মহামানবের সাগরতীরে : রবীন্দ্রনাথের সমাজ, রাষ্ট্র/ জাতি ও জাতীয়তাবাদ ভাবনা

রবীন্দ্রনাথের সমাজ, রাষ্ট্র/ জাতি ও জাতীয়তাবাদ ভাবনা যে পৃথক তিনটি প্রকোষ্ঠে বিকশিত হয়েছিল, তা নয়; এ তিনটি ভাবনার ভেতর সংযুক্তি ছিল, কার্যকরণসূত্রে একটির সঙ্গে অন্যটির সম্পর্ক ছিল। তাই তাঁর সমাজভাবনায় রাষ্ট্রভাবনার অনুষঙ্গগুলি বিধৃত হয়েছে; তাঁর রাষ্ট্রভাবনাকে প্রভাবিত করেছে সমাজভাবনা, এবং তাঁর জাতীয়তাবাদের চিন্তাকে একটা পরিণতি এবং নির্দেশনা দিয়েছে তাঁর সমাজভাবনা। একইভাবে জাতীয়তাবাদ সম্পর্কিত তাঁর চিন্তায় রাষ্ট্র ছিল একটি প্রধান পক্ষ। তবে, মোটা দাগে আমরা দেখাতে পারি, রবীন্দ্রনাথের এ তিন ভাবনায় সমাজ নিয়ে ছিল আশাবাদ; রাষ্ট্র বা জাতি এবং জাতীয়তাবাদ নিয়ে ছিল সংশয় ও শঙ্কা। তাঁর কাছে সমাজ ছিল জাতি বা রাষ্ট্রগঠনের মূল ভিত্তি, যদিও রাষ্ট্র নিজে এই ভিত্তির বিপ্রতীপে অবস্থিত, এবং জাতীয়তাবাদ ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রের বিচলনের জন্য দায়ী। যত তিনি সমাজের ভেতর ভারতের তথা বাঙালির সংহতি ও মুক্তি খুঁজেছেন, তত তিনি জাতি বা ন্যাশন এবং রাষ্ট্র বা স্টেট সম্পর্কে সাবধান হচ্ছেন, এবং জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে শঙ্কিত হচ্ছেন। ফলে রাজনীতি, সমাজ ও দেশ নিয়ে তাঁর লেখালেখিতে তিনি একসময় সুনির্দিষ্ট কিছু অবস্থান গ্রহণ করেছেন, যদিও এই অবস্থানগুলি শুরু থেকেই সুচিহ্নিত ছিল না, বরং এসব অবস্থানে পৌঁছার দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় অনেকবার তিনি তাঁর চিন্তাভাবনার পরিমার্জনা করেছেন, এমনকি এদের ভেতর কিছু অসঙ্গতি তৈরি হতেও দিয়েছেন। নিজের একসময়ের কোনো চিন্তার বাইরে গিয়ে ভিন্ন সময়ে তিনি হয়তো ভিন্ন কোনো বক্তব্য দিয়েছেন, অথবা একই সময়ে তাঁর কোনো তত্ত্ব ও সেই তত্ত্বের প্রয়োগে কিছু ব্যবধানও রেখে দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ নিজে বলেছেন, তিনি রাজনীতিবিদ বা রাষ্ট্রনীতিবিদ কোনোটাই নন, সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ে তাঁর চিন্তা মূলত একজন সচেতন এবং পরিবর্তনকামী নাগরিকের। বস্তুত, উনিশ শতকের শেষ দুই দশক থেকে ভারতীয় রাজনীতিতে যে পরিবর্তন তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন; সমাজের নানা বিবর্তন ও বিরোধের যে-অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন; কুড়ির দশকের শুরু থেকে পশ্চিমে, জাপানে, চীনে ও পারস্যে তিনি সরেজমিনে যেসব ঘটনা দেখেছেন এবং সমাজ, রাজনীতি ও সাম্রাজ্যবাদের নানা রূপ ও কাঠামোর নমুনা পর্যবেক্ষণ করেছেন, এবং প্রথম মহাযুদ্ধ পার হয়ে কুড়ি-তিরিশের দশকে ভারতীয় ও বিশ্ব রাজনীতিতে যে সংঘাতময় ও সহিংস পালাবদল দেখেছেন, তার প্রভাবে সমাজ ও রাষ্ট্র, জাতীয়তাবাদ, সাম্রাজ্যবাদ এবং আন্তর্জাতিকতাবাদ নিয়ে তিনি নিরন্তর ভেবেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন এবং লিখেছেন। সেগুলোর ভেতর আপনা থেকেই একটা তাত্ত্বিক শৃঙ্খলা এবং মতাদর্শগত ঐক্য দাঁড়িয়ে গেছে যা তাঁর আলোকপ্রাপ্ত উদার মানবিকতা  এবং রোমান্টিক চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

এই ‘রোমান্টিক’ শব্দটি এখানে দ্বিবিধ অর্থে বিশেষ তাৎপর্যময় – এর প্রথম অর্থটি সংশ্লেষী, অর্থাৎ কল্পনাশ্রয়ী চিন্তা ও হিতকারী উদ্দেশ্যের মিলনের ইঙ্গিতবহ, এবং দ্বিতীয় অর্থটি বিশ্লেষী, অর্থাৎ রোমান্টিকতার অন্তস্থিত কল্পনা ও বাস্তবের অমিলকে ব্যাখ্যা করার প্রয়াসী। সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়ে রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় দূরবর্তী ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের সন্নিপাত যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ওই ইতিহাস কেন গুরুত্ব হারালো, এবং বর্তমান ঘটনাপ্রবাহ কেন মানবজাতিকে পরিত্রাণহীন একটি দিগন্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের পথনির্দেশ রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় সমাজের সংশ্লেষী চরিত্রের পুনরুত্থান কামনা করেছেন; অন্যদিকে আধুনিক রাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদ চিন্তার বিশ্লেষী ও শেষ বিচারে বিনাশী চিন্তার অবসান দেখতে চেয়েছেন, কিন্তু তিনি ভালোভাবেই অবগত ছিলেন, সমাজ নিজ থেকে বদলায় না, অথবা বাইরে থেকে আসা কোনো বিনাশী চিন্তা হঠাৎ করে শক্তি সঞ্চয় করে না। সমাজ বদলের জন্য সমাজের ভেতরের মানুষের কর্মোদ্যোগ এবং বাইরের অনিষ্টকারী শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার জন্য প্রয়োজন আত্মশক্তির সমাবেশ। এজন্য রবীন্দ্রনাথ শেষ বিচারে দৃষ্টি দিয়েছেন ব্যক্তির ওপর; আরো নির্দিষ্টভাবে, ব্যক্তির ভেতরের শক্তি ও সম্ভাবনার ওপর। আত্মশক্তির উদ্বোধন অবশ্য ঘটেনি, এবং কেন ঘটেনি, তার কারণগুলি এ-প্রবন্ধে বিশ্লেষণ করা হবে। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার মূল একক হচ্ছে ব্যক্তি ও গ্রাম। গ্রাম বা গ্রামীণ সমাজ যদি হয় ব্যক্তির সক্রিয় প্রতিনিধিত্বকারী, এবং ব্যক্তি যদি সক্রিয়ভাবে প্রতিনিধিত্ব করে তার সমাজের, তাহলে পরস্পরের ভেতরে একটি মিথস্ক্রিয়া চলতে থাকে, যার প্রভাবে সমাজ উন্নত হয়, অর্থাৎ এর দায়বদ্ধতার এবং সক্রিয়তার ক্ষেত্রগুলি সংহত হয়। তেমনি ব্যক্তিও তার কর্মোদ্যমে সমাজকে এগিয়ে নিতে পারে। এই প্রতিনিধিত্বকারী এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তার সঙ্গে সাদৃশ্য ছিল ফরাসি রাষ্ট্রনায়ক ও চিন্তাবিদ ফ্রাঁসোয়া গিজোর (১৭৮৭-১৮৭৪) জাতিসম্পর্কিত মতের সঙ্গে। আরেক ফরাসি তাত্ত্বিকের চিন্তার সঙ্গে তাঁর মিল ছিল, এবং তিনি হচ্ছেন আর্নস্ট রেঁনা (১৮২৩-১৮৯২)। রেঁনার মতোই রবীন্দ্রনাথ ন্যাশন বা জাতিকে দেখেছেন ষোড়শ শতকের ইউরোপীয় উদ্ভাবন হিসেবে, যার সঙ্গে উপনিবেশ-পূর্ব ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তার কোনো মিল নেই। ‘ন্যাশন কী’ শীর্ষক প্রবন্ধে রেঁনা জানান, একটি ন্যাশন বা জাতির অস্তিত্ব হচ্ছে একটি দৈনন্দিন গণভোট, ঠিক যেমন একজন ব্যক্তির অস্তিত্ব হচ্ছে জীবনের নিরন্তর সত্যায়ন (ভাবা, ন্যাশন অ্যান্ড ন্যারেশন, পৃ ১৯)। এই রোমান্টিক ন্যাশন-চিন্তা রবীন্দ্রনাথেরও, তবে এ-বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনায় পরে যাওয়া যাবে।

তিন স্তরে বিন্যস্ত রবীন্দ্রনাথের সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্র এবং জাতীয়তার ভাবনা কীভাবে কয়েকটি গূঢ় প্রতিপাদ্যে সূত্রবদ্ধ ছিল, তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ ১৯০৪ সালে প্রকাশিত ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধটি। মূলত বাঙালি সমাজ এর উপজীব্য হলেও সমাজ ছাড়িয়ে জাতি ও রাষ্ট্রে এই প্রবন্ধের অভিনিবেশের বিস্তৃতি। চারটি বিষয়কে এই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ গুরুত্ব দিয়েছেন, এবং শুধু সামাজিক বা রাজনৈতিক নয়, বরং নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সেগুলোর বিশ্লেষণ করেছেন। প্রথমত, তাঁর বক্তব্য হলো, পশ্চিমের রাষ্ট্রশক্তির চরিত্রের সঙ্গে ভারতীয় রাষ্ট্রের চরিত্রের মৌলিক একটি পার্থক্য হচ্ছে, পশ্চিমে যেখানে রাষ্ট্র মানুষের ওপর খবরদারি করে, তাকে নিয়ন্ত্রণ করে, ভারতে সেটি প্রথাগতভাবে করে এসেছে সমাজ। রাষ্ট্র অবস্থান নিয়েছে জনগণ থেকে দূরে, ফলে সমাজ বা গ্রামগুলিকে আত্মনির্ভরশীল হতে হয়েছে। বস্তুত গ্রামীণ সমাজে রাষ্ট্রক্ষমতার প্রকাশ ঘটানোর মতো কোনো প্রতিষ্ঠানেরও অস্তিত্ব ছিল না। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্র থেকে এই দূরত্ব এবং এই আত্মনির্ভরশীলতার (অন্যত্র একে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বলেও রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেছেন) ফলে ভারতীয় সভ্যতার প্রধান বিকাশস্থল হচ্ছে গ্রাম। গ্রামের দেবমন্দির, অতিথিশালা, পানীয়জলের উৎস, গ্রামের গুরুগৃহ বা পাঠশালা এবং গ্রামের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড যুগযুগ ধরে স্থানীয় প্রয়োজন এবং আকাক্সক্ষা অনুযায়ী সৃষ্ট এবং পরিচালিত হয়ে এসেছে, এবং সমাজের স্বকীয়তা রক্ষিত হয়েছে। এজন্য রাজায় রাজায় সংঘাতেও এগুলি ক্ষতিগ্রস্ত বা বাধাপ্রাপ্ত হয়নি। সেজন্য গ্রাম থেকে উৎসারিত কল্যাণশক্তি দেশের কল্যাণশক্তি হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। একই পর্যবেক্ষণ রবীন্দ্রনাথ করেছেন ‘ভারতবর্ষীয় সমাজ’ (১৯০১) প্রবন্ধে। ওই প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, পশ্চিমে নানান রাষ্ট্র বিপ্লবে যেমন জাতি বা ‘নেশন’ আত্মরক্ষা করেছে, জয়লাভ করেছে, সেভাবে আত্মরক্ষা ও জয়লাভ করেছে ভারতীয় সমাজ। তবে পশ্চিমা ন্যাশনের রক্ষাসূত্র যেখানে এর সংগঠন ও সামরিক শক্তি, ভারতীয় সমাজের ক্ষেত্রে এটি ছিল এর কল্যাণশক্তি, যার গঠনে নীতি ও ধর্মের একটি ভূমিকা ছিল। স্বদেশি সমাজ অন্ন, বস্ত্র, আরোগ্য ইত্যাদি মৌলিক বিষয়ে যে-আত্মনির্ভরশীল ছিল, তাও তার কল্যাণশক্তির জন্য। এই কল্যাণশক্তিকে জাগ্রত করার জন্য সমাজ আত্মশক্তি বিকাশে উৎসাহ দিত। সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কিত লেখালেখিতে রবীন্দ্রনাথ অনেকবার উল্লেখ করেছেন, ভারতবর্ষের সমাজপ্রধান ব্যবস্থাটি বিনষ্ট হয় উপনিবেশী শাসনের প্রকোপে। ইংল্যান্ডে যেরকম সর্বসাধারণের মঙ্গলভার রাজশক্তিতে পূঞ্জীভূত, ভারতে তেমন সমাজে। ইংল্যান্ডে রাজশক্তি বিপর্যস্ত হলে সর্বসাধারণের জীবনে সংকট সৃষ্টি হয়, ভারতে সংকট সৃষ্টি হয় সমাজ বিপর্যস্ত হলে। অথচ উপনিবেশী শাসন ভারতে পশ্চিমা রাষ্ট্রপ্রধান ব্যবস্থা প্রয়োগ করলো এবং নানা বিধি-বিধান, আইনি ও বিচারিক ব্যবস্থা, এবং কেন্দ্রমুখী প্রতিষ্ঠান ভারতীয় সমাজের প্রাণশক্তিকে রুদ্ধ করে দিলো। এই রুদ্ধতা এবং এর বিপরীতে বিকাশের বিষয়টি রবীন্দ্রনাথের তৃতীয় বিবেচনা। আত্মশক্তির সমাবেশ যদি না ঘটাতে পারে স্বদেশি সমাজ, তাহলে এর উদ্ধার সম্ভব নয়। চতুর্থত, রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন, স্বদেশি সমাজের প্রকৃত পরিচয় হচ্ছে এর সন্নিবেশী চরিত্র, এর আত্মস্থ করার শক্তি। বিভিন্ন বিচিত্র ও বিক্ষিপ্ত বহু উপাদানকে স্বদেশি সমাজ একটি জায়গায় এনে সংহত করেছে, নিজের প্রয়োজনে নতুন রূপে সাজিয়েছে। ‘ভারতীয় সমাজ’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, সমাজ সকল ধর্ম ও জাতকে স্থান দিয়েছে, তাদের সহ অবস্থান নিশ্চিত করেছে। সমাজের এই সংহতিশক্তির পুনঃউদ্বোধন ছিল রবীন্দ্রনাথের লক্ষ্য। এজন্য তিনি সমাজের সাধারণতন্ত্রকে গুরুত্ব দিয়েছেন, ন্যাশনতন্ত্রকে নয়।

স্বদেশি সমাজের প্রাচীন ইতিহাস এবং অবস্থান নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যতটা নিশ্চিত ছিলেন, তার বর্তমান অবস্থান নিয়ে ততটাই ছিলেন উদ্বিগ্ন। এই সমাজের তিনটি বিষয় তাঁকে পীড়া দিত। প্রথম, যে অতিথিশালা, পানীয়জলের বন্দোবস্ত অর্থাৎ যা কিছু পূর্তকাজ ইত্যাদির কথা তিনি উল্লেখ করেছেন, সেগুলি রাজ অনুগ্রহে অথবা জমিদারের উদ্যোগে নয়তো পুণ্যের প্রলোভনে স্থাপিত – সেগুলি এক প্রকার চ্যারিটি বই কিছু নয়। গ্রামের মানুষ নিজ উদ্যোগে সেগুলি স্থাপন করেছেন, এমন নজির খুবই কম, চোখে না পড়ার মতোই। কেন নেই, তার কারণটাও তিনি উল্লেখ করেন, এবং তা হচ্ছে আত্মশক্তির রুদ্ধতা। এমন ঘটনার কথাও রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেন, যেখানে গ্রামে আগুন লাগলে একটা কুয়ার অভাবে মানুষ সেই আগুন নেভাতে পারে না। অথচ এজন্য দোষ দেয় অদৃষ্টকে। এই দৃষ্টান্ত থেকে সমাজের পীড়াদায়ক দ্বিতীয় বিষয়টির উল্লেখ করা যায়, এবং তা হচ্ছে সমাজের কর্মহীনতা। কালান্তর গ্রন্থের বিভিন্ন প্রবন্ধে তিনি স্বীকার করছেন, শুধু যে কাজকর্ম বন্ধ হয়ে গেছে তা নয়, ‘সেই পরিমাণ বাহবার ঘণ্টা বাড়িয়া উঠিয়াছে,’ (‘বিবেচনা ও অবিবেচনা’, কালান্তর, পৃ ২৭) রাষ্ট্রযন্ত্রের উৎপাতে সমাজ কর্মহীন হলে অদৃষ্টবাদ একটা সান্ত্বনা হিসেবে মানুষের সামনে আসে। কর্মহীনতার আরেকটি কারণ ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম’ প্রবন্ধে কিছুটা বিস্তারে বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। ‘সংসারে তাই ধর্মে-কর্মে আচারে-বিচারে যত সংকীর্ণতা, যত স্থূলতা, যত মূঢ়তাই থাক্, উচ্চতম সত্যের দিক হইতে তার প্রতিবাদ নাই, এমন-কি, সমর্থন আছে।’ জ্ঞানী ও সংসারী সকলেই নিজের দায়িত্ব প্রতিপালনে অক্ষম। ফলে ‘এ দেশে কর্মসংসারে বিচ্ছিন্নতা জড়তা পদে পদে বাড়িয়া চলিল, কোথাও তাকে বাধা দেওয়ার কিছু নাই’ (কালান্তর : ৬৪)। অন্যদিকে, ইউরোপে সত্যসাধনার ক্ষেত্র জ্ঞানে নয়, বরং এর প্রয়োগে, এ-বিষয়টি রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেন।

তৃতীয় যে বিষয়টি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ অনেক লেখালেখি করেছেন, তা হচ্ছে সমাজের সামঞ্জস্য বিধানের ক্ষমতাটি, যা এর অন্তর্গত নানা পার্থক্যকে একটা অভিন্ন তলে বিন্যস্ত করে। হিন্দু মুসলমানের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব ও ভুল বোঝাবুঝি দীর্ঘকাল ভারতের ঐক্য প্রতিষ্ঠার অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তা যে সমাজ থেকে উদ্ভূত তা উল্লেখ করে ‘লোকহিত’ প্রবন্ধে তিনি লেখেন : “হিন্দু-মুসলমানের পার্থক্যটাকে আমাদের সমাজে আমরা কুশ্রীভাবে বেআব্রু রাখি … বাংলার মুসলমান যে এই বেদনায় [অর্থাৎ বঙ্গভঙ্গের বেদনায়] আমাদের সঙ্গে এক হয় নাই তাহার কারণ, তাহাদের সঙ্গে আমরা কোনোদিন হৃদয়কে এক হইতে দিই নাই” (কালান্তর, পৃ ৩৯-৪০)। ‘বাতায়নিকের পত্র’ প্রবন্ধে তিনি
হিন্দু-মুসলমান বিভাজন সমস্যার উল্লেখ করে বলেন, ‘সমাজে পরস্পরের সঙ্গে ব্যবহার, যার উপরে পরস্পরের গুরুতর সুখদুঃখ শুভাশুভ প্রত্যহ নির্ভর করে, সে সম্বন্ধে বুদ্ধির কোনো কৈফিয়ত নেওয়া চলে, এ কথা আমরা ভাবতেও একেবারে ভুলে গেছি’ (কালান্তর, পৃ ১৫৮)। যৌবনে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু মহাসভার আদর্শকে গ্রহণ করেছিলেন, ভারতীয় কংগ্রেস সৃষ্টির (১৮৮৫) পর এর সঙ্গেও তাঁর সংযুক্তি ছিল। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হলে তার বিরুদ্ধে কলকাতাকেন্দ্রিক যে-আন্দোলন সূচিত হয়, তাতে এর সমর্থক হিসেবেও তিনি সক্রিয় ছিলেন, কিন্তু হিন্দু মহাসভার আদর্শ, কংগ্রেসের রাজনীতি, স্বদেশি আন্দোলন বিশেষ করে বিদেশি পণ্য বর্জন বা বয়কট আন্দোলন ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর সন্দেহ তৈরি হলে ১৯০৭ সালের পর থেকে তিনি রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন।

বস্তুত এসব বিষয়ে তাঁর ভিন্নমত তিনি লেখালেখিতে ও বক্তৃতায় তুলে ধরেছেন। ১৮৯৮ সালে ‘প্রসঙ্গ কথা’য় তিনি হিন্দু ধর্ম ও হিঁদুয়ানির প্রভেদ তুলে ধরে লেখেন, ‘বর্তমান কালে হিঁদুয়ানির পুনরুত্থানের যে-একটা হাওয়া উঠিয়াছে তাহাতে সর্বপ্রথমে ওই অনৈক্যের ধুলা, সেই প্রাদেশিক ও ক্ষণিক তুচ্ছতাগুলিই উড়িয়া আসিয়া আমাদিগকে আচ্ছন্ন করিয়াছে।’ যদিও তিনি এই আশাও প্রকাশ করেছেন যে ‘আমাদের দেশের যাহা স্থায়ী, যাহা সারবান্, যাহা গভীর, যাহা আমাদের সকলের ঐক্যবন্ধনের উপায়, তাহাই ক্রমে প্রকাশিত হইয়া পড়িবে’ (‘প্রসঙ্গ-কথা’, পরিশিষ্ট,
রবীন্দ্র-রচনাবলী, দশম খণ্ড, পৃ ৫৫৮)। কিন্তু কীভাবে তা প্রকাশ হবে, সে সম্বন্ধে কোনো নির্দেশনা তিনি দেননি, ফলে এই উচ্চারণও তাঁর রোমান্টিক উদারচিন্তার প্রতিফলন হিসেবেই থেকে গেছে। হিঁদুয়ানির সংকীর্ণতা ও আচার সর্বস্বতার বিপরীতে হিন্দুত্বের যে-সংজ্ঞাটি তিনি দিয়েছেন, তাও প্রণিধানযোগ্য, যেহেতু তা একটি আদর্শায়িত রূপ হিসেবেই বিরাজমান, কর্মক্ষেত্রে এর কোনো প্রয়োগ দেখা যায়নি। ‘স্বার্থের আদর্শকেই মানবসমাজের কেন্দ্রস্থলে স্থাপন না করিয়া, ব্রহ্মের মধ্যে মানবসমাজকে নিরীক্ষণ করা, ইহাই হিন্দুত্ব’ (‘ভারতীয় সমাজ,’ আত্মশক্তি,
রবীন্দ্র-রচনাবলী, তৃতীয় খণ্ড, পৃ ৫২৫)।

সমাজের অপ্রীতিকর বিষয় আরো আছে এবং সেগুলির মধ্যে আছে হিন্দুদের ভেতরেই জাত প্রথার অত্যাচার, নারীকে শিক্ষাবঞ্চিত রেখে তাকে সংসারধর্মের প্রাকৃতিক সেবিকার স্থানে অধিষ্ঠিত করে এক চিরকালীন বঞ্চনার শিকারে পরিণত করা, সমাজের ভেতরে জনহিতি ও মঙ্গলকর্মের অভাব ইত্যাদি। রবীন্দ্রনাথের প্রাচীন-বর্তমান সমাজচিত্রের একদিকে আছে সকলের জন্য নির্দিষ্ট স্থান ও ভূমিকা এবং অন্যদিকে তা থেকে বেরিয়ে এসে অরাজকতা সৃষ্টির বিষয়টি। ‘ছোটো ও বড়ো’ প্রবন্ধে তিনি লিখেন :

একদিন আমাদের দেশে যে সমাজ ছিল তাহা সাধারণের প্রতি আমাদের দায়িত্বের আদর্শকে সচেষ্ট রাখিয়াছিল। সেই দায়িত্বের ক্ষেত্র ছিল সংকীর্ণ … সেই ছোটো সীমার মধ্যে ধনীর দায়িত্ব ছিল তার ধন লইয়া, জ্ঞানীর দায়িত্ব তার জ্ঞান লইয়া … সচেষ্ট জীবনের এই যে নানা দিক বিস্তার, ইহাতেই মানুষের যথার্থ আনন্দ ও গৌরব (কালান্তর, পৃ ৮৮-৮৯)।

এ ছিল প্রাচীন পল্লী সমাজ। এর বর্তমান অবস্থাটি ভিন্ন :

আমাদের সেই দায়িত্ব সমাজ হইতে বাহিরে সরিয়া গেছে। একমাত্র সরকার বাহাদুরই আমাদের বিচার করেন, রক্ষা করেন, পাহারা দেন … সমাজে কোন্টা হিন্দু কোন্টা অহিন্দু আদালত হইতে তার বিধান দেন … সুতরাং এখন আমাদের সমাজ আমাদের উপর যে পরিমাণে ভার চাপাইয়াছে, সে পরিমাণে ভার বহিতেছে না … (কালান্তর,
পৃ ৮৯)।

সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির যে ভারসাম্য একদিন ছিল, তা এখন আর নেই। ব্যক্তি আর সমাজের প্রতিনিধিত্ব করে না। সমাজও করে না ব্যক্তির। ফলে, একদিকে কর্মহীনতা, অন্যদিকে সমাজের ভেতর রাষ্ট্রের ঢুকে পড়া এবং সমাজের অংশগ্রহণমূলক এবং প্রতিনিধিত্বকারী চরিত্রের বিচলন এখন যে সংকট সৃষ্টি করেছে তা ‘আপন দেশের সেবা করিবার’ ও ‘তার দায়িত্ব গ্রহণ করিবার স্বাভাবিক অধিকার’হীনতার শামিল (কালান্তর, পৃ ৯০)। সমাজ ও রাষ্ট্রের যে সম্পর্ক আগে ছিল তা সমাজ থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। অথচ এখন এই নিম্নপর্যায় থেকে উচ্চ পর্যায়ের সম্পর্কটি উল্টে উচ্চ থেকে নিচের এক বিপরীত প্রবাহে দাঁড়িয়েছে। এখন রাষ্ট্রই নির্ধারণ করছে কে কার সেবা কীভাবে করবে; সমাজ নয়। ফলে ঔদাসীন্য এবং সংযোগহীনতার বিপর্যয়।

এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় কী, তা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ অনেক ভেবেছেন। শুধু যে ভেবেছেন, তা নয়, নিজে উদ্যোগী হয়ে নিজের সীমিত পরিসরে এর প্রায়োগিক একটা প্রকাশেরও চেষ্টা করেছেন। শিক্ষা বিস্তারের উদ্যোগ নিয়েছেন, কৃষি এবং যোগাযোগের উন্নতি সাধনের প্রকল্প গ্রহণ করেছেন, সমবায় আন্দোলন প্রবর্তনের চেষ্টা করেছেন, এমনকি ম্যালেরিয়া উচ্ছেদের আয়োজনে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন। তিনি সচেতন ছিলেন যে, গ্রাম ও শহরের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যাওয়ায়, শহর গ্রামের যুবক সম্প্রদায়কে আকর্ষণ করে নিয়ে যাওয়ায় একটা শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে; কৃষিতে আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণে গ্রামগুলি পিছিয়ে আছে; আর শিক্ষাদীক্ষাতে তো বটেই। এজন্য গ্রামগুলিকে আবার স্বনির্ভর করার জন্য কৃষি শিক্ষা ও সমবায় – এ তিনের সমন্বয়ে শান্তিনিকেতনে তিনি একটি ব্যাপক উদ্যোগও গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর প্রত্যয় ছিল, কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলে গ্রামগুলি নিজেদের বিদ্যাপীঠ, শস্যগুদাম, সমবায় বিতান এমনকি ব্যাংক পর্যন্ত তৈরি করে নিতে পারবে। ১৯১২ সালে শান্তিনিকেতনের সরুল গ্রামে কেনা কুড়ি বিঘা জমিতে তিনি ১৯২২ সালে ইনস্টিটিউট অফ রুরাল রিকনস্ট্রাকশন গড়ে তোলেন, যা বাইশটি গ্রামের উন্নতি সাধনের দায়িত্ব নেয়। তাতে সাফল্য যে আসেনি, তা নয়, কিন্তু তাঁর আকাক্সক্ষা থেকে তা দূরেই রয়ে গেছে। বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজের ব্যাপ্তির তুলনায় তার কর্মোদ্যোগের ক্ষেত্রটি ছিল নিতান্তই সামান্য। এবং তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর প্রকল্পগুলিকে কেউ অন্যত্র অনুসরণের চেষ্টাও করেননি। তেমন উদ্যোগী মানুষও ছিলেন না। এবং এরকম উদ্যোগের ফল কী হতে পারে রবীন্দ্রনাথের একটি মন্তব্য থেকে হয়তো তা অনুমানও করা যায়। ‘আমাদের পাড়াগাঁয়ে অন্ন জল স্বাস্থ্য শিক্ষা আনন্দ সমস্ত আজ ভাঁটার মুখে’ এরকম ভাবনা থেকে তিনি একটি পাড়ায় ‘নিজের কল্যাণ নিজে করিবার শক্তিকে’ জাগাবার চেষ্টা করলেন। নিজেদের পরিশ্রমে যদি গ্রামবাসী একটি কুয়া খুঁড়ে ফেলে, তাহলে রবীন্দ্রনাথ তা বাঁধিয়ে দেওয়ার খরচ দেবেন, এরকম প্রস্তাবেও সায় মেলেনি। মানুষ একে রবীন্দ্রনাথের পুণ্যলাভের একটা ফাঁকি হিসেবে দেখল। রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, ‘মানুষের সকল অভাবই পূরণ করিবার বরাত হয় বিধাতার পরে নয় কোনো আগন্তুকের উপর’ (‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম’, কালান্তর, পৃ ৭০-৭১), এজন্য একেবারে গোড়া থেকেই রবীন্দ্রনাথ আত্মশক্তি জাগানোর জন্য, নিজেদের নৈষ্কর্ম্য ও ঔদাসীন্য থেকে বেরিয়ে এসে কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।

সমাজের প্রশ্ন থেকে যখন রাষ্ট্র ও জাতির প্রশ্নে দৃষ্টি ফেরান রবীন্দ্রনাথ, তখন অতীত থেকেও বেশি গুরুত্ববহ হয়ে দাঁড়ায় বর্তমান, যেহেতু রাষ্ট্র ও জাতির প্রকাশের সঙ্গে সমাজের হিতকারী চিন্তার সঙ্গতি উপনিবেশী ভারতে একেবারে গোড়াতেই তিরোহিত হয়েছে। তবে রাষ্ট্র ও জাতি নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনা সময়ের ব্যবধানে পরিবর্তিত হয়েছে। ১৯০১ সালে লেখা ‘নেশন কী’ প্রবন্ধে তাঁর বক্তব্য ছিল সদর্থক। ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহের ভিন্নতাকে তিনি আবশ্যক বিবেচনা করে লিখেছেন, ‘তাহারাই সকলের স্বাধীনতা রক্ষা করিতেছে – এক আইন, এক প্রভু হইলে স্বাধীনতার পক্ষে সংকট। বৈচিত্র এবং অনেক সময় বিরোধী প্রবৃত্তি দ্বারা ভিন্ন ভিন্ন নেশন সভ্যতা বিস্তারকার্যে সহায়তা করিতেছে। মনুষ্যত্বের মহাসংগীতে প্রত্যেকে এক-একটি সুর যোগ করিয়া দিতেছে, সবটা একত্রে মিলিয়া বাস্তবলোকে যে একটি কল্পনাগম্য মহিমার সৃষ্টি করিতেছে তাহা কাহারো একক চেষ্টার অতীত’ (আত্মশক্তি, রবীন্দ্র-রচনাবলী, তৃতীয় খণ্ড, পৃ ৫১৯)।

এই পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথের ন্যাশনচিন্তার সঙ্গে আর্নস্ট রেনাঁর ন্যাশনচিন্তার সাদৃশ্য দেখা যায়। ‘ন্যাশন কী’ এই একই শিরোনামে সরবোঁ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৮৮২ সালে দেওয়া এক বক্তৃতায় রেনাঁ বলেন, ন্যাশন – সকলের অস্তিত্বের মূলে আছে তাদের ‘স্বাধীনতা রক্ষার নিশ্চয়তা; যদি তাদের এক আইন ও এক প্রভু হয়, তাহলে [ওই স্বাধীনতা] পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে।’ রেনাঁ তাঁর বক্তৃতায় আরো বলেন, ‘ন্যাশন হচ্ছে একটি আত্মা, একটি আধ্যাত্মিক বিধান, এবং ন্যাশনের অতীতে রয়েছে অভিন্ন গৌরব, এবং বর্তমানে রয়েছে একটি অভিন্ন প্রত্যয়’ (ভাবা, ন্যাশন অ্যান্ড ন্যারেশন, পৃ ১৯)। এই প্রত্যয় বা ইচ্ছার রেনাঁ যে-মূল্য দেন, সেই একই মূল্য দেন অতীত ও বর্তমানের পরম্পরাকে। রেনাঁর এই মত রবীন্দ্রনাথ গ্রহণ করলেও উপনিবেশী শক্তির অধীনে এ দুটোই যে অকেজো হয়ে পড়ে, তাও তিনি উপলব্ধি করেছেন। উপনিবেশী শাসনে জাতির প্রত্যয় বা ইচ্ছাকে অধীনস্থ হতে হয় ভিন্ন এক জাতির শাসনব্যবস্থার, এবং অতীত ও বর্তমানের মাঝখানে এই শাসনব্যবস্থা তুলে দেয় বিচ্ছেদের প্রাচীর। ফলে ন্যাশন হয়ে দাঁড়ায় অপ্রকৃত; জাতি হারিয়ে যায় রাষ্ট্রের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের আবরণে, এবং জাতির চিন্তাটিও হয়ে দাঁড়ায় বিমূর্ত। ১৯১৭ সালে প্রকাশিত ন্যাশনালিজম গ্রন্থে তিনি ন্যাশনকে এরকম একটি বিমূর্ত সত্তা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, এবং প্রশ্ন তুলেছেন, যারা শাসিত, তারা তো রক্ত-মাংসের জীবন্ত মানুষ, তারা তো বিমূর্ত কিছু নয়। তাহলে একটি বিমূর্ত উৎস থেকে জীবন্ত মানুষের কল্যাণে কী উৎসারিত হতে পারে? এই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের ন্যাশন একই সঙ্গে জাতি ও রাষ্ট্র, এবং তা প্রকৃতপক্ষে সকল মানুষের স্বার্থের সংগঠিত রূপ। অথচ এই ন্যাশনের ন্যূনতম মানবিকতা অথবা আধ্যাত্মিকতা আর নেই (৫৪-৫৫)। একই সঙ্গে জাতীয়তাবাদ ও আধুনিক ন্যাশন বা রাষ্ট্র যে এখন অতিকায় এক ‘ভৌগোলিক দানবে’ পরিণত হয়েছে, এই মন্তব্য করে তিনি সকল ধরনের পশ্চিমা জাতীয়তাবাদ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন (৯৭)। আশীষ নন্দীর মতে, রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদকে অবৈধ ভাবতেন।

রেনাঁর সঙ্গে ন্যাশন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের চিন্তাভাবনার আরেকটি মিল পাওয়া যায় ন্যাশন প্রতিষ্ঠা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের অভিমতে। ‘নেশন কী’ প্রবন্ধে তিনি লেখেন : ‘ভূখণ্ডের উপর যুদ্ধক্ষেত্র ও কর্মক্ষেত্রের পত্তন হইতে পারে, কিন্তু নেশনের অন্তঃকরণটুকু ভূখণ্ডে গড়ে না। জনসম্প্রদায় বলতে যে পবিত্র পদার্থকে বুঝি, মনুষ্যই তাহার শ্রেষ্ঠ উপকরণ’ (রবীন্দ্র-রচনাবলী, তৃতীয় খণ্ড, পৃ ৫১৮)। রেনাঁও তাঁর বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘মনের দিক থেকে স্বাস্থ্যবান এবং উষ্ণ হৃদয়ের অধিকারী বিশাল জনসম্প্রদায় যে ধরনের নৈতিক বিবেক’ সৃষ্টি করে, তা-ই হচ্ছে ন্যাশন (ভাবা, ন্যাশন অ্যান্ড ন্যারেশন, পৃ ২০)। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ রেনাঁর চিন্তাকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে ন্যাশনকে মানসিক সংগঠন এবং মানসিক সম্প্রদায় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আমাদের সময়ে বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন ন্যাশনকে যে অর্থে ‘কল্পিত জনগোষ্ঠী’ বা ইমাজিন্ড্ কম্যুনিটি হিসেবে দেখেছেন, রবীন্দ্রনাথও অনেকটা তেমনটি দেখেছেন, এবং অ্যান্ডারসনের মতো তাঁর এই মানসিক সংগঠনটিও জনসম্প্রদায়কে তার অস্তিত্ব রক্ষা, বাইরের আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং স্বরাজ অর্জনে সহায়তা দিয়েছে। ফলে, একদিকে ন্যাশন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের সদর্থক দৃষ্টি, অন্যদিকে এর পশ্চিমা রূপায়ণে শক্তিমদমত্ততা এবং সাম্রাজ্যলিপ্সুতার কারণে একে বিপজ্জনক গণ্য করা – এর মধ্যে রয়েছে একটি বিবর্তনের প্রক্রিয়া। এই বিবর্তনে একটা ভূমিকা রেখেছিল প্রথম মহাযুদ্ধ এবং ১৯১৬-১৭ সালে তাঁর জাপান ও আমেরিকা ভ্রমণ। এই ভ্রমণ তাঁকে খুব কাছে থেকে পশ্চিমা ও জাপানিজ ন্যাশনালিজমের প্রকাশকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ দিয়েছিল। পশ্চিমা ন্যাশন সম্পর্কে তাঁর অভিমতটি
এ-সময় খুব স্পষ্ট রূপ ধারণ করে। ইউরোপে ন্যাশন রাষ্ট্রগুলি নিজেদের অখণ্ডতা বজায় রাখতে গিয়ে একে অন্যের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে, তারপরও নতুন জ্ঞানের ধারক ও বাহক হিসেবে জগৎসভায় তাদের একটি উচ্চাসন ছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ একসময় দেখেছেন, ‘য়ুরোপের বাইরে অনাত্মীয় মণ্ডলে য়ুরোপীয় সভ্যতার মশালটি আলো জ্বালাবার জন্যে নয়। আগুন লাগাবার জন্য।’ ফলে ‘চীনের মর্মস্থানের উপর’ ‘একদিন কামানের গোলা আর আফিমের পিণ্ড একসঙ্গে বর্ষিত হল’ (‘কালান্তর’, কালান্তর, পৃ ২৪)। ইংরেজ রাষ্ট্রের উপনিবেশী শাসন

ছিল এই দ্বিত্বতার প্রকাশ – অর্থাৎ একদিকে সভ্যতার মুখোশ, অন্যদিকে বর্বরতার মুখশ্রী। ‘কালান্তর’ প্রবন্ধেই রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘আজ ইংরেজ শাসনের প্রধান গর্ব ল এবং অর্ডার, বিধি এবং ব্যবস্থা নিয়ে। এই সুবৃহৎ দেশে শিক্ষার বিধান, স্বাস্থ্যের বিধান অতি অকিঞ্চিৎকর; দেশের লোকের দ্বারা নব নব পথে ধন-উৎপাদনের
সুযোগ-সাধন কিছুই নেই – অদূর ভবিষ্যতেও তার যে সম্ভাবনা আছে, তাও দেখতে পাইনে’ (‘কালান্তর’, কালান্তর, পৃ ২০)।

ইউরোপ সম্বন্ধে যেটুকু মোহ ভারতবাসীর ছিল, তা ঘুচে গেল প্রথম মহাযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। কোনো মাতালের ‘আব্রু ঘুচে যাওয়ার’ মতো বর্ণনা করে এই মোহমুক্তি সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘এত মিথ্যা, এত বীভৎসতা হিংস্রতা নিবিড় হয়ে বহুপূর্বকার অন্ধযুগে ক্ষণকালের জন্যে হয়তো মাঝে মাঝে উৎপাত করেছে, কিন্তু এমন ভীষণ উদগ্র মূর্তিতে আপনাকে প্রকাশ করে নি।’ ইউরোপ সম্পর্কে যে জ্ঞান ছিল ভারতীয়দের, প্রধানত ইংরেজদের সম্পর্কে, তাতে ‘কুৎসিতের সম্পর্কে … একটা সংকোচ ছিল; আজ সে লজ্জা দিচ্ছে সেই সংকোচকেই’ (‘কালান্তর’, কালান্তর, পৃ ২২)। রবীন্দ্রনাথের জাপান ভ্রমণও তাঁকে ওই জাতির দ্বিত্বতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিয়েছে। ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘সেই জাপানের সম্বৃদ্ধি আমি স্বচক্ষে দেখে এসেছি, দেখেছি সেখানে স্বজাতির মধ্যে তার সভ্যশাসনের রূপ’ (কালান্তর, পৃ ৪১১)। কিন্তু জাপানযাত্রায় তিনি এর উগ্র সাম্রাজ্যলিপ্সাও দেখেছেন, এবং দেখে বিচলিত হয়েছেন। ইউরোপ থেকে জাপান কর্মের দীক্ষা এবং অস্ত্রের দীক্ষা গ্রহণ করেছে – এই ছিল তাঁর অভিমত (জাপান-যাত্রী, রবীন্দ্র-রচনাবলী, ঊনবিংশ খণ্ড, পৃ ৩৫৭)। এর আগে এই কর্মের দীক্ষা কীভাবে নতুন জ্ঞানসৃষ্টিতে নিযুক্ত হয়েছে, তিনি তার একটি বর্ণনা দেন, কিন্তু একই সঙ্গে জানান, অস্ত্রের দীক্ষাটাও সাম্রাজ্যলিপ্সার কাজে জাপান প্রয়োগ করতে শিখেছে : ‘চীনের সঙ্গে নৌযুদ্ধে জাপান জয়লাভ করেছিল – সেই জয়ের চিহ্নগুলিকে কাঁটার মতো দেশের চার দিকে পুঁতে রাখা যে বর্বরতা, সেটা যে অসুন্দর, সে কথা জাপানের বোঝা উচিত ছিল’ (রবীন্দ্র-রচনাবলী, ঊনবিংশ খণ্ড,

পৃ ৩৪৯)।

এই দ্বিত্বতা কেন, সে-প্রশ্নের একটি জবাব রবীন্দ্রনাথ তাঁর ন্যাশনালিজম গ্রন্থে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন –

The Nation, with all its paraphernalia of power and prosperity, its flags and pious hymns, its blasphemous prayers in the churches… cannot hide the fact that the Nation is the greatest evil)

জাপান যে বাণিজ্য, শিল্প এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় পারদর্শী ছিল, এবং এসব ক্ষেত্রে এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে সর্বাগ্রে স্থান করে নিয়েছিল, একথা রবীন্দ্রনাথও লিখেছেন। জাপান ভ্রমণে এর বিত্তবৈভবের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছে, যদিও রবীন্দ্রনাথ বেশি মুগ্ধ হয়েছেন এর চিত্তবৈভবে। কিন্তু জাপান যখন ধন উপার্জন করেছে, সেই ধনের সঙ্গে ক্ষমতা ও পররাষ্ট্রলোভও তার রাষ্ট্রকাঠামোয় ঢুকেছে। ইউরোপের দেশগুলির স্বাতন্ত্র্য এবং বৈচিত্র্যের কথাও যেমন রবীন্দ্রনাথ স্বীকার করেছেন, এদের জ্ঞানের শক্তিতে মুগ্ধও হয়েছেন, কিন্তু বলেছেন, রাষ্ট্রীয় স্বার্থে দেশগুলি নিষ্ঠুর। চীনের সঙ্গে জাপানের আচরণে ইউরোপীয় দেশগুলির রাষ্ট্রিক স্বার্থপরতার একটি শোকাবহ প্রতিরূপ তিনি দেখতে পেয়েছেন। জাপানে যেসব বক্তৃতা তিনি দিয়েছেন, তাতে তিনি এই বিষয়টি উল্লেখ করে জাতীয়তাবাদের বিপদ সম্পর্কে জাপানিদের সাবধান করে দিয়েছেন।

ন্যাশন বা জাতি এবং রাষ্ট্র সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিহাস ও সমসাময়িক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটটি গুরুত্ব পেয়েছে। একদিকে তিনি এটিকে ঐতিহাসিক বাস্তবতা হিসেবে দেখছেন, যার শুরুটা পশ্চিম অর্থাৎ ইউরোপে, ষোড়শ শতকে। এই ন্যাশনের ভূগোল আছে, ক্ষমতার কাঠামো আছে। এই ন্যাশন যখন রাষ্ট্র তখন সে
পররাষ্ট্র-লোভী হতে পারে। অস্তিত্বের সংকটে নিপতিত হতে পারে, সংকট থেকে উদ্ধার পেতেও পারে অথবা নাও পারে। অর্থাৎ এই ন্যাশনের একটি রূপগত, আকৃতিগত এবং প্রকৃতিগত দিক আছে। অন্যদিকে এর একটি ভাবগত দিকও আছে, যা বিমূর্ত, মনোগত। এটি কল্পিত না হলেও এর অভিঘাতটি কিছুটা কল্পনাশ্রয়ী। গোরা উপন্যাসে যে ‘ধনে পূর্ণ, জ্ঞানে পূর্ণ, ধর্মে পূর্ণ’ অর্থাৎ ‘পূর্ণ স্বরূপ’ ভারতবর্ষের কথা গোরা বলছে, এবং সে-ভারতবর্ষ কোথাও নেই বলে আক্ষেপ করছে, তা কখনো ছিল কি না, এই প্রশ্নে না গিয়েও বলা যায়, এটি কল্পিত ভারতবর্ষ। এই ন্যাশনচিন্তাটি ছিল স্বদেশি আন্দোলনের মূলে। কিন্তু একসময় এই কল্পনা থেকেও রবীন্দ্রনাথ বেরিয়ে এসেছেন, যখন দেখেছেন স্বদেশি সংগ্রামের মূল চিন্তায় যে-ভারতবর্ষ তাতে সকল সম্প্রদায়ের সমান উপস্থিতি এবং অধিকার নেই, এবং তাতে স্বদেশের যে একটি আদর্শায়িত রূপ আঁকা হয়েছে তাতে পক্ষ-প্রতিপক্ষের চিন্তাটিও সাদা-কালো। বিদেশি শক্তি আঘাত হেনেছে, পঙ্গু করেছে স্বদেশকে, ভারতমাতাকে; ভারতমাতা সেই আঘাতে বিপর্যস্ত। ‘ব্যাধি ও প্রতিকার’ প্রবন্ধে তিনি লেখেন, ‘বয়কট’-যুদ্ধ ঘোষণা করিয়া আমরা বাহির হইলাম এবং দেশধর্মগুরুর নিকট হইতে স্বরাজমন্ত্রও গ্রহণ করিলাম; মনে করিলাম এই সংগ্রাম ও সাধনার যত-কিছু বাধা সমস্তই বাহিরে, আমাদের নিজেদের মধ্যে আশঙ্কার কারণ কিছুই নাই। … আমরা নিজেরাই নিজেদের দলনের উপায়, অগ্রসর হইবার প্রতিবন্ধক, এ কথা যখন নিঃসংশয়রূপে ধরা পড়িল তখন এই কথাই আমাদিগকে বলিতে হইবে যে, স্বদেশকে উদ্ধার করিতে হইবে, কিন্তু কাহার হাত হইতে? নিজের পাপ হইতে।’ (পরিশিষ্ট, রবীন্দ্র-রচনাবলী, দশম খণ্ড, পৃ ৬২৯)

স্বদেশি যুগের ন্যাশনচিন্তা রবীন্দ্রনাথকে জাতীয়তাবাদের বিভ্রান্তি সম্পর্কে আরেকবার সচেতন করলো। ১৯১৬-১৯ সালের জাপান ও আমেরিকা ভ্রমণ তাঁকে জাতীয়তাবাদের ভাবগত রূপ কী ভয়ানক হতে পারে সে-সম্পর্কে প্রকৃষ্ট একটি ধারণা দিলেও সেই নৈবেদ্যর পর্যায় থেকেই এ বিষয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি খুবই পরিষ্কার – যা ‘সভ্যতার সংকটে’ এসেও তিনি পরিবর্তন করেননি। মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে, সমকালীন অন্যান্য রাজনীতিবিদ – যেমন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস এবং জওহরলাল নেহরুর সঙ্গে জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে তাঁর চিন্তার বিরোধ ছিল, কিন্তু নৈবেদ্যর অনেক জায়গায় তিনি যা লিখেছেন, জাপান ও আমেরিকায় বিভিন্ন বক্তৃতায় যা বলেছেন, ‘সভ্যতার সংকট’-এও তাই বলেছেন। তবে এই বলার পেছনে যে অনুধাবন, পর্যবেক্ষণ, পঠন এবং দৃষ্টিগঠন ছিল, এবং তাতে যে বিবিধ সূত্রের, উপাদানের এবং অভিজ্ঞতার সমাবেশ ঘটেছিল, তাতে সময়ান্তরে এর প্রকাশে তারতম্য ঘটেছে। একেবারে গোড়াতে, প্রথম ইংল্যান্ড যাত্রা, হিন্দু মহাসভা ও ভারতীয় কংগ্রেসের উদ্বোধনের সময়, জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের চিন্তাভাবনার সঙ্গে ১৯০০-১৯০১-এ নৈবেদ্য রচনা ও প্রকাশের পর এবং ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ নিয়ে গড়ে ওঠা আন্দোলন এবং এ দুয়ের মধ্যেকার চার বছরে লেখা ‘স্বদেশী সমাজ’সহ অন্যান্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখার সময় এ-বিষয়ে তাঁর মতামতের মধ্যে কিছুটা ফারাক দেখা যায়। কিন্তু এ-ফারাক তিনি দ্রুতই কাটিয়ে উঠেছিলেন। অনেকে রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদের চিন্তাকে অনেকগুলি পর্যায়ে বিস্তৃত হয়ে পরিণত হতে দেখেছেন। আশিস সান্যাল তাঁর রবীন্দ্রনাথ ও ন্যাশনালিজম গ্রন্থে যেমন, এরকম তিনটি পর্বের উল্লেখ করেন – ১৮৮৫-১৯০৫, নৈবেদ্য থেকে নিয়ে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সমাপ্তি পর্যন্ত, এবং ওই সময় থেকে রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবন পর্যন্ত। কিন্তু সান্যাল-নির্দিষ্ট দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে জাতীয়তাবাদ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি, ঘটেছে এর অনুধাবন ও প্রকাশের তীব্রতায়। তাছাড়া, প্রথম মহাযুদ্ধের অভিঘাতে ইউরোপের জ্ঞানালোক প্রাপ্তির যুগের সকল যুক্তি আর অর্জন যখন ভূলুণ্ঠিত হয়েছে, তখন রবীন্দ্রনাথ পশ্চিমা জাতিপ্রেম ও জাতীয়তাবাদকে আরো কঠোর সমালোচনা ও নিন্দা করেছেন। ‘সভ্যতার সংকট’ পর্যন্ত এই মনোভাবে তাঁর কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।

একথা বলা বরং সংগত যে, ১৯০০-১৯০১ সাল (অর্থাৎ নৈবেদ্য লেখা ও প্রকাশের সময়) পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ জাতীয়তাবাদ নিয়ে ততটা নিরাশ ছিলেন না, এবং তাঁর চিন্তায় তখনো ইউরোপীয় জ্ঞান ও সভ্যতার একটি প্রশংসনীয় অবস্থান ছিল। অবশ্য ইউরোপীয় জ্ঞান ও মনীষা, তার বিজ্ঞান সাধনা ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠায় তার প্রত্যয়, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ‘ইউরোপের অন্তরের ঐশ্বর্যশক্তি’কে তিনি কখনো অস্বীকার করেননি। শুরুতে বরং এই ঐশ্বর্যশক্তিকে ভারতীয় সমাজের পশ্চাদপদতা মোচনে সহায়ক হবে ভেবে তিনি তার আবাহন করেছিলেন। ১৯৩৩ সালে ‘কালান্তর’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ নিঃসঙ্কোচে এই ঐশ্বর্যের বিষয়টি স্বীকার করেন :

একটা প্রবল উদ্যমের বেগে য়ুরোপের মন ছড়িয়ে পড়েছে সমস্ত পৃথিবীতে – শুধু তাই নয়, সমস্ত জগতে। যেখানেই সে পা বাড়িয়েছে সেইখানটাই সে অধিকার করেছে। কিসের জোরে? সত্যসন্ধানের সততায়। … প্রতিদিন জয় করেছে সে জ্ঞানের জগৎকে; কেননা তার বুদ্ধির সাধনা বিশুদ্ধ, ব্যক্তিগত মোহ থেকে নির্মুক্ত (কালান্তর, পৃ ১৪)। 

ইউরোপের জ্ঞানালোক-আদর্শ এবং এর রাজনৈতিক আদর্শের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ একটা প্রভেদরেখা টেনেছিলেন। রাজনৈতিক ইউরোপ, বিশেষ করে উপনিবেশকামী ইংল্যান্ড, তাঁর কাছে ছিল সভ্যতার শত্রু, কিন্তু জ্ঞানসন্ধানী ইউরোপ নিয়ে তিনি লিখতে শুরু করেছেন অনেক আগে, ১৮৯০ সালের দ্বিতীয় ইংল্যান্ড যাত্রা থেকে ফিরে আসার পর। ১৯৮০ থেকে নৈবেদ্য রচনা পর্যন্ত তিনি কয়েকটি প্রবন্ধে ইংরেজ, ভারতবর্ষ ও জাতীয়তাবাদ নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেন, যেগুলির একটি রাজনৈতিক মাত্রা ছিল। এসব প্রবন্ধের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘ইংরেজ ও ভারতবাসী’ (১৮৯৩), ‘ইংরেজের আতঙ্ক’ (১৮৯৪), ‘অপমানের প্রতিকার’ (১৮৯৪), ‘রাজা ও প্রজা’ (১৮৯৪), ‘রাজনীতির দ্বিধা’ (১৮৯৪)। ভারতবর্ষ সম্পর্কে তাঁর চিন্তাভাবনা, ইংল্যান্ড তথা ইউরোপের সভ্যতার অন্ধকার দিকটি সম্পর্কে তাঁর সম্যক দৃষ্টিগঠন এবং স্বদেশি সমাজের সমস্যাগুলি নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনার অনেক পরিচয় এই প্রবন্ধগুলিতে আছে। পশ্চিম সম্পর্কে তাঁর মোহমুক্তির পেছনে যে ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল, দক্ষিণ আফ্রিকায় ঘটে যাওয়া সেই বুয়োর যুদ্ধ নিয়ে তিনি যখন ‘শতাব্দীর সূর্য আজি’ লিখলেন, যা নৈবেদ্যতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, তখনই বোঝা গিয়েছিল, জাতীয়তাবাদ যে নিজের প্রয়োজনে সামরিকবাদে রূপ নিতে পারে, সে বিষয়টি রবীন্দ্রনাথ ওই সময়ে সঠিকভাবে অনুধাবন করেছিলেন। পরবর্তীকালে এ নিয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্যও করেছিলেন।

কাজেই, রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ ভাবনাকে দুটি পর্যায়ে বিন্যস্ত করে দেখাটাই যথার্থ। প্রথম পর্যায়ে তিনি জ্ঞানালোকপ্রাপ্ত ইউরোপের অন্তরের ঐশ্বর্যের আলোকেই ইংল্যান্ড ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশকে বিবেচনা করেছেন। ফলে, ওইসব ন্যাশনের জ্ঞান ও কর্মের দিকটিই তাঁর চোখে পড়েছে বেশি, যতটা না পড়েছে তাদের রাজনৈতিক-উপনিবেশিক-সাম্রাজ্যবাদী ন্যাশনালিজমের প্রকাশটির ওপর। তবে জ্ঞানের বিষয়টি যে রবীন্দ্রনাথের কাছে প্রাধান্য পাবে, তাও তাঁর মানসগঠনকালের আশা-আদর্শ এবং তৎকালীন বিদ্যোৎসাহী সমাজে বাঙালি চিন্তানায়কদের প্রভাব পর্যালোচনা করলেই নিঃসন্দেহ হওয়া যায়। বাংলার রেনেসাঁস এবং
রামমোহন-বিদ্যাসাগর-বঙ্কিমচন্দ্রের চিন্তার জগতের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্যক যোগাযোগ ছিল, তিনি নিজেও চিন্তানায়কদের একজন হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। রামমোহন-বিদ্যাসাগর যে সমাজ সংস্কারের সূচনা করেছিলেন, তার মূলে ছিল শিক্ষা, যা মানুষকে নানা সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত করবে। সনাতনী হিন্দু সমাজে আচার এবং কুসংস্কার ছিল প্রবল, এবং এগুলির বিরুদ্ধে সংগ্রামে ও শিক্ষার পাশাপাশি ছিল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা। রবীন্দ্রনাথ নিজেও উপলব্ধি করেছেন, সমাজ সংস্কারের জন্য প্রয়োজন আত্মশক্তির সমাবেশ, এবং আত্মশক্তির বলে বলীয়ান না হলে ব্যক্তি সমাজ বা দেশের, কারো মুক্তি সম্ভব নয়। উনিশ শতকের চিন্তানায়কদের কাছে উপনিবেশী শাসন ছিল একটি বাস্তবতা, যাকে অস্বীকার করার উপায় ছিল না। তা থেকে সশস্ত্র সংগ্রাম করে বেরিয়ে আসা যায়, সে চিন্তাটি ছিল অবাস্তব। বরং শিক্ষা, আত্মশক্তি এবং প্রাচীন ভারতের লুপ্ত আদর্শের পুনরুত্থানের মধ্য দিয়ে যে তা সম্ভব, সেরকম একটি ইঙ্গিত রবীন্দ্রনাথের নানান লেখায় দেখা যায়। ‘অপমানের প্রতিকার’ প্রবন্ধে যেমন, শিক্ষার মাধ্যমে মনুষ্যত্ব অর্জনের ওপর তিনি জোর দিয়েছেন। লিখেছেন, ‘গৃহের ও সমাজের শিক্ষায় যখন আমরা সেই মনুষ্যত্ব উপার্জন করিতে পারিব তখন ইংরাজ আমাদিগকে শ্রদ্ধা করিতে বাধ্য হইবে এবং অপমান করিতে সাহস করিবে না’ (রাজা প্রজা, রবীন্দ্র-রচনাবলী, দশম খণ্ড, ৪১৭)। এ প্রবন্ধে তিনি ইংরেজের ক্রমিক উপস্থিতিকে স্বীকার করে নিয়েছেন। নৈবেদ্য পর্যন্ত লেখালেখিতে রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ চিন্তা তাই আধুনিক ইউরোপের জ্ঞানাদর্শের পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক ও সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপের স্খলনের পরিপ্রেক্ষিতেই বিচার্য।

রবীন্দ্রনাথের জাতীয়তাবাদ ভাবনার দ্বিতীয় পর্যায়টি সূচিত হওয়ার পেছনে ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির সামরিক অভিযান এবং উপনিবেশী নিষ্পেষণের ভূমিকা সম্পর্কে অনেকেই লিখেছেন। বুয়োর যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে। ভারতীয় রাজনীতিতে ব্রিটিশবিরোধী প্রবণতা, এবং স্বদেশি চেতনার যে সমাবেশ ১৮৮০-র দশক থেকে তীব্রতা পাচ্ছিল, তার সূচনা ১৮৫৭ সালের ঘটনাপ্রবাহে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের প্রসঙ্গে একটি বিষয়ের অবতারণা না করলেই নয়, এবং তা হচ্ছে ১৮৯০ থেকে প্রায় এক দশক জমিদারির কাজে শিলাইদহ-শাহজাদপুর-পতিসরে তাঁর অনেকটা সময় কাটানো। এ সময় পূর্ব বাংলার গ্রামজীবনকে তিনি নিবিড়ভাবে দেখেছেন, এবং দারিদ্র্য, অশিক্ষা, অস্বাস্থ্য ইত্যাদির প্রকট মাত্রা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেয়েছেন। এ অভিজ্ঞতা তাঁকে আত্মশক্তি ও কর্মের দিকে গভীরভাবে টেনে নিয়ে গেছে। এই দারিদ্র্য ও অশিক্ষা ইত্যাদির পেছনে যে উপনিবেশী শাসন, তাকে তিনি জাতীয়তাবাদের আবরণে পশ্চিমা অপদেবতার একটি প্রকাশ হিসেবে দেখেছেন। তিনি বুঝেছেন, সমগ্র জাতি একটি আদর্শে ঐক্যবদ্ধ না হলে দারিদ্র্য ও অশিক্ষা থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। ফলে, একদিকে তাঁর স্বজাতি সাধনার ক্ষেত্র ও পরিসর বেড়েছে, অন্যদিকে জাতীয়তাবাদের বিধ্বংসী রূপ সম্পর্কে তিনি সচেতন হয়েছেন। যখন স্বদেশি আন্দোলন ও বঙ্গভঙ্গ রোধ আন্দোলন তীব্র হয়েছে, তাতে স্বদেশি জাতীয়তাবাদের প্রাবল্য দেখে তিনি বিচলিত হয়েছেন। এই জাতীয়তাবোধ যতটা ভাবের, আবেগের এবং বিমূর্ত আদর্শের প্রপঞ্চ তৈরি করে, ততটা কর্মের নয়। গান্ধীর চরকা আন্দোলন নিয়েও এই কারণে তাঁর আপত্তি ছিল। বিদেশি পণ্য বর্জন আন্দোলনের পক্ষে রবীন্দ্রনাথের সায় ছিল না,

কারণ এর রাজনৈতিক ভাবাবেগ ছিল, প্রায়োগিক কোনো পরিকল্পনা ছিল না। গ্রামের কৃষক বিদেশি পণ্যের ভোক্তা নয়, বিদেশি পণ্য বর্জনে তার লাভক্ষতির সম্ভাবনাটাও সেজন্য শূন্যই থেকে যায়। আর গান্ধীর চরকা আন্দোলনে কৃষকের কী উপকার হবে, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন। অর্থাৎ জাতীয়তাবাদের কোনো উগ্র রূপকেই, তা সে পশ্চিমে হোক, ভারতেই হোক, রবীন্দ্রনাথ সমর্থন করেননি। তবে ন্যাশনের একটি সদর্থক রূপ যেমন আছে, যা থেকে দ্রুতই পশ্চিমের ন্যাশনগুলি বেরিয়ে গেছে – একথাটি তিনি মেনে নিয়েছেন, কিন্তু ভারতে এই সদর্থক রূপটির প্রতিফলন ও প্রতিপালন যে সম্ভব নয়, তাও উপলব্ধি করেছেন, কেননা, উপনিবেশী শক্তি শাসিত সমাজ-কেন্দ্রিক ভারতবর্ষে ইউরোপের রাষ্ট্রকেন্দ্রিক কোনো সদর্থক চিন্তা ও নিজস্ব পথে প্রকাশিত হতে পারে না। জাতীয়তাবাদের একটি সদর্থক রূপ একে গোড়ার দিকে মর্যাদা দিয়েছিল। কিন্তু শীঘ্রই সে রূপটিকে জলাঞ্জলি দিয়ে জাতীয়তাবাদের অপদেবতা প্রকাশিত হয়েছে। ‘শান্তিনিকেতন’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লেখেন :

মানুষের জাতীয়তা, ইংরেজিতে যাকে nationality বলে, ক্রমশ উদ্ভিন্ন হয়ে উঠেছে এইজন্য যে তার মধ্যে মানুষের সাধনা মিলিত হয়ে মানুষের এক বৃহৎ রূপকে ব্যক্ত করবে, ক্ষুদ্র স্বার্থ থেকে প্রত্যেক মানুষকে মুক্ত করে বৃহৎমঙ্গলের মধ্যে সকলকে সম্মিলিত করবে। কিন্তু, সেই তপস্যা ভঙ্গ করবার জন্য শয়তান সেই জাতীয়তাকেই অবলম্বন করে কত বিরোধ কত আঘাত, কত ক্ষুদ্রতাকে দিন দিন তার মধ্যে জাগিয়ে তুলছে। (রবীন্দ্র-রচনাবলী, ষোড়শ খণ্ড, পৃ ৪৯৮)

তার পরও ইউরোপে কোনো কোনো শক্তি স্বজাতির কাছে জাতীয়তাবাদের একটি সমন্বয়কারী চেহারা মেলে ধরেছিল। কিন্তু ‘য়ুরোপের বাহিরে গিয়া ইহারা সহসা পূর্ণশক্তিতে প্রকাশিত হইয়া পড়ে। ধর্মনীতির আবরণমুক্ত … উৎকট রুদ্র মূর্তি …’ পরিগ্রহণ করে (‘রাজনীতির দ্বিধা’, রাজা প্রজা, রবীন্দ্র-রচনাবলী, দশম খণ্ড, পৃ ৪০৬)। কিন্তু নৈবেদ্য থেকে নিয়ে জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে প্রায় প্রতিটি কথায় তিনি জাতীয়তাবাদ নামক ভৌগোলিক অপদেবতার উল্লেখ করেছেন, যার উপদ্রবে পৃথিবী প্রকম্পিত। একই সঙ্গে জাতীয়তাবাদের চিন্তা যেন ভারতবর্ষের বিবেক ও মননকে আচ্ছন্ন না করে ফেলতে পারে, সে-ব্যাপারেও সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন। নৈবেদ্য থেকে সংক্ষিপ্ত দুটি উদ্ধৃতি :

১)      … হিংসার উৎসব আজি বাজে

        অস্ত্রে অস্ত্রে মরণের উন্মাদরাগিনী

        ভয়ংকরী। দয়াহীন সভ্যতানাগিনী

        তুলেছে কুটিল ফণা চক্ষের নিমিষে

        গুপ্ত বিষদন্ত তার ভরি তীব্র বিষে।

        … … …

        … লজ্জা শরম তেয়াগি

        জাতিপ্রেম নাম ধরি প্রচণ্ড অন্যায়

        ধর্মেরে ভাসাতে চাহে বলের বন্যায়।

(নৈবেদ্য, পৃ ৭১)

২)      আজি সভ্যতার

        অন্তহীন আড়ম্বরে, উচ্চ আস্ফালনে,

        দরিদ্ররুধিরপুষ্ট বিলাসলালনে,

        অগণ্য চক্রের গর্জে মুখরঘর্ঘর,

        লৌহবাহু দানবের ভীষণ বর্বর

        রুদ্ররক্ত-অগ্নিদীপ্ত পরম স্পর্ধায়,

        নিঃসংকোচে শান্তিচিত্তে কে ধরিবে, হায় …

(নৈবেদ্য, পৃ ১০২)

তাঁর জন্মোৎসবের জন্য ১ বৈশাখ ১৩৪৮ তারিখে লেখা ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ পশ্চিমের দুটি সভ্যতার একটি তুলনামূলক বিচার করেন – এর একটি সাম্রাজ্যবাদী ইংল্যান্ড, অন্যটি সমাজতন্ত্রী সোভিয়েত রাশিয়া, উভয়েই যারা ‘বহুসংখ্যক পরজাতির উপরে প্রভাব চালনা করে।’ তিনি লেখেন, ইংল্যান্ড ‘এই পরজাতীয়ের পৌরুষ দলিল করে দিয়ে তাকে চিরকালের মতো নির্জীব করে রেখেছে। সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে রাষ্ট্রিক সম্বন্ধ আছে বহুসংখ্যক মরুচর মুসলমান জাতির – আমি নিজে সাক্ষ্য দিতে পারি, এই জাতিকে সকল দিকে শক্তিমান করে তোলবার জন্য তাদের অধ্যবসায় নিরন্তর’ (কালান্তর, পৃ ৪১১-১২)।

‘সভ্যতার সংকটে’র ইংল্যান্ড চল্লিশ বছর আগে নৈবেদ্যর ‘স্বার্থলিপ্ত লুব্ধ সভ্যতার’ প্রতীক। তবে এই সভ্যতারও উল্টো পিঠ যে ইউরোপেই আছে, এই বিশ্বাসটি রবীন্দ্রনাথ জীবনের শেষে এসেও লালন করেছেন। অন্ধ জাতীয়তাবাদ, ভয়ংকর ন্যাশনচর্চা এবং বিধ্বংসী সাম্রাজ্যবাদের যে শেষ হতে পারে সে বিশ্বাসে তিনি স্থিত হয়েছেন। লিখেছেন, ‘এই কথা আজ বলে যাব, প্রবল প্রতাপশালীরাও ক্ষমতা মদমত্ততা আত্মম্ভরিতা যে নিরাপদ নয় তারই প্রমাণ হবার দিন আজ সম্মুখে উপস্থিত হয়েছে’ (কালান্তর, পৃ ৪১৬)। ‘সভ্যতার সংকট’ শেষ হয়েছে এক মহামানবের আবাহন দিয়ে এবং ‘মানব-অভ্যুদয়ে’র জয়গান দিয়ে।

দুই

রবীন্দ্রনাথের সমাজ, জাতি ও রাষ্ট্র এবং জাতীয়তাবাদ চিন্তায় মাঝে মধ্যে যে ফাঁক লক্ষ করা যায়; একটি পূর্বাপর, সামূহিক এবং সংকটের উৎস-সন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গির অভাব এবং যে দু-একটি অসঙ্গতি মাঝে মধ্যে চোখে পড়ে, সে-সম্পর্কে এখন দৃষ্টিপাত করা যায়। ‘সভ্যতার সংকটে’র শেষ দুটি পৃষ্ঠার দিকে তাকালেই দেখা যাবে, এর আগের সাত পৃষ্ঠায় বিধৃত সভ্যতার সংকট সম্পর্কে তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টির একটি অমিল রয়ে গেছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যে নিরাপদ নয়, তার যাবার যে সময় এসেছে, সে-সম্পর্কে তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীর পেছনে যতটা না ঐতিহাসিক অনিবার্যতা আছে, তার থেকে বেশি আছে এক রোমান্টিক আশাবাদ। ইংরেজকে যে ভারতবর্ষ থেকে পাততাড়ি গুটাতে হবে, তা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন ঘটনাপ্রবাহ এবং ভারতের তৎকালীন রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করলেই মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায়। কিন্তু ইংরেজের ভারত ছেড়ে চলে যাওয়া, আর ‘প্রবল প্রতাপশালীর মদমত্ততা’ ইত্যাদি অপসৃত হয়ে যাওয়া এক কথা নয়। সাম্রাজ্যবাদ কখনো পরাস্ত হয় না, এর রূপ বদলায়। ভৌগোলিক অথবা ভূমিগত সাম্রাজ্যবাদের দিন শেষ হলেও অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের ইতি হয় না। এই সাম্রাজ্যবাদ পশ্চিম প্রবল প্রতাপে এখনো জারি রেখেছে, এবং আমাদের সময়ে বিশ্বায়ন নামক পুঁজিবাদের প্রবল প্রতাপশালী ও মদমত্ত ক্ষমতার প্রকাশটি তারই প্রমাণ। যে-মহামানবের আবাহন করেছেন রবীন্দ্রনাথ, তার রূপটিও স্পষ্ট নয়, এবং পূর্বের মানব-অভ্যুদয়ের প্রকাশটিও অনুমানসাপেক্ষ। রবীন্দ্রনাথের মহামানব কি আত্মশক্তি, পরিবার ও সমাজের শিক্ষায় বলীয়ান এবং স্বনির্ভর মানুষ, অথবা সংহত অর্থে সমাজ? মানব-অভ্যুদয় কি সমাজতান্ত্রিক কোনো বিপ্লব? নাকি স্বাধীন ভারতের অভ্যুদয়? কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তো নিজেই ‘সভ্যতার সংকটে’ প্রশ্ন তোলেন, ইংরেজ যখন ভারতবর্ষ ছেড়ে যাবে, ‘কোন ভারতবর্ষকে সে পিছনে ত্যাগ করে যাবে? কী লক্ষ্মীছাড়া দীনতার আবর্জনাকে? একাধিক শতাব্দীর শাসনধারা যখন শুষ্ক হয়ে যাবে, তখন একী বিস্তীর্ণ পঙ্কশয্যা দুর্বিষহ নিষ্ফলতাকে বহন করতে থাকবে?’ (কালান্তর, পৃ ৪১৫) পশ্চিমের যে সংকটগুলিকে তিনি জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের অন্তস্থিত বলে বর্ণনা করেছেন, সেগুলির প্রকাশ তো ১৯৪১-এর ভারতবর্ষের সর্বত্র। ভারতীয় সমাজ ভেঙে পড়েছে, পশ্চিমা ন্যাশনের আদলে ভারতকে তৈরি করতে গিয়ে ইংরেজ এর অন্তরের রসকে শুকিয়ে দিয়েছে, এর সামাজিক কোনো কাঠামোকেই অক্ষত রাখেনি। ১৯৪১ সালে যে ভারত স্বাধীনতার জন্য তৈরি হচ্ছিল, তার কাঠামো নির্মিত হচ্ছিল উপনিবেশী ইট কাঠ লোহা দিয়ে। এর প্রশাসন-বিচার ব্যবস্থা-শিক্ষা সবই তৈরি হয়েছিল উপনিবেশী আদলে। ১৯৪১-এর ভারতে হিন্দু-মুসলমান সমস্যার সমাধান হওয়া তো দূরের কথা, তা আরো তীব্র হচ্ছিল, এবং ধর্মের ভিত্তিতে উপমহাদেশ যে ভাগ হবে, তারও লক্ষণ ছিল সুস্পষ্ট; এবং ধর্মের স্থলে ধর্মতন্ত্রের প্রভাব, বিশ্বাসের স্থলে আচারের প্রকোপ ছিল সর্বত্র। তাহলে কোন মানব-অভ্যুদয়ের কথা রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন?

সোভিয়েত রাশিয়া যে পররাজ্যগুলির মানুষজনকে শক্তিমান করছে, তার পেছনের কারণগুলিকে বিচার করতে হবে স্বার্থপর, বাণিজ্যনির্ভর এবং বলবিশ্বাসী সাম্রাজ্যবাদের বিপরীতে সমাজতন্ত্রের সাম্যবাদী এবং মানবিক নীতিগুলির পরিপ্রেক্ষিতে। রবীন্দ্রনাথ নিজেই লিখেছেন, ‘বাণিজ্য এখন আর নিছক বাণিজ্য নহে, সাম্রাজ্যের সঙ্গে একদিন তার গান্ধর্ব বিবাহ ঘটিয়া গেছে’ (‘লড়াইয়ের মূলে’, কালান্তর, পৃ ৫২) অথচ, সমাজতন্ত্রের আদর্শগুলির ব্যাখ্যা, বা ভারতে সেগুলির প্রয়োগ অথবা অর্জন সম্ভাবনা নিয়েও তাঁর কোনো মন্তব্য নেই। সমাজতন্ত্রের ইহজাগতিকতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ধর্মচিন্তার বিরোধ লাগে বটে, কিন্তু সারা ভারতে ধর্ম কী সহজে ধর্মতন্ত্রের আদলে প্রকাশিত হয়ে মানুষের শোষণ, দারিদ্র্য এবং অশিক্ষা চিরস্থায়ী করে, তার উল্লেখ তো তিনি নিজেও করেছেন। রুশ বিপ্লবের প্রশংসা রবীন্দ্রনাথ করেছেন, কিন্তু ১৯২৫ সালে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠার পরও তিনি এর আদর্শগুলি নিয়ে তেমন উৎসাহী ছিলেন না। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্র একসময় একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প ছিল, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী ভেদবুদ্ধিই তাকে বিকশিত হতে দেয়নি।

সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে এরিক হাইন্ডরেকার একটি উল্লেখযোগ্য মন্তব্য করেছেন। ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মনোগত নির্মাণ’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে তিনি লেখেন, ‘সাম্রাজ্য একটি ভৌগোলিক-রাজনৈতিক অস্তিত্বের পাশাপাশি একটি সাংস্কৃতিক নির্মাণও বটে। এর অবস্থান মনের ভূগোলে এবং একই সঙ্গে ক্ষমতার ভূগোলে’ (হাইন্ডরেকার, পৃ ৪৮৬)। ব্রিটিশ উপনিবেশ যে গভীরভাবে ভারতের এক বিরাট সংখ্যক মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছে, একটি সাংস্কৃতিক নির্মাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, সে-সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ যে পরিমাণ উদ্বিগ্ন ছিলেন, তার থেকে একটু বেশি উদ্বিগ্ন থাকলে তিনি ফ্রানৎস ফাঁনোর মতো অস্ত্র দিয়ে না হলেও সচেতনতা, নিষ্ঠা ও কর্ম দিয়ে প্রতিরোধের ডাক দিতেন, মনের উপনিবেশমুক্তির আহ্বান জানাতেন; এবং সবচেয়ে বড় কথা, সাম্রাজ্যবাদ যে একটি প্রকল্প, এ-বিষয়টি শুরু থেকেই চিহ্নিত করতে পারতেন। ভারতীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতির উনিশ শতকীয় আদর্শে – যে আদর্শে রবীন্দ্রনাথ সমর্পিত ছিলেন – শেক্সপিয়ার, বার্ক, বায়রন ও অন্যান্য কবি-লেখকের পাশাপাশি মেকলের নামও উচ্চারিত হয়। অথচ এই মেকলের লেখায় যেরকম নগ্নভাবে সাম্রাজ্যবাদী একটি প্রকল্পের কথা উঠে এসেছে, তাতে সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্পটিকে চিহ্নিত করতে না পারাটা বিস্ময়কর মনে হয়।

 এই সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্পের বিষয়টি নিয়ে কিছু বলা যায়। অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ অনেক আগেই বলেছিলেন, ব্রিটিশদের আসলে কোনো সাম্রাজ্য নেই, আছে সাম্রাজ্যের একটি প্রকল্প। স্মিথ অবশ্য কথাটি বলেছিলেন এই পরিপ্রেক্ষিত থেকে যে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে ভৌগোলিক এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলি পরস্পর-প্রোথিত ছিল। বিষয়টি আরেকটু ব্যাখ্যা করে বলা যায়, উপনিবেশী ভৌগোলিক সাম্রাজ্যে ইংরেজের অর্থনৈতিক শক্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তির সম্প্রসারণও এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল :

–       প্রাচীন ভারতীয় সমাজের অন্তর্গত বৈষম্যকে আরো প্রকট করে তুলে তার প্রতিরোধের সকল শক্তি নিঃশেষ করা।

–       হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্বকে দীর্ঘস্থায়ী এবং মীমাংসার অতীত একটি বিষয়ে পরিণত করা।

–       শিক্ষাকে একটি শ্রেণীর বাইরে দুষ্প্রাপ্য করে রাখা, এবং সংখ্যালঘু যারা শিক্ষিত হবে, তাদের শিক্ষাও যাতে সাম্রাজ্যবাদ সংরক্ষণে নিয়োজিত থাকে, তা নিশ্চিত করা। এই শিক্ষাকেও আবার ইংল্যান্ডমুখী করে রাখা।

–       দারিদ্র্যকে চিরস্থায়ী করা, যাতে ভারতের সিংহভাগ মানুষ পরনির্ভরশীল থাকে।

–       রেনাঁ ‘জাতির ইচ্ছা’ বলে যে প্রত্যয়ের কথা বলেছেন, তা নিষ্ক্রিয় রাখা।

–       ভারতীয়দের কর্মক্ষেত্র সংকুচিত এবং নিয়ন্ত্রণাধীন রাখা।

–       ধর্মতন্ত্রের প্রতিষ্ঠানগুলিকে সহায়তা দেওয়া, যাতে তারা শোষণ ও সম্প্রদায়গত বিচ্ছেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সক্রিয় সহযোগী হিসেবে থাকে।

–       সাম্রাজ্যবাদী ‘সেলফ’ বা গুরুজন এবং এর অধীনস্থ ‘ন্যাটিভ আদার’ বা উন্নয়নকে প্রচলিত চিরায়ত বিভাজনে রাখা।

রবীন্দ্রনাথ নিজে ‘আমাদের ভারতবর্ষ’ ও ‘ইংরেজের ভারতবর্ষ’ – এরকম বিভাজন স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি ভারতবর্ষের ইতিহাসে যখন চোখ রাখতেন, এর সুমহান ঐতিহ্যগুলি তাঁর চোখে ধরা পড়ত। অথচ ইংরেজ যখন ভারতবর্ষকে বর্ণনা করত, তার চিন্তায় ভর করত প্রাচ্যবাদী অনেক স্টেরিওটাইপ। রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের ওপর লেখা অ্যাডমন্ড গসের (১৮৪৯-১৯২৮) একটি প্রবন্ধের কথা তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন, যা ১৮৯১ সালের দি সেঞ্চুরি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছিল (৪২ : ৬, ৯০১-৯১০) যেখানে গস ভারতকে বিশাল, তাপদগ্ধ, ক্লান্তিকর একটি দেশ হিসেবে অভিহিত করে একে শুধু কালো মানুষ আর পথের কুকুর অধ্যুষিত বলে উল্লেখ করেন। রবীন্দ্রনাথ এই একপেশে এবং নির্মম বর্ণনায় বিচলিত হয়েছিলেন। কিন্তু এডওয়ার্ড সাঈদের ব্যাখ্যা অনুসরণ করে আমরা সহজেই বুঝতে পারি, এই প্রাচ্যবাদী স্টেরিওটিপিক্যাল চিন্তা সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্পেরই একটি অনিবার্য প্রকাশ।

এই প্রকল্পের অধীনে ভারতীয় সমাজে যে স্থবিরতা এবং অধোগতি দেখা দিয়েছিল, তার দুর্দশা রবীন্দ্রনাথ নানান জায়গায় বর্ণনা করেছেন, কিন্তু প্রকল্পকে চিহ্নিত না করেই পরিবার ও সমাজের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আপনশক্তিতে আত্মপ্রকাশ করে ইংরেজের সমীহ আদায় করার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এই শিক্ষা কে দেবে, কীভাবে দেবে, এ-বিষয়ে কোনো বিশদ ব্যাখ্যায় তিনি যাননি। শান্তিনিকেতনে প্রাচ্যদেশীয় গুরুমুখী বিদ্যা ও উদার মানবিকতার আদর্শের সঙ্গে বিজ্ঞানের হিতকারী দিকটির যে-সমন্বয় তিনি সাধন করেছিলেন, তাতে বোঝা যায় সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্প থেকে দূরে এনে শিক্ষাকে একটি গণমুখী একতা দেওয়ার প্রয়াস তাঁর ছিল। কিন্তু এই শিক্ষা তাঁর জীবদ্দশাতেই আর কোথাও অনুসৃত হয়নি। এমনকি স্বদেশি আন্দোলনের সময় যে পশ্চিমা শিক্ষা বর্জনের লক্ষ্যে মহারাষ্ট্র বিদ্যাপীঠ, গুজরাট শিক্ষাপীঠ ইত্যাদি গড়ে ওঠে, সেগুলোও কোনো অভিঘাত রাখতে সক্ষম হয়নি।

উপনিবেশ-পূর্ব ভারতীয় সমাজের চিত্রায়ণে রবীন্দ্রনাথ কিছুটা আদর্শচিন্তার দ্বারস্থ হন। কিন্তু তাঁর প্রাচীন স্বদেশি সমাজ যে

স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল, তা কোন অর্থে? ‘স্বদেশী সমাজে’র যে স্বয়ম্ভর সমাজের ছবি তিনি আঁকেন, সেই সমাজ এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। বৃহত্তর স্বদেশের সঙ্গে যোগাযোগের অভাব, প্রকৃত শিক্ষার – অর্থাৎ যে শিক্ষা মানুষকে বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত করে – অভাব, কর্মের অভাব এসবই ছিল এই সমাজের পরিচয়। এই সমাজে জাত-পাত্র বিচার ছিল, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ছিল, নারী-পুরুষের সীমা নির্ধারিত ছিল। একটি দূরগত আদর্শদৃষ্টি দিয়ে তাকালে এই সমাজকে তুষ্ট মনে হতে পারে, কিন্তু এরকম তুষ্টি পৃথিবী সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব থেকে, একেবারে স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত ভ্রান্তিও বটে। ‘কালান্তর’ প্রবন্ধের শুরুতেই রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘একদিন চণ্ডীমণ্ডপে আমাদের আখড়া বসত, আলাপ জমত … গল্প-গুজবে তাসে-পাশায় এবং তার সঙ্গে … দিবানিদ্রা মিশিয়ে দিনটা যেত কেটে’ (কালান্তর, পৃ ১১)। এই বর্ণনায় শুধুই অবসরের কথা, কাজের কোনো কথা নেই। কাজ করত নিরন্ন কৃষক, খেটে খাওয়া মানুষ; আর এই অবসর ছিল সচ্ছল, অর্ধ-সচ্ছল বাবুদের। বস্তুত উপনিবেশী শাসন আসার আগেও স্বদেশি সমাজে দরিদ্রদের জন্য (এবং তাদের সংখ্যাই ছিল বেশি) একই উপনিবেশী অবস্থাই বিরাজ করছিল। ব্রিটিশ উপনিবেশী সাম্রাজ্যবাদকে তাই এই সমাজ থেকে কোনো প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়নি।

সমাজ বলতে রবীন্দ্রনাথ যে সামূহিক একটি বিষয় বোঝান আসলে তা কি তাই? সমাজ কি একটি একক সত্তা, সমাজ কি নিরেট? নাকি সমাজ আপাতদৃষ্টিতে এক, যেহেতু ক্ষমতাবান সমাজপতিরা নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য সমাজের একতা জোর করে ধরে রেখেছেন? সমাজের ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে সম্পর্কটা কী? যদি বলা হয় পরস্পর শ্রদ্ধাবোধের, তবে ভুল বলা হবে। বরং যদি বলা হয় শোষক ও শোষিতের, এবং তাদের মধ্যে স্থিতাবস্থা ক্ষমতাবান ও ক্ষমতাহীনের চিরাচরিত ভারসাম্যের, তাহলেই তা হবে সত্য। অর্থাৎ ক্ষমতাহীনের ক্ষমতা নেই বলে তাকে ক্ষমতাবানকে মান্য করতে হয়। ‘দুই বিঘা জমি’র উপেনের পক্ষে জমিদারের অবিচারের প্রতিবাদ করা সম্ভব নয়। ফলে সমাজে কোনো বিবাদ নেই, এরূপ প্রমাণিত হবে। রবীন্দ্রনাথ যদি সমাজের অন্তর্নিহিত অসাম্য, বিরোধ ক্ষমতার আখ্যানের বিভিন্ন রূপ এবং জোর খাটানো ভারসাম্যের বিষয়টি উপনিবেশ-পূর্ব ভারতেও খুঁজে দেখতেন, তাহলে নিশ্চয় লক্ষ করতেন, এ সমাজ আত্মশক্তিতে জেগে উঠতে তৈরি নয়, এ সমাজ স্বয়ংসম্পূর্ণও নয়, এবং অপরিবর্তিত কাঠামোর ভেতর এ সমাজ নিয়ে আশাবাদী হওয়াটাও কষ্টকর। এবং, এটি মেনে নিলে একস্থানে তিনি যে উল্লেখ করেছেন, আমাদের গ্রামের শিক্ষা স্বাস্থ্য অবকাঠামো ইত্যাদির উন্নতি আমরা নিজেরাই করতে পারি, যদি ইচ্ছা করি, সেই ইচ্ছা না করাটার কারণটাও পাওয়া যেত। এই শোষণমূলক, বিভাজিত কিন্তু স্থানীয় ক্ষমতার চর্চায় একক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত সমাজে এই ইচ্ছা করাটা নির্ভর করে ক্ষমতাবান বা ক্ষমতাকেন্দ্রের ওপর। আর যদি এই ইচ্ছাটা তৈরি হয় নিচ থেকে, প্রান্তিক মানুষজনের পক্ষ থেকে, এর প্রয়োগের জন্য যে শক্তির সমাবেশ ঘটাতে হবে, তা হতে হবে হয় ওই কেন্দ্রের শর্ত মেনে, অথবা কোনো বিপ্লবের মধ্য দিয়ে।

সমাজের সামূহিকতা নিয়ে মার্কসবাদীরাও প্রশ্ন তুলেছেন, যেহেতু সামূহিকতা শ্রেণী বিভাজনের বিষয়টি আড়াল করতে চায়, তবে এর একটা সীমানাও তারা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু প্রসঙ্গটির একটি দার্শনিক বিস্তার ঘটালে আমরা কি এর্নেস্টো লাক্লো ও শাঁতাল মুফের মতো বলতে পারি না, প্রত্যেক সামূহিকতার চরিত্রই আসলে অসম্পূর্ণ (লাক্লো ও মুফ, পৃ ৬৭)। সমাজ সম্পূর্ণ বলে কিছু নয়। যেমন, রবীন্দ্রনাথ যে সমাজের উল্লেখ করেন, তাতে নারীর অবস্থান বাড়ির সীমানার ভেতর। সমাজের দৃশ্যমান কর্মক্ষেত্রে, এবং শিক্ষা সংস্কৃতি কোনো ক্ষেত্রেই তার বিচরণ নেই। এই সমাজ তাহলে সম্পূর্ণ হয় কীভাবে? আর সমাজ যদি অসম্পূর্ণই হয়, তাহলে তার আত্মশক্তিরই বিকাশ কীভাবে ঘটে? তাহলে কি ন্যাশন ও জাতীয়তাবাদের মতো সমাজও সম্পূর্ণভাবে পুরুষতান্ত্রিক? এই পুরুষতান্ত্রিকতার পক্ষেই তো সাম্রাজ্যবাদের প্রকল্প।

রবীন্দ্রনাথের ভারতীয় সমাজ যে পশ্চিমা রাষ্ট্রযন্ত্রের আঘাতে দুর্বল হয়ে পড়ল, সে তার ভেতরের শক্তির অভাবের জন্য। স্বয়ংসম্পূর্ণ হলে, প্রকৃত একক হলে, সে সমাজ টিকে থাকত। সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্প ভারতে সফল ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পক্ষে ছিল শ্রেণী, বিত্ত ও জাতপাতে বিভাজিত সমাজ ব্যবস্থা।

রবীন্দ্রনাথ যে-অর্থে ন্যাশনকে সদর্থক রূপে দেখেছেন, অর্থাৎ যে-ন্যাশন নিজের জনগণের সেবা করবে, সকল জাতি, ধর্ম ও বর্ণের মানুষকে এক কাতারে নিয়ে আসবে এবং পররাষ্ট্রের ওপর খবরদারি বা তাকে পদানত করার চেষ্টা করবে না, তার নজির তিনি দেখেছিলেন আদর্শিক ভারতবর্ষে। ভারতবর্ষের মহামানবের সাগরতীরে শক হুন পাঠান মোগল এক দেহে লীন হয়েছে, এই দেশ তার নিজস্ব ভূগোলের বাইরে সাম্রাজ্য বিস্তার করেনি। কিন্তু সে কি তার রাষ্ট্রসংগঠনের অভাবের জন্য, তার সম্মিলিত ইচ্ছার অভাবের জন্য, না তার চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের জন্য, এ-বিষয়টি পরিষ্কার হয়নি। আধুনিক ন্যাশন সংগঠনের যে কতগুলো সূত্র থাকে – যেমন, মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে ন্যাশন হওয়ার পক্ষে প্রবল একটি ইচ্ছাশক্তি – যে ইচ্ছাশক্তিটি ন্যাশনকে ভালোর দিকে যেমন নিতে পারে, মন্দের দিকেও তেমনি; দেশের সকল অংশের মধ্যে যোগাযোগ; সমাজ সংগঠনে বৈষম্যহীনতা ও গতিশীলতা; এবং ন্যাশন ভাবগত বা মনোগত হলেও এর সদর্থক কার্যকারিতার পক্ষে সকলের একটি সম্মতি, তা কি ভারতবর্ষের ছিল? ভারতবর্ষের আর্যরা তো দ্রাবিড়দের ওপর সাম্রাজ্যবিস্তারের চেষ্টা করেছে; ভারতবর্ষে অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ চলেছে, এবং সাগরতীরে লীন হওয়া বিভিন্ন জাতির মধ্যে অন্তহীন বিরোধ চলেছে এবং এখনো চলছে। আর্নস্ট রেনাঁ যে ‘উইল অফ দ্য ন্যাশন’ উল্লেখ করেন, তাতে জনগণ সংগঠিত ও সতর্ক না থাকলে সহিংসতা ঢুকে পড়ে। এ-বিষয়টি হোমি ভাবা উল্লেখ করে ন্যাশনের স্থানিকতা সম্পর্কে যে ব্যাখ্যা দেন, তা এখানে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ন্যাশন হচ্ছে সংস্কৃতির একটি স্থান বা ঠিকানা, এবং এই স্থানিকতা যত না ইতিহাসকে কেন্দ্র করে, তার থেকে বেশি সময়কে কেন্দ্র করে; (এটি) এক ধরনের জীবনযাপন যা ‘জনগোষ্ঠী’ থেকে বেশি জটিল; ‘সমাজ’ থেকে বেশি প্রতীকী; ‘দেশ’ থেকে বেশি দ্যোতনামূলক …’ (ভাবা, দি লোকেশন অফ কালচার, পৃ ১৪০)। এবং, ভাবার সঙ্গে যোগ করে বলা যায়, ন্যাশনের ভৌগোলিকতার সঙ্গে মানসিকতার বিষয়টিও জড়িত।

বিভিন্ন জটিল আন্তঃসম্পর্কে জড়িয়ে পড়া ন্যাশন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথও অবহিত ছিলেন। তাই তিনি স্বদেশি আন্দোলনের সময় ভারতীয় ন্যাশনের ‘উইল’ বা ইচ্ছা যখন সহিংসতার পথে গেল, তখন তার সঙ্গে সংশ্রব ছিন্ন করেছেন। তিনি দেখেছেন, ওই সময় থেকে কীভাবে ঘটনাবহুল সময়ের নানা প্রকাশকে ধারণ করে বিভিন্ন দল ও উপদলের চিন্তায় ন্যাশন নিয়ে বিভিন্ন ভাবমূর্তির সমাবেশ ঘটেছে, যা ভারতমাতা থেকে নিয়ে রুশ বিপ্লবের আদর্শে তৈরি ভারত চিত্র পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত ছিল। মহাত্মা গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথের ন্যাশনচিন্তা প্রসঙ্গে আশীষ নন্দীর বক্তব্যটি এখানে প্রণিধানযোগ্য। ‘তারা উভয়েই চান নি যে তাঁদের সমাজ এমন এক অবস্থার শিকার হবে’, নন্দী লেখেন, ‘যেখানে ভারতীয় ন্যাশনচিন্তা ভারতীয় সভ্যতাকে ছাড়িয়ে যাবে, এবং যেখানে ভারতীয়দের বাস্তব জীবনযাত্রা শুধুমাত্র ভারত নামের একটি কল্পিত ন্যাশনের চাহিদা অনুযায়ী নির্ধারিত হবে’ (নন্দী, পৃ ১৫৫)। ন্যাশন যখন জনগোষ্ঠীকে ছাপিয়ে, সমাজকে ছাপিয়ে, দেশকে ছাপিয়ে এক ব্যাপক অবয়ব ধারণ করতে থাকলো তখন রবীন্দ্রনাথ সমাজের কাছে, গ্রামের কাছে, ব্যক্তির কাছে ফিরে যেতে চেয়েছেন। কিন্তু সময়ের প্রতিকূলে এই যাত্রা বেশিদূর এগোবার কথা নয়। সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্প স্বদেশি আন্দোলনে সহিংসতা, বিচ্ছিন্নতা এবং বিভাজন যুক্ত করেছিল; তার প্রভাবে ন্যাশনের চিন্তা বিপথগামী হয়েছে। ঘরে বাইরে ও চার অধ্যায় উপন্যাসে এর নানা রূপ রবীন্দ্রনাথ এঁকেছেন, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্পটির পরিবর্তে আত্ম-পর্যবেক্ষণ ও আত্ম-সমালোচনার ওপর বেশি আলো ফেলেছেন।

ন্যাশন থেকে যখন রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি গেছে ন্যাশনালিজমের দিকে, তখন তিনি যে বিষয়টি সম্যকভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, তা ছিল ন্যাশনালিজমের নামে ইউরোপীয় ন্যাশনগুলোর ‘সংগঠনগত লৌহশৃঙ্খল’ দিয়ে অবশিষ্ট পৃথিবীকে বেঁধে ফেলা। এই লৌহশৃঙ্খল, রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষমাহীন এবং মজবুত (ন্যাশনালিজম, পৃ ১৫-১৬)। এই বর্বর ন্যাশনালিজমকে তিনি ঘৃণা করেছেন। কিন্তু কল্পনায় ভেবেছেন, ভারতবর্ষের যে অন্তর্নিহিত ধর্ম একের ভেতর বহুকে মেলায়, দ্বন্দ্বের মধ্যে ঐক্যের সন্ধান করে, তার উদ্বোধন সম্ভব হলে ভারতের নিজস্ব ও মৌলিক ন্যাশনালিজম দেশকে সামনে এগোবার শক্তি জোগাবে। কিন্তু তা যে সম্ভব নয়, এবং সম্ভব নয় সাম্রাজ্যবাদের প্রকল্পের কারণে, তা আমরা বুঝি। রবীন্দ্রনাথও তাঁর নানা লেখায় সমাজের ভেতরে, বিভিন্ন সমাজে সমাজে অনৈক্য এবং বিভেদের উল্লেখ করে তা স্বীকার করে নিয়েছেন। তবে ন্যাশনালিজমের আরেকটি পথ তিনি সন্ধান করেছেন, যার একটি ব্যাখ্যা মিশেল ফুকোর টেকনোলজিস গ্রন্থের একটি বক্তব্য ধার করে দেওয়া যায়। ফুকো বলেন, পশ্চিমের রাজনৈতিক-জাতীয়তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ব্যক্তিবর্গকে একটি জনগোষ্ঠীতে বা সামূহিকতায় সমন্বিত করা, এবং এজন্য প্রয়োজন ক্রমবর্ধমান ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের সঙ্গে এই সামূহিকতাকে শক্তিশালী করার প্রয়াসের সংযোগ সৃষ্টি করা (ফুকো, পৃ ১৬২-৩)। রবীন্দ্রনাথ অবশ্য ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের পরিবর্তে ব্যক্তিকে উপজীব্য করেন, এবং লেখেন, ‘আমাদের সমাজে প্রত্যেকের সহিত সমস্ত দেশের একটা প্রাত্যহিক সম্বন্ধ কি বাঁধিয়া দেওয়া অসম্ভব’ (‘স্বদেশী সমাজ’ সংকলন, পৃ ৬১); কিন্তু এখানেও প্রশ্ন ওঠে, উদ্যোগটা কে নেবে? ব্যক্তি নিজে থেকে উদ্যোগ যে নেবে, সে সম্ভাবনা নেই কারণ সমাজের ভেতর ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির রয়েছে অনেক দূরত্ব। আর ব্যক্তিদের সংগঠিত করে এই সংযোগ সাধন যিনি বা যারা করবেন, তারাই বা কে? তাছাড়া, এরূপ উদ্যোগ নেওয়ার যে প্রত্যয় ব্যক্তিতে, সমাজে, প্রতিষ্ঠানে হয়তো তৈরি হবে, সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্প তাকেই নস্যাৎ করে দেবে। সেরকম অসংখ্য উদাহরণ উপনিবেশী ভারতে রয়েছে।

একসময় রবীন্দ্রনাথ তাঁর আশাবাদের কাছে ফিরে যান, এবং সমাজ, জাতি, রাষ্ট্র বা দেশ ও জাতীয়তাবাদের প্রশ্নের একটি মানবিক নিষ্পত্তির জন্য ভারতের সেই বৈশিষ্ট্যের দ্বারস্থ হন, যে বৈশিষ্ট্য তার ‘ত্যাগ না করিয়া, বিনাশ না করিয়া একটি ব্যবস্থার মধ্যে সকলকেই’ স্থান দেওয়া, এবং লেখেন :

ভারতবর্ষের এই গুণ থাকাতে কোনো সমাজকে আমাদের বিরোধী কল্পনা করিয়া আমরা ভীত হইব না। প্রত্যেক নব নব সংঘাতে আমরা আমাদের বিস্তারেরই প্রত্যাশা করিব। হিন্দু বৌদ্ধ মুসলমান খৃষ্টান ভারতর্ষের ক্ষেত্রে পরস্পর লড়াই করিয়া মরিবে না, এইখানে তাহারা সামঞ্জস্য খুঁজিয়া পাইবে। (‘স্বদেশী সমাজ’, সংকলন, পৃ ৬৬)

প্রবন্ধটি ১৯০৪ সালে লেখা। এরপর সাঁইত্রিশ বছর রবীন্দ্রনাথ বেঁচে ছিলেন, কিন্তু তাঁর প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, বরং এর বিপরীতটাই ঘটেছে। তার কারণ, সাম্রাজ্যবাদের বিস্তার, তার নখদন্ত প্রদর্শন ও ব্যবহার, এবং ভারতীয় সমাজের অনৈক্য এবং আত্মক্ষয়। জীবনের শেষ প্রবন্ধে তাই আরেকবার ক্লান্ত এবং পীড়িত কিন্তু আশাবাদী রবীন্দ্রনাথ মানব-অভ্যুদয়ের স্বপ্ন দেখেছেন।

যদিও, বাস্তবে, তাঁর পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা এই সম্ভাবনাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

তথ্যসূত্র

১.      Bhabha, Homi, The Location of Culture, London and Nwe York : Routeledge, 1994.

২.      _________, Nation and Narration, London and Nwe York : Routeledge, 1990.

৩.      Foucault, Michel, Technologies of the Self, in LH Martin, H Gutman and PH Hutton (eds.), Techonologies of the Self, Amherst : University of Massachusetts Press, 1988.

৪.      Goss, Edmund, On Rudyard Kipling, The Century Magayine, vol. 42, October 1891, 901-910.

৫.      Hinderaker, Eric, The ‘Four Indian Kings’ and the Imaginative Construction of the British Empire,’ William and Mary Quarterly, 3rd ser. 53, 1996.

৬.      Laclau, Ernesto and Mouffe, Chantal, Hegemoû and Socialist Strategy : Towards a Radical Democratic Politics, London: Verso, 1985.

৭.      Nandy, Ashish, ‘The Illegitimacy of Nationalism : Rabindranath Tagore and the Politics of Self’’ in Bonfire of Creeds : The Essential Ashish Nandy, Delhi : Oxford University Press, 2004.

৮.      Tagore, Rabindranath, Nationalism, London : Macmillan, 1918.

৯.      সান্যাল, আশিস, রবীন্দ্রনাথ ও ন্যাশনালিজম, কলকাতা : এম. সি. সরকার অ্যান্ড সন্স, ২০০৪।’

১০.     ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ, কালান্তর, কলিকাতা : বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, ১৩৯৫ [১৩৪৪]।

১১.     _________, সংকলন, কলিকাতা : বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, ১৪০৭ [১৩৩২]।

১২.     _________, নৈবেদ্য, কলিকাতা : বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, ১৩৮৩ [১৩০৮]।

১৩.     _________, রবীন্দ্র-রচনাবলী, তৃতীয় খণ্ড, কলিকাতা : বিশ্বভারতী, ১৩৮২।

১৪.     _________, রবীন্দ্র-রচনাবলী, দশম খণ্ড, কলিকাতা : বিশ্বভারতী, ১৩৭৮।

১৫.     _________, রবীন্দ্র-রচনাবলী, ষোড়শ খণ্ড, কলিকাতা : বিশ্বভারতী, ১৩৮৪।

১৬.     _________, রবীন্দ্র-রচনাবলী, ঊনবিংশ খণ্ড, কলিকাতা : বিশ্বভারতী, ১৩৮২। ৎ

ষষ্ঠ বর্ষ, একাদশ-দ্বাদশ সংখ্যা, পৌষ-মাঘ ১৪১৭, ডিসেম্বর ২০১০-জানুয়ারি ২০১১