সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মধুসূদন : সমালোচনার তাৎপর্য

সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে

কবি-সমালোচক বুদ্ধদেব বসু একবার বলেছিলেন, তিনি ছিলেন, ‘বিশ শতকের একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি’। নিজের বক্তব্যকে খানিকটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বুদ্ধদেব জানিয়েছিলেন, সুধীন্দ্রনাথের ‘মতো নানা গুণসমন্বিত পুরুষ রবীন্দ্রনাথের পরে আমি অন্য কাউকে দেখিনি।’ আমরা যেন মনে রাখি যে, সুধীন্দ্রনাথের কথা বিবেচনা করতে গিয়েই বুদ্ধদেব বসুর মধ্যে ওই প্রশ্নটি জেগেছিল যে, ‘যাকে আমরা প্রতিভা বলি, সে-বস্তুটি কী?’ বুদ্ধদেব নিজেও যে সেটির উত্তর খুঁজে পেয়েছিলেন, তা নয়। বোধকরি, এসব প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর আমাদের কারো জানা নেই। সেই কারণে বুদ্ধদেব বসুকে বলতে হয়েছিল, ‘তা [প্রতিভা] কি বুদ্ধিরই কোনো উচ্চতর স্তর, না কি বুদ্ধির সীমাতিক্রম্য কোনো বিশেষ ক্ষমতা, যার প্রয়োগের ক্ষেত্র এক ও অনন্য?’ এইসব প্রশ্নের কোনো সুনির্দিষ্ট সুরাহা করতে পারেননি বুদ্ধদেব বসু, কারো পক্ষেই বোধকরি সেটা সম্ভব নয়। তবে বুদ্ধদেবের ওই গুচ্ছ প্রশ্নের মধ্যেই কিন্তু সে-প্রশ্নের উত্তরের একটি আভাস আমরা ঠিকই পেয়ে যেতে পারি। (বুদ্ধদেব, ১৯৯১ : ৯৯)। আমরা দেখতে পাই যে, এখানেই থেমে যাননি বুদ্ধদেব; সুধীন্দ্রনাথকে তিনি পণ্ডিত, মনস্বী, বিদ্বান প্রভৃতি বিশেষণে অভিষিক্ত করে বলেছিলেন, ‘তাঁর পঠনের পরিধি ছিলো বিরাট ও বোধের ক্ষিপ্রতা ছিলো অসামান্য।’ শুধু তা-ই নয়, বুদ্ধদেবের মতে, ‘যাকে বলে কাণ্ডজ্ঞান, সাংসারিক ও সামাজিক সুবুদ্ধি, তাও পূর্ণমাত্রায় ছিলো তাঁর।’ ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্র ধরে বুদ্ধদেব বসু আরো আমাদের জানিয়েছিলেন, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ‘কর্তব্য পালনে অবহেলা করতেন না, গার্হস্থ্য ধর্মপালনে অনিন্দনীয় ছিলেন, ছিলেন আলাপদক্ষ, রসিক, প্রখর ব্যক্তিত্বশালী … সর্ববিষয়ে উৎসুক ও মনোযোগী’ (বুদ্ধদেব, ১৯৯১ : ১০০)। আমরা এইখানে এইসব প্রসঙ্গের উল্লেখ করছি এই কারণেই যে, সুধীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মে তাঁর সেই ব্যক্তিগত প্রতিভা, স্বভাব ও বৈশিষ্ট্যগুলো নানাভাবে প্রতিভাত হয়ে উঠেছিল; সেসব বিচিত্রভাবে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর কাব্যকর্মে ও সাহিত্যসমালোচনায়। এমনকি মাইকেল মধুসূদন দত্ত সম্পর্কে তিনি যে মূল্যায়ন করার প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন, সেখানেও আমরা তাঁর প্রতিভা ও বিশ্লেষণী শক্তির প্রকাশ দেখতে পাই।

দুই

মাইকেল মধুসূদন দত্ত সম্পর্কে কবি-সমালোচক জগন্নাথ চক্রবর্তী বলেছিলেন, ‘আমাদের সাহিত্যে মধুসূদন ভারতীয় রেনেসাঁসের ভগীরথ, অগ্রগামী; ব্রাহ্মসমাজকেন্দ্রিক রিফরমেশন-এর প্রভাব থেকে তিনি মুক্ত’ (জগন্নাথ, ২০২৩ : ২৬৬)। অনুবাদক-প্রাবন্ধিক উইলিয়াম রাদিচে (William Radice : 1951) তাঁর মেঘনাদবধ কাব্যের অনুবাদের ভূমিকায় বলেছিলেন, ‘In Madhusudan we can readily find the familiar ingredients of Romanticism : egotism, passionate love, idealization of women, worship of Nature, patriotism.Õ (Dutt, 2010 : xiv)। পাশাপাশি তিনি এই মন্তব্যও করেছিলেন যে, ‘It is not even necessary to go to his poems and plays to find it, as Madhusudan the romantic leaps out from the pages of his extraordinary English letters.’ (Datt, 2010 : xiv)। অর্থাৎ একই মানুষ মধুসূদন দুটি ভিন্ন অঞ্চলের মানুষজনের কাছ থেকে দুটি ভিন্ন সময়ে একই ধরনের পারঙ্গমতার স্বীকৃতিলাভ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তাঁর সামর্থ্যের সেই বিষয়টি অনুধাবন করেই হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে বলা সম্ভব হয়েছিল, ‘যে গ্রন্থে স্বর্গ, মর্ত্ত্য, পাতাল তর‌্যভুবনের রমণীয় এবং ভয়াবহ প্রাণী ও পদার্থসমূহ একত্রিত করিয়া পাঠকের দর্শনেন্দ্রিয় লক্ষ্য চিত্রফলকের ন্যায় চিত্রিত হইয়াছে … যে গ্রন্থ পাঠ করিতে করিতে কখনো বা বিস্ময় কখন বা ক্রোধ বা করুণরসে আর্দ্র হইতে হয়, এবং বাষ্পাকুল লোচনে যে গ্রন্থের পাঠ সমাপ্ত করিতে হয়, তাহা যে বঙ্গবাসীরা চিরকাল বক্ষঃস্থলে ধারণ করিবেন ইহার বিচিত্রতা কি!’ (ব্রজেন্দ্রনাথ ও সজনীকান্ত, ২০১৮ : ২১)। এইসব মন্তব্য সেদিনের মতো আজকের দিনেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বলেই মনে হয়।

তিন

তাঁর সাহিত্য-জীবনের একটি পর্বে এসে মাইকেলের কাব্য নিয়ে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত আলোচনা করেছেন। সেইসব আলোচনা হয়তো-বা সংক্ষিপ্ত কিন্তু তার মধ্যেও সুধীন দত্তের কাব্য বিশ্লেষণের দক্ষতা ও গভীরতার পাশাপাশি কোনো-কোনো সময় সুবিন্যস্ত নিয়ম এবং পদ্ধতির দেখা মেলে। ‘রবীন্দ্রপ্রতিভার উপক্রমণিকা’ প্রবন্ধে আমরা দেখতে পাই যে, উনিশ শতকের বাংলা সাহিত্যের ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তদের প্রতি বলা যায় পুরোপুরি বীতশ্রদ্ধ ছিলেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। তার চেয়ে প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্যে তিনি আনন্দ পেতেন কিংবা পুরনো পদাবলীকারদের আত্মীয় বলে স্বীকার করতেও সম্মত ছিলেন। (সুধীন্দ্রনাথ, ১৯৯৫ : ২১০)। তারপরও বলা যায়, সেই ঊনবিংশ শতাব্দীর কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের কাব্যকর্মের প্রতি সুধীন্দ্রনাথের মনোযোগ বিশেষভাবে আলোচনার দাবি করে। মাইকেল সম্পর্কে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত বলেছিলেন, ‘পূর্ব-পুরুষদের সঙ্কীর্ণতা-প্রসঙ্গে সাম্প্রতিকেরা যতই মুখ ছোটাক না কেন, এ-কথা আজ তর্কাতীত যে প্রথার শাসন-ব্যতিরেকে মাইকেলের উদ্দাম প্রকৃতি চিরদিন উচ্ছৃঙ্খল থেকে যেত, কখনও স্থায়ী কাব্যে আত্মপ্রকাশ করত না।’ আর এর পাশাপাশি সুধীন্দ্রনাথ মন্তব্য করেন, ‘মাইকেলের রচনা যেহেতু বিদ্রোহের উন্মাদনায় আপাতত অধীর, তাই বাহ্য বিচারে যদিও মনে হয় যে তিনিই বুঝি নবযুগের প্রবর্তক … ধরা পড়ে যে তিনি অর্বাচীন শুধু আঙ্গিকের দিক দিয়ে; এবং শুধুই তাঁর বিষয়বস্তু সনাতন নয়, এমনকি
যে-অন্তঃপ্রেরণার জোরে তিনি কবি, তাও আদ্যন্ত বহিরাশ্রয়ী বলেই, ধ্রুপদী-আখ্যার যোগ্য’ (সুধীন্দ্রনাথ, ১৯৯৫ : ২১০)। তাঁর এই বক্তব্যকে একটা সাহিত্যিক যৌক্তিকতায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য হেমচন্দ্র-নবীন সেনের প্রসঙ্গ টেনেছেন সুধীন্দ্রনাথ। তাঁর মতে, ‘হেমচন্দ্রীয় ও নবীন-সেনী মহাকাব্যের পাশে “কড়ি ও কোমল”-এর প্রতি পঙ্ক্তিকে যতই লোভনীয় লাগুক না কেন, শুধু সে-পুস্তক লিখে, মাইকেলকে ছাড়িয়ে যাওয়া দূরের কথা, রবীন্দ্রনাথ তাঁর জাতেও উঠতে পারতেন না; এবং মাইকেলের যে-কোনও কবিতার পরে “কড়ি ও কোমল” কেবল বিষয়ের বিচারে নিম্নপদস্থ নয়, ব্যঞ্জনার দিক থেকেও অনুন্নত।’ এসবের পাশাপাশি সুধীন্দ্রনাথের এমনও মনে হয়েছে,
যে-গ্রন্থের মেরুদণ্ড পয়ারে নির্মিত এবং ‘চতুর্দশাক্ষর পয়ারকে, মাইকেল এমন এক পর্যায়ে তুলেছিলেন যার পরে তার উদ্গতি স্বভাবতই অসম্ভব’ (সুধীন্দ্রনাথ, ১৯৯৫ : ২২১)।

চার

আমরা দেখি যে, মাইকেলের কবিতার আঙ্গিক, বিশেষ করে, তাঁর কাব্যের ভাষা ও ছন্দকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করতে গিয়ে সুধীন্দ্রনাথ জানিয়েছিলেন, ‘বাংলা নাটকের অন্যতম প্রবর্তক, মাইকেলও যেহেতু বাংলা লিখতে শিখেছিলেন সংস্কৃত অভিধানের অধ্যাপনায়, তাই তাঁর ছন্দে অর্থ সাধারণত আবেগের অগ্রগণ্য।’ আবার এর পরক্ষণেই তাঁর মনে হয়েছে, ‘না, এ-অভিযোগ হয়তো ন্যায্য নয়, কারণ আবেগই কাব্যের প্রাণ; এবং আমরা যদি একবার মানি যে মাইকেলী কবিতায় আবেগ নেই, তবে তাতে কবিত্ব আছে, এ-কথাও আমাদের অনস্বীকার্য।’ তাঁর বক্তব্যকে আরো খানিকটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সুধীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘বস্তুত আবেগমাত্রেই হৃদ্গত বা ঐকান্তিক নয়, তার বুদ্ধিগত ও নৈর্ব্যক্তিক উদাহরণ … যথেষ্ট সুলভ’ (সুধীন্দ্রনাথ, ১৯৯৫ : ২২১)। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মুখে আবেগের স্তুতি ও কবিতায় সেই আবেগের গুরুত্বের কথা শুনে কেউ-কেউ হয়তো বিভ্রান্ত হবেন, কিন্তু যদি নিবিড়ভাবে খেয়াল করি, তাহলে দেখতে পাবো যে, এখানে মাইকেলের কবিতায় বুদ্ধিগত ও আবেগের তন্ময় অভিব্যক্তিকেই তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। সুধীন্দ্রনাথের মতে, বুদ্ধিগত ও নৈর্ব্যক্তিক আবেগের উদাহরণ শুধু বাংলা সাহিত্যেই নয়, তা বিশ্বসাহিত্যেও যথেষ্ট পরিমাণে দেখা যায়। তিনি মনে করতেন. ‘হৃদ্গত আবেগ মন্ময় বলে তা যেমন সর্বজনবিদিত ভাবানুষঙ্গের সাহায্যে প্রকাশ্য, তেমনই বুদ্ধিগত আবেগের তন্ময় অভিব্যক্তি স্বভাবত বর্ণনাত্মক ও অভিধাশ্রিত’ (সুধীন্দ্রনাথ, ১৯৯৫ : ২২১)। অন্যদিকে আবার, মাইকেলের যতিবিরল অমিত্রাক্ষরের মধ্যেও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত কবির ‘বেদনাবিমুখ তথা ভাবনাপ্রধান মতিগতি’ এবং ‘তাতে অপূর্ব ধ্বনিবিজ্ঞানে’র পরিচয় পেয়েছেন। সেইসঙ্গে তাঁর এ-ও মনে হয়েছে যে, মাইকেলের কাব্যের ‘অতিশ্রুতি শব্দতরঙ্গে পাঠকের মন
বড়-একটা ভেসে যায় না।’ তাঁর এই মন্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর প্রবন্ধে মাইকেলের কাব্য-প্রবণতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের তুলনা করে বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের চিত্তবৃত্তি ঠিক এর উল্টো; এবং তাঁর যতিভূয়িষ্ঠ ছন্দে পর্যন্ত ছেদের বালাই নেই, অনির্বচনীয় অনুভূতির নিরন্তর প্রবাহে তা সর্বত্র বেগবান।’ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পরে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ভারমুক্তভাবে বলতে পেরেছিলেন, ‘সত্য বলতে কী, রবীন্দ্রনাথের মতো স্বভাবস্বচ্ছন্দ লেখকের পক্ষে অমিত্রাক্ষরের মুক্তি অনাবশ্যক।’ কেননা, ‘কৈশোরক উচ্ছ্বাস কাটতে না কাটতে তিনি [রবীন্দ্রনাথ] বুঝেছিলেন যে ছন্দোবন্ধে বাঙালীর পুরাকালীন স্বেচ্ছাচার প্রশ্রয় পেলে, তাঁর আত্মপ্রকাশে বিঘ্ন ঘটবে।’ সে-কারণেই সুধীন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল যে, ‘প্রথম দিকের রীতিমতো নাটক কখানিতে ছাড়া অমিত্রাক্ষর তিনি ব্যবহার করেননি।’ আবার সেইসঙ্গে ‘যেখানে অবিচ্ছিন্ন ভাবাবেগের তাগিদে অথবা কথকতার গরজে প্রবহমাণ ছন্দের প্রয়োগ অনিবার্য হয়ে উঠেছে, সেখানে শুধু পদান্ত বিরাম তুলে দিয়ে তিনি সনাতনী পয়ারকেই কাজে লাগিয়েছেন’ (সুধীন্দ্রনাথ, ১৯৯৫ : ২২২)। সুধীন্দ্রনাথের দিক থেকে এইভাবে রবীন্দ্রনাথকে ‘স্বভাবস্বচ্ছন্দ লেখক’ চিহ্নিত করাকে সে-সময়ের রবীন্দ্র-অনুসারীদের কেউ-কেউ একেবারেই পছন্দ করেননি; এমনকি আমাদের এমনও মনে হয়েছে যে, রবীন্দ্রনাথ নিজেও সুধীন্দ্রনাথের এই আলোচনায় ঠিক-ঠিক স্বস্তিবোধ করতে পারেননি। দুজনের চিঠিপত্রেই সেইসব অস্বস্তির নমুনা দেখতে পাওয়া যায়। মাইকেল সম্পর্কে বলতে গিয়ে সুধীন্দ্রনাথ তাঁর এই প্রবন্ধে আরো জানিয়েছেন, মাইকেলের মতো ধ্রুপদী কবিদের ‘কাব্যোপজীবিকা যেহেতু নিরাধার তথা অবিমিশ্র আবেগ, তাই তাতে ব্যক্তিগত বেদনার প্রাবল্য নেই।’ সে-কথা স্বীকার করে নিয়েই সুধীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘প্রসঙ্গের নানাত্ব সত্ত্বেও “চতুর্দশপদী কবিতাবলী”র স্বরবৈচিত্র্য “মানসসুন্দরী”র চেয়ে কম; এবং তারপরেও না মেনে উপায় থাকে না বটে যে অন্তত আক্ষরিক ছন্দে মাইকেলের নৈপুণ্য রবীন্দ্রনাথের চেয়ে বেশি’ (সুধীন্দ্রনাথ, ১৯৯৫ : ২২২)। একজন সৎ সমালোচককে যে একইসঙ্গে সত্যভাষণের ক্ষেত্রে সাহসী হতে হয় – বাংলা সাহিত্যে সুধীন্দ্রনাথ তাঁর অসাধারণ নিদর্শন হয়ে থাকবেন।

পাঁচ

মাইকেলের ওপরে কবি মিল্টনের প্রবল প্রভাব দেখতে পেয়ে সুধীন্দ্রনাথের মনে হয়েছিল যে, ‘মাইকেল ছন্দকে অমিত্রাক্ষর করেই থামলেন, বুঝলেন না যে ভাষা প্রাকৃত না হলে, প্রকৃত কাব্যরচনা অসম্ভব।’ এইটা বলার ভেতর দিয়ে মাইকেলের প্রতি যে সুবিচার করা হলো না, সেটি সুধীন্দ্রনাথের বুঝতে দেরি হয়নি। সে-কারণেই নিজের ভুল সামলে নিতে তাঁকে বলতে হয়েছে, ‘এ-কথা নিশ্চয়ই স্বীকার্য যে ভাষা সম্বন্ধে তিনি [মাইকেল] কোনওদিন ঔদাসীন্য দেখাননি।’ সেইসঙ্গে সুধীন্দ্রনাথ এইটিও বলেছিলেন যে, ‘তৎকালীন পুঁথিগত বাংলা তাঁর [মাইকেল] চোখে অচল ঠেকেছিল; এবং সজীব ভাষার সন্ধানে তিনি যদি শেষ পর্যন্ত সংস্কৃত শব্দকোষেরই শরণ নিয়ে থাকেন, তাহলে শুধু তাঁকেই একদেশদর্শী বললে চলবে না, অসংস্কৃত বাংলার ঐকান্তিক দৈন্যও মানা চাই’ (সুধীন্দ্রনাথ, ১৯৯৫ : ২৪৪)। তবে এ-কথাও ঠিক যে, মাইকেলের মেঘনাদবধ কাব্যের নির্বিকার গাম্ভীর্য সুধীন্দ্রনাথ পছন্দ না-করে পারেননি। আবার, তাঁর এটিও মনে হয়েছে, এ-কাব্যের সার্থকতার নেপথ্যে রয়েছে একজন ‘নীতিকারের নিশ্চিন্ত নির্ব্যূঢ়তা’। আর সেই কারণে পাঠকদের সতর্ক করতে গিয়ে সুধীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘মাইকেল-সম্পর্কে এ-কথাও মনে রাখা কর্তব্য যে, তিনি ইংরাজী শিক্ষার প্রথম যুগের মানুষ; এবং নিজবাসভূমে পরবাসী হওয়াই ছিল তদানীন্তন চিৎপ্রকর্ষের পরাকাষ্ঠা।’ এসবের পাশাপাশি তিনি এ-ও বলতে কোনোরকম দ্বিধা করেননি যে, ‘মাইকেল বাংলা ভাষাকে ভালোবাসতেন বটে, কিন্তু তার প্রকৃতি বুঝতেন না। তাই তিনি বঙ্গভারতীর সেবকমাত্র, তার ত্রাণকর্তা নন’ (সুধীন্দ্রনাথ, ১৯৯৫ : ২৪৪)। বাংলা ভাষার কোমলতা, গাম্ভীর্য ও অলঙ্কারের পুঞ্জীভূত শৃঙ্খলা সম্পর্কে অত্যন্ত ওয়াকিবহাল ছিলেন বলেই সুধীন্দ্রনাথ এভাবে বলতে পেরেছিলেন, ‘মাইকেলের ছিদ্রান্বেষণ আমার অনভিপ্রেত। আমি জানি যে, তিনি শুধু নিয়ামক হিসাবে অদ্বিতীয় নন, চারিত্র্যগুণের অনটনে তাঁর বিরাট কবিপ্রতিভার অনেকখানি যদিও অপ্রকাশিত, তবু তিনি একজন মহাকবি; এবং যতদিন বাংলা কাব্যের অনুকম্পায়ী জুটবে, ততদিন তাঁর নাম-কীর্তনে লোকাভাব ঘটবে না’ (সুধীন্দ্রনাথ, ১৯৯৫ : ২৪৪)। মধুসূদনের এই কৃতিত্বের নেপথ্যের কারণ হিসেবে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এবারো উল্লেখ করতে ভোলেননি যে, ‘মাইকেল শুধু ম্রিয়মাণ বাংলা কাব্যকে জাগিয়ে তুলে, ঝিমিয়ে পড়েননি’; সেইসঙ্গে তিনি ‘বাঙালী কবিকে তরজাওয়ালার দল থেকে বাঁচিয়েছিলেন।’ তিনি শুধুই যে বাঁচিয়েছিলেন কেবল তা-ই নয়, সুধীন্দ্রনাথের মতে, মাইকেলের কাব্যরচনার ‘অব্যবহিত পরেই বঙ্গাকাশে যতগুলি জ্যোতিষ্ক উঠেছিল … তা বোধহয় মৃন্ময় দ্রোণের চরণে একলব্যের অর্ঘ্যনিবেদন।’ মাইকেল সম্পর্কে সুধীন্দ্রনাথের আরো মনে হয়েছিল যে, ‘মাইকেলকে পথপরিচায়ক হিসাবে না পেলেও বঙ্গসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের আবির্ভাব হয়তো যথাসময়ে ঘটত … তবে অনেক অকিঞ্চিৎকর পরিশ্রমে তাঁর অধিকাংশ শক্তি ফুরাত’ (সুধীন্দ্রনাথ, ১৯৯৫ : ২৪৪-২৪৫)। সুধীন্দ্রনাথের এই কথাটিকে কিন্তু কোনোভাবেই অগ্রাহ্য করা যায় না। যিনি সামনে না-থাকলে রবীন্দ্রনাথের মতো একজন কবির অধিকাংশ শক্তি ব্যয় হতো অকিঞ্চিৎকর পরিশ্রমে, তাঁকে এড়ানোর সুযোগ বাংলা সাহিত্যে কারো নেই – এই উপলব্ধিটা অন্তত সুধীন্দ্রনাথের ছিল।

ছয়

একজন সৎ সমালোচকের জন্য তাঁর নিজের মতামতটাকে প্রকাশ করাটা একেবারে বাধ্যতামূলক – এমনটা যদি বলা হয়, তাহলেও খুব-একটা বেশি বলা হয় না। সেইদিকটাতে খেয়াল রেখেই বুদ্ধদেব বসু তাঁর সমালোচক-ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই মন্তব্য করেছিলেন যে, ‘যাকে আমরা সমালোচনা বলি সে-জিনিসটা অত্যন্ত অস্থির। তার উপর নির্ভর করতে ভয় হয়’ (বুদ্ধদেব, ১৯৮৪ : ১৩৪)। অথচ আমরা বেদনার সঙ্গে খেয়াল করি যে, বুদ্ধদেব বসু সেই ‘অস্থির’ মতামতটাকেই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে বলেছিলেন, ‘মাইকেলের খ্যাতির সঙ্গে মাইকেলের কীর্তির সুমাত্রা-সূত্রের সম্বন্ধ নয়। … সমসাময়িক পাঠকসমাজে মাইকেলের আধিপত্য সূচিত হয়েছিলো মেঘনাদবধ কাব্য প্রকাশিত হবার আগেই। আর তার পর থেকে আজ প্রায় একশো বছর ধরে আমরা অবিশ্রান্ত শুনে আসছি যে মাইকেল মহাকবি, বাংলা সাহিত্যের ত্রাতা এবং বাংলা কাব্যের মুক্তিদাতা। তাঁর ঘটনাবহুল জীবন, জীবনের শোকাবহ সমাপ্তি তাঁর প্রতিষ্ঠার সহায়তা করেছে’ (বুদ্ধদেব, ১৩৬১ : ২৮)। অন্যদিকে, বিষ্ণু দে তাঁর ‘মাইকেল ও আমাদের রেনেসান্স’ প্রবন্ধে তৎকালীন আর্থ-সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে মাইকেলের সাহিত্যচর্চার কৃতিত্বকে খুঁজে বের করার একটা নিষ্ঠাবান প্রচেষ্টা দেখতে পাই। তাঁর প্রবন্ধের শুরুতেই বলেছেন, ‘জমির ব্যবস্থা, সমাজবিন্যাস, শাসনযন্ত্র প্রয়োগের সব ব্যাপারেই আমরা নিজেদের ভেবেছি প্রায়-সাহেব; ইওরোপ, বিশেষ করে ইংলন্ডের সঙ্গে কল্পিত সাদৃশ্য খুঁজে আমরা দেশে-বিদেশে দাবি-দাওয়া তুলেছি এবং কৃপণ উপহার গ্রহণ করেছি।’ আবার আমরা দেখতে পাই যে, সেই একইভাবে, বিষ্ণু দে-ও বলেছিলেন, ‘সাহিত্যক্ষেত্রেও আমরা উপমান খুঁজেছি ইংলন্ডে এবং জ্ঞানানুসারে কিছুটা হয়তো লাতিন ইওরোপে। এমনকি আমাদের অপরিসর সাহিত্যের বিরাট চমকপ্রদ মুষ্টিমেয় প্রতিভাধরদের আদি-পুরুষ মাইকেল মধুসূদন দত্তও এই উপমানির্ভর যুক্তির একজন প্রাথমিক শহিদ।’ (বিষ্ণু দে, ১৯৬৭ : ১)।

সাত

আমরা এখন নিশ্চিতভাবেই জানি যে, কবিতার অন্যতম প্রধান কাজ হচ্ছে, সত্যের অভিমুখে ক্রমাগত এগিয়ে যাওয়া, এই যাওয়াটা কবির দিক থেকে একটা পরিভ্রমণও বটে। আর সে-কারণেই সম্ভবত কবি শঙ্খ ঘোষ জানিয়েছিলেন যে, ‘সত্যি বলা ছাড়া আর কোনো কাজ নেই কবিতায়’ (শঙ্খ, ১৯৮৬ : ভূমিকা)। শঙ্খ ঘোষেরও বহু বছর আগে কবি-সমালোচক C. Day Lewis বলে গিয়েছেন যে, ‘Truth is poetry’s only defence, and true poetry’ can defend itself. Truth is poetry’s only defence, and true poetry can defend itself. (Lewis, 1947 : Foreword (Lewis, 1947 : Foreword.’। আর কবিতার সমালোচনা তো শিল্পের সেই অন্তর্নিহিত সত্যিটাকেই নানাভাবে উদ্ঘাটন করে। আর সে-কারণেই বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, ‘সমালোচনা বলতে আমি বুঝি উন্মীলন।’ কবিতার কেমন সেই উন্মীলন? – এই প্রশ্নের উত্তরে বুদ্ধদেব জানিয়েছিলেন, ‘সাহিত্যের বড়ো একটা পটভূমিকায় আলোচ্যকে আলোকিত করে, এবং নিজের উৎসুক চিত্তকে প্রকাশ করে, পাঠকের উদাসীন মনকে জাগ্রত করেন সমালোচক’ (বুদ্ধদেব, ১৯৮৪ : ১৩৮-১৩৯)। আর সেইসঙ্গে যে-জরুরি কথাটা বলতে বুদ্ধদেব বসু একেবারেই ভোলেননি, সেটি হচ্ছে, ‘এ কাজে উত্তাপ চাই, উৎসাহ চাই, নিন্দার ঠাণ্ডা সংকীর্ণতা দিয়ে তা সাধিত হতে পারে না।’ (বুদ্ধদেব, ১৯৮৪ : ১৩৯).

আট

কবিতার সত্য আর বাস্তবতার সত্য একইসঙ্গে এক ও ভিন্ন। সুধীন্দ্রনাথের কাব্যাদর্শ দিয়ে মাইকেল মধুসূদনের কাব্য-সমালোচনার পর্বান্তর পর্যালোচনা করতে গিয়ে আমরা সাহিত্যের সেই সত্যটাকেই নতুনভাবে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেলাম। কেননা, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের দৃষ্টিতে এইটিও এড়ায়নি যে, যতই রামায়ণ-মহাভারতের পুরাণের চরিত্রগুলোকে তিনি কাব্যিক রূপ দিন-না কেন, মধুসূদনের কাব্যের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল তাঁর সমকালের
রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ। আর সে-কারণেই মাইকেলের প্রচেষ্টাকে সাধুবাদ জানাতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘মনুষ্যসংসারে মানুষই নিত্য, মনুষ্যসমাজে মানুষই সেব্য, মানুষিক মঙ্গলই মনুষ্যধর্মের একমাত্র লক্ষ্য – এই মহাসত্যে যে-জাতির শিল্প ও সাহিত্য, বিজ্ঞান ও দর্শন, জীবন ও মরণ অনুপ্রাণিত, তার অভ্যুত্থান স্বভাবতই অনিবার্য’ (সুধীন্দ্রনাথ, ১৯৯৫ : ৩২৭)। সুধীন্দ্রনাথের এই মন্তব্যের সূত্র ধরে আমরা আবারো বুঝে নিতে পারি যে, মহাসত্যের সেই মহৌষধের কার্যকারিতার জন্যই পৃথিবীতে কবি ও কবিতার মৃত্যু নেই। যে-কারণে অত্যন্ত সংগতভাবেই বিশিষ্ট সাহিত্য-সমালোচক ও শেক্সপিয়র-বিশেষজ্ঞ উইলসন নাইট বলতে পেরেছিলেন, ‘Poetry exists to enlarge and transmute our existance. Its magic works on the mind.’ (Knight, 1971 : 44)। মাইকেলের কাব্যসমগ্রের শিল্পিত বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও কথাটি ভীষণভাবে প্রযোজ্য। একইভাবে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এখানে তাঁর সাহিত্যসমালোচনার যে-আদর্শটি প্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন, সেটিও নানাভাবে প্রাসঙ্গিক। কেননা, তাঁর সাহিত্যসমালোচনার ধরনটি ছিল মননশীল এবং তা পাঠক-সমালোচক – উভয়েরই কাছে নিবিড় মনোযোগের দাবি রাখে।

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

১. জগন্নাথ চক্রবর্তী, ২০২৩, মেঘনাদবধ কাব্যে চিত্রকল্প (প্রথম প্রকাশ : ১৯৯৭), প্রতিভাস, কলকাতা।

২. বিষ্ণু দে, ১৯৬৭, মাইকেল রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য জিজ্ঞাসা, মনীষা গ্রন্থালয় প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা।

৩. বুদ্ধদেব বসু, ১৯৮৪, কালের পুতুল (প্রথম প্রকাশ : ১৯৪৬), নিউএজ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলিকাতা।

৪. বুদ্ধদেব বসু, ১৯৯১, প্রবন্ধ-সংকলন (প্রথম প্রকাশ : ১৯৬৬), দে’জ পাবলিশিং, কলিকাতা।

৫. ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও সজনীকান্ত দাস (সম্পাদক), ২০১৮ (প্রথম সংস্করণ : ১৩৪৮), মেঘনাদবধ কাব্য : মাইকেল মধুসূদন, বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ, কলকাতা।

৬. শঙ্খ ঘোষ, ১৯৮৬ (প্রথম প্রকাশ : ১৯৭০), শ্রেষ্ঠ কবিতা, দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।

৭. সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, ১৯৯৫, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের প্রবন্ধসংগ্রহ (সম্পাদক : অমিয় দেব), দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা।

৮. C. Day Lewis, 1947, A Hope for Poetry, Basil Blackwell, Oxford.

৯. G. Wilson Knight, 1971, Neglected powers, Routledge & Kegan Paul, London.

১০. Michael Madhusudan Dutt, 2010, The Poem of the Killing of Meghnad (Meghnadbadh kabya), Penguin Books India,  New Delhi.