ভ্যানগঁগ জাদুঘরে

হেনি রুমকেন্স আমার ডাচ-বন্ধু। আমার সঙ্গে ওর কলম-বন্ধুত্ব হয় ১৯৬১ সালে, তখন আমি স্কুলে পড়ি। ১৯৭৮ সালে ও ঢাকায় আসে স্বামীর সঙ্গে। ওর স্বামী ইয়োপ ভন-ওভেন কোনো একটি বিদেশী সংস্থার কাজ-সূত্রে ঢাকায় আসে। ওরা চার বছর ছিল। ওই সময় ওর সঙ্গে আমার সরাসরি যোগাযোগ হয়, আমাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে এবং কলম-বন্ধুত্বের অবসান ঘটে। ১৯৮১ সালে ও দেশে ফিরে যায়।

 এরপর আবার যোগাযোগের সূত্র হয় চিঠি। অনেকবারই ও আমাকে ওর দেশে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়, কিন্তু নিজের পয়সায় টিকেট কেটে বিদেশ যাওয়া সম্ভব নয়, অতএব চুপচাপ থাকি। পেরিয়ে যায় পনেরো বছরেরও বেশি সময়। একদিন সুযোগ আসে। ১৯৯৪ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিলের ফেলোশিপ পেয়ে চার মাসের জন্য ঝঙঅঝ-এ ড. উইলিয়াম রাডিচের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাই। সে-সময়টি ছিল আমার জন্য দারুণ সময়। ঝঙঅঝ-এর বাংলা বিভাগ থেকে আমাকে লন্ডন ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরি এবং ব্রিটিশ মিউজিয়াম লাইব্রেরিতে পড়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। আমি প্রায় রাতদিন বইয়ের রাজ্যে ডুবে থাকতাম। একদিন উইলিয়াম বললেন, আগস্টের শেষে নেদারল্যান্ডে একটি সেমিনার হবে বাংলাদেশ-বিষয়ে। আয়োজক সংস্থা হলো ঊঘইঝ. ওরা আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে একটি সেশনে সভাপতিত্ব করার জন্য। আমি জানিয়ে দিয়েছি যে আমি যাবো।

আমি চুপচাপ উইলিয়ামের কথা শুনি। নেদারল্যান্ড শুনে ভেতরে ভেতরে চমকে উঠি। ভাবি, ইস আমার যাওয়ার সুযোগ হলে হেনির সঙ্গে দেখা হতো। ঢাকা ছাড়ার সময় হেনি গর্ভবতী ছিল। বলেছিল, ওর মেয়ে হলে নাম রাখবে ইন্দিরা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সে-বছরই আততায়ীর হাতে নিহত হন। হেনির মেয়ে হয়েছে এবং নাম রেখেছে ইন্দিরা। এতদিনে মেয়েটি অনেক বড় হয়েছে। কার মতো হয়েছে, বাবা না মা?

আমার চমক ভাঙিয়ে উইলিয়াম বললেন, ঊঘইঝ সম্পর্কে আপনি জানেনতো?

আমি বললাম, না, তেমন কিছু জানি না।

তিনি বললেন, এটা হলো ‘ইউরোপিয়ান নেটওয়ার্ক ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ’। বাংলাদেশের নানা বিষয়ে ওরা গবেষণা করে, সেমিনার করে। বই প্রকাশিত হয়। ওরা বিভিন্ন লেখকের কাছে পেপার পড়ার জন্য সিনোপসিস চেয়েছে। আপনি তো আমাকে আপনার একটি পেপার দেখতে দিয়েছেন। আমার বেশ পছন্দ হয়েছে পেপারটি। আপনি ওই পেপারের সিনোপসিস পাঠিয়ে দিন। ওদের পছন্দ হলে সেমিনারে যাওয়ার আমন্ত্রণ পেতেও পারেন। আমি থ হয়ে বসে থাকি। ভাবি, চেষ্টা করতে দোষ কী? পাঠিয়েই দেখি না। আমার যে-পেপারটির কথা উইলিয়াম বললেন তার নাম ‘কালচার অ্যান্ড চাইল্ড: দ্য বাংলাদেশ পারসপেকটিভ’। প্রবন্ধটি বাংলায় লেখা। ইংরেজি অনুবাদ করে দেশ থেকে আসার সময় নিয়ে এসেছিলাম। উইলিয়ামের উপদেশমতো সিনোপসিস করে আমস্টারডামে পাঠালাম। ঠিকানা উইলিয়াম দিয়েছিল। জুন মাসের মাঝামাঝি আমার দেশে ফেরত আসার কথা, সেভাবে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এর মধ্যে নেদারল্যান্ড থেকে উইলিয়ামের কাছে ফোন আসে। আমার সিনোপসিসটি ওদের সেমিনারে উপস্থাপনের জন্য মনোনীত হয়েছে। উইলিয়াম আমাকে এ-কথা জানিয়ে অভিনন্দন জানায়। আর আমি ভাবি, এভাবেই কি স্বপ্নপূরণ হয়? গল্পের মতো মনে হয় বিষয়টা। হেনি ও ওর পরিবারের অন্যদের দেখার আনন্দ প্রথমে মনে হয়। ওদের একটি ছেলে হয়েছে। নাম রেখেছে রডারিক। ওকেও আমার দেখা হবে। আমার আনন্দের সীমা নেই। আমার আনন্দে উদ্ভাসিত মুখের দিকে তাকিয়ে উইলিয়াম বলেন, আপনি দেখি ভীষণ খুশি হয়েছেন? আমি তাকে হেনির সঙ্গে বন্ধুত্বের কথা বলি। ’৬১ সাল থেকে ’৯৪ সাল পর্যন্ত হিসাব করে উইলিয়াম অবাক বিস্ময়ে বলেন, ৩৩ বছর ধরে আপনারা বন্ধু? অদ্ভুত, এমনটি কমই দেখা যায়। হেনির টেলিফোন-নম্বর থাকলে আপনি আজই আমার রুম থেকে টেলিফোন করে ওকে আপনার আমস্টারডাম যাওয়ার খবরটি জানান। আসুন আমি লাইন লাগিয়ে দিচ্ছি।

উইলিয়াম নিজেই টেলিফোন-সংযোগ লাগিয়ে দিলে আমি একবারে হেনিকে পাই। ও-তো শুনে লাফিয়ে ওঠে। বলে, তুমি কয়েকদিন ছুটি বেশি নিয়ে আসবে। আমার সঙ্গে থাকবে। আমি তোমাকে কনফারেন্স সেন্টারে পৌঁছে দিয়ে আসব। যেদিন কনফারেন্স শেষ হবে সেদিন গিয়ে নিয়ে আসব। তোমাকে পুরো হল্যান্ড ঘুরিয়ে দেখাতে আমার বেশি সময় লাগবে না। দেশটা বেশি বড় না, ছোট। তোমাদের কনফারেন্স যেখানে হবে সেই ইউথ্রেটে আমার বাবার বাড়ি। মনে আছে আমাদের বন্ধুত্বের শুরুর দিকে আমি তোমাকে ইউথ্রেট থেকে চিঠি লিখতাম? সেমিনার কয়দিন চলবে?

বললাম, তিনদিন। ২৫ থেকে ২৭ আগস্ট। ও বলল, প্রথমে তুমি কী দেখবে আমাকে জানাও। আমি তোমার জন্য প্রোগ্রাম বানিয়ে রাখব। আমি এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে বলি, আমি প্রথমে ভ্যানগঁগ মিউজিয়াম দেখব।

ফোনের ওপাশ থেকে হেনির হাসি শুনতে পাই। বলে, তারপর কি অ্যান ফ্রাঙ্কের মিউজিয়াম দেখবে?

হ্যাঁ, অবশ্যই। অ্যান ফ্রাঙ্কের ডায়েরি পড়েছি। মিউজিয়াম দেখাটা দারুণ হবে।

ভেবো না, তোমার জন্য আমার মতো করে প্রোগ্রাম বানিয়ে রাখব।

আমি ধন্যবাদ বলার মতো ভাষা খুঁজে পাই না, শুধু অভিভূত হয়ে যাই।

কদিন পর উইলিয়াম বলেন, ঊঘইঝ আমস্টারডাম অফিসে আপনার ঢাকার ঠিকানায় আমন্ত্রণপত্র পাঠাতে বলে দিন। আপনি তো কয়েকদিন পরে ঢাকায় ফিরে যাচ্ছেন।

আমি দ্রুত ঝঙঅঝ-এর অফিস থেকে ই-মেইল করি এবং সেদিন বিকেলে ঝঙঅঝ-এর উলটোদিকে যে-বইয়ের দোকান আছে সেখানে ঢুকে ভ্যানগঁগের ওপরে বই খুঁজতে থাকি। বেশিক্ষণ খুঁজতে হয় না। অল্পেই পেয়ে যাই ঞযব ষরভব ধহফ ড়িৎশং ড়ভ ঠরহপবহঃ ঠধহএড়ময বইটি। প্রচ্ছদে ঠরহপবহঃ শব্দটি শিল্পী তাঁর ছবিতে যেমন আঁকাবাঁকা রেখায় নকশা করে স্বাক্ষর করেছেন সেভাবে লেখা আছে। দোকানে দাঁড়িয়েই বইটির নানাকিছু বইয়ের ফ্ল্যাপ এবং পেছনের প্রচ্ছদ থেকে আমার  জানা হয়ে যায়। বইটির লেখক জেনিস অ্যান্ডারসন। নিউজিল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। ক্যান্টারবারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেন। তাঁর পড়াশোনার বিষয় ইতিহাস এবং শিল্পের ইতিহাস। প্রথমে কাজ করেন লন্ডনের বিজ্ঞান জাদুঘর লাইব্রেরিতে, পরে সেভ দ্য চিলড্রেন অফিসে। এরপরে লন্ডনের একটি প্রকাশনা-সংস্থায় চাকরি নেন। সেখানে তিনি পেইন্টিং, অ্যান্টিকস, চলচ্চিত্র এবং থিয়েটার-সম্পর্কিত বই সম্পাদনা করতেন। তাঁর স্বামী একজন শিল্পী ও লেখক। আমি এই মহিলা সম্পর্কে খানিকটা পরিচিতি দিলাম এ-কারণে যে, এই বইয়ে ভ্যানগঁগের যে-কটি ছবি তিনি নির্বাচন করেছেন এবং ছবির পরিচিতি দিয়েছেন তা আমাকে মুগ্ধ করেছে। বইটি ছাপা হয়েছে ইটালি থেকে।

ভিনসেন্ট ভ্যানগঁগ সম্পর্কে নানা বিষয় আমার বিভিন্ন সময়ে পড়া ছিল। তাঁর জগৎবিখ্যাত ‘সূর্যমুখী’ বিভিন্ন বইয়ে ছাপা দেখেছি। তাঁর জীবনের নানা পাগলামির খবরতো নানা জায়গায় গল্পের মতো পড়েছি। হল্যান্ডের সন্তান ভ্যানগঁগের চিত্রশিল্প তাঁর দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে দেখব সেজন্য তাঁকে আরো গভীরভাবে জানা দরকার। সুতরাং বইটি কিনে ফেলি। আরো খুশি লাগছিল যে বইটি ওই বছরই ব্রিটেনে প্রথম প্রকাশিত হয়।

প্রকাশক প্যারাগন বুক সার্ভিস লিমিটেড। রাসেল স্কোয়ার থেকে আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনে বাড়ি ফেরার পথে কামরা প্রায় খালিই ছিল। ফলে বইটি খুলে বসি। কতক্ষণ পরপর ট্রেন থামছে, কেউ নামছে কেউ উঠছে, কিন্তু আমার মনোযোগ নষ্ট হয় না। আগেই বলেছি বইটির ছবি-নির্বাচনের কথা। পাতা ওলটাতেই প্রথমে যে-ছবিটি দেখি, এক কথায় চমৎকার। ছবিটির নাম The Potato Eaters, ১৮৮৫ সালে আঁকা। ছবিতে আছে পাঁচটি অবয়ব, শ্রমিকশ্রেণির মানুষ। টেবিলে আলুর প্লেট, একজন কাপে চা ঢালছে। ছবিতে ব্যবহৃত হয়েছে গাঢ় রং, কালোর আভায় বেশি উজ্জ্বল। ওদের মাথার ওপরে হারিকেন জ্বলছে, অল্প আলো ঘিরে আছে ঘরটিকে। এ-ছবিকে বিশ্লেষণ করতে বললে আমি পারব না। ছবি আমি ব্যাখ্যা করতে জানি না, কিন্তু তাকিয়ে থাকার মুগ্ধতায় আমি বিভোর হতে পারি। চোখ সরতে চায় না। ছবির পাশে জেনিস অ্যান্ডারসন লিখেছেন, প্যারিসে যাওয়ার আগে হল্যান্ডে বসে শিল্পী যেসব ছবি এঁকেছেন সেগুলোর বেশিরভাগই ‘ডার্ক অ্যান্ড হেভি’। এসব ছবিতে সুবিধাবঞ্চিত গরিব খনি-শ্রমিক ও কৃষকদের প্রতি তাঁর দরদি মনোভাব ফুটে উঠেছে। জেনিস আরো লিখেছেন, শিল্পী নিজে তাঁর ছোটভাই Theo -কে এই ছবি সম্পর্কে লিখেছেন, …the idea that these people in the lamplight … have worked the earth and that my painting gives dignity to  manual work and the food they have themselves earned through honest toil’ – ভ্যানগঁগের একজন কৃষকের ছবি আছে এ-বইয়ের ৪৬ পৃষ্ঠায়, ছবির নাম Old Peasant, এঁকেছেন ১৮৮৮ সালে। কৃষকের মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, মাথায় খড়ের তৈরি হ্যাট, গায়ে নীল রঙের জামা – একটি উজ্জ্বল চেহারা। জেনিস লিখছেন – ‘a man to whom the earth is bountiful.’ ট্রেন তীব্রগতিতে ছুটছে বিভিন্ন স্টেশন ছুঁয়ে ছুঁয়ে। আর দুটো স্টেশন পরই নেমে যাবো। উর্মি রহমান ও সাগর চৌধুরীর বাড়িতে থাকি। দ্রুত বইয়ের পাতা ওলটাই। দৃষ্টি আটকে যায় ভ্যানগঁগের বিখ্যাত ‘সূর্যমুখী’র ওপর। শিল্পীর বিশ্বাস ছিল ‘সূর্যমুখী’ হলো ‘Symbols of the sunshine’।জেনিস লিখেছেন যে, নিজ জীবনে নানা বিপর্যয় মোকাবিলা করার পরও শিল্পীর অসাধারণ আশাবাদ জীবন ও মানবতার পক্ষে অটুট থেকেছে। জেনিস আবার লিখেছেন, ‘Sunflowers, of which he painted maû pictures, were a symbol of the power and beneficence of life.’ চলন্ত ট্রেনে বসে আমি সূর্যমুখীর দিকে তাকিয়ে থাকি। গুনে দেখি ছোটবড় মিলিয়ে পনেরোটি সূর্যমুখী আছে ফুলদানিটিতে। কোনো কোনোটি অন্য ফুলের আড়ালে ঢাকা পড়েছে, একটুখানি বেরিয়ে আছে শুধু। সবগুলো পূর্ণ প্রস্ফুটিত নয়, দু-একটা অর্ধ-প্রস্ফুটিত। আমার মনে হয়, এগুলো সাধারণ সূর্যমুখী নয়, এই হলুদ রঙও সাধারণ হলুদ নয়, যেন ফুল ও রঙের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে তীব্র আলোকচ্ছটা, যেটা দৃষ্টি ধাঁধিয়ে দেয় না, ধাঁধায় মানুষের জীবনীশক্তি, যে-শক্তি বেঁচে থাকার আনন্দভুবন নির্মাণ করার জন্য অপরিহার্য। আমি বইয়ের অন্য পাতা আর ওলটাই না। ট্রেন এসে স্টেশনে থামে। বইটি ব্যাগে ভরে নিই। বেশ খানিকটা পথ হেঁটে পৌঁছে যাবো উর্মি আর সাগরদার বাড়িতে। কিন্তু আমার মাথা থেকে নামে না ভ্যানগঁগ। ট্রেনের গতির মতো ছুটতে থাকে। পথে হাঁটতে হাঁটতে সমালোচকদের কথা মনে হয় যাঁরা বিভিন্নভাবে মূল্যায়ন করেছেন ভ্যানগঁগকে। বলেছেন, তাঁর শিল্প ও জীবন এত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত যে একটিকে আরেকটি থেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। আরো বলেছেন, ‘The name of Van Gogh suggests primarily no theme connected with the history of art, but rather an eminently human one. He was a missionary who painted. He was a painter with social ideas. His story is not that of an eye, a pallette, a brush, but the tale of a lonely heart which beat within the walls of a dark prison, longing and suffering without knowing why, until one day it swa the sun, and in the sun recogni“ed the secret of life. It flwe towards it and was consumed in its rays.’ বাড়ি ফিরলে দেখতে পাই উর্মি এবং সাগরদা কেউই কাজ থেকে ফেরেনি। আমার কাছে একটা চাবি থাকে, আমি ফাঁকা বাড়িটার চারদিকে তাকাই। আমার মনে হয় যদি পুরো বাড়িটার  বিভিন্ন জায়গায় সূর্যমুখী সাজিয়ে রাখতে পারতাম! ওরা ভাবত, ভ্যানগঁগের সূর্যমুখী এখানে কীভাবে এল! আশ্চর্য, আমাদের বাড়িতে আজ আলোর বন্যা। আমি বইটা উর্মির চমৎকার করে সাজানো বাড়িটার টেবিলে রাখি। দেয়ালের সঙ্গে লাগানো র‌্যাকে অনেক বই আছে, ভাবি ওখানে যদি বইটা রাখি তবু ওটাকে খুঁজে পেতে আমার অসুবিধা হবে না। আমি এখন এই শিল্পীকে স্মৃতির পাতায় গেঁথেছি।

দুই

আজ ২৯ আগস্ট। ২৭ তারিখে আমাদের সেমিনার শেষ হলে হেনি আমাকে সম্মেলনকেন্দ্র থেকে নিয়ে এসেছে। এখন দাঁড়িয়ে আছি আমস্টারডামের ভ্যানগঁগ মিউজিয়ামের সামনে। হেনি টিকেট কাটতে গেছে। টিকেটের দাম মাথাপিছু দশ গিল্ডার। তেমন ভিড় নেই। জাদুঘরের সামনে দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকাই। ইয়োপ গাড়ি পার্ক করতে গেছে। কদিনে হল্যান্ডের অনেক জায়গায় ঘুরেছি। হেনি আর আমি বেশিরভাগ সময়ে, কখনো ইন্দিরা আমাদের সঙ্গী হয়েছে। কিন্তু ভ্যানগঁগের জন্মস্থান দেখা হয়নি আমার। সে-জায়গাটি কোথায়, কতদূরে ইত্যাদি ভেবে লজ্জায় হেনিকে কিছু বলিনি। বললে, ও হয়ত ঠিকই আমাকে নিয়ে ছুটত সে-জায়গাটি দেখাতে, কিন্তু ভেবেছি অনুরোধটা বেশি হয়ে যেতে পারে। একটু পরে টিকেট কেটে হেনি ফিরে আসে। আমরা ইয়োপের জন্য অপেক্ষা করি। হেনিকে বলি, চলো ওই সিঁড়ির ওপর বসি।

হেনি মাথা নেড়ে সায় দেয়। লম্বায় ও আমার দ্বিগুণ। ওর পাশে আমাকে একটুখানি দেখায়। মনে আছে ঢাকায় যখন ওর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় তখন আমার কপালে টিপ দেখে ও আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি কি হিন্দু? আমি তখন ওকে সিঁদুরের টিপ এবং সাধারণ টিপের পার্থক্য বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, বাঙালি নারীরা শাড়ির সঙ্গে এই টিপ পরতে ভালোবাসে। অনেক সময় শাড়ির রঙের সঙ্গে ম্যাচ করে টিপ পরে। টিপ বাঙালির সংস্কৃতির অংশ। একসময় হেনির দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলি, তুমি এই জাদুঘরে কয়বার এসেছ? ও হেসে বলল, অনেকবার। আমার এখানে আসতে ভালো লাগে। আমার খুব গর্ব হয় যে ভ্যানগঁগ আমার দেশের শিল্পী।

আমি নিজের দেশের পেইন্টিংয়ের কথা বলার জন্য দ্রুত বলি, ঢাকায় থাকতে তোমাকে আমি জয়নুল আবেদিনের কথা বলেছিলাম।

ও হেসে বলে, হ্যাঁ, মনে আছে। তাঁর আঁকা দুর্ভিক্ষের ছবিগুলো এখনো আমি মনে করতে পারি। সে-ছবির কোনো একটায় আমি কাক দেখেছিলাম। ভ্যানগঁগের একটা ছবির নাম ‘ঈৎড়ংি ড়াবৎ ধ পড়ৎহভরবষফ’। তোমাকে ছবিটি দেখাব। ওই যে ইয়োপ আসছে।

প্রায় সাত ফুট উচ্চতার ইয়োপ লম্বা পা ফেলে হেঁটে আসছে। হালকা-পাতলা গড়ন, খুবই অমায়িক। হেনির চেয়ে দু-এক বছরের ছোট। আমি ওর আসার দিকে তাকিয়ে থাকি। হেনি উঠে সামনে এগিয়ে যায়। আমি চুপচাপ বসে থাকি।

ভ্যানগঁগ ১৮৫৩ সালের ৩০ মার্চ হল্যান্ডের এৎড়ড়ঃ-তঁহফবৎঃ-এ জন্মগ্রহণ করেন। ইধৎনধহঃ নামের একটি ছোট শহরে এ-জায়গাটি অবস্থিত। শিল্পী বেঁচে ছিলেন মাত্র ৩৭ বছর। কোনো পেইন্টিং স্কুলে শিক্ষালাভ না করেও যে-অসাধারণ শিল্পকর্ম তিনি তৈরি করেছিলেন তা তাঁর সহজাত ঐশীশক্তির বহিঃপ্রকাশ। তাঁর ছোট ভাই ঞযবড় ছিল তার বন্ধু, পৃষ্ঠপোষক এবং পরিত্রাণকর্তার মতো। ঞযবড় তাঁর ভাইয়ের শিল্পী হওয়ার আকাক্সক্ষাকে শুধু মৌখিক সমর্থন জানিয়েই শেষ করেনি, ছবি আঁকার জন্য যে আর্থিক সহযোগিতার প্রয়োজন হয় সে-দায়িত্বও নিজের কাঁধে নিয়েছিল। শিল্পী নিজে অবশ্য প্যারিস, ব্রাসেলস এবং লন্ডনে কাজ করেছিলেন। তিনি ছিলেন চাচার প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এড়ঁভরষ বঃ ঈরব-এর আর্ট ডিলার। পরে ব্রাবান্ত শহরের খনি-শ্রমিক ও গরিব কৃষকদের মধ্যে ধর্ম-প্রচারকের কাজ করেন। এ-সময় থেকেই তাঁর ছবিতে গরিবদের জীবনযাপন ফুটে উঠতে থাকে। এ-সময় তিনি নিজেও গরিবদের মতো খুব সাধারণভাবে থাকতেন, একজন পতিতাকে নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়েছিলেন। ফলে স্থানীয় গির্জা থেকে বাধার সম্মুখীন হন। তিনি তাঁর গভীর ধর্মীয় অনুভূতি সত্ত্বেও খ্রিষ্টীয় সমাজের কাছে ভুল বোঝাবুঝির শিকার হন। পরবর্তীকালে এক প্রতিদানহীন ভালোবাসার সম্পর্কের জটিলতায় তিনি আত্মহত্যার ঝুঁকি নিয়েছিলেন।

এ-সময় হেনি আর ইয়োপ এসে আমার সামনে দাঁড়ায়। হেনি মৃদু হেসে বলে, দূর থেকে তোমাকে দেখে মনে হলো তুমি কিছু ভাবছ? বাড়ির কথা মনে হচ্ছে? মুনা, লারা, শমিকের কথা?

আমি জবাব দেই না। মৃদু হাসি।

চলো যাই, ইয়োপ বলে।

আমরা তিনজনে জাদুঘরের ভেতরে ঢুকি। বড় করে শ্বাস টানি, যেন ছবির কাঁচা রং থেকে এক ঝলক বাতাস ছুটে আসবে। বিশাল ভবনের চারদিক জুড়ে এত ছবি যে একদিনে দেখে শেষ করা যাবে না। বুড়িছোঁয়ার মতো সামনে দাঁড়িয়ে চলে যেতে হবে। একটি ছবির সামনে বেশিক্ষণ দাঁড়ালে হেনি ডাক দেয়। আমি যদি বলি, একটু দাঁড়াও, ও তখন বলে এত অল্পসময়ে সব ছবি দেখতে পারবে না। তারচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো দেখো শুধু। সব দেখতে গেলে তোমার সাতদিন সময় লাগবে।

আমার মনে হয় ও ঠিকই বলেছে। আমি সময় নষ্ট না করে বিভিন্ন ঘর ঘুরতে থাকি। ভ্যানগঁগের ফুলের ছবিগুলো আমাকে আকৃষ্ট করে বেশি। একবার কোথায় যেন পড়েছিলাম যে তাঁর বোন লিখেছিল, ভিনসেন্ট যখন ছোট তখন ফুলের ‘ঝড়ঁষ’ কি তা-ও বুঝত। ও ওঁর সংবেদনশীল হাত দিয়ে ফুল একত্রে বেঁধে গুচ্ছ বানাত। সেই হাত ওর রয়ে গেছে। ওই একই হাত দিয়ে ও এখন তুলি ধরে এবং ওর ক্যানভ্যাসে শুধু ফুল চিত্রিত হয় না, সেই ফুলের ভেতরে সেই ‘ঝড়ঁষ’-ও থাকে। আমি ‘ওজওঝঊঝ’ নামের ফুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকি, ফুলদানিতে একগুচ্ছ ফুল চমৎকারভাবে বিন্যস্ত। মূলত বেগুনি রঙের ফুল, সঙ্গে সাদার ছোঁয়া আছে। পটভূমির রং হলুদ। এই ছবিটি আঁকা হয়েছিল ১৮৯০-তে। এই একই নামে।

তিনি আরেকটি ছবি এঁকেছেন এই একই শিরোনামে। এখানকার ফুলগুলো বাগানে, ছবিটি আঁকা হয়েছিল ১৮৯০ সালে। তেলরঙে আঁকা। চোখ ফেরাতে পারি না। যেন সবকিছু ছাড়িয়ে ফুলের আত্মা বিচ্ছুরিত হচ্ছে। জীবনের নানা টানাপোড়েনে তিনি কিছুটা মানসিক অসুস্থতার শিকার হয়েছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি নিজের কান কেটে ফেলেছিলেন, সেই কানটি কাগজে মুড়ে রাত তিনটায় পতিতালয়ে ফেলে এসেছিলেন। এই ঘটনার পর তাঁর বন্ধু তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পনেরো দিন থাকার পরে সুস্থ হলে হাসপাতাল ছেড়ে আসেন। কিন্তু আর্লসের লোকজন শহর-কর্তৃপক্ষের কাছে একটি দরখাস্ত দেয় যে, এমন ভয়ংকর পাগলকে স্বাধীনভাবে বাস করতে দেওয়া উচিত না। তাঁকে আবার হাসপাতালে পাঠানো হয়। এখানে বসে তিনি কয়েকটি ছবি আঁকেন। নিজের পোর্ট্রেট আঁকেন বেশ কয়েকটি। তার মধ্যে একটি ছিল তাঁর কানে ব্যান্ডেজ বাঁধা পোর্ট্রটে। হাসপাতালের বাগান,ঘরের ভেতরে স্টোভ, পর্দা, বিছানা ইত্যাদির ছবি। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে তিনি নিজেই মনে করেন যে তাঁর কিছুদিন অ্যাসাইলামে থাকা উচিত। তিনি Saint -জবসু অ্যাসাইলামে থাকতে আসেন। এখানকার বাগানের Irises ফুল তাঁকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে। জেনিস লিখেছিলেন, …the deep red soil in which the irises are growing becomes towards the top of the picture an airy green, seeming to suggest a transition from shadwo into light and freedom – perhaps an unconcious symbolism in Van Goghs mind.’

একটু পরে হেনি আমার হাত ধরে টানে। বলে, চলো শিল্পীর নিজের হাতে কান-কাটা ছবিটা দেখবে। ছবির সামনে গিয়ে দাঁড়ালে দেখতে পাই ডান কানটি কাটা। বন্ধুর সঙ্গে রাগ করে কান কাটেন এবং তা একজন পতিতাকে উপহার দেন। ওই বন্ধুর সঙ্গে তিনি যে-বাড়িতে থাকতেন সেই বাড়ির নাম ‘Yellwo House| তাঁর বন্ধুটিও ছিলেন চিত্রশিল্পী। হেনি হাসতে হাসতে বলে, নিজের কান কেউ কাটতে পারে বলো? তারপর ব্যান্ডেজকরা সেই মুখের ছবি এঁকেছে নিজে? ও একদম জাত শিল্পী বুঝলে। ওর প্রতিটি ছবির সঙ্গে জীবনের নানা ঘটনা জড়িয়ে আছে। কয়লাখনির শ্রমিকদের নিয়ে কতগুলো ছবি এঁকেছে আর ড্রইং করেছে। তাদের মতো জীবনযাপন করেছে। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছে, খোলা আকাশের নিচে ঘুমিয়েছে। এর সবটাই কি পাগলামি? মোটেই না। এ-সবই হলো ওঁর শিল্পীসত্তার ‘ঝড়ঁষ’।

হেনি ‘Soul’ শব্দটি ব্যবহার করলে আমি চমকে ওর দিকে তাকাই। ও হেসে মৃদুস্বরে বলে, ভ্যানগঁগের জন্য আমরা গর্বিত। আমি আমার ছেলেমেয়েকে সময় পেলে এই জাদুঘরে নিয়ে আসি। কারণ এই জাদুঘর তো একদিনে দেখে শেষ করার ব্যাপার নয়। ইন্দিরা শিল্পীর ড্রইং খুব পছন্দ করে। আর রডারিক ভালোবাসে ফুল।

জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কী পছন্দ?

হেনি সঙ্গে সঙ্গে বলল, সবই ভালো লাগে। তবে ওর পোর্ট্রটেগুলো আমি ভীষণ পছন্দ করি। ও বিভিন্ন জনের পোর্ট্রটে এঁকেছে।

ইয়োপ পেছনে দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে বলে, আমি গোটা জাদুঘরটা ভালোবাসি। কোন ছবি ছেড়ে কোনটা দেখব আমি ভেবে কুলিয়ে উঠতে পারি না।

আমি ইয়োপের হাত ধরে বলি, আমারও তা-ই মনে হচ্ছে। আমি ফুল দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম, এখন দেখছি শস্যক্ষেত, নিসর্গ আমাকে আরো টানছে। পোর্ট্রেটও, ড্রইংও। আমি বুঝতে পারছি না কী বলব।

ভাবনা রেখে চলো এগোই। হেনি সবাইকে তাড়া দেয়। সন্ধ্যায় আমরা একটি রেস্তোরাঁয় খাবো। ইন্দিরা ও রডারিককে বাড়ি থেকে ওঠাতে হবে। এজন্য হেনির এই তাগাদা। হাঁটতে হাঁটতে যে-ছবিটির ওপর চোখ আটকে যায় সেটি শস্যক্ষেতের পেইন্টিং। নাম Cornfield, ১৮৮৭ সালে আঁকা। আর্লসের যে ইয়োলো হাউসে তিনি থাকতেন সেটিও এঁকেছেন, ১৮৮৮ সালে। বেশ বড় বাড়ি। সমালোচকরা লিখেছেন ‘When he writes, hwo beautiful is yellow, this is not merely the sensual reaction of a painter, but the confession of a man for whom yellwo was the colour of the sun, a symbol of warmth and light. Yellwo aroused ecstacy first as an idea in the man, then as a colour in the artist.’ এভাবে নানা ভাবনার মাঝে ফুলদানিতে রাখা আরেকটি ছবির সামনে যাই, যেটিরনাম Flowers in a Copper Vase, 1886.

অর্ধেক জাদুঘর ঘোরার পরে হেনি বলে, আজ আর দেখা হবে না। তোমার হাতে সময়ও নেই। তুমি কাল সকালে ব্রাসেলস যাবে। সুতরাং এই জাদুঘর দেখে শেষ করতে হলে তোমাকে আরেকবার আমস্টারডামে আসতে হবে।

সেটি আর কোনোদিন হবে কি-না জানি না। তবে পাশের ঘরটা দেখে যেতে চাই।

হেনি সায় দিলে আমরা পাশের ঘরে ঢুকি। যে-দুটো ছবি আমাকে টানে তার একটির নাম Meadwo with butterflies, 1890। অন্যটি হলো Crows over a Cornfield, 1890। প্রথমটি আঁকা হয়েছে মে মাসে, পরেরটি জুলাইয়ে। শস্যক্ষেতের ওপর একঝাঁক কাক উড়ছে, দেখতে দেখতে বুক ভার হয়ে যায়। কাক-প্রসঙ্গ আমাকে ভীষণ নাড়ায়। কারণ কাকের সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর একটি যোগ আছে।

এ-বছরই ছিল তাঁর জীবনের একটি গভীর উন্মাতাল সময়। প্যারিসে গিয়ে জানতে পারেন তাঁর প্রাণপ্রিয় ভাই ঞযবড়-র আর্থিক দুরবস্থার কথা, জানতে পারেন তার শিশুপুত্রের নিদারুণ অসুস্থতার কথা, শিল্পী এসব সহ্য করতে পারেন না। তাঁর পাগলামি বেড়ে যায়। তিনি কাক মারার অজুহাত দেখিয়ে একটি রিভলভার সংগ্রহ করেন।

সেদিন ছিল ১৮৯০ সালের ২৭ জুলাই। … he wanted to shoot crows, went into the fields, leaned against the trunk of a tree and shoot himself in the breast.’

নিজের হাতে নিজের জীবনের অবসান ঘটালেন। Dr. Gachet বাঁচানোর চেষ্টা করলেন। এই ডাক্তার তাঁকে দেখাশোনা করতেন। ডাক্তারের পোর্ট্রেট তিনি এঁকেছিলেন। কিন্তু শত চেষ্টা করার পর মাত্র দুদিন।

ভিনসেন্ট ভ্যানগঁগ মারা গেলেন ২৯ জুলাই, ১৮৯০।

পাশের একটি ছবি দেখিয়ে হেনি বলল, দেখো, এই বাগানের ছবিটা দারুণ। অপূর্ব লাগছে।

আমি বললাম, আর এসব কাক!

কাক! হেনি বিস্ময়ে আমার দিকে তাকায়। তারপর ওর দৃষ্টি আবার বাগানের পেইন্টিংয়ের ওপর যায়। বলে, তাঁর মৃত্যুর বছরেই ছবিটি আঁকা হয়েছে। জুন মাসে।

আর শস্যক্ষেতের ওপর কাকের ছবিটা জুলাই মাসে।

তুমি কাক নিয়ে এত ভাবছ কেন বলোতো?

আমি হেনি আর ইয়োপের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলি, ‘He borrowed a revolver on the pretext that he wanted to shoot crows …’

ওরা দুজনে সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় নেড়ে বলল, বুঝেছি।

আমরা কেউ আর কথা বলি না। নিঃশব্দে বেরিয়ে আসি। সেদিনের মতো আমাদের জাদুঘর দেখা শেষ হয়েছে।

বাড়ি ফিরলে ইন্দিরা বলে, কেমন দেখলে জাদুঘর?

আমি হাসতে হাসতে বলি, তোমাদের ভিনসেন্টকে দেখে এলাম।

ইন্দিরা হি-হি করে হাসতে হাসতে বলে, আমাদের ভিনসেন্ট কানকাটা রাজা। ভাবো তো কেমন শিল্পী তিনি, যে নিজের কান নিজে কেটে আবার তার ছবি এঁকেছেন।

পাশ থেকে রডারিক বলে, দারুণ লোক।

হয়েছে, সবাই থামো। চলো আমরা বেরিয়ে পড়ি।

গাড়িতে উঠতে উঠতে হেনি বলে, তুমি পৃথিবীখ্যাত এমন আর কোনো শিল্পীর মিউজিয়াম দেখেছ?

মিউজিয়াম অনেক দেখেছি। তবে একক কোনো শিল্পীর না। তবে এ-বছরের ২২ এপ্রিল লন্ডনের টেট গ্যালারিতে পিকাসোর এক্সিবিশন দেখেছি।

আমিও প্যারিসে পিকাসোর এক্সিবিশন দেখেছি।

হেনি কথা বলতে বলতে গাড়ির সামনের সিটে বসে। ইয়োপ চালাবে। আমরা তিনজন পেছনের সিটে। হেনির বাড়ি যেখানে সে-জায়গার নাম voorschoten. এখান থেকে আমস্টারডাম পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ড্রাইভ। আমরা সেদিকে যাচ্ছি। গাড়ি ছুটছে। একসময় হেনি ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, আজকে মিউজিয়ামের সামনে তোলা তোমার ছবিগুলো প্রিন্ট করতে দেবো, যেন তুমি সঙ্গে করে নিয়ে যেতে পারো।

ইয়োপ ঘাড় ঘোরায় না। কিন্তু হাসতে হাসতে বলে, আমি জানি ওই দু-তিনটি ছবিই সেলিনার প্রিয় স্মৃতি হবে। ও হল্যান্ডের অনেক কিছুই ভুলে যাবে, কিন্তু ভুলবে না এই মিউজিয়ামের কথা।

আমি জোরে জোরেই বলি, থ্যাঙ্ক ইউ, ইয়োপ।

সহায়ক গ্রন্থ :

১. The Life and Works of Vincent Vangogh _ Janice Anderson, Parragon Book Service Limited, Great Britain, 1994

২. Vangogh – W. Uhde, Phaidon Publishers,    III Fourth Avenue, Nwe York, First Published 1951

Published :


Comments

Leave a Reply