শৈশবের অনুসন্ধান

বাস্তববাদী চিত্র-পদ্ধতির সঙ্গে নস্টালজিক আবহ যুক্ত করে শেখ আফজাল একপ্রকার ব্যক্তিজগৎ তৈরি করে থাকেন। এই ব্যক্তিজগৎ মূলত শৈশবকেন্দ্রিক। শৈশব হচ্ছে ব্যক্তির আত্মোপলব্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আত্মোপলব্ধির একটি অংশ হিসেবেই শেখ আফজাল চিত্ররচনা করে থাকেন। শৈশব তাঁর কাছে খুব-একটা দূরের বিষয় নয়। তিনি সেটিকে চিন্তার স্তরে বহন করেন এবং সম্পর্ক-স্থাপনের আকাক্সক্ষা করেন। ফলে অন্য ধরনের ফিগার যখন আঁকেন তখনো সেখানে ব্যক্তির মানসিক পরিস্থিতিতে নস্টালজিক আবহ কাজ করে।

সাজু আর্ট গ্যালারিতে চলতে থাকা তাঁর প্রদর্শনীতে শৈশব-স্মৃতিসহ এসেছে পার্বত্য প্রাকৃতিক পরিবেশ, সুন্দরবন, ল্যান্ডস্কেপ। কিছুটা চাইনিজ স্ক্রলের মতো করে বাংলা ক্যালিওগ্রাফির ব্যবহার এবং স্পেসবিন্যাস কাজে মাত্রা দান করেছে। জলরংগুলোতে একপ্রকার স্থিতিমুহূর্ত লক্ষ করা যায়, যে-মুহূর্তটি যে-কোনো জনপদ বা বসতি-স্থাপনের সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত থাকলে উদ্ভূত হয়। জীবনযাপনের নিরবচ্ছিন্নতার সাথে একপ্রকার স্থিতিময় আবহ কাজ করে। কারণ স্থিতি না থাকলে জীবন রচিত হয় না। তাই শিল্পী আফজাল যখন জনগোষ্ঠীর জীবন বা ব্যক্তির জীবন আঁকেন সেখানে এই স্থৈর্যের দেখা মেলে। ওই স্থৈর্যকে দুভাবে ধরা যায়। চিত্রে গতি তৈরি করে আবার গতিহীনতা তৈরি করেও। শেখ আফজাল মধ্য- পথে গিয়েছেন। ফলে একপ্রকার ম্যাচ্যুরিটির (টেকনিকগত) সাহায্য তাঁকে নিতে হয়। ক্যালিওগ্রাফির উল্লম্ব ব্যবহার ছবিতে কাব্যিকতা নিয়ে এসেছে। কিছু জলরং দেখে মনে হয়েছে কাজ কম হলে অধিক ধার পাওয়া যেত।

ছবিকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করার একেক পদ্ধতি একেক শিল্পী গ্রহণ করেন। সৌন্দর্যমণ্ডিত করাটা শিল্পে জরুরি নয়। জরুরি হচ্ছে শিল্প-তৈরির উদ্দেশ্যে যাওয়া। সেটি সৌন্দর্য তৈরি করেও যাওয়া যায় আবার অতি কদাকার আকৃতি রচনা করেও যাওয়া যায়। শিল্পী আফজাল সৌন্দর্য তৈরি করে লক্ষ্যে যেতে চান। সেক্ষেত্রে তাঁকে আরো জটিল উপায় অবলম্বন এবং পরিমিতির বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে বলে মনে হয়েছে। চড়া রঙের বিপরীতে যে-হাইপার রিয়ালিস্টিক আলো-আঁধারি তিনি তৈরি করেন সেই আলো-আঁধারি আরো বেশি নাটকীয় হয়ে উঠত যদি তিনি কিছু ক্ষেত্রে রঙের সরল উচ্ছ্বাসকে জটিল করে ফেলতেন। তবে আলোর ভিন্ন জাগতিক প্রয়োগ তাঁর নস্টালজিক আবহ-তৈরিতে ব্যাপক সাহায্য করেছে। নারী-চরিত্র-চিত্রণে তিনি মধ্যবিত্ত নারীর আটপৌরে ভঙ্গিকে বেছে নিয়েছেন। রিয়ালিজমের সঙ্গে সামাজিক প্রেক্ষাপট মিলিয়ে নারী-চরিত্রগুলো মনে হয় কোনো-না-কোনোভাবে পারিবারিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত। তবে তাঁর নারীরা প্রেমময়ী এবং ঘরমুখী। তাঁর ছবির শিশুরা নিঃসঙ্গ এবং কিছুটা বিমর্ষ। এই বিমর্ষতা আত্মমগ্নতার। তারা যখন একসঙ্গে খেলা করে, সেখানেও কাজ করে নিঃসঙ্গ আত্মমগ্নতা। এই আত্মমগ্নতা যেন তাদের ভবিষ্যতের। যে-ভবিষ্যতে শিল্পী শেখ আফজাল নিজেই হয়তো অবস্থান করছেন।

আমাদের দেশের চিত্রকলায় শিশুরা অনেকের ছবিতেই এসেছে। একেক শিল্পী একেকভাবে এনেছেন। তবে শেখ আফজালের শৈশব-রচনা সবচেয়ে বেশি ব্যক্তিগত জীবনঘেঁষা বলেই প্রতিভাত হয়। শৈশবের সার্বজনীন চিত্রায়ণের চেয়ে তিনি তার নিজের শৈশবকে যেন খুঁজে ফিরছেন।

শেখ আফজাল ছবি আঁকেন দৃশ্যজগতের খণ্ডাংশকে বিশেষায়িত করে, যা সম্ভবত অধিকাংশ শিল্পীই করে থাকেন। তবে বিশেষায়নের এই প্রক্রিয়া একেক শিল্পীর একেকরকম। বিশ্বজগৎকে বিশেষায়িত করতে শিল্পী আফজাল ব্যবহার করেছেন টেক্সচার ও আলোর কড়া ব্যবহার, যে-কারণে এক ধরনের বাস্তববোধের সঙ্গে ফ্যান্টাসির মিলিত বোধ ছবিতে তৈরি হয়। তবে সেই ফ্যান্টাসি বাস্তবশাসিত। শিল্পী আফজাল শেষ পর্যন্ত বাস্তব দিয়ে সমাধান করতে চান তাঁর বিশ্ববীক্ষার। যদিও স¥ৃতিকাতরতা ও শৈশব তাঁকে ফ্যান্টাসির জগতে ডাক দেয় তবুও তিনি একপ্রকার শ্রেণিবোধের মাধ্যমে বাস্তবে ফিরে আসেন। তাঁর কাজে একপ্রকার নিু মধ্যবিত্ত পারিবারিক মূল্যবোধ, পরিবেশ এবং তাদের প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। শ্রেণির এই বিশেষ প্রক্ষেপণ তাঁর চিন্তাসূত্রের কিছু দিক তুলে ধরে। চিত্রশিল্পে সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস নির্ভর করে শিল্পীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক অবস্থানের উপর। সাহিত্যেও তাই। শ্রেণি-প্রক্ষেপণের প্রক্রিয়া ও আদল দিয়ে শিল্পীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও সমাজের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সহজেই নির্ধারণ করা যায়। যেমন – চিত্রশিল্পে আইকন-নির্ভর বিষয়-বস্তুর সমাপ্তি ঘটে মূলত ইমপ্রেশনিস্ট ও পোস্ট ইমপ্রেশনিস্টদের হাতে। পরবর্তীকালে বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যায়ে শিল্পকে শিল্পের শ্রেণি-বিন্যাস থেকেও মুক্ত করে দাদাবাদীরা। এসব আন্দোলনের পেছনে এমনি শক্তিশালী চালিকা-শক্তি হিসেবে কাজ করেছে শ্রেণি-সচেতনতা। শ্রেণি-সচেতনতার বহিঃ-প্রকাশ হিসেবে শিল্প যে-শক্তি অর্জন করেছে তারই অবশেষ চলছে চিত্রকলার কনসেপচুয়াল এলাকা-গুলোয়। সমাজকে প্রশ্ন করার অধিকার শিল্প এই সচেতনতার মাধ্যমেই অর্জন করেছে। তবে শিল্পের সঙ্গে সমাজের সম্পর্কগুলো নির্ধারিত হয় আর যেসব অনুষঙ্গের মাধ্যমে, সেগুলো আবার ঐতিহ্যগত। শিল্পী আফজাল ঐতিহ্যগত জায়গা থেকেই শ্রেণি-সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন, যার ফলে বৈপ্লবিক প্রতিবাদের স্থান থেকে সরে এসে একপ্রকার ফটোগ্রাফিক বাস্তবতাকে তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন। সে-কারণে জীবনের দার্শনিক গুণাগুণের চেয়ে তাঁর চিত্রে তাৎক্ষণিক মানবিক অনুভূতিগুলো অধিক প্রত্যাশিত। এক্ষেত্রে মানবিক অনুভূতি ও দর্শনের সংশ্লেষণ হলে তাঁর চিত্রভাষা বৃহত্তর প্রেক্ষাপট পাবে বলে মনে হয়। বাংলাদেশের চিত্রকলায় এ-দুইয়ের সংশ্লেষণ কম শিল্পীর মধ্যেই দেখা যায়। তবে অনেকের মধ্যে প্রচেষ্টা বিদ্যমান।  কিন্তু দর্শনের জটিলতার জায়গাটুকু শিল্পীদের সহজভাবে        অনুধাবন করতে হবে। যে-কাজটি সুলতান ও জয়নুলের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই ক্রিয়া করত। চিত্রকলা মূলত প্রাথমিকভাবে দর্শন ও সাহিত্য-আশ্রয়ী। পরবর্তীকালে নাটক, সংগীত, চলচ্চিত্র – এসব মাধ্যমের নানা বৈশিষ্ট্য শিল্পীর টেম্পারমেন্ট-অনুযায়ী তাঁর ছবিতে প্রকাশিত হয়। শিল্পী আফজালের ছবিতে চলচ্চিত্রের আলো ও সাহিত্যের নস্টালজিয়ার প্রভাব বিদ্যমান, যে-কারণে একপ্রকার স্থির নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে ফ্রিজ শটের মতো তাঁর চরিত্রগুলো দর্শকের দিকে বীক্ষণরত। অবশ্য প্রদর্শনীর জলরংগুলোর বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণই ভিন্ন মেজাজের। জলরংগুলোয় যে-পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে সেখানে একপ্রকার ছদ¥-আবহাওয়ার ইমেজ বিদ্যমান। অর্থাৎ পরিবেশটির যে-স্বাভাবিক আলো-আবহাওয়ার বিষয়টি ছিল সেখানে তাঁর উপস্থিতি নেই। তিনি অনেকটা স্টুডিও-আবহাওয়ার ইমেজে জলরংগুলোর পরিবেশ তৈরি করেছেন। যে-কারণে একপ্রকার ক্লাসিক ভঙ্গির সূক্ষ¥ প্রয়াস লক্ষ করা যায় এসব কাজে। আমাদের চিত্রকলায় জলরঙের সম্ভাবনাকে এখন পর্যন্ত পুরোমাত্রায় কাজে লাগানো হয়নি। জলরঙের শক্তিকে বুঝতে হলে অনেকটা উপকরণের দৃষ্টিভঙ্গিতে একে বিচার করতে হবে, যে-উপকরণকে যে-কোনো চিত্রভাষায় নিযুক্ত করা যায়। ফলে জলরং চিত্রভাষার অন্তর্নিহিত জ্ঞানের মাধ্যমে প্রাগ্রসর ভূমিকা রাখতে পারবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, জলরং কয়েকটি নির্দিষ্ট টেকনিকের বশবর্তী হয়ে টেকনিকের মুনশিয়ানায় শেষ হয়ে গেছে। সেগুলো জলরং হিসেবে যে মানসম্পন্ন নয়, তা কিন্তু নয়। কিন্তু এই হিসাবের বাইরে তেমনভাবে জলরং নিয়ে শিল্পীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাননি। তাই জলরঙের এই অদৃশ্য জগৎ নিয়ে কাজ করে অনেকেই নতুন এলাকা সৃষ্টি করতে পারেন। নতুন এলাকার মাধ্যমেই নতুন চৈতন্য সৃষ্টি হবে, যে-চৈতন্য অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে চিত্রকলা সমৃদ্ধ হয়।