অক্টাভিও পাজের জীবন ও সাহিত্য

চুরাশি বছর বয়সে লোকান্তরিত হলেন মেক্সিকান কবি অক্টাভিও পাজ। ১৯৯০ সালে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অক্টাভিও পাজের মৃত্যুর ফলে লাতিন আমেরিকার এ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবি ও গদ্য-লেখকের প্রস্থান ঘটল। লাতিন আমেরিকার সাহিত্য-জগতে অক্টাভিও একদিনে উঠে আসেননি। তাঁকে তাঁর এই আসনে উঠে আসতে হয়েছিল অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে। তাঁর পরিচিতি শুধু কবি বা গদ্য-লেখক হিসেবে একটি নির্দিষ্ট ফ্রেমেও আটকে থাকেনি। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক, কূটনীতিক এবং সেই সাথে একজন গবেষক এবং রাজনীতিবিদও। পাবলো নেরুদা ছাড়া আর সব সাহিত্যিককে তিনি বোধহয় অতিক্রম করতে পেরেছিলেন তাঁর কবিতার আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট দিয়ে। পাজের কবিতায় যেমনি আছে বৈচিত্র্যের সমাবেশ, তেমনি আছে এক গভীর বিশালতা। তিনি এটি খুব ভালোভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, একজন লেখককে কীভাবে সত্যিকারের লেখক হয়ে উঠতে হয়। তাই তাঁর বিষয়কে তিনি এমনভাবে উপলব্ধি করতে চাইতেন যাতে করে উঠে আসত এক অচেনা অনুভব। সময়ের সময়হীনতার মধ্যে প্রবেশ এবং সময়ের ভেতরের ও বাইরের মুহূর্তের উপলব্ধি তাঁর কবিতায় এক নতুন মাত্রা সংযোজিত করত। কবিতার স্বার্থে কবিতার সঙ্গে সময় কিংবা ইতিহাসের মিলন ঘটানোর প্রচেষ্টায় তিনি লিখে গেছেন আজীবন।

তাঁর লেখা নির্দিষ্ট ও বিশেষ কোনো স্থানের ভেতর আবদ্ধ থাকেনি, চিন্তা বা আন্দোলনের কাছে আত্মসমর্পণ করেনি কখনো। তাই পাঠকমহলে তাঁর কবিতা যতখানি স্থান করে নিয়েছে ঠিক ততখানি তাঁর গদ্যও। যে-কোনো বিষয় নিয়ে পাজ লিখতে পারতেন যেমন সহজে, তেমন আলোচনাও করতে পারতেন। তাঁর কল্পনাশক্তি সবসময়ে ছিল সঞ্চরণশীল। বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে তিনি যেতে পারতেন খুব সহজে। তাঁর লেখা ছিল প্রথাবিরোধী। তিনি ভালোভাবে জানতেন কীভাবে একটা লেখা সম্পন্ন করতে হয় এবং তা পাঠকমহলে পৌঁছে দেওয়া যায়। নানা বিপরীতমুখী চিন্তার স্রোত তাঁকে নাড়া দিত। প্রথাগত কর্ম ও ভাষারীতির বন্ধন থেকে তিনি মুক্তি চাইতেন সবসময়। এক চিন্তা থেকে অন্য চিন্তার স্রোতে বারবার তাঁর সঞ্চারপথ সরে যেত। তাঁর হৃদয়ে ও শরীরে তাই ঘটতো সবসময়ে সত্যের আবির্ভাব। সবসময়ে তিনি বর্তমান সময়ের মধ্য থেকে অন্যস্বরে কিছু বলেছেন। লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে অক্টাভিও পাজ তাই আজো একজন প্রবাদপ্রতিম কবি ও গদ্য-লেখক। ১৯১৪ সালে  মেহিকো শহরে অক্টাভিও পাজ জন্মগ্রহণ করেন। আর মাত্র সতেরো বছর বয়সে থেকে তিনি স্থানীয় বিভিন্ন পত্রিকায় শুরু করেন লেখালেখির কাজ। শুরুতে যেসব কবিতা তিনি লিখতেন সেসবের ভেতর তাঁর নিজস্বতা থাকত খুব কম। বিখ্যাত কিছু কবি যেমন সরজুয়ানা ইনম, দেলাক্রুজ কুয়েভেদো প্রমুখ কবি-

লেখকের প্রভাব পড়ত তাঁর লেখায়। আর সেইসব লেখা দিয়ে তাঁকে চিনবার মতো তেমন কিছু থাকতো না। যখন পাজের বয়স ২৩ বছর তখন স্পেনে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। পাজ সমর্থন করতেন রিপাবলিকানদের এবং সে-সময়ে তিনি ঘুরে আসেন মাদ্রিদ, আন্দালুসিয়া, ভ্যালেনসিয়া। ইতো-মধ্যে তাঁর প্রথম কবিতার বই লুনা সিলভেস্রে (গ্রাম্য চাঁদ) প্রকাশিত হয় এবং তা যথেষ্ট সাড়া জাগায়। গৃহযুদ্ধশেষে তিনি ফিরে এসে টলার (দীর্ঘতর) নামে একটি রিভিউ পত্রিকা প্রকাশনা শুরু করেন। পত্রিকাটি দ্রুত আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করে, কারণ এই পত্রিকায় মেহিকোর লেখকদের সঙ্গে অনেক স্প্যানিশভাষী লেখকও নিয়মিত লিখতেন। এই সময়ে পাজের আরেকটি কবিতার বই রেয়ার দেল হোমযেত্র (তোমার স্বচ্ছ ছায়ার নিচে) প্রকাশিত হয়। তারপর একে একে দুবছরের মধ্যে পাথর ও ফুলের মধ্যে কবিতা ও পৃথিবীর উপকূলে নামে দুটি কবিতার বই বের হয়।

১৯৪৩ সালে পাজ লেখাপড়া নিয়ে দুবছর ব্যস্ত থাকেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ১৯৪৫ সালে তিনি ফিরে আসেন পারীতে এবং যোগ দেন মেহিকোর দূতাবাসে। এখানেই পরিচয় হয় সুররিয়ালিস্টি কবিদের সঙ্গে এবং পাজও যোগ দেন সুরারিয়ালিস্টি আন্দোলনে। পাজের প্রথম দিককার লেখাগুলোয় যে-একঘেয়েমি ছিল এই আন্দোলনে যোগ দেওয়ার ফলে তাঁর লেখা মোড় নেয় অন্যদিকে এবং তিনিও সম্ভবত বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর প্রথম দিকের লেখার সাথে বর্তমানকালের লেখার ফারাক। ১৯৪৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আরেকটি কবিতার বই। ১৯৫০ সালে তাঁর বিখ্যাত গদ্যবই লাবেরিনতো দেলা সোলেদাদ (নিজর্নতার গোলকধাঁধা) প্রকাশিত হয়। এবং এই বইটি দ্রুত তাঁকে বিখ্যাত করে তোলে। রাতারাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর নাম এবং ইউরোপের প্রায় সবভাষায় তা অনূদিত হতে থাকে। এর ঠিক পরের বছর তাঁর আরেকটি গদ্যধর্মী কবিতার বই ঈগল (সূর্য) নামে প্রকাশিত হয়। এই লেখাগুলোতে সুররিয়ালিজমের ভাব প্রত্যক্ষভাবে ছাপ ফেলে।

১৯৫২ সালে পাজ ভারত ও জাপান সফর করেন। ভারতে তিনি রাষ্ট্রদূত হিসেবে ছিলেন ছয় বছর। এই সময়ে তিনি সমস্ত ভারত ঘুরে দেখেন এবং পরিচিত হন এখানকার বিখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ – কেউই বাদ যাননি তাঁর তালিকা থেকে। এখানকার সংস্কৃতি তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। তিনি এ-সময়ে এখানকার শিল্পকলা, দর্শন এবং সাহিত্য নিয়ে গভীর মনোযোগ-সহকারে পড়াশোনা করেন। এবং সেই সময়ে এখানকার ধর্মীয় প্রথা, মিথ, সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে গভীর অনুসন্ধানও চালান, যার প্রতিফলন কাব্যগ্রন্থ ইস্টার্ন স্লোপ-এ (পূবের ঢাল) ছায়া ফেলে গভীরভাবে। তাঁর প্রাচ্যদেশের অভিজ্ঞতার কথা তিনি এখানে বর্ণনা করেন। পাশ্চাত্য কবি হয়েও প্রাচ্যধারাকে তিনি অতি আগ্রহের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন বিখ্যাত সুইডিশ কবি গুনার একেলোফ ও মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ এবং গ্যারি গ্লাইডারের মতো।

পাজের প্রথম দিককার অর্থাৎ ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে যা রচনা করেছেন তাতে তাঁর কল্পনাশক্তির কিছুটা পরিচয় পাওয়া গেলেও গভীরতার তেমন পরিচয় মেলে না। এই সময়ে তাঁর রচনায় মূলত যৌনতা, অস্থিরতা এবং নিঃসঙ্গতা বেশি প্রাধান্য পেয়েছিল। ১৯৩৮ সাল থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত তাঁর লেখা কবিতা নিয়ে দোষী দরজা নামে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। এতে তাঁর লেখা এবং বিষয়ে কিছু দুর্বলতার ছাপ পাওয়া গেলেও তাঁর ভেতর যে এক আশ্চর্য প্রতিভা আছে তার বিরাট ইঙ্গিত পাঠকমহলে তখন ধরা পড়েছিল।

১৯৪৮ থেকে ১৯৫৪ সালের লেখাগুলোতে পাজ একটি বিরাট পরিবর্তন আনেন। দাঁড় করেন একটা নতুন ফর্ম, নতুন স্টাইল, যাতে করে তৈরি হয় পাজের নিজস্বতা। প্রতীকীবাদ ও সুররিয়ালিজম তাঁর এই সময়কার লেখাগুলোয় যোগ করে এক নতুনমাত্রা এবং রহস্যময়তা। একথা মানতে হবে যে, পাজ এ-সময়ে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। এই সময়েই তাঁর বিখ্যাত কবিতার বই পিয়েদরা দে মেল (সূর্য-পাথর) প্রকাশিত হয়। এটি সম্ভবত এই শতাব্দীর অন্যতম দীর্ঘ কবিতা। এখানে পাজ যেন তাঁর নির্দিষ্ট ধারা, ভাষা-প্রয়োগ ও বিষয় থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন। সুররিয়ালিস্টিক দলে যে তিনি যোগ দিয়েছেন এখানে তার প্রমাণ পাওয়া যায় পুরোমাত্রায়। বলা চলে এটি পাজের উল্লেখযোগ্য সাফল্য। এখানে যেমন আছে মিথের ব্যবহার তেমনি আছে ঐতিহ্য ও উদ্ভাবনাশক্তির। একে যেন অন্যকে জড়িয়ে ধরে আছে। তাঁর ভাষা ও ভালোবাসার যে-রূপ এখানে প্রকাশ পেয়েছে তেমনিভাবে তার প্রকাশভঙ্গিও এখানে ফুটে উঠেছে সমান্তরালভাবে।

১৯৬৮ সালে মেক্সিকো সিটিতে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকের বিরুদ্ধে ছাত্ররা প্রতিবাদ জানালে পুলিশ তাদের ওপর গুলি চালায় – এই  মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক সংবাদ কবি-হৃদয়কে ভীষণভাবে নাড়া দেয় এবং তিনি এর দৃঢ় প্রতিবাদ জানান এবং রাষ্ট্রদূত পদ থেকে পদত্যাগ করে স্বদেশে ফিরে যান জাহাজে করে সমুদ্রপথে। আর এই সমুদ্রপথের যাত্রায় তিনি লিখে ফেলেন দুই উদ্যানের কাহিনী।

১৯৭০ সালে তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে লাতিন আমেরিকার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক পদে নিয়োজিত হন। এক বছর পর পুনরায় তিনি মেহিকোতে ফিরে আসেন এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কবিতার অধ্যাপক হিসেবে কাজ করতে থাকেন। এই সময়ে তিনি বহুবচন নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। পত্রিকাটির বিষয় ছিল রাজনীতি, সাহিত্য ও সমালোচনা। পত্রিকাটি লাতিন আমেরিকার বুদ্ধিজীবী-মহলে দারুণ চমক সৃষ্টি করে। তারপর একে একে প্রকাশিত হতে থাকে কবিতার বই পাঁকে ডোবা শিশুরা, আলোচিত অতীত ও প্রত্যাবর্তন। ১৯৭৯ সালে ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি কবিতা বিভাগে রিডার হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হয় নির্বাচিত কবিতার বই লা মেজর দে অক্টাভিও পাজ এবং গদ্যবই পিনতুরা দে জুয়ান সেরিয়ানো।

১৯৯০ সালে ৭৬ বছর বয়সে পাজ নোবেল পুরস্কারে পুরস্কৃত হন। যদিও ইতোমধ্যে তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্যে বহু পুরস্কার তিনি পেয়েছিলেন। তবুও নোবেল পুরস্কার বিশ্বের দরবারে তাঁকে আরো পরিচিত করে তোলে। আর এ-ও যেন ইঙ্গিত দেয়, সে-বছর পুরস্কার তাঁরই প্রাপ্য ছিল।

১৯৬৪ সালে পাজ পঞ্চাশ বছর বয়সে মারিয়ে জোগে এমিনিকে বিয়ে করেন এবং পারী যাবার পথে এমিনির সাহচর্যে জাহাজে বসে দুই উদ্যানের কাহিনী নামে কবিতার বইটি লিখে ফেলেন।

জীবনের শেষ দিনগুলোয় তিনি ছিলেন একা। বাস করছিলেন ক্যান্সারের সঙ্গে। তবুও তিনি থেমে থাকেননি। অসুস্থ শরীর নিয়ে চালিয়ে গেছেন তাঁর সাহিত্যকর্ম। সবকিছু থেকে আড়াল করে থাকলেও সাহিত্যজগৎ থেকে নিজেকে আড়াল করে রাখেননি। সাহিত্য-পত্রিকা ভুয়েলতা প্রকাশ নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন।

অক্টাভিও পাজ নানাজনের কাছ থেকে কবিতার প্রেরণা পেলেও তাঁর মধ্যে বরাবরই একরকমের নিজস্বতা ছিল। তাঁর প্রধান বিষয় ছিল সময়ের সাথে সমাজ-পরিবর্তন। পাবলো নেরুদার মতো তিনিও চেয়েছেন সমাজ-পরিবর্তন। তাঁর মধ্যেও ছিল মাকর্সবাদ। পৃথিবীর মানুষের গতানুগতিক জীবনযাপনের ছকেবাঁধা চিত্র তাঁকে যন্ত্রণাবিদ্ধ করত। তিনি সবসময়ে চাইতেন উৎপাদন ও বণ্টনব্যবস্থায় পুনর্বিন্যাস। তাঁর কবিতায় একদিকে যেমন আছে বিরাট আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট অন্যদিকে তেমন আছে হৃদয়ের নরম ভাবাবেগ, যেখানে সবসময়ে ফুটে থাকত সংবেদনশীলবোধ ও মানবতাবোধ। মার্কসবাদের প্রভাবে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আরো যেতে হবে অন্য মানুষের জীবনে, সমষ্টিগত জীবনের গভীর নির্জনে।

চুরাশি বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান হলেও বিশ্বের সাহিত্য-জগতে তিনি থাকবেন চিরঅম্লান।