রয়েড কিন্তু এই মানসিক ব্যাধিকে ঠিক কেবল মানসিক ব্যাধি হিসেবে বিবেচনা না করে এর সুদিকগুলোও তুলে ধরেছেন। অস্তিত্ববান মানুষ হয়ে-ওঠার জন্য ফ্রয়েড সাইকোসিসের ওপর বেশ জোর দিয়েছেন। স্বর্গ, মেঘ, জ্যোতি, আঘাত, প্রজ্বলন, তন্দ্রাসহ এই ধারার যে সমস্ত বিষয় তিনি তাঁর কবিতায় বারবার নিয়ে এসেছেন তা তাঁর সাইকোসিসেরই ফলাফল – এ-বিষয় উতরে যাওয়ার কোনো উপায় তাঁর ছিলও না। ফ্রয়েডীয় সাইকোসিস কিংবা সিজোফ্রেনিয়া – যাই বলা হোক না কেন, তা যে হোল্ডার্লিনের কবি-মানস ও কবিতার ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলেছে, তা সকলে স্বীকার করতে বাধ্য হবে। উপরোক্ত বিষয়-আশয়ই হোল্ডার্লিনের সাহিত্যের প্রধানতম বিষয় ও প্রবণতা।

তিন

ইস্টার

এখন সময় আগুনের

দিবালোকের জন্য আমরা অধৈর্য,

নতজানু, অপেক্ষায় ক্লান্ত

ঠিক তখুনি, ওই নীরবতায়,

আমরা বনভূমির অবাক ডাক শুনি।

এরই মধ্যে আমরা সিন্ধু থেকে গান গাই

যা ভেসে আসে বহুদূর থেকে,

এবং ইফিয়াস নদী এবং নদী দেবতা থেকে,

যেহেতু আমাদের আছে

বহুদিনের কাক্সিক্ষত ভব্যতা।

তবে এতে নাটকীয় চমকও আছে

যা ধরা যায়

সোজা সামনে

যা আছে সবচেয়ে নিকটে

যা নিয়ে যাবে অন্য পারে।

কিন্তু এইখানে আমরা গড়তে চাই

নদীরা এই মাটিকে দিয়েছে উর্বরতা

এবং পত্রপল্লবকে বেড়ে ওঠার শক্তি

আর যদি গ্রীষ্মে প্রাণীরা

জলের উৎসে জড়ো হয়

মানুষেরাও সেই উৎসে যাবে।

নদীর নাম ইস্টার

এর বসবাস সুন্দরের গভীরে। পাতার স্তম্ভরা পোড়ে

তাদের মধ্যে কম্পন জাগে। তারা একসাথে বনের মধ্যে দাঁড়ায়

একে অপরের দিকে হাত বাড়ায়, উপরে।

পাথরের গম্বুজ থেকে

দ্বিতীয় একটা মাত্রা ফুটে বেরোয়

ফলে আমি অবাক হই না যে দূরের ঝিলিক দেওয়া নদী

হারকুলিসকে তার অতিথি করেছিল

যখন তিনি ছায়ার খোঁজে নেমে এসেছিলেন

আর স্থলযোজকের গরম এড়াতে।

সেইখানে তাদের ছিল সাহস

যার প্রয়োজন যখন তখন, যেমন শীতল জল

আর আত্মার জন্য চলার মতো একটি পথ

সে কারণেই জলের উৎসে এসেছিলেন সেই নায়ক

এর সুবাস ছড়ানো হলুদ দুই তীরে

যাদের পেছনে ছিল ফার বৃক্ষ, যাদের গভীরে

শিকারিরা ঘুরে বেড়ায়

এবং দুপুর আর রজন-সমৃদ্ধ গাছগাছালি

যাদের বেড়ে ওঠার কাতরতা গোঙানির মতো শব্দ তোলে।

তারপরও নদীটাকে মনে হয়

প্রায় যেন উল্টো বয়ে যায়, আর আমি

ভাবি এটি এসেছে পুবের থেকে

অথবা আরো বেশি দূরের থেকে। কিন্তু কেন এটি

সোজা ঝুলে থেকে পর্বতের গায়ে? অন্য নদীটি,

রাইন, চলে গেছে

পাশ দিয়ে, এবং নদীগুলি শুধু শুধু শুষ্কতায় বয়ে যায় না,

কিন্তু কিভাবে? আমাদের একটা ইশারা চাই

এর থেকে বেশি কিছু নয়, কিন্তু যার প্রকাশ সহজ,

আমাদের যা মনে করিয়ে দেবে এক অবিচ্ছিন্ন বন্ধনে বাঁধা সূর্য আর চাঁদকে,

যার অবশ্য একটা শেষ আছে – যেমন দিন ও রাতের –

স্বর্গে যারা উষ্ণতা দেবে একে অপরকে।

মহোত্তম দেবতাকে তারা আনন্দ দেয়। তা না হলে

কেন তিনি তাদের কাছে নেমে আসবেন?

এবং পৃথিবীর প্রাচীন সবুজের মতো, অপরিপক্বতার মতো

তারা স্বর্গের সন্তান। কিন্তু আমার মনে হয়েছে

তিনি যেন তাদের একটু বেশি আশকারা দেন,

যেন অবজ্ঞাও দেখান; যেহেতু

যৌবনে যখন একটি দিন শুরু হয়

বেড়ে ওঠার সূত্রপাত তো তখন-ই

ততক্ষণে কিন্তু আরেকটি দিন এসে গেছে

সৌন্দর্যকে এক ধাপ এগিয়ে নিতে

আর ঘোড়ার শাবকের মতো

সবকিছুর গায়ে নাক ঘষতে থাকে। আর যদি সে খুশি হয়

দূরের বাতাস তার শব্দ শোনে।

কিন্তু পাথরের প্রয়োজন খোদাই হওয়া

এবং পৃথিবীর প্রয়োজন কর্ষিত জমি

অথবা সীমাহীন শূন্যতা

কিন্তু একটি নদী কি করবে

কেউ তা জানে না।

*অনূদিত কবিতাটির জার্মান শিরোনাম ‘Der Ister’ এবং ইংরেজি শিরোনাম ‘The Ister’। জার্মানিতে দানিয়ুব নদীকে ডাকা হয় ইস্টার নামে। ২০০৫ সালে ম্যাক্সিন হেরনফ (Maxine Hernoff) ও পল হুভার (Paul Hoover) হোল্ডার্লিনের দুটি কবিতা মূল জার্মান থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। একটি কবিতার শিরোনাম ‘ইস্টার’, অন্যটির ‘ডিয়োতিমা’। দুটি কবিতাই ছাপা হয়েছিল জ্যাকেট ম্যাগাজিনে। ম্যাক্সিন হেরনফ সান ফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটির শিক্ষক। পল হুভার কবি ও সম্পাদক। অনূদিত কবিতাটি জ্যাকেট ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ‘ইস্টার’ কবিতার অনুবাদ।

সহায়ক

১. L. S. Salzberger, Hoelderlin, Yale University Press, New York, 1952.

২. Editor : John Tranter, Jacket Magazine, USA, April, 2005.

৩. Nathan Lee, ‘A Journey Up the Danube, Philosophy Included’, The New York Times, New York, Feb. 10, 2006.

৪. Walter de Gruyter, Kürschners Deutscher Gelehrten-Kalender (English : Kürschner’s Encyclopedia of German Scholars), 22nd Edition, Germany, 2009.

৫. সৈয়দ আলী আহসান, জার্মান সাহিত্য (মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগ), বইঘর, চট্টগ্রাম, ১৯৭৬।

৬. হাবিব আর রহমান, পাশ্চাত্য সাহিত্যতত্ত্ব : ধ্রুপদী ও আধুনিক, কথাপ্রকাশ, ঢাকা, আগস্ট ২০১৫।