সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম : এক গভীর অবলোকন

ইংরেজি বিভাগে আমাদের ব্যাচের শিক্ষার্থীরা সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে খুব বেশি সময় শিক্ষক হিসেবে পাননি। দ্রুতই তিনি গবেষণার কাজ নিয়ে সম্ভবত কানাডায় চলে যান। তখন তাঁর চুলে বাবড়ি, সোনালি ফ্রেমের গোল কাচের চশমা। শুধু দেখেছি রশীদ-ঠাকুরতা সেমিনার কক্ষের কাছে নিজের অফিসকক্ষের দরজার তালা খুলে ঢুকছেন কিংবা বন্ধ করছেন। তারপর কোথাও যাচ্ছেন খুব দ্রুতপায়ে। এই দ্রুতগতি আমার চোখে তাঁর এক সিগনেচার ব্যাপার। অধ্যাপক যতীন সরকার একবার সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের দ্রুতগতি নিয়ে তাঁর সপ্রশংস বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। কারণ, এ ছিল আরো অনেক বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ। লেখক হিসেবে তিনি বেশ বহুলপ্রজই ছিলেন। আমরা দেখেছি, বৃহদাকারে না হলেও মনজুরুলভাই (এখন থেকে এসএমআই) কীভাবে প্রায় চলতে চলতে অনেক কাজ করে ফেলতেন – মধ্যম এবং ছোট আয়তনের গদ্য লিখে ফেলতেন – কম্পোজ করিয়ে যথাস্থানে পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন। বিভাগের কিছু কমিটি সভাতেও তিনি খুব দ্রুত যেতেন, যেতে পারতেন, চিন্তা করতেন, সিদ্ধান্ত নিতেন। আমি অন্তত বিস্মিত হতাম – সিদ্ধান্ত হয়ে যেত, সভা শেষ। এতে করে অন্যদের অংশগ্রহণ হয়তো তুলনামূলক কম হতো; কিন্তু তাঁরা দ্রুত কাজ করার এক প্রকার প্রশিক্ষণ পেতেন। দ্রুত কাজ করতে পারা মানুষটি কিছুটা দ্রুতই চলে গেলেন পৃথিবী থেকে। সেজন্যেই একজন বুদ্ধিজীবীর পক্ষে প্রত্যাশিত কাজ যে সাকল্যে অনেক অসম্পন্ন থেকে গেছে, তা নয়। সম্মান অনেক অনার্জিত থেকেছে, তাও নয়। তাই, আমার বলার ইচ্ছা হচ্ছে যে, গতি তথা দ্রুতগতিই সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে ডিফাইন করে, সংজ্ঞায়িত করে।

ফল প্রকাশের পর যত দ্রুত এসএমআই ইংরেজি বিভাগে নিয়োগ পেয়েছিলেন এবং এমনকি বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব, তাও আমাদের বিস্মিত করে। দৈনিক সংবাদ-এর সাহিত্য সাময়িকীতে ধারাবাহিকভাবে ‘অলস দিনের হাওয়া’ শিরোনামে বিশ্বসাহিত্যের নানা উল্লেখযোগ্য বিষয়ে পর্যালোচনা লিখতে থাকলেন এসএমআই। আলোড়ন যেমন সৃষ্টি হলো এই অভিনব শিরোনামের কারণে, একত্রিতভাবে এগুলো যখন বই আকারে প্রকাশিত হলো, তাঁর নাম সাহিত্যপ্রেমী পাঠকের মুখে মুখে। অনেক কিছু ঘটেছে বিস্ময়কর দ্রুততার মধ্যে। মাঝে মাঝে আমি ভাবি, মনজুর স্যারের বইয়ের সংখ্যা কত? কতগুলো ঘটনা যে দ্রুততায় ঘটে তাঁকে উল্লেখযোগ্য পরিচিতি এবং প্রতিষ্ঠা দিয়েছে – তা ঠিক এরূপভাবে না ঘটলে কি হতো? তথ্যটি এ-মুহূর্তে যাচাই করে নিতে পারছি না। স্যামুয়েল জনসনের সময়ে তিনি শুধু বৈঠকি আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না-থাকলে, বস্ওয়েলের লাইফ অফ স্যামুয়েল জনসনকে নিয়েও, কি ইংল্যান্ড তথা বিশ্বের মানুষ আরো বেশি ঋদ্ধ হতো না? আমি হয়তো কিছু জল্পনা বুনছি, ব্যক্তির বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করা যায় না, সুতরাং অনেক কিছু অনেকভাবে ঘটতে পারত। ব্যক্তির আকাক্সক্ষাকে সমাজ কিংবা প্রতিষ্ঠান দ্রুত চরিতার্থ করলে, তার ফল নানারকম হয়। এক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামকে, কিছু সংস্কার মেনেও, বলা যায় খ্যাতি-পরিচিতির ‘বরপুত্র’।
সমাজ-সংস্কৃতিতে শূন্যস্থান ছিল, তিনি তা পূরণ করেছেন।

এসএমআই’র দৃষ্টি ছিল তীক্ষ্ন, দ্রুত অনেক খবর সংগ্রহ করে ফেলতেন। প্রকৃতপক্ষে, তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল, সেভাবেই জেনে যেতেন অনেক কিছু। আমার প্রথম কবিতার বই কাঙাল দীর্ঘকাল বেরুলো ১৯৮৫-এর বইমেলায়। তখন এক সন্ধ্যায় আমি টিএসসি মোড় পেরিয়ে বইমেলা, অর্থাৎ বাংলা একাডেমির প্রবেশ গেটের দিকে হেঁটে চলেছি। মনজুরভাই বাংলা একাডেমি থেকে বেরিয়ে টিএসসি মোড়ের দিকে তাঁর অভ্যস্ত দ্রুতপায়ে এগোচ্ছেন। দেখা হতেই দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং কবিতার বইটি সম্পর্কে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে কিছু কথা বললেন। কোত্থেকে, কীভাবে জেনেছেন জিজ্ঞাসা করার সুযোগ ছিল না, তিনি আমাকে উৎসাহ দিয়ে, অভিনন্দন জানিয়ে শেষ করলেন, চলে গেলেন। আজব ব্যাপারই বলতে হবে।

২০০০-এর পরে আমি একটি হত্যার হুমকির চিঠি পাই, ডাকযোগে। হুমকিদাতারা চিঠিতে আমাকে আদেশ দিয়েছিল সিপিবির সঙ্গে চলমান কাজকর্ম বন্ধ করার। অন্যথায় তারা আমাকে হত্যা করবে, ইত্যাদি। আমি লক্ষ করলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে সৃষ্ট এ-সম্পর্কিত কথাবার্তায় এসএমআই নিজের মতো করে বলছেন সিপিবির কথা। আমার দীর্ঘদিনের সিপিবি-সংযোগ সম্পর্কে তিনি জানতেন, এ-ঘটনায়ও তিনি সেটাই, যাচাই না করেই, উপস্থিত করলেন। চিন্তা সাময়িকীর একটি বিশেষ সংখ্যার ক্ষেত্রেও একটু হালকা গমন দেখেছিলাম। সংখ্যাটিতে বেঞ্জামিন, এডর্নো, দেরিদা প্রমুখের তত্ত্বের সাহায্যে সন্ত্রাসীদের কর্মকাণ্ডকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কলাভবনের লাউঞ্জে আমি মনজুরভাইকে সংখ্যাটি দেখিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলাম। কিন্তু পর্যাপ্ত সাড়া পেলাম না। – বললেন যে, তিনি ক্লাসে পোস্টমডার্নিজম সম্পর্কে যে-আলোচনা করেন, তার পরে ওইসব
লেখালেখি-সাংবাদিকতা কোনো কলকে পাবে না, বাজার পাবে না। আমাকে তিনি নিশ্চিন্ত থাকতে বললেন। বরং আমার মনে হয়েছে, আমাদের অনেক বুদ্ধিজীবীই সম্যক সচেতন ছিলেন না, কিংবা ওয়াকিবহাল। শীর্ষতর একজন বুদ্ধিজীবী রক্ষণশীলতাকে উদারতন্ত্রের চেয়ে অধিকতর কাম্য/ গ্রহণযোগ্য বলেছিলেন।

সে যাক। আমার মনে পড়ছে, আমাকে, বিশেষত আমার বাংলা গদ্যকে, উচ্চ প্রশংসা করে এসএমআই আমাদের আহসানুল হক স্যারের সঙ্গে আলোচনা করছেন। যদ্দূর মনে পড়ে, আহসানুল হক স্যার তখন বিভাগের চেয়ারম্যান। বিভাগের সেই বহুল পরিচিত চেয়ারম্যানের টেবিল। গণসাহিত্য সাময়িকী বেরিয়েছিল কিছুদিন আগে। বিকেলের দিকটাতে কোনো কাজে আমি গিয়েছিলাম বিভাগের চেয়ারম্যানের অফিসে। অবাক হয়ে গেলাম সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম গণসাহিত্যে প্রকাশিত আমার প্রবন্ধটির শেষ পৃষ্ঠা খুলে নিয়ে কথা বলছেন, তারপর নিম্নোদ্ধৃত অনুচ্ছেদটি সম্পূর্ণ পড়ে শোনালেন আহসানুল হক স্যারকে, তিনি তখন বেশ আবেগাপ্লুত :

জলপাই লেবাইস্যা দেবতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সংগ্রাম বেড়ে চলেছে। এ সংগ্রামেরও রয়েছে –
যুদ্ধ-বিরোধী-লক্ষ্য। কারণ আন্তর্জাতিক যুদ্ধবাজদের দোসররাই এখানে গণতন্ত্রের ঘাতক। এবং যুদ্ধবাজ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ধ্বনি তুলে অগ্রসর হচ্ছে গণতন্ত্রের যে সংগ্রাম, শুরু থেকেই কবি এবং কবিতা তার দুঃসাহসী যোদ্ধা। জীবনবিনাশী তাবৎ শক্তির বিরুদ্ধে অফুুরান প্রাণ নিয়ে এগোচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ। বাংলাদেশের কবিতাও। অত্যাচার; নির্যাতন ও ভয়ভীতি উপেক্ষা করে কবিতা কথা বলছে, কবিগণ বলছেন মিসাইল ও অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে। বাংলাদেশের কবিতার সজীবতা এবং প্রাণশক্তি দেখে মনে হয় নেরুদা ঠিকই বলেছিলেন :

বিড়ালের জীবনের মতই কঠিন প্রাণ-প্রাচুর্যে পূর্ণ কবিতারও মৃত্যু নেই। সে তার সুন্দর মুখে দিগন্তজোড়া নবান্নের হাসি নিয়ে বেঁচে থাকে।

আমি তাকিয়ে আছি আমার দুজন শিক্ষকের দিকে। তাঁরা তখন আমার প্রবন্ধের বিষয় ও ভাষার প্রতি অনুমোদনের হাসি, অনুপ্রেরণার দ্যুতি ছড়াচ্ছেন। অনুজ লেখক-কবিকে এগিয়ে দেওয়ার মনোভাব সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল। সেদিন নিজে দেখে আজ বহুদিন পর লিখছি। এই ঘটনাটি উনিশশো আশির দশকের শেষদিককার, ধারণা করা যায়। এরও বহু পরে, আমি ঢাবি’র ইংরেজি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিই। অব্যবহিত পরের কিছুদিন যে খুব ভালো কেটেছে, তা নয়। কে খুশি, কে অসুখী – পরিষ্কার বোঝা যায়নি।
যে-ক’জন শিক্ষক, সহকর্মী পরিষ্কার আশ্বস্ত করেছেন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তাঁদের অংশের। তবে তিনি দেশের বাইরে থাকায় আমার ঠিক যোগ দেওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে দেখা হয়নি। চক্রান্তের বাড়াবাড়ির মুখে একদিন তিনি বলেছিলেন, ‘You have come to stay here।’ আমাকে সাহায্য করেছিলেন ড. শওকাত হোসেন, ড. খোন্দকার আশরাফ হোসেন এবং ড. ফকরুল আলম।

জে এস মিলের On Liberty পড়াতাম আমি। অন্ধ আনুগত্য এবং পালে-চলার বিষয়গুলো সম্পর্কে মিল বলেছেন। আমি সাধারণত পাঠ্য টেক্সটের সঙ্গে বর্তমান পৃথিবী এবং বাংলাদেশের যোগসূত্র, মিল-অমিল ইত্যাদি উল্লেখ করতাম। একদিন এক ছাত্র আমাকে থামতে বলল। ‘অনেক পড়িয়েছেন, অনেক বলেছেন, এবারে …।’ আমি পরিস্থিতিটা বিভাগে জানালাম। কিছুদিন পরে অন্য কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলতে কিছু সিনিয়র শিক্ষকসহ উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকীর অফিসে যাই। হঠাৎ শুনি ভিসি সাহেবকে মনজুর স্যার বলছেন, ‘কাজলকে তো ক্লাসে পড়াতেই দিচ্ছে না।’ সেই মুহূর্তটি ছিল আমার এবং বিভাগের জন্য ঐতিহাসিক। সম্প্রতি আরো একবার মনজুর স্যার নিজে আমাকে ফেসবুকে লিখতে নিষেধ করেছেন, অধ্যাপক ফকরুল আলমের উপস্থিতিতে আর সি মজুমদার মিলনায়তনের একটি অনুষ্ঠানের শুরুতে। সংগীত ও নৃত্যকলা বিভাগে নাচ শেখানোর কোর্স প্রবর্তনের ইস্যুতে মনজুর স্যার খুব দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন, কলা অনুষদের অধ্যাপকদের এক সভায়। আমি প্রস্তুতই ছিলাম, তিনি আমার দিকে তাকালেন, মাথা দোলালেন। আমি উচ্চকণ্ঠে বক্তৃতা দিয়েছিলাম, মনে আছে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ওই বিভাগের বিষয়াদিতে শেষ পর্যন্তও যুক্ত ছিলেন, জানি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা ইনস্টিটিউটের (এখন এটি একটি অনুষদ) প্রতিষ্ঠাতা শিল্পী জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে একটি জোর সংগ্রামের আয়োজন করেছিল। ওখানকার শিক্ষক-শিল্পীদের সঙ্গে এসএমআই’র ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে নিশ্চয়ই ঈর্ষণীয় সংখ্যক ছবি এবং চারুকর্ম জমেছে। এর একটি স্মারক প্রদর্শনী হতে পারে। তাঁর প্রয়াণের আগামী বার্ষিকীতে। আগ্রহ এবং উত্তাপের সংখ্যা এবং বৈচিত্র্য প্রমাণ করে যে, এসএমআই দুর্বল কিন্তু সংগ্রামী এক সমাজের প্রতিনিধি-বুদ্ধিজীবী, তাঁর মতো কিছু মানুষকে বহু শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করতে হয়েছে। তিনি বিজ্ঞানের এক বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেও গিয়েছিলেন। সময়ের ফসল হয়ে তিনি প্রায় সব্যসাচী। সব্যসাচী-প্রবণতা তাঁর; তা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত কি না, সময় বলবে।

ইংরেজি বিভাগের জনপ্রিয় অফিস সহকারী বাবুল প্রসাদের কথা এ-মুহূর্তে মনে পড়ছে। তার ক্যান্সার ধরা পড়লো, এবং দ্রুতই অবস্থার অবনতি হলে বাবুল চলে গেলেন।

মারণব্যাধির মানসিক চাপেও অসুস্থতার সময় তিনি অফিসে ঠিকঠাক কাজ হয়তো করতে পারছিলেন না।
কারো-কারো দিক থেকে প্রচণ্ড তিরস্কৃত হয়ে অন্য কারো কাছে হয়তো সান্ত্বনা পেয়েছেন। সে যাক। তাঁর মৃত্যুর পরে আমি দেখেছি বাবুলের পুত্রকে একটি চাকরি জুটিয়ে দিতে এবং পরবর্তী সময়ে কিছু কারণে প্রায়-চলে যাওয়া তার চাকরি ফিরে পেতে কী বিশাল ভূমিকা নিয়েছেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। বিজনেস স্টাডিজ অনুষদে বাবুলের সেই ছেলে এখনো চাকরি করছে। গোটা বিশ্ববিদ্যালয়েই বড় একটি প্রভাব ছিল এসএমআই’র। অ্যাকাডেমিক এবং নানা নন-অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রে। এটা ছড়িয়েও পড়েছিল – দেশব্যাপী, বিভিন্ন, বিচিত্র এলাকায়। আমি আবারো বলবো – এমন পরিস্থিতিতে – সব ক্ষেত্রেই যে ফল ভালো হয়, তা নয়। ব্যক্তি মানুষের সাধ্যের তো সীমা থাকে। আশা করি, পাঠক আমাকে বুঝতে পারবেন। এমনকি এসএমআই’র যে স্পষ্টতই অকালপ্রয়াণ, তাকেও তাঁরা তাঁর অত্যধিক চাপের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখবেন। এখানে কে সীমা রাখবে, ভারসাম্য? – সমাজ/ পরিমণ্ডল, না ব্যক্তি শিক্ষক, ব্যক্তি বুদ্ধিজীবী? এরূপ যাই হোক কারো মূল পেশা কিংবা কর্মক্ষেত্র নিঃসন্দেহে যা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ – যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। চাপ কি শুধু বাইরের গোষ্ঠীর, চক্রের, দলের – না, তা ব্যক্তি লেখকের ভেতর থেকেই আসে, সংশ্লিষ্টতা-সম্পৃক্ততার কারণে, ভিত্তিতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপককে দেখেশুনেই আমি একবার একটি কবিতা লিখলাম নিম্নরূপ, সংকলিত হয়েছিল আমার ফুল ও উন্মত্ত রঙিন বইয়ে। বইটি প্রকাশিত হয় ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

পরিচয় পাই : ক্ষমতার বিদ্যা, তার উপার্জন,/ অর্থেরই মতন।/ গণ্ড ও পশ্চাৎদেশ তারও/ কোথায়-কখন স্ফীত-নাগালের বাইরে বর্ত্তুল -/ বোঝাটা কঠিন/ বোঝাটা কঠিন/ কোন্ বিত্ত-বৈভবের -/ কোন্ জমি, কেমন ফ্যাক্টরির -/ মালিক তিনিও, অদৃশ্য হয়তোবা,/ মালিক তিনিও তবু।

কলমে সশস্ত্র তিনি,/ কাগজ-কলম-কালি তরবারি, রিকয়েললেস, এ-কে;/ পুস্তকের দুর্গে আজ কর্নেল, কাল জেনারেল -/ সমান হিংস্র তার ঠোঁট/ তার নিব/ ঝরে বিষ, রক্ত/ বিষয়ব্যক্তির দেহ থেকে, বিষয়বস্তুর।/ কখনও বিড়বিড় :/ পেন ইজ মাইটিয়ার, পেন ইজ মাইটিয়ার;/ কখনও আবার ঠাকুরঘরে কার মন্ত্রপাঠ :/ বিদ্যা দদাতি বিনয়ং, বিদ্যা দদাতি বিনয়ং।/ আপনারে শুধু ঘেরিয়া-ঘেরিয়া তার পেন,/ তার ঠোঁট -/ লোকে বলে ক্ষুরধার,/ লোকে বলে অনলবর্ষী,/ তিনি দূর থেকে …/ দিনে-দিনে তাকে চিনি,/ তিনি আমাদের অন্ধ-ভক্তির লোভী স্কন্ধকেও।

আশা করি, পাঠক আমাকে ভুল বুঝবেন না। এটি একটি বৃহত্তর পরিস্থিতি আমাদের প্রিয় অধ্যাপকের
প্রায়-অকালপ্রয়াণে এই কবিতাটিকে পুনরায় হাজির করার উপলক্ষ মাত্র, যে অধ্যাপক স্মরণীয়ভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন যে, এদেশে আমরা শিক্ষক-বুদ্ধিজীবীরাও শুধু প্রশাসক হতে চাই। কবিতাটির শেষ লাইনে আমি পরিপার্শ্বকে সমাজ-রাষ্ট্রকে পরিস্থিতির পরিপূরক অংশ বলেছি। প্রশাসক হননি, অধ্যাপক হয়েছেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। এমন প্রবণতার নিন্দা করেছেন তা নিশ্চয় এই মূলগত মনোভাব থেকে যে, অধ্যাপক-বুদ্ধিজীবী ক্লাসে পড়ানোর সহায়ক-পরিপূরক কাজ হিসেবে গবেষণা করবেন, লিখবেন – সৃজনশীল, তাত্ত্বিক এবং বিশ্লেষণধর্মী রচনা। উপস্থিত একটি হিসাব পাচ্ছি তিনি নিজে এ ভূমিকায় সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু তা পর্যাপ্ত কি না, এ-প্রশ্ন কেউ করতে পারেন। তাঁর সক্ষমতা এবং নির্দেশনার বিচারেই সে-প্রশ্ন। যেমন, তাঁর গল্পগ্রন্থের সংখ্যা দশ (১০), উপন্যাসের সংখ্যা ছয় (৬), প্রবন্ধের বইয়ের সংখ্যা তিন (৩)। এ পরিসংখ্যান হয়তোবা খানিক অসম্পূর্ণ। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রচনা একত্রিত হয়ে এখন আরো কিছু বই প্রকাশিত হবে। তাঁর গবেষণা-অভিসন্দর্ভ আমরা বই আকারে পাইনি। দিন শেষে আমাদের পাঠক কি সন্তুষ্ট? তিনি কি তাঁর কর্তব্য নির্দেশের সমানুপাতিক কাজ করেছেন, ভূমিকা পালন করেছেন? খুব কাছে থেকে দেখে এবং অনেক আশা ছিল বলেই, স্মৃতিতর্পণের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের এই সুযোগ পেয়েই আমি খুব ঘনিষ্ঠ অবলোকনে গেলাম – মার্জনা চাই, যদি কেউ তাতে ক্ষুণ্ন হন, অপরাধ নেন। এই অনুপযুক্ত উপলক্ষেই প্রকৃতপক্ষে এক সমগ্র দৃশ্যপটের দিকে তাকানোর এই চেষ্টা আমার।