বুনো ফুলের চরণচিহ্ন

প্রাচীরের ছিদ্রে এক নামগোত্রহীন

ফুটিয়াছে ছোট ফুল অতিশয় দীন।

ধিক্ ধিক্ করে তারে কাননে সবাই –

সূর্য উঠি বলে তারে, ‘ভালো আছ ভাই?’

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘উদার-চরিতানাম্’, কণিকা

ষড়ঋতু ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত বিচিত্র ফুল ও ফসলের এই বাংলাদেশে ফুলের প্রসঙ্গ এলেই রবীন্দ্রনাথের কথা মনে পড়ে। দেশি-বিদেশি কত ফুল যে তিনি আমাদের চিনিয়েছেন, নামকরণ করেছেন, অচেনা বিদেশি ফুলের চারা এনে রোপণ করেছেন, তার কোনো হিসাব নেই। এসবের মধ্যে বুনো ফুলের বর্ণনা-বিবরণ-পরিচিতিও কম নেই। বাংলা ভাষার প্রকৃতিবিষয়ক কবিতা-সাম্রাজ্যের দিকে যদি আলতো চোখ ফেরাই তবু কত চেনা-অচেনা, এমনকি রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘নামগোত্রহীন’ ফুলের কথা পাওয়া যায়। কৈশোরে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথ-রচিত প্রথম কাব্যের নামই তো বনফুল – যদিও প্রকাশনার দিক থেকে তা দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। প্রকৃতিপ্রেমের সঙ্গে বনফুলের সৌন্দর্য, সৌগন্ধ ও রূপমাধুরীরসের সব বিষয় যেমন পুষ্পপ্রেমিক, তেমনই উদ্ভিদবিজ্ঞানীর গবেষণার বিষয় হতে পারে। আর দ্বিজেন শর্মার মতো দুধারি পণ্ডিত হলে তো সোনায় সোহাগা! তিনি তো ফুলের সৌন্দর্যকলা ও উদ্ভিদবিজ্ঞানের তথ্য রাসায়নিক জাদুমিশ্রণে এক নতুন শিল্প সৃষ্টি করেছেন তাঁর রচনায়।

নজরুলের গানে-কবিতায়ও বুনো ফুলের বিবরণ কম আসেনি : ‘আয় বনফুল ডাকিছে মলয়,/ এলোমেলো হাওয়ায় নূপুর বাজায়, কচি কিশলয়।’ এমন অনেক চরণ নজরুলের গান থেকে চয়ন করা যায়। রবীন্দ্রপ্রজন্ম ও রবীন্দ্রোত্তর বহু কবির কবিতায় পুষ্পপ্রীতির প্রকাশ ঘটেছে – এমনকি বুনো ফুলের প্রতি ভালোবাসাও। এক্ষেত্রে চোখ মুদে নাম করা যায় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত ও অজিত দত্তের। অজিত দত্তের প্রথম বইয়ের শিরোনামই কুসুমের মাস। রবীন্দ্রোত্তর ছোটগল্পের বিখ্যাত লেখক বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের লেখকনাম আমরা সবাই জানি, বনফুল।  মানুষের অনাদরে, অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালে, কেবল প্রকৃতির লালনপালনে ফুটে-ওঠা এই বুনোফুল নামে-বেনামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পথেঘাটে এবং আমাদের চারপাশে। পুষ্পপ্রেমিক ও বাগান-বিলাসীদের কাছে পথশিশুদের মতো অবহেলার পাত্র হয়েও বুনোফুল ঠাঁই করে নিয়েছে এ-কালের কবিতায় ও কথাসাহিত্যে। রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ দাশের কবিতা এবং বিভূতিভূষণ ও তারাশঙ্করের উপন্যাস মোটা দাগে এর সাক্ষ্য দেয়। জীবনানন্দের যে-কোনো কবিতার বইয়েই পাওয়া যাবে অনাথ শিশুদের মতো বুনোফুলের বর্ণনা ও ভালোবাসার প্রকাশ।

বনফুল, বুনোফুল, বন্যফুল, বনজ ফুল – এই শব্দচতুষ্টয়ের দিকে একটু বিশেষভাবে ফিরে তাকাই। এগুলোর অর্থ অভিন্ন এবং পূর্বপদে যুক্ত আছে মৌলিক শব্দ ‘বন’। অর্থগত ভিন্নতা না-থাকলেও এগুলোর গঠন ও পদপরিচয়ে ভিন্নতা আছে। ‘বনফুল’ শব্দটির উভয় পদই বিশেষ্য। এটি সমাসনিষ্পন্ন পদ। বনের ফল = বনফুল। ষষ্ঠী বিভক্তির চিহ্ন (র, এর) লোপ পেয়েছে বলে ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস। যদি এর ব্যাসবাক্য হয়, ‘বনে জন্মে/ ফোটে যে ফুল’ তবে মাঝের পদ লোপ পাওয়ায় তা মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস। ‘বুনো’ শব্দটি পদবিচারে বিশেষণ বা বিশেষ্যের বিশেষণ। ‘বন্যফুল’-এর ‘বন্য’ তদ্ধিতান্ত শব্দ। এটি তদ্ধিত প্রত্যয়জাত শব্দ। বন + ষ্ণ্য/ য = বন্য। সমাস-বিচারে এটিও মধ্যপদলোপী কর্মধারয়। এর ব্যাসবাক্য বনে উৎপন্ন/ জাত যে ফুল = বন্যফুল। ‘বনজ’ শব্দটির মানে, বনে জন্মে যে ফুল। এটিও তদ্ধিত প্রত্যয়জাত শব্দ এবং সমাস-বিচারে তা উপপদ তৎপুরুষ সমাস। কোনো শব্দের শেষে যখন ‘জ’ যুক্ত থাকে তখন বুঝতে হবে, এর অর্থ – ‘জন্মে যে’ বা ‘জন্মে যা’। যেমন, জলজ = জলে জন্মে যা, প্রাণিজ = প্রাণীতে জন্মে যা, ফুলজ = ফুলে জন্মে যা ইত্যাদি। ‘বুনোফুল’ শব্দের আরো অনেক প্রতিশব্দ বাংলায় আছে : বনকুসুম, বনপুষ্প, বনকোরক, বনমঞ্জরি, বনকলি, জংলি ফুল, অরণ্যফুল, অরণ্যপুষ্প, অরণ্যপ্রসূন, অটবীপুষ্প ইত্যাদি।

দুই

ফুল বীজের বিধাতা, ফলের মাতা। পরাগায়ণের মাধ্যমে প্রসব করে ফল এবং বীজ। এই বিবেচনায় ফুল আসলে বৃক্ষের যৌনাঙ্গ ও জননযন্ত্র। ফুলের মধ্যে একই সঙ্গে অবস্থান করে পুংকেশর ও গর্ভকেশর। গাছ প্রাপ্তবয়স্ক হলে যৌবনবতী হয়। তখন তাতে ফুল ফোটে আর ফুলের ভেতর বিকশিত হয় পুংকেশর ও গর্ভকেশর। বাহারি রঙে সজ্জিত ফুলের রূপে বা বৃক্ষের সঞ্চিত সুগন্ধে আকৃষ্ট হয় কীটপতঙ্গ – তাতে হয় পরাগায়ণ। আর ফুলের সৌগন্ধ্য ও

রং-রূপের সৌন্দর্যে মোহিত হয় মানুষ। রঙিনাযুত সৌন্দর্য ও গন্ধ-ছড়ানো সব ফুলেরই ধর্ম, তবে এর চাইতে বড় সত্য বংশবিস্তার। সৌন্দর্যে এবং সৌগন্ধ্যে মানুষ, প্রাণী ও পতঙ্গকুল ফুলের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তবে ফুলের প্রতি কীটপতঙ্গের আকর্ষণ মূলত সৌন্দর্যের জন্য নয় – মধু সংগ্রহের জন্য। ফুল ও পতঙ্গের অজান্তেই প্রকৃতিগতভাবে ঘটে পরাগায়ণ। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানের বাণীতে লিখেছেন : ‘অলি বার বার ফিরে যায়, অলি বার বার ফিরে আসে – তবে তো ফুল বিকাশে॥’ (গীতবিতান, প্রেমপর্যায়, ৩১৭ নম্বর গান)। এই বাণীর ভেতরে কি উদ্ভিদবিজ্ঞানের পরাগায়ণ-তত্ত্বের সত্যটি লুক্কায়িত নেই! কীটপতঙ্গের পুষ্পাকর্ষণ প্রাকৃতিক ও বৈষয়িক কিন্তু মানুষের পুষ্পপ্রীতি মনস্তাত্ত্বিক ও সৌন্দর্যচেতনাজাত। পুষ্পপ্রেমিক বলেই রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন : ‘ফুলের বনে যার কাছে যায় তারেই লাগে ভালো’ এবং  ‘ফুলের গন্ধ বন্ধুর মতো জড়ায়ে ধরিছে গলে’। পুষ্পপ্রেমমুগ্ধ যতীন্দ্রমোহন বাগচীর বিনম্র ভাষায় : ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না, একলা জেগে রই’। ফুল যেমন নিজেকে প্রকাশ করে তার রূপ ও গন্ধে, তেমনি রবীন্দ্রনাথেরও প্রকাশ ঘটেছে তাঁর গানের বাণী ও সুরে।

কাকে বলে বুনোফুল, তা চিনিইবা কীভাবে? এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ায় লেখা হয়েছে : ‘চাষ বা যত্ন ছাড়া বেড়ে ওঠা সপুষ্পক উদ্ভিদ।’ (বাংলাপিডিয়া, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃ ১৬৮, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি)। লোকচক্ষুর অন্তরালে অনাদর-অবহেলায় জন্মে যে লতাগুল্ম ও বৃক্ষকুল, সেগুলোই বুনোগাছ এবং এর বীজাধার  হলো বুনোফুল। এরা মানুষের যত্নহীন ও সংস্পর্শহীন প্রকৃতিতে জন্মে, প্রকৃতিতেই ঝরে যায়। ‘তোমার হলো শুরু, আমার হলো সারা’ – রবীন্দ্রনাথের এই গানের মতো ফুল ঝরে গেলে জন্মে ফল। সেসব ফল হয় কীটপতঙ্গ ও পশুপাখির খাদ্য।

বুনোফুলের বিকাশ ও বিলয় সাধারণত মানুষের দৃষ্টিসীমার অন্তরালে। সেজন্যই রবীন্দ্রনাথ বুনোফুলকে ‘নামগোত্রহীন’ এবং ‘অতিশয় দীন’ বলেছেন। বুনোফুল মানুষের স্বার্থান্ধ ভালোবাসা না-পেলেও পায় প্রকৃতির অনাবিল প্রেম। এসব ফুল বিত্তবান পুষ্পপ্রেমিক বা অভিজাত মানুষের বিলাসী বাগানে স্থান পায় না! তাদের স্থান প্রকৃতির প্রসারিত কোলে। বনবনাঞ্চল, খাল-বিল-ঝিল, নালা-নর্দমা, পথ-ঘাট-প্রান্তর বুনোফুলের জন্মস্থান। তবে ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে সর্ববিধ ফুলই বুনোফুল। কারণ সৃষ্টির ইতিহাস-বিচারে উদ্ভিদজগতের অনেক পরে জীবজগৎ ও মানুষের উদ্ভব। নন্দনজ্ঞান ও সৌন্দর্যবোধ জাগ্রত হওয়ার পর মানুষ পুষ্পপ্রেমে বিগলিত হয়ে ফুলকে বাগানবন্দি করেছে, রোপণ করেছে আঙিনা ও প্রাঙ্গণে। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় এ-সত্যের স্বীকৃতি মেলে। তিনি বনজ ফুলের বৃক্ষকে মানুষের আনন্দসঙ্গী হতে আতিথ্য-গ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়ে লিখেছেন :

আয় আমাদের অঙ্গনে,/ অতিথি বালক তরুদল

মানবের স্নেহসঙ্গ নে,/ চল্ আমাদের ঘরে চল্

শ্যামবঙ্কিম ভঙ্গীতে/ চঞ্চল করসঙ্গীতে

দ্বারে নিয়ে আয় শাখায় শাখায়/ প্রাণ-আনন্দ কোলাহল!

(‘বৃক্ষরোপণ উৎসব’, বনবাণী)

মানুষ পুষ্পপ্রেমিক ও বাগানবিলাসী হয়ে উঠেছে কিছুটা প্রয়োজনে, কিছুটা অপ্রয়োজনে। প্রয়োজনটা বৈষয়িক, অপ্রয়োজনটা আত্মিক। গাছের লতাপাতা, শিকড়বাকড়ের ঔষধিগুণের কথা আপাতবিস্মৃত হয়েও বলা যায়, বৃক্ষের ফল বৈষয়িক, ফুল আত্মিক। তাই উদ্ভিদবিজ্ঞানের নন্দনতাত্ত্বিক দ্বিজেন শর্মা লিখেছেন : যখন মানুষ ‘প্রয়োজনের জগৎ থেকে মুক্তির জগতে উত্তীর্ণ হয়েছে, ভালোবাসতে শিখেছে অপ্রয়োজনীয়কেও, বলতে পেরেছে ‘যেথা যত ফুল আছে বনে বনে ফুটে, আমার পরশ পেলে খুশি হয়ে ওঠে’। এভাবেই ফুল মানুষের জীবনে আনন্দময় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে, স্থান পেয়েছে  কাব্যে,  সংগীতে, শিল্পকলায়, আধ্যাত্ম সাধনায় ও শেষে বাণিজ্যিক পণ্যসম্ভারে।’ (দ্বিজেন শর্মা, ‘কুসুমে কুসুমে চরণচিহ্ন’, মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা, বৃক্ষ ও পরিবেশ সংখ্যা, পৃ ৯)। তাই বলা যায়, সব ফুলই বুনোফুল, পুষ্পমাত্রই অরণ্যজাত এবং বনের ললিত সৌন্দর্য। তাই বলতে দ্বিধা নেই, মানবসৃষ্ট হলেও বাগানমাত্রই ক্ষুদ্র বন, মিনি বনানী।

বৈষ্ণব-সাহিত্য ও রবীন্দ্রকাব্যে ‘কুঞ্জবন’ বা ‘ফুলবন’ শব্দটির অন্তরেও অরণ্য-গন্ধের আভাস পাওয়া যায়।

রূপে-রঙে, গন্ধে-বর্ণে, আকৃতি-প্রকৃতিতে বুনোফুলের অন্ত নেই। বিচিত্র এর রূপ-রং, অনির্ণেয় এর গন্ধসুধা, বহুমাত্রিক এর আকৃতি-প্রকৃতি। গাছগাছালি সম্পর্কিত জ্ঞানের আকর, যাকে বলি উদ্ভিদবিজ্ঞান, তাতেও এসবের পূর্ণ পরিসংখ্যান নেই! তবু সম্প্রতি প্রাপ্ত প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য সন্নিবেশ করা যাক।

উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা বলেন, পৃথিবীতে তিন লক্ষ প্রজাতির উদ্ভিদ আছে। এর মধ্যে হাজার-হাজার প্রজাতি এখনো আমাদের অজানা-অচেনা। যা আমরা চিনিজানি তার মধ্যে মাত্র পাঁচভাগ (দেড় হাজার প্রজাতি) কাজে লাগাতে পারছি। বাংলাদেশে যেসব বুনোফুল ফোটে তার সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার। সকল অঞ্চলে সব বুনোফুল ফোটে না। তাই এসব বুনোফুলের উদ্ভিদগুলোকে আবার অঞ্চল অনুযায়ী ভাগ করা হয়েছে। এই বুনোফুলগুলোর বাংলা নাম খুবই হৃদয়গ্রাহী এবং শ্রবণমধুর। অঞ্চলভেদে এরকম সুখশ্রাবী কিছু নাম উল্লেখ করা হলো।

* কৃষি ও প্লাবনভূমিতে : কুলেকাড়া, ছোট মোরগফুল, ঢোলপাতা, ঝুরঝুরি, কাশ, শেয়ালকাঁটা।

* পথপাশ বসতবাড়িতে : বাসক, সর্পগন্ধা, আকন্দ, বিছুটি, গোবুরা, চাকুন্দা, বাবলা, জংলি শন, পিতরাজ, ডেউয়া, কদম, বেত।

* পাহাড় ও বনে : নীললতা, নিমআদা, গাইছালতা, সাদা কলমি, পাহাড়ি কাশ, লেটকাঁটা, বনকদলী, বননারাঙ্গা, কুকরা, ঢোলসমুদ্র, হলদে ফুল, দাঁতরাঙা, খরখরা জাম, ঘাসফুল, নাগবল্লি, বান্দরহুলা, মাকরি শাল, শাঠি, বনআদা ইত্যাদি।

* স্বাদু পানির জলাভূমিতে : হিজল, হেলেঞ্চা, চাঁদমালা, শাপলা, কলমি, পাটিবেত, পানিকাপর, কচুরিপানা, রক্তকমল, শোলা, বড়নখা, জলধনিয়া ইত্যাদি।

* উপকূলীয় অঞ্চলে : গোলপাতা, হেন্তাল, হাড়গজা, সমুদ্র লাবুনি, পিণ্ডারি, পরশপিপুল, বোলা, কেয়া, সাগর নিশিন্দা, নানা প্রজাতির ম্যানগ্রোভ, ছাগলঘুরি, সাগর কলমি, বন শন ইত্যাদি। (বাংলাপিডিয়া, ষষ্ঠ খণ্ড, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, পৃ ২৭০-২৭১)।

সন্দেহ নেই, বুনোফুল বিশ্বসৃষ্টির ঊষালগ্নে প্রকৃতি-সৃজিত সম্ভারের প্রথম নান্দনিক বস্তু – রবীন্দ্রনাথ যাকে পৃথিবীর ‘আদি প্রাণ’ বলে বর্ণনা করেছেন। কেবল তা-ই নয়; ‘বৃক্ষবন্দনা’ কবিতায় তিনি পৃথিবীর প্রথম প্রাণসত্তা বৃক্ষকে ‘মৃত্তিকার বীর সন্তান’, ‘হে  নিস্তব্ধ, হে মহাগম্ভীর’ এবং ‘সূর্যরশ্মিপায়ী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ভারতীয় পৌরাণিক ঐতিহ্যেও মানুষের জীবনধারণ ও সৌন্দর্য উপভোগে বনজ বৃক্ষ ও বুনোফুলের উল্লেখ আছে। পুষ্পপ্রেমিক ও বৃক্ষবিজ্ঞানী দ্বিজেন শর্মা লিখেছেন : ‘তিন হাজার বছরের পুরনো ঋগে¦দে পুষ্পাচ্ছন্ন বনরাজির প্রশস্তি বর্ণিত হয়েছে। আড়াই হাজার বছর আগে লেখা রামায়ণ ও মহাভারতে আছে পুষ্পশোভিত হ্রদ, নাগরিক উদ্যান ও অশোকবনসহ চম্পা, নাগচম্পা, শালতরু, কদম্ব, জুঁই, কুমুদ, নীলোৎপল ও সহস্রদল মধুগন্ধী অপরূপ কমলের কথা। শাল ও পলাশশোভিত লুম্বিনীউদ্যানে ভূমিষ্ঠ হন গৌতম বুদ্ধ খ্রিষ্টপূর্ব ৫৬৩ সালে। … প্রায় দেড় হাজার বছর আগে গণিতবেত্তা আর্যভট্ট উত্তর ভারতকে সূর্যালোক ও পদ্মের দেশ বলে বর্ণনা করেছিলেন। প্রায় শতাব্দীকাল পরে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের সভাকবি কালিদাসের কাব্যে এদেশের অজস্র তরুলতার পরিচয় উজ্জ্বল হয়ে আছে।’ (‘কুসুমে কুসুমে চরণচিহ্ন’, মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা, বৃক্ষ ও পরিবেশ সংখ্যা, পৃ ৯)। মহাজনের এসব বিবরণ থেকে পৌরাণিক যুগে বনজ পুষ্পপ্রীতির পরিচয় পাওয়া যায়।

ভারতীয় পৌরাণিক সাহিত্য ও কালিদাস-ভবভূতির সংস্কৃত সাহিত্য-ভাণ্ডারের কথা বাদ দিলেও বাংলা সাহিত্যের চর্যাপদ থেকে বৈষ্ণব-সাহিত্য ও মঙ্গল-কাব্যে বুনোফুলের প্রচুর বর্ণনা পাওয়া যায়। আমাদের লোকসাহিত্যে, বিশেষত হিরে-জহরত-খচিত মৈমনসিংহ গীতিকায়ও মেলে বিচিত্র বুনোফুলের ব্যাপক বিন্যাস। সেসব রত্নভাণ্ডার থেকে কয়েকটি উজ্জ্বল পঙ্ক্তি :

* নানা তরুবর মোউলিলরে

অগনত লাগেলী ডালী ॥ (চর্যাপদ)

* দুইহো মনের উল্লাসে করিল বনবিলাসে। (বড়ুচণ্ডীদাস)

* নৃপ-আসন নব পাটল পাত/ কাঞ্চন কুসুম ছত্রধরু মাথ। (বিদ্যাপতি)

* তোলে পুষ্পকুরুবক কুন্দ আর কুরুণ্ডক

কদম্ব কনক করবীর।      (কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম চক্রবর্তী)

* বৈশাখ এদেশে বড় সুখের সম

নানা ফুল গন্ধেমন্দ গন্ধবহ বয়।   (ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর)

* অশোক কিংশুক মধুটগর চম্পক পুন্নাগ নাগেশ্বর

গন্ধরাজ যুতি ঝাটি মনোহর বাসক বক শেফালিকা। (ওই)

* চাইর কোণা পুষ্কুনির পারে চম্পা নাগেশ্বর

ডাল ভাঙ্গ পুষ্প তুল কে তুমি নাগর। (মৈমনসিংহ গীতিকা)

* গাঁথ গাঁথ সুন্দর কন্যা লো মালতীর মালা

ঝইরা পড়ছে সোনার বকুল গো ঐ না গাছের তলা।

                                        (মৈমনসিংহ গীতিকা)

* যেন হেলিয়া দুলিয়া পড়ে/ নাগেশ্বরের ফুল। (সিলেটি লোকগীতি)।

প্রাচীন ও মধ্যযুগের সাহিত্যের ধারাবাহিকতায় আমরা লক্ষ করি, উনিশ শতকের মাইকেলি যুগের সমকালীন সাহিত্যেও বুনোফুল বিভিন্ন কবি-লেখকের রচনায় রূপায়িত হয়েছে। মধুকবির পাশাপাশি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র, মীর মশাররফ হোসেন প্রমুখের রচনায় এর সাক্ষ্য মেলে। এমন কয়েকটি উদাহরণ :

* বনকমলিনী কুরঙ্গিণী সুলোচনা। (মাইকেল)

* চতুর্দিকে বিবিধ বনকুসুম বিকশিত। (ওই)

* দয়াময়ী বনদেবী ফুল অবচয়ি রেখেছেন …। (ওই)

* প্রস্ফুটিত বন প্রসূন সৌরভামোহিত মন্দ গন্ধবহে…। (দীনবন্ধু মিত্র)

* বনপুষ্প সকল নন্দনকাননের পুষ্প হইতেও আদরের। (মীর মশাররফ হোসেন)।

* কতই কুসুম আরো আছে বঙ্গ আগারে …

টগর মল্লিকা নানা নিশিগন্ধা শোভারে…। (হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)।

অরণ্য, বনবনানী, বুনো ফুলফল – এসবের মধ্যে বাংলার

কবি-লেখকরা নরত্ব ও দেবত্ব আরোপ করেছেন।

অরণ্য-সাম্রাজ্যের অধীশ্বরকে কল্পনা করেছেন দেবদেবী বা নরনারীর স্বরূপ। তাতে অরণ্য মানবত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই দেবত্ব ও মানবত্ব আরোপের জন্য তারা অরণ্য-সাম্রাজের অধীশ্বরকে নানাভাবে আখ্যায়িত করেছেন। বনদেবী, বনলক্ষ্মী, বনরাজ, বনসখা, বনদেবতা, বনরানি, বনকন্যা, অরণ্য-দুহিতা, বনসুন্দরী ইত্যাদি অভিধায় অভিষিক্ত করেছেন। এই নরত্বারোপ ও দেবত্বারোপ অরণ্য-সাম্রাজ্যকে নতুন চেতনায় অভিষিক্ত করেছে।

তিন

প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও ষড়ঋতুর দেশ এই বঙ্গভূমি। এদেশের প্রকৃতি সৃজিত হয়েছে বনবনানী, লতাগুল্ম, গাছগাছালি ও বিচিত্র রঙিন ফুলে। এর মধ্যে প্রকৃতিলালিত

চেনা-অচেনা বুনোফুলের  সংখ্যাধিক্য। তাই আধুনিক বাংলা কাব্যে ও কথাসাহিত্যে প্রকৃতি ও পরিবেশ বর্ণনায় বুনোফুলের সমারোহ লক্ষ করা যায়। বাংলা সাহিত্যের মূলধারার চারজন কবি ও কথাশিল্পী এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য বলে মনে করি : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, জসীম উদ্দীন ও বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। এই স্রষ্টাদের মধ্যে রবীন্দ্র-নজরুল কবিতার পাশাপাশি তাঁদের সংগীত-সাম্রাজ্যে রঙিনাযুত বিচিত্র ফুলের সৌন্দর্য ও সুবাসের কথা বর্ণনা করেছেন। বিশেষত তাঁদের ঋতুভিত্তিক কবিতা ও গানে এর প্রাচুর্য অধিক। তবে সেসব ফুল অধিকাংশই বাগানবিলাসী নয়, মালীর সযত্নে লালিতও নয় – নিতান্তই অযত্ন-অবহেলায় প্রকৃতির কোলে,
পথে-প্রান্তরে ও বনবনানীতে ফুটে-থাকা বুনোফুল। শুরুতে কবিগুরুর কবিতা ও গান থেকে কয়েকটি হীরকজ্যোতিময় পঙ্ক্তি :

* আকাশ হাসে শুভ্র কাশের আন্দোলনে –

সুর খুঁজে তাই শূন্যে তাকাই আপন মনে ॥

(২৩ নম্বর গান, প্রেমপর্যায়, গীতবিতান)

* চেনা কুসুম ফুটে আছে না-চেনা এই গহন বনের ধারে

অচেনা এই পথের অন্ধকারে ॥

(৩০ নম্বর গান, ওই, গীতবিতান)

* সে কথা ফুটিয়া উঠে কুসুম বনে,

সে কথা ব্যাপিয়া যায় নীল গগনে।

(৩৬ নম্বর গান, ওই, গীতবিতান)

* ওগো শোনো কে বাজায়।

বনফুলের মালার গন্ধ বাঁশির তানে মিশে যায় ॥

(৫৬ নম্বর গান, ওই, গীতবিতান)

* বনে যদি ফুটল কুসুম নেই কেন সেই পাখি।

(২৫৫ নম্বর গান, ওই, গীতবিতান)

* বঁধূ তোমায় করব রাজা তরুতলে,

বনফুলের বিনোদমালা দেব গলে॥

(৩৬৮ নম্বর গান, ওই, গীতবিতান)

* আমার বনে বনে ধরল মুকুল,

বহে মনে মনে দক্ষিণ হাওয়া।

(২০০ নম্বর গান, বসন্ত, গীতবিতান)

* এসো বনমল্লিকাকুঞ্জে এসো হে, এসো হে, এসো হে।

(২০২ নম্বর গান, ওই, গীতবিতান)

* বাতাস ছুটেছে বনময় রে, ফুলের না-জানে পরিচয় রে।

(২০৭ নম্বর গান, ওই, গীতবিতান)

* আজ দখিন-বাতাসে

নাম-না-জানা কোন্ বনফুল ফুটল বনের ঘাসে।

(২২৬ নম্বর গান, ওই, গীতবিতান)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতবিতানে, বিশেষত প্রেম,

প্রকৃতি ও ঋতুপর্যায়ের গানে এমন শতশত পঙ্ক্তি উদ্ধার করা যাবে যাতে বুনোফুলের সৌন্দর্য-মহিমা বিধৃত হয়েছে। গানের সমান্তরালে তাঁর কবিতায়ও বুনোফুলের সৌন্দর্য ও সৌগন্ধ্যের মহিমা কম প্রকাশিত হয়নি। কবিতা থেকেও অজস্র উদ্ধৃতি উদ্ধার করা যেতে পারে। বলাই বাহুল্য, রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ প্রকৃতিবিষয়ক কবিতায়ই কমবেশি নানা চেনা-অচেনা ফুলের সমারোহ লক্ষ করা যায়। তাঁর অর্ধশতাধিক কাব্যগ্রন্থে তো বিচ্ছিন্নভাবে বুনোফুলের বর্ণনা আছেই অধিকন্তু তাঁর ‘স্ফূলিঙ্গ’, ‘বন-ফুল’, ‘ভগ্নহৃদয়’, ‘শৈশবসঙ্গীত’ ইত্যাদি প্রথম জীবনে রচিত কাব্যে ফুল ও বুনোফুলের উপমা-উৎপ্রেক্ষা লক্ষ করা যায়। সৃষ্টির ঊষালগ্নে পৃথিবীর বর্ণনা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন : ‘এমন সময় কোন্ সুযোগে বনলক্ষ্মী তাঁর দূতীগুলিকে প্রেরণ করলেন পৃথিবীর এই অঙ্গনে, চারিদিকে তার তৃণশষ্পের অঞ্চল বিস্তীর্ণ হল, নগ্ন পৃথিবীর লজ্জা রক্ষা হল। ক্রমে ক্রমে এল তরুলতা প্রাণের আতিথ্য গ্রহণ করে।’ (‘অরণ্যদেবতা’, রবীন্দ্ররচনাবলী, চতুর্দশ খণ্ড, পৃ ৪০৪, ঐতিহ্য)। প্রাণের প্রথম প্রকাশ উদ্ভিদে, ফুলে তার বংশগতি ও সৌন্দর্যের বিকাশ। এখানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা থেকে কয়েকটি উদ্ধৃতি :

* শ্বেত পাথরেতে গড়া/ পথখানি ছায়াকরা

ছেয়ে গেছে ঝরে গেছে বকুলে। (‘মদনভস্মের পূর্বে’)

* বসন্তে উঠিত ফুটে বনে বেলফুল … (‘ব্যস্ত প্রেম’)

* সকল বন আকুর করে শুভ্র শেফালিকা … (‘সুপ্তোত্থিতা’)

* পথপাশে মল্লিকা দাঁড়ালো আসি … (‘বরযাত্রা’)

* এই শ্রাবণবেলা বাদলঝরা যূথীবনের গন্ধেভরা। (‘বর্ষা’)

 * বারম্বার ঝরে ঝরে পড়ে ফুল

  জুঁই চাঁপা বকুল পারুল/ পথে পথে। (‘বলাকা’)

* নদীর তীরে কাশের দোলা,

  শিউলি ফোটে দূরে। (‘অজয় নদী’)

* বনের বক্ষে উঠেছে আজ জ্বলে চামেলি ওই … (‘বিস্মরণ’)

* চাই না জ্ঞেয়ান, চাই না জানিতে/ সংসার, মানুষ

        কাহারে বলে।

  বনের কুসুম ফুটিতাম বনে/ শুকায়ে যেতাম বনের কোলে।

(বন-ফুল কাব্যোপন্যাসের প্রথম সর্গের সূচনা।)

* বনের কুসুমকলি/ তপনতাপনে জ্বলি

শুকায়ে মরিবে নাকি করেছে মনন। (বন-ফুল, অষ্টম সর্গ)

* এলোথেলো চুলে বনফুলমালা/ দেহে এলোথেলো

         বাস – (‘প্রতিশোধ’, শৈশব সংগীত)

* অজানা পান্থের মতো ডাক দিলে অতিথির ডাকে,

অপরূপ পুষ্পোচ্ছ্বাসে, হে লতা, চিনালে আপনাকে। (‘নীলমণিলতা’, বনবাণী)।

বুনোফুলের সৌন্দর্য, মহিমা ও রূপমাধুরী সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের কবিতা থেকে এমন অজস্র কবিতার পঙ্ক্তিকণা উদ্ধার করা যায়। আর ছেলেবেলায় ‘আমাদের ছোট নদী’ কবিতার ‘একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা’ – এই উজ্জ্বল পঙ্ক্তি কার না মনে আছে! আমাদের দেখা-অদেখা, চেনা-অচেনা অসংখ্য বুনোফুলের বর্ণনা তিনি করেছেন বিভিন্ন কবিতায়। কিন্তু বুনোফুলের প্রতি আমাদের অবহেলা, ঔদাসীন্য ও তুচ্ছতাচ্ছিল্যের বিবরণ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বুনোফুলের প্রতি পরম মমতা প্রকাশ করেছেন বনবাণী কাব্যের ‘কুরচি’ কবিতায় :

তুমি আভিজাত্যহীনা,

নামের গৌরবহারা; শ্বেতভুজা ভারতীর বীণা

তোমারে করে নি অভ্যর্থনা অলংকারঝংকারিত

কাব্যের মন্দিরে। …

আমি কবি লজ্জা পাই কবির অন্যায় অবিচারে

হে সুন্দরী। শাস্ত্রদৃষ্টি দিয়ে তারা দেখেছে তোমারে,

রসদৃষ্টি দিয়ে নহে; শুভদৃষ্টি কোনো সুলগনে

ঘটিতে পারে নি তাই, ঔদাস্যের মোহ-আবরণে

রহিলে কুণ্ঠিত হয়ে।

তোমারে দেখেছি সেই কবে

নগরে হাটের ধারে জনতার নিত্যকলরবে,

ইটকাঠপাথরের শাসনের সংকীর্ণ আড়ালে,

প্রাচীরের বহিঃপ্রান্তে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় বুনোফুল ‘আভিজাত্যহীনা, নামের গৌরবহারা’। অজ্ঞাতকুলশীল বিবিধ এই ফুলের যেন আলাদা কোনো নাম নেই – রূপেরঙে, রসেগন্ধে ভিন্ন হলেও সবারই এক নাম, বুনোফুল। এ-ফুল রমণীর খোঁপায় স্থান পেলেও বিগ্রহের চরণে পায় না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, আমরা বুনোফুলকে ‘শাস্ত্রদৃষ্টি’ দিয়ে দেখি কিন্তু ‘রসদৃষ্টি’ দিয়ে অনুভব করি না। সেই নামহীনা বুনোফুল ধূলি-ধূসরিত পথপ্রান্তে, ইটপাথরের আড়ালে, প্রাচীরের বাইরে অনাদরে ফোটে, অবহেলায় ঝরে যায়! কিন্তু মানবচক্ষুর অন্তরালে হলেও প্রকৃতির সোহাগে সে জীবনচক্র পূর্ণ করে – ফুল ফোটায়, রং ছড়ায়, গন্ধ বিলায়, ফল ধরায়, বীজের বিকাশ করে এবং কীটপতঙ্গ ও পক্ষীকুলের আহার জোগায়।

চার

কাজী নজরুল ইসলামও ছিলেন বাংলা কবিতা-গান ও গদ্যের আরেক অন্যতম দিকপাল। দৃষ্টিনন্দন ও গন্ধসুধাময় ফুলের জগৎ তাঁর কাব্যগীতিতে প্রপাতের মতো পরিকীর্ণ। লোকচক্ষুর অন্তরালের বুনোফুলও তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি, বরং তা হয়েছে নজরুলের রচনায় অভিষিক্ত ও অলংকৃত। নজরুল ইসলাম কেবল সংখ্যার আধিক্যে বিশ্বের সেরা গীতিকবি নন; বহুমুখী সুর ও বাণীর বৈচিত্র্যে তিনি বাংলা গানের রাজাধিরাজ। তাই তাঁর গানের বাণীতে আছে বিচিত্র বনফুলের ছন্দহিন্দোল, সুরেও আছে বুনোফুলের রূপমাধুরী এবং সুগন্ধ। চকিত অবলোকনে নজরুলের গানের ভাণ্ডার থেকে বনফুলের রং ও গন্ধমাখা একগুচ্ছ উদ্ধৃতি :

* কর্ণ-মূলে দুল দুলিও দুলাল-চাঁপার কুড়ি

বন-অতসীর কাঁকন পরো, কনক-গাঁদার চুড়ি। (আবদুল কাদির সম্পাদিত নজরুল রচনাবলী, তৃতীয় খণ্ড)

*… বন-কুন্তলে গরবী/ আমি কানন-করবী। (নজরুলগীতি, অখণ্ড, পৃ ১৪০)

* বোরকা খুলি বন-কেতকীর/ ফুলরেণুতে রাঙলো গা। (ওই)

* বন-তমালের ডালে বেঁধেছি ঝুলনা

আজি রাতে দুলিব গো মোরা দুজনা। (ওই)

* … চল্ ভাই ফুল আনি – চল্ আমরা বনদেবতাকে সাজাব। (মধুমালা, প্রথম অঙ্ক)

* হল অশোকে শিমুলে বন-পুষ্প রচা। (‘মাধবী-প্রলাপ’, সিন্ধু-হিন্দোল)

* বন-বীথিকার পথ-ধূলি ছেয়েছে ঝরা পাপড়ির দল। (নজরুলগীতি, অখণ্ড, পৃ ১৬১)

* ভুল করিলে বনমালী এসে বনে ফুল ফোটাতে। (ওই, পৃ ১২৪)

* রাঙাও দশদিশ লজ্জা-অরুণ রূপ-সজ্জায় বনশ্রীতে। (ওই, পৃ ৭০)

* বুলবুলি নীরব নার্গিস বনে,

ঝরা বন-গোলাপের বিলাপ শুনে। (ওই)

* মৃৎ-প্রদীপ জ্বালি আমি দেউলে তাঁর

বনডালায় পূজা-কুসুমসম্ভার। (ওই)

* বনফুলহার দেবতার গলে সাজিবে না ওগো ভালো। (ওই)।

* অর্জুন মঞ্জরী কর্ণে, গলে নীপমালিকা। (ওই)

রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের রচনাসম্ভার বিশাল। এর বিশালতা ও গভীরতা মহাসাগরের মতোই। এর তলদেশ থেকে নিমগ্ন ডুবুরির মতো অনুসন্ধানী গবেষকের পক্ষেই সম্ভব তাঁদের কাব্যসাহিত্যে পুষ্পসম্ভারের সঞ্চয়ন। আমরা কেবল ওপরভাসা দৃষ্টি ও আনাড়ি চোখে কিছু বর্ণিল শামুক-ঝিনুক তুলেছি মাত্র!

পাঁচ

বিশ শতকের কথাশিল্পে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কবিতায় জীবনানন্দ দাশ বাংলার বিচিত্র বুনোফুল রূপায়ণে অনন্য কুশলতার পরিচয় দিয়েছেন। কত রঙের কত রূপের বুনোফুল যে উল্লিখিত কবি ও কথাশিল্পী আমাদের চিনিয়েছেন তা সংখ্যাতীত। এই কবি ও কথকদ্বয়ের পাঠক পরিচিত হয়েছেন বাংলার অনাদৃত-অবহেলিত পুষ্পজগতের সঙ্গে। বাংলার প্রকৃতির চিরহরিৎ রূপসাগরে ডুব দিয়ে তাঁরা তুলে এনেছেন অরূপ রতন! তাঁদের সহানুভূতির কারণে। বাংলা সাহিত্যে স্থান করে নিয়েছে বহুকাল বঞ্চিত বুনোফুলেরা, যারা চিরকেলে অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ বা একালের পথশিশুদের মতো। জীবনানন্দের রূপসী বাংলা কাব্য এবং বিভূতিভূষণের আরণ্যক উপন্যাসে মেলে বুনোফুলের চিত্ররূপময় সরব উপস্থিতি। শুরুতে জীবনানন্দের কবিতা থেকে কয়েকটি উদ্ধৃতি :

* পশমের মতো লাল ফুল ঝরিবে বিজন ঘাসে –

* আমি চলে যাব  বলে চালতার ফুল কী আর ভিজিবে না শিশিরের জলে/ নরম গন্ধের ঢেউয়ে?

* বাংলার নদী মাঠ ভাঁটফুল ঘুঙুরের মতো তার কেঁদেছিল পায়।

* ভেরেণ্ডাফুলের ভোমরারা বুলাতেছে – শাদা দুধ

        ঝরে/ করবীর;

* বৈচির বনে আমি জোনাকীর রূপ দেখে হয়েছি কাতর;

* – বনে আজও কলমীর ফুল ফুটে যায় –

* বুকে আজ ভেরেণ্ডার ফুলে ভীমরুল গান গায় –

* নীলাভ আকাশ জুড়ে সজিনার ফুল

  ফুটে থাকে হিম শাদা – রঙ তার আশ্বিনের আলোর

       মতন।

* শাদা ভাঁটপুষ্পের তোড়া

আলোকলতার পাশে গন্ধ ঢালে দ্রোণফুল বাসকের গায়; (রূপসী বাংলা কাব্যের সনেটগুচ্ছ থেকে)।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরণ্যক উপন্যাসে চকিত অবলোকনে যে বুনোফুলগুলোর নাম পাওয়া যায় তা নিম্নরূপ :

নীল বন-অপরাজিতা, বুনো-আদার রঙিন ফুল, দুধলি ফুল, দুধিয়া ফুল, গুড়মী ফুল, ধাতুপ ফুল, গোলগোলি ফুল, পিয়াল ফুল, ধুঁধুল ফুল, ন্য চন্দ্রমল্লিকা, ভান্ডীফুল, হোয়াইট বিম, রেড ক্যাম্পিয়ান, ফক্সগ্লাভ, উড অ্যানিমোন্, ডগরোজ, ওয়াটার ক্রোফ্ট, বোগেনভিলিয়া, তেউড়ি ফুল, সন্ধ্যামনি, স্পাইডার লিলি, আমলকি, কাশ, কেঁদ, কেলিকদম্ব, ফণীমনসা, রক্ত পলাশ, শিমুল ইত্যাদি। তাছাড়া বিভূতিভূষণের আরণ্যক উপন্যাসে যেসব বনজ বৃক্ষ ও লতাগুল্মের নাম-পরিচয়-বর্ণনা আছে সেগুলোও অধিকাংশ সপুষ্পক। যেমন : বাদামগাছ, মকাই, ঝুপসি গাছ, ঘোড়ানিম, গোঁড়ালেবু, ছাতিম, জম্বু, বনসিদ্ধি, বন্য কুল, ভুঁই কুমড়া, শ্যামা ঘাস, খেড়ী ঘাস, ভালুকঝোড়, সাবাই ঘাস, হরীতকী, চীনা ঘাস, পাকুড়, লাক্ষা ইত্যাদি।

একালের কবি-লেখকদের স্বভাবসংগত নয়। তাঁরা অনেকটাই প্রকৃতিবিচ্ছিন্ন নাগরিকজীবনের অভিলাষী এবং উন্মূল। তাই বুনোফুলের সুবাস, লতাগুল্মের সৌন্দর্য ও পথেপ্রান্তরে ফুটে-থাকা নামগোত্রহীন পুষ্পশোভা তাঁদের নজর কাড়ে না! রবীন্দ্রনাথ যাঁর কবিতা পড়ে ‘দূরাগত রাখালের বংশীধ্বনি’ শুনেছিলেন, সেই জসীম উদ্দীনই বোধকরি আধুনিক বাংলা কবিতায় পল্লিপ্রকৃতি-চিত্রণের শেষ কর্ণধার ও রাখালরাজা। তাঁর কবিতা থেকে বুনোফুলের একটি চিত্রকল্পের উদ্ধৃতি দিয়ে এ-লেখার ইতি টানা যাক :

মাঠের যত না ফুল লয়ে দুলী পরিল সারাটি গায়,

খোঁপায় জড়ালো কলমীর লতা, গাঁদাফুল হাতে-পায়।              

                                 (সোজন বাদিয়ার ঘাট)।