উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপক পুষ্পিতা সেন কবিতা রচনার পাশাপাশি একজন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবেও দুই বাংলার পাঠকের কাছে পরিচিত। তাঁর সাম্প্রতিক কবিতার বই বৃষ্টিগুলো তবু ঝরুক (২০২৫) প্রকাশের আগে আরো পাঁচটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম পুষ্পাঞ্জলি (২০২২), জলছাপ (২০২৩) ও বন্দিবাক্ (২০২৪) কাব্যগ্রন্থগুলো ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত। অন্যদিকে ছুঁয়ে থেকো অনুভবে (২০২৩) এবং আঁচড়খানি বৃথা (২০২৪) কাব্যগ্রন্থদুটি যথাক্রমে শৈলী প্রকাশন ও খড়িমাটি থেকে প্রকাশিত। এছাড়া জাতীয় পত্রিকা, স্থানীয় দৈনিক ও বিভিন্ন সাময়িকী-সংকলনে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হচ্ছে। বৃষ্টিগুলো তবু ঝরুক (২০২৫) আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত চার ফর্মার একটি বই। ৬৪ পৃষ্ঠা জুড়ে ৫০টি কবিতা রয়েছে এতে। এ যেন পঞ্চাশোত্তীর্ণ কবির ৫০টি ভিন্ন ভিনণ অনুভূতির কাব্যিক অনুবাদ। কবিতাগুলির ভাব, ভাষা ও বিষয় বৈচিত্র্যের চমৎকার উপস্থাপনে পাঠক মুগ্ধ হবেন। তাঁর কবিতার মনোযোগী পাঠকরা লক্ষ করবেন, তাঁর কবিতায় রয়েছে বিচিত্র বিষয়ের সমাহার এবং বৃষ্টিধারার মতো সাহসী কাব্যভাষা।
প্রথম ফ্ল্যাপের ভাষায় : ‘একজন কবির মননে মানব অনুভূতির যাবতীয় অনুষঙ্গই ধাপে ধাপে কবিতায় পরিণতি লাভ করে। নির্বাচিত কবিতাসমূহে কবি শুধু দৃষ্টিনন্দনের ক্ষেত্র হিসেবে প্রকৃতিকে অবলোকন না করে নগরজীবনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তির গন্তব্য এঁকেছেন এবং প্রকৃতিলগ্ন মানুষের মিলিত রূপেরও সম্মিলন ঘটিয়েছেন। কবির প্রকৃতি-বিমুগ্ধতা বিদগ্ধ পাঠকের চৈতন্যে নতুন দৃশ্যকল্প সৃষ্টির পাশাপাশি নবচেতনার উন্মেষ ঘটাতে পারে। চরম সত্য যেমন তীক্ষ্ন ছুরির মতো ঝলসে উঠেছে তাঁর কবিতায়, তেমনি কবিতার আত্মাকে স্পর্শ করার নিরন্তর সাহস দেখিয়েছেন অবিশ্বাস্য রূপকল্পে – শব্দের বন্ধনহীন প্রসন্নতায়। নির্বাচিত কবিতাসমূহের এত সহজ অবলোকন, এত সুস্থির শব্দগ্রন্থনা পাঠকহৃদয়ে প্রেমামৃতের পুনর্জাগরণ ঘটাবে – এ আমাদের দৃঢ় প্রতীতি।’ বইয়ে উল্লেখ না থাকলেও কবির সঙ্গে ফোনালাপসূত্রে অনুমান করা যায় কথাগুলো সদ্যপ্রয়াত সংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার-রচিত। তারিখ ইব্রাহিমের তারিফ যে অমূলক নয়, তা পুষ্পিতার কবিতা পাঠকমাত্রেই মানবেন।
কবি পুষ্পিতা সেন, ইচ্ছে উড়া মন যাঁর। যাঁর মন ঘুরে ঘুরে নানা রঙের শব্দ এনে জড়ো করে আর তা দিয়ে গাঁথেন একটা একটা করে কবিতার মালা। কবিতা সৃষ্টিতে তাঁর সাহসিকতা-মগ্নতা পাঠকের সামনে আসে বইটির প্রথম পঙ্ক্তিতেই : ‘হাত ধরে টানতে চেয়েছে ওরা কতবার’। তাই তো কেউ কবিকে টলাতে পারেনি, কারো লাভ হয়নি। কবির সরল স্বীকারোক্তি : ‘আমি বর্ষার হাত ধরে খোঁপায় কদম গুঁজে/ ঠায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির জলে জীবন ভিজিয়ে চলেছি’ (‘মগ্নতা’)। এভাবেই এগিয়ে চলেছে কবি পুষ্পিতার কাব্যময় পথচলা। তবু জীবন তো পুষ্পশয্যা নয়, জীবন মানেই ক্রমাগত সংগ্রাম কসরত আর কষ্ট মাড়িয়ে চলা। কবিতায় তাই জীবনের উপমা উঠে আসে এভাবে : ‘জীবনটাই নামতে নামতে/ কলের জলের মতো তলানিতে ঠেকে,/ কসরতেও আর হয় না ঊর্ধ্বমুখী’ (‘অবনমন’)। তবু জীবনের সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে কিংবা জীবনের তলানিতে পড়তে পড়তে কবিও প্রেমে পড়েন, আর দশটি মানুষের মতো ভালোবাসেন। ভালোবাসার দহনে শুদ্ধ হয়ে নিজের ভুল বুঝতেও পারেন তিনি। ভালোবাসায় বেদনা-কষ্টের অনুভব, প্রিয়জনকে অবহেলে হারানোর বেদনার বিলাপ আর কৃতজ্ঞতার কোমল স্বীকারোক্তি :
যে আমার চেয়েও অধিক চিনেছিলে আমায়
সেই তোমায় চিনতে চাইনি কখনো। …
সেই তোমাকে মাড়িয়ে চলে গেছি জ্বলন্ত সূর্যের কাছে,
আরও অধিক ভালোবাসা আনবো বলে। (‘ভালোবাসা’)
এখানে আমরা অবলোকন করি ভালোলাগায় আত্মসমর্পণের অমিয় কাব্যভাষা। মাত্র দশ পঙ্ক্তির এই কবিতার কাব্যভাষায় মিতব্যয়িতার স্বরূপও পাঠককে বিমুগ্ধ করে বলে আমাদের বিশ্বাস। ভালোবাসার বিমুগ্ধতায় কবির উড়ো মন কী থিতু হয়! তবু বঙ্গোপসাগরের বাউল বাতাস বয়ে যায় বাঙালি কবির মনে। তাই তো উদাসী কবি লেখেন : ‘দাঁড়িয়ে রয়েছি সুদূরের পথে চেয়ে/ আসবে সে এক একতারা গান সুর/ মিলাবো কণ্ঠ বাউলিয়ানায় গেয়ে/ উদাসী মনে শূন্যতা ভরপুর’ (‘বাউলিয়ানা’)। বাউল বলেই বোধ হয় কবি বেমালুম ভুলে যান জুগুপ্সা-ভয়। আর হরহামেশা সাহসী কাব্যভাষা উঁকি দেয় কবিতার রূপ ধরে। অমিত দৃঢ়তায় কবি ঘোষণা করেন কিংবা বলা যায় আজ্ঞা করেন : ‘ফেলে দিও না তোমার উদ্বৃত্ত/ খাদ্য হোক বা ভ্রূণ বা পানীয়’ (‘উদ্বৃত্ত’)। সহৃদয় পাঠকের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় – সুযোগ ও সম্পদের অপচয় কবিকে ক্লান্ত-বিষণ্ণ করে, কষ্ট দেয়। কমিটেড কবির তাই প্রত্যাশা : ‘উপচানো থালা থেকে, কিছু যদি যেতো মুখে অনাহারির,/ তবেই সুখটা হতো ঊর্ধ্বসারির’ (সুখ)। কিন্তু তা তো সহজে হওয়ার নয়। স্বার্থান্ধ সমকালীন সমাজ আজ আরো কত কিছুতে অন্ধ অথবা অন্ধত্ব চাপিয়ে দেওয়ার আয়োজনে অধীর। এমন বাস্তবতার বিপরীতে ব্যঙ্গ করে ব্যক্ত হয় বাউল কবির বয়ান; কিংবা বলা যায়, সমকালীন বাস্তবতার শোক কাটিয়ে উঠতে কবির ক্রোধ সহসী কাব্যভাষায় ব্যক্ত হয় তাঁর আঙুলের নিপুণ ছোঁয়ায় :
কালো পর্দা আনো, ঢেকে দাও লোক
ঢাকো, ঢাকো সব কোণও …
স্পর্ধা দু’চোখ;
তবেই বন্ধ হবে যাবতীয় শোক। (‘ঢাকো সব’)
আফ্রো-এশিয়ায় নারীজন্মের অসহায়ত্ব আর আতঙ্কিত হয়ে অনবরত অনিশ্চিতের পানে ছুটে চলার কাব্যিক রূপান্তর যেন ‘মেয়েটি’ কবিতায় ভাষারূপ পেয়েছে। এখানে কবি দেখান যে – একটি মেয়ে যৌবন, প্রৌঢ়, বার্ধক্য এমনকি শৈশব পেরিয়ে মাতৃজঠরে ফিরেও সে নিরাপদ নয়। ফলে, ‘কোথায় যাবে মেয়েটি আজ?/ ছুটে চলছে তাই …’ (‘মেয়েটি’)। প্রাণপণ প্রতিজ্ঞা নিয়ে বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষায় ছুটে চলতে গিয়ে কবির আত্মোপলব্ধি হয় : ‘সাহসেরক্ষয়ে যাওয়াটাই শুধু দেখে যাই,/ অসহায় চোখে’ (‘সাহস’)। এখানেও পাঠক পাবেন আমাদের অপরিণত সমাজে অসহায়-অবলা আখ্যা পাওয়া কবির সহায় তাঁর তীক্ষ্ন কলমের সাহসী কাব্যভাষা। সমাজের এত অনাচারেও কবি তাই ক্লান্ত-বিষণ্ণ নন মোটেই। পারিপার্শ্বিক করুণ-ক্লান্তিময় বাতাবরণে বাস করেও কবি পুষ্পিতা সেন রচনা করেন – ‘নতুন দিনের গান/ তাই দিয়ে স্বর করছি মুখর, পুষ্পিত উদ্যান’ (‘মুখর যখন মন’)।
কায়ার সঙ্গে যেমন ছায়া থাকে তেমনি সাহসের সঙ্গে থাকে ভয়। ভয় যে সহজে পিছু ছাড়ে না। জীবন মানেই সংগ্রাম। বেঁচে থাকার নামই লড়াই করে শিরদাঁড়া খাড়া রাখার রুদ্ধশ্বাস যুদ্ধ। কবির ভাষায় : ‘সোজা হয়ে দাঁড়াতে যাই, দু’পা আঁকড়ে/ পারি কি সোজা হতে?/ পাথুরে ভয়ে সিঁটিয়ে থাকি’ (‘বাঁচতে চাইছি বলে’)। বেঁচেবর্তে থাকতে গিয়ে মাঝেমধ্যে পালিয়ে বাঁচতে হয় বটে। তবু সাহসী এ-কবি পরাজয়ে ডরে না এমন বীর। পরাজয়ে নিঃশেষ না হওয়ার কারণও অব্যক্ত থাকে না জীববিজ্ঞানে সম্মানসহ স্নাতকোত্তর অর্জন করা কবির। তাঁর কাব্যভাষায় পাই : ‘ভ্রূণ নিলে তবে কোষ আছে, পাবে না অবক্ষয়/ আজ পরাজয়ে সন্ধ্যা হলেও, কাল পাবোই ভোর জয়’ (‘তবুও জয়’)।
এরই মাঝে আছে ব্যক্তিজীবনের চিরন্তন মিলন-বিরহ। যাকে পাই তাকে চাই না; কিংবা যাকে চাই তাকে পাই না – জাতীয় রাবীন্দ্রিক রোমান্টিক কাব্যভাষাতেও কবির দক্ষতা চোখে পড়ার মতো : ‘এমনই হয়,/ কাছের চক্ষু দেখতে পায় না ঠিক/ আকার, অবয়ব/ নিকট আপনজন? দূরে গেলে … / তবেই কাঁদে মন’ (‘যে ছিল আপন’)। কেবল অন্তরের কথা নয়, অফিসের-সংসারের কথার সঙ্গে সর্বত্রই কবি নিজেকে, নিজের ভাবনাকে ছড়িয়ে দেন। ছড়ার স্বরবৃত্ত ছন্দেও তাই ঝংকার তোলেন : ‘কোথায় আমি নেই বলো তো/ ভাবছো কেবল শূন্যযোগে/ আয়না খুলে তোমায় দেখো/ দেখবে আমায় পুরোভাগে’ (‘উপস্থিতি’)। এভাবে সবকিছু নিয়ে কবি নিরাশ নন মোটেই। রোমান্টিক যুগের কবি তো নন তিনি। একুশ শতকের আধুনিক যুগের বাস্তবতা-যন্ত্রণাকে নিয়েও তিনি প্রচণ্ড রকম ইতিবাচক ভাবনায় বিভোর। জীবনবাদী কবির কাব্যভাষায় তাই উছলে ওঠে জীবনের জয়গান : ‘বৃষ্টিগুলো তবু ঝরুক,/ জীবনের নদী নিরন্তর বয়ে চলার জন্য/ বৃষ্টিগুলো ঝরুক’ (‘বৃষ্টিগুলো তবু ঝরুক’)। এসব অনুভবের একটা বড় গুণ এর পরিমিতিবোধ। অযথা একটি শব্দও কবি ব্যবহার করেননি; অতিশয়োক্তি নেই, অতিকথন নেই। সমকালের যে বীভৎসতা কিংবা বিমুগ্ধতা কবি হৃদয়ে দোলা দিয়েছে, যে অনিবার্য কাব্যভাষা হয়ে আবির্ভূত হয়েছে, তাদেরই কবি শিল্পসুষমা দিয়ে পাঠকের কাছে পরিবেশন করেছেন সৎসাহস নিয়ে, সততার সঙ্গে। তাই তাঁর কবিতাগুলি নিটোল, যেন প্রতিটি একটি জীবন্ত ছবি। কাব্যভাষা মানে কবিতার ভাষা। এটি মোটেই আটপৌরে ভাষা নয়, আলংকারিক ভাষা। সাধারণ গদ্যভাষার চেয়ে ভিন্ন। এ-ভাষা সাধারণত রূপক, উপমা এবং অন্যান্য আলংকারিক ভাষা ব্যবহার করে, যা একটি গভীর অর্থ প্রকাশ করে। কাব্যভাষা পাঠকের মনে বিশেষ অনুভূতি তৈরি করে এবং কবিতার বিষয়বস্তুকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলে। সব্যসাচী লেখক ও কবি সৈয়দ শামসুল হক এক সাক্ষাৎকারে বলেন : ‘কাব্যভাষা হলো কবির নিজস্ব কণ্ঠস্বর। যেমন ধরো, শামসুর রাহমানের ক্ষেত্রে বলব, একধরনের দুঃখবোধ আছে। এটা হচ্ছে তাঁর নিজস্ব ব্যাপার। এটা দোষের কিছু না; ভগবান বুদ্ধও বলেছেন যে, জগৎ দুঃখময়। কবি শামসুর রাহমান দুঃখের ভেতর দিয়ে জীবনকে দেখেন; মানে, দুঃখটা তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করে।’ আমাদের আলোচ্য কবি পুষ্পিতা সেন দুঃখের আগুনে পুড়ে পোড়খাওয়া বেপরোয়া সাহসী কাব্যভাষায় তাঁর কবিতার পঙ্ক্তিগুলো মেলে ধরেন। কবিতাপ্রেমী সকল মানুষের হৃদয় জয় করবে এ বইয়ের কবিতাগুলো – এ আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.