বাংলাদেশের প্রচুর মানুষ জীবিকার সন্ধানে এখন পৃথিবীর প্রায় সব দেশে ছড়িয়ে গেছেন। জিয়া এয়ারপোর্টের সামনে টিনের স্যুটকেস অথবা কাপড়ের বোঝা হাতে লাইন করে দাঁড়ানো তরুণদের মুখ মনে আসছে, যাঁরা মধ্য এশিয়ায় যাচ্ছিলেন নির্দিষ্ট চাকরি করতে। এঁদের বেশিরভাগই এসেছেন বিভিন্ন গ্রাম থেকে। নিশ্চয়ই যাওয়ার সুযোগ পেতে দালালদের কমিশন দিতে হয়, কিন্তু ঘরে বসে বেকার হয়ে পড়ে থাকার চেয়ে সেটা ঢের ভালো। এদিকে মালয়েশিয়া, ওদিকে মধ্য এশিয়ায় শ্রমের বিনিময়ে যা রোজগার করেন এঁরা, তার বড় অংশ দেশে পাঠিয়ে দেন প্রতিমাসে। ইউরোপ-আমেরিকার রেস্টুরেন্ট, দোকান এবং ট্যাক্সির ব্যবসায় যেমন বাংলাদেশের মানুষ জড়িত, তেমনি খুব বড় ব্যবসায়ী অথবা ডাক্তারের দেখা পেয়েছি যাঁরা বাংলাদেশ থেকে ওখানে গিয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার সিডনি শহরে গিয়েছিলাম কদিন আগে বাংলাদেশ সংস্কৃতি সংস্থার আমন্ত্রণে। সেখানে বেশিরভাগ বাংলাদেশের মানুষ কলেজের, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। একজন ট্যাক্সিচালকের সন্ধান পেয়েছিলাম, যাঁর বাড়িতে দুটো দামি গাড়ি আছে স্ত্রীপুত্রের ব্যবহারের জন্য। আমার ধারণা, বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরের মানুষ বিদেশে গিয়ে যা রোজগার করেন তার একটা অংশ অবশ্যই দেশের পরিবারের কাছে পাঠাবেন। শতকরা ষাটভাগ এই দলে পড়েন। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এঁরা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিচ্ছেন। কষ্ট করে, যাবতীয় অসুবিধের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে, এঁরা যা পাঠাচ্ছেন তা ষাটগুণ হয়ে বাবা-মা, ভাই-বোনদের স্বাচ্ছন্দ্য দিচ্ছে। এই ব্যাপারটা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের স্বভাবে নেই। বড়জোর শতকরা দুজন দেশে টাকা পাঠান। পাঠাবার সময়ে হিসেব করেন, পঁয়তাল্লিশ গুণ বেড়ে যাবে দেশে ডলারটা পৌঁছালে; তাহলে কতটা পাঠানো উচিত। ভারতের কেরল রাজ্যের মানুষেরাই শুধু এ-ব্যাপারে বাংলাদেশের মানুষদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে।

বিদেশে গিয়ে শুধু টাকা রোজগার করে দিন না কাটিয়ে প্রায় প্রতিটি শহরে বাংলাদেশের মানুষ সংস্কৃতি-সংগঠন গড়ে তুলেছেন। ছেলেমেয়েকে বাংলা শেখানোর ক্লাস করান। দেশ থেকে শিল্পীদের নিয়ে এসে অনুষ্ঠান করা হয় প্রায়ই। নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকা ঠিকানার জন্য আমরা গর্ব করতে পারি। প্রফেশন্যাল কাগজ যেমন হয় ঠিকানা সেইরকমের। সার্কুলেশন ঈর্ষণীয়। কাগজের সম্পাদক রব ভাই দারুণ মানুষ। এরকম উদ্যোগী যুবক আমি খুব কম দেখেছি। এই ঠিকানার আমন্ত্রণে আমি প্রথমবার বাংলাদেশের মানুষের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করি। তারপরে বহুবার ওঁদের আমন্ত্রণ এবং ভালোবাসা পেয়েছি।

সেবার ডালাসের প্রবাসী বাংলাদেশের মানুষেরা সম্মেলনের ব্যবস্থা করেছিলেন। ম্যারিয়ট হোটেলে আমাকে রেখেছিলেন ওঁরা। অনুষ্ঠান চলাকালে একজন যুবকের সঙ্গে আলাপ হলো। কথা বলতে বলতে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি কী করেন?’

যুবক বলল, ‘আমি কবিতা লিখি। বাংলা ভাষায়।’

চমকে উঠলাম। আমেরিকায় থাকে অথচ সে সগর্বে বলছে, বাংলা কবিতা লেখাই তার কাজ? জিজ্ঞাসা করলাম, ‘না, মানে, অন্য কাজকর্ম… ?’

‘মাঝে মাঝে করি। ভালো লাগে না।’

পৃথিবীর সব দেশেই বোধহয় এরকম পাগল থাকে।

দ্বিতীয় দিনে ছেলেটি কাছে এসে সবিনয়ে বলল, ‘স্যার, আপনি যদি দয়া করে আমাদের বাসায় যান তাহলে বাসার সবাই খুশি হবে।’

যেহেতু ওর সম্পর্কে কৌতূহল ছিল তাই বললাম, ‘কাল সন্ধের সময় আমার প্লেন। সারাদিনে কোনো কাজ নেই। কাল যাওয়া যেতে পারে।’

ভেবেছিলাম এই শহরের কোনো সাধারণ ফ্লাটে গিয়ে কিছুটা সময় কাটানো যাবে। ওই একই অনুষ্ঠানে ঢাকা থেকে গিয়েছিলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। এরকম জমকালো মানুষ আমি আগে দেখিনি। মুখ খুললেই উনি যে-কোনো মানুষের বন্ধুত্ব পেতে পারেন। টিভি অনুষ্ঠান করে বিপুল জনপ্রিয় হয়েছিলেন। পড়িয়েছেন। এবং এখন বাংলাদেশে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তৈরি করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আবুদার সঙ্গে আমার দুদিনেই বহুকালের সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। পরের দিন এক কবির বাসায় যাব শুনে উনিও সঙ্গী হতে চাইলেন। শুধু সৎসঙ্গ নয়, স্বর্ণসঙ্গ পেতে কার না ভালো লাগে!

পরের দিন সকালে স্থানীয় একটি বাংলাদেশের যুবক এলো গাড়ি নিয়ে। সে আমাদের কবির বাসায় পৌঁছে দেবে। আবুদা আর আমি গাড়ির আরোহী হলাম। কিছুক্ষণ পরে লক্ষ করলাম আমরা সম্ভবত শহরের বাইরের দিকে যাচ্ছি। প্রশ্ন করতেই চালক জানাল, হ্যাঁ, তাই। আমাদের মিনিট তিরিশেক যেতে হবে। মিনিট তিরিশ ওই রাস্তায় যাওয়া মানে প্রায় পঁচিশ মাইল যাওয়া। রাস্তায় কোনো বাস দেখতে পাচ্ছি না। ছেলেটির নিশ্চয়ই গাড়ি আছে, তাই দুদিন সম্মেলনে আসা-যাওয়া করতে পেরেছে। তাহলে এদেশে বাংলা কবিতা লিখলেও গাড়ির মালিক হওয়া যায়।

খানিকবাদেই লোকালয়ের বাইরে চলে এলাম। আবুদা বললেন, ‘যা-ই বলুন, আমেরিকার যেখানেই যাচ্ছি প্রকৃতির দিকে তাকালেই বাংলাদেশের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। অমন শ্যামলিমা কোথাও পাবে না-কো খুঁজে।’ কথাটা ঠিক। এই এখন আমাদের দুপাশে জঙ্গল শুরু হলেও কীরকম রুক্ষতায় ভরা। জঙ্গল না থাকলে দুপাশের চেহারা যতদূরে যাও একরকমের। বিরক্তিকর। এমনকি ছোট শহরগুলোর রাস্তার ওপর টাঙানো নির্দেশিকাগুলো যদি খুলে ফেলা যায় তাহলে আলাদা করে চেনা যাবে না। আমাদের মোল্লারহাট কিন্তু কোনো সাইনবোর্ড ছাড়াই মোল্লারহাট হয়ে থাকবে।

চালক বলল, ‘এই উড্সের ভেতর জমি বিক্রি হয়। কিনবেন স্যার?’

আবুদা চমকে উঠলেন, ‘কিনব মানে? আমাদের বিক্রি করবে?’

‘হ্যাঁ স্যার। পাসপোর্ট দেখালেই হবে। নাগরিক হওয়ার প্রয়োজন নেই।’

‘ইন্টারেস্টিং।’ আবুদা বললেন, ‘চলুন দেখে আসি।’

হাইওয়ে থেকে ছবির মতো সিমেন্ট-বাঁধানো রাস্তা ঢুকে গেছে জঙ্গলে। উড্স-এর বাংলা ঠিক জঙ্গল নয়। লম্বা লম্বা গাছ, যাদের গায়ে আগাছা নেই, তলায় বুনো ঝোপ নেই। খানিকটা যেতেই অফিসঘর। বাইরের নোটিশবোর্ডে বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে। এক-একটা প্লট চারকাঠার। এখনো আটটি প্লট খালি আছে। জমির মূল্য এবং আনুষঙ্গিক খরচ মিটিয়ে পাঁচ হাজার ডলার পড়বে। আবুদা বললেন, ‘বাংলাদেশের টাকায় তিন লাখ। এই টাকায় এক কাঠা জমি ওখানে পাওয়া মুশকিল। কিনে ফেলি। ঢাকায় গিয়ে বলতে পারব আমেরিকায় আমার জমি আছে। না, আসুন, দুজনে মিলে কিনি। আপনি ছয়মাস আমি ছয়মাস থাকব।’

হাসলাম। মজা পাচ্ছিলাম। জমি দেখতে বের হলাম। যেসব জমি ইতিমধ্যে বিক্রি হয়েছে তার ক্রেতার নাম বোর্ডে লেখা আছে। কিন্তু কোনো বাড়ি নেই। তার বদলে মোটামুটি বড় তিনটে ঘর অনেকগুলো চাকার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। চালক জানাল, ‘এখানে বাড়ি করার অনুমতি নেই। তাই ক্যারাভানে থাকে সবাই। ইলেকট্রিসিটি, জলের ব্যবস্থা আছে। গাড়িতে ক্যারাভান টেনে নিয়ে এসে জল-ইলেকট্রিকের কানেকশন নিয়ে মাসখানেক থেকে যায়। কোনো কোনো ক্যারাভানের চাকা বসে গেছে, দেখতে পেলাম। অর্থাৎ এরা নড়াচড়া করে না, এখানেই থেকে গেছে।

জমি কেনার ইচ্ছে নিয়ে আবার হাইওয়েতে উঠে এলাম। আবুদা আর আমি স্থির করলাম, এখন অত ডলার যখন পকেটে নেই তখন পরেরবার এসে কেনা যাবে। আবুদার সেই ইচ্ছে এখনো আছে কি-না জানি না, কিন্তু আমার আছে। ইচ্ছে নিয়ে আমৃত্যু থাকাটাও তো বেশ মধুর ব্যাপার।

গাড়ি একটা ছোট্ট লোকালয়ে ঢুকল। প্রথমেই গ্যাস স্টেশন। সেখানে যে-ছেলেটি কাজ করে সে হাত নাড়ল। তার দিকে হাত নেড়ে চালক জানাল, ‘ওর নাম নাসিম। খুলনায় বাড়ি।’      আর একটু যেতেই একটা মাঝারি ডিপার্টমেন্টাল দোকানে বেশ ভিড়। গাড়ির শব্দ শুনে বছর পঞ্চাশেকের এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এসে নমস্কার করলেন, ‘আপনারা যে আসবেন আমরা বিশ্বাসই করতে পারি নাই। আমি বড়ভাই।’

‘এটা আপনার দোকান?’

‘আমাদের দোকান। সবই আপনাদের আশীর্বাদে। চলেন।’

সামনে বাগান। সেখানে পটল, মুলো, বেগুনের ক্ষেত। পেছনে কলার বন। তাতে সবরি কলা ঝুলছে। মাঝখানে বাড়ি।

গাড়ি থামতেই তিনজন পরমাসুন্দরী মহিলা কয়েকটি বাচ্চাকে       নিয়ে বেরিয়ে এসে সসম্ভ্রমে নমস্কার করলেন। ওঁদের পরনে জামদানি শাড়ি।

বড়ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘বড়বউ, মেজবউ, ছোটবউ।’

বড়বউ বললেন, ‘আমাদের জীবন ধন্য হয়ে গেল।’

আবুদা রসিকতা করলেন, ‘আমরা কে তা না জেনেই বলছেন ভাই?’

ছোটবউ বললেন, ‘উনি সমরেশ মজুমদার।’

মেজবউ বললেন, ‘আপনি স্যার। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।’

বড়বউ বললেন, ‘আপনার টিভি প্রোগ্রাম আমরা দেশে থাকতে না দেখে ছাড়তাম না। কী সুন্দর কথা বলেন আপনি।’

আমাদের নিয়ে ওঁরা ভেতরে গেলেন। আরাম করে বসে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কিন্তু যাঁর আমন্ত্রণে এলাম সেই কবি কোথায়?’

‘এখনই এসে পড়বে।’ ছোটবউ বললেন, ‘আমাদের এক কর্মচারীকে পুলিশ থানায় ধরে নিয়ে গিয়েছে। তাকে ছাড়াতে ওকে যেতে হয়েছে।’

‘আপনাদের কর্মচারী মানে?’ জিজ্ঞাসা করলাম।

বড়ভাই বললেন, ‘এ-ই আমাদের পরিবার। কাছাকাছি, ধরেন পঁচিশ মাইলের মধ্যে আমাদের চারটে স্টোর্স আর দুটো পাম্প আছে। রোজ আমি আর মেজভাই দেখাশুনা করি। হঠাৎ বিশেষ প্রয়োজন হলে ছোটভাই যায়।’

‘ছোটভাই কি কবিতা লেখেন?’

‘হ্যাঁ, ওই ওর শখ। জীবনও বলতে পারেন। এখান থেকে দেশের কাগজে লেখা পাঠায়। ওর ওপর আমরা কোনো চাপ দিই না। থাকুক নিজের মতো।’

‘ওর সংসার?’

বড়ভাই হাসলেন, ‘এই সংসারটা আমাদের সবার সংসার। কারো আলাদা না।’ জলখাবার এলো। আমেরিকায় ঢোকার পর থেকে ওদেশের খাবার খেয়ে চলেছি। এখন আমাদের চোখের সামনে লুচি, বেগুনভাজা, তরকারি, মুরগির ঝোল এবং ক্ষীর। বড়বউ বললেন, ‘একমাত্র লুচি ছাড়া সবই কিন্তু বাসায় হয়েছে।’

জিজ্ঞাসা করলাম, ‘মুরগি?’

‘মুরগি পোষা হয়। গরুও।’

আবুদা বললেন, ‘কী আশ্চর্য! আপনারা তো এখানে মিনি বাংলাদেশ বানিয়ে বাস করছেন, স্থানীয় লোকেরা কী বলছেন?’

‘আমাদের সঙ্গে খুব ভালো সম্পর্ক। আমাদের ইচ্ছে ছেলেমেয়েরা বাঙালি পরিবারে বিয়ে করুক। বড় হয়ে যদি তাদের অন্য ইচ্ছে হয় তাহলে কিছু তো করার নেই।’ বড়বউ বললেন।

খাওয়া শেষ করলাম। আহা, কী আরাম!

বড়ভাই আমাদের বাগান দেখাতে নিয়ে গেলেন। কী নেই? উচ্ছে, ঢ্যাঁড়শ, গাছে মোচা ঝুলছে। লক্ষ করলাম, চারপাশে বেশ দেশ-দেশ গন্ধ, কথাটা মনে করিয়ে দিলাম আবুদাকে। আবুদা বললেন, ‘আসলে মাটি কার? না, মানুষের। মানুষ মাটিকে যেমন রাখবে মাটিও তেমন থাকবে। এঁরা এঁদের পরিশ্রম আর ভালোবাসা দিয়ে ডালাসের এক টুকরো মাটিকে ফরিদপুর অথবা নদীয়ার মাটিতে রূপান্তরিত করতে পেরেছেন। বড়, বড় ভালো লাগছে হে।’

একটু হাঁটতেই চোখে পড়ল একখানা বাস দাঁড়িয়ে আছে একপাশে। তার চেহারা খুবই আকর্ষণীয়। বড়ভাই বললেন, ‘এটা আমাদের ক্যারাভান।’

‘আচ্ছা!’ আমি আপ্লুত।

‘মাঝে মাঝে সবাই মিলে কোথাও বেড়াতে যাই। দূরের যাত্রার পথে খুব ভালো।’

আবুদা বললেন, ‘ভাই, আমরা কি গাড়িটার ভেতরে যেতে পারি?’

‘নিশ্চয়ই।’ বড়ভাই বললেন।

তিনি দরজা খুলে দিলে আমরা ভেতরে উঠে গেলাম। একটি অত্যাধুনিক কমপ্যাক্ট ফ্ল্যাট। তাতে শোওয়ার ঘর, টয়লেট, কিচেন, বসার ঘর থেকে টিভি, লেখার জায়গার চমৎকার ব্যবস্থা করা হয়েছে অঙ্ক করে। আবুদা বললেন, ‘সাবাস ভাই, তুমি আলাদীনের প্রদীপের জিনকে পেয়ে গেছ দেখছি।’

এইসময়ে মেজভাই এলেন। চমৎকার মানুষ। আমরা ছোটভাইয়ের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু সে পুলিশ এবং আদালতের ঝামেলা থেকে কর্মচারীকে মুক্ত করতে তখনো পারেনি বলে টেলিফোনে আফসোস করছিল।

ওঁরা বললেন থেকে যেতে। প্লেনের টিকেট পালটে দেবেন। আবুদারও খুব আপত্তি ছিল না। কিন্তু দেশে ফেরার তাগিদ বেশি থাকায় আমি রাজি হতে পারিনি। ডালাসে ফেরার পথে খুব গর্ব হচ্ছিল। একটি বাঙালি পরিবার তাঁদের বাঙালিত্ব অক্ষুণ্ন রেখে আমেরিকার বুকে প্রবল সুখে বাস করছে, এই দৃশ্য বড় একটা দেখা যায় না। নিজেদের   দেশেই যখন আমরা ভাই ভাই একসঙ্গে থাকতে পারি না তখন ওখানে ওঁরা যৌথ পরিবারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। খবর নিয়ে জেনেছি, এরপরেও ওঁরা প্রতিমাসে দেশের আত্মীয়দের কাছে নিয়মিত টাকা পাঠান।

এই লেখা শেষ করার আগে আবুদার কথা বলি। ঈশ্বর আমাদের শরীর দিয়েছেন। এই শরীরের গঠন অনেকটাই এক। ঈশ্বর আমাদের মন দেননি। শৈশব থেকে ধীরে ধীরে নিজেরাই সেই মনকে আমরা তৈরি করেছি যে যার নিজের মতো করে। আমাদের বেশিরভাগই সেই মনে স্বার্থচিন্তা, সংকীর্ণতা, ঈর্ষার মশলা ছড়িয়েছি নিজের অজান্তে। আবুদা এখানেই আমাদের থেকে আলাদা। এই দিলখোলা মানুষটির মনে এত ভালোবাসা, যা উজাড় করে দিয়েও তিনি শেষ করতে পারেন না। পারবেন না শেষদিন পর্যন্ত।

কবির সঙ্গে দেখা হয়নি। পুলিশ বা আদালতে কি কবিকে মানায়? কিন্তু পরেরবার ডালাসে গেলে নিশ্চয়ই তার মুখে কবিতা শুনতে পাব, এই আশায় আছি।