‘সতীতালয়’ শব্দটি বাংলাভাষার একটি শব্দ, যার অর্থ ‘সতীত্ব রক্ষার স্থান’ বা ‘সতীর থাকার স্থান’। এটি একটি যৌগিক শব্দ যা ‘সতী’ বা ‘আলয়’ শব্দ দুটি মিলে গঠিত হয়েছে। ‘সতী’ শব্দের অর্থ পতিব্রতা নারী বা সতীসাধ্বী নারী এবং আলয় শব্দের অর্থ স্থান বা গৃহ। সুতরাং সতীতালয় শব্দের সাধারণ অর্থ হলো যেখানে সতী নারীরা বাস করেন বা যেখানে তাদের সতীত্ব রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। স্পষ্টভাবে বললে ‘সতীতালয়’ শব্দটি বলতে সাধারণ এমন স্থানকে বোঝায়, যেখানে নারীরা তাদের সম্মান ও সতীত্ব রক্ষার জন্য আশ্রয় নেয়। এটি একটি ঐতিহাসিক ধারণা, যা মূলত প্রাচীন ভারতীয় সমাজে প্রচলিত ছিল।
বর্তমানে ‘সতীতালয়’ শব্দটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয় এবং এর ব্যবহার সীমিত। আধুনিক সমাজে বিধবাদের পুনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন পদক্ষপ নেওয়া হলেও ‘সতীতালয়’ শব্দটি আর সেই অর্থে প্রচলিত নেই।
সতীতালয় কাব্যগ্রন্থটি অস্ট্রিক ঋষির লেখা কবিতার সংকলন। এ বইয়ে আটচল্লিশটি কবিতা রয়েছে। গ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলো বিষয় মূলত প্রেম, বিরহ, জীবন ও প্রকৃতির বিভিন্ন দিক। বইটির প্রতিটি কবিতাই শিরোনামহীন। সতীতালয়ের প্রথম কবিতা –
আমি বাদ পড়াদের দলে, প্রাথমিক তালিকায় নামের
বাঁ-পাশে ক্রসচিহ্ন
কারা যেন বঞ্চিত শব্দটির পূর্বে সন্তর্পণে বসিয়ে রেখেছে সুবিধা
অস্ট্রিক ঋষি এ-কবিতায় ‘বঞ্চিত’ শব্দকে ‘সুবিধা’ অর্থে প্রয়োগ করে খারাপকে ভালো বোঝাতে চেয়েছেন।
কবির আটাশ নং কবিতা –
প্রেমে কোনো ঋজু পথ নেই প্রার্থনার নেই কোনো হ্রস্ব প্রবিধান
আলোর পেছনে ছুটছো দেখো তোমাকে ধাওয়া করছে
স্ব-ব্যঙ্গ প্রকারভেদ, ক্রমবর্ধমান ছায়া।
সেই যুদ্ধাহত সৈনিক শত্রুপক্ষর শুশ্রূষাকুটির – নিবিড়
পরিচর্যায়
ক্ষতে ক্লিষ্ট তবু সেবিকার সহৃদয় স্পর্শে ইশারা ও উস্কানির
প্রতিভায়
নিরাময়ের কক্ষর ভিতর – বহুদিন অপেক্ষার শেষে
পরশ্রী-প্রেমিকাকে
টান দিয়ে বুকে জড়ানোর তীব্রতর স্বপ্ন নিয়ে বাড়িয়েছিল ব্যাকুল হাত
চিঠির বদলে সে পেয়েছে মৃত্যুদণ্ডাদেশ
অস্ট্রিক ঋষির এ-কবিতায় মূলত যৌনতার বিভিন্ন দিক প্রতিফলিত হয়েছে। প্রেমের প্রসাদগুণে এভাবে তাঁর কবিতা হয়ে ওঠে সুখপাঠ্য।
সতীতালয় কাব্যগ্রন্থের কোনো কবিতার নির্দিষ্ট নাম না থাকলেও এগুলি যৌনতাকে ফ্রয়েডীয় ও লাঁকানিও মনস্তত্ত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন ধারায় উপস্থাপিত। এই কাব্যগ্রন্থটি সামাজিক ট্যাবু ভেঙে বিষয়টিকে বিভিন্ন মনসত্মাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানোর চেষ্টা করে। তাঁর বইয়ের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কবিতার অংশ নিম্নে দেওয়া হলো, যেগুলোতে প্রেম-বিরহ উভয়ের বর্ণনা রয়েছে। যেমন –
এর চেয়ে ভারী কী হয় যদি জানি যে জীবন ব’য়ে নিচ্ছি তা
আমার নয়
বা,
মনে যদি পড়ে তবে সে বিচ্ছেদ নয়; মুখে যদি বলা লাগে
প্রেম নয় তবে
নবীন কবি অস্ট্রিক ঋষির এই কবিতার বইয়ে বিশেষ কিছু কবিতা ঠাঁই পেয়েছে, যেগুলোর জন্য তিনি পাঠকদের মনোযোগ আশা করতে পারেন। এ প্রসঙ্গে, তাঁর বইয়ের প্রথম ও শেষ কবিতা দুটি উল্লেখ্য। অর্থবোধক বিচারে বইটির আটচল্লিশটি কবিতার মধ্যে এগুলো বিশেষভাবে উল্লেখ্য।
আধুনিক, বিশেষ করে উত্তরাধুনিক কবিতায় প্রথাগত
ছন্দ না থাকলেও প্রতিটি উৎকৃষ্ট কবিতায় অন্তর্গত ছন্দ
থাকে। আধুনিক বাংলা কবিতায় মুক্তক অক্ষরবৃত্তে রচিত কবিতার সংখ্যাই বেশি। অষ্ট্রিক ঋষির কবিতাগুলোও সেই ধারার।
অস্ট্রিক ঋষির সতীতালয় বইটির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য হলো – বইটিতে প্রেম, সম্পর্ক এবং জীবনের নানা অনুভূতিকে তুলে ধরা হয়েছে। বিচারকদের বিচারে যোগ্য বিবেচিত হওয়ায় এটি ২০২৪ সালের সিটি ব্যাংক-নিবেদিত কালি ও কলম পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়।
একুশে বইমেলা ২০২৪-এ প্রকাশিত এ-বইটি প্রকাশ করেছে কিংবদন্তি পাবলিকেশন। এ-বইয়ের কাব্যভাষায় যে সাবলীলতা ও গীতিময়তা বিদ্যমান তা নিঃসন্দেহে কবিতাপ্রেমী পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.