শুরুটা অভিনব তো বটেই, এমনকি বেশ মজার। কোনো উপন্যাসের শুরু কি ঠিক এমনভাবে হয়? তা ছাড়া, উপন্যাসের কাহিনীগতির অন্তর্গতও এটি নয়, কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়েই এ-সব কথা বলা
হচ্ছে। আরম্ভটা এইরকম। আমি কিঞ্চিৎ কাটছাঁট করেই তুলে দিচ্ছি :
মান্যবর সকলে, হুজুরেরা, প্রণম্যগণ, হে দেশবাসী!
আমাদের রুষ সাম্রাজ্য বিষয়টি কী?
আমাদের রুষ সাম্রাজ্য হইল একরূপ ভৌগোলিক অস্তিত্ব, একটি অতিপরিচিত গ্রহের অংশবিশেষ। এই রুষ সাম্রাজ্যের মধ্যে রহিয়াছে প্রথমত বৃহৎ রুষিয়া, ক্ষুদ্র রুষিয়া, শ্বেত রুষিয়া এবং লোহিত রুষিয়া; দ্বিতীয়ত রহিয়াছে জর্জিয়া, পোল্যান্ড, কাজান ও আস্ত্রাখান নামের রাজ্যসমূহ এবং তৃতীয়ত… হইল তো, … ঠিক আছে, … ঠিক আছে … ঐ আর কি…
আমাদের রুষ সাম্রাজ্যের মধ্যে রহিয়াছে বহু নগরী, রাজধানীবাচ্য, প্রাদেশিক, জিলা নামাঙ্কিত, আর স্বায়ত্তশাসিত নগরাবলি; এবং সর্বোপরি রহিয়াছে এক মহানগরী, ও সকল রুষীয় শহরের মাতৃস্বরূপা এক নগরী।
মহানগরীটি হইল মস্কো; রুষী নগরবৃন্দের জননী হইল গিয়া কিয়েভ্।
পিতের্বুর্গ্, সাংক্ৎ পিতের্বুগ্র্, অথবা পিওর্ৎ (বস্তুত সবে মিলিয়া একই) তো রুষ সাম্রাজ্যেরই অংশ।
আমাদের কথা মোটের উপর পিতের্বুর্গ্ লইয়াই : সাংক্ৎ পিতের্বুর্গ্ও কহিতে পারেন, কিংবা চাই-কি শুধুই পিওর্ৎ (সকলই তো একই হইল)। এই একই যুক্তি প্রয়োগহেতু নিয়েভ্স্কি সড়কটিকে বলিতে পারেন পিতের্বুর্গ্ সড়ক।
সকলকে মুগ্ধ করিয়া দিবার মতো গুণ নিয়েভ্স্কি সড়কের রহিয়াছে বৈকি : আমজনতার গায়ে হাওয়া লাগাইয়া ঘুরাফিরার জন্য উন্মুক্ত বিস্তার; ইহাকে রুদ্ধ করিয়া দাঁড়াইয়া আছে নম্বরচিহ্ন লইয়া বাড়ির পর বাড়ি – ইহাতে লাভ হইয়াছে এই যে, যে-গৃহই আমরা চাই না কেন তাহা খুঁজিয়া পাওয়া বড়োই সহজ। নিয়েভ্স্কি সড়ক হইল সকল সড়কের ন্যায় একটি গণসড়ক; অর্থাৎ কিনা – ইহা এমন এক সড়ক যেখানে চলাচল করে জনগণ (বাতাস নহে কিন্তু, আপনি নিশ্চিত হইতে পারেন); তাহাতে সারি বাঁধিয়া যে বাটীকাসকল দাঁড়াইয়া আছে এবং সম্মুখভাগ সুদৃশ্য করিয়াছে তাহাই হইল গিয়া ইহার সারাৎসার Ñ হুম্… ঠিকই… সবই আমজনতার জন্য। সায়াহ্নকালে নিয়েভ্স্কি সড়ক বৈদ্যুতিক বাতি দ্বারা আলোকিত হয়। দিবাভাগে কিন্তু এই সড়কটিতে কোনো উজ্জ্বলতার প্রয়োজন হয় না।…
রাজধানী শহরটিতে নিয়েভ্স্কি সড়ক হইল অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক। ইহা সর্বাংশে কিন্তু রুষী নয়। অন্যান্য রুষীয় শহরগুলোতে সারিবদ্ধ ক্ষুদ্রাকার কাষ্ঠনির্মিত গৃহাদি ব্যতীত বড়ো কিছু একটা দেখা যায় না।
পিতের্বুর্গ্ ঐ সকল হইতে একেবারে তাক লাগাইবার মতো অন্যরকম।
আপনারা যদি নাই-আঁকড়ার মতো ঐ অশ্লীল গল্পটি লইয়া জিদ্ করিতে থাকেন যে, মস্কোয় তো পনের লক্ষ লোকের অধিবাস, তাহা হইলে শেষাবধি মানিতেই হয় যে – প্রকৃত রাজধানী হওয়া উচিত মস্কোরই, কারণ কেবল রাজধানীরই এক্তেয়ার থাকে পনের লক্ষ মানুষ ধরিয়া রাখিতে; প্রাদেশিক শহরসমূহে তো এরূপ জনসংখ্যা নাই – অতীতেও কখনও ছিল না, ভবিষ্যতেও কখনও হইবে না। এই অশ্লীল গল্প যদি আপনাদের বিশ্বাস হয়, তবে তো পিতের্বুর্গ্কে রাজধানী কওন যায় না।
আর পিতের্বুর্গ্ যদি রাজধানী না হয়, তবে তো পিতের্বুগের অস্তিত্বই রহিল না। তাহা হইলে, ইহার অস্তিত্ব কেবলই কল্পনাপ্রসূত হইয়া গেল।
অথচ, পিতের্বুর্গ্ তো আদৌ কাল্পনিক নয়; ইহাকে মানচিত্রের মধ্যে শনাক্ত করিতে পারা যায় – এটি কৃষ্ণকায় বিন্দু ও তাহার চারিদিকে গোলাকার বৃত্ত, এইভাবে দেখা যায়; আর এই গণিতশাস্ত্রীয় বিন্দুটি – যাহা পরিমাপ করা যায় না – কিন্তু বিক্রমসহকারে নিজ অস্তিত্ব ঘোষণা করিতে থাকে : ঐ বিন্দুটি হইতেই ক্রমাগত নিঃসরিত হইতে থাকে শব্দস্রোতমালা, হইতে-হইতে একটি গ্রন্থের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ভরিয়া দিতে থাকে; এবং ঐ বিন্দুটি হইতেই বিজ্ঞপ্তি প্রজ্ঞাপন ইত্যাদি বাহির হইয়া চতুর্দিকে কেবলই ছড়াইয়া যাইতে থাকে।
তো, এই হলো মুখপাত, কি কথারম্ভ, বা উপক্রমণিকা, যা-ই বলি না কেন। উপন্যাস পিতের্বুর্গ্ তার জবরদস্ত্ সময়ের সন্তানসন্ততি নিয়ে হাজির হতে শুরু করবে এর পরে, মানে উপরের ঐ বয়ানের পরে। ঠিক আছে, উপন্যাসশুরুর প্রথম বাক্যটি বলেই না হয় এখানে রাশ টানি; সেটিও কম কৌতুকপ্রদ নয়। বাক্যটি হলো : ‘আপল্লোন্ আপল্লোনভিচ্ আব্লেউখফ্ অতিশয় সুন্দর বংশোদ্ভূত পুরুষ – তাঁহার পূর্বপুরুষ হইল গিয়া বাবা আদম।’
আন্দ্রেই বিয়েলি, যিনি এই উপন্যাসের নির্মাতা, তাঁকে নিয়ে দু-চার কথা বলার উদ্দেশ্যেই হেন
প্রস্তাবনা। বিয়েলিকে আমরা বাঙালি পাঠকেরা প্রায় চিনি না বললেই চলে। অবশ্য যাঁরা রুশ ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ব্যাপারে উৎসাহী তাঁদের ব্যাপার আলাদা, তাঁরা জানবেনই। আমার রচনার উদ্দীষ্ট তাঁরা নন। বাংলা অনুবাদ-সাহিত্যের এই এক দুর্ভাগ্য, বিশ্বসাহিত্যের শ্রুতকীর্তি নমুনাগুলোর প্রায় কিছুই ভাষান্তরিত হয়নি। আন্দ্রেই বিয়েলির কোনো রচনার – কবিতা-গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ-গবেষণা, কোনো কিছুরই তর্জমা বাংলাতে আমি দেখিনি। যদি-বা হয়ে থাকে তার সংখ্যা এতই নগণ্য যে, আমার চোখ এড়িয়ে গেলেও আমার লজ্জা পাওয়ার কারণ নেই। এখনকার রাশিয়ায় কী অবস্থা জানি না, কিন্তু সোভিয়েত আমলে যখন কিছুকাল সেখানে বাসের অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল আমি বিয়েলির রচনা বাজারে বিকোতে দেখিনি। শুধু তাঁরই নয়, তাঁর সময়কালের বহু লেখকেরই নয়। যেমন, ধরা যাক, ইভ্গিয়েনি জামিআতিন্, ফিওর্দ সলগুব্, ভাদিস্লাফ্ খোদাসিয়েভিচ্, কন্স্তান্তিন্ বাল্মোন্ত্, নিকলাই গুমিলিওফ্, ওসিপ্ মান্দেল্শ্তাম্, ভেলির্মি খি¬য়েব্নিকফ্, মিখাইল্ কুজ্মিন্।
আমরা হয় এঁদের চিনিই না, নয়তো কেবল নামের সঙ্গে পরিচিত। এঁদেরই বন্ধুবৃত্তের অন্তর্গত – কখনো সমবয়সী, কখনো হয়তো কিঞ্চিৎ বয়োজ্যেষ্ঠ – মাত্র তিনজনের সঙ্গে বাঙালি কাব্যরসিক বা রুশসাহিত্য-ভক্তের কমবেশি পরিচয় আছে : ভাদির্মি মায়াকোফ্স্কি, আলেক্সান্দ্র্ ব্লোক্, আর আন্না আখ্মাতভা। আমাদের কাছে যে-তথ্য অজ্ঞাত তা হলো, যত জনের নাম উপরে উচ্চারিত হয়েছে তাঁরা প্রত্যেকেই একটি বিশেষ সময়ের সংলগ্ন প্রধান সাহিত্যব্রতী। ইংরেজি ভাষার বাইরে যে-কোনো বিদেশী সাহিত্য যেহেতু আমাদের হাতে ইংরেজির মাধ্যমেই এসে পৌঁছয় তাই অনুবাদ অলভ্যতার কারণে এঁদের নাম আমাদের অগোচরে থেকে গেছে।
রুশসাহিত্যে ‘রৌপ্য যুগ’ বলে এক সময়খণ্ড আছে। মোটামুটিভাবে বিগত শতকের প্রথম পঁচিশ বছরকে এর ভিতরে ফেলা যায়। সাহিত্য ও শিল্পের নানাবিধ শাখায় এবং নন্দনতত্ত্বীয় চিন্তায় এত রকম গোষ্ঠী, আন্দোলন, পত্রপত্রিকা, সভাসমিতি এ-সময়ে জন্মেছে যে বিস্ময়কর তো বটেই, প্রায়-অবিশ্বাস্য। স্তালিন-যুগের কিছু আগুপিছু যাঁরা দেশান্তরী হয়ে ইউরোপ-আমেরিকার নানা স্থানে বসতি গাড়েন তাঁদের ভিতরে জনা কয়েক আমাদের বিলক্ষণ চেনা : মার্ক্ শাগাল্, ভাসিলি কান্দিন্স্কি, রমান্ ইয়াকব্সন্। দেশের ভিতরে থেকে গেলে এঁদের জানতে আরো সময় লাগত। এঁরাও কিন্তু ঐসব দলেরই হিরেজহরতের চুম্কি ছিলেন।
আমার খুব গোপন এক বাসনা অচরিতার্থ থেকেই হয়তো আমার মৃত্যুর সঙ্গেই দেহান্তর লাভ করবে। ইচ্ছেটা এই, কৃতবিদ্য কোনো ব্যক্তি ঐ রুশী রুপোলি যুগের এক জম্পেশ আলেখ্য লিখুন। রুশ ভাষা-সাহিত্যে পারঙ্গম মানুষ এখানে কম নেই; স্বাধীনতার পর ওদেশে পড়াশুনো করে এসেছেন, অত্যন্ত ভালো রুশ জানেন এমন লোক অনেকেই আছেন, আমি জানি। আমার নিবেদন, তাঁরা কেউ ‘কল্লোল যুগ’ ধরনের একটি বই লিখুন ওই সময় নিয়ে। কী যে বর্ণাঢ্য, ঝকমকে একটা ব্যাপার হবে!
আন্দ্রে বিয়েলির (১৮৮০-১৯৩৪) তো লেখক হওয়ার কথাই ছিল না। লেখক হলেন বলেই-না এই তাখাল্লুস। নইলে আসল নাম যা
তা-ই থাকত : বরিস্ নিকলায়েভিচ্ বুগায়েফ্, অর্থাৎ বুগায়েফ্ বংশের নিকলাই-এর পুত্র বরিস্। বাবা নিকলাই ভাসিলিয়েভিচ্ বুগায়েফ্ ছিলেন মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতশাস্ত্রের ডাকসাইটে অধ্যাপক। মা আলেক্সান্দ্রা দ্মিত্রিয়েভ্না প্রায় ডানাকাটা পরী, তদুপরি সংগীতশাস্ত্রে পারদর্শিনী। ছেলেমেয়ে বলতে ওই একটিই, সবেধন নীলমণি, পুত্র শ্রীমান বরিস্। বাড়িতে বাবা-মার বন্ধুবান্ধবসূত্রে যে-জগতের সঙ্গে চেনাজানা হয় তা সর্বাংশে মেধাশ্রয়ী, শিল্পবৃত্তীয়, নান্দনিক। একমাত্র সন্তানের যোগ্য প্রতিপালন নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর স্বপ্নের সংঘাত বরিসের মনোজগতেও ছায়া ফেলে নিশ্চয়ই। নাম পাল্টে আন্দ্রেই বিয়েলি হওয়ার সেটি এক কারণ হয়তো-বা। ছেলেকে কবিতার দিকে ঝুঁকতে দেখলে বাবা রেগে যান গণিতের শত্রুকে নিজের ঘরে প্রশ্রয় পেতে দেখে। চান, ছেলে হবে গণিতবিদ। আর মা ঠিক উল্টো। ছেলে প্রশ্রয় পায় সেখানে। নাম হয়তো পাল্টাতেই হতো, বাবাকে ঠকানোর জন্যে। কিন্তু তা বলে ওই নামটিই কেন? ‘বিয়েলি’ মানে শ্বেত, সাদা, সফেদ। আর আন্দ্রেই হলেন সুপ্রাচীন সন্ত, যাঁর হাত ধরে খ্রিষ্টধর্ম রুশ ভূখণ্ডে খুঁটি গাড়ে। আন্দ্রেই যেন বাপ-মায়ের সন্তান বরিস্কে এক ঝট্কায় ভিন্ন এক আসনে তুলে নিয়ে বসিয়ে দিল। সে-এক ইন্দ্রিয়াতীত মরমীবাদের দুনিয়া – ধর্মকে সঙ্গী করে নয়, অঙ্কশাস্ত্র ও সংগীত ও দর্শন ইত্যাদির সম্মিলনে নির্মিত নতুন এক কাব্যদর্শন উদ্ভাবন করলেন বিয়েলি। ক্রমে ব্লোক্, মেরেজ্কোফ্স্কি, জামিয়াতিন্, মেন্দেল্শ্তাম্ প্রমুখ বন্ধুদের নিয়ে রুশ কাব্যশিল্পে প্রতীকবাদের জন্ম দেবেন।
সুদর্শন পুরুষ ছিলেন। সমকালীন সাক্ষ্য বলছে যে, তাঁর সকল বন্ধুবান্ধব ও সতীর্থ সাহিত্যিক তাঁর অনেকটা যেন প্রেমেই পড়ে ছিলেন। কবি জিনাইদা গিপ্পিউস্ লিখেছেন, ওই তরুণ কবি ‘কখনও হাঁটতেন না… যেন নাচতেন’। অকালপ্রয়াত কবি মান্দেল্শ্তামের বিধবা পত্নী নাদিয়েজ্দার দুখণ্ডের আত্মজীবনীতে বিয়েলি কী মুগ্ধতা ও স্নেহেই-না উল্লেখিত হয়েছেন। আমার পড়ে মনে হয়েছে, এ যেন এক রুশ অস্কার ওয়াইল্ড। তিনি লিখছেন : “বিয়েলি মনে হতো তার চারদিকে আলো বিচ্ছুরিত করছে, আমি এমন আরেকটি মানুষকে দেখিনি, যে কিনা আক্ষরিক অর্থেই বিভান্বিত। এরকমটা যে কেন মনে হতো – সে কি ওর চোখের জন্যে, নাকি তার মাথা থেকে যে অবিরত আইডিয়া-প্রবাহ বেরুচ্ছে তার কারণে, সে বলা ভারি শক্ত; কিন্তু তার সান্নিধ্যে যেই আসত সেই তার মনস্বিতায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হতো। তার উপস্থিতি, তোমার পানে তার তাকানোর ভঙ্গি, আর তার কণ্ঠস্বরে মন চাঙ্গা হয়ে উঠত, নাড়ির গতি দ্রুততর হতো। কিছু যেন একটা অশরীরী, তড়িৎপ্রবাহ, মূর্তিমান বিদ্যুৎগর্জন, কী-রকম যেন অব্যাখ্যেয় অলৌকিক ব্যাপার – আমার স্মৃতিতে এসব ধরা আছে।… বিয়েলির কথা বলার ভঙ্গি ছিল পাস্তের্নাকের ঠিক বিপরীত। বিয়েলির কথা যেন তোমাকে ঢেকে ফেলে, জড়িয়ে ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে, ক্রমে ক্রমে তোমাকে বিমুগ্ধ করে, তোমাকে তার নিজের দিকে টেনে নিয়ে, তোমাকে শেষ পর্যন্ত দখল করে নেবে। কণ্ঠস্বরের ধরনটা ছিল একটু থতমত-খাওয়া, ফুর্তির মেজাজও খানিকটা, যেন শ্রোতা-সম্পর্কে সে ঠিক নিশ্চিত হতে পারছে না, ভয় পাচ্ছে যদি তার কথা ভুল বোঝে কিংবা মন দিয়ে না শোনে – মানে তোমার আস্থা ও মনযোগ কীভাবে পাবে সে-জন্যে তার চেষ্টার কমতি নেই।”
এ-ই হচ্ছেন আন্দ্রেই বিয়েলি। চুয়ান্ন বছরের জীবন সৃজনশীলতার দিক থেকে ফলপ্রসূভাবে কেটেছিল, কিন্তু সাংসারিক জীবন তত শান্তির ছিল না। বহির্মুখী ছিলেন, কিছুটা উড়নচণ্ডী ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। প্রথম স্ত্রী আসিয়া তুর্গিয়েনেভা যে চলে গেলেন সে তো তাঁরই অবিমৃষ্যকারিতার কারণে। পরে ক্লাভেদিয়া ভাসিলিয়েভাকে বিয়ে করলেন এবং দাম্পত্য-সম্পর্কে চিড়ও ধরেনি। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের অত্যাচার সেই শান্তিতে বাদ সেধেছিল। বিয়েলিকে শাস্তি দেওয়ার জন্যে স্ত্রীকে জেলে ভরেছে বারবার।
আধুনিক রুশ গদ্যের শ্রেষ্ঠ প্রতিভা হিসেবে বিয়েলির স্বীকৃতি প্রায় তর্কাতীত। প্রতীকবাদী কাব্যদর্শনের অন্যতম নির্মাতা হলেও গদ্যশৈলী-নির্মাণে তাঁর নিরীক্ষণধর্মিতা অসামান্য এবং পরবর্তী প্রজন্মসমূহের উপরে তাঁর গদ্যের প্রভাব-ব্যাপারে প্রায় সকলেই একমত। বাইশ বছর বয়সে লিখতে শুরু করেন, মৃত্যুর বছরেও তাঁর শেষ বই বেরিয়েছে। গীতিকবিতা, এপিকধর্মী কবিতা, উপন্যাস, গল্পগ্রন্থ, প্রবন্ধসংগ্রহ, গবেষণাগ্রন্থ, দার্শনিক রচনা, স্মৃতিকথা, সমকালীন কবি ও কবিতার মূল্যায়ন Ñ আন্দ্রেই বিয়েলির কৌতূহল ও সাধনার বৈচিত্র্য ঈর্ষণীয়।
পিতের্বুর্গ্, যে-উপন্যাসের উল্লেখ করেছি নান্দীমুখে, বিশ শতকের বিশ্বে রচিত গুটিচারেক উপন্যাসের একটি বলে নবোকফ্ বিশ্বাস করতেন।
০৬ই জুলাই ২০০৪
রাজধানী শহরটিতে নিয়েভ্স্কি সড়ক হইল অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক। ইহা সর্বাংশে কিন্তু রুষী নয়। অন্যান্য রুষীয় শহরগুলোতে সারিবদ্ধ ক্ষুদ্রাকার কাষ্ঠনির্মিত গৃহাদি ব্যতীত বড়ো কিছু একটা দেখা যায় না। পিতের্বুর্গ্ ঐ সকল হইতে একেবারে তাক লাগাইবার মতো অন্যরকম।
আপনারা যদি নাই-আঁকড়ার মতো ঐ অশ্লীল গল্পটি লইয়া জিদ্ করিতে থাকেন যে, মস্কোয় তো পনের লক্ষ লোকের অধিবাস, তাহা হইলে শেষাবধি মানিতেই হয় যে – প্রকৃত রাজধানী হওয়া উচিত মস্কোরই, কারণ কেবল রাজধানীরই এক্তেয়ার থাকে পনের লক্ষ মানুষ ধরিয়া রাখিতে; প্রাদেশিক শহরসমূহে তো এরূপ জনসংখ্যা নাই – অতীতেও কখনও ছিল না, ভবিষ্যতেও কখনও হইবে না। এই অশ্লীল গল্প যদি আপনাদের বিশ্বাস হয়, তবে তো পিতের্বুর্গ্কে রাজধানী কওন যায় না।
আর পিতের্বুর্গ্ যদি রাজধানী না হয়, তবে তো পিতের্বুগের অস্তিত্বই রহিল না। তাহা হইলে, ইহার অস্তিত্ব কেবলই কল্পনাপ্রসূত হইয়া গেল।
অথচ, পিতের্বুর্গ্ তো আদৌ কাল্পনিক নয়; ইহাকে মানচিত্রের মধ্যে শনাক্ত করিতে পারা যায় – এটি কৃষ্ণকায় বিন্দু ও তাহার চারিদিকে গোলাকার বৃত্ত, এইভাবে দেখা যায়; আর এই গণিতশাস্ত্রীয় বিন্দুটি – যাহা পরিমাপ করা যায় না – কিন্তু বিক্রমসহকারে নিজ অস্তিত্ব ঘোষণা করিতে থাকে : ঐ বিন্দুটি হইতেই ক্রমাগত নিঃসরিত হইতে থাকে শব্দস্রোতমালা, হইতে-হইতে একটি গ্রন্থের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ভরিয়া দিতে থাকে; এবং ঐ বিন্দুটি হইতেই বিজ্ঞপ্তি প্রজ্ঞাপন ইত্যাদি বাহির হইয়া চতুর্দিকে কেবলই ছড়াইয়া যাইতে থাকে।
তো, এই হলো মুখপাত, কি কথারম্ভ, বা উপক্রমণিকা, যা-ই বলি না কেন। উপন্যাস পিতের্বুর্গ্ তার জবরদস্ত্ সময়ের সন্তানসন্ততি নিয়ে হাজির হতে শুরু করবে এর পরে, মানে উপরের ঐ বয়ানের পরে। ঠিক আছে, উপন্যাসশুরুর প্রথম বাক্যটি বলেই না হয় এখানে রাশ টানি; সেটিও কম কৌতুকপ্রদ নয়। বাক্যটি হলো : ‘আপল্লোন্ আপল্লোনভিচ্ আব্লেউখফ্ অতিশয় সুন্দর বংশোদ্ভূত পুরুষ – তাঁহার পূর্বপুরুষ হইল গিয়া বাবা আদম।’
আন্দ্রেই বিয়েলি, যিনি এই উপন্যাসের নির্মাতা, তাঁকে নিয়ে দু-চার কথা বলার উদ্দেশ্যেই হেন প্রস্তাবনা। বিয়েলিকে আমরা বাঙালি পাঠকেরা প্রায় চিনি না বললেই চলে। অবশ্য যাঁরা রুশ ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ব্যাপারে উৎসাহী তাঁদের ব্যাপার আলাদা, তাঁরা জানবেনই। আমার রচনার উদ্দীষ্ট তাঁরা নন। বাংলা অনুবাদ-সাহিত্যের এই এক দুর্ভাগ্য, বিশ্বসাহিত্যের শ্রুতকীর্তি নমুনাগুলোর প্রায় কিছুই ভাষান্তরিত হয়নি। আন্দ্রেই বিয়েলির কোনো রচনার – কবিতা-গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ-গবেষণা, কোনো কিছুরই তর্জমা বাংলাতে আমি দেখিনি। যদি-বা হয়ে থাকে তার সংখ্যা এতই নগণ্য যে, আমার চোখ এড়িয়ে গেলেও আমার লজ্জা পাওয়ার কারণ নেই। এখনকার রাশিয়ায় কী অবস্থা জানি না, কিন্তু সোভিয়েত আমলে যখন কিছুকাল সেখানে বাসের অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল আমি বিয়েলির রচনা বাজারে বিকোতে দেখিনি। শুধু তাঁরই নয়, তাঁর সময়কালের বহু লেখকেরই নয়। যেমন, ধরা যাক, ইভ্গিয়েনি জামিআতিন্, ফিওর্দ সলগুব্, ভাদিস্লাফ্ খোদাসিয়েভিচ্, কন্স্তান্তিন্ বাল্মোন্ত্, নিকলাই গুমিলিওফ্, ওসিপ্ মান্দেল্শ্তাম্, ভেলির্মি খি¬য়েব্নিকফ্, মিখাইল্ কুজ্মিন্।
আমরা হয় এঁদের চিনিই না, নয়তো কেবল নামের সঙ্গে পরিচিত। এঁদেরই বন্ধুবৃত্তের অন্তর্গত – কখনো সমবয়সী, কখনো হয়তো কিঞ্চিৎ বয়োজ্যেষ্ঠ – মাত্র তিনজনের সঙ্গে বাঙালি কাব্যরসিক বা রুশসাহিত্য-ভক্তের কমবেশি পরিচয় আছে : ভাদির্মি মায়াকোফ্স্কি, আলেক্সান্দ্র্ ব্লোক্, আর আন্না আখ্মাতভা। আমাদের কাছে যে-তথ্য অজ্ঞাত তা হলো, যত জনের নাম উপরে উচ্চারিত হয়েছে তাঁরা প্রত্যেকেই একটি বিশেষ সময়ের সংলগ্ন প্রধান সাহিত্যব্রতী। ইংরেজি ভাষার বাইরে যে-কোনো বিদেশী সাহিত্য যেহেতু আমাদের হাতে ইংরেজির মাধ্যমেই এসে পৌঁছয় তাই অনুবাদ অলভ্যতার কারণে এঁদের নাম আমাদের অগোচরে থেকে গেছে।
রুশসাহিত্যে ‘রৌপ্য যুগ’ বলে এক সময়খণ্ড আছে। মোটামুটিভাবে বিগত শতকের প্রথম পঁচিশ বছরকে এর ভিতরে ফেলা যায়। সাহিত্য ও শিল্পের নানাবিধ শাখায় এবং নন্দনতত্ত্বীয় চিন্তায় এত রকম গোষ্ঠী, আন্দোলন, পত্রপত্রিকা, সভাসমিতি এ-সময়ে জন্মেছে যে বিস্ময়কর তো বটেই, প্রায়-অবিশ্বাস্য। স্তালিন-যুগের কিছু আগুপিছু যাঁরা দেশান্তরী হয়ে ইউরোপ-আমেরিকার নানা স্থানে বসতি গাড়েন তাঁদের ভিতরে জনা কয়েক আমাদের বিলক্ষণ চেনা : মার্ক্ শাগাল্, ভাসিলি কান্দিন্স্কি, রমান্ ইয়াকব্সন্। দেশের ভিতরে থেকে গেলে এঁদের জানতে আরো সময় লাগত। এঁরাও কিন্তু ঐসব দলেরই হিরেজহরতের চুম্কি ছিলেন।
আমার খুব গোপন এক বাসনা অচরিতার্থ থেকেই হয়তো আমার মৃত্যুর সঙ্গেই দেহান্তর লাভ করবে। ইচ্ছেটা এই, কৃতবিদ্য কোনো ব্যক্তি ঐ রুশী রুপোলি যুগের এক জম্পেশ আলেখ্য লিখুন। রুশ ভাষা-সাহিত্যে পারঙ্গম মানুষ এখানে কম নেই; স্বাধীনতার পর ওদেশে পড়াশুনো করে এসেছেন, অত্যন্ত ভালো রুশ জানেন এমন লোক অনেকেই আছেন, আমি জানি। আমার নিবেদন, তাঁরা কেউ ‘কল্লোল যুগ’ ধরনের একটি বই লিখুন ওই সময় নিয়ে। কী যে বর্ণাঢ্য, ঝকমকে একটা ব্যাপার হবে!
আন্দ্রে বিয়েলির (১৮৮০-১৯৩৪) তো লেখক হওয়ার কথাই ছিল না। লেখক হলেন বলেই-না এই তাখাল্লুস। নইলে আসল নাম যা তা-ই থাকত : বরিস্ নিকলায়েভিচ্ বুগায়েফ্, অর্থাৎ বুগায়েফ্ বংশের নিকলাই-এর পুত্র বরিস্। বাবা নিকলাই ভাসিলিয়েভিচ্ বুগায়েফ্ ছিলেন মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতশাস্ত্রের ডাকসাইটে অধ্যাপক। মা আলেক্সান্দ্রা দ্মিত্রিয়েভ্না প্রায় ডানাকাটা পরী, তদুপরি সংগীতশাস্ত্রে পারদর্শিনী। ছেলেমেয়ে বলতে ওই একটিই, সবেধন নীলমণি, পুত্র শ্রীমান বরিস্। বাড়িতে বাবা-মার বন্ধুবান্ধবসূত্রে যে-জগতের সঙ্গে চেনাজানা হয় তা সর্বাংশে মেধাশ্রয়ী, শিল্পবৃত্তীয়, নান্দনিক। একমাত্র সন্তানের যোগ্য প্রতিপালন নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর স্বপ্নের সংঘাত বরিসের মনোজগতেও ছায়া ফেলে নিশ্চয়ই। নাম পাল্টে আন্দ্রেই বিয়েলি হওয়ার সেটি এক কারণ হয়তো-বা। ছেলেকে কবিতার দিকে ঝুঁকতে দেখলে বাবা রেগে যান গণিতের শত্রুকে নিজের ঘরে প্রশ্রয় পেতে দেখে। চান, ছেলে হবে গণিতবিদ। আর মা ঠিক উল্টো। ছেলে প্রশ্রয় পায় সেখানে। নাম হয়তো পাল্টাতেই হতো, বাবাকে ঠকানোর জন্যে। কিন্তু তা বলে ওই নামটিই কেন? ‘বিয়েলি’ মানে শ্বেত, সাদা, সফেদ। আর আন্দ্রেই হলেন সুপ্রাচীন সন্ত, যাঁর হাত ধরে খ্রিষ্টধর্ম রুশ ভূখণ্ডে খুঁটি গাড়ে। আন্দ্রেই যেন বাপ-মায়ের সন্তান বরিস্কে এক ঝট্কায় ভিন্ন এক আসনে তুলে নিয়ে বসিয়ে দিল। সে-এক ইন্দ্রিয়াতীত মরমীবাদের দুনিয়া – ধর্মকে সঙ্গী করে নয়, অঙ্কশাস্ত্র ও সংগীত ও দর্শন ইত্যাদির সম্মিলনে নির্মিত নতুন এক কাব্যদর্শন উদ্ভাবন করলেন বিয়েলি। ক্রমে ব্লোক্, মেরেজ্কোফ্স্কি, জামিয়াতিন্, মেন্দেল্শ্তাম্ প্রমুখ বন্ধুদের নিয়ে রুশ কাব্যশিল্পে প্রতীকবাদের জন্ম দেবেন।
সুদর্শন পুরুষ ছিলেন। সমকালীন সাক্ষ্য বলছে যে, তাঁর সকল বন্ধুবান্ধব ও সতীর্থ সাহিত্যিক তাঁর অনেকটা যেন প্রেমেই পড়ে ছিলেন। কবি জিনাইদা গিপ্পিউস্ লিখেছেন, ওই তরুণ কবি ‘কখনও হাঁটতেন না… যেন নাচতেন’। অকালপ্রয়াত কবি মান্দেল্শ্তামের বিধবা পত্নী নাদিয়েজ্দার দুখণ্ডের আত্মজীবনীতে বিয়েলি কী মুগ্ধতা ও স্নেহেই-না উল্লেখিত হয়েছেন। আমার পড়ে মনে হয়েছে, এ যেন এক রুশ অস্কার ওয়াইল্ড। তিনি লিখছেন : “বিয়েলি মনে হতো তার চারদিকে আলো বিচ্ছুরিত করছে, আমি এমন আরেকটি মানুষকে দেখিনি, যে কিনা আক্ষরিক অর্থেই বিভান্বিত। এরকমটা যে কেন মনে হতো – সে কি ওর চোখের জন্যে, নাকি তার মাথা থেকে যে অবিরত আইডিয়া-প্রবাহ বেরুচ্ছে তার কারণে, সে বলা ভারি শক্ত; কিন্তু তার সান্নিধ্যে যেই আসত সেই তার মনস্বিতায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হতো। তার উপস্থিতি, তোমার পানে তার তাকানোর ভঙ্গি, আর তার কণ্ঠস্বরে মন চাঙ্গা হয়ে উঠত, নাড়ির গতি দ্রুততর হতো। কিছু যেন একটা অশরীরী, তড়িৎপ্রবাহ, মূর্তিমান বিদ্যুৎগর্জন, কী-রকম যেন অব্যাখ্যেয় অলৌকিক ব্যাপার – আমার স্মৃতিতে এসব ধরা আছে।… বিয়েলির কথা বলার ভঙ্গি ছিল পাস্তের্নাকের ঠিক বিপরীত। বিয়েলির কথা যেন তোমাকে ঢেকে ফেলে, জড়িয়ে ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে, ক্রমে ক্রমে তোমাকে বিমুগ্ধ করে, তোমাকে তার নিজের দিকে টেনে নিয়ে, তোমাকে শেষ পর্যন্ত দখল করে নেবে। কণ্ঠস্বরের ধরনটা ছিল একটু থতমত-খাওয়া, ফুর্তির মেজাজও খানিকটা, যেন শ্রোতা-সম্পর্কে সে ঠিক নিশ্চিত হতে পারছে না, ভয় পাচ্ছে যদি তার কথা ভুল বোঝে কিংবা মন দিয়ে না শোনে – মানে তোমার আস্থা ও মনযোগ কীভাবে পাবে সে-জন্যে তার চেষ্টার কমতি নেই।”
এ-ই হচ্ছেন আন্দ্রেই বিয়েলি। চুয়ান্ন বছরের জীবন সৃজনশীলতার দিক থেকে ফলপ্রসূভাবে কেটেছিল, কিন্তু সাংসারিক জীবন তত শান্তির ছিল না। বহির্মুখী ছিলেন, কিছুটা উড়নচণ্ডী ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। প্রথম স্ত্রী আসিয়া তুর্গিয়েনেভা যে চলে গেলেন সে তো তাঁরই অবিমৃষ্যকারিতার কারণে। পরে ক্লাভেদিয়া ভাসিলিয়েভাকে বিয়ে করলেন এবং দাম্পত্য-সম্পর্কে চিড়ও ধরেনি। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের অত্যাচার সেই শান্তিতে বাদ সেধেছিল। বিয়েলিকে শাস্তি দেওয়ার জন্যে স্ত্রীকে জেলে ভরেছে বারবার।
আধুনিক রুশ গদ্যের শ্রেষ্ঠ প্রতিভা হিসেবে বিয়েলির স্বীকৃতি প্রায় তর্কাতীত। প্রতীকবাদী কাব্যদর্শনের অন্যতম নির্মাতা হলেও গদ্যশৈলী-নির্মাণে তাঁর নিরীক্ষণধর্মিতা অসামান্য এবং পরবর্তী প্রজন্মসমূহের উপরে তাঁর গদ্যের প্রভাব-ব্যাপারে প্রায় সকলেই একমত। বাইশ বছর বয়সে লিখতে শুরু করেন, মৃত্যুর বছরেও তাঁর শেষ বই বেরিয়েছে। গীতিকবিতা, এপিকধর্মী কবিতা, উপন্যাস, গল্পগ্রন্থ, প্রবন্ধসংগ্রহ, গবেষণাগ্রন্থ, দার্শনিক রচনা, স্মৃতিকথা, সমকালীন কবি ও কবিতার মূল্যায়ন – আন্দ্রেই বিয়েলির কৌতূহল ও সাধনার বৈচিত্র্য ঈর্ষণীয়।
পিতের্বুর্গ্, যে-উপন্যাসের উল্লেখ করেছি নান্দীমুখে, বিশ শতকের বিশ্বে রচিত গুটিচারেক উপন্যাসের একটি বলে নবোকফ্ বিশ্বাস করতেন। য়
০৬ই জুলাই ২০০৪ তাঁরা কেউ ‘কল্লোল যুগ’ ধরনের একটি বই লিখুন ওই সময় নিয়ে। কী যে বর্ণাঢ্য, ঝকমকে একটা ব্যাপার হবে!
আন্দ্রে বিয়েলির (১৮৮০-১৯৩৪) তো লেখক হওয়ার কথাই ছিল না। লেখক হলেন বলেই-না এই তাখাল্লুস। নইলে আসল নাম যা
তা-ই থাকত : বরিস্ নিকলায়েভিচ্ বুগায়েফ্, অর্থাৎ বুগায়েফ্ বংশের নিকলাই-এর পুত্র বরিস্। বাবা নিকলাই ভাসিলিয়েভিচ্ বুগায়েফ্ ছিলেন মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতশাস্ত্রের ডাকসাইটে অধ্যাপক। মা আলেক্সান্দ্রা দ্মিত্রিয়েভ্না প্রায় ডানাকাটা পরী, তদুপরি সংগীতশাস্ত্রে পারদর্শিনী। ছেলেমেয়ে বলতে ওই একটিই, সবেধন নীলমণি, পুত্র শ্রীমান বরিস্। বাড়িতে বাবা-মার বন্ধুবান্ধবসূত্রে যে-জগতের সঙ্গে চেনাজানা হয় তা সর্বাংশে মেধাশ্রয়ী, শিল্পবৃত্তীয়, নান্দনিক। একমাত্র সন্তানের যোগ্য প্রতিপালন নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর স্বপ্নের সংঘাত বরিসের মনোজগতেও ছায়া ফেলে নিশ্চয়ই। নাম পাল্টে আন্দ্রেই বিয়েলি হওয়ার সেটি এক কারণ হয়তো-বা। ছেলেকে কবিতার দিকে ঝুঁকতে দেখলে বাবা রেগে যান গণিতের শত্রুকে নিজের ঘরে প্রশ্রয় পেতে দেখে। চান, ছেলে হবে গণিতবিদ। আর মা ঠিক উল্টো। ছেলে প্রশ্রয় পায় সেখানে। নাম হয়তো পাল্টাতেই হতো, বাবাকে ঠকানোর জন্যে। কিন্তু তা বলে ওই নামটিই কেন? ‘বিয়েলি’ মানে শ্বেত, সাদা, সফেদ। আর আন্দ্রেই হলেন সুপ্রাচীন সন্ত, যাঁর হাত ধরে খ্রিষ্টধর্ম রুশ ভূখণ্ডে খুঁটি গাড়ে। আন্দ্রেই যেন বাপ-মায়ের সন্তান বরিস্কে এক ঝট্কায় ভিন্ন এক আসনে তুলে নিয়ে বসিয়ে দিল। সে-এক ইন্দ্রিয়াতীত মরমীবাদের দুনিয়া – ধর্মকে সঙ্গী করে নয়, অঙ্কশাস্ত্র ও সংগীত ও দর্শন ইত্যাদির সম্মিলনে নির্মিত নতুন এক কাব্যদর্শন উদ্ভাবন করলেন বিয়েলি। ক্রমে ব্লোক্, মেরেজ্কোফ্স্কি, জামিয়াতিন্, মেন্দেল্শ্তাম্ প্রমুখ বন্ধুদের নিয়ে রুশ কাব্যশিল্পে প্রতীকবাদের জন্ম দেবেন।
সুদর্শন পুরুষ ছিলেন। সমকালীন সাক্ষ্য বলছে যে, তাঁর সকল বন্ধুবান্ধব ও সতীর্থ সাহিত্যিক তাঁর অনেকটা যেন প্রেমেই পড়ে ছিলেন। কবি জিনাইদা গিপ্পিউস্ লিখেছেন, ওই তরুণ কবি ‘কখনও হাঁটতেন না… যেন নাচতেন’। অকালপ্রয়াত কবি মান্দেল্শ্তামের বিধবা পত্নী নাদিয়েজ্দার দুখণ্ডের আত্মজীবনীতে বিয়েলি কী মুগ্ধতা ও স্নেহেই-না উল্লেখিত হয়েছেন। আমার পড়ে মনে হয়েছে, এ যেন এক রুশ অস্কার ওয়াইল্ড। তিনি লিখছেন : “বিয়েলি মনে হতো তার চারদিকে আলো বিচ্ছুরিত করছে, আমি এমন আরেকটি মানুষকে দেখিনি, যে কিনা আক্ষরিক অর্থেই বিভান্বিত। এরকমটা যে কেন মনে হতো – সে কি ওর চোখের জন্যে, নাকি তার মাথা থেকে যে অবিরত আইডিয়া-প্রবাহ বেরুচ্ছে তার কারণে, সে বলা ভারি শক্ত; কিন্তু তার সান্নিধ্যে যেই আসত সেই তার মনস্বিতায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হতো। তার উপস্থিতি, তোমার পানে তার তাকানোর ভঙ্গি, আর তার কণ্ঠস্বরে মন চাঙ্গা হয়ে উঠত, নাড়ির গতি দ্রুততর হতো। কিছু যেন একটা অশরীরী, তড়িৎপ্রবাহ, মূর্তিমান বিদ্যুৎগর্জন, কী-রকম যেন অব্যাখ্যেয় অলৌকিক ব্যাপার – আমার স্মৃতিতে এসব ধরা আছে।… বিয়েলির কথা বলার ভঙ্গি ছিল পাস্তের্নাকের ঠিক বিপরীত। বিয়েলির কথা যেন তোমাকে ঢেকে ফেলে, জড়িয়ে ধরে আষ্টেপৃষ্ঠে, ক্রমে ক্রমে তোমাকে বিমুগ্ধ করে, তোমাকে তার নিজের দিকে টেনে নিয়ে, তোমাকে শেষ পর্যন্ত দখল করে নেবে। কণ্ঠস্বরের ধরনটা ছিল একটু থতমত-খাওয়া, ফুর্তির মেজাজও খানিকটা, যেন শ্রোতা-সম্পর্কে সে ঠিক নিশ্চিত হতে পারছে না, ভয় পাচ্ছে যদি তার কথা ভুল বোঝে কিংবা মন দিয়ে না শোনে Ñ মানে তোমার আস্থা ও মনযোগ কীভাবে পাবে সে-জন্যে তার চেষ্টার কমতি নেই।”
এ-ই হচ্ছেন আন্দ্রেই বিয়েলি। চুয়ান্ন বছরের জীবন সৃজনশীলতার দিক থেকে ফলপ্রসূভাবে কেটেছিল, কিন্তু সাংসারিক জীবন তত শান্তির ছিল না। বহির্মুখী ছিলেন, কিছুটা উড়নচণ্ডী ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। প্রথম স্ত্রী আসিয়া তুর্গিয়েনেভা যে চলে গেলেন সে তো তাঁরই অবিমৃষ্যকারিতার কারণে। পরে ক্লাভেদিয়া ভাসিলিয়েভাকে বিয়ে করলেন এবং দাম্পত্য-সম্পর্কে চিড়ও ধরেনি। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের অত্যাচার সেই শান্তিতে বাদ সেধেছিল। বিয়েলিকে শাস্তি দেওয়ার জন্যে স্ত্রীকে জেলে ভরেছে বারবার।
আধুনিক রুশ গদ্যের শ্রেষ্ঠ প্রতিভা হিসেবে বিয়েলির স্বীকৃতি প্রায় তর্কাতীত। প্রতীকবাদী কাব্যদর্শনের অন্যতম নির্মাতা হলেও গদ্যশৈলী-নির্মাণে তাঁর নিরীক্ষণধর্মিতা অসামান্য এবং পরবর্তী প্রজন্মসমূহের উপরে তাঁর গদ্যের প্রভাব-ব্যাপারে প্রায় সকলেই একমত। বাইশ বছর বয়সে লিখতে শুরু করেন, মৃত্যুর বছরেও তাঁর শেষ বই বেরিয়েছে। গীতিকবিতা, এপিকধর্মী কবিতা, উপন্যাস, গল্পগ্রন্থ, প্রবন্ধসংগ্রহ, গবেষণাগ্রন্থ, দার্শনিক রচনা, স্মৃতিকথা, সমকালীন কবি ও কবিতার মূল্যায়ন – আন্দ্রেই বিয়েলির কৌতূহল ও সাধনার বৈচিত্র্য ঈর্ষণীয়।
পিতের্বুর্গ্, যে-উপন্যাসের উল্লেখ করেছি নান্দীমুখে, বিশ শতকের বিশ্বে রচিত গুটিচারেক উপন্যাসের একটি বলে নবোকফ্ বিশ্বাস করতেন।
০৬ই জুলাই ২০০৪


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.