প্রাবন্ধিক আবদুল হক

আবদুল হক (১৯১৮-১৯৯৭) বাংলাদেশের সেরা প্রাবন্ধিকদের একজন – একথা বললে তাঁর লেখকসত্তাকে পুরোপুরিভাবে অনুধাবন করা যায় না। তাঁর লেখকজীবন শুরু হয়েছিল কবিতা, গল্প ও উপন্যাস রচনার মধ্য দিয়ে এবং পরবর্তীকালেও তিনি তাঁর সৃষ্টিশীল উদ্যমকে বিসর্জন দেননি। যদিও একসময় কবিতাচর্চা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন এরূপ আত্মসমালোচনার বশবর্তী হয়ে যে, আধুনিক কবিতা সৃষ্টি করতে তিনি অক্ষম; কিন্ত্ত গল্প-উপন্যাস-নাটক রচনা তিনি অব্যাহত রেখেছিলেন। কিংবা বলা যায়, সৃজনশীলতা ও মননশীলতা তাঁর সৃষ্টিসত্তায় সমন্বিত হয়েছিল। সুগভীর রাজনীতি-সতর্কতা, দেশপ্রেম, ইতিহাসচেতনা ও জাতীয় কর্তব্যবোধই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, সন্দেহ নেই। এছাড়া তাঁর প্রাবন্ধিক সত্তাকে সমৃদ্ধ করেছে বিজ্ঞানমনস্কতা, উদারনৈতিকতা, সংস্কারশূন্য অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও বিশ্বপ্রসারিত জীবনদৃষ্টি।

সর্বাংশে সাহিত্যমনস্ক হওয়া সত্ত্বেও সমাজ-ইতিহাস ও রাজনীতি-সচেতনতার ফলে আবদুল হক আমাদের জাতীয় সংকটের কোনো কোনো শীর্ষমুহূর্তে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনে সক্ষম হয়েছেন। উন্নত চিন্তনত্র্কিয়া, অসামান্য দূরদৃষ্টি ও ইতিহাসবোধের সমন্বয়ে জাতীয় সংকটমুক্তির প্রশ্নে তত্ত্বগত যুক্তি প্রদানে সক্ষম হওয়া সবসময়ই একজন প্রাবন্ধিকের জন্য গৌরবের বিষয়। আমাদের জাতীয় সংকটের এরকম দুটি গুরুত্বপূর্ণ লগ্নের কথা উল্লেখ করা যায় যখন আবদুল হক স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে, প্রবল সাহসিকতা ও ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে, জাতীয় মননমুক্তির আন্দোলনকে অগ্রসর করে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এর একটি আমাদের ভাষা-আন্দোলন; আরেকটি বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলন।

ভাষা-সৈনিক

আমাদের ভাষা-আন্দোলনের ক্ষেত্রে ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সাল দুটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্ত্ত ভাষার বিতর্কটি শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালেরও আগে। এমনকি ১৯৪৭-এর আগস্টে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকশক্তি কর্তৃক ভারতবিভক্তির মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলকে স্বাধীনতা প্রদানেরও আগে শুরু হয়েছিল নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে সে-সম্পর্কিত বিতর্কটি। বিশেষত ১৯৪৭-এর ৩ জুন তারিখে লর্ড মাউন্টব্যাটেন কর্তৃক ভারত-বিভাগের পরিকল্পনা ঘোষণার পর থেকেই শুরু হয় এ-সম্পর্কিত চিন্তা-ভাবনা। ৩ জুনেই বঙ্গবিভাগের বিষয়টি সুনিশ্চিত হয়েছিল। বাঙালি মুসলিম-সমাজের প্রায় শতভাগ লোকই সে-সময়ে পাকিস্তান-আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন; কিন্ত্ত এর অধিকাংশই বঙ্গবিভাগকে সমর্থন করতে পারেননি। সুতরাং এ-নিয়ে লেখক-বুদ্ধিজীবীমহলে তখন এক উত্তেজনাকর পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা ঘোষণার পর নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের বিভিন্ন সমস্যা নিয়েও আলোচনার সূচনা ঘটেছিল। এমন পরিস্থিতিতে যখন প্রচারিত হয় যে, মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করতে আগ্রহী তখন বাঙালি চিন্তাবিদরা বাংলা ভাষার পক্ষে কলম ধরেন।

পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে সে-সময়ে যেসব চিন্তাবিদ উদ্যোগী হয়েছিলেন তাদের মধ্যে অগ্রণী ছিলেন আবদুল হক। রাষ্ট্রভাষা বাংলা সম্পর্কিত আবদুল হকের প্রথম প্রবন্ধটি বেরিয়েছিল ১৯৪৭ সালের ২২ ও ২৯ জুন তারিখে, দুই কিস্তিতে, দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার রবিবাসরীয় বিভাগে। প্রবন্ধের শিরোনামা ছিল : ্লবাংলা ভাষা বিষয়ক প্রস্তাবশ্। তাঁর দ্বিতীয় প্রবন্ধ ্লপাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষাশ্ ছাপা হয়েছিল ১৯৪৭ সালের ৩০ জুন তারিখে, দৈনিক আজাদের সম্পাদকীয় পৃষ্ঠায়। এ বিষয়ে আবদুল হকের তৃতীয় প্রবন্ধ ্লউর্দু রাষ্ট্রভাষা হলেশ্ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৭ সালের ২৭ জুলাই তারিখে ইত্তেহাদে। মিসেস এম.এ.হক ছদ্মনামে তাঁর চতুর্থ প্রবন্ধ বেরিয়েছিল বেগম পত্রিকায় ১৯৪৭ সালের ৩ আগস্ট সংখ্যায় (শিরোনামা : পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা)। অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের পূর্বেই আবদুল হকের এ চারটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল।

বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি নিয়ে অন্য যাঁদের লেখা ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁদের একটি তালিকা কালানুক্রমিকভাবে উপস্থাপন করা হলেই আবদুল হকের অগ্রণী ভূমিকার বিষয়টি স্পষ্ট হবে। তরুণ লেখকদের মধ্যে মাহবুব জামাল জাহেদী ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই তারিখে দৈনিক ইত্তেহাদে ্লরাষ্ট্রভাষা বিষয়ক প্রস্তাবশ্ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ড. জিয়াউদ্দীন উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বিবৃতি প্রকাশ করলে জুলাইয়ের (১৯৪৭) শেষদিকে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দৈনিক আজাদে এক প্রবন্ধে তার বিরোধিতা করে বাংলাকে পাকিস্তানের প্রথম রাষ্ট্রভাষা ও উর্দুকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণের দাবি করেন। ১৯৪৭-এর জুলাই মাসে ঢাকায় মুসলিম লীগের বামপন্থী অংশকে নিয়ে গঠিত গণআজাদী লীগের ম্যানিফেস্টোতে ্লবাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষাশ্ করার দাবি জানানো হয়। ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকায় গঠিত হয় তমদ্দুন মজলিশ। ১৫ সেপ্টেম্বর তারিখে এই সংগঠনের পক্ষে থেকে ্লপাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দুশ্ শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়। ওই পুস্তিকায় কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ এবং আবুল কাসেমের লেখা সংকলিত হয়। কবি ফররুখ আহমদ সওগাত পত্রিকায় ১৩৫৪-র আশ্বিন সংখ্যা (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৪৭) ্লপাকিস্তান : রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্যশ্ শীর্ষক এক প্রবন্ধ লেখেন। নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রকাশিত কৃষ্টি পত্রিকায় ১৩৫৪-র কার্তিক সংখ্যায় (অক্টোবর-নভেম্বর ১৯৪৭) ড. মুহম্মদ এনামুল হক লেখেন জ্ঞপূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষার পরিপ্রেক্ষিতে উর্দু ও বাংলাঞ্চ শীর্ষক প্রবন্ধ। কাজী মোতাহার হোসেন সওগাত পত্রিকায় ১৩৫৪-র অগ্রহায়ণ সংখ্যায় (নভেম্বর-ডিসেম্বর ১৯৪৭) প্রকাশ করেন ্লরাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা সমস্যাশ্ শীর্ষক প্রবন্ধ। একই পত্রিকার ১৩৫৪-র পৌষ সংখ্যায় (ডিসেম্বর ১৯৪৭-জানুয়ারি ১৯৪৮) মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী লেখেন ্লশিক্ষার কথাশ্।

উল্লিখিত লেখকগণ তাঁদের প্রবন্ধসমূহে যে একই ধরনের মত পোষণ করেছেন তা নয়। কেউ বাংলাকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়েছেন, কেউ বাংলা ও উর্দু উভয়কে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে সকলেই একটি বিষয়ে একমত ছিলেন। তা হলো উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের বিরোধিতা করা এবং রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করা। এক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী। তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের আন্তঃপ্রাদেশিক রাষ্ট্রভাষা ও কেন্দ্রীয় সরকারের সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকার করে বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ও শিক্ষার বাহন করার প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন।

রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কিত বিতর্ক বা মতামত বিশ্লেষণ করা আমাদের এ প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের এসব তথ্য পরিবেশন থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, আবদুল হকই প্রথম বাংলা ভাষার পক্ষে প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। আরো বিস্ময়কর তথ্য হলো, এর মাত্র কয়েকমাস আগে (ডিসেম্বর ১৯৪৬) তিনি এমএ পরীক্ষা শেষ করেছিলেন। তাঁর প্রবন্ধ লেখারও একেবারে প্রাথমিক পর্যায় ছিল সেটা। এমন একটি বয়সে জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক ইস্যুতে তাঁর প্রথম কলম ধরার মধ্যে যে সাহস ও দূরদর্শিতার পরিচয় পাওয়া যায় তা অবশ্যই প্রশংসাযোগ্য। পরবর্তীকালে এ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন যে, ্লবাংলা রাষ্ট্রভাষার সপক্ষে লেখা সেই সময়ে আমি একটা অবশ্যকরণীয় কর্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম।শ্ (ভাষা আন্দোলনের আদিপর্ব, মুক্তধারা, তৃ.প্র.১৯৯৫, পৃ.৮)।

প্রাবন্ধিক জীবনের সূচনালগ্নের এসব রচনায় স্বাভাবিকভাবে আবেগের আধিক্য ছিল। তাছাড়া তাঁর বক্তব্যে যথেষ্ট যুক্তি থাকলেও সর্বজনগ্রাহ্য মতামত প্রদানে তখনো তাঁর লেখনী সুতীক্ষ্ম হয়ে ওঠেনি। যেমন তিনি বাংলাকেই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে মত ব্যক্ত করেছিলেন এই যুক্তিতে যে, নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাংলাভাষীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি; কিন্ত্ত পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে বাংলাই যে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হতে পারে না পরবর্তীকালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার দাবিতে পরিচালিত ভাষা আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহেও সে-সত্য উপলব্ধি করা যায়। তবে একথা সত্য যে, ১৯৪৭-এর জুন-জুলাই-আগস্টে রচিত চারটি প্রবন্ধে আবদুল হক পাকিস্তানের বাংলাভাষী জনগণের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বার্থরক্ষায় উদ্যোগী হয়েছিলেন। চল্লিশের দশকে গড়ে ওঠা পাকিস্তান আন্দোলনের তিনি বিরোধী ছিলেন না। কিন্ত্ত দ্বিজাতিতত্ত্বের ভেতরকার অন্ধ ধর্মীয় আবেগও তাঁকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। সমগ্র ভারতবর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে সে-সময়ে নানা বঞ্চনার শিকার সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার দাবি তাঁর কাছে ন্যায়সংগত মনে হয়েছিল, এটুকুই। কিন্ত্ত ধর্মের নামে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে জলাঞ্জলি দেওয়ার প্রশ্নটি ছিল তাঁর কাছে অকল্পনীয়। তাই রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে উর্দুর পরিবর্তে বাংলার পক্ষে কলম ধরতে তাঁকে কোনোরূপ দ্বিধার সম্মুখীন হতে হয়নি। তিনি বাঙালিত্বকে কোনোভাবে বিসর্জন দিতে চাননি। ওই চারটি প্রবন্ধে তিনি কতকগুলো বিষয় স্পষ্ট করেছেন। তা হলো : উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণ বাঙালির আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বার্থ বিঘ্নিত হবে। ভাষাগত স্বাধীনতা না পেলে বাঙালির জন্য স্বাধীনতা হবে ্লআংশিক ও বদ্ধমুখশ্। বাংলা ভাষায় পৌত্তলিকতার প্রভাব সম্পর্কিত অভিযোগের উত্তরে তিনি বলেন, বাংলা হিন্দু-মুসলমানের মিলিত ভাষা এবং বাংলায় মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাছাড়া ভাষার প্রশ্নে পৌত্তলিকতা ও পবিত্রতার প্রশ্ন অবান্তর। তাঁর মতে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য উর্দুর চেয়ে উন্নত।

আবদুল হকসহ অন্য প্রাবন্ধিক ও চিন্তাবিদগণের উল্লিখিত রচনাসমূহ ছাত্রসমাজসহ বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজের রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে একটি প্রবল জনমত গঠনে সহায়ক হয়েছিল। এসব রচনা ভাষা-আন্দোলনের একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণ করেছিল। আর এরই মধ্য দিয়ে যেমন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের অন্তঃসারশূন্যতা তেমনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের চিন্তাও ক্রমশ স্বচ্ছ হতে শুরু করেছিল।

কলম-সৈনিক

অতঃপর বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে আবদুল হক এক দুঃসাহসী কলমযুদ্ধ পরিচালনা করেন। ১৯৪৭-এ যখন তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে লেখনী ধারণ করেছিলেন তখন তিনি সওগাত পত্রিকায় কর্মরত। চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে তখন তাঁকে ভাবতে হয়নি। কিন্ত্ত ষাটের দশকে যখন তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে সবচেয়ে যুক্তিপূর্ণ বুদ্ধিদীপ্ত প্রবন্ধগুলো লিখেছেন তখন তিনি সরকারি কর্মচারী। রচনাগুলো তাঁকে প্রকাশ করতে হয়েছে ছদ্মনামে। তবু নাম প্রকাশিত হওয়ার বিপদ ছিল পুরোমাত্রায় এবং তাতে শুধু চাকরির নিরাপত্তাই বিঘ্নিত হতো না জীবন-সংশয়ের ঝুঁকি ছিল। সুগভীর দেশপ্রেম ও জাতীয় কর্তব্যবোধের প্রেরণায় তিনি এসব কিছুকে অগ্রাহ্য করেছিলেন।

ষাটের দশকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে তাঁর একাধিক রচনা বেনামে (্লআবু আহসানশ্ ছদ্মনামে) সমকাল পত্রিকায় মুদ্রিত হয়েছিল। প্রবন্ধগুলোর শিরোনাম ছিল এরকম – ্লবাঙালি মুসলমান : ভূমিকা ও নিয়তিশ্ (১৯৬৩), ্লপূর্ব-পাকিস্তান : বাংলাদেশশ্ (১৯৬৪), ্লমুসলিম জাতীয়তাবাদ : পুনর্নিরীক্ষাশ্ (১৯৬৬), ্লযুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িকতাশ্ (১৯৬৬),  ্লসাম্প্রদায়িকতা ও সংস্কৃতিশ্ (১৯৬৭) প্রভৃতি। এর মধ্যে দুটি প্রবন্ধ (্লমুসলিম জাতীয়তাবাদ: পুনর্নিরীক্ষাশ্ এবং ্লযুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িকতাশ্) প্রকাশের পর সে-সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র বিভাগ এবং সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা বিভাগে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে ্লমুসলিম জাতীয়তাবাদ : পুনর্নিরীক্ষাশ্ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার পর সমকাল পত্রিকা ও সমকাল মুদ্রায়ণের অস্তিত্বই বিপন্ন হওয়ার উপক্রম ঘটে। পত্রিকার সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফরকে স্বরাষ্ট্র বিভাগের পক্ষ থেকে নানারূপ হয়রানির শিকার হতে হয়।

স্বরাষ্ট্র বিভাগ ও গোয়েন্দা বিভাগের ব্যাপক সত্র্কিয়তার একটি বিবরণ পরবর্তীকালে আবদুল হক তাঁর বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ (১৯৭৩) গ্রন্থের ভূমিকায় লিপিবদ্ধ করেছেন। এই বিবরণ থেকে জানা যায়, প্রবন্ধের লেখক কে তা বের করার জন্য স্বরাষ্ট্র বিভাগ ও গোয়েন্দা বিভাগের লোকেরা কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডে গিয়ে লেখক আবদুল হক ও কবি আবদুল কাদিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। গোয়েন্দা বিভাগের লোকেরা মাহে-নও অফিসেও গিয়েছিল। রাওয়ালপিন্ডি থেকে মাহে-নও কর্তৃপক্ষের কাছে এ সম্পর্কিত তথ্যাদি জানতে চাওয়া হয়েছিল। সমকাল-এর কপি বাজারে ফুরিয়ে যাওয়ায় সামরিক কর্তৃপক্ষ কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের গ্রন্থাগার থেকে পত্রিকার বাঁধানো ফাইল সেনানিবাসে নিয়ে গিয়েছিল। স্বরাষ্ট্র বিভাগের কর্মকর্তারা কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পেরেছিল যে, আবদুল হকই উক্ত প্রবন্ধের লেখক। কিন্ত্ত তাদের কাছে এর লিখিত কোনো প্রমাণ ছিল না। সিকান্দার আবু জাফরকে লিখিত প্রমাণের জন্য স্বরাষ্ট্র বিভাগে তলব করা হয়েছিল; কিন্ত্ত তিনি নাম প্রকাশে অসম্মতি জ্ঞাপন করেন। অতঃপর স্বরাষ্ট্র বিভাগের লোকজন সমকাল মুদ্রায়ণ, কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড ও আবদুল হকের বাসভবনে গিয়ে তাঁর হস্তাক্ষরের নমুনা সংগ্রহের মাধ্যমে তাঁকে ও সমকাল-কে দোষী সাব্যস্ত করতে প্রয়াসী হয়। কিন্ত্ত বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রমহলে ব্যাপক প্রতিত্র্কিয়া হবে ভেবে সরকার শেষ পর্যন্ত সমকাল বাজেয়াপ্ত করার পরিকল্পনা থেকে সরে যায়। সরকারি আইনজ্ঞের রিপোর্টও অবশ্য অনুকূলে ছিল না। রিপোর্টে বলা হয়েছিল, প্রবন্ধে উপস্থাপিত তথ্য ও যুক্তিসমূহ এমন কোনো আইনের আওতায় আনা সম্ভব নয় যা দিয়ে লেখক ও পত্রিকাকে আদালতের মাধ্যমে শাস্তি প্রদান করা যায়। বরং আদালতের মাধ্যমে ওইসব যুক্তি সকল শিক্ষিত মানুষের মাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। পূর্ব পাকিস্তান সরকার শেষ পর্যন্ত, প্রেসিডেন্টের কেবিনেটের মতামতের জন্য, প্রবন্ধটির একটি ইংরেজি অনুবাদ রাওয়ালপিন্ডিতে পাঠিয়েছিল। বিচারপতি আবদুল মওদুদ তখন কেন্দ্রীয় সরকারের আইন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ছিলেন। প্রবন্ধটি সম্পর্কে তাঁর মতামত চাওয়া হলে তিনি লিখেছিলেন : আবু আহসানকে নতুন ও তরুণ লেখক বলে মনে হয়; এ ধরনের লেখকের মাথা প্রথমাবস্থায় কিছুটা গরম থাকে; তাই এমন লেখকের রচনা উপেক্ষা করাই যুক্তিযুক্ত।

্লমুসলিম জাতীয়তাবাদ : পুনর্নিরীক্ষাশ্ প্রবন্ধটি নিয়ে সরকারি মহলে এত তীব্র প্রতিত্র্কিয়া সৃষ্টি হওয়ার যথার্থ কারণও ছিল। ওই প্রবন্ধে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভ্রান্তি নির্দেশ করা হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, ওই দ্বিজাতিতত্ত্বের ওপরই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের যুক্তির ভিত্তিকে। আর প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল এমন একটি সময় যখন সরকার রাজনৈতিক ঘটনাবলির দিক থেকেও বেশ চাপের মধ্যে ছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ছয়দফা প্রস্তাব সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। এর অল্প কিছুদিন পরেই ১ মার্চের ভাষণে আইয়ুব খান ছয়দফাকে কেন্দ্র করে তীব্র দমননীতি প্রয়োগের হুমকি দেন। এপ্রিল মাস থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে বারবার গ্রেফতার ও জামিন প্রদানের প্রহসনমূলক ঘটনা ঘটতে থাকে। আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী শক্তির নেতা-কর্মীদের অধিকতর সংখ্যায় গ্রেফতারের ঘটনা ঘটতে থাকে। এসবেরই প্রতিবাদে এবং ছয়দফার ভিত্তিতে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন তারিখে দেশব্যাপী এক সফল হরতাল পালিত হয়। এসব ঘটনার পরে ১৯৬৬ সালের শেষদিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে সুগভীর তাত্ত্বিক যুক্তিসহ এই প্রবন্ধটি প্রকাশিত হলে স্বাভাবিকভাবে সরকারি মহল তীব্রভাবে কম্পিত হয়।

উক্ত প্রবন্ধে আবদুল হক দেখান যে, জিন্নাহ-প্রবর্তিত দ্বিজাতিতত্ত্বের (ভারতে হিন্দু-মুসলমান দুই জাতি) বিষয়টি ছিল সাময়িক স্লোগানমাত্র। ভারতীয় মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাসভূমি প্রতিষ্ঠাই ছিল এর উদ্দেশ্য। এর মেয়াদ ১৯৪০ সালের মার্চের লাহোর প্রস্তাবের সময় থেকে ১৯৪৭-এর ১১ আগস্ট পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। ১৯৪৭-এর আগস্ট পাকিস্তানের গণপরিষদের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে জিন্নাহ যে ভাষণ দেন তাতে সুস্পষ্টভাবেই দ্বিজাতিতত্ত্ব পরিহার করেন। ওই ভাষণে তিনি হিন্দু-মুসলমানকে শতঢ়ভষশ হিসেবে উল্লেখ না করে Bljjqkfpu বলে উল্লেখ করেন। তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল নাগরিকের জন্য পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলেন এবং সকলের জন্য সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার আশ্বাস দেন। ধর্মভিত্তিক অন্তর্দ্বন্দ্ব জাতির জন্য যে ক্ষতিকর এবং তার অবসানই যে মঙ্গলজনক তা-ও তিনি উল্লেখ করেন। ওই ভাষণ থেকেই বোঝা যায়, জিন্নাহ দ্বিজাতিতত্ত্বকে একটি অভ্রান্ত রাজনৈতিক মতবাদ হিসেবে গ্রহণ না করে একটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। অতঃপর এ প্রবন্ধে আবদুল হক মুসলিম জাতীয়তাবাদের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করে এবং অন্তঃসারশূন্যতাকে আরো স্পষ্ট করে তোলেন। ভারত ও পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিত এবং দ্বিজাতিতত্ত্ব অনুযায়ী পাকিস্তানের সকল মুসলমান এক জাতিভুক্ত কি-না প্রভৃতি বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তিনি মুসলিম জাতীয়তাবাদের বিভ্রান্তিমূলক দিকগুলোকে পাঠকের কাছে স্বচ্ছ করে তোলেন। ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্য সবদিক থেকেই পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের জনগণ যে ভিন্ন প্রকৃতির, তাদের ভৌগোলিক নিসর্গ, জীবনবৈশিষ্ট্য ও নৃতাত্ত্বিক গঠন যে স্বতন্ত্র তা এ প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়। দুই অংশের এই স্বাতন্ত্র্যের কথা উল্লেখ করে আবদুল হক সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে, ্লপূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার প্রধান শর্ত এমনি সংহত ঘনীভূত বাঙালি জাতীয়তাবাদ।শ্

  শুধু উক্ত প্রবন্ধেই নয়, বিশ শতকের পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে রচিত বিভিন্ন প্রবন্ধে লেখক বাঙালি মুসলমানদের দ্বিবিধ সত্তার মধ্যে একটি সামঞ্জস্য বিধানের কথা বারবার বলেছেন। বাঙালিত্ব ও মুসলমানিত্ব-বাঙালি মুসলমানের এই উভয় পরিচয়কে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে তিনি এর কোনো একটিকে গুরুত্বহীন করে তোলার বিরোধিতা করেছেন। পাশাপাশি ধর্মের ভিত্তিতে জাতীয়তা ও সংস্কৃতির পরিচয় যে এর প্রধান ভিত্তি, তা নানা তথ্য ও যুক্তি সহযোগে তিনি প্রমাণ করেছেন। পাকিস্তানের দুই অংশের স্বতন্ত্র জাতিসত্তার প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে এসে তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে সত্র্কিয় মুসলিম জাতীয়তাবাদের ধারণাটিকে ভাবাবেগপ্রসূত ও অবাস্তব বলে প্রতিপন্ন করেন। এভাবে স্বাধিকারকামী বাঙালির কাছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারণাটিকে একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি দান করেন তিনি। এমনকি ্লপূর্ব পাকিস্তানশ্ নামক প্রদেশটির নাম যে ্লবাংলাদেশশ্ হওয়া যুক্তিযুক্ত তা নিয়ে একটি প্রবন্ধ (্লপূর্ব-পাকিস্তান : বাংলাদেশশ্) লেখেন ১৯৬৪ সালে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের সাত বছর আগে। প্রবন্ধটি যদিও লেখা হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গকে ্লবাংলাদেশশ্ হিসেবে অভিহিত করার উদ্যোগের বিরোধিতা করে, কিন্ত্ত এই প্রবন্ধ থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নামকরণের একটি পূর্ণ যুক্তিসিদ্ধ ভিত্তিও স্পষ্টতা অর্জন করে। এভাবে আবদুল হক বাংলাদেশের স্বাধিকার তথা স্বাধীনতা আন্দোলনের দার্শনিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি দাঁড় করিয়ে দেন এবং এই ভূমিকার কারণে তিনি অভিহিত হন ্লকলম-সৈনিকশ্ হিসেবে। সমকাল-সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফর তাঁর পত্রিকায় এসব প্রবন্ধ প্রকাশ করে এক্ষেত্রে সন্দেহাতীতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

শুধু ষাটের দশকে নয়, সত্তরের দশকেও আবদুল হককে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে কলম ধরতে হয়েছে এবং সরকারের রোষানলে পড়তে হয়েছে। পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর সরকারের পক্ষ থেকে যখন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের একটি নতুন ধারণা প্রচার করা হয় তখন তিনি লেখেন ্লদোদুল্যমান জাতীয়তাশ্ নামক প্রবন্ধ। এটিও প্রথমে সমকাল পত্রিকায় (বৈশাখ ১৩৮৪/এপ্রিল-মে ১৯৭৭) এবং পরে কিছুটা পরিবর্তিত রূপে বক্তব্য পত্রিকায় (বৈশাখ-আষাঢ় ১৩৮৪) প্রকাশিত হয়। স্মরণীয় যে, ১৯৭৬ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে বাংলা একাডেমী আয়োজিত সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানের প্রথম দিনে (১৫ ফেব্রুয়ারি) বাঙালি জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে আলোচনার ব্যবস্থা করা হয়। নির্ধারিত বক্তা না-হয়েও দৈনিক ইত্তেফাকের সাংবাদিক খন্দকার আবদুল হামিদ ওইদিন সভায় উপস্থিত হয়ে জ্ঞবাংলাদেশী জাতীয়তাবাদঞ্চ নামে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। স্পষ্টতই সরকার পক্ষের ব্যবস্থাপনায় এটি ঘটে। তাঁর মতে, ভারতে বহু কোটি বাঙালি রয়েছে সুতরাং বাঙালি জাতীয়তাবাদ ঠিক নয়। এ প্রবন্ধটি ১৯৭৬ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ইত্তেফাকে মুদ্রিত হয়। অতঃপর দেশে জাতীয়তাবাদ সম্পর্কিত একটি বিতর্ক নতুন করে দানা বাঁধে। আবদুল হক তাঁর প্রবন্ধে লেখেন : ্লবাঙালি কথাটা বর্জন করে এ রাষ্ট্রের নাগরিককে বাংলাদেশী বলার পেছনে আছে অনেকখানি আত্ম-অবিশ্বাস, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আছে সংশয়, জাতীয়তার ধারণায় অনিশ্চয়তা। গত চল্লিশ বছরে বর্তমান বাংলাদেশ নামক ভূ-ভাগের নাগরিকদের জাতীয়তার ধারণায় ছিল উপমহাদেশের ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িকতা, তারপর পাকিস্তানের ভিত্তিতে সাম্প্রদায়িক জাতীয়তা, তারপর আরো দু-একটি ছোটখাট ধাপ অতিক্রম করে বাংলাদেশের চতুঃসীমার মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তা। সাম্প্রতিককালে পুনরায় সাম্প্রদায়িক জাতীয়তা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। (চেতনার এলবাম এবং বিবিধ প্রসঙ্গ, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৩, পৃ.৮১)। তাঁর মতে, জাতীয়তার ধারণা এমন ব্যাপার নয় যে অল্পদিন পরপর পরিধেয় বস্ত্রের মতো তা পরিবর্তনযোগ্য। তিনি লেখেন: বাংলাদেশে বাস করার কারণেই এদেশের লোক বাঙালি তা নয়; আবহমান কাল যাবৎ তারা বাঙালি নামে পরিচিত এবং তাদের মাতৃভাষা বাংলা, এসব কারণেই তারা বাঙালি।

এ-প্রবন্ধ ছাপা হওয়ার পর প্রতিত্র্কিয়াশীল শক্তি আবদুল হকের সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠে। ১৯৭৭ সালের আগস্টের গোড়ার দিকে খন্দকার আবদুল হামিদ ্লমর্দে মুমীনশ্ ছদ্মনামে দৈনিক আজাদে প্রথমে এর সমালোচনা করেন। তারপর একই পত্রিকায় ২৬ আগস্ট ও ২ সেপ্টেম্বর তারিখে আরেকজন এর সমালোচনা করেন। এরা দুজনই নামের সঙ্গে পরিচয় হিসেবে বাংলা একাডেমীর পাঠ্যপুস্তক বিভাগের ডিরেক্টর কথাটা উল্লেখ করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল : এতে সরকারের দৃষ্টি আকৃষ্ট হবে এবং লেখককে বরখাস্ত করা হবে। আবদুল হকের স্মৃতি-সঞ্চয়ের ৬ নভেম্বর ১৯৭৭ তারিখে লেখায় (স্মৃতি-সঞ্চয় ১, সময় প্রকাশন, ২০০৩, পৃ ১৫৬) এর বিশদ বিবরণ আছে। এ থেকে আরো জানা যায়, বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী দৈনিক আজাদের ওইসব লেখা সামনে নিয়ে আবদুল হককে দুদফা ডেকে পাঠান এবং সরকারের নীতিবিরোধী কিছু লেখা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না একথা তাঁকে দিয়ে লিখিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং সে-সময়ে রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা সৈয়দ আলী আহসানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বলেন। আবদুল হক এর কোনো প্রস্তাবেই রাজি হননি। স্মৃতি-সঞ্চয়ের ওই লেখায় আবদুল হক এ প্রবন্ধকে কেন্দ্র করে এনএসআই ও ডিজিএফআই-এর সত্র্কিয়তার কথাও উল্লেখ করেছেন।

একথা স্বীকার্য যে, বাঙালি জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে আবদুল হকের এই ভূমিকাটি কেবল তাঁর রাজনৈতিক চেতনার উচ্চতা কিংবা দূরদৃষ্টিকেই চিহ্কিত করে না। এছাড়াও তাঁর মধ্যে ছিল সুগভীর দেশাত্মবোধের এক মহৎ প্রেরণা যা তাঁকে সাংসারিক স্বার্থ-সীমার ঊধের্ব উঠতে শক্তি যুগিয়েছিল। এই স্বাজাত্যপ্রেম এবং সমগ্র জাতির আশা-আকাঞ্ঝজার সঙ্গে একাত্মবোধ ও সেই সূত্রে জাতির প্রতি দায়িত্বশীলতা তাঁকে আর্থিক নিরাপত্তাহানির ঝুঁকি নিতেও দুঃসাহসী করে তুলেছিল। ্লদুঃসাহসীশ্ শব্দটি ব্যবহার করছি এ কারণে যে, কৈশোর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে তাঁকে আর্থিক দৈন্যের বিরুদ্ধে এক কঠিন যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয়েছে। ষাটের দশকে পাঁচ সন্তানবিশিষ্ট সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সেই ব্যক্তিটি যখন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে চাকরি হারানোর ঝুঁকি সত্ত্বেও (জীবিকার বিকল্প কোনো উপায়ের অনুপস্থিতির মধ্যেই) ওইসব প্রবন্ধ লেখেন তাকে দুঃসাহস ছাড়া আর কী বলা যায়! তাঁর জীবনযুদ্ধের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসটি তুলে ধরলেই এই দুঃসাহসের মর্ম উপলব্ধি করা যাবে।

সপ্তম শ্রেণি থেকেই আবদুল হককে নিজ গ্রাম (উদয়নগর, গোমস্তাপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ) থেকে সাত মাইল দূরবর্তী এক গ্রামে অনাত্মীয় বাড়িতে জায়গির থেকে লেখাপড়া করতে হয়েছে। তখন তার বয়স মাত্র চৌদ্দ বছর। তারপরেও তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন (১৯৩৬)। কিন্ত্ত জায়গিরের ব্যবস্থা করতে না পারায় উচ্চ মাধ্যমিক পর্বের অধ্যয়ন এক বছর বিলম্বিত হয়। শেষে জায়গিরের সুবিধার জন্যে তাকে যেতে হয় নিজ গ্রাম থেকে অনেক দূরে টাঙ্গাইলের করটিয়া সাদত কলেজে। জায়গির বাড়ি থেকে কলেজে যাতায়াতের অত্যন্ত কষ্টকর ব্যবস্থা সত্ত্বেও তিনি প্রথম বিভাগে আইএ পাশ করেন (১৯৩৯)। জায়গিরের অভাবে বিএ পাঠের ক্ষেত্রে আবারো তিন বছরের শূন্যতা সৃষ্টি হয়। অতঃপর স্টাইপেন্ড, টিউশনি ও কাজী আবদুল ওদুদের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুতে সহায়তার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন প্রভৃতি নানা প্রত্র্কিয়ার মধ্য দিয়ে রাজশাহী কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে বিএ পাশ করেন (১৯৪৪)। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এমএ পড়ার সময় রাতে চাকরি করতে হয়েছে। পরীক্ষা শেষের সঙ্গে সঙ্গে হল থেকে সরাসরি পত্রিকা অফিসে গিয়ে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন (১৯৪৬) তিনি। তারপর ১৯৫১ সাল পর্যন্ত পত্রিকার চাকরিশেষে সরকারের তথ্য বিভাগে যোগদান করেন। কিন্ত্ত চাকরির নিয়োগটি যেহেতু ছিল অস্থায়ীভিত্তিক সেহেতু ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত সাড়ে তেরো বছর তাঁর বেতন যেমন একটাকাও বৃদ্ধি পায়নি তেমনি প্রতিমুহূর্তে চাকরি হারানোর ঝুঁকি বহন করতে হয়েছে। ১৯৬৫ সালে কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ডে এবং

১৯৭২-এ বাংলা একাডেমীতে চাকরি-সংক্রান্ত কিছুটা স্বস্তি ফিরে এলেও ১৯৮১ সালে যখন তিনি অবসর গ্রহণ করেন তখন বাংলা একাডেমীর কর্মচারীদের পেনশনের ব্যবস্থা না-থাকায় পরবর্তী জীবনেও তাঁকে অর্থাভাবের কষ্ট একইভাবে বহন করতে হয়েছে।

আবদুল হকের এই জীবনযুদ্ধ থেকে আমরা ধারণা করতে পারি, বিপুল আত্মপ্রত্যয় এবং সমাজ ও সভ্যতার প্রতি মানবজীবনের সুগভীর দায়বোধ দ্বারা পরিচালিত ছিলেন বলেই তিনি আর্থিক প্রতিকূলতাকে অগ্রাহ্য করতে পেরেছিলেন। ছাত্রজীবনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি প্রচণ্ড অর্থাভাবের মধ্যেই প্রবল আগ্রহ নিয়ে পাঠ করেছেন পাঠ্যবহির্ভূত সৃজনশীল রচনা এবং অব্যাহত রেখেছেন নিজের সৃষ্টিশীলতার চর্চাও। সচ্ছল জীবনের প্রলোভন তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। বরাবর মহৎ চিন্তা দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন এবং একটি জাতির সামগ্রিক আশা-আকাঞ্ঝজার সঙ্গে নিজের চিন্তা-ভাবনা ও সৃষ্টিশীল প্রয়াসকে সংযুক্ত করে নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি নিতেও কুণ্ঠিত হননি। বর্তমানে আমাদের সমাজে যখন একান্ত ব্যক্তিগত সংকীর্ণ স্বার্থকেন্দ্রিক জীবনচর্চার প্রতিযোগিতাই সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে তখন আবদুল হকের মতো এমন মহৎ চিন্তাবিদের জীবনধারা আমাদের আলোর পথ দেখাতে পারে।