‘আয়না মহল’ এবং ‘কমনওয়েলথ সাহিত্য’ বিতর্ক

The Glass Palace

Amitav Ghosh

Publishers :

Harper Collins

India, 2000

Rs. 295

ÔI have on maû occassions

publicly stated my objections to the classification of books such as mine under the term Commonwealth Literature.Õ (অমিতাভ ঘোষ, কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশনকে লেখা চিঠি।)

অমিতাভ ঘোষের The Glass Palace (আয়না মহল) উপন্যাসটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বার্মা (বর্তমানে মায়ানমার) দখল এবং এর রাজনৈতিক উত্থান-পতনের কাহিনী। কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন ঘোষিত একটি পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে আয়না মহল উপন্যাস এবং এর স্রষ্টা আন্তর্জাতিক সাহিত্য-পরিমণ্ডলে তর্ক-বিতর্কের সূত্রপাত ঘটিয়েছেন। অমিতাভ ঘোষের এই সবিনয় প্রত্যাখ্যান এবং এ-সংক্রান্ত কিছু যৌক্তিক প্রশ্ন কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন, কমনওয়েলথ সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়গুলোকে অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দিয়েছে। লেখার পটভূমি মূলত মায়ানমার এবং ভারত জুড়ে বিস্তৃত। প্রধান চরিত্র এক ছিন্নমূল বালক, রাজকুমারের ভাগ্য-পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে উপন্যাসটি ক্রমবিকাশ লাভ করেছে। রাজকুমারের বাল্যকালে, অর্থাৎ সে যখন একটি ছাপরা হোটেলের টি-বয়, তখন মায়ানমারের ইতিহাসের সেই করুণ ঘটনাটি ঘটে; রাজপরিবার ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ হয়ে যায় এবং তাদের বাধ্যতামূলক নির্বাসনে পাঠানো হয় দক্ষিণ ভারতের রত্নগিরির একটি বাড়িতে। ক্ষমতা দখলের পর ব্রিটিশদের শোষণ এবং লুণ্ঠনের ফলে অতি পরিচিত ‘গোল্ডেন ল্যান্ড’ (মায়ানমার) জৌলুস হারাতে থাকে এবং দীর্ঘ বাষট্টি বছরের ধারাবাহিকতায় দেশটি দরিদ্র রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

ছাপরা হোটেলের মালিক মাচোর কাছে রাজকুমার মায়ানমারের রাজার আয়না মহলের কথা জানতে পারে। আরো জানতে পারে সেখানের অপরূপা পরিচারিকাদের কথা যারা রাজকন্যাদের লালন-পালন করে থাকে। কিশোর রাজকুমার সেদিন সিদ্ধান্ত নেয় যে-করেই হোক ওই আয়না মহলে সে প্রবেশ করবেই। রাজকুমারের জীবনের উত্থানপর্ব শুরুর আগেই ব্রিটিশরা মায়ানমার দখল করে এবং সেই বিশৃঙ্খলার সুযোগে তার আয়না মহলে প্রবেশের সুযোগ জুটে যায়।

ইংরেজ সেনাবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে মায়ানমারের রাজা থিবাউ পরাজিত হলে সাধারণ বর্মীরা রাজপ্রাসাদে লুটতরাজ শুরু করে। সেই ফাঁকে রাজকুমারও সেখানে ঢুকে পড়ে এবং তার পূর্বশ্রুত আয়না মহলে গিয়ে কিশোরী পরিচারিকাদের দেখতে পায়। তাদের মাঝে একজনকে তার ভালো লাগে। মেয়েটির নাম ডলি। রানি সুপেয়ালাতের বিশ্বস্ত চাকরানি ডলি শিশু রাজকন্যাদের দেখাশোনা করে। প্রথম দর্শনে প্রেম; রাজকুমার ডলিকে দেখে মজে যায়। পরের দিন রাজপরিবারের নির্বাসন-যাত্রার সময়ে রাজকুমার কিছু মিঠাই কিনে তাদের গমনপথে দাঁড়িয়ে থাকে এবং সুযোগ বুঝে ছুটে গিয়ে ডলিকে দিয়ে পালিয়ে যায়। বাল্যকালে এই প্রেম-নিবেদনের পর অনেক বছর ডলি সম্পর্কে আর কোনো খবরাখবর পায় না। তাছাড়া এ ঘটনাটি ডলির মনেও কোনো রেখাপাত করে না। মায়ানমারের রাজকুমার সয়া জনের সহযোগিতায় একজন ধনাঢ্য ব্যক্তিতে পরিণত হন। গোড়াতে ধারণা করা হয়েছিল যে উপন্যাসটি একটি প্রেমকাহিনীতে রূপ নেবে, কিন্তু মাঝপথে এসে ঘটনাগুলো বাঁক পরিবর্তন করে। ফুলের স্থান দখল করে অস্ত্র, অর্থাৎ তৎকালীন ভারত এবং মায়ানমারের ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক উত্থান-পতনের এবং দমন-পীড়নের ঘটনাবলি উপন্যাসে প্রাধান্য পেতে থাকে।

The Glass Palace উপন্যাসে ইংরেজদের মায়ানমার দখল, মায়ানমারের রাজকীয় সংস্কৃতির বিনাশ, মায়ানমার এবং ভারতের স্বাধীনতা-আন্দোলন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত ভারতীয়দের নাজুক অবস্থান, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ভারতীয় সেনা অফিসার-সিপাহীদের স্বপক্ষত্যাগ, মায়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থান, অং সাং সুকির উত্থান এবং তাঁর গৃৃহবন্দি হওয়া পর্যন্ত প্রায় একশ এগারো বছরের ঘটনাবলি স্থান পেয়েছে। উপন্যাসের শুরুর দিকে মায়ানমারের রাজপরিবার উচ্ছেদ এবং বাধ্যতামূলক নির্বাসনে পাঠানোর ঘটনাটি ভারতের শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের অন্তিম পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ব্রিটিশরা বাহাদুর শাহ জাফরকে মায়ানমারে নির্বাসিত করে আর মায়ানমারের রাজা থিবাউকে নির্বাসিত করে ভারতে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র মায়ানমারের স্বাধীনতা হরণ এবং রাজপরিবারকে দীর্ঘ (৩৪ বছর) নির্বাসনে রাখার মধ্য দিয়ে বর্মীদের মন থেকে রাজার স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। দীর্ঘ বাষট্টি বছর বিলাতিদের শোষণ এবং লুুণ্ঠনের পর ১৯৪৭ সালে মায়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু ততদিনে মায়ানমার নিঃস্ব, আর্থ-সামাজিক কাঠামো ভেঙে মিশমার হয়ে গেছে, জাতীয় নেতৃত্বে সৃষ্টি হয়েছে বিভেদ আর বৈষম্য। স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়। বিদ্রোহ, সামরিক অভ্যুত্থান, গণতন্ত্র হরণ, ছাত্র হত্যা ইত্যাদি তখন প্রাত্যহিক ঘটনায় পরিণত হতে থাকে। সামরিক বাহিনী গ্রাস করতে থাকে মায়ানমারের ধন-সম্পদ, ফলে সাধারণ মানুষ ক্রমশ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়।

উপন্যাস শুরু হয়েছে ১৮৮৫ সালের পটভূমিতে এবং শেষ হয়েছে ১৯৯৬ সালে যখন মায়ানমারের বিরোধীদলীয় নেত্রী অং সাং সুকি (ফটোগ্রাফার দিনুর সহপাঠী জেনারেল অং সাং-এর কন্যা) গৃহবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। আয়না মহলকে আদি থেকে অন্তে যেতে মোট তিনটি জেনারেশন পার হতে হয়েছে। রাজকুমারের কৈশোরের জীবন-সংগ্রাম দিয়ে উপন্যাসটি আরম্ভ হয়। সয়া জন নামে এক চিনেম্যানের সহযোগিতায় রাজকুমার কাঠের ব্যবসায় সাফল্য অর্জন করেন এবং প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হন। তার এই উত্থানের সুবর্ণ সময়ে তিনি আয়না মহলের সেই ডলির অম্বেষণে দক্ষিণ ভারতের রত্নগিরির আউটরাম হাউজে ছুটে আসেন। সেখানে ডলির দেখা মেলে। কালেক্টর বেনী প্রসাদ দের স্ত্রী উমার সহযোগিতায় তিনি ডলির সাথে যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম হন। বেনী প্রসাদ তার সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করেন, কেননা উমার মামা, যিনি মায়ানমারে অবস্থান করছেন, রাজকুমারের মাধ্যমে নানাভাবে উপকৃত হচ্ছেন। কিন্তু বাল্যকালের সেই ঘটনাটি ডলি অস্বীকার করে বসে যে-ঘটনাটি রাজকুমার দীর্ঘদিন লালন করেছে এবং তাকে আউটরাম হাউজে টেনে নিয়ে এসেছে। অনেক চেষ্টার পরে উমার সহযোগিতায় রাজকুমার ডলিকে বিবাহ করতে সক্ষম হন। পরবর্তীকালে এই উমার সাথে তাদের আত্মীয়তাও হয়, তাছাড়া জীবন-সায়াহ্নে উমা এবং রাজকুমার একই বাড়িতে অবস্থান করে। রাজকুমার-ডলির বিবাহের কিছুকাল পরেই উমা বিধবা হয়।

রাজকুমার-ডলির ঘরে দুসন্তান জন্মলাভ করে, নীলু আর দিনু। দিনু বাল্যকালে পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে পঙ্গু হয়ে যায়। নীলু ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করে এবং সে-উদ্দেশ্যে টাকা খাটাতে কলকাতায় গিয়ে উমার ভাতিজি মঞ্জুর প্রেমে পড়ে এবং তাদের বিয়ে হয়। দিনু ফটোগ্রাফির দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং মালয়ে গিয়ে সয়া জন এবং তার বাবার যৌথ উদ্যোগে গড়া রাবার প্লান্টের বাড়িতে বসবাস করতে থাকে। ততদিনে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। মঞ্জুর একটি কন্যা সন্তান হয়। মঞ্জু-নীলুর দাম্পত্য জীবন বেশি দিন স্থায়ী হয় না। যুদ্ধ কেড়ে নিয়ে যায় নীলুকে। জাপানিদের রেঙ্গুনে বোমাবর্ষণের সময়ে সে কাঠের গুড়ির নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ করে। যুদ্ধে রেঙ্গুন পুরোপুরি আক্রান্ত হলে ডলি, রাজকুমার, মঞ্জু এবং তার শিশু কন্যা জয়া দুর্গম পথে ভারতের উদ্দেশে পাড়ি জমায়। কিন্তু বিরূপ প্রকৃতির সাথে টিকে থাকার সংগ্রামে মঞ্জু হেরে যায় এবং একটি খরস্রোতা নদী পার হবার সময় ভেলা থেকে সে ভেসে যায়। রাজকুমার আমৃত্যু নাতনি জয়ার সাথে থাকেন এবং তাকে লালন- পালন করেন। ডলি মায়ানমার চলে যায় দিনুর সন্ধানে এবং তাকে খুঁজে বের করে। কিন্তু ডলিরও কোনো সন্ধান থাকে না মায়ানমারে যাবার পরে। রাজকুমারের নাতনি জয়ার বিয়ে হয় এক ডাক্তারের সাথে, তাদের একটি সন্তান জন্মলাভের পর একদিন ট্রেন দুর্ঘটনায় জয়ার স্বামী মৃত্যুবরণ করলে তাকেও তার ফুপু উমার মতো জীবন-সংগ্রামে নামতে হয়। জয়া আবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় এবং এম.এ পাশ করে কলেজে চাকরিতে যোগদান করে। চাকরির পাশাপাশি সে পিএইচডি-র জন্যে গবেষণা শুরু করে। ভারতে ফটোগ্রাফির ইতিহাস তার গবেষণার বিষয়। উমার রেখে যাওয়া কাগজপত্র ঘেঁটে সে মালয়ে বসবাসকারী ইলোঙ্গ নামে একজনের কথা জানতে পারে। ইলোঙ্গ হচ্ছে রাজকুমারের অবৈধ সন্তান অর্থাৎ জয়ার চাচা। তিনি মালয়েশিয়ার একজন প্রাক্তন মন্ত্রী, সমাজসেবামূলক কার্যক্রমের জন্যে সম্মানজনক দাতো উপাধিপ্রাপ্ত। ইলোঙ্গ রাজকুমার এবং সয়া জনের গড়া মর্নিংসাইড রাবার প্লান্টের বর্তমান পরিচালক। খামারটি এখন সমবায়ে রূপ নিয়েছে। জয়া ইন্টারনেট ঘেঁটে ইলোঙ্গর নাম জানতে পারে এবং তাকে মেইল করে। প্রত্যুত্তরে ইলোঙ্গ জয়াকে মালয়ে আসার জন্যে বিমান টিকেট পাঠিয়ে দেয়। শুরু হয় জয়ার চাচা ফটোগ্রাফার দিনুকে অনুসন্ধান পর্ব। জয়া ইলোঙ্গর কাছ থেকে তথ্য নিয়ে দিনুকে খুঁজতে মায়ানমারের রেঙ্গুনে চলে যায়। বহু খোঁজাখুঁজির পর সেখানে ঞযব এষধংং চধষধপব স্টুডিওর সন্ধান পায় জয়া। দিনু মূলত রেঙ্গুনে নজরবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। দিনুকে অনুসন্ধানের ভেতর দিয়ে মায়ানমারে সামরিক শাসনের তৎকালীন (১৯৯৬ খ্রি.) প্রেক্ষাপট উন্মোচিত হয়।

যুদ্ধ কীভাবে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে, দুর্ভোগ টেনে আনে – রাজকুমারের পরিবারই তার প্রমাণ। এক সময়ের ধনাঢ্য রাজকুমার যুদ্ধের কারণে সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। তার পরিবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। সয়া জনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। সয়া জন মালয়ে থিতু হয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের সময় পালাতে গিয়ে তিনি এবং তার নাতনি অ্যালিসন মারা যান। দিনু পালিয়ে বেড়াতে থাকে।

আয়না মহল উপন্যাসে আরেকটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে; ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীতে নিয়োগপ্রাপ্ত ভারতীয়দের রাজনৈতিক টানাপোড়েন। অর্জুন (মঞ্জুর ভাই) চরিত্রচিত্রণের মাধ্যমে অমিতাভ ঘোষ ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ভারতীয়দের কোণঠাসা অবস্থান এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তাদের স্বপক্ষত্যাগের ঘটনাগুলো উল্লেখ করেছেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে সচেতন ভারতীয় সৈনিক-অফিসাররা মোহন সিংহের নেতৃত্বে আজাদ হিন্দু ফৌজে যোগদান করে এবং যুদ্ধ থেকে বিরত থাকে। অর্জুন মালয়ে সহযোগীদের সাথে স্বপক্ষ ত্যাগ করে। কিন্তু যুদ্ধ-পরিস্থিতি মিত্র বাহিনীর পক্ষে মোড় নিলে এবং নেতাজী সুভাষ বসুর পরিকল্পনা ভেস্তে গেলে এসব ত্যাগী দেশপ্রমিক সৈন্য বিপদের মুখে পড়ে। অর্জুন যখন দলত্যাগ করেছিল তখন তার সাথে পেশাদার সৈনিক-অফিসার যারা ছিল তারা ক্রমান্বয়ে দলছুট হতে থাকে। ক্ষুধা, ক্লান্তি, অপুুষ্টিতে ভুগে অর্জুনরা ক্রমশ দুর্বল হয়ে যায়। তাছাড়া তাদের আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ অত্যন্ত সেকেলে হবার দরুন যুদ্ধে তারা খুব কমই বিজয় অর্জন করতে পারে। পরিস্থিতি এতটাই বিরূপ আকার ধারণ করে যে অর্জুনকে নিজের হাতে তার ব্যাটম্যান কিষান সিংকে হত্যা করতে হয়, যদিও এ ব্যাপারে তার মতদ্বৈধ ছিল। শেষ পর্যায়ে এসে অর্জুনকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হলেও অর্জুন তা প্রত্যাখ্যান করে; পরিণামে তাকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে ফেলা হয়।

আয়না মহল উপন্যাসে ফটোগ্রাফি বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। ক্যামেরার ব্র্যান্ড, ফ্লাসগান, ট্রাইপড ইত্যাদির উল্লেখে ধারণা করা যায় অমিতাভ ঘোষ আলোকচিত্র বিষয়ে যথেষ্ট আগ্রহী। রাজকুমার-ডলির বিবাহের সময় পারসি ফটোগ্রাফার মিসেস খামবাটার ছবি তোলা, দিনুর ফটোগ্রাফিচর্চা, জয়ার আগ্রহ, মুম্বাইয়ে আলোকচিত্র-প্রদর্শনী, ডলি-রাজকুমারের বিয়ের ছবিটি ঠরংঁধষ অহঃযৎড়ঢ়ড়ষড়মু’র দৃষ্টিকোণে বিশ্লেষণ, জয়ার পিএইচডি-র থিসিস ইত্যাদি থেকে আলোকচিত্র-বিষয়ে লেখকের ঔৎসুক্য প্রমাণিত হয়। দিনুর চরিত্র-বিশ্লেষণে এটা ধারণা করা যেতে পারে যে লেখক এ চরিত্র-সৃষ্টিতে ভারতে ব্রিটিশ আমলের বিখ্যাত ফটোগ্রাফার লালা দীন দয়ালকে মাথায় রেখেছিলেন। লালা দীন দয়াল ১৮৭৪ সাল থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত ফটোগ্রাফিতে সক্রিয় ছিলেন। হায়দ্রাবাদ এবং মুম্বাইতে তার স্টুডিও ছিল। ভারতে ফটোগ্রাফির চর্চা শুরু হয় ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে।

আয়না মহল ভারত এবং মায়ানমারের জনগণের ওপর ব্রিটিশ শাসনের নেতিবাচক দিকগুলোকে তুলে ধরেছে। অপশাসনের কুফল যে একটা সমাজ-ব্যবস্থাকে কতখানি ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে বর্তমান মায়ানমার তার জাজ্বল্যমান  দৃষ্টান্ত। দীর্ঘ বাষট্টি বছরের শোষণ ও লুণ্ঠনের ক্ষত আজও দেশটি বয়ে বেড়াচ্ছে। অন্যদিকে ভারতের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার বিভেদ সৃষ্টি করে ব্রিটিশরা যে চিরস্থায়ী সংকট তৈরি করেছে তার অবসান ঘটার কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

আয়না মহল উপন্যাসে মায়ানমারের রাজপরিবারের করুণ পরিণতি বর্ণনার সাথে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই সময় এবং খুশবন্ত সিংয়ের দিল্লী উপন্যাসে ভারতের শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের শেষ পরিণতি-বর্ণনার সামঞ্জস্য রয়েছে। অর্থাৎ সুনীল এবং খুশবন্ত ভারতের ইতিহাসের ভিত্তিতে যে-কাজটি করেছেন অমিতাভ ঘোষ মায়ানমারের ইতিহাসের ভিত্তিতে ঠিক সে-কাজটিই করেছেন। দুদেশের রাজপরিবারকে একই পরিণতি বরণ করতে হয়েছিল :

‘আমার পালকি সমাধির গেটের বাইরে আনা হলো। সেখানে আমার গ্রেফতারকারীরা অপেক্ষমাণ। … পারস্যের বিজয়ী বীর নাদির শাহ কর্তৃক আমার পূর্বপুরুষকে উপহার হিসেবে দেওয়া বিখ্যাত তরবারি ‘জুলফিকার’ হডসনের হাতে তুলে দিলাম। আমার পুত্র তার তরবারি সমর্পণ করলো। হডসন সাহেব আমাদের পালকিতে উঠার নির্দেশ দিলো। আমরা ফিরিঙ্গিদের হাতে বন্দি হলাম।’

‘অতীতে আমরা যখনই কেল্লায় প্রবেশ করেছি আমাদের আগমনবার্তা ঘোষণার জন্যে তোপধ্বনি করা হতো এবং ‘নহবত’ খানায় বাদ্য বাজানো হতো। এবার আমার নাম বিকৃতভাবে উচ্চারিত হলো, বাহাদুর শা।… ভূগর্ভস্থ কক্ষে আমাদের স্থান হলো,…।’ (দিল্লী, খুশবন্ত সিং, অনুবাদ : আনোয়ার হোসাইন মঞ্জু, পৃঃ ২০০,২০১)

অমিতাভ ঘোষ খুশবন্ত সিংয়ের মতো মায়ানমারের রাজপরিবারের প্রাসাদত্যাগের একই বর্ণনা দিয়েছেন :

‘পুবের ফটকে দুটো বাহন অপেক্ষা করছিল। সেগুলো বলদে-টানা গাড়ি, জেথা, মান্দালয়ের রাস্তার অত্যন্ত প্রচলিত বাহন। সামনের গাড়িতে একটা রঙিন আনুষ্ঠানিক শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। রাজা যখন গাড়িতে উঠবেন, তখন লক্ষ করলেন, তাঁর শামিয়ানায় নয়টি নয় সাতটি তাজ, পণ্ডিত ব্যক্তিদের জন্যে যে-সংখ্যাটি বরাদ্দ, রাজার জন্যে থাকে নয়টি।’ (হোসেন আলমগীর)

দক্ষিণ ভারতের রত্মগিরির আউটরাম হাউজে মায়ানমারের রাজপরিবারের ঠাঁই হয়। তাদের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। রাজা ছিলেন মূলত গৃহবন্দি, রানি এবং রাজকন্যারা বাইরে বেরুতে পারলেও চলাচলে যথেষ্ট কড়াকড়ি ছিল। রাজকন্যারা তাই সঙ্গী হিসেবে পেয়েছে তাদের বাড়িতে নিযুক্ত কর্মচারীদের। এই রাজপরিবারকে যে কতটা পরাধীনতা বরণ করতে হয়েছে তার প্রমাণ মিলবে ব্রিটিশদের নিয়োগকৃত কালেক্টর এবং রানি সুপেয়ালাতের কথোপকথনে। এক রাজকন্যা কোচয়ানের সাথে অবৈধ সম্পর্কে গর্ভবতী হয়ে পড়ে, রানি সেটি জানতে পেরে মেনে নেন এবং ব্যাপারটি ব্রিটিশ সরকারকে অবহিত করে রাষ্ট্রীয়ভাবে ভাবী-আগন্তুকের খবরটির ঘোষণা দিতে বলেন। কালেক্টর ঘটনাটি শুনে এবং রানির স্বাভাবিক আচরণে হতভম্ব হয়ে পড়েন :

‘রাজকন্যার বিবাহের জন্য আমি কোনো লাইসেন্স ইস্যু করিনি, অতএব সে আইনত বিবাহিত হতে পারে না।’ তার উত্তরে রানি তাকে জানান, ‘আমি অবাক হচ্ছি যে আপনার কোনো গুপ্তচর এটা বলার কথা ভাবেনি যে সন্তান লাইসেন্স ছাড়াও জন্ম নিতে পারে।’

‘তার মানে আপনি বলছেন শিশুটা…’

‘হ্যাঁ, আপনাদের আইনে, শিশুটা হবে জারজ।’

ব্রিটিশ রাজের সূক্ষ্ম পরিকল্পনা ছিল বর্মীদের মন থেকে রাজপরিবারের স্মৃতি সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলা। রাজা থিবাউ একত্রিশ বছর গৃহবন্দি থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। নির্বাসনে থাকাকালে তাঁর জীবন চালাতে হয়েছে মূল্যবান রত্নসামগ্রী বিক্রি করে। অবশ্য তাঁর রত্নভাণ্ডারের অধিকাংশই ব্রিটিশরা নির্বাসন-যাত্রার সময় মেরে দিয়েছিল। শেষ দিনগুলোতে এই রাজপরিবারকে মারাত্মক অর্থসংকটে পড়তে হয়েছিল। তাদের রাজকীয় ঐতিহ্য, সৌজন্য বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। পরিবারটি ক্রমশ অতলে তলিয়ে যায়। এক রাজকন্যা কোচয়ানের সাথে প্রেমে অন্তঃসত্ত্বা হয় এবং তাকে বিবাহ করে। দ্বিতীয় রাজকন্যা আরেকজনের সাথে পালিয়ে যায়। রাজা তাকে ফিরিয়ে আনার জন্যে গাড়ি পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু ফিরে আসেনি জেনে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। রানি সুপেয়ালাত রেঙ্গুনে ফিরে যান (১৯১৯ খ্রি.) এবং সেখানে নিঃসঙ্গ অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে (১৯২৫ খ্রি.)। একটি রাজপরিবার এভাবেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

সমগ্র উপন্যাসে রাজা থিবাউয়ের উপস্থিতি সামান্য। অমিতাভ ঘোষের পরিমিত উপস্থাপনে এ চরিত্রটি পাঠকের সহানুভূতি অর্জনে সক্ষম হয়েছে। রত্মগিরিবাসী তাকে যথাযথ সম্মান জানাতে ভুল করেনি। নির্বাসনে থাকাকালে থিবাউর একমাত্র সঙ্গী ছিল একটি বায়নোকুলার। এ যন্ত্রটি দিয়ে তিনি সমুদ্র পর্যবেক্ষণ করতেন এবং দূরগামী, দূরাগত নৌযান সম্পর্কে আগে-ভাগেই জেনে যেতেন। এটি রত্নগিরির সাধারণ মানুষের খুবই কাজে লেগেছে। এই পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বৃষ্টির আগাম সংবাদ তিনি দিয়ে দিতে পারতেন এবং রাজার এই সংবাদের ভিত্তিতে রত্নগিরিবাসী নৌকা এবং অন্যান্য জলযান চালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতো। রত্নগিরিবাসী নিজেদের অজান্তেই থিবাউকে তাদের রাজা হিসেবে মেনে নিয়েছিল।

রানি সুপেয়ালাতের চরিত্র রাজার ঠিক উলটো; কাঠিন্য এবং নিষ্ঠুরতায় পরিপূর্ণ। রানির প্রতি পাঠকের কোনো সহানুভূতি তৈরি হয় না যখন জানা যায় যে তার এক নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তে মায়ানমারের রাজপরিবারের উনআশি জন রাজকুমারকে হত্যা করা হয় যাদের ভেতরে নবজাতক এবং শিশুও ছিল। এ যেন মায়ানমারের লেডি ম্যাকবেথ। থিবাউয়ের সিংহাসন নিষ্কণ্টক করার জন্যে তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে মায়ানমারের স্বাধীনতা-আন্দোলনের সময় কোনো রাজকুমারকে পাওয়া যাচ্ছিল না সিংহাসনে বসানোর জন্য। রানির মূর্খতা এবং জেদের ফলেই মায়ানমারকে ব্রিটিশদের সঙ্গে যুদ্ধে নামতে হয়েছিল। অথচ একটু কৌশলী হলে সংঘাত এড়িয়ে একটা সমঝোতায় আসা যেত। তবে রাজা থিবাউ যে রানি সুপেয়ালাতের লাটাইয়ের ঘুড়ি ছিলেন সে-বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। সম্ভবত গভীর ভালোবাসাই এর মূল কারণ।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সেই সময় উপন্যাসটির মাধ্যমে অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতকের ভারতীয় সমাজ-বিবর্তনের ইতিহাসকে যেমন তুলে ধরেছেন ঠিক তেমনিভাবে অমিতাভ তাঁর আয়না মহল উপন্যাসের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক মায়ানমারের সামাজিক উত্থান-পতনের ইতিহাসকে তুলে ধরেছেন। মায়ানমারের সূত্র ধরে ভারতের রাজনৈতিক-সংগ্রামের ঘটনাগুলোও এখানে স্থান পেয়েছে। মায়ানমারে নির্বাসিত ভারতের শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধিগাত্রের এপিটাফে লেখা আছে ‘কিতনা বদনসিব জাফর দাফন কি লিয়ে, দো গজ জমিন ভি মিল না সাকে কুত্তয়ে ইয়ারমে।’ অর্থাৎ ‘জাফর তুমি এতই দুর্ভাগা যে দাফনের জন্য নিজের প্রিয় জন্মভূমিতে দুই গজ মাটিও মিললো না।’ রাজা থিবাউয়ের ভাগ্যেও একই পরিণতি ঘটেছে। মৃত্যুর পর (১৯১৬ খ্রি.) তাকে তড়িঘড়ি করে রত্নগিরিতেই সমাধিস্থ করা হয়।

২০০০ সালে আয়না মহল উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। ২০০১ সালের মার্চ মাসে বইটি ঊঁৎধংরধ ৎবমরড়হধষ রিহহবৎ ভড়ৎ ঃযব ২০০১ ঈড়সসড়হবিধষঃয ডৎরঃবৎং পুরস্কার লাভ করে। ব্যাপারটি অমিতাভের অগোচরে ঘটেছে। কারণ বইটি জমা দেওয়া হয়েছিল প্রকাশকের পক্ষ থেকে। ইউরোপে প্রকাশকরা পুরস্কারের লোভে লেখকদের বই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে থাকেন। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে বইয়ের কাটতি বাড়ানো। কোনো একটা পুরস্কারলাভের অর্থ হচ্ছে বইয়ের বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়া। অমিতাভ ঘোষের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। তিনি যখন জানতে পারলেন যে তাঁর বইটি উপরেভল্লখিত পুরস্কারলাভের পাশাপাশি এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিতব্য ২০০১ সালের ‘শ্রেষ্ঠ বই’ পুরস্কারের চূড়ান্ত তালিকায় অপেক্ষমাণ, তখনই তিনি কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশনকে চিঠি দিয়ে উপন্যাসটি প্রত্যাহার করে নেন (মার্চ ২০, ২০০১)। সিদ্ধান্তের স্বপক্ষে তাঁর অন্যতম যুক্তি হচ্ছে, তিনি কোনো লেখাকেই, তাঁর লেখা তো বটেই, কমনওয়েলথ সাহিত্য-অভিধায় চিহ্নিত করতে নারাজ। এতে করে সাম্প্রতিক লেখাগুলোর সেই সীমানা চিহ্নিত হয়ে যায় যে সীমার ভেতরে বর্তমান বাস্তবতাও নেই, ভবিষ্যতের সম্ভাবনাগুলোও নেই, আছে কেবল অতীতের কিছু বিতর্কিত বিষয়ের উপস্থাপনমাত্র এবং এই অতীতকে যে তার নিষ্ঠুর ঘটনাবলি দ্বারাই স্মরণ করতে হবে ব্যাপারটা আদ্যন্ত সেরকম নয়, এটি উন্মুক্ত। যে কেউ তার ইচ্ছে অনুযায়ী অতীতকে বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারে, অমিতাভ যেমন করেছেন। তাঁর মতে, ‘কমনওয়েলথ লেখক’ কিংবা ‘কমনওয়েলথ সাহিত্য’ ধারণাটি মেনে নিয়ে অতীতের সাম্রাজ্যবাদকে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিতে স্মরণ করলে তাঁর উপন্যাস-সত্তার প্রতি অবিচার করা হবে :

…I feel that I would be betraying the spirit of my book if I were to allwo it to be incorporated within that particular memoriali“ation of Empire that passes under the rubric of the Commonwealth.

উপরন্তু তিনি আরো যেসব যুক্তি তুলে ধরেছেন সেগুলো হচ্ছে যেমন : ‘কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন’ কমনওয়েলথ আওতাভুক্ত রাষ্ট্রের ওই লেখকদের পুরস্কার দিয়ে থাকে যাঁদের লেখার মাধ্যম ইংরেজি। এটি তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, কেননা একমাত্র ইংরেজি ভাষাকে স্বীকৃতি প্রদানের মধ্য দিয়ে কমনওয়েলথভুক্ত দেশের অন্যান্য ভাষা এবং সংস্কৃতিকে অবহেলা করা হচ্ছে। আয়না মহল উপন্যাসটি কেন পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলো তার দুটি কারণ লেখক নিজেই উল্লেখ করেছেন। একটি হচ্ছে ইংরেজি ভাষা, অন্যটি হচ্ছে তিনি যে-দেশের (ভারত) নাগরিক সে-দেশটি এক সময়ে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের কলোনি ছিল। অর্থাৎ তিনি যদি উপন্যাসটি বাংলা, তামিল, কিংবা হিন্দিতে লিখতেন তাহলে তা পুরস্কারের জন্যে মনোনীত হতো না। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে আসলে ‘কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন’ ইংরেজি ভাষাকে উৎসাহিত করছে। অমিতাভ ঘোষ সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এই পুরস্কার প্রদানকারী সংস্থা কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন কীভাবে পুরস্কার দেবে এবং লেখালেখির ভাষা কী হবে ইত্যাদি ব্যাপারে কমনওয়েলথ রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতে কোনো ‘রূপরেখা’ তৈরি হয়নি। যে-কোনো ধরনের সাহিত্য-পুরস্কার প্রসঙ্গে অমিতাভের মতামত হচ্ছে, পুরস্কার অবশ্যই সাহিত্যকে যথাযথ মূল্যায়ন করবে, সাহিত্য-চর্চায় উৎসাহ যোগাবে। বর্তমান কিংবা অতীতের বিশেষ কোনো মূল্যবোধকে বাহবা দেবে না, কোনো Literary বলয় তৈরি করবে না- কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন যা করে আসছে।

‘কমনওয়েলথ সাহিত্য’ ধারণাটি নিয়ে ইতিপূর্বেও প্রশ্ন উঠেছিল। ১৯৮৩ সালে সালমান রুশদী তাঁর একটি প্রবন্ধে (Commowealth Literature Does Not Exist) প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেছিলেন। তাঁর কাছেও ‘কমনওয়েলথ সাহিত্য’ অভিধাটি act of segregation মনে হয়েছে। রুশদীর মতে, কমনওয়েলথ সাহিত্যের অবস্থান Proper ইংরেজি সাহিত্যের নিচে। তিনি তাঁর লেখায় কমনওয়েলথ রাষ্ট্রসমূহের বহুমাত্রিক সংস্কৃতি, বহুভাষার প্রসঙ্গটি তুলেছিলেন। সালমান রুশদী লেখালেখিতে যে-বিতর্কটি উসকে দিয়েছিলেন অমিতাভ ঘোষ পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে তার পূর্ণতা আনলেন। এটি ব্রিটিশ রাজের প্রতি নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের প্রত্যাঘাত। অমিতাভ ঘোষের সিদ্ধান্তটি আন্তর্জাতিক সাহিত্যাঙ্গনকে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছে এবং ভারতীয় তরুণ সাহিত্যিকদের ইংরেজি সাহিত্য- চর্চায় ভারতের অর্জিত শক্তিশালী অবস্থান উপলব্ধিতে সহায়তা করেছে। অন্যদিকে আবার ইতিপূর্বে কমনওয়েলথ পুরস্কারপ্রাপ্ত ভারতীয় সাহিত্যিকদের; রোহিনতন মিস্ত্রী (১৯৯২, ১৯৯৬), বিক্রম শেঠ (১৯৯৪), বিক্রমচন্দ্র, গীতা হরিহরণদের, একটু অস্বস্তিতেও ফেলে দিয়েছে ।

ভারতের মতো প্রাক্তন ব্রিটিশ কলোনির অন্যান্য রাষ্ট্রের সচেতন সাহিত্যিকরা আজকাল ব্রিটেনের পেতে রাখা বিভিন্ন ধরনের পুরস্কার এবং সুযোগ-সুবিধার পরিখাগুলো সহজেই অতিক্রম করে যেতে পারছেন। সম্প্রতি জ্যামাইকান বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ কবি বেঞ্জামিন জেফানিয়া ব্রিটেনের রানি কর্তৃক তাকে Order of the British Empire (OBE) প্রদানের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনিও এ ধরনের সম্মান প্রদানের মাঝে রাজনীতি, লেখক ক্রয়-বিক্রয় এবং তাদেরকে নিষ্ক্রিয় করার অসৎ উদ্দেশ্যের আভাস পেয়েছেন। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব, বিশেষ করে ইংল্যান্ড তার অতীতকে, অতীতের সেই কর্তৃত্বকে, পুনঃস্মরণ করতে চায় আমাদের ওহাড়ষঁহঃধৎু সংস্থাগুলোর পিঠ চাপড়ে দিয়ে। সে-কারণে অমিতাভ ঘোষ প্রশ্ন তুলেছেন- যখন কোনো রাজনৈতিক সংগঠন, তামাক কোম্পানি, কোনো সাহিত্য-পুরস্কার প্রদান করতে চাইবে তখন সেটা নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন আছে। পুরস্কারদাতারা যদি লেখক-যাচাইয়ের অধিকার রাখে তাহলে তাদের জানা উচিত, লেখকদেরও পুরস্কার যাচাইয়ের অধিকার রয়েছে। ৎসহযোগিতায় রাজকুমার ডলিকে বিবাহ করতে সক্ষম হন। পরবর্তীকালে এই উমার সাথে তাদের আত্মীয়তাও হয়, তাছাড়া জীবন-সায়াহ্নে উমা এবং রাজকুমার একই বাড়িতে অবস্থান করে। রাজকুমার-ডলির বিবাহের কিছুকাল পরেই উমা বিধবা হয়।

রাজকুমার-ডলির ঘরে দুসন্তান জন্মলাভ করে, নীলু আর দিনু। দিনু বাল্যকালে পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে পঙ্গু হয়ে যায়। নীলু ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করে এবং সে-উদ্দেশ্যে টাকা খাটাতে কলকাতায় গিয়ে উমার ভাতিজি মঞ্জুর প্রেমে পড়ে এবং তাদের বিয়ে হয়। দিনু ফটোগ্রাফির দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং মালয়ে গিয়ে সয়া জন এবং তার বাবার যৌথ উদ্যোগে গড়া রাবার প্লান্টের বাড়িতে বসবাস করতে থাকে। ততদিনে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। মঞ্জুর একটি কন্যা সন্তান হয়। মঞ্জু-নীলুর দাম্পত্য জীবন বেশি দিন স্থায়ী হয় না। যুদ্ধ কেড়ে নিয়ে যায় নীলুকে। জাপানিদের রেঙ্গুনে বোমাবর্ষণের সময়ে সে কাঠের গুড়ির নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ করে। যুদ্ধে রেঙ্গুন পুরোপুরি আক্রান্ত হলে ডলি, রাজকুমার, মঞ্জু এবং তার শিশু কন্যা জয়া দুর্গম পথে ভারতের উদ্দেশে পাড়ি জমায়। কিন্তু বিরূপ প্রকৃতির সাথে টিকে থাকার সংগ্রামে মঞ্জু হেরে যায় এবং একটি খরস্রোতা নদী পার হবার সময় ভেলা থেকে সে ভেসে যায়। রাজকুমার আমৃত্যু নাতনি জয়ার সাথে থাকেন এবং তাকে লালন- পালন করেন। ডলি মায়ানমার চলে যায় দিনুর সন্ধানে এবং তাকে খুঁজে বের করে। কিন্তু ডলিরও কোনো সন্ধান থাকে না মায়ানমারে যাবার পরে। রাজকুমারের নাতনি জয়ার বিয়ে হয় এক ডাক্তারের সাথে, তাদের একটি সন্তান জন্মলাভের পর একদিন ট্রেন দুর্ঘটনায় জয়ার স্বামী মৃত্যুবরণ করলে তাকেও তার ফুপু উমার মতো জীবন-সংগ্রামে নামতে হয়। জয়া আবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় এবং এম.এ পাশ করে কলেজে চাকরিতে যোগদান করে। চাকরির পাশাপাশি সে পিএইচডি-র জন্যে গবেষণা শুরু করে। ভারতে ফটোগ্রাফির ইতিহাস তার গবেষণার বিষয়। উমার রেখে যাওয়া কাগজপত্র ঘেঁটে সে মালয়ে বসবাসকারী ইলোঙ্গ নামে একজনের কথা জানতে পারে। ইলোঙ্গ হচ্ছে রাজকুমারের অবৈধ সন্তান অর্থাৎ জয়ার চাচা। তিনি মালয়েশিয়ার একজন প্রাক্তন মন্ত্রী, সমাজসেবামূলক কার্যক্রমের জন্যে সম্মানজনক দাতো উপাধিপ্রাপ্ত। ইলোঙ্গ রাজকুমার এবং সয়া জনের গড়া মর্নিংসাইড রাবার প্লান্টের বর্তমান পরিচালক। খামারটি এখন সমবায়ে রূপ নিয়েছে। জয়া ইন্টারনেট ঘেঁটে ইলোঙ্গর নাম জানতে পারে এবং তাকে মেইল করে। প্রত্যুত্তরে ইলোঙ্গ জয়াকে মালয়ে আসার জন্যে বিমান টিকেট পাঠিয়ে দেয়। শুরু হয় জয়ার চাচা ফটোগ্রাফার দিনুকে অনুসন্ধান পর্ব। জয়া ইলোঙ্গর কাছ থেকে তথ্য নিয়ে দিনুকে খুঁজতে মায়ানমারের রেঙ্গুনে চলে যায়। বহু খোঁজাখুঁজির পর সেখানে The Glass Palace স্টুডিওর সন্ধান পায় জয়া। দিনু মূলত রেঙ্গুনে নজরবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। দিনুকে অনুসন্ধানের ভেতর দিয়ে মায়ানমারে সামরিক শাসনের তৎকালীন (১৯৯৬ খ্রি.) প্রেক্ষাপট উন্মোচিত হয়।

যুদ্ধ কীভাবে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে, দুর্ভোগ টেনে আনে – রাজকুমারের পরিবারই তার প্রমাণ। এক সময়ের ধনাঢ্য রাজকুমার যুদ্ধের কারণে সর্বস্বান্ত হয়ে যায়। তার পরিবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। সয়া জনের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। সয়া জন মালয়ে থিতু হয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের সময় পালাতে গিয়ে তিনি এবং তার নাতনি অ্যালিসন মারা যান। দিনু পালিয়ে বেড়াতে থাকে।

আয়না মহল উপন্যাসে আরেকটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে; ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনীতে নিয়োগপ্রাপ্ত ভারতীয়দের রাজনৈতিক টানাপোড়েন। অর্জুন (মঞ্জুর ভাই) চরিত্রচিত্রণের মাধ্যমে অমিতাভ ঘোষ ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ভারতীয়দের কোণঠাসা অবস্থান এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তাদের স্বপক্ষত্যাগের ঘটনাগুলো উল্লেখ করেছেন। যুদ্ধের এক পর্যায়ে সচেতন ভারতীয় সৈনিক-অফিসাররা মোহন সিংহের নেতৃত্বে আজাদ হিন্দু ফৌজে যোগদান করে এবং যুদ্ধ থেকে বিরত থাকে। অর্জুন মালয়ে সহযোগীদের সাথে স্বপক্ষ ত্যাগ করে। কিন্তু যুদ্ধ-পরিস্থিতি মিত্র বাহিনীর পক্ষে মোড় নিলে এবং নেতাজী সুভাষ বসুর পরিকল্পনা ভেস্তে গেলে এসব ত্যাগী দেশপ্রমিক সৈন্য বিপদের মুখে পড়ে। অর্জুন যখন দলত্যাগ করেছিল তখন তার সাথে পেশাদার সৈনিক-অফিসার যারা ছিল তারা ক্রমান্বয়ে দলছুট হতে থাকে। ক্ষুধা, ক্লান্তি, অপুুষ্টিতে ভুগে অর্জুনরা ক্রমশ দুর্বল হয়ে যায়। তাছাড়া তাদের আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ অত্যন্ত সেকেলে হবার দরুন যুদ্ধে তারা খুব কমই বিজয় অর্জন করতে পারে। পরিস্থিতি এতটাই বিরূপ আকার ধারণ করে যে অর্জুনকে নিজের হাতে তার ব্যাটম্যান কিষান সিংকে হত্যা করতে হয়, যদিও এ ব্যাপারে তার মতদ্বৈধ ছিল। শেষ পর্যায়ে এসে অর্জুনকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হলেও অর্জুন তা প্রত্যাখ্যান করে; পরিণামে তাকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে ফেলা হয়।

আয়না মহল উপন্যাসে ফটোগ্রাফি বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। ক্যামেরার ব্র্যান্ড, ফ্লাসগান, ট্রাইপড ইত্যাদির উল্লেখে ধারণা করা যায় অমিতাভ ঘোষ আলোকচিত্র বিষয়ে যথেষ্ট আগ্রহী। রাজকুমার-ডলির বিবাহের সময় পারসি ফটোগ্রাফার মিসেস খামবাটার ছবি তোলা, দিনুর ফটোগ্রাফিচর্চা, জয়ার আগ্রহ, মুম্বাইয়ে আলোকচিত্র-প্রদর্শনী, ডলি-রাজকুমারের বিয়ের ছবিটি Visual Anthropologyর দৃষ্টিকোণে বিশ্লেষণ, জয়ার পিএইচডি-র থিসিস ইত্যাদি থেকে আলোকচিত্র-বিষয়ে লেখকের ঔৎসুক্য প্রমাণিত হয়। দিনুর চরিত্র-বিশ্লেষণে এটা ধারণা করা যেতে পারে যে লেখক এ চরিত্র-সৃষ্টিতে ভারতে ব্রিটিশ আমলের বিখ্যাত ফটোগ্রাফার লালা দীন দয়ালকে মাথায় রেখেছিলেন। লালা দীন দয়াল ১৮৭৪ সাল থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত ফটোগ্রাফিতে সক্রিয় ছিলেন। হায়দ্রাবাদ এবং মুম্বাইতে তার স্টুডিও ছিল। ভারতে ফটোগ্রাফির চর্চা শুরু হয় ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে।

আয়না মহল ভারত এবং মায়ানমারের জনগণের ওপর ব্রিটিশ শাসনের নেতিবাচক দিকগুলোকে তুলে ধরেছে। অপশাসনের কুফল যে একটা সমাজ-ব্যবস্থাকে কতখানি ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে বর্তমান মায়ানমার তার জাজ্বল্যমান  দৃষ্টান্ত। দীর্ঘ বাষট্টি বছরের শোষণ ও লুণ্ঠনের ক্ষত আজও দেশটি বয়ে বেড়াচ্ছে। অন্যদিকে ভারতের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতার বিভেদ সৃষ্টি করে ব্রিটিশরা যে চিরস্থায়ী সংকট তৈরি করেছে তার অবসান ঘটার কোনো লক্ষণ আপাতত দেখা যাচ্ছে না।

আয়না মহল উপন্যাসে মায়ানমারের রাজপরিবারের করুণ পরিণতি বর্ণনার সাথে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই সময় এবং খুশবন্ত সিংয়ের দিল্লী উপন্যাসে ভারতের শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের শেষ পরিণতি-বর্ণনার সামঞ্জস্য রয়েছে। অর্থাৎ সুনীল এবং খুশবন্ত ভারতের ইতিহাসের ভিত্তিতে যে-কাজটি করেছেন অমিতাভ ঘোষ মায়ানমারের ইতিহাসের ভিত্তিতে ঠিক সে-কাজটিই করেছেন। দুদেশের রাজপরিবারকে একই পরিণতি বরণ করতে হয়েছিল :

‘আমার পালকি সমাধির গেটের বাইরে আনা হলো। সেখানে আমার গ্রেফতারকারীরা অপেক্ষমাণ। … পারস্যের বিজয়ী বীর নাদির শাহ কর্তৃক আমার পূর্বপুরুষকে উপহার হিসেবে দেওয়া বিখ্যাত তরবারি ‘জুলফিকার’ হডসনের হাতে তুলে দিলাম। আমার পুত্র তার তরবারি সমর্পণ করলো। হডসন সাহেব আমাদের পালকিতে উঠার নির্দেশ দিলো। আমরা ফিরিঙ্গিদের হাতে বন্দি হলাম।’

‘অতীতে আমরা যখনই কেল্লায় প্রবেশ করেছি আমাদের আগমনবার্তা ঘোষণার জন্যে তোপধ্বনি করা হতো এবং ‘নহবত’ খানায় বাদ্য বাজানো হতো। এবার আমার নাম বিকৃতভাবে উচ্চারিত হলো, বাহাদুর শা।… ভূগর্ভস্থ কক্ষে আমাদের স্থান হলো,…।’ (দিল্লী, খুশবন্ত সিং, অনুবাদ : আনোয়ার হোসাইন মঞ্জু, পৃঃ ২০০,২০১)

অমিতাভ ঘোষ খুশবন্ত সিংয়ের মতো মায়ানমারের রাজপরিবারের প্রাসাদত্যাগের একই বর্ণনা দিয়েছেন :

‘পুবের ফটকে দুটো বাহন অপেক্ষা করছিল। সেগুলো বলদে-টানা গাড়ি, জেথা, মান্দালয়ের রাস্তার অত্যন্ত প্রচলিত বাহন। সামনের গাড়িতে একটা রঙিন আনুষ্ঠানিক শামিয়ানা টাঙানো হয়েছে। রাজা যখন গাড়িতে উঠবেন, তখন লক্ষ করলেন, তাঁর শামিয়ানায় নয়টি নয় সাতটি তাজ, পণ্ডিত ব্যক্তিদের জন্যে যে-সংখ্যাটি বরাদ্দ, রাজার জন্যে থাকে নয়টি।’ (হোসেন আলমগীর)

দক্ষিণ ভারতের রত্মগিরির আউটরাম হাউজে মায়ানমারের রাজপরিবারের ঠাঁই হয়। তাদের চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। রাজা ছিলেন মূলত গৃহবন্দি, রানি এবং রাজকন্যারা বাইরে বেরুতে পারলেও চলাচলে যথেষ্ট কড়াকড়ি ছিল। রাজকন্যারা তাই সঙ্গী হিসেবে পেয়েছে তাদের বাড়িতে নিযুক্ত কর্মচারীদের। এই রাজপরিবারকে যে কতটা পরাধীনতা বরণ করতে হয়েছে তার প্রমাণ মিলবে ব্রিটিশদের নিয়োগকৃত কালেক্টর এবং রানি সুপেয়ালাতের কথোপকথনে। এক রাজকন্যা কোচয়ানের সাথে অবৈধ সম্পর্কে গর্ভবতী হয়ে পড়ে, রানি সেটি জানতে পেরে মেনে নেন এবং ব্যাপারটি ব্রিটিশ সরকারকে অবহিত করে রাষ্ট্রীয়ভাবে ভাবী-আগন্তুকের খবরটির ঘোষণা দিতে বলেন। কালেক্টর ঘটনাটি শুনে এবং রানির স্বাভাবিক আচরণে হতভম্ব হয়ে পড়েন :

‘রাজকন্যার বিবাহের জন্য আমি কোনো লাইসেন্স ইস্যু করিনি, অতএব সে আইনত বিবাহিত হতে পারে না।’ তার উত্তরে রানি তাকে জানান, ‘আমি অবাক হচ্ছি যে আপনার কোনো গুপ্তচর এটা বলার কথা ভাবেনি যে সন্তান লাইসেন্স ছাড়াও জন্ম নিতে পারে।’

‘তার মানে আপনি বলছেন শিশুটা…’

‘হ্যাঁ, আপনাদের আইনে, শিশুটা হবে জারজ।’

ব্রিটিশ রাজের সূক্ষ্ম পরিকল্পনা ছিল বর্মীদের মন থেকে রাজপরিবারের স্মৃতি সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলা। রাজা থিবাউ একত্রিশ বছর গৃহবন্দি থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। নির্বাসনে থাকাকালে তাঁর জীবন চালাতে হয়েছে মূল্যবান রত্নসামগ্রী বিক্রি করে। অবশ্য তাঁর রত্নভাণ্ডারের অধিকাংশই ব্রিটিশরা নির্বাসন-যাত্রার সময় মেরে দিয়েছিল। শেষ দিনগুলোতে এই রাজপরিবারকে মারাত্মক অর্থসংকটে পড়তে হয়েছিল। তাদের রাজকীয় ঐতিহ্য, সৌজন্য বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে। পরিবারটি ক্রমশ অতলে তলিয়ে যায়। এক রাজকন্যা কোচয়ানের সাথে প্রেমে অন্তঃসত্ত্বা হয় এবং তাকে বিবাহ করে। দ্বিতীয় রাজকন্যা আরেকজনের সাথে পালিয়ে যায়। রাজা তাকে ফিরিয়ে আনার জন্যে গাড়ি পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু ফিরে আসেনি জেনে হৃদক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। রানি সুপেয়ালাত রেঙ্গুনে ফিরে যান (১৯১৯ খ্রি.) এবং সেখানে নিঃসঙ্গ অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে (১৯২৫ খ্রি.)। একটি রাজপরিবার এভাবেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

সমগ্র উপন্যাসে রাজা থিবাউয়ের উপস্থিতি সামান্য। অমিতাভ ঘোষের পরিমিত উপস্থাপনে এ চরিত্রটি পাঠকের সহানুভূতি অর্জনে সক্ষম হয়েছে। রত্মগিরিবাসী তাকে যথাযথ সম্মান জানাতে ভুল করেনি। নির্বাসনে থাকাকালে থিবাউর একমাত্র সঙ্গী ছিল একটি বায়নোকুলার। এ যন্ত্রটি দিয়ে তিনি সমুদ্র পর্যবেক্ষণ করতেন এবং দূরগামী, দূরাগত নৌযান সম্পর্কে আগে-ভাগেই জেনে যেতেন। এটি রত্নগিরির সাধারণ মানুষের খুবই কাজে লেগেছে। এই পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বৃষ্টির আগাম সংবাদ তিনি দিয়ে দিতে পারতেন এবং রাজার এই সংবাদের ভিত্তিতে রত্নগিরিবাসী নৌকা এবং অন্যান্য জলযান চালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতো। রত্নগিরিবাসী নিজেদের অজান্তেই থিবাউকে তাদের রাজা হিসেবে মেনে নিয়েছিল।

রানি সুপেয়ালাতের চরিত্র রাজার ঠিক উলটো; কাঠিন্য এবং নিষ্ঠুরতায় পরিপূর্ণ। রানির প্রতি পাঠকের কোনো সহানুভূতি তৈরি হয় না যখন জানা যায় যে তার এক নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তে মায়ানমারের রাজপরিবারের উনআশি জন রাজকুমারকে হত্যা করা হয় যাদের ভেতরে নবজাতক এবং শিশুও ছিল। এ যেন মায়ানমারের লেডি ম্যাকবেথ। থিবাউয়ের সিংহাসন নিষ্কণ্টক করার জন্যে তিনি এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে মায়ানমারের স্বাধীনতা-আন্দোলনের সময় কোনো রাজকুমারকে পাওয়া যাচ্ছিল না সিংহাসনে বসানোর জন্য। রানির মূর্খতা এবং জেদের ফলেই মায়ানমারকে ব্রিটিশদের সঙ্গে যুদ্ধে নামতে হয়েছিল। অথচ একটু কৌশলী হলে সংঘাত এড়িয়ে একটা সমঝোতায় আসা যেত। তবে রাজা থিবাউ যে রানি সুপেয়ালাতের লাটাইয়ের ঘুড়ি ছিলেন সে-বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। সম্ভবত গভীর ভালোবাসাই এর মূল কারণ।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সেই সময় উপন্যাসটির মাধ্যমে অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতকের ভারতীয় সমাজ-বিবর্তনের ইতিহাসকে যেমন তুলে ধরেছেন ঠিক তেমনিভাবে অমিতাভ তাঁর আয়না মহল উপন্যাসের মাধ্যমে ঔপনিবেশিক মায়ানমারের সামাজিক উত্থান-পতনের ইতিহাসকে তুলে ধরেছেন। মায়ানমারের সূত্র ধরে ভারতের রাজনৈতিক-সংগ্রামের ঘটনাগুলোও এখানে স্থান পেয়েছে। মায়ানমারে নির্বাসিত ভারতের শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধিগাত্রের এপিটাফে লেখা আছে ‘কিতনা বদনসিব জাফর দাফন কি লিয়ে, দো গজ জমিন ভি মিল না সাকে কুত্তয়ে ইয়ারমে।’ অর্থাৎ ‘জাফর তুমি এতই দুর্ভাগা যে দাফনের জন্য নিজের প্রিয় জন্মভূমিতে দুই গজ মাটিও মিললো না।’ রাজা থিবাউয়ের ভাগ্যেও একই পরিণতি ঘটেছে। মৃত্যুর পর (১৯১৬ খ্রি.) তাকে তড়িঘড়ি করে রত্নগিরিতেই সমাধিস্থ করা হয়।

২০০০ সালে আয়না মহল উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়। ২০০১ সালের মার্চ মাসে বইটি Eurasia regional winner for the 2001 Commonwealth Writers পুরস্কার লাভ করে। ব্যাপারটি অমিতাভের অগোচরে ঘটেছে। কারণ বইটি জমা দেওয়া হয়েছিল প্রকাশকের পক্ষ থেকে। ইউরোপে প্রকাশকরা পুরস্কারের লোভে লেখকদের বই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে থাকেন। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে বইয়ের কাটতি বাড়ানো। কোনো একটা পুরস্কারলাভের অর্থ হচ্ছে বইয়ের বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়া। অমিতাভ ঘোষের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। তিনি যখন জানতে পারলেন যে তাঁর বইটি উপরেভল্লখিত পুরস্কারলাভের পাশাপাশি এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিতব্য ২০০১ সালের ‘শ্রেষ্ঠ বই’ পুরস্কারের চূড়ান্ত তালিকায় অপেক্ষমাণ, তখনই তিনি কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশনকে চিঠি দিয়ে উপন্যাসটি প্রত্যাহার করে নেন (মার্চ ২০, ২০০১)। সিদ্ধান্তের স্বপক্ষে তাঁর অন্যতম যুক্তি হচ্ছে, তিনি কোনো লেখাকেই, তাঁর লেখা তো বটেই, কমনওয়েলথ সাহিত্য-অভিধায় চিহ্নিত করতে নারাজ। এতে করে সাম্প্রতিক লেখাগুলোর সেই সীমানা চিহ্নিত হয়ে যায় যে সীমার ভেতরে বর্তমান বাস্তবতাও নেই, ভবিষ্যতের সম্ভাবনাগুলোও নেই, আছে কেবল অতীতের কিছু বিতর্কিত বিষয়ের উপস্থাপনমাত্র এবং এই অতীতকে যে তার নিষ্ঠুর ঘটনাবলি দ্বারাই স্মরণ করতে হবে ব্যাপারটা আদ্যন্ত সেরকম নয়, এটি উন্মুক্ত। যে কেউ তার ইচ্ছে অনুযায়ী অতীতকে বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারে, অমিতাভ যেমন করেছেন। তাঁর মতে, ‘কমনওয়েলথ লেখক’ কিংবা ‘কমনওয়েলথ সাহিত্য ধারণাটি মেনে নিয়ে অতীতের সাম্রাজ্যবাদকে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিতে স্মরণ করলে তাঁর উপন্যাস-সত্তার প্রতি অবিচার করা হবে :

…I feel that I would be betraying the spirit of my book if I were to allwo it to be incorporated within that particular memoriali“ation of Empire that passes under the rubric of Ôthe Commonwealth.

উপরন্তু তিনি আরো যেসব যুক্তি তুলে ধরেছেন সেগুলো হচ্ছে যেমন : ‘কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন’ কমনওয়েলথ আওতাভুক্ত রাষ্ট্রের ওই লেখকদের পুরস্কার দিয়ে থাকে যাঁদের লেখার মাধ্যম ইংরেজি। এটি তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, কেননা একমাত্র ইংরেজি ভাষাকে স্বীকৃতি প্রদানের মধ্য দিয়ে কমনওয়েলথভুক্ত দেশের অন্যান্য ভাষা এবং সংস্কৃতিকে অবহেলা করা হচ্ছে। আয়না মহল উপন্যাসটি কেন পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলো তার দুটি কারণ লেখক নিজেই উল্লেখ করেছেন। একটি হচ্ছে ইংরেজি ভাষা, অন্যটি হচ্ছে তিনি যে-দেশের (ভারত) নাগরিক সে-দেশটি এক সময়ে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশদের কলোনি ছিল। অর্থাৎ তিনি যদি উপন্যাসটি বাংলা, তামিল, কিংবা হিন্দিতে লিখতেন তাহলে তা পুরস্কারের জন্যে মনোনীত হতো না। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে আসলে ‘কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন’ ইংরেজি ভাষাকে উৎসাহিত করছে। অমিতাভ ঘোষ সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে এই পুরস্কার প্রদানকারী সংস্থা কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন কীভাবে পুরস্কার দেবে এবং লেখালেখির ভাষা কী হবে ইত্যাদি ব্যাপারে কমনওয়েলথ রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতে কোনো ‘রূপরেখা’ তৈরি হয়নি। যে-কোনো ধরনের সাহিত্য-পুরস্কার প্রসঙ্গে অমিতাভের মতামত হচ্ছে, পুরস্কার অবশ্যই সাহিত্যকে যথাযথ মূল্যায়ন করবে, সাহিত্য-চর্চায় উৎসাহ যোগাবে। বর্তমান কিংবা অতীতের বিশেষ কোনো মূল্যবোধকে বাহবা দেবে না, কোনো Literary বলয় তৈরি করবে না – কমনওয়েলথ ফাউন্ডেশন যা করে আসছে।

‘কমনওয়েলথ সাহিত্য’ ধারণাটি নিয়ে ইতিপূর্বেও প্রশ্ন উঠেছিল। ১৯৮৩ সালে সালমান রুশদী তাঁর একটি প্রবন্ধে (Commowealth Literature Does Not Exist) প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেছিলেন। তাঁর কাছেও ‘কমনওয়েলথ সাহিত্য’ অভিধাটি act of segregation মনে হয়েছে। রুশদীর মতে, কমনওয়েলথ সাহিত্যের অবস্থান Proper ইংরেজি সাহিত্যের নিচে। তিনি তাঁর লেখায় কমনওয়েলথ রাষ্ট্রসমূহের বহুমাত্রিক সংস্কৃতি, বহুভাষার প্রসঙ্গটি তুলেছিলেন। সালমান রুশদী লেখালেখিতে যে-বিতর্কটি উসকে দিয়েছিলেন অমিতাভ ঘোষ পুরস্কার প্রত্যাখ্যানের মধ্য দিয়ে তার পূর্ণতা আনলেন। এটি ব্রিটিশ রাজের প্রতি নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের প্রত্যাঘাত। অমিতাভ ঘোষের সিদ্ধান্তটি আন্তর্জাতিক সাহিত্যাঙ্গনকে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছে এবং ভারতীয় তরুণ সাহিত্যিকদের ইংরেজি সাহিত্য- চর্চায় ভারতের অর্জিত শক্তিশালী অবস্থান উপলব্ধিতে সহায়তা করেছে। অন্যদিকে আবার ইতিপূর্বে কমনওয়েলথ পুরস্কারপ্রাপ্ত ভারতীয় সাহিত্যিকদের; রোহিনতন মিস্ত্রী (১৯৯২, ১৯৯৬), বিক্রম শেঠ (১৯৯৪), বিক্রমচন্দ্র, গীতা হরিহরণদের, একটু অস্বস্তিতেও ফেলে দিয়েছে ।

ভারতের মতো প্রাক্তন ব্রিটিশ কলোনির অন্যান্য রাষ্ট্রের সচেতন সাহিত্যিকরা আজকাল ব্রিটেনের পেতে রাখা বিভিন্ন ধরনের পুরস্কার এবং সুযোগ-সুবিধার পরিখাগুলো সহজেই অতিক্রম করে যেতে পারছেন। সম্প্রতি জ্যামাইকান বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ কবি বেঞ্জামিন জেফানিয়া ব্রিটেনের রানি কর্তৃক তাকে Order of the British Empire (OBE) প্রদানের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনিও এ ধরনের সম্মান প্রদানের মাঝে রাজনীতি, লেখক ক্রয়-বিক্রয় এবং তাদেরকে নিষ্ক্রিয় করার অসৎ উদ্দেশ্যের আভাস পেয়েছেন। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব, বিশেষ করে ইংল্যান্ড তার অতীতকে, অতীতের সেই কর্তৃত্বকে, পুনঃস্মরণ করতে চায় আমাদের Involuntary সংস্থাগুলোর পিঠ চাপড়ে দিয়ে। সে-কারণে অমিতাভ ঘোষ প্রশ্ন তুলেছেন- যখন কোনো রাজনৈতিক সংগঠন, তামাক কোম্পানি, কোনো সাহিত্য-পুরস্কার প্রদান করতে চাইবে তখন সেটা নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন আছে। পুরস্কারদাতারা যদি লেখক-যাচাইয়ের অধিকার রাখে তাহলে তাদের জানা উচিত, লেখকদেরও পুরস্কার যাচাইয়ের অধিকার রয়েছে।