চলতি বছর আগস্টের ৫ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত ঢাকার লালমাটিয়ায় গ্যালারি ইল্যুশনে গত শতকের আশির দশকের শিল্পী মো. কাইমুল ইসলাম তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী করলেন। প্রদর্শনীর শিরোনাম : ‘দাদার পুনর্জন্ম : দৃশ্য ও শব্দ’। সম্ভবত বাংলাদেশে এটি প্রথম অংশগ্রহণমূলক কোলাজ প্রদর্শনী।
এটি আর দশটা প্রদর্শনী থেকে ভিন্ন ধরনের – শিল্পীর ভাবনায় দাদাবাদের পুনর্জন্ম আবাহনের বিশেষ একটি প্রদর্শনী। এতে মিশ্রমাধ্যমে সাম্প্রতিককালে আঁকা ২৪টি চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে, শিরোনাম কোলাজ ১ থেকে ২৪।
দাদাবাদের ইতিহাস
দাদাবাদ (Dadaism বা শুধু ‘Dada’) হলো বিংশ শতকে আবির্ভূত ক্ষণস্থায়ী এক শিল্প-সাহিত্য আন্দোলন, যা ১৯১৬ সালে সুইজারল্যান্ডের জুরিখ শহরের ক্যাবারে ভলতেয়ারে শুরু হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংস, মানুষের জীবনে অরাজকতা ও হতাশা শিল্পীদের মনে এক অস্তিত্ম ও বিদ্রোহের জন্ম দেয়। প্রচলিত শিল্পধারা ও যুক্তিবাদী সংস্কৃতিকে ভ্রান্ত মনে করে তাঁরা এর বিপরীতে নতুন চিন্তায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আবাহন করেন।
দাদাবাদীরা বিশ^াস করতেন যে, যুদ্ধ-পরবর্তী সভ্যতা অর্থহীন। তাই তার প্রতিফলন তাঁরা শিল্পে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন – অযৌক্তিকতা, ব্যঙ্গ, কোলাজ, কাকতালীয়তা এবং এতকাল ধরে অশিল্প বিবেচিত বস্তু ও বিষয়কে শিল্পে রূপ দেওয়া ছিল তাঁদের প্রধান লক্ষ্য।
‘Dada’ শব্দটি ফরাসি একটি শিশুকণ্ঠের উচ্চারণ থেকে নেওয়া, যার মানে খেলনা ঘোড়া। নামটির মধ্যেই প্রতিফলিত হয়েছে বিদ্রোহ ও নির্বুদ্ধিতার প্রতীকী ইঙ্গিত।
দাদাবাদী শিল্পীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন – জুরিখের হুগো বল, ত্রিসত্মান জারা, হান্স আর্প, বার্লিনের জন হার্টফিল্ড, জর্জ গ্রোজ, নিউইয়র্কের মার্সেল দুচাম, ফ্রান্সিস পিকাবিয়া, ম্যান রে প্রমুখ। এই শিল্পীরা দাদাবাদী শিল্পকে নতুন রূপ দেন।
প্যারিসে দাদাবাদ ফরাসি কবি-শিল্পীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯২০ সাল পর্যন্ত দাদাবাদ স্থায়ী হয়। এ থেকেই সুররিয়ালিজমের জন্ম।
শিল্পী কাইমুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ছাপচিত্র বিভাগ থেকে স্নাতক করেছেন ১৯৮৭ সালে। নবীনকাল থেকে প্রগতিশীল চিন্তা-চৈতন্য নিয়ে বেড়ে ওঠা শিল্পী কর্মজীবন শুরু করেছিলেন শিক্ষকতা দিয়ে। পরে তিনি করপোরেট বাণিজ্য সংস্থায় যোগ দেন। অবসর নিয়ে এখন ছবি আঁকায় মনোনিবেশ করেছেন।
শিল্পী কাইমুল দাদাবাদের আমূল বদলে দেওয়ার এই দ্রোহকে তাঁর শিল্পসৃজনে তুলে আনার প্রয়াস করেছেন দেশে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আলোকে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস চেতনায় আস্থাবান মানুষের বিশ্বাসকে ধারণ করা শিল্পীর মনে এই পরিবর্তনে উপেক্ষিত ইতিবাচকতার পরিবর্তে সংঘটিত হত্যা-নির্যাতন-ভাস্কর্য ভাঙচুর, পলায়ন, অবমাননা, মিথ্যা মামলায় দোষী-নির্দোষীর বাছবিচারহীন হয়রানি, বাকস্বাধীনতায় নিয়ন্ত্রণ, সংবাদমাধ্যমের সেলফ সেন্সরশিপ এমনতর নানাবিধ নিয়ম-অনিয়ম, আশা-নিরাশা, খেদ, বিশ্বাস-অবিশ্বাস যে অনুভূতি জাগিয়েছে, তারই এক প্রকার প্রকাশ ঘটেছে এই প্রদর্শনীর আয়োজন থেকে শিল্পীর কাজ, দর্শকদের অংশগ্রহণসহ প্রতিটি স্তরে।
সাম্প্রতিককালে উচ্চারিত ও বহুল আলোচিত ‘রিসেট বাটন’ এই বাক্যটিকে বিভক্ত করে তিনি চারটি চিত্র এঁকেছেন। চিত্রপটে শিল্পী তুলে ধরেছেন শুয়োরের অবয়বসহ প্রতিবাদী অনুষঙ্গ। তিনি চেয়েছেন তাঁর এই চিত্রমালায় দর্শকদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ। এজন্য ছাপচিত্র, অংকন, অ্যাক্রিলিক রঙে আঁকা-গড়া তাঁর একেকটি চিত্রের শূন্যস্থানে আঁকতে ও মন্তব্য লিখতে তিনি দর্শকদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। দর্শকরা সাড়া দিয়েছেন শিল্পীর এই আহবানে।
দর্শকের হাতে শূন্যস্থান ভরে গেছে। ফলে শিল্পীর উপস্থাপিত প্রথম দিনের ছবির সঙ্গে শেষদিনের ছবির অনেক ফারাক হলেও শিল্পীর ইচ্ছে পূরণ হওয়ায় তাঁর এই শিল্প-আয়োজন সফল হয়েছে বলে মনে করছেন তিনি।
শিল্পী প্রতিদিন খেয়াল করছিলেন, তাঁর উপস্থাপিত চিত্রকর্মের পট একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে। দর্শকরাও মজা পাচ্ছিলেন তাঁদের এমন অংশগ্রহণে। এক্ষেত্রে শিল্পীর দর্শন ও বিশ্বাস হচ্ছে – দ্রোহের ভাবনায় মানুষের যূথবদ্ধতার প্রয়াস যাতে সৃজনশীলতা পায় কাঙ্ক্ষিত পূর্ণতায়।
দাদাবাদের দ্রোহী চেতনার প্রভাব
আমাদের চিত্রশিল্পীদের বিদ্রোহী সৃজনকর্মেও দাদাবাদের
প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ কতক প্রভাবক ভূমিকা আছে বলা যায়। দাদার দ্রোহী চেতনার একটা ঝাপটা বিংশ শতকের ত্রিশের দশকে এসেছিল ভারতবর্ষেও। যেমন – রবীন্দ্র চিত্রকলায় আমরা দেখতে পাই ভারতবর্ষে প্রচলিত চিত্রকলার সঙ্গে কবির কাজের বিস্তর ফারাক।
উনিশশো তেতালিস্নশের মানবতাঘাতী ভয়াল মন্বন্তরের তীব্র অভিঘাতে জয়নুল ও চিত্তপ্রসাদের আঁকা ‘দুর্ভিক্ষের চিত্রাবলী’ ছিল প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ও মানবতার পক্ষে এক শিল্পাশ্রয়ী বিদ্রোহ। এক্ষেত্রে জয়নুল তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছিলেন সসত্মা কাগজে কালো কালিতে তুলির দ্রুত টানে দৃঢ় রেখায় ভুক্তভোগী ক্ষুধাক্লিষ্ট শীর্ণকায় মানুষসহ পথের কুকুর ও কাকের ছবি এঁকে।
১৯৭১ সালে পাকিসত্মানি শাসক ইয়াহিয়া – যার নির্দেশে সশস্ত্র পাকিসত্মানি সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেই ইয়াহিয়ার রক্তখেকো মুখ ও ১৯৮৯ সালে জাতীয় কবিতা উৎসবমঞ্চে কবি রবীন্দ্র গোপের স্কেচখাতায় আঁকা তাঁর শেষ চিত্র ‘দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে’ কামরুল হাসানের প্রতিবাদী চিত্রকর্ম, যা দাদাবাদের চেতনার সঙ্গে মিলেছে, শিল্পীর এই প্রতিবাদী অংকন জনচেতনাকে আরো জাগ্রত করেছিল।
গত শতকের পঞ্চাশের দশকে এখানকার তরুণ শিল্পী যেমন – আমিনুল ইসলাম, হামিদুর রাহমান, নভেরা আহমেদ, মুর্তজা বশীর, রশিদ চৌধুরীদের পাশ্চাত্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ফলে অর্জিত জ্ঞান ও দ্রোহচেতনায় তাঁদের হাত ধরে প্রচলিত শিক্ষার বাইরে প্রতিষ্ঠাবিরোধী শিল্পচর্চার সূত্রপাত ঘটে।
পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীদের অনেকেই ওইরূপ প্রতিবাদী কাজ করেছেন দিনের পর দিন। পরিতোষ সেন, গণেশ পাইন, সুনীল দাস, বিকাশ ভট্টাচার্যসহ আরো শিল্পীর কাজ দেখুন। তাঁদের কাজে এই বৈশিষ্ট্যগুলো পাওয়া দুর্লভ নয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রবিকাশের যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল সেটি বাধাগ্রস্ত হয় সমাজের নানা সংকট, হত্যা, ক্যু,ক্ষমতার রাজনৈতিক পালাবদলে। আশির দশকে একদল তরুণ শিল্পীর হাত ধরে তৈরি হয় ‘সময়’ নামে এক শিল্পী গ্রুপ। প্রচলিত সমাজ ও শিল্পের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছিল সময়ের। এই শিল্পীদলের সদস্য হলেন – ঢালী আল মামুন, শিশির ভট্টাচার্য্য, হাবিবুর রহমান, নিসার হোসেন, ওয়াকিলুর রহমান, তৌফিকুর রহমান, দিলারা বেগম জলি। পরে আরো যুক্ত হন সেলিম আহমেদ ও লালারুখ সেলিম। এই দলের ভাস্কর্য ও চিত্রকর্মে প্রতিষ্ঠাবিরোধী দ্রোহ দেখা গেছে, এর প্রভাবও পড়েছে সে-সময়ের নবীন তরুণদের শিল্পসৃজনে।
আশির দশকেই স্থপতি ও নির্মাতা এনামুল করিম নির্ঝরের যোজন চিত্রশালায় আয়োজিত ঢালী আল মামুনের গড়া দা, বঁটি, ছুরি-চাকু, বাউলি এসব দেশি অস্ত্রশস্ত্রের সন্নিবেশে স্থাপনা-ভাস্কর্য দেখেছেন দর্শক-শিল্পবোদ্ধারা। সামাজিক-রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপনা নিয়ে নিসার হোসেন ও শিশির ভট্টাচার্য্যের পেইন্টিং আলোচিত হয়েছে, শিল্পবোদ্ধাদের প্রশংসা পেয়েছে। সাভারের তাজরীন ফ্যাশনস গার্মেন্টস ট্র্যাজেডিসহ বিভিন্ন সময় অগ্নিকাণ্ডে হতাহত গার্মেন্টকর্মীদের স্মরণে শব্দ ও সুর সংবলিত যে-স্থাপনা প্রদর্শনী করেন দিলারা বেগম জলি, সমাজবাস্তবতা নিয়ে সেটিও এক শিল্পিত দ্রোহের প্রকাশ। শিল্পী কালিদাস কর্মকার তাঁর নানা কাজ দিয়ে আমাদের সমকালীন শিল্পভুবনে প্রতিবাদ জারি রাখতেন।
২০২৪ সালের ১৯ থেকে ২৭শে এপ্রিল ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের লা গ্যালারিতে সুরঞ্জনা ভট্টাচার্য নামে একজন শিল্পীর ‘এ প্যাচওয়ার্ক অফ লাইফ থ্রু পেইন’ শিরোনামে একটি প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়। তাঁর কাজগুলো দাদাবাদের সঙ্গে যায়। সেখানে মোট ৪২টি কোলাজ কাজ দেখানো হয়, যেগুলো ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে করা। প্রদর্শনীর কাজগুলোয় দৃষ্টিসংগত সীমাবদ্ধতা, শারীরিক যন্ত্রণা ও একাকিত্বের মধ্যেও শিল্প সৃষ্টি ও বেঁচে থাকার সংগ্রামের প্রতিফলন ঘটেছে। এ-কথা বললে অত্যুক্তি হবে না, দাদাবাদ ও এর হাত ধরে সৃষ্ট সুররিয়ালিজমের প্রত্যক্ষ ও অপ্রত্যক্ষ প্রভাব সমকালীন শিল্পে এবং চিন্তায় এখনো ক্রিয়াশীল!


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.