নারীর জন্যে বিশেষ আইন শিকল ছাড়া কিছুই নয়

‘এই শিকল পরা ছল রে মোদের

শিকল পরা ছল

এই শিকল পরেই শিকল তোদের

করবো রে বিকল।’

        – নজরুল ইসলাম

      পূর্বকথা

ন্যায়বিচার, সমতা ও সম-অধিকারের দাবি যুগ যুগ ধরে নারী তুলেছে সংসারে, সমাজে, রাষ্ট্রে। কিন্তু পেয়েছে বিশেষ আইন, যা প্রতি ক্ষেত্রে নারীর প্রতি নিষেধাজ্ঞা ছাড়া কিছুই নয়। মূলধারা থেকে নারীকে বিচ্ছিন্ন করেছে এই আইন। নারীর প্রতি বঞ্চনা, লাঞ্ছনা, অত্যাচারের বিষয়ে বিক্ষুব্ধ পাশ্চাত্য ও বাঙালি নারী-পুরুষের কণ্ঠ শুনতে পাই তাঁদের লেখায়, প্রচারপত্রে, ভাষণে, প্রবন্ধে, গ্রন্থে, খনার বচনে, চর্যাপদে, লোকজ সাহিত্যে, আত্মকথায়, গল্প-উপন্যাস-নাটকে এবং সাময়িকপত্রে। সাহিত্যে ফুটে উঠেছে বাঙালি নারীর ওপর যুগ যুগ ধরে চলে আসা অবিচার-অত্যাচারের কাহিনী।১ এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদও হয়েছে যুগ যুগ ধরে।২

পাশ্চাত্যের নারী-জাগরণের ইতিহাসে প্রথম লিখিত তথ্য বলে উল্লিখিত ‘ফিমেল ওরেশনস’ (১৬৬২) প্রবন্ধে মার্গারেট লুকাস (ওলন্দাজ) বলেছেন, ‘পুরুষ আমাদের বিরুদ্ধে দারুণ বিবেচনাহীন ও নিষ্ঠুর আচরণ করে, ওরা সব ধরনের স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে কিন্তু আমাদের বেলায় অবরোধ সৃষ্টি করে, মেয়েদের সঙ্গেও মিশতে দেয় না।’৩ মেরি অ্যাসটেল (ব্রিটিশ) ‘রিফ্লেকশনস আপন ম্যারেজ’ (১৭০০) প্রবন্ধে বলেছেন, ‘যদি সব মানুষই জন্মগতভাবে স্বাধীন তবে নারী কেন জন্ম থেকে দাসী!’৪

বিবি তাহেরন নেসা ‘বামাগণের রচনা’য় (১৮৬৫) বলেছেন, ‘হে দেশীয় সভ্য মহোদয়গণ! আপনারা আর স্ত্রীলোকদিগকে বিদ্যাশিক্ষা দিতে উদাসীন থাকিবেন না। যদি এ ধরাধামকে আপনাদের প্রকৃতই সুধাধাম দেখিতে ইচ্ছা থাকে তবে অগ্রে আপনাদের স্ত্রীগণকে বিদ্যাভূষায় ভূষিত করিতে চেষ্টা পান।’৫

রামমোহন রায় বলেছেন (১৮১৯), ‘স্বামীর গৃহে প্রায় সকলের পত্নী দাস্যবৃত্তি করে।’৬

প্রথম আত্মকথা রচয়িতা রাসসুন্দরী দেবী আমার জীবন (১২৮৩) গ্রন্থে বলেছেন বিয়ের পর তাঁর মানসিক অবস্থার কথা;

‘এখন কখন মনে পড়ে সেই দিন

পিঞ্জরেতে পাখী বন্দী জালে বন্দী মীন। …

… লোকে আমোদ করিয়া পাখী পিঞ্জরে বন্ধ করিয়া রাখিয়া থাকে। আমার যেন সেইদশা ঘটিয়াছে। আমি ঐ পিঞ্জরে এ জন্মের মতো বন্দী হইলাম; আমার জীবদ্দশাতে আর মুক্তি নাই।’৭ এরকম কথাই ভিন্ন সময়ে বলেছেন রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২), লীলানাগ (১৯০০-৭১), শামসুন্নাহার মাহমুদ (১৯০৮-৬৪), প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার (১৯১১-৩২), সুফিয়া কামাল (১৯১১-৯৯), দৌলতননেসা (১৯২২-৯৭) প্রমুখ।৮

এই অবস্থা থেকে মুক্তির লক্ষ্যে এঁরা সকলেই দাবি করেছেন নারীর সমতা, মর্যাদা, সম-অধিকারের আইন। সাম্প্রতিককালেও সেই দাবিতে নারী-আন্দোলন চলেছে এবং নারীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামও চলেছে। বিশেষ বিশেষ আইন প্রণয়ন করে যুগে যুগে নারীর অধিকার দেওয়ার কথা বলে শুভঙ্করের ফাঁকি দিচ্ছে রাষ্ট্র ও সরকার। নারীর জন্যে বিশেষ আইন সম-অধিকার ও মর্যাদা দেয় না। বরং নিষেধাজ্ঞার পরাকাষ্ঠা দেখায়।

সেটি খুঁজে বের করতেই এই লেখার অবতারণা।

১. পাশ্চাত্যে নারীর অধিকার দেওয়ার নামে অধিকার হরণ

১৮৭৭ সালে ইউরোপে প্রথম শ্রমিক-সম্মেলনে নারীদের কাজের দাবির বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত হয় যে, ‘গৃহেই নারীর স্থান, পুরুষের দায়িত্ব হচ্ছে তাকে রক্ষা করা।’ শ্রমজীবী পরিবারের দারিদ্র্যপীড়ন, সন্তানের মৃত্যু, প্রসূতিমৃত্যু বাড়তে থাকে।৯

ফরাসি বিপ্লবে (১৭৮৯) নারীর অংশগ্রহণ ইতিহাসে স্থান পেলেও ১৭৯৩ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত কনভেনশনে ঘোষিত ‘মানুষের অধিকার’-এ নারী ও পুরুষের সমান অধিকার, নারীর কাজের ও শ্রমের অধিকার (যা সে-সময়ে অস্বীকৃত ও নিষিদ্ধ ছিল প্রচলিত প্রথা হিসেবে) বিষয়ে বক্তব্য স্থান পেল না। এই অবিচারের বিরুদ্ধে নারী-আন্দোলন শুরু হলে ফ্রান্সের সংসদীয় সদস্য অলি দ্য গুঁজে, লইজ লাকঁব ও অন্য অনেকের প্রচেষ্টায় কনভেনশনের ১৭ নং ধারায় ‘নারীর অধিকার’ যুক্ত হলো। আইনত নারীকে মানুষের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হলো।১০

অভাবের তাড়নায় গর্ভপাত করতে বাধ্য হতো সংসার থেকে বিতাড়িত নারী। ধর্ষণ করে, অত্যাচার করে অন্তঃসত্ত্বা নারীকে সামাজিক-আর্থিক অসহায়ত্বে নিক্ষেপ করে পুরুষ যখন পালিয়ে বাঁচে তখন নারীকে বহন করতে হয় অপবাদ, ক্ষুধা, মৃত্যু। গর্ভপাত করতে বাধ্য হয় নারী। ১৭৯৩ সালে ফরাসি আইন প্রণীত হলো যে, পরিত্যক্ত অনাথ শিশুদের প্রতিপালনের দায়িত্ব সরকার নেবে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে সরকার অত্যাচারী নারীদের সহায়তা করেছে, কিন্তু তা নয়। সরকার বাঁচাতে চেয়েছে ধর্ষণকারীদের- তাদের অপরাধী না করে। কিন্তু নির্যাতিত নারী গর্ভপাতের পথই বেছে নেয়। ১৮০৩ সালে সেজন্যে গর্ভপাত নিষিদ্ধ এবং গর্ভপাতের জন্যে নারীর মৃত্যুদণ্ডের আইন প্রণীত হয়।১১

সার্বজনীন ভোটাধিকারের দাবিতে নারী-আন্দোলন তীব্র হলে ১৮৩২ সালে ইংল্যান্ডে ‘পার্লামেন্টারি রিফর্ম অ্যাক্ট’-এ ঘোষিত হলো নারীর ভোটাধিকারের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা।১২

দাসপ্রথা-বিরোধী আন্দোলনে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও কৃতিত্বের পরে দেখা গেল দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হয় কিন্তু নারীদের দাসত্বমোচন হলো না। ১৮৪৮ সালে (১৯ ও ২০ জুলাই) আমেরিকার সেনেকা ফলস্-এ নারী সম্মেলনে বলা হলো যে, পুরুষের সঙ্গে সংগ্রামে-আন্দোলনে অংশ নেবার পরও নারীর প্রতি পুরুষের আচরণ বৈষম্যপূর্ণ থেকে গেল। মানবসমাজের ইতিহাস হচ্ছে নারীর বিরুদ্ধে পুরুষসমাজের নিরন্তর আঘাত, অত্যাচার ও বাধা দেওয়ার ইতিহাস। সিদ্ধান্তগ্রহণের একক দায়িত্বে থাকা পুরুষ স্বার্থপরের মতো নারীর প্রতি নানা নিষেধাজ্ঞা জারি করলো। নারীর ভোটাধিকার নিষিদ্ধ হলো। নারীসমাজের মতামত ছাড়াই পুরুষসমাজ এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে নারীর জন্যে বিশেষ আইন করে তা মানতে বাধ্য করেছে নারীসমাজকে।১৩

৫২ বছর ধরে ভোটাধিকারের জন্যে নারীসমাজ একাদিক্রমে সংগ্রাম করেছেন। ভোটাধিকারের শর্ত ছিল বি.এ ডিগ্রিধারী ও সম্পত্তিবান হতে হবে। অথচ উচ্চশিক্ষাক্ষেত্রে নারীর প্রবেশাধিকার ছিল বাধাগ্রস্ত, সম্পত্তির মালিকানা নারীর জন্যে ছিল অলীক স্বপ্ন। এই দুই অনধিকারের শর্তে নারীর ভোটাধিকারের বিষয়ে বিবেচনার কথা বলা হলো। নিউজিল্যান্ডের নারীরা প্রথম সীমিত ভোটাধিকার পেয়েছে ১৮৯৩ সালে। তা কার্যকর হয় ১৯২৮ সালে। এখনও বিশ্বের দু’একটি দেশে নারীর ভোটাধিকার নেই।১৪

নারীকে মানুষ বলে সমাজ, রাষ্ট্র পরিবার আইন স্বীকার করে না। তাই জাতিসংঘ ঘোষিত ‘মানবাধিকার ঘোষণাপত্র’ (১৯৪৮) নারীর মানবাধিকারের বাস্তবায়ন ঘটাতে পারেনি। নারী-আন্দোলনের ফলে ১৯৭৯ সালে ‘সিডও সনদ’ বা ‘নারীর প্রতি বৈষম্যদূরীকরণ সনদ’ প্রণীত করে জাতিসংঘ থেকে নারীর মানবাধিকারের বাস্তবায়ন ঘটাতে হচ্ছে এবং ১৯৯৩ সালে ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত মানবাধিকার সম্মেলনে ‘নারীর অধিকার মানবাধিকার’ দাবিটি সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।১৫ বেইজিং সম্মেলনের ঘোষণাপত্রে (১৯৯৫) এবং বেইজিং +৫-এর ঘোষণাপত্রে (২০০০) নারীর মানবাধিকারের ওপর জোর দিতে হচ্ছে।

২. বাঙালি নারীর অধিকার দেওয়ার নামে অধিকার হরণ

সতীদাহ, কুলীন বহুবিবাহ, মুসলিম বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ ও অবরোধের মতো নিষ্ঠুর প্রথা কয়েক শতক ধরে চলায় বাঙালি নারীর দুঃসহ, পরাধীন, নির্যাতিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, আবদুল লতিফ, আবুল হুসেন, সরোজিনী নাইডু, রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, নওশের আলী খান ইউসুফজয়ী, শামসুন্নাহার মাহমুদ প্রমুখ সতীদাহ, যৌতুকপ্রথারোধে এবং বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, নারীশিক্ষা, বিধবাবিবাহ, সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, ভোটাধিকার ইত্যাদি বিষয়ে নারীর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে আন্দোলন করেছেন।১৫

ক্রমান্বয়ে সতীদাহপ্রথা বন্ধ-আইন (১৮২৯), জন্ম-মৃত্যু ও বিবাহ-রেজিস্ট্রেশন-আইন (১৮৮৬), হিন্দু বিধবা বিবাহ-আইন (১৮৫৬), পেনাল কোড (১৮৬০), বিবাহ-বিচ্ছেদ আইন (১৮৬৯), খ্রিষ্টান বিবাহ-আইন (১৮৭২), বিশেষ বিবাহ-আইন (১৮৭২), সাক্ষ্য-আইন (১৮৭২), জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধীকরণ-আইন (১৮৭৩), বিবাহিত নারীর সম্পত্তির আইন (১৮৭৪), সন্তানের অভিভাবকত্ব-আইন (১৮৯০), সহবাস সম্মতি বিল (১৮৯২), বিদেশী বিবাহ-আইন (১৯০৩), সিভিল-আইন (১৯০৮), বাল্যবিবাহ রোধে সারদা আইন (১৯২৯), হিন্দু উত্তরাধিকার-আইন (১৯২৯), মুসলিম ব্যক্তি-আইন বা শরিয়ত-আইন (১৯৩৭), মুসলিম বিবাহ-আইন বাতিল (১৯৩৯), মাতৃত্ব-সুবিধা-আইন (১৯৩৯), অনাথ ও বিধবা-আশ্রম-আইন (১৯৪৪), হিন্দু বিবাহিত নারীর ভিন্ন আবাসস্থল ও ভরণপোষণ-আইন (১৯৪৬) প্রণীত হয়েছে।১৬ ১৯১৯ সালে ভারতের নারীসমাজ সীমিত ভোটাধিকার পেয়েছে এবং ১৯৩৫ সালে পেয়েছে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকার। দেশবিভাগের পরে ১৯৪৭ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের নারীসমাজ ভোটাধিকার পেয়েছে এবং ১৯৭২ সালের পরে বাংলাদেশের নারীসমাজ তা অর্জন করেছে।১৭

নারী-পুরুষের সার্বজনীন সমতা ভোটাধিকার আইনে স্বীকৃত। পতিতাদের ভোটাধিকার স্বীকৃত। সংবিধানেও মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে নানাবিধ পীড়নমূলক আইনে পতিতাদের জন্যে এফিডেবিট বাধ্যতামূলক করা, থানা-পুলিশের কাছে রেকর্ড রাখা, সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করা চলছেই। এইডসের ঝুঁকি হিসেবে পতিতাদের চিহ্নিত করা হচ্ছে। ভোক্তা-পুরুষ ঝুঁকির চিহ্নিতমুক্ত থাকছে।১৮

এই আইনগুলোর মধ্যে ভোটাধিকারের আইন বাদে অন্য সবই পারিবারিক।

পারিবারিক আইনগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে সিভিল ও ক্রিমিনাল কোডের সঙ্গে এই বিশেষ আইনগুলোর মিল নেই। সিভিল ও ক্রিমিনাল কোডের মধ্যে নাগরিকের বিরুদ্ধে অপরাধের সাজামূলক আইন অন্তর্ভুক্ত। আইনপ্রয়োগের ত্রুটির জন্যে এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক-ধর্মীয় অপব্যাখ্যার জন্যে নারীর বিরুদ্ধে অপরাধকে সার্বজনীন ক্রিমিনাল কোডের আওতাভুক্ত মনে করা হয় না। পারিবারিক অধিকারবঞ্চিত এদেশের নারীসমাজ অধিকার পাওয়ার জন্যে আন্দোলন শুরু করলে ১৯৬১ সালে ‘মুসলিম পারিবারিক আইন’ প্রণীত হয়। মূলত এই আইনে বহুবিবাহ নিয়ন্ত্রণে স্ত্রীর অনুমতির বাধ্যবাধকতা যুক্ত হয়েছে এবং বাবা বেঁচে থাকাকালে বিবাহিত সন্তানের মৃত্যু হলে তার সন্তানরা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হবে না- এই অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই অধিকারগুলো থেকে মানুষ হিসেবে নারী ও শিশুর বঞ্চিত থাকার কথা নয়। নারীকে মানুষ বলে গণ্য করা হয় না। তাই মানুষের ও নাগরিকের অধিকারের বাইরে বিশেষ আইনের একটি গণ্ডি টেনে নারীর অধিকার দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের সংবিধানে নারীর মৌলিক সম-অধিকার নিশ্চিত হলেও১৯ বাস্তবে তা প্রযোজ্য হয় না।

বাস্তবতা এটাই যে, যুগ যুগ ধরে নারী বঞ্চিত হওয়ায় পারিবারিক, সামাজিক, শিক্ষাগত, প্রশাসনগত, রাজনৈতিক বিশেষ-আইন প্রণয়ন করে সেই ক্ষেত্রে সমতা তৈরির দাবি নারী-আন্দোলন থেকে উত্থাপিত হয়। বিশেষ আইনগুলো বৈষম্য-পীড়িত সামাজিকীকরণের দোষে দুষ্ট হয়ে প্রণীত হয়। সেইসঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয়। নাগরিক অধিকারের ধারাও সংশোধিত হয় না। মূলধারার আইনে নারীর প্রতি বঞ্চনা অব্যাহত থাকে। নারীর বিরুদ্ধে ফতোয়া দেওয়া বন্ধ করতে নারীসমাজ আইনের দাবি তুলেছে। সংবিধানের ৩৫ ধারার ৪৩ অনুচ্ছেদ এবং বাংলাদেশের প্রচলিত দণ্ডবিধির ৫০৮ ও ৫০৯ ধারায় বলা হয়েছে ফতোয়া দিয়ে আইনবিরোধী জোর খাটানো শাস্তিযোগ্য অপরাধ।২০ এই ধারায় নারীর প্রতি ফতোয়া দেওয়া অপরাধ বলে গণ্য হচ্ছে না। নারীকে একটা বিশেষ গণ্ডিতে আবদ্ধ করে রাখার জন্যে বিশেষ আইনের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের ব্যক্তি-আইন, পারিবারিক আইন, শ্রম-আইন, শিক্ষা-আইন, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আইন, অপরাধ দমন-আইন, যৌতুকনিরোধ-আইন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন-আইন ২০০০, সংসদে নারীর সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন বিধি- প্রভৃতি নারীসমাজকে প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে।

সর্বশেষ নারীনির্যাতন দমন-আইনেও ধর্ষিত নারীর ওপরেই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে ধর্ষণ-প্রমাণের দায়। সন্তান-বহনের দায়। গর্ভপাত নিষিদ্ধ থাকায় ধর্ষণজনিত সন্তানকে বহন করতে হবে নারীকে। ধর্ষণকারী পিতৃত্বের মহত্বে ভূষিত হচ্ছে। ধর্ষণকারীর সঙ্গে ধর্ষিতার বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। পুরুষের বহুবিবাহ আইন সম্মত থাকায় এবং তালাক দেওয়া পুরুষের জন্যে সহজতর হওয়ায় এ ধরনের অপআইন নারী নির্যাতন কমাচ্ছে না, বরং বাড়িয়ে চলেছে।

আন্তর্জাতিক নারীবর্ষ ১৯৭৫, নারীদশক ১৯৭৫-১৯৮৫ এবং ১৯৮৫-১৯৯৫; নারী সম্মেলন ১৯৯৫, নারীদশক-উত্তর পাঁচবছর + পাঁচবছর ১৯৯৫-২০০৫; সিডও সনদ ১৯৬৭, নারীর মানবাধিকার সনদ ১৯৯৩, ধরিত্রী সম্মেলন ১৯৯৪-এর ধারাগুলো পর্যালোচনা করলে জানা যায় যে, পাশ্চাত্যে ও প্রাচ্যে নারীর মর্যাদা এবং অধিকার আইনত প্রান্তিকে অবস্থান করছে।

কৃষিযুগের সূচনাকালে নারীকে গৃহের গণ্ডিতে আবদ্ধ করে, বাধ্যতামূলক একগামী করে পুরুষের বহুগামিতা, পিতৃধারায় সন্তানের পরিচয়, সম্পত্তিতে নারীর অধিকারহীনতা, সতীত্ব রক্ষার দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখনো সেই ধ্যান-ধারণা, সংস্কৃতি ও আইন বিশ্বের নারী-সমাজকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রেখেছে।

শেষ কথা

দেশের প্রচলিত আইন সংশোধন করে, সংবিধানের প্রযোজ্য ও প্রয়োজনীয় ধারা সংশোধন করে নারীকে পূর্ণ নাগরিকের মর্যাদা দিয়ে মূলধারার আইনে নারী-পুরুষ ভেদাভেদহীন, শোষণহীন, জেন্ডার সমতাপূর্ণ অধিকার সংযুক্ত করতে হবে। এই উত্তরণ ছাড়া নারীর শৃঙ্খলমোচন সম্ভব হবে না।

সূত্র-নির্দেশ

১. আনিসুজ্জামান, বাঙালি নারী: সাহিত্য ও সমাজে, ঢাকা, সাহিত্য প্রকাশ, ২০০০।

২. মালেকা বেগম, আজিজুল হক, আমি নারী, ঢাকা, ইউপিএল, ১৯৯৯।

৩. Gerda Lerner, The Majority Finds its Past : Placing Women in History. London, Oxford University Press. 1979, P. 10.

৪. Mary Astell, Reflections Upon Marriage, London; 1700 D×…Z Gerda Lerner, Hs

৫. উদ্ধৃত, গোলাম মুরশিদ, রাসসুন্দরী থেকে রোকেয়া: নারী প্রগতির একশ বছর, ঢাকা : বাংলা একাডেমী, ১৯৯৩, পৃ. ১০৪।

৬. রামমোহন রায়, ‘সহমরণ বিষয়ে প্রবর্ত্তক ও নিবর্ত্তকের দ্বিতীয় সম্বাদ’, অজিতকুমার ঘোষ-সম্পাদিত রামমোহন রচনাবলী, কলকাতা : হরফ, পুনর্মুদ্রণ: ১৯৯৮; পৃ. ২০২।

৭. রাসসুন্দরী দেবী, আমার জীবন, নরেশচন্দ্র জানা-সম্পাদিত আত্মকথা, প্রথম খণ্ড, কলকাতা; অনন্যা প্রকাশন, ১৯৮১, পৃ. ১৭।

৮. মালেকা বেগম, বাংলার নারী আন্দোলন, ঢাকা, ইউপিএল, পুনর্মুদ্রণ ২০০১।

৯. আউগুস্ট বেবেল, নারী, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ, অনুবাদ : কনক মুখার্জী, কলকাতা, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি, ১৯৮৩, পৃ.১২।

১০. ঐ।

১১. ঐ।

১২. Eli“abeth C. Stanton, Susan B. Anthoû, and Matilda J. Gage, editors, History of Woman Suffrage. Rochester, Nwe York; Charles Mann, Vol. 1 (1881), D×…Z Alice S. Rossi, The Feminist Papers. Boston; Northern University Press, 1988. P. 413-470. , Reprinted 1988. ১৩. ঐ, পৃ. ৪১৬।

১৪. ঐ।

১৫. The United Nations and The Advancement of Women, 1945-1995, Nwe York, United Nations, 1995, P. 4-6.

১৬. মালেকা বেগম, বাংলার নারী আন্দোলন, প্রাগুক্ত।

১৭. Women lwa Code (1956-1946), Fawyia Karim Firoye, Dhaka, Institiute for Lwa and Developemnt, 1996|

১৮. Barbara J. Nelson and Najma Chowdhury, Edited, Women and Polities World Wide, London, Yale University Press, 1994, P. 366 and 98।

১৯. র্কুরাতুল-আইন-তাহ্মিনা ও শিশির মোড়ল, জীবনের দামে কেনা জীবিকা, ঢাকা, সেড, ২০০০।

এবং ইলাচন্দ্র, ‘যৌনকর্মী এবং ডিএমপি ৭৪ ধারা’, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বুলেটিন, ফতোয়া, ঢাকা, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, ২০০১,        পৃ.-৯।