কথাসাহিত্যে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম টিকে থাকবেন। টিকে থাকবেন তাঁর চিন্তা-প্রবন্ধের আলোকে, তাঁর সজ্জন-স্বভাব বিস্তারের কারণেই। নশ্বর পৃথিবীতে এ কম বড় ব্যাপার নয়। … তাঁর সঙ্গে কাটানো অসংখ্য স্মৃতি,
স্মৃতি-সমগ্র জমে আছে মাথায়।
কথাসাহিত্যিক, শিল্প-সমালোচক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রয়াণের পরে সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষ করে ফেসবুকের নিউজফিড শোকে আচ্ছন্ন হয়ে গেল। সাধারণত শিল্পসাহিত্যের গুণী ব্যক্তিত্ব কেউ চলে গেলে, সচরাচর এমন শোকবার্তা চোখে পড়ে না। এটি সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের দারুণ অর্জন, বাংলা ভাষায়, বাংলাদেশে।
বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বিবেচনায় সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মৃত্যুকে ‘অকাল’ বলা যাবে না। তবু তাঁর ছাত্রছাত্রী-সহকর্মী-পাঠক-শুভানুধ্যায়ী-অনুরাগী স্বজনের পক্ষে এই আকস্মিক মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন। তবু ‘জন্মিলে মরিতে হবে’ এই চির সত্যটির বাস্তবতায় তিনি চলে গেলেন। আমরা, আমি সত্যিই ব্যথা পেয়েছি মনজুর স্যারের প্রস্থানে। শ্রদ্ধা জানাই স্যারকে।
দীর্ঘকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে স্যার শিক্ষকতা করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরের পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়াচ্ছিলেন তিনি। সেই হিসেবে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ছাত্রছাত্রী ছড়িয়ে আছে হাজারে হাজার। কিন্তু সৈয়দ মনজুরুলের মধ্যে সেই বিরল গুণ বিদ্যমান ছিল যে, তাঁকে আমরা অনেকেই কাছে পেয়েছি, যারা কি না ইংরেজি বিভাগের ছাত্র ছিলাম না। তিনি শিল্প-সাহিত্যের মানুষ, সেই হিসেবে হয়তো বেশিই সান্নিধ্য পেয়েছি এবং এই গুণ সৈয়দ মনজুরুলের মধ্যে সবসময়ই ছিল যে, তিনি শিক্ষক কিন্তু শিক্ষকের প্রথাগত ভঙ্গিতে অ্যাপ্রোচ করতেন না। প্রগাঢ় এক বন্ধুত্বমাখা সম্পর্ক রচনা করতেন তিনি – এ-কথা যে কেউ স্বীকার করে নেবে। অধ্যাপকের হামবড়া ভাব নিয়ে চলতেন না, বাংলাদেশের একজন মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক যেমন হয়ে থাকেন, সেই মেজাজেই দেখেছি তাঁকে।
কীভাবে প্রথম চিনি সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে? কোথায় তাঁকে সামনাসামনি দেখলাম আমি?
গ্রামের হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করার পর জেলা শহরের কলেজে ভর্তি হই। খুব স্বাভাবিকভাবেই তখন পর্যন্ত সৈয়দ মনজুরকে আমার চেনার সুযোগ নেই। জেলা শহরে বসে ঢাকার দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকী খুঁজে খুঁজে পড়ার নেশা ছিল আমার। প্রতি বৃহস্পতিবার সংবাদ সাময়িকীতে প্রকাশ হতো দুটি নিয়মিত কলাম। এক. সৈয়দ শামসুল হকের ‘হৃৎকলমের টানে’, দুই. সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ‘অলস দিনের হাওয়া’।
একটি হোমিও দোকানে সংবাদ রাখা হতো। আমি বৃহস্পতিবার সেই দোকানে বসে থাকতাম। হোমিও ডাক্তার রোগী নিয়ে একটু হলেই সেই ফাঁকে আমি সংবাদ সাময়িকীর চার পৃষ্ঠা নিয়ে যেতাম। পড়ার নেশা তখন, ‘হৃৎকলমের টানে’ ও ‘অলস দিনের হাওয়া’। ‘অলস দিনের হাওয়া’তে সৈয়দ মনজুর লিখতেন সমকালীন বিশ্বসাহিত্যের নানা আলোচনা, যা আমার জন্য জানার খোরাক তখন। পরে যখন খুলনায় থাকি আর্ট কলেজের ছাত্র হওয়ার সূত্রে, ওখানকার এক নাট্যোৎসবে নন্দনতত্ত্ব নিয়ে সেমিনারে গিয়েছিলেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। কাছে গিয়ে দু-একটি প্রশ্নও করেছি হয়তো, স্যারের যা মনে থাকার কথা না কিন্তু আমার মনে আছে। আর্ট কলেজে পড়ি, কবিতাও লিখি, স্যার প্রশ্ন শুনে আমার দিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিলেন। পরে আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা ইনস্টিটিউটে খুলনা আর্ট কলেজ থেকে মাইগ্রেট করে চলে আসি, ঢাকার বাসিন্দা হয়ে যাই, আস্তে আস্তে একটা দারুণ বোঝাপড়ামূলক সম্পর্ক রচিত হলো আমাদের মধ্যে। সেই সম্পর্ক কবিতা, শিল্পকলা, সিনেমা ছাড়িয়ে ঢুকে পড়ল কত কিছুর মধ্যে, সেসব একটু পরে বলি। আগে বলি, শ্রীহট্টে জন্মেছিলেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। পড়ুয়া পরিবার তাঁদের। সৈয়দ মনজুরের মায়ের মামা ছিলেন বিখ্যাত সৈয়দ মুজতবা আলী। মুজতবা আলী তো বিখ্যাত মানুষ, পুবে ও পশ্চিমেও তাঁর যাতায়াত প্রতিষ্ঠিত ছিল। রবীন্দ্রনাথের ওয়ান অফ দ্য পিএস ছিলেন। নিজের রস-সম্ভারের রচনার কারণেই সৈয়দ মুজতবা আলী সুবিদিত। তাঁর ভাগ্নির ছেলে সৈয়দ মনজুর। আড্ডায় একবার সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলছিলেন, হাছন রাজার বংশলতিকাতেও তাঁর পূর্বপুরুষ জড়িয়ে আছেন।
বাংলাদেশের কয়েকজন মাত্র আর্ট ক্রিটিকের একজন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। সেই হিসেবে তাঁর অনুপস্থিতিতে একজন কথাসাহিত্যিক, একজন সাহিত্য-সমালোচক, একজন অধ্যাপক, একজন আর্ট ক্রিটিক হারাল বাংলাদেশ।
বাংলাদেশে শিল্প-সাহিত্য যাঁরা করেন, তাঁদের মধ্যে সিনিয়র অনেকেই ব্যক্তি সুবিধা নিতে গিয়ে নিজেকে রাজনৈতিকভাবে নষ্ট করে ফেলেন, সৈয়দ মনজুর তার ব্যতিক্রম। এ কারণেই তরুণদের কাছে তিনি অধিক পছন্দের। সব মিলিয়ে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের প্রয়াণ একটি ক্ষত হয়ে থাকল। আমরা এই নিম্নস্বরে কথা বলা সজ্জন মানুষটিকে হারিয়ে ফেললাম।
কলাভবনের দোতলায়, সম্ভবত ২০৬৪ নম্বর রুমই ছিল স্যারের অফিস রুম। সেই রুমে যেতাম ছাত্রজীবনে, যখন আমি চারুকলায় পড়তাম।
অনেক পরে এক আর্ট গ্যালারিতে হঠাৎ দেখা মনজুর স্যারের সঙ্গে। অনেকদিন বাদে দেখা। আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম। স্যার দু-হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘তোমার সঙ্গে হ্যান্ডশেকে হবে!’ বুকে টেনে নিলেন। মাঝেমধ্যেই এরকম দেখা হতো স্যারের সঙ্গে, নানা অনুষ্ঠানে, হয়তো ঢাকা ক্লাবেই বেশি। সচরাচর দেখা না হলেও, আমরা আছি একই শহরে – এটা তো জানতাম। তিনি ফুলার রোডে থাকতেন, আমি এলিফ্যান্ট রোডে। ক্যাম্পাসে রিকশা ক্রসিংয়ে দেখা হতো একসময়। বড় কোনো আর্ট এক্সিবিশনে বেশি দেখা হতো। পত্রিকার পাতায় দেখা হতো। আমার একটি কবিতার বইয়ের রিভিউ লিখেছিলেন স্যার, সে অনেক আগে, ভোরের কাগজে।
কথাসাহিত্যের পাশাপাশি তিনি টিকে থাকবেন তাঁর চিন্তা-প্রবন্ধের আলোকে, তাঁর সজ্জন-স্বভাব বিস্তারের কারণেই। নশ্বর পৃথিবীতে এ কম বড় ব্যাপার নয়।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম চলে গেলেও তাঁর কাজ থেকে গেল। কাজের মধ্যেই মানুষ বাঁচে। কাজেই মনজুর স্যার আছেন, থাকবেন।
অনেক বছর আগের কথা, স্যারের রুমে গিয়ে আমার তখনকার ওই বয়সে এক ‘বৃশ্চিকা’র কামড়ে আহত হই আমি, স্যার কবিরাজি করছিলেন। কবিরাজির একটি কথা বলেই শেষ করছি। স্যার আমাকে বললেন, ‘জানো, আমার মা আমাকে কী নামে ডাকতেন?’
‘কী নামে?’
স্যার বললেন, ‘টোকন নামে।’
‘সত্যিই?’
‘হ্যাঁ, সত্যিই!’
দারুণ মজা হলো। স্যার বললেন, ‘এই শহরের কেউ এটা জানে না।’
কথা ওটা নয়। কথা কোনটা?
কথা হচ্ছে, মনজুর স্যার চলে গেলেন। তাঁর সঙ্গে কাটানো বহুবিধ, স্মৃতি-সমগ্র গেঁথে আছে মাথায়। লাভিউ স্যার।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.