প্রায় প্রান্ত থেকে যারা কেন্দ্রে এসেছেন, সেই শ্রেণির শিল্পীদের একজন বাসকিয়া। আগন্তুকের মতো নয়, প্রান্তিক মানুষের অর্থপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে সৃজন করেছেন শিল্প। নিজের সঙ্গে প্রলাপের মতো অস্থির, তীক্ষ্ম কথপোকথন। আবার কখনো স্বপ্ন, নিঃসঙ্গতা, উচ্ছন্ন সময়ের সুখ-দুঃখ, সমাজের নষ্ট-সম্ভাবনা ইত্যাদি জটিল বিষয়গুলো চিত্রিত করেছেন প্রতীকী ব্যঞ্জনায়। তাতে জমাটি নির্মাণ ও কথন আছে। আছে নির্লিপ্ত নির্বাক, দার্শনিকসুলভ বিমগ্ন উদাসীনতার অন্তরালে আদ্যন্ত মানবিক এবং নৈতিক চেতনা। সমাজে তমসার কেন্দ্র থেকে তুলে আনা তাঁর বেদনা ও আনন্দের এই চিত্রণ শিল্পের এক মণিময় অভিজ্ঞান।
ইতালীয় ট্রান্সআভোর্গাডের বর্ণিক ক্লেমন্ড সানদ্রো চিয়া, বার্লিনের ফভ জুলিয়ান স্নেবালের মতো বাসকিয়া ছিলেন এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। রোসেনবার্গ, দোকুনিং প্রজন্মের পর বাসকিয়া, কেইথ হারিংসহ অন্য তরুণ শিল্পীরা নিউইর্য়ক স্কুলের পাতায় এক আলোকিত অধ্যায় সংযোজন করে গেছেন।
পুরো নাম জাঁ মিশেল বাসকিয়া। জন্ম নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে। ২২ ডিসেম্বর ১৯৬০। মা পুর্তরিকার, বাবা তাহিতির। মধ্যবিত্ত পরিবারের সচ্ছলতায় শৈশব কেটেছে ছোট দু-বোনসহ। শৈশবে মাত্র চার বছর বয়সেই টেলিভিশনে কার্টুন দেখে উৎসাহিত হয়ে ছবি আঁকা শুরু। অ্যাকাউন্টিং ফার্মে কাজ করতেন বাবা। ড্রইং কাগজ কিনে দিতেন সে ফার্ম থেকে। মা-র আগ্রহ ছিল ফ্যাশন ডিজাইন আর স্কেচে। ফলে প্রায়ই আঁকতেন ছেলের সঙ্গে। আর ছেলেকে নিয়ে যেতেন বিভিন্ন মিউজিয়ামে – এগুলোর মধ্যে ছিল ব্রুকলিন, মডার্ন আর্ট, মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম ইত্যাদি। মূলত মা-ই শিল্পচর্চায় তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছেন এবং শিক্ষার ব্যাপারেও উৎসাহিত করতেন। ’৬৭ সালে মা-বাবার বিচ্ছেদ হলে দু-বোনসহ বাসকিয়া বাবার সঙ্গে চলে আসেন। তাঁকে ভর্তি করা হয় প্রাইভেট ক্যাথলিক স্কুলে। এ সময়েই এক সহপাঠীর সঙ্গে রচনা করেন শিশুতোষ বই – নিজের লেখার সচিত্রকরণসহ।
এই বয়সে তাঁর আঁকার বিষয় ছিল গাড়ি, আলফ্রেড হিচককের চলচ্চিত্রের চরিত্র আর কমিকস বইয়ের কার্টুন। খেলাধুলার পাশাপাশি আগ্রহ জন্মেছিল ইংরেজি, স্প্যানিশ ও ফরাসি সাহিত্য পড়ার। সাত বছর বয়সে রাস্তায় বল খেলার সময় গাড়ির আঘাতে মারাত্মক আহত হয়ে হাসপাতালে কাটাতে হয় মাসখানেক। শয্যাশায়ী ছেলেকে মা কিনে দেন বিখ্যাত বই – গ্রে’জ অ্যানাটমি (এৎধু’ং অহধঃড়সু)। চিকিৎসাশাস্ত্রের ছাত্রদের জন্যে এই বইটির চিত্রসমূহ ছিল সম্পদ। পরবর্তী জীবনে তাঁর সৃজনের অলিপথে, অন্বেষণের বাতিঘর ছিল বইটি।
’৭১ সালে প্রাইভেট স্কুল ছেড়ে পাঠানো হয় পাবলিক স্কুলে। বছর তিনেক পর বাবার কর্মসূত্রে যেতে হয় পুর্তরিকায়। চৌদ্দ বছর বয়সটা নানা ধরনের বিপত্তি ঘটাবার জন্যে ছিল যথেষ্ট। তখনই প্রথমবারের মতো বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। দুবছর পর ’৭৬ সালে বাবা জেরার্ডকে নিউইর্য়কের কর্মস্থলে আবার ডেকে পাঠানো হয়। কিশোর বাসকিয়াকে ভর্তি করানো হয় এডওয়ার্ড আর মুরো হাই স্কুলে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পরই তাঁকে পাঠিয়ে দেয়া হয় ম্যানহাটানের বিশেষ স্কুল ‘সিটি-এজ স্কুলে’ (City-as-School)। এটা ছিল বিকল্পধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হতো এবং প্রথাগত শিক্ষা-পদ্ধতি কঠিন মনে হয় এমন ছাত্রদের এই স্কুলে পাঠানো হয়। অধ্যয়নকালে পরিচয় হয় গ্রাফিতি শিল্পী আল-ডিয়াজের সঙ্গে। অল্পদিনেই পরিচয় নিবিড় সখ্যে রূপ নেয়। দুজনে একত্রে ম্যানহাটানের রাস্তায় দেয়াল ¯েপ্র করে আঁকা শুরু করেন। বছরের শেষে ডিসেম্বর মাসে আবার বাড়ি থেকে পালান ষোলো বছরের বাসকিয়া। এবার দুসপ্তাহের জন্যে। সময় কাটিয়েছেন গ্রিনউইচ ভিলেজের ওয়াশিংটন স্কোয়ার পার্কে। আর উদ্দেশ্যহীন চরে বেড়ানোর মাঝেই উদ্ভ্রান্ত মন নতুন আনন্দ খুঁজে পায় ড্রাগ সেবনে। বহু অনুসন্ধানের পর বাবা তাঁকে বাড়ি ফিরিয়ে আনেন। আর কথাবার্তার এক পর্যায়ে বাসকিয়া বাবাকে বলেন – বাবা, একদিন আমি খুব, খুব বিখ্যাত হবো (ও রিষষ নব াবৎু াবৎু ভধসড়ঁং ড়হব ফধু)।
’৭৭ সালটি ছিল নানাদিক দিয়ে ঘটনাবহুল। আল-ডিয়াজসহ অন্যান্য বন্ধু মিলে ম্যানহাটানের দেয়ালে গ্রাফিতি লেখা শুরু করেন। সাবওয়ে, ট্রেন, লোয়ার ম্যানহাটানের বিভিন্ন ভবন ছিল তাদের শিল্পচর্চার লক্ষ্যবস্তু। এক পর্যায়ে দুজনে বিভিন্ন প্রবাদ, উক্তি ¯েপ্র করে চিত্রিত করা শুরু করেন। এ সমস্ত লেখা ছিল খুবই বুদ্ধিদীপ্ত, সরস ভাবের। একই সঙ্গে দার্শনিক এবং রাজনৈতিক বক্তব্যপূর্ণ। তবে বাসকিয়ার গ্রাফিতি ছিল মূলত – কাব্যিক, দার্শনিক এবং বক্তব্য বা বাণীসমৃদ্ধ। থাকত প্রতীকরূপে মুকুট অথবা লেখা ঝঅগঙ (প) – যা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠে তাঁদের পরিচিতি-নির্দেশক রূপে।
SAMO as end to mind wash religion, nwo here politics & bogus philosophy.
SAMO saves idiots.
Plush safe he think, SAMO wKsev
Pay for soup.
এ বছরই জুনে আল-ডিয়াজের গ্রাজুয়েশনের দিন। বাসকিয়া মঞ্চে বক্তৃতারত প্রিন্সিপালের মাথায় বাক্সভর্তি শেভিং ফোম ঢেলে দেন। এ ঘটনায় অবাধ্যতার জন্যে তাঁকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়। নিজের গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করার মাত্র এক বছর বাকি। দুরন্ত তরুণের মনে হয়েছিল – ফিরে যাবার আর কোনো পথ নেই। কিন্তু পথ তাঁকে ডেকেছিল ভিন্ন বাঁকে।
বাড়িতে মায়ের অভাব অনেকটাই পূরণ করেছিলেন বাবার নতুন সঙ্গিনী নোরা ফিৎজপ্যাটরিক। ক্রমশ তিনিই হয়েছিলেন বাসকিয়ার আর্দশ মাদার ফিগার – উষ্ণতায়, বন্ধুত্বের প্রগাঢ়তায় আর মাতৃস্নেহে। তা সত্ত্বেও পরের বছর জুনে আবার ঘর ছাড়েন।
চিত্রকলা সম্পর্কে প্রথাগত ধ্যান-ধারণা, রীতির
শিকড় উপড়ে বাসকিয়া হয়ে উঠেছিলেন এক ব্যতিক্রমি দ্রোহী চিত্রশিল্পী। পরিবেশ ও বিবর্তনের প্রভাবে মানুষের বৌদ্ধিক মনন, চিন্তন ও প্রতিভার বিকাশ ঘটে। শৈশবের দুর্ঘটনা-পরবর্তী গ্রে’জ অ্যানাটমি বইয়ের ভরাট স্মৃতি সতেজ ছিল মনের গোপন অলিন্দে। পরবর্তীতে সেইসব রেখাচিত্র তরুণ বাসকিয়াকে অদেখা-অজানা মূর্ত-বিমূর্ত শিল্পের জগতে নিয়ে গেছে। তারপর প্রতিভার নিজস্ব নিয়মে শিল্প হলো তাঁর উন্মোচন – নিজের অস্তিত্বপ্রকাশের চৈতন্য-উজ্জ্বল সিঁড়ি।
তিনিই ছিলেন একমাত্র কৃষ্ণ আমেরিকান শিল্পী যিনি শিল্পের ইতিহাসে বাস্তবিকই শিল্পমণ্ডিত শ্রমের বিভাময় চিহ্ন রেখে গেছেন। আশির দশকে আন্তর্জাতিক শিল্প-আন্দোলনের ঘূর্ণি উঠেছিল – তাতে উত্তর-আধুনিকতার পথ ধরে শিল্পকলা ফিরে পেয়েছিল শরীরীমূর্ততা। অর্থাৎ সচেতনভাবেই শিল্পীরা ফিরে এসেছিলেন মূর্ত চিত্রকলায়। বাসকিয়া ছিলেন এই আন্দোলনের তেজস্বী প্রজন্মের প্রতিভূ।
এক প্রকার জৈবতাড়নায় পিকাসো গ্রিক উপ্যাখ্যানের মিনোটর কল্পনাকে আশ্রয় করেছিলেন। আর বাসকিয়া ভয়াবহ মানসিক অস্থিরতায় চোখে দুরবিন সেঁটে নয়, দিব্যদৃষ্টিতে সভ্যতার ক্ষয়, অলীক নিয়ম আর বাস্তবেরই পূর্ণ বাস্তবায়ন করেছেন। আদিম গুহাচিত্রের মতো নাইভ-সারল্যে নিউইয়র্কের কংক্রিটের দেয়াল, টানেল, সেতু, ভবনে এঁকেছেন মহানগরের প্রতিচিত্র, যাপিত জীবনের সন্ত্রাস, বৈষম্য, যন্ত্রণা।
’৮৩-তে শিরোনামহীন মর্মভেদী জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ করেছেন প্রথম পছন্দ : অগ্নিনির্বাপণকারী হওয়া। দ্বিতীয় পছন্দ : কার্টুনিস্ট। কিন্তু কেন? সভ্যতার আঁচে ঝলসায়নি তাঁর সরলতা; তাই খাঁটি ফোক প্রিমিটিভ সারল্যে বলেছেন – কারণ ‘আগুন সবচাইতে বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করে। সাহায্যের জন্যে অন্য যে-কোনো আতর্নাদের চেয়ে।’
তাঁকে বলা হতো কালো পিকাসো, এক প্রশ্নের উত্তরে এ প্রসঙ্গে বলেছেনও – নিজেকে তিনি ততটা ভাবেন না। এসব তোষামোদী, আত্মতৃপ্তিকর …
বাবার বাড়ি ছেড়ে নিজ বাড়িতে এসে বাসকিয়া যোগ দেন থিয়েটার দল ‘ফ্যামিলি লাইফ থিয়েটারে’। আর অর্থোপার্জনের জন্যে চলছিল নিজের আঁকা টি-শার্ট, পোস্টকার্ড বিক্রি। রাতের তোলপাড় সময় কাটত ম্যানহাটানের ডাউনটাউনের মাড ক্লাব (গঁফফ ঈষঁন) কিংবা ক্লাব-৫৭-তে। শিল্পী, মিউজিসিয়ান, পারফরমারদের উথালপাথাল জমাটি আড্ডা। থাকতেন আজকের বিখ্যাত সংগীতশিল্পী ম্যাডোনা, বি-৫২ দল, মাইকেল হলমান আর গ্রে গ্রুপের ভবিষ্যৎ সদস্যরা।
এসময়েই সোহোর (ঝড়যড়) একটি রেস্টুরেন্টে অ্যান্ডি ওয়ারহল এবং প্রভাবশালী চিত্রসমালোচক হেনরি গেলডজাহলারের সঙ্গে প্রথম দেখা হয় বাসকিয়ার। ওয়ারহল একটি কার্ড কিনলেও গেলডজাহলার তাঁকে খুবই অল্পবয়সী বলে বাতিল করে দেন। ’৭৮ সালের ১১ই ডিসেম্বর দি ভিলেজ ভয়েস (The village Voice) পত্রিকায় সামো (ঝধসড়) সম্পর্কে লেখেন ফিলিপ ফাফলিক (চযরষরঢ় ঋধভষরপশ) । এতে লেখা হয় শহরের সর্বত্র বিরাজমান ‘সামো’ এবং তা নিউইর্কের শিল্পমহলে আগ্রহের সৃষ্টি করে। রচনাটিতে বাসকিয়া ও আল-ডিয়াজের আলোকচিত্রের পরিচিতি লেখা হয়েছিল জ এবং এল দিয়ে। কিন্তু মাত্র কয়েক মাস পর ’৭৯ সালের শুরুতেই সম্পর্কের অবনতি হলে দুজনের যৌথ উদ্যোগের শিল্পচর্চা ‘সামো’ বন্ধ হয়ে যায়। আর লোকজন হঠাৎই সোহোসহ ইস্ট-ভিলেজের দেয়ালসমূহে চিত্রিত দেখে – সামো মৃত (ঝধসড় রং ফবধফ)। বাসকিয়া টি-শার্ট, পোস্টকার্ড আঁকা ছাড়াও নতুন উদ্যমে ড্রইং ও কোলাজ করায় অধিকতর মনোযোগী হন। বিষয় হিসেবে তাতে স্থান পেয়েছে গ্রাফিতি আর্ট, বিমূর্ত প্রকাশবাদ। চিত্রিত হতো বেসবল খেলোয়াড়, কেনেডির গুপ্তহত্যা এবং পেজ ক্যান্ডি জাতীয় ভোগ্যপণ্যের বিষয়াদি।
এ বছর মে মাসে বন্ধু মাইকেল হলমান, শ্যারন ডসোন এবং ভিনসেন্ট গালোদের ব্যান্ডদল ‘চ্যানেল-৯’-এ যোগ দেন। বাসকিয়া বাজাতেন ক্লারিনেট ও সিনথেসাইজার। দলটিকে পরে নতুনভাবে সংগঠিত করে নতুন নাম দেওয়া হয়। স্মৃতির মধ্যে তখনো শৈশব রয়ে গেছে। তাই বাল্যস্মৃতির স্মরণে নাম দেন ‘গ্রে’ (Gray)।
গান-বাজনা, কবিতা লেখার পাশে চলছিল পোস্টকার্ড, টি-শার্ট বিক্রি সোহো, ওয়াশিংটন স্কোয়ার এবং মোমার (মিউজিয়াম অফ মডার্ন আর্ট) সামনে। চরিষ্ণু বাসকিয়ার বহুধারা কাজের মধ্যেই আলাপ হয় কেনি এফার্স এবং কেইথ হারিংয়ের সঙ্গে। আর মাড ক্লাবের আড্ডার সূত্রে পরিচয় হয়েছিল দিয়েগো করতেজের সঙ্গে। দিয়েগোই বাসকিয়াকে আলাপ করিয়ে দেন শিল্পসমালোচক ও মেট্রোপলিটান মিউজিয়ামের বিশ্ব শতাব্দীর শিল্পকলার প্রধান কিউরেটর হেনরি গেলডজাহলারের সঙ্গে, যিনি
সোহোর রেস্টরেন্টে তাঁকে অল্পবয়সী বলে মন্তব্য করে বাতিল করেছিলেন। পরে তিনি হয়েছিলেন বাসকিয়ার বিশেষ বন্ধু এবং কাজের প্রাথমিক সংগ্রাহক।
সহিষ্ণু স্বভাবের হলেও তাঁর মগজে, স্নায়ুতে স্মৃতির তাজ্জব, দুরন্ত ঘুড়ি – আচমকাই যেন খুলে গেল প্রকৃত শিল্পচর্চার নির্ঝর। সাধারণ বিষয় যা, সেটিই হয়ে উঠল শিল্পের প্রাণস্পন্দন।
‘টাইম স্কোয়ার শো’ শিরোনামে দলীয় চিত্রপ্রদর্শনীতে প্রথম অংশগ্রহণ করেন ’৮০ সালে। অন্যদের মধ্যে ছিলেন জেনি হলজার, কেনি এসার্ফ, ডেভিড হামোন, কিকি স্মিথদের মতো শিল্পীরা। প্রদর্শনীতে বাসকিয়ার কাজটি ছিল গোটা দেয়ালজুড়ে সামো গ্রাফিতির আঙ্গিকে করা। আর আর্ট ইন আমেরিকা পত্রিকায় শিল্প-আলোচনায় একমাত্র তাঁর সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। নিজের কাজের প্রাথমিক সাফল্যে প্রাণিত হয়ে ব্যান্ডদল ‘গ্রে’ ছেড়ে চিত্রকলায় নিজেকে পূর্ণরূপে সমর্পণ করেন। ওই বছরই মারিপলের প্রযোজনায়, ওব্রিয়েনের লেখা চলচ্চিত্র ‘নিউইয়র্ক বিট’-এর জন্য মনোনীত করা হয় বাসকিয়াকে। পরিচালক ছিলেন বার্তোগ্লিও। বিষয়, কিছুটা ডাউনটাউনের সংস্কৃতিজগৎ এবং বাসকিয়ার জীবনধারা, শিল্পচর্চা। যদিও নির্মিত ছবিটি দীর্ঘদিন মুক্তি-প্রতীক্ষার বাক্সে আবদ্ধ ছিল। ফলে বেঁচে থাকতে বাসকিয়ার কখনো ছবিটি দেখা হয়নি। অবশেষে ছবিটির নতুন নাম ডাউনটাউন-৮১ (উড়হিঃড়হি-৮১) দিয়ে কান চলচ্চিত্র উৎসবে পাঠানো হয়। উৎসবে প্রথম বিশ্বের ১৫ জন পরিচালকের নির্বাচিত চলচ্চিত্রের একটি হিসেবে প্রদর্শিত হয় গত ২০০০ সালে।
চলচ্চিত্র থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে ছবি আঁকার উপকরণ কেনা ছাড়াও, ’৮১-র জানুয়ারিতে বান্ধবী সুজান মালুককে নিয়ে নতুন অ্যাপার্টমেন্টে উঠে আসেন। এর আগে স্থানাভাবে বাসকিয়াকে আঁকার কাজটি করতে হতো ডাউনটাউনের গ্রেট জোনস স্ট্রিটে চলচ্চিত্রের প্রোডাকশন অফিসের চত্বরে। সে-সময়ে ওব্রিয়েনের সাহায্যে কয়েকটি চিত্রকর্ম ও ড্রইং বিক্রি করেছিলেন। তাঁর প্রথম চিত্রকর্ম বিক্রি হয়েছিল একশ ডলারে।
তাঁর পয়মন্ত শিল্পের কল্যাণে ’৮১ সালটি ছিল উল্লেখযোগ্য। ‘নিউইয়র্ক, নিউওয়েভ’ (ঘবুিড়ৎশ, ঘবিিধাব) চিত্রপ্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন কেইথ হারিং, ওয়ারহল, রবার্ট মাপেলথ্রপ প্রমুখের সঙ্গে। আয়োজক দিয়েগো করতেজ। ফেব্রুয়ারি মাসের এই প্রদর্শনীর পরপরই তিনজন শিল্পব্যবসায়ী তাঁর চিত্রকর্মের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন – ব্রুনো বিসোফবেরজার, আনিনা নোসি এবং এমিলিও মাজোলি। তিন মাস পর মাজোলিই ইতালির মদেনাতে বাসকিয়ার প্রথম একক চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন। আর জীবনের প্রথম প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রথম ইউরোপ ভ্রমণে আসেন তিনি মে মাসে। বিভিন্ন প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ, প্রতিভার স্বীকৃতি এবং ক্রমবর্ধমান খ্যাতি তরুণ শিল্পীর জীবনে খানিকটা সুস্থিরতা এনেছিল। হৃদয়ে তখন আলোর পাশে প্রগাঢ় আশা, স্বপ্ন প্রত্যাশিত চূড়া স্পর্শের। এর আগে এপ্রিলে ‘মাড ক্লাবেই’ – লোয়ার ম্যানহাটান ড্রইং শো (Lower Manhatan Drawing Show) বিয়ন্ড ওয়ার্ডস : গ্রাফিতি বেসড-রুটেড-ইনস্পায়ার্ড ওয়ার্কস (Beyond words : graffiti Based-Rooted-Inspired works) এবং ফিউচারা (ঋঁঃঁৎধ) শিরোনামে তিনটি দলীয় প্রদর্শনীতে ছিলেন। এ সমস্ত চিত্রপ্রদর্শনীতে বাসকিয়ার কাজগুলো ছিল সামো পর্বের। সেপ্টেম্বরে অংশ নেন আনিনা নোসির গ্যালারিতে দলীয় প্রদর্শনীতে। কেইফ হারিং, বিলি রেকলি, মাইক জিলার, জেনি হোলজার, বারবার ক্রুজার, পিটার নাদিন প্রমুখ শিল্পীদের কাজ ছিল। কিন্তু শুধুমাত্র বাসকিয়ার চিত্রকর্মের জন্যে সংরক্ষিত ছিল গ্যালারির প্রধান অংশটি। এ প্রদর্শনীর পরপরই আনিনা হয়ে উঠেন তাঁর প্রধান শিল্প-ব্যবসায়ী এবং নিজস্ব কোনো স্টুডিও নেই জানতে পেরে ছবি আঁকার গ্যালারির বেসমেন্টে স্থান করে দেন। বছরের শেষে ডিসেম্বরে আর্ট ফোরাম (অৎঃ ভড়ৎঁস) পত্রিকায় বাসকিয়ার ওপর বড় আকারের লেখা প্রকাশিত হয়। ‘দি র্যাডিয়েন্ট চাইল্ড’ বা ‘দীপিত শিশু’। লেখক রেনে রিকার্ড।
শিল্পসৃষ্টির সুষমায়, মগ্নতায় ’৮২ সালটি ছিল আরো গৌরবের। আমেরিকায় জীবনের প্রথম একক প্রদর্শনীটি ছিল একুশ বছরের স্পর্ধিত, ফুঁসে-ওঠা তারুণ্যের অনন্য অর্জন। নিউইয়র্কের আনিনা নোসির গ্যালারির এই প্রদর্শনী দর্শক ও শিল্পসমালোচকদের মুগ্ধতা সংগ্রহ করে নিয়েছিল। সৃষ্টি আর মননের সুবেদী সমারোহ আলোড়িত করেছিল।
এক বিশেষ ধরনের আতঙ্ক, শঙ্কায় ছেঁয়ে থাকত তাঁর চিত্রকলা – যেন চাপা, তীক্ষ্ম আর্তনাদ। শিল্পই ছিল তাঁর ব্যাপক শক্তি ও মুক্তি। মানবতা, নান্দনিকতা আর দার্শনিক প্রত্যয়ের নিপুণ রসায়নে অনুভব-ঋদ্ধ সে-সমস্ত চিত্রকর্ম। রং-রেখার বিনিময় ও বিন্যাসে বাসকিয়ার আত্মবিনির্মাণ, যেখানে মানবদেহ মনে হবে গোটা প্রক্রিয়ার কেন্দ্র, হৃৎপিণ্ড। দেহের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, তার যাবতীয় উপস্থাপনের ক্যানভাস যেন শৈশব-দুর্ঘটনার পর অ্যানাটমি বইয়ে দেখা জাগ্রত স্মৃতি। বিকৃত মুখ, করোটি, হাড়, রক্ত মিলে ব্যক্তিগত উদ্ভাসের দাগে সিক্ত। তাঁর নিজের ভেতর ছিল এক জর্জরিত আত্মা। তাঁর ক্ষরণ, ভাঙচুর, মানসিক দ্বন্দ¡, প্রতিক্রিয়া- সমস্তই প্রতিফলিত হয়েছে তীব্র শরীরীচেতনায়। দেহ হয়ে উঠেছিল তাঁর কণ্ঠস্বর, তাতেই খুঁজে পেতেন প্রকাশ। আর ক্যানভাসে বিভিন্ন শব্দ, বাক্য বা বাণী লেখার স্বতঃস্ফূর্ততায় হয়ে উঠেছিল এক লীলাময় শিল্প। আতঙ্ক, ভয়, নৈরাজ্য, দুঃস্বপ্ন, আনন্দ, মগ্নতা – যা ছিল সুররিয়ালিস্টদের স্বপের বিন্যাস – অনেকটা সে-ধারায় স্নায়ুতে, ধমনিতে, স্বেদে, স্মৃতিতে জমে-থাকা বোধ খনন করে, প্রখর অনুভূতির ছটায় ব্যক্ত করেছেন তাঁর ভাবনা-প্রলয়। তাঁর ঘূর্ণাবর্ত অবচেতনা ছেঁয়ে ছিল ইমেজে ইমেজে।
অস্তিত্বের তাড়নায়, অবদমিত প্রেরণা আর চেতনাকে সুঠাম করে তুলেছেন ক্যানভাসে। বিশ্বাস, সিদ্ধান্ত আর প্রতিভার সংমিশ্রণে বাসকিয়া ছিলেন আশির শিল্প-আন্দোলনের প্রতীক। রং ও তুলি নামক আয়ুধের উপাসক। তাঁর ভাবনা-প্রকাশের মাধ্যম ছিল মিশ্র – অ্যাক্রেলিক, পেনসিল এবং কোলাজ। মার্কিন শিল্পসমালোচক হেনরি গেলডজাহলার একবার জানতে চেয়েছিলেন, তাঁর শিল্পের বিষয়গুলো কী? উত্তর ছিল – আনুগত্য (Royality) বীরত্ব বা শৌর্য (Heroism) এবং পথ c)।
অস্তিত্বের চরমতম সংকটে, দমন আর বৈরিতার বিরুদ্ধে জীবনপণ লড়াই আর জীবনভর যন্ত্রণায় জর্জরিত মানুষের উত্তরাধিকারী বাসকিয়া। জানতেন কৃষ্ণকায় মানুষের পায়ের নিচের জমি তাদেরই শোণিতে ভেজা আর এই রক্তভেজা লালজমিতে জন্ম হয়েছে বহু সাহিত্যের। প্রত্যক্ষ অনুভব করেছেন আমেরিকার সমাজেও কৃষ্ণদের দুর্গতি ও দুর্যোগের চিত্র। দেখেছেন নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টে প্রায় অনুপস্থিত কৃষ্ণ চিত্রশিল্পীরা। মানুষের তৈরি সমাজ ও পরিস্থিতি সংলগ্ন উন্মুলসত্তার এই সংকট পুষ্টি যুগিয়েছে তাঁর শিল্পকে। শেকড়ের শ্বাস থেকে নিয়েছেন শিল্পের নির্যাস।
জীবনের গভীরতর কোনো স্পন্দন ধরা না পড়লে শুধু দৃশ্যের জন্ম দিয়ে শিল্পের মুক্তি ঘটে না। বাসকিয়ার কোনো কোনো চিত্রকর্ম দেখলে আপাত মনে হবে সর্বব্যাপী, বিশৃঙ্খলা, এলোমেলো, কখনো-বা রং-রেখার অসমাপ্ত নির্মাণ। কিন্তু এই বিশৃঙ্খলের ব্যাকরণের মাঝেই তিনি রং-রেখায় ব্যাপ্ত স্পেসকে দিয়েছেন নতুন অভিব্যক্তি। হয়ত এ বিন্যাসই ছিল তাঁর অন্তঃগূঢ় বিন্যাস। শুদ্ধ অসন্তোষ, সামগ্রিক অতৃপ্তি থেকে জন্ম নেওয়া এইসব চিত্রকর্ম ক্রীড়ামগ্ন বালকের একাগ্রতায়, ঔৎসুক্যে সৃজন করেছেন। তাঁর চিত্রের ভাবে জমা আছে বহুস্তর, বহুস্বর – ব্যঙ্গ, কৌতুক, জমাট আর্তনাদ, ভয়। ঐতিহ্যের মধ্য থেকে বৃত্ত ভেঙেছেন নতুন উদ্ভাবনে, নিজস্বতা বয়নে।
সুরাত, দুশো-ভিলো এবং মদিগ্লিয়ানির মতো বাসকিয়া ছিলেন শিল্পের আকাশে ধূমকেতু। নিজের গন্তব্য বা নিয়তি সম্পর্কে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন না। কৈশোরের স্বপ্নবীজ ছিল বিখ্যাত হবার, আর ঠিক দশ বছর পরই সেই লালিত ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে হয়ে উঠেছিলেন আমেরিকায় তরুণ প্রতিভার আইকন। এই তরুণ চিত্রকর সম্পর্কে অ্যান্ডি ওয়ারহল বলেছিলেন, ‘বাসকিয়ার চিত্রকর্ম হবে এমন এক জিনিস এই শতাব্দীতে যা আমাদের সঙ্গে থাকবে।’
স্বল্পায়ু জীবনে অসংখ্য একক সফল চিত্রপ্রদর্শনী তাঁর কর্মমুখর প্রতিভার প্রজ্ঞপ্তি। আনিনা নোসির গ্যালারিতে প্রদর্শনীর পরপরই অংশ নেন ‘ট্রান্সআঁভোগারডিয়া : ইতালিয়া-আমেরিকা’ (ঞৎধহংধাধহঃমঁধৎফরধ : ওঃধষরধ /অসবৎরপধ) দলীয় প্রদর্শনীতে বিখ্যাত সব শিল্পীর সঙ্গে – ছিলেন ফ্রান্সেসকো ক্লেমন্ত, এনজো গুচ্চি, সান্দ্রো চিয়া, দাভিদ সাল, জুলিয়ান স্নেবল প্রমুখ। এই সময়েই জার্মানিতে ‘ডুকমেন্টা-৮ আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে আমন্ত্রিত হন। খ্যাতনামা এবং প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের মাঝে বাসকিয়াই ছিলেন সবচাইতে তরুণ শিল্পী। তাঁর আগে এত অল্পবয়সে কোনো শিল্পী এই প্রদর্শনীতে নির্বাচিত হননি।
নিজের শরীর নিয়ে শিল্পীর যে আবেশ, আচ্ছন্নতা তার মূলে নিরন্তর কাজ করেছে সাত বছর বয়সের দুর্ঘটনা। তাই ক্রমব্যাপ্ত সৃষ্টি আর স্বপ্নের বুননে শরীর (অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ) ছিল তাঁর কেন্দ্র, হৃদয় তাঁর কাজের নাভিমূল এবং তাঁর নিয়তি। ’৮২ সালে একগুচ্ছ লিথোগ্রাফ প্রকাশিত হয় আনিনা গ্যালারি থেকে। স্মৃতির তর্পণে এই পোর্টফোলিওর নাম দেন অ্যানাটমি। ঐ বছরই সেপ্টেম্বর মাসে জুরিখে প্রথম একক প্রদর্শনীর আয়োজন করেন ব্রুনো বিসোফবেরজার। গোটা ইউরোপে তিনি ছিলেন বাসকিয়ার চিত্রকর্মের একমাত্র ডিলার। ১৯৬৮ সাল থেকে অ্যান্ডি ওয়ারহলের কাজেরও তিনি ছিলেন প্রধান ব্যবসায়ী। ব্রুনোই বাসকিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেন ওয়ারহলের সঙ্গে। এ উপলক্ষে ওয়ারহল পোলারয়েড ক্যামেরায় বাসকিয়ার ছবি তুলেন। বাসকিয়ার আগ্রহে দুজনের প্রতিকৃতি একত্রে ক্যামেরায় বন্দি করেন ব্রুনো। ছবি তোলার পর্ব শেষ হতেই বাসকিয়া দ্রুত ছবিগুলো নিয়ে চলে যান। আর ঘণ্টাদেড়েক পর তাঁর স্টুডিও সহকারী স্টেফেন টরটন একটি সদ্যসমাপ্ত ক্যানভাস নিয়ে আসে। ওয়ারহল এবং বাসকিয়ার প্রতিকৃতির চিত্রকর্মটি ছিল তখনো ভেজা। শিরোনাম – দুই মাথা বা টু হেড (Two head)।
রটারডামে একক প্রদর্শনীশেষে ১৯৮৩ সালে শিল্প-ব্যবসায়ী ফ্রেড হফমানের সহযোগিতায় পাঁচটি প্রিন্টের আরো একটি সংস্করণ বের হয় বাসকিয়ার। এ বছরেই তিনি আবার সংগীত জগতে ফিরে আসেন – বের করেন র্যাপ মিউজিকের অ্যালবাম, ম্যানহাটানের বিভিন্ন ক্লাবে এই রেকর্ডগুলো বাজানো হতো।
সংগীত ছিল বাসকিয়ার দ্বিতীয় ভুবন। তাঁর স্নায়ুকে ঋদ্ধ করেছে এই সংগীতস্পৃহা। সে-কারণেই তাঁর চিত্রকর্ম সম্পর্কে বলা হয় যে, ওগুলো সংগীতেরই পোস্টস্ক্রিপ্ট (postscript), তাঁর চিত্রকর্ম যতটা দেখার ঠিক ততটাই শোনার, অনুভবের। চিত্রকলা যদি হয় তাঁর আধ্যাত্মিক আশ্রয়, নান্দনিক বোধের রশ্মি, তবে সংগীত ছিল হৃদয়ের শুভবার্তা, আত্মার শুশ্রƒষা।
উত্তর-কৈশোরে অনুরাগী ছিলেন জিমি হেনড্রিক্স (ঔরসসু ঐবহফৎরী) এবং জানিস জপলিনের (ঔধহরং ঔড়ঢ়ষরহ) কাজের শৈল্পিক উৎকর্ষতা ও সফলতার। দুজনেই মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৯৭০ সালে মাত্রাতিরিক্ত ড্রাগ সেবনে মারা যান। পরবর্তীতে তাঁর ভাবনার সৌরআলোয় আদর্শরূপে এসেছেন কালো মিউজিশিয়ান, সংগীতশিল্পী, মুষ্ঠিযোদ্ধা প্রমুখ। ক্রমশ ক্যানভসে ভরাট হয়েছেন মাইল ডেভিস, চার্লি পার্কার, বিলি হলিডে, ম্যাক্স রোচ, মুহম্মদ আলী ক্লের মতো কালোমানিক কিংবদন্তির চরিত্ররা। ‘ক্যাসিয়াস’ চিত্রে ক্লে ছিলেন তাঁর রোলমডেল। ’৮২ সালে করা এই ছবিটির পাশে আরো অজস্র চিত্রকর্মে এভাবে এসেছে, শৌর্য ও বীরত্বের পুরুষেরা। তাঁদের প্রতি আনুগত্য নিবেদনের মুদ্রায় মূর্ত হয়েছেন বিখ্যাত বেসবল খেলোয়ার হাংক অ্যারন (ঐধহশ অৎড়হ) কিংবা জাজশিল্পী চার্লি পার্কার, যাঁর গান তিনি ক্লান্তি হীনভাবে শুনে যেতেন। সাহিত্যে উইলিয়াম বুরাহ (Burrough) এবং জ্যাক কেরুয়াক পাঠে ছিল অমল আনন্দ।
’৮৮ সালে বাসকিয়ার শেষ প্রদর্শনীতেও দেখা গেছে হাতে জ্যাক কেরুয়াকের দি সাবটেরেনিয়ান (The Subterraneans)। কেরুয়াকের কবিতায় চার্লি পার্কার আবির্ভূত সদাশয় বুদ্ধরূপে। বলেছেন, বেদনার্ত কবিকে – সবকিছু ভালো। পার্কার জেন দর্শনের প্রসন্নতায় উচ্চারণ করেন – Play the pretty notes & play clean, এই আত্মদর্শন ছিল তাঁর হৃদয়ের অন্ধ সত্য। রক্ত আর যন্ত্রণার উজান খুঁড়ে খুঁড়ে অন্বেষণ করেছেন সেই সত্যকে। প্রথম দিকের ড্রইংগুলোতে নিজের রক্তের ছাপ দিয়েছেন কাগজে যেন প্রমাণ করতে তাঁর প্রতিশ্রুতি শান্তির জন্যে, তাঁর শিল্প … নিয়তিগ্রাহ্য।
রেখা ও আঁকিবুকির বিরামহীন স্ফুরণে কোনো এক জায়গায় থেমে থাকতে চাননি। তাই কোনো এক রীতিতেও নিজেকে বেঁধে ফেলেননি। তাঁর শিকড়অভিলাষী চৈতন্যে বিভিন্ন প্রতীক এসেছে অনুভূতির উৎসারণে। বাসকিয়া বহুচিত্রে মুকুট এঁকেছেন তিনটি চূড়া দিয়ে। আভিজাত্য, কৌলিন্যের প্রতীক- কবি, সংগীতশিল্পী এবং বিখ্যাত মুষ্ঠিযুদ্ধ চ্যাম্পিয়ন। তিনি প্রথার অচলায়তন ভেঙেছিলেন। ক্যানভাসে মূর্ত প্রতীক, ইমেজ সাহসী খেয়ালিপনার সৃজনচিহ্ন নয়। এইসব রূপক, প্রতীক-খননে উঠে আসে ক্ষত-ক্ষরণ আর সমাজনির্দিষ্ট নিয়তির গল্প। তাঁর সমস্ত চেতনায় কাজ করেছে তিনটি শক্তি – লেখা, সংকেত (গ্রাফিতি) আর চিত্রকলা। অস্থির এক দহন, টানাপোড়েনের মাঝেও সচল ছিল সৃষ্টিশৈলী। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই নিষিক্ত হয়েছিল শিল্পমনীষা। ’৮৩ সালে হুইটনি মিউজিয়ামের বিয়েনালে অংশগ্রহণ করেন আর বাসকিয়ার আগে এত অল্পবয়সে কোনো শিল্পীই সেখানে প্রদর্শনীর সুযোগ পাননি। মননে, চিন্তনে, সৃজনে উত্তাল এই দিনগুলোতে অ্যান্ডি ওয়ারহলের সঙ্গে সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ, প্রগাঢ় হয় নতুন বান্ধবী ইন্টারভিউ কাগজের সম্পাদক এবং বাসকিয়ার কাজের অন্ধভক্ত পেইজ পোওয়েলের সূত্রে। এবছরই সেপ্টেম্বরে এক তরুণ কৃষ্ণ গ্রাফিতিশিল্পী মাইকেলকে পুলিশ গ্রেফতার করে এবং পুলিশ হেফাজতেই আঘাতজনিত কারণে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় বাসকিয়া গভীরভাবে মর্মাহত হন। প্রাক্তন বান্ধবী সুজান বিষয়টির আইনসম্মত বিচারের জন্যে মৃতশিল্পীর পরিবারের জন্যে অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা করে, কিন্তু বাসকিয়া সচেতনভাবেই নিজেকে দূরে রাখেন। তাঁর সন্তাপ, বেদনা, প্রতিবাদ অবলীলায় প্রাণ পেয়েছে চিত্রে। চমক লাগানো আচ্ছন্নতা নয়, তাঁর ক্যানভাসে এসেছে সমাজ-বাস্তবতার অমোঘ বিষয়বস্তু। তাঁর ছবি উন্নাসিক এলিট সংস্কৃতির শুশ্রƒষা নয়।
সতেরোটি দলীয় এবং চারটি বড় ধরনের একক প্রদর্শনীর সফলতায় তাঁর সৃজন-সম্ভাবনার প্রতিটি দ্বার তখন উন্মুক্ত। ডাক পান জাপানের আকিরা ইকেডা গ্যালারিসহ আমেরিকার ও ইউরোপের বনেদি গ্যালারিগুলো থেকে। ইতোমধ্যে ’৮৪ সালের সেপ্টেম্বরে কোলাবরেশ›স (Collaborations) শিরোনামে বাসকিয়া, ক্লেমন্ত ও ওয়ারহলের একটি দলীয় প্রদর্শনী হয়েছে জুরিখে ব্রুনোর গ্যালারিতে। মেধা, শীলন ও প্রাতিস্বিক মননের বিভায় চব্বিশ বছর বয়সেই অর্জন করেছিলেন জনপ্রিয়তা আর সেলিব্রেটি। বছরের শেষে আলাপ হয় নিউইয়র্ক ক্লাব এরিয়ার মালিকের বোন জেনিফার গুডের সঙ্গে। দুজনের সম্পর্কের মাঝে রোপিত হয়েছিল বিমুগ্ধ বিহ্বলতা। বাসকিয়ার জীবনে জেনিফারের সঙ্গে প্রেমজ সম্পর্কটি ছিল প্রবল ভালোবাসা এবং রোমান্টিকতার করস্পর্শে তপ্ত।
তার মাঝেই বাসকিয়ার অতিরিক্ত ড্রাগ-আসক্তির বিষয়টি বন্ধুদের উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে। নিরাপত্তাহীনতা-প্রকাশ ছাড়াও নিজ-অস্তিত্ব সম্পর্কেও মাঝে মাঝে তিনি অসচেতন হয়ে উঠতেন। সন্দেহবাতিক মনোবিজ্ঞানীদের ভাষায় প্যারানইয়া – ভ্রান্তিজনিত মানসিকতার শিকার বাসকিয়ার মনে হতো লোকজন তাঁর বাড়ি থেকে চিত্রকর্ম চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। মানসিক ভারসাম্যের অভাব, চিন্তা-চেতনায় অসংলগ্নতার বীজ অনেক প্রতিভাবান ব্যক্তির জীবনে ছিল। রুশো, শোঁপা, মোজার্ট, জন স্টুয়ার্ট মিলে অনেকেই সাময়িক বা স্থায়ীভাবে মানসিক অবসাদে ভুগেছেন। ভ্যানগঘ শেষ পর্যন্ত অপ্রকৃতিস্থ থেকেও সৃজনশীল ছিলেন। আর ভাস্কর কামিই ক্লদেলের নিরাপত্তাহীনতাবোধ থেকে স্থায়ী মানসিক অবসাদের কাহিনীে াে এখন শিল্পজগতের সবার জানা।
কৃষ্ণকায় মানুষদের প্রতি সমাজের অবজ্ঞা ও করুণার অশোভন আচরণ, বাসকিয়াকে করেছিল আপন্ন অস্তিত্ববিষয়ে সচেতন। ক্রমশ তাঁর দ্রোহীসত্তার ভেতর জন্ম নেয় নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতাবোধ। যে নিঃসঙ্গতা থেকে মানুষের নিস্তার নেই। নিজস্ব ভাবনার অখণ্ড পরিমণ্ডলে তখন বিচ্ছিন্নতাই হয় তাঁর অমোঘ নিয়তি। মানসিক স্থিতিহীনতার অস্থির ছায়াঘেরা সময়েও শিল্পই ছিল তাঁর নিঃসঙ্গ যাত্রার সহোদর। ’৮৪ সালে হাওয়াই দ্বীপের মাউই থেকে ফিরে এসে অনিচ্ছাসত্ত্বেও কাজ করেন জুলিয়ান স্নেবাল, এরিক ফিমেল, ডেভিড সালে প্রমুখ বিখ্যাত শিল্পীদের ডিলার মেরি বুনের সঙ্গে। অংশ নেন নিউইয়র্কের মডার্ন আর্ট মিউজিয়াম, প্যারিসের ম্যুজে দ্য মডার্ন আর্টের দলীয় প্রদর্শনীতে। ’৮৫ সালে জুরিখে একক চিত্রপ্রদর্শনীর পর দি নিউইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনের ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় বাসকিয়ার ছবি প্রকাশিত হয় প্রচ্ছদে – ‘নিউ আর্ট, নিউ মানি : দি মার্কেটিং অব অ্যান আমেরিকান আর্টিস্ট’ রচনাসহ। সেপ্টেম্বরে বাসকিয়া-ওয়ারহলের যৌথ উদ্যোগে করা ষোলোটি চিত্রের প্রদর্শনীর আয়োজন করেন ব্রুনো এবং টনি সাফরাজি নিউইয়র্কে। কিন্তু প্রদর্শনীর নেতিবাচক সমালোচনা প্রকাশ করে নিউইয়র্ক টাইমস। পত্রিকায় লেখা হয় – ‘ওয়ারহলস ম্যানিপুলেশন’ নামে। মন্তব্য করা হয় যে তিনি নিজের উদ্দেশ্যসাধনে বাসকিয়াকে ব্যবহার করছেন। বাসকিয়া তাঁর সোভাগ্য-বহনকারী প্রাণী। ফলে অচিরেই দুজনের যৌথ পরিকল্পনার সমাপ্তি টানা হয় এবং পরস্পরের উষ্ণ সম্পর্কে শীতল পর্দা নেমে আসে।
ডিসেম্বরে দুসপ্তাহের জন্যে জাপানে যান আকিরা ইকিদা গ্যালারিতে একক প্রদর্শনী উপলক্ষে। পরের বছর জানুয়ারিতে লসঅ্যাঞ্জেলেস ও জুরিখে একক প্রদর্শনীশেষে জীবনে প্রথমবারের মতো আফ্রিকা ভ্রমণে যান। সঙ্গে প্রেমিকা জেনিফার। বাসকিয়ার একান্ত ইচ্ছায় আইভরি কোস্টের আবিদজানে একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেন ব্রুনো। আফ্রিকায় প্রদর্শনী করার আগ্রহের পেছনে প্রচ্ছন্নভাবে কাজ করেছে তাঁর জাতিসত্তাবোধ। কারণ তাঁর সম্পর্কে আফ্রো-আমেরিকার সাংস্কৃতিক বলয়ের অনেকেরই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নেতিবাচক। বাসকিয়াকে তাঁরা প্রকৃত, খাঁটি কৃষ্ণশিল্পী মনে করতেন না। প্রদর্শনী-সম্পর্কিত স্থানীয় প্রতিক্রিয়া জানা যায়নি।
পঁচিশ বছর বয়সে দ্বিতীয়বারের মতো অংশ নেন ষাটটিরও বেশি চিত্রকর্ম ও ড্রইং নিয়ে – হ্যানোভারের কেসনার-জেসেলশাকট মিউজিয়ামে। বলাই বাহুল্য এতো তরুণ বয়সে বাসকিয়ার আগে কোনো শিল্পী এখানেও প্রদর্শনীর সুযোগ পাননি। হামবুর্গের একটি বিনোদনমূলক পার্কের অলঙ্করণে অংশ নেন অন্যান্য বিখ্যাত শিল্পীর সঙ্গে এ বছরই। ‘লুনা লুনা’ নামের পার্কটিতে কাজ করেছিলেন জোসেফ বয়িস, সালভেদোর দালি, সোনিয়া দোলনি, কেইথ হারিং, দাভিদ হকনে, রয় লিনচেস্টাইন প্রমুখ রথী-মহারথী শিল্পীরা।
’৮৬-র শীতে বাসকিয়ার জীবন অনর্গল এলোমেলো বিন্যাসে বদলে যেতে থাকে। মননের সুবেদী সমারোহের মধ্যেও চলমান-স্থির সব একাকার। ক্রমাগত লুপ্তির দিকে ধাবমান বিশ্বাস-সংশয় ঈপ্সা। দূরপনেয় ড্রাগের নেশা তাঁর প্রেমময় জীবনে শূন্যতা এনে দেয়। জেনিফারের সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটে। ’৮৭ সালে প্যারিসের গ্যালারিতে প্রথম চিত্রপ্রদর্শনীর পরপরই মরমী বন্ধু ওয়ারহলের মৃত্যু তাঁকে হিমনির্জন বেদনার মনোভূমিতে নির্বাসিত করে। অস্তিত্বের সমগ্রকে ঘিরে একাকীত্ব আর বিচ্ছিন্নতার চোরাটানি। আজন্ম স্নায়ুর চাপ, পাশে নৈরাজ্য আস্তানা গেড়েছে মনোজগতে। বেড়ে গেছে ড্রাগসেবনের মাত্রা। ভঙ্গুর, অস্থির কম্পমান হৃদয় থেকে সৃষ্টি হলো ‘টিভি স্টার’ (T.V Star) লিখলেন – এখানে কিছুই পাবার নেই (Nothing to be ganed here)।
আশার প্রদীপ্ত প্রসারিত পথে চলা তরুণের মনের গোপনে সুপ্ত ছিল ত্রয়ীচেতনা – সময়চেতনা, আত্মনচেতনা ও মৃত্যুচেতনা। তাঁর বহুচিত্রে আছে মৃত্যুচেতনা। খুলি, কঙ্কাল ইত্যাদির সংখ্যাধিক্য সর্বত্র বিরাজমান শেষ চিত্রকর্মে। চেতন-অবচেতনের ক্রমিক বিলোপনে দেখেছেন মৃত্যুর ছায়া। তাঁর চিত্রের পটভূমি আকাশ নয়, নয় দিগন্তরেখা। কিন্তু পুরো ক্যানভাসে ছড়ানো শব্দের চিত্রাবলি থেকে মাপা যায় মানসের তাপমাত্রা। প্রকৃত মৃত্যুর মাত্র কয়েক মাস আগে করা ‘রাইডিং উইথ ডেথ’ (জরফরহম রিঃয ফবধঃয) ছিল নিউইয়র্কের শেষ প্রদর্শনীতে ’৮৮ সালের ২৯ এপ্রিলে। জীবনের শেষ ইউরোপ ভ্রমণে আসেন প্রদর্শনী উপলক্ষে। প্যারিসের দুটো গ্যালারি এবং ডুসেলডর্ফে চিত্রপ্রদর্শনীশেষে ফিরে যান নিউইয়র্কে। এপ্রিলে সফল প্রদর্শনীর পর জুন মাসে এক ড্রাগ ট্রিটমেন্ট প্রোগ্রামে হাওয়াইতে গিয়েছিলেন। তারপর আর বাসকিয়ার ফিরে-আসা হয়নি প্রাণের শহর নিউইয়র্কে সপ্রাণে।
বিচ্ছিন্নতার চেতনা যখন লুপ্ত, নিঃসঙ্গতার অনন্ত বেদনার বিষাদ-হৃদয়ে পুষে জ্যোর্তিময় শিল্পী পৃথিবীর অনালোকিত পথে প্রস্থান করেন। ১২ আগস্ট শুক্রবার, ১৯৮৮ সালে গ্রেট জোনস স্ট্রিটের অ্যাপার্টমেন্টে বাসকিয়ার মৃতদেহ পাওয়া যায়। ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ জানা যায় মাত্রাতিরিক্ত ড্রাগসেবনের প্রতিক্রিয়া।
নিজের চিত্রকর্ম সম্পর্কে একবার বলেছিলেন – ‘আমি একটি ছবি শুরু করি এবং তারপর শেষ করি। আমি শিল্প নিয়ে ভাবি না, যখন কাজ করি। আমি চেষ্টা করি জীবন নিয়ে ভাবতে। এই জীবনমুখী শিল্পীর সংক্ষিপ্ত জীবনের কৃতিত্ব, সফলতা ও সৃজনসম্ভারই তাঁর শিল্পের কেতন ও দর্শন হয়ে থাকবে।
অকালপ্রয়াত এই বর্ণিকের স্মৃতির সম্মানে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন সতীর্থ চিত্রশিল্পী জুলিয়ান স্নেবাল। সম্প্রতি বাসকিয়ার চিত্রকর্মের প্রদর্শনী হয়ে গেল প্যারিসে। চার মাসব্যাপী এই প্রদর্শনীর আয়োজক ছিল ফনদাশিও-দিনা ভিয়েরনি মুজ্যে মাইও।
তথ্য সূত্র : প্রদর্শনীর ক্যাটালঘ
১৯৯৯ এবং ২০০৩ সাল।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.