পোড়া নদীর স্বপ্ন পুরান
পাপড়ি রহমান
প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ
প্রকাশক : উত্তরণ
মূল্য : ৮০ টাকা
পো ড়া নদীর স্বপ্ন পুরান পাপড়ি রহমানের প্রথম উপন্যাস। এ এক নদীর, নদীতীরবর্তী মানুষ আর তাদের হাহাকারময় জীবনের উপন্যাস। বইটির ফ্ল্যাপেই এ সম্পর্কে জানানো হয়, ‘নদী আর নদীবর্তী মানুষের উপাখ্যান। জীবনঘনিষ্ঠ, সমাজসত্য আর বহুমাত্রিক জীবনের ছবি পরিস্ফুট এই উপাখ্যানে।…’ উপন্যাসটির শুরুই নদীর এক চমৎকার বর্ণনা দিয়ে। কিংজলা নামের এক গ্রামের নদীর নাম ঘাঘরা। গ্রামের বুকের উপর চিৎপাত শুয়ে থাকে। জল-জংলার এই বদ্বীপেরই এক নদীর নাম। তবে এই জনপদটি ঠিক কোন অঞ্চলের তা পরিষ্কার হয় না। হয়ত বাংলাদেশের তাবৎ জলচিত্র আর তার মানুষকেই পাপড়ি রহমান ধরতে চেয়েছেন। এ এমনই এক নদী যা আষাঢ়, শাওন আর ভাদ্রমাসে সারা আসমান মেঘে ছেয়ে থাকে, ভ্রমরের পাখনা ওড়ানো মেঘ। এই নদী বাঘিয়া নামের বিলের সাথেও মিশে। শ্রাবণ-সংক্রান্তিতে এক নৌকাবাইচ হয় এখানে। এই উৎসবই উপন্যাসটির এক উল্লেখযোগ্য আদল তৈরি করে। কিংবা বলা যায়, সামাজিক জীবনের কিছু নিষ্ঠুরতা, বিবর্তন জানানোর জন্যে এমন এক অনুষ্ঠানের বেশ প্রয়োজন ছিল।
নৌকাবাইচের সময় ঘাটে ঘাটে অগুনতি নৌকা বাঁধা – দূর থেকে মনে হয় যেন পিঁপড়ার সারি। ঘাঘর নদীর এ এক অদ্ভুত আয়োজন। একেকটা নৌকায় থাকে ৩০-৪০ জন মাঝি। এখন কিংজলার জল চিরল দাঁতের মিশির মতো রং ধারণ করে। কিংজলার পঙ্খীরাজ, লতাপাতা, সিংহ, বাঘ, হরিণ, চক্ষু, পরী নামের নৌকাগুলো এ বাইচে অংশ নিচ্ছে। শুধু কিংজলা নয়; আরো নাও ভাসিয়েছে নাটুয়া গাঁ, সোনাইমুড়ি, দীঘলিয়া, বেতকা আর রাধানগর। রুস্তম এ বছর মাল্লা সাজেনি; কারণ তার নববধূ আবিতন পোয়াতি এবং সেও চায় না রুস্তম নৌকায় উঠুক। এভাবেই ঔপন্যাসিক একটা নৌকাবাইচের চিত্র আঁকেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই নৌকাবাইচই একটা প্রধান বাঁক-বদলকারী ঘটনা হয় উপন্যাসটির। কারণ পঙ্খীরাজ নামের নৌকা জলঘূর্ণিতে (কুর) পড়ে এবং এর মাঝিদের আর খুঁজেও বের করা যায় না। তবে এখানে এ প্রশ্ন করা যায়, পঙ্খীরাজের বিভিন্ন অংশ বরুয়ার ব্রিজের কাছে পাওয়া যায়; পাঁচ-ছয়জনের মৃতদেহ পাওয়া গেলেও তাদের শনাক্ত করা যায় না। কেন? একটা গ্রামের জীবন এমন বিচ্ছিন্ন তো হতেই পারে না। মানুষ জলে ডুববে, একসময় এদের কেউ কেউ ভাসবে; কিন্তু ঘাঘরার লোকজনও তাদের চিনবে না, এ কেমন অবজার্ভেশন? যাই হোক, এরপরই নৌকাডুবির কবলে পড়া ইদ্রিস মিয়ার স্ত্রী ল্যাংড়িধলির কান্না পাঠক দেখতে পায়। ৩০-৪০ জন মাঝি-মাল্লার ভেতর একজনের কান্নাকেই পাপড়ি বেছে নেন। একই ঘটনায় অন্যসব আক্রান্তদের ব্যথা কি এমনই তুচ্ছ? কিন্তু উপন্যাসটির যে ধরন, বিস্তৃতির যত আয়োজন, তাতে অনেকগুলো বিষয়ের মতো এ যন্ত্রণাকেও বিস্তৃত করা যেত। তবে একই ল্যাংড়িধলির কান্না সারাটা উপন্যাসে নানা মাত্রায় বিস্তৃত। এই ল্যাংড়িধলি (এই অদ্ভুত নামকরণের একটা ব্যাখ্যা থাকলে ভালো হতো) মানসিক, শারীরিক, জৈবিক আর সাংসারিক শান্তি খোঁজে। কথকরূপী আনোয়ারেরও দ্বারস্থ হয়। তবু তার কষ্টের খুব একটা হেরফের হয় না। ল্যাংড়িধলি যে-যন্ত্রণা লালন করছে, বয়ে বেড়াচ্ছে, পাঠকের সাথে শেয়ার করছে – তা যত না নিপুণ বর্ণনাভঙ্গিতে প্রকাশ পায় তার চেয়েও বেশি কাব্যময়তায় পরিপূর্ণ।
শান্তি খোঁজে বাসন্তী। চমৎকার কুমোরের কাজ করে, তার কাজের নিপুণতার চিত্তাকর্ষক এক বর্ণনা আছে উপন্যাসটিতে। তারই ছেলে গৌতম, বোন পার্বতী। গৌতম কুমোরের ছেলে হয়েও নদীর টান অনুভব করে প্রচণ্ড। মাছও যারে সুজন আর আকাইল্যাকে নিয়ে। বিধবা মাসী পার্বতীর প্রতি অদ্ভুত মায়াময় এক কৈশোরিক জৈবিক টান অনুভব করে সে। তবে তার মা বাসন্তী যখন অধিক সন্তান থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্যে বনাজী ওষুধ খেয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যায়, তখন তার মানবিক হাহাকার পাঠককেও নাড়িয়ে দেয়। পার্বতী মাসীকেও আর সহ্য করতে পারে না সে, কারণ তার বাবা কার্তিক বিধবা শ্যালিকাকে বিয়ে করার পরিকল্পনা নেয়। পাপড়ি সারা উপন্যাসটিতে এই মানবিক টানাপোড়েন আঁকতেই যথার্থ ধৈর্যের পরিচয় দেন।
এ দিকটাও উপন্যাসটির একটা অন্যতম প্রধান দিক যে এতে
নানামাত্রার বর্ণনাভঙ্গি স্থান পেয়েছে। কখনো মনে হবে মৈমনসিং গীতিকার এক আধুনিক সংস্করণ আমরা পাঠ করছি, কখনো মনে হবে কাব্যনাট্যের স্বাদ নিচ্ছি, আবার কখনো মনে হবে অদ্বৈত মল্লবর্মনের সহযাত্রী হয়ে (নিশ্চয়ই ইতিবাচক অর্থেই) এক নদীর কান্না শোনাচ্ছেন তিনি। একটা বিষয় খুব খেয়াল করা যায়, নদী-জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দে, জলের রঙের উন্মাদনায়, নদীর উপকথা নির্মাণে পাপড়ি রহমান যে ব্যাকুলতা প্রকাশ করেন, কথকরূপী আনোয়ার বা রানু-জানু-ডাক্তার সানোয়ার এমনকি ছোটনানার ভাবভঙ্গি বা জীবনাচার বর্ণনায় ততই যেন মিতব্যয়ী। ঐ স্থলে ঘটনা বা চরিত্রকে বাড়তে দেন না তেমন। এ অংশগুলোর বর্ণনায় শুধু পৃথক নয়, যেন গল্পের ভেতর ভিন্ন তালের এক বাড়তি অনুষঙ্গ ঢুকাচ্ছেন পাপড়ি। এখানে তিনি জীবনের নানাবিধ বাঁক-বদলে আরো অ্যান্টিট্রাডিশনাল হতে পারতেন। কারণ এতে একধরনের সমকালীন অনুষঙ্গ-প্রতিষঙ্গের স্র্রোত প্রবহমান ছিল। সমকালীন মুক্ত-অর্থনীতির বুর্জোয়া রাজনীতির প্রসঙ্গও আসে এখানে। তবে তা বেশ ম্লান আর ঝাপসা। বুদবুদের মতো এসেই মিলিয়ে যায়। তিনি ধৈর্য রাখতে পারেননি রানুর বিয়ের বেলায়ও। রানু চোখের জল মুছতে মুছতেই ভাবছিল একজীবনে কতকিছুই ঠিক ঠিক হয় না…। আর এরই পরবর্তীতে, মাত্র ১৫/১৬ লাইনের ভেতরই বাবা আর রানুর আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের বর্ণনা দেন, অরুণকে নিয়ে আসেন, বিয়ের সাজপোশাকের কথা বলে নেন, ছোটনানাকে ছাড়াই বিয়ের প্রস্তুতি নেন, বাবা রানুকে অজু করে নিতে বলেন, কাজিকেও বলেন, ‘কাজি সাহেব এইবার বিয়েটা পড়ান’। এত তাড়াহুড়া কেন বোঝা গেল না। উপন্যাসে শুধু চরিত্র তৈরি হয় না, জীবনবদলের ইঙ্গিত বা প্রস্তুতি হয় না, পাঠকও নিজেকে এসবের সাথে জারিত করতে পারেন। একটা উপন্যাসে একজন পাঠকের ভেতরে যে হাসি-কান্না-বোধ-চলমানতা তৈরি হয়, তা আসলে ঔপন্যাসিকের প্রবহমানতারই অংশ। এখানে কি এসব তেমনভাবে এল? মনে হবে হুটহাট অনেক কিছু ঘটিয়ে একট সুস্থ মননশীল
ফিনিশিংয়ের দিকে যাওয়ার প্রবণতা ঔপন্যাসিকের প্রবল।
জল-ভূমি নিয়ে গড়া উপন্যাসে, এমনই ধাঁচের জীবনযাপন আসতে পারে যাতে মিশে থাকবে জলের গন্ধ। আসবে জেলে সম্প্রদায়, জেলেদের হাহাকার, জল-ব্যবসা, সাপের দেবী মনসা, দেবী মনসাপূজা, মনসানির্ভর মিথ। ধর্মীয় বিষয়াদি প্রাসঙ্গিকভাবে আসতে পারত। কুমোরপাড়ার হারানরা মাছ ধরে, ১৩-১৪ বছরের গৌতম পেশা বদল করে। কিন্তু বর্ণবাদে ঠাসা হিন্দুধর্মের লোকজনের এনিয়ে কোনো দ্বন্দ¡ তৈরি হয় না। ডোম, মেথর, বেদে (পাখির মাংস বিক্রেতা) প্রভৃতির মতো জলদাস আর কুমোররাও নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের। মাছ সম্পর্কীয় পচাগান্ধা পেশার জলদাস সম্প্রদায়ের সাথে দৃশ্যমান শিল্পের অধিকারী বলে কথিত কুমোরদের মনোভঙ্গি বা অহংকারও (যদিও এ উভয় সম্প্রদায়ই সামাজিক জীবনের অতি প্রয়োজনীয় মানবিক প্রাত্যহিকতার সাথে জড়িত) ভিন্ন হবে। কিন্তু এখানে এসব নিয়ে এদের তেমন মনঃপীড়া দেখা যায় না। নদী আর নদীতীরবর্তী জীবন এখানে মুখ্য বলে অন্যান্য গ্রাম, গ্রামীণ জীবন কিংবা নৌকার জীবন আসতে পারত। এই উপন্যাসে মা মনসার কথা এসেছে দুইবার, তা-ও নেতিবাচক অর্থে। অথচ নদীকূলের মানুষদের আশা-আকাক্সক্ষার অনেক কিছুই মনসামুখী। এমনকি যে শাওনের কথা বলা হলো উপন্যাসটির শুরুতেই সেই শাওনের পুরোমাস চলে মনসাপূজা, একেবারে মনসাবন্দনা।
পাপড়ির ধৈর্যহীনতা এই উপন্যাসের আরেকটা উল্লেখযোগ্য দিক। এত আয়োজন, এত চরিত্র, এত অনুষঙ্গ তবু তিনি আরোপিত ঘটনা ও বর্ণনা উপন্যাসটিতে প্রয়োগ করেন। পাঠকের যথোচিত মনোযোগী আচরণকে তিনি মনে রাখতে পারতেন। বেশ অবিচার বোধ হয় করা হলো কথকরূপী আনোয়ারের প্রতিও। তার বাবা সানোয়ার হোমিওপ্যাথ ডাক্তার, যার প্রতি তার প্রেরণামূলক টানও খুব বেশি। সানোয়ার প্রথা ভাঙতে চান; সমাজতন্ত্রে এখনো বিশ্বাস রাখেন। একসময় মিয়া বাড়ির ঐতিহ্য ভেঙে তার মেয়ে রানুকে অরুণের সাথে বিয়েও দেন। কিন্তু এসবে এত তাড়াহুড়া যে পাঠক শ্বাস ফেলারও সময় পান না, যার ফলে সানোয়ারের জেলে যাওয়ার মতো সিরিয়াস বিষয়ের সাথেও পাঠক একাত্ম হতে পারেন বলে ধারণা করা মুশকিল।
তবে এই উপন্যাসটির উপস্থাপনার ধরনটি বেশ চমৎকার এবং নতুনত্বের ইঙ্গিতবাহী। ভাষার ভাঙচুর আর বহুমাত্রিক আয়োজন বেশ মজার। শুরুতেই মনে হবে ঘাঘরার জল, হাওয়া, রং বদলের খেলার অংশ হয়ে যাচ্ছে পাঠক। বৈঠার টান, জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, জলঘূর্ণির অদ্ভুত রেশ পাঠকের মর্মমূলে গেঁথে যেতে থাকে। নৌকা চলার শব্দ পাঠকের বোধে তীব্র-তীক্ষè নাড়া দেয়। এর বর্ণনাও জল-জীবনের প্রবহমানতা তৈরি করে। নতুন নতুন শব্দ তিনি অবলীলায় প্রয়োগ করেন – যেমন র্পকারে (প্রকারে), গভ্ভে (গর্ভে), লরিদশা (বিপদ-আপদ), বাইস্যা (বর্ষা), উইন্যা (শুকনা), মইদ্যে (মধ্যে), ঢক (নমুনা), কম্ম (কর্ম), খুদা (খোদা), চক্ষের (চোখের) ইত্যাদি। উপন্যাসটির দুই উল্লেখযোগ্য চরিত্রই বলা যায় ঘাঘরা আর এর নাগালে আসা বিভিন্ন মিথ, লোককথা, দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা।
তার ভাবনার পাটাতনটি
বাস্তবতাঘেঁষা আর এর প্রকাশভঙ্গি স্বকল্পধাঁচের। এর প্রচ্ছদে পুরান শব্দটি স্বপ্ন থেকে আলাদা অর্থাৎ লেখা হলো স্বপ্ন পুরান। আবার ব্যাককভারসহ অন্য চার জায়গায় (ইংরেজিতেও) লেখা হলো স্বপ্নপুরান। এই পুরান তো পুরাতন বা পুরনো অর্থেই? নাকি মিথের আবহে পোড়া নদীর জীবনে বা স্বপ্ন পূরণ (পরিপূর্ণ) অর্থেই এর নামকরণ করা হলো? পোড়া নদীর স্বপ্ন কিন্তু পূরণ হওয়ার কোনো লক্ষণই দেখা গেল না। এ ধরনের বিভ্রম কেবলই তৈরি হচ্ছে। উপন্যাসটি শেষ পর্যন্ত হতবিহ্বলতার বহুমাত্রিক বিভ্রমই বহন করে। ৎ
টান অনুভব করে সে। তবে তার মা বাসন্তী যখন অধিক সন্তান থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্যে বনাজী ওষুধ খেয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যায়, তখন তার মানবিক হাহাকার পাঠককেও নাড়িয়ে দেয়। পার্বতী মাসীকেও আর সহ্য করতে পারে না সে, কারণ তার বাবা কার্তিক বিধবা শ্যালিকাকে বিয়ে করার পরিকল্পনা নেয়। পাপড়ি সারা উপন্যাসটিতে এই মানবিক টানাপোড়েন আঁকতেই যথার্থ ধৈর্যের পরিচয় দেন।
এ দিকটাও উপন্যাসটির একটা অন্যতম প্রধান দিক যে এতে
নানামাত্রার বর্ণনাভঙ্গি স্থান পেয়েছে। কখনো মনে হবে মৈমনসিং গীতিকার এক আধুনিক সংস্করণ আমরা পাঠ করছি, কখনো মনে হবে কাব্যনাট্যের স্বাদ নিচ্ছি, আবার কখনো মনে হবে অদ্বৈত মল্লবর্মনের সহযাত্রী হয়ে (নিশ্চয়ই ইতিবাচক অর্থেই) এক নদীর কান্না শোনাচ্ছেন তিনি। একটা বিষয় খুব খেয়াল করা যায়, নদী-জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দে, জলের রঙের উন্মাদনায়, নদীর উপকথা নির্মাণে পাপড়ি রহমান যে ব্যাকুলতা প্রকাশ করেন, কথকরূপী আনোয়ার বা রানু-জানু-ডাক্তার সানোয়ার এমনকি ছোটনানার ভাবভঙ্গি বা জীবনাচার বর্ণনায় ততই যেন মিতব্যয়ী। ঐ স্থলে ঘটনা বা চরিত্রকে বাড়তে দেন না তেমন। এ অংশগুলোর বর্ণনায় শুধু পৃথক নয়, যেন গল্পের ভেতর ভিন্ন তালের এক বাড়তি অনুষঙ্গ ঢুকাচ্ছেন পাপড়ি। এখানে তিনি জীবনের নানাবিধ বাঁক-বদলে আরো অ্যান্টিট্রাডিশনাল হতে পারতেন। কারণ এতে একধরনের সমকালীন অনুষঙ্গ-প্রতিষঙ্গের স্র্রোত প্রবহমান ছিল। সমকালীন মুক্ত-অর্থনীতির বুর্জোয়া রাজনীতির প্রসঙ্গও আসে এখানে। তবে তা বেশ ম্লান আর ঝাপসা। বুদবুদের মতো এসেই মিলিয়ে যায়। তিনি ধৈর্য রাখতে পারেননি রানুর বিয়ের বেলায়ও। রানু চোখের জল মুছতে মুছতেই ভাবছিল একজীবনে কতকিছুই ঠিক ঠিক হয় না…। আর এরই পরবর্তীতে, মাত্র ১৫/১৬ লাইনের ভেতরই বাবা আর রানুর আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ের বর্ণনা দেন, অরুণকে নিয়ে আসেন, বিয়ের সাজপোশাকের কথা বলে নেন, ছোটনানাকে ছাড়াই বিয়ের প্রস্তুতি নেন, বাবা রানুকে অজু করে নিতে বলেন, কাজিকেও বলেন, ‘কাজি সাহেব এইবার বিয়েটা পড়ান’। এত তাড়াহুড়া কেন বোঝা গেল না। উপন্যাসে শুধু চরিত্র তৈরি হয় না, জীবনবদলের ইঙ্গিত বা প্রস্তুতি হয় না, পাঠকও নিজেকে এসবের সাথে জারিত করতে পারেন। একটা উপন্যাসে একজন পাঠকের ভেতরে যে হাসি-কান্না-বোধ-চলমানতা তৈরি হয়, তা আসলে ঔপন্যাসিকের প্রবহমানতারই অংশ। এখানে কি এসব তেমনভাবে এল? মনে হবে হুটহাট অনেক কিছু ঘটিয়ে একট সুস্থ মননশীল
ফিনিশিংয়ের দিকে যাওয়ার প্রবণতা ঔপন্যাসিকের প্রবল।
জল-ভূমি নিয়ে গড়া উপন্যাসে, এমনই ধাঁচের জীবনযাপন আসতে পারে যাতে মিশে থাকবে জলের গন্ধ। আসবে জেলে সম্প্রদায়, জেলেদের হাহাকার, জল-ব্যবসা, সাপের দেবী মনসা, দেবী মনসাপূজা, মনসানির্ভর মিথ। ধর্মীয় বিষয়াদি প্রাসঙ্গিকভাবে আসতে পারত। কুমোরপাড়ার হারানরা মাছ ধরে, ১৩-১৪ বছরের গৌতম পেশা বদল করে। কিন্তু বর্ণবাদে ঠাসা হিন্দুধর্মের লোকজনের এনিয়ে কোনো দ্বন্দ¡ তৈরি হয় না। ডোম, মেথর, বেদে (পাখির মাংস বিক্রেতা) প্রভৃতির মতো জলদাস আর কুমোররাও নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের। মাছ সম্পর্কীয় পচাগান্ধা পেশার জলদাস সম্প্রদায়ের সাথে দৃশ্যমান শিল্পের অধিকারী বলে কথিত কুমোরদের মনোভঙ্গি বা অহংকারও (যদিও এ উভয় সম্প্রদায়ই সামাজিক জীবনের অতি প্রয়োজনীয় মানবিক প্রাত্যহিকতার সাথে জড়িত) ভিন্ন হবে। কিন্তু এখানে এসব নিয়ে এদের তেমন মনঃপীড়া দেখা যায় না। নদী আর নদীতীরবর্তী জীবন এখানে মুখ্য বলে অন্যান্য গ্রাম, গ্রামীণ জীবন কিংবা নৌকার জীবন আসতে পারত। এই উপন্যাসে মা মনসার কথা এসেছে দুইবার, তা-ও নেতিবাচক অর্থে। অথচ নদীকূলের মানুষদের আশা-আকাক্সক্ষার অনেক কিছুই মনসামুখী। এমনকি যে শাওনের কথা বলা হলো উপন্যাসটির শুরুতেই সেই শাওনের পুরোমাস চলে মনসাপূজা, একেবারে মনসাবন্দনা।
পাপড়ির ধৈর্যহীনতা এই উপন্যাসের আরেকটা উল্লেখযোগ্য দিক। এত আয়োজন, এত চরিত্র, এত অনুষঙ্গ তবু তিনি আরোপিত ঘটনা ও বর্ণনা উপন্যাসটিতে প্রয়োগ করেন। পাঠকের যথোচিত মনোযোগী আচরণকে তিনি মনে রাখতে পারতেন। বেশ অবিচার বোধ হয় করা হলো কথকরূপী আনোয়ারের প্রতিও। তার বাবা সানোয়ার হোমিওপ্যাথ ডাক্তার, যার প্রতি তার প্রেরণামূলক টানও খুব বেশি। সানোয়ার প্রথা ভাঙতে চান; সমাজতন্ত্রে এখনো বিশ্বাস রাখেন। একসময় মিয়া বাড়ির ঐতিহ্য ভেঙে তার মেয়ে রানুকে অরুণের সাথে বিয়েও দেন। কিন্তু এসবে এত তাড়াহুড়া যে পাঠক শ্বাস ফেলারও সময় পান না, যার ফলে সানোয়ারের জেলে যাওয়ার মতো সিরিয়াস বিষয়ের সাথেও পাঠক একাত্ম হতে পারেন বলে ধারণা করা মুশকিল।
তবে এই উপন্যাসটির উপস্থাপনার ধরনটি বেশ চমৎকার এবং নতুনত্বের ইঙ্গিতবাহী। ভাষার ভাঙচুর আর বহুমাত্রিক আয়োজন বেশ মজার। শুরুতেই মনে হবে ঘাঘরার জল, হাওয়া, রং বদলের খেলার অংশ হয়ে যাচ্ছে পাঠক। বৈঠার টান, জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, জলঘূর্ণির অদ্ভুত রেশ পাঠকের মর্মমূলে গেঁথে যেতে থাকে। নৌকা চলার শব্দ পাঠকের বোধে তীব্র-তীক্ষè নাড়া দেয়। এর বর্ণনাও জল-জীবনের প্রবহমানতা তৈরি করে। নতুন নতুন শব্দ তিনি অবলীলায় প্রয়োগ করেন – যেমন র্পকারে (প্রকারে), গভ্ভে (গর্ভে), লরিদশা (বিপদ-আপদ), বাইস্যা (বর্ষা), উইন্যা (শুকনা), মইদ্যে (মধ্যে), ঢক (নমুনা), কম্ম (কর্ম), খুদা (খোদা), চক্ষের (চোখের) ইত্যাদি। উপন্যাসটির দুই উল্লেখযোগ্য চরিত্রই বলা যায় ঘাঘরা আর এর নাগালে আসা বিভিন্ন মিথ, লোককথা, দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা।
তার ভাবনার পাটাতনটি
বাস্তবতাঘেঁষা আর এর প্রকাশভঙ্গি স্বকল্পধাঁচের। এর প্রচ্ছদে পুরান শব্দটি স্বপ্ন থেকে আলাদা অর্থাৎ লেখা হলো স্বপ্ন পুরান। আবার ব্যাককভারসহ অন্য চার জায়গায় (ইংরেজিতেও) লেখা হলো স্বপ্নপুরান। এই পুরান তো পুরাতন বা পুরনো অর্থেই? নাকি মিথের আবহে পোড়া নদীর জীবনে বা স্বপ্ন পূরণ (পরিপূর্ণ) অর্থেই এর নামকরণ করা হলো? পোড়া নদীর স্বপ্ন কিন্তু পূরণ হওয়ার কোনো লক্ষণই দেখা গেল না। এ ধরনের বিভ্রম কেবলই তৈরি হচ্ছে। উপন্যাসটি শেষ পর্যন্ত হতবিহ্বলতার বহুমাত্রিক বিভ্রমই বহন করে।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.