পূরবী বসুকে ধন্যবাদ জানাই ‘পিল’ শিরোনামে লেখাটির জন্য। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ‘নারী-আন্দোলনের সুদীর্ঘ পথ-পরিক্রমায় ষাটের দশকে জন্মনিয়ন্ত্রণ-বড়ির আবিষ্কার’কে পূরবী বসু দেখেছেন ‘স্বাধীন মানুষ হিসেবে নারীর পথচলার জন্য প্রশস্ত ও অপেক্ষাকৃত মসৃণ এক রাস্তা’ রূপে। বিজ্ঞানের ছাত্রী, পেশাগতভাবে বিজ্ঞানচর্চায় যুক্ত, চিন্তা-ভাবনা-লেখায় নারীবাদের চর্চায় সুপরিচিত পূরবী বসু তাঁর ‘পিল’-প্রবন্ধে জন্মনিয়ন্ত্রণ-বড়ির ইতিহাসের সন্ধান দিয়েছেন। (কালি ও কলম, প্রথম বর্ষ ষষ্ঠ সংখ্যা, জুলাই ২০০৪, পৃ. ১০৮-১১৫)।
পিলের স্বপ্নদ্রষ্টা ও তা বাস্তবায়নের মূল উদ্যোক্তা মার্গারেট সেঙ্গার (১৮৭৯-১৯৬৬) এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের যৌথ শ্রমে-চেষ্টায়, ৬২ বছরের সংগ্রামে আবিষ্কৃত (১৮৯৮ থেকে ১৯৬০) জন্মনিয়ন্ত্রণ-বড়ি চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্রে বিক্রি করা অনুমোদিত হয়েছে ১৯৬০ সালে, আমেরিকায়। এই ‘ঐতিহাসিক ঘটনা’র আগের ও পরের অনেক বিবরণের মধ্যে পূরবী বসুর মূল সুরটি ধ্বনিত হয়েছে নারীমুক্তির ক্ষেত্রে ‘পিল’-এর অবদান বা নারীমুক্তির সঙ্গে ‘পিল’-এর সম্পর্ক দৃঢ়ভাবে ঘোষণায়। তিনি লিখেছেন, ‘যৌনতা ও সন্তানধারণ, নারীর যে-দুটি বিষয়কে পুঁজি করে আদিকাল থেকে নারীকে শোষণ ও বঞ্চনার শিকার করা হচ্ছে, সেই যৌনতাকে সন্তানধারণ থেকে আলাদা করার সুযোগ করে দিয়েছে এই জন্মনিয়ন্ত্রণ-বড়ি বা ‘পিল’।’ এ-প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন যে, জন্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব নারী যতদিন পায়নি ততদিন মাতৃত্বজনিত ও অন্যান্য অনেক বিষয়ের সিদ্ধান্ত সে নিজে নিতে পারেনি; পুরুষের সিদ্ধান্ত মানতে হয়েছে। পূরবী বসু বলেছেন, ‘পিল’ নারীর কাজের ক্ষমতা ও ক্ষেত্র প্রসার করেছে, নারীমুক্তির দরজা খুলে দিয়েছে, নারীর অবস্থা ও অবস্থান বদলে দিয়েছে।
বাস্তবে কিন্তু অন্যরকম ঘটছে। যে-নারী সববিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সে-ই ‘পিল’ খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে – অন্যরা ‘পিল’ পাওয়া ও খাওয়ার জন্য এখনো স্বামী-মুখাপেক্ষী। লেখাটি পড়ে আমার মনে হয়েছে নারীমুক্তির দরজা খোলার ক্ষেত্রে ‘পিল’ উদ্ভাবন ও প্রয়োগের অবদানকে প্রাধান্য দিয়ে নারীমুক্তি-আন্দোলনকে একপেশে-বিচ্ছিন্ন করে দেখা হয়েছে। নারীমুক্তির দরজা খোলার ক্ষেত্রে মার্গারেট সেঙ্গার যে-উপায় বা কৌশল গ্রহণ করেছেন তার বিস্তারিত পটভূমিকা, আবেগ, আন্তরিকতা, উদ্বেগসহ সন্তানধারণ-প্রসবের এবং ব্যক্তিগত জীবনের বিকাশ-কর্মসাফল্য-বিষয়ে দ্বন্দ্ব-যন্ত্রণার শিকার নারীদের জন্য বাস্তব সমাধানের পথ তৈরি করার লক্ষ্যে মার্গারেট সেঙ্গারের সংগ্রামমুখর জীবনযাপনের সময়কালে (১৮৯৮ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত) ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ভারতবর্ষসহ বহু দেশে নারী-আন্দোলনের সংগ্রাম চলেছিল নারী-পুরুষের সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য, নারীর মর্যাদা-অধিকার-প্রতিষ্ঠার জন্য।১ মার্গারেট সেঙ্গারের জন্মনিয়ন্ত্রণ-আন্দোলনের বহু আগে মেরি ওলস্টন ক্র্যাফট্ (১৭৫৯-১৭৯৭) ইংল্যান্ডে বিশ্ব-নারীমুক্তির আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে পথিকৃৎ রূপে স্বীকৃতি পেয়েছেন।২ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে মার্গারেট সেঙ্গার নিজে যুক্ত ছিলেন নিউইয়র্ক ও ফ্রান্সের বিপ্লবী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে। সে-সময়ে জার্মানিতে বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী রোজা লুক্সেমবার্গ (১৮৭০-১৯১৯) এবং ফ্রান্সে আনাতোল ফ্রাঁস ‘নরৎঃয ংঃৎরশব’-বিষয়ে একটি প্রস্তাব কার্যকর করার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন। শোষিত শ্রমিকশ্রেণির সন্তানদের সামরিক-শিল্পকারখানার কাজে টেনে নেওয়ার পথ রুদ্ধ করার জন্য তাঁরা শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে জন্মনিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানিয়ে ‘জন্ম-ধর্মঘটে’র প্রচেষ্টা চালান। মার্গারেট সেঙ্গার এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাঁর নিজের ‘birth control’-আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেন। বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগ্রামের লক্ষ্যে পরিচালিত কাজ যথা : শ্রমিকদের জীবনের দুর্দশামোচনে অংশ নেওয়া, নারী-জাগরণের কাজে অবদান রাখা এবং শ্রেণিসংগ্রামকে প্রণোদিত করা – ইত্যাদির সঙ্গে মার্গারেট সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন।৩
মার্গারেট সেঙ্গার আন্দোলন করেছেন শরীরের ওপর নারীর নিজ-নিয়ন্ত্রণের অধিকার-প্রতিষ্ঠার জন্য। ঘন ঘন সন্তান-জন্মদানে বাধ্য বা উপায়ন্তরহীন শ্রমজীবী গরিব নারীদের তিনি মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন। সেজন্য ‘জন্মনিয়ন্ত্রণ-বড়ি’ বা ‘পিল’-আবিষ্কারের স্বপ্ন তাঁকে তাড়িত করেছিল। কিন্তু এই কাজটি শুধুই ওষুধ কোম্পানির বা বিজ্ঞানী-গবেষকের সাহায্য-সহযোগিতায় হয়নি। মার্গারেট সেঙ্গার ৬২ বছর সংগ্রাম করেছেন নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যৌনতাবিষয়ক নৈতিকতার রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে। সেই লক্ষ্যে প্রসূতি নারীদের মৃত্যুরোধের জন্য, ঘন ঘন সন্তান-জন্মদানের সংকটমোচনের জন্য তিনি নিবেদিত ছিলেন। তাঁর লেখায়, ভাষণে, সংগঠন গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে তীব্রভাবে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন চার্চ, রাষ্ট্র এবং পুরুষকে।৪
১৯৩০ সালে মেক্সিকান জন্মনিয়ন্ত্রণ-বড়ি উদ্ভাবিত হয়েছিল বলে তথ্যে জানা যায়। তবে তার ব্যবহার ছিল নামমাত্র। ১৯৬০ সালে আমেরিকায় জন্মনিয়ন্ত্রণ-বড়ি বা পিল-ব্যবহারের ছাড়পত্র অনুমোদিত হওয়ার পর লক্ষাধিক মহিলা তা গ্রহণ করেন।৫
মার্গারেট সেঙ্গারের দুটি বই : Woman And the Nwe Race (১৯২০) এবং ¸ Fight For Birth Control (১৯৩১) থেকে তাঁর সকল চ্যালেঞ্জ জানা যায়। তিনি জানতেন যে, নারীর যৌনতাবিষয়ক আধুনিক আন্দোলনকে রক্ষণশীল সকল মহল চ্যালেঞ্জ করবে, দমন করবে। ডড়সবহ জবনবষ (১৯১৪) পত্রিকা, Birth Control জবারবি (১৯১৬) পত্রিকা, Family Limitation এবং Sing Sing Job নামের বড় বড় ইশতাহার বের করে তিনি রক্ষণশীলদের বিরুদ্ধে অব্যাহত চ্যালেঞ্জ চালিয়ে গেছেন। তিনি সমাজের মধ্যে উত্থাপিত প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছেন বইয়ে প্রকাশিত লেখায় : ‘Birth Control – A ParentsÕ Problem or Woman’s? তাঁর মতে, এই সমস্যাটি শুধুমাত্র নারীর, তাই নারীরই এই জন্মনিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে।
বিশ্ব-নারী-আন্দোলনের অগ্রদূত মেরি ওলস্টনক্র্যাফট্ (১৭৫৯-১৭৯৭)। তিনি পুরুষের সভ্যতাকে চ্যালেঞ্জ করার বিদ্রোহ জানিয়ে মুক্তি দিতে চেয়েছিলেন নারীকে। জন্মনিয়ন্ত্রণে নারীর একক অধিকার-প্রতিষ্ঠার নেত্রী মার্গারেট সেঙ্গার। তিনি ‘শরীর আমার সিদ্ধান্ত আমার’ মতবাদের প্রবক্তা। সিমোন দ্য বোভায়ার (১৯০৮-১৯৮৬), প্রথম জানালেন, মন্তব্য করলেন চরম সত্য কথা যে, ‘কেউ নারী হয়ে জন্ম নেয় না, বরং হয়ে ওঠে নারী’। তিন শতাব্দীতে জন্ম নেওয়া এই তিনজন বিশ্ব-নারীনেত্রীর নারী-আন্দোলন ও চ্যালেঞ্জের সূত্রপাত-সম্পর্কিত তথ্য থেকে জানা যায়, তিনজনই নিজ নিজ মায়ের গার্হস্থ্য ও মাতৃত্বজনিত চরম দুর্দশা ও কষ্ট দেখে তীব্রভাবে আলোড়িত হয়েছিলেন।
বাবার সকলরকম অত্যাচারে জর্জরিত মায়ের দুর্দশা এবং তাঁর নিজের ওপর বাবার আধিপত্য খাটাবার দাবি সহ্য করতে না পেরে মেরি ওলস্টনক্র্যাফট্ অসুখী, অভাবী পরিবারের পরিবেশ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য, স্বনির্ভর ও উপার্জনশীল হওয়ার জন্য, মাত্র উনিশ বছর বয়সে বাড়ি ত্যাগ করে চলে যান। এরপরের ইতিহাস ঝঞ্ঝামুখর, সংগ্রামমুখর জীবন এবং নারীবাদের তাত্ত্বিক রূপে তাঁর গড়ে ওঠার কাহিনী। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবন তাঁর বড়ই কষ্টের ছিল। দ্বিতীয় সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় তিনি
মারা যান।
মার্গারেট সেঙ্গার আশৈশব দেখেছেন মাকে কেবল সন্তান-জন্মদানে বিধ্বস্ত হতে। ১১ জন জীবিত ও ৭ জন মৃত সন্তান প্রসব করার ধকলে এবং যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মা মারা যাওয়ার ঘটনায় বাবাকে অভিযুক্ত করে মাত্র উনিশ বছর বয়সে মার্গারেট সেঙ্গার বাড়ি ছেড়ে চলে যান আত্মনির্ভরশীল হওয়ার জন্য। আমরা জানি, তিনি প্রতিষ্ঠিত হন এবং নারী-সমাজকেও স্বনির্ভর হওয়ার পথ প্রদর্শন করেন।
সিমোন দ্য বোভোয়ার তাঁর বাবার ঔদার্যে বড় হয়ে উঠেছিলেন। বাবা তাঁকে ছেলের মতোই মানুষ করেছেন, বলেছেন, মেয়ে তার পুরুষের মতো চিন্তা করে, বুদ্ধি তার পুরুষের মতোই। কিন্তু সেই বাবার অধীনেই মাকে তিনি দেখেছেন ক্লান্তিকর দুঃসহ গৃহস্থালির কাজে নিষ্পেষিত হতে। এই নিয়তির হাত থেকে মুক্তির জন্য তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন কখনো গৃহিণী বা মা হবেন না। মাত্র একুশ বছর বয়সে তিনিও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু করেন অস্তিত্ববাদী আন্দোলন। পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতাকে তিনি বদলে দিয়েছেন।
এই তিনজন নেত্রীর জীবনী, বই, দর্শন ও আন্দোলনের ধারা যদি একত্রিত করে বিশ্লেষণ করা যায়, তবে নারীমুক্তির দরজা খুলে যাওয়ার সমগ্রতা ধরা পড়বে।৬
বর্তমান বিশ্বের নারী-আন্দোলন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে মার্গারেট সেঙ্গারের চ্যালেঞ্জ ও মতবাদ। কিন্তু আজ বিশ্ব-নারী-আন্দোলন অন্যরকম বক্তব্য ও ঘোষণা নিয়ে লড়াই করছে। মার্গারেট সেঙ্গার বলেছিলেন যে, নারীর সবরকম অধিকার, যথা: শিক্ষা, ভোটাধিকার, বৈষম্য দূর করা, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের অধিকার, জীবনের সকলরকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার-প্রতিষ্ঠা বাস্তবে তখনই সম্ভব হবে যখন নারী জন্মনিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারবে মাথাধরার বড়ি অ্যাসপিরিনের মতো সহজভাবে ‘পিল’ খেয়ে। সেই ‘পিল’ আবিষ্কৃত হওয়ার পর নারীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। বর্তমানে ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায় যে, মাসিক ঋতুস্রাব দীর্ঘায়িত করতেও এই পিল-অপব্যবহার বেড়েছে। তা নারীর শরীরের ওপর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
আরো দেখা গেল, নারী ‘পিল’ খেয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও তার জীবন-নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি এতে নেই। দম্পতি – নারী ও পুরুষ, সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্র ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান – একযোগে যতক্ষণ পর্যন্ত না নারীর সিদ্ধান্তগ্রহণের অধিকার-বিষয়ে, তার শিক্ষা-কর্মসংস্থান-অর্থনৈতিক-সামাজিক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রভৃতি বিষয়ে রক্ষণশীল চ্যালেঞ্জগুলো বাতিল করে আধুনিক চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছে – ততক্ষণ বা ততদিন নারীর নিজ-জীবন নিয়ন্ত্রণের এমনকি ‘পিল’ খেয়ে সন্তান-জন্মনিয়ন্ত্রণের সুফল অর্জিত হবে না।
বাংলাদেশে এই পিল-ব্যবহারের ব্যাপক কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৭২ সালে পরিবার-পরিকল্পনায় নিবেদিত বা ‘Concern for Women’ প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে। আমি নিজে ১৯৭৪ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সেই কার্যক্রমে পেশাগত কাজ করেছিলাম। দ্বিতীয়বার সন্তানসম্ভবা হওয়ায় প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা-অনুযায়ী (প্রেগনেন্ট মহিলাকে এই কাজে নিযুক্ত না রাখা) আমার চাকরি চলে যায়। নারী-আন্দোলনে যুক্ত থাকায় ও পেশাগত কাজের অভিজ্ঞতায় জেনেছি, বাংলাদেশের শতকরা ৮০ জন পুরুষ নারীর পিল খাওয়ার বিরুদ্ধে ছিলেন। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। পিল খেতে দিতে সম্মত হলেও ‘কনডম’-ব্যবহারে পুরুষ অনিচ্ছুক থাকছে। পুরুষের মতই তো এখনো সিদ্ধান্ত বিরাজ করছে। নারী-আন্দোলনে আজ সর্বসম্মত প্রতিষ্ঠিত মত হচ্ছে : নারীর এক মৌলিক সমস্যা প্রজননগত ভূমিকার সঙ্গে তার উৎপাদনশীল শ্রমের সামঞ্জস্য-বিধান। নারীর অবস্থা ও অবস্থান-বদলের বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে হবে দুটি কারণের একযোগে কাজ হিসেবে : উৎপাদনশীল শ্রমে নারীর অংশগ্রহণ ও প্রজননের দাসত্ব থেকে মুক্তিলাভ। রূপান্তরিত করতে হবে নারীর সামাজিক ও রাজনৈতিক মর্যাদা।
১৯৯৫ সালে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্বনারী-সম্মেলন ও তার পরবর্তী ১০ বছরে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের নারীর মর্যাদাবিষয়ক জাতিসংঘ কমিশনের প্রতিবেদনে (পৃথিবীর প্রায় সকল দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিবেদনের প্রতিফলন ঘটছে) নানারকম ইতিবাচক ও নেতিবাচক পরিস্থিতির বিষয় জানা যায়। এর মধ্যে এখনো সমস্যা হিসেবে নারীর শরীর ও জীবনরক্ষার বিষয়টি গুরুতর হয়ে উঠছে HIV ভাইরাস থেকে সৃষ্ট অওউঝ-এ আক্রান্ত নারীদের জন্য কর্মসূচি-গ্রহণের মাধ্যমে।
‘পিল’ এক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারছে না। এক্ষেত্রে পুরুষ যৌনসঙ্গীর ‘কনডম’-ব্যবহারের গুরুত্ব আজ সকলেই জানেন।
পূরবী বসু যেহেতু ‘পিল’-বিষয়েই মনোনিবেশ করেছেন, সেজন্য ‘কনডম’-এর ইতিহাস বা ব্যবহারের গুরুত্ব-বিষয়ে চারটি মাত্র বাক্য ব্যবহার করেছেন। যৌন সংক্রামক ব্যাধি-রোধে ‘পিল’ যেহেতু ভূমিকা রাখতে পারছে না তাই নারীর নিজের বেঁচে থাকাই আজ চরম ঝুঁকির মুখে। এইচআইভি ভাইরাসে এইডস-এর সংক্রমণ থেকে সন্তানকে বাঁচাবার জন্য অর্থাৎ সন্তান যেন জন্মই না নিতে পারে সেজন্য প্রত্যেক নারীকে (যারা সন্তান জন্ম দেওয়ার বয়সী) পিল খেয়েই যেতে হবে। নিজে বাঁচার জন্য নারীকে সংগ্রাম করতে হবে যৌনসঙ্গীকে কনডম-ব্যবহারে বাধ্য করতে। এই যুগে নারী হেরে যাচ্ছে পুরুষ যৌনসঙ্গীকে কনডম-ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে। এক্ষেত্রে সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি পুরুষের হাতেই থেকে যাচ্ছে।
নারীকে শোষণ ও বঞ্চিত করার পুঁজি এখনো যৌনতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত আরো ভয়াবহভাবে। এইডস রোধে পুরুষের কনডম-ব্যবহার যেখানে অত্যাবশ্যকীয় সেক্ষেত্রে আমরা দেখছি বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সর্বত্র ‘কনডম’-ব্যবহারে পুরুষের অনাগ্রহ। পৃথিবীর সর্বত্রই রাষ্ট্রীয়ভাবে কনডম-প্রাপ্ততা সহজলভ্য করা হচ্ছে না। পৃথিবীর বয়ঃসন্ধিকালের অল্পবয়সী তরুণদের শতকরা ২৫ ভাগ ঐওঠ সংক্রমিত। এই বয়সী মেয়েদের মধ্যে সংক্রমণের হার তুলনামূলক বেশি বাড়ছে। অথচ কনডম-ব্যবহারের বিষয়ে এদের সচেতন করা, এদের জন্য কনডম সহজলভ্য করার বিষয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তীব্র বিরোধিতা করছে। যৌনতার যথেচ্ছাচারে অভ্যস্ত কনডম-ব্যবহারে অনিচ্ছুক পুরুষ এইডসের সংক্রমণ ছড়াচ্ছে গৃহ-অভ্যন্তরে ‘অতি বিশ্বস্ত’ গৃহবধূর শরীরে। বাংলাদেশে এইডসে গৃহবধূদের নীরব মৃত্যু-আশঙ্কা তীব্ররূপে দেখা দিয়েছে। (‘কেয়ার’ পরিচালিত গবেষণা, ২০০৩)।
এই পরিস্থিতিতে আন্দোলন জোরদার হতে হবে ‘কনডম’-ব্যবহারের সাফল্য শতকরা ১০০ ভাগ কার্যকর করার জন্য। রাষ্ট্র, পরিবার, সমাজ, নারী-পুরুষের যৌথ কার্যক্রম এই সাফল্য আনতে পারবে।
সূত্র :
১. সিমোন দ্য বোভোয়ার, দি সেকেন্ড সেক্স, অনুবাদ : হুমায়ুন আজাদ, দ্বিতীয় লিঙ্গ, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০১ পৃ. ১০৪-১০৫।
২. Alice S. Rossi, edited, The Feminist Papers, Northern University Press, Boston, 1988, p. 25-85.
৩. Margaret Sanger, The Right To One’s Body, p. 518.
৪. ঐ, পৃ. ৫২১।
৫. Constance Jones, 1001 Things Everyone Should Knwo about WomenÕs History, Double Day, Nwe York, 1998, p. 164. ৬. Alice S. Rossi, ed., The Feminist Papers প্রাগুক্ত।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.