গোলাপ তুমি সুন্দর হয়ে উঠলে… 

যা কিছু সুন্দর আমি তাদের আরো সুন্দর করে তুলতে চাই। পাহাড়, নদী কিংবা পাতা-ঝরার সিম্ফনি আমার কাছে সুন্দর। বুদ্ধদেব বসু খুব তীব্রভাবে বহুকিছু সুন্দর করে তোলেন। বিস্ময়কর তাঁর, কালিদাস-বিবরণী – বিশেষত মেঘদূত। যা হোক, প্লেটো তাঁর ‘অনুকরণ-তত্ত্ব’, সেটি খুব মজার ও উপভোগ্য বলেই শিরোধার্য। নির্বাসিত কবিদের গালাগালি দিয়েও সর্বোচ্চ সুন্দরের তত্ত্ব তিনিই দিতে পেরেছিলেন। ওতে অনেকরকম করে সুন্দরের নিহিতার্থ ব্যাখ্যাত হয়েছে। বলতে ভয় নেই, ‘শিল্পের ন্যায়’ ধারণাটি দিয়ে তিনি সর্বোচ্চ শিল্পের প্রণোদনাটি সাহিত্যে অত্যুচ্চ করে তুলেছিলেন। কীভাবে? একালে এসেও যখন ‘রিপাবলিক’ পড়ি, সেটি ন্যায়, সাম্য, সত্যের সাবলিমিটি বা ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ সবটাই সাহিত্যিক সম্বন্ধে নিপুণ – তারই দার্শনিক ধারণার উপলক্ষে, যেখানে সৌন্দর্য ব্যক্তিনিরপেক্ষতা চরমভাবে মূর্তমান। বেনজামিন জয়েট ইংরেজি অনুবাদ করেছেন (কারণ আমার গ্রিক জানা নেই) তাতেই যদি ঠিকরে থাকি, বিস্তর এক সমাপতনের ভাবনা প্রতিশ্রুত হয়। সে ভাবনায় জগৎ-জীবন-দর্শন সবটাই মোড়ানো থাকে সৌন্দর্যের বিদ্যুৎপ্রভায়। যেটি পরবর্তীকালে সেঁধিয়ে রয়, অ্যরিস্টটলের ট্র্যাজেডিতত্ত্বের ভেতরে। জীবনের ক্লাইমেক্স তখন ততোধিক উপভোগ্য – যা সবটাকে প্রবল উল্লাসে পৃথিবীর যা শ্রেষ্ঠ তার মুখোমুখি করায়। এভাবে গোড়ার দিকে নন্দনতত্ত্ব বা সমালোচনার একটি পর্যায়-ধারণার বৃত্ত গড়ে ওঠে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নান্দনিক ধারণাসমূহ পাল্টায়। রুচিবিচারেও তৈরি হয় নতুন দৃষ্টিকোণ। পাশ্চাত্য নন্দনতত্ত্বের অভিমুখসমূহ রচিত হয়, নতুন ধারাপাতে – রেনেসাঁসের ভেতরে। এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক লক্ষণীয় প্রবণতাসমূহ উল্লেখ করার মতো। অ্যাংলো স্যাংসন প্রিয়ডের শেষে লিওনার্দো চিত্রকর হিসেবে পৃথিবীবাসীকে নতুন মেসেজ দেন। তারপর পুঁজি ও বাণিজ্যের সম্প্রসারণে ক্রমশ পাশ্চাত্য জীবনধারা টেম্পোরাল ও সেক্যুলার অনুসন্ধিৎসায় সম্মুখগামী গতি লাভ করে। সেখানে গতির সৌন্দর্যে অনেক নতুন মনীষার জন্ম হয়। নিয়তি বা দুর্ভোগ অস্বীকার করে পরিশ্রম-কর্তৃক ভাগ্য-বিনির্মাণের বিশ্বাস সৃষ্টি হয়। তখন প্রচলিত মূল্যবোধ বা সামাজিক অনুশাসনের আচরণসমূহ বাতিল করে সভ্যতানির্ভর অভিপ্রায় গড়ে ওঠে। দূরে কোনো এক স্থলে উপনিবেশ গড়ে ওঠে। তিনভাগ জলের বিপরীতে একভাগ স্থল অনুসন্ধানের চেষ্টা চলে। যে একভাগের ভেতরে খনি-ধনরত্ন-মণিমুক্ত বেশি সেখানে ব্যবসায়ীর চোখ আকৃষ্ট হয়। এ আকর্ষণ সম্পদের। পুঁজির। সামন্তসমাজ ক্রমশ ভেঙে পড়ে। ক্লাসিক যুগের অবসান ঘটতে শুরু করে। বিপরীতে রোমান্টিকতার উত্থান। রোমান্টিক উত্থানের তাৎপর্যেও ভেতরে ব্যক্তির বিকাশ, পুঁজির সঞ্চলন, দ্বন্দ্ব ও অধিকারের আকাঙ্ক্ষা সামনে আসে। অ্যাডভেঞ্চার, সাহস, রোমান্সরসে ভেসে যায় অনেককিছু। ব্যক্তির আনন্দ ও জয়োল্লাসের মধ্য দিয়ে কেনাবেচা, বিনিময়, সম্পদের অধিকার ও বণ্টননীতি চালু হয়। ম্যাকায়েভেলি, লক, বার্কলে, হিউম, কান্ট, স্পিনাজো, লাইবোনিজ, হেগেল তাদের দার্শনিক ভিত্তিতে মানুষের চাহিদা আকাঙ্ক্ষার মধ্যে স্বপ্ন, মনুষ্যত্ব, সৌন্দর্যবোধের দর্শন তৈরি হয়। এসব মনীষী সময়েরই সৃষ্টি। ফলে সাহিত্য-শিল্পে মূল্যবোধসমূহ নতুন অভিধা পায়। শিল্পের মর্মকথা আগের মতো আর থাকে না। তার বাস্তবতা, সার্বিকতা, অধিকারভেদ, বৈরাগ্য বা আনন্দ পাল্টায়। শিল্প ও আনন্দ, শিল্প ও কল্পনা ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণে প্রসারতা পায় এবং গৃহীত হয়। 

বলছিলাম, পাশ্চাত্য রেনেসাঁসের উত্তরাধিকার রোমান্টিক দর্শনচিন্তার কথা। সেখানে শেলি, কিটস, ওয়ার্ডসওয়ার্থ বায়রন স্ত্রোত্র রচনা করে গোলাপের সৌন্দর্য বিচার করলেন। ‘নেগেটিভ ক্যাপাবিলিটি’র ভেতরে আত্মমুগ্ধতায় ব্যক্তির বিলোপনীতির এসেন্স তৈরি হলো। এই আত্মমুগ্ধতা কী? রবীন্দ্রনাথ বলেন ‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ’, চেতনার রংটুকু সৌন্দর্যের অভিপ্রেত রূপ। তার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য রস, উপলব্ধির আনুগত্য, অনুভবের গভীরতা বোধের সূক্ষ্মতায় নতুন অবভাসে উন্মোচিত হলো। এই উন্মোচন এক গভীর আনন্দপ্রয়াস। প্রথমে তা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, ভাবের আনুকূল্যে অনুভাব্য, বিস্মমুগ্ধতার প্রলাপে জড়ানো, ক্রমশ তা চিত্তে প্রসারিত হয়ে, এক পুলকানন্দে ঘোর সত্যরূপে উদ্ভাসিত হলো। সকলেই তা গ্রহণ করল। অভিযানে নামল, সুন্দর তার সৌন্দর্যের পেখম মেলিয়ে ধরল। এই আনন্দ উপভোগের মাত্রা এক একরকম। কবিরা তার রূপ নির্ণয় করেছেন মনের মাধুরী মিশিয়ে। সে-আনন্দে পশ্চিমা বাতাস কিংবা সমুদ্রের কল্লোল, কিংবা উঁচু পাহাড় তার চিত্তে ধরা দিয়েছে বিরল প্রলাপনে। মনের মানুষরূপে তা ইন্দ্রিয়ের গোচরে এসেছে। ইন্দ্রিয়াতীত উপলভ্যতায় সম্পূর্ণ সত্য হয়ে সারার্থ খুঁজেছে। টেনিসনের লেখায় রবীন্দ্রনাথ অধ্যাত্মরসের আখররূপে প্রকৃতির গভীর অনুভবকেই উপলব্ধিতে এনেছেন। ষোড়শ শতকে মিল্টনের কবিতা, শেক্সপিয়রের সনেটগুচ্ছ সর্বদা প্রকৃতির ও নিয়তির অনুভাবে বিমূর্ত রহস্যময়তার অমোঘ আহ্বানকে সান্নিধ্য করেছে। শুধু চিত্রকলায় বা পেইন্টিংয়ের জগতে নয়, কাব্যভাষার ভেতরে যে ‘অপূর্বনির্মাণক্ষমপ্রজ্ঞা’ তা কবি গ্রহণ করেন কী দিয়ে বা কীসের ভেতরে তা সবটুকুই শ্রেয়শীলতার প্রশ্রয়ে কাঙ্ক্ষিত হয়ে উঠেছে স্বপ্নাপ্লুত 

জল-বাতাস-আগুন আর প্রকৃতির (পৃথিবী/ মর্ত্য) ভেতরে। 

দুই

রোমান্টিক আন্দোলনের পর অভিঘাতটি আসে রিয়ালিজমের ভেতরে। কেন? দেখার দৃষ্টি পাল্টায় বলে! বোধের বারান্দায় আসে নতুন রোদ্দুর। চিন্তার শাখায় হাওয়া তোলে নতুন দোয়েল। নিশ্চয়ই কার্ল মার্কস (১৮১৮-১৮৮৩)-এর আগমন এবং উনিশ শতকের তীব্রগন্ধী আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন। পরিবর্তনটা পূর্বের শ্রেষ্ঠত্বকে শোষণ করে না বরং সম্পূরক জ্ঞান করে। কীভাবে? ওই যে গোলাপ সুন্দর হয়ে উঠল, বা ‘truth is beauty beauty is truth’ সেটি অধিক সত্য হয়ে উঠল, এ-সমাজে; কিন্তু অধিকতর নতুনরূপে। ব্যক্তির প্রসারতায় যেভাবে ক্লাসিক সৌন্দর্য গুটে গেল, ঠিক সেরকম নয়। ব্যক্তি আরো পারম্পরিক হয়ে পাশাপাশি দাঁড়াল। এ সৌন্দর্যের রূপ ও রস রোমান্টিক ধারারই অনুসরণ। আরো রক্তমাংসরম্য। অধিক জীবনবাদী। জীবনের প্রশ্রয় যেখানে অধিক। তবে গোলাপ উপভোগের আনন্দকে, ভাবরসের সিম্ফনিকে অন্য আলোয়, অধিক ক্রিয়াশীল করে প্রতিশ্রুত হওয়ার সময় পেল। ততোদিনে আমাদের সামনে এসে গেছেন ডারউইন, ফ্রয়েড। ফলে রসের ইন্দ্রীয়শীলতায় ঘটে গেছে আভাময় অনুকল্পন। শ্রেয়শীলতার পরতে যুক্ত হয়েছে ততোধিক আলাপন। সে কেমন আলাপন? কীভাবে তা পরিপক্বতা পেল? কিটস বা টেনিসনের পরে এশীয় অঞ্চল উপনিবেশ-আক্রান্ত। উপনিবেশ ও উপনিবেশিত দ্বন্দ্ব তীব্র না হলেও পরিবর্তনের রাশি রাশি রূপ স্ফটিকত্ব ও অনুধ্যানশীল অভিমুখ পাচ্ছে। সৌন্দর্যের বিচার, তার মাত্রাজ্ঞান, ছন্দোধারা, শোষণের ক্রিয়া, উপলভ্য ইন্দ্রিয়বিলাস এই উপমহাদেশে ক্রমশ সহজাত ও সরল প্রতিচ্ছায় ঘনীভূত হওয়ার প্রয়াস পাচ্ছে। হিমালয় অধ্যুষিত ভারতবর্ষ চিরকালই মুণি-ঋষির ভাবরসে জারিত। এই আবহাওয়ার যে উপাচার তাতে গড়ে ওঠে ব্যক্তির মন্ময় অনুরাগে তা প্রতিষ্ঠিত ও অনুধ্যেয়। কথাটি আরো সহজ করে বললে এমনটা শোনায় : ‘তুমি কি কেবলই ছবি … শ্যামলে শ্যামল তুমি নীলিমায় নীল …’ এই প্রস্তাব ব্যক্তির অনুরাগ এবং ইন্দ্রিয়ের সংকল্পে সৃজিত – যেখানে ব্যক্তি ও প্রকৃতি সমন্বিতরূপে হয়ে ওঠে নৈসর্গিক, চিরায়ত, অধ্যাত্মতৃষ্ণাপরায়ণ, অসীমের ধূপ, অন্তর্লীন হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। এই অন্তর্লীনতা রোমান্টিক, পাশ্চাত্য অনুভবের ধারায় তীব্রতর, শ্রেয়োশীল আনন্দের উপভোগ্য মাত্রা; খুব দেরিতে এলো ভারতবর্ষে, রবীন্দ্রনাথ সেখানে গুরুতররূপে প্রতিষ্ঠিত। প্রকাণ্ড বটছায়া যেন। বিশাল তার সুশীতল ভাব-প্রাবল্য। বুঝি এই মূল্যবোধ এরকম : ‘সত্য হল তার প্রকটরূপ অর্থাৎ সত্যমূল্যে মানুষের অধিকাংশ অভিজ্ঞতারই মর্যাদা নির্ণীত হয়। মহাকবি রবীন্দ্রনাথ এই সত্যমূল্যেই ধরিত্রীর কাছ থেকে মাটির একটি তিলক পরতে চেয়েছিলেন। তাঁর মতে শিল্প বা আর্ট যদি মিথ্যার বেসাতি করে, তাহলে সে শিল্পে তাঁর কোনো প্রয়োজন নেই।’ তাই বুদ্ধি নয়, বুদ্ধির কেজো প্রয়াস নয়, সত্যমূল্যটি শিল্পসত্য ও জীবনসত্যের ধারায় মূর্তমান। এই মূর্তমান বিষয়টি চিন্তা ও ধারণার পরিপ্রেক্ষিত রচনা করে। শিল্প যে শিল্পের জন্য, শিল্পের আনন্দ যে শিল্পের ভেতরেই, শিল্পের অধঃক্ষেপ যে শিল্পেরই কেলাসিত রূপ সেটি সর্বাংশে সত্য। এ সত্যভিত্তি রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরীতে উজ্জ্বল। শিল্পের উপস্থাপন ঘটে যে প্রকরণে, সেখানে সর্বতোই নির্ণীত হয় শ্রেয়গুণের উৎসব। উল্লেখ থাকে আনন্দের চিরায়ত উপাদান। রহস্য কিংবা অ্যাডভেঞ্চার তার মূল। সেটি উন্মোচনের জন্য নিরন্তর অভিলাষ থাকে, গড়নে-চিন্তনে-উচ্ছ্বাসে-উপভোগে-সংহারে সে এক তীব্রতর ‘পাগল’। শিল্প তাই পাগলের দূত। এই পাগল, কেজো বুদ্ধির বাইরে বোহেমীয় ও ভবঘুরে। সত্য-সুন্দর আরাধনায় তার সক্রিয় ব্যাপ্তি সেখানে ঊর্ব্বশীরূপ, অধরা-মাধুরীর রস কিংবা বিশাল সমুদ্রের ফেনোচ্ছ্বাস কিংবা মূর্তমান পাহাড়ের যুগবিনাশী প্রতিরূপ প্রকরণে নির্ধারিত থাকে। সুন্দরের উৎসও সেখানেই। ভালোলাগার সন্দর্ভও তাই। রোমান্টিক উচ্ছ্বাসটাই তাই শিল্পে অভিমুখ। স্ত্রোত্র, প্রার্থনা, গাথা, প্রেমিক-সন্ধান, মনের মানুষের আরাধনা সবটাই প্রকৃতি-অনুরুদ্ধ। ভারতবর্ষ সেক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ। রবীন্দ্রনাথ সেই সৌন্দর্যেরই দান। সমস্ত মুগ্ধতা আত্মস্থ করে রবীন্দ্রনাথ তাই বলেছেন ‘আমি জন্ম রোমান্টিক’। অবনীন্দ্রনাথের এই রোমান্টিকতার বিস্তার ঘটেছে; যার উত্তরাধিকার নন্দলাল বসু থেকে শুরু করে অনেকেই। রবীন্দ্রনাথ যে-ঘরানা সৃষ্টি করেছেন, তা সর্বব্যাপ্ত। এবং এইটিই সৌন্দর্যের চিরন্তন আখর। কিন্তু বিশ শতকের গোড়াতেই নতুন যুগবাস্তবতার ধারা শুরু হলো। সে যুগবাস্তবতায় দুটো বিশ্বযুদ্ধ এবং দুই পরাশক্তির তাণ্ডব দেশে দেশে ছড়াল, মিলিট্যান্ট প্রবণতায় আটকে গেল অনেক দেশ, সাম্রাজ্যবাদ নতুনরূপে আঘাত হানতে থাকল। এর উত্তর দেওয়ার মতো শক্তি পৃথিবীতে প্রতিপক্ষরূপে কাউকে তেমন পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেল না। বিচ্ছিন্নতার বিরাট পাথর ব্যক্তিমানুষের মধ্যে দৃশ্যমান হলো। আলাদা হয়ে যাচ্ছে মানুষ ও মানবতার প্রগল্ভতা। শূন্যতা গ্রাস করছে সর্বস্তরে। এই স্তর কণ্টকিত। বিশ্বযুদ্ধের টক গন্ধ আরও অধিক উৎকট হয়ে মানুষের ভেতরে বাইরে ক্রিয়া করছে। মানুষের মধ্যে দ্বিধা ও দোলাচলতার অধঃক্ষেপ রচিত হয়। বিষয়গুলো দৃঢ়তর হতে থাকে। কিন্তু এসব রাজনৈতিক বাস্তবতার ভেতরে অনেক মনীষীও নিজস্বতায় সৌন্দর্যের 
 রূপ-রস-আনন্দের অভিপ্রায় তৈরি করে। ফ্রয়েডের দ্য ইন্টারপ্রেটেশন অব ড্রিম বেরোয় ১৯০১ সালে। মার্কসের মৃত্যুর পর মানুষের স্বপ্নজগতে ভয়, বীভৎসতা, ক্রন্দন, বেদনা, সুখানন্দ ভিন্ন মাত্রায় প্রকাশ্য হয়। এ প্রকাশ্যতার কারণও ওই রাজনৈতিক পরিবর্তন। ভারতে রাজনৈতিক দল গঠনের পর তৃতীয় দশক থেকে উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন তীব্রতর হয়। সংবিধান সংশোধনেরও পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ভারত শাসন আইনের ভেতর দিয়ে দেখা যায় নাগরিক ধারণাগুলো প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। সমাজের সংস্কার ভেঙে গেছে। নতুন মূল্যবোধ দানা বাঁধছে। রবীন্দ্রনাথের রোমান্টিক ধারণার বিপরীতে এদেশীয় পাশ্চাত্যমুগ্ধ কবিদের হাতে এলিয়ট, ইয়েটস, ব্রেখট, বোদলেয়ার, রিলকে প্রকাশ্য হচ্ছেন। রুচিবিচারের মাত্রা পুনর্গঠিত হলো। এঁদের ভেতরে আঁদ্রে ব্রেতো, এজরা পাউন্ড, স্টিফেন স্পেন্ডার প্রমুখ বিভিন্ন আন্দোলনের জন্ম দেন। ফেমিনিজম থেকে শুরু করে অস্তিত্ববাদী দর্শন, ফবিজম, এক্সপ্রেশনিজম, ইম্প্রেশনিজম প্রভৃতি বিশ শতকের শিল্পের নতুন উদ্ভাবনী মাত্রা। এমনটা গড়ে ওঠে মানবের অস্থিরত্ব, নৈরাশ্য, নিঃশব্দতার ভেতরে। বিশ্বযুদ্ধই সবকিছুকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। এমনকি রবীন্দ্রনাথও তার আঙ্গিক পাল্টে ফেলেন। দৃঢ়তররূপে তিনি গদ্যছন্দ, উপন্যাসের ভাষা, গল্পের পরিধি ও বিন্যাস, রূপক নাটক রচনা করেন। এসব রচনার পেছনের কারণ কী? তাঁর রোমান্টিক চেতনারই বা সারসত্য কতোদূর? কীভাবে তিনি নিজেকে বদলান? পাল্টান। সৌন্দর্যে আনেন নতুন দৃষ্টি। গানে আনেন নতুন সুর। সবটুকু ঢেলে দেন রবীন্দ্রনাথ। সৌন্দর্যেও যে নতুন অভিক্ষেপ সেটি তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে লক্ষ্যগোচর হয়ে পড়ে ঠিক সত্তর বছর বয়সে যখন তিনি চিত্রশিল্পীরূপে আবির্ভূত হলেন। তাঁর চিত্রই নতুন চেতনার ইঙ্গিত দিলো। শিল্পের নতুন পরত খুলে গেল। আশ্চর্য রবীন্দ্রনাথ! আমাদের সামনে শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্যসাধকরূপে বিবৃত হলেন। এটি তাঁর পরিবর্তিত শিল্পের অসামান্য রূপ। আশ্চর্য দর্শন। বিভূতিময়তার সারাৎসার। এই রবীন্দ্রনাথ বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ নন্দনতাত্ত্বিক। পৃথিবীশ্রেষ্ঠ নন্দনতাত্ত্বিক। এই অপরূপত্ব ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে নতুন অভিমুখ। যেটি বিশ শতকের রাজনৈতিক, সামাজিক, আর্থনৈতিক বাস্তবতারই নামান্তর। রোমান্টিক সৌন্দর্যের যে সর্বোচ্চ রূপ তিনি প্রকাশ করলেন তা পৃথিবীর যে কোনো সৌন্দর্যরসিকের চেয়ে কম নয়। রাশিয়ার বৌমগার্টেন, ইটালির বেনিডাত্ত ক্রোচে প্রমুখ এক একটা সময়ে এই ধারারই আলোর বিচ্ছুরণ ঘটান। বস্তুত রোমান্টিক চেতনাশিল্পধারাই ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ ধারণাটিকে প্রতিষ্ঠিত করেন। আবার পুনরুক্তি করে বলা যায়, শিল্প যে শিল্পের জন্য সেটিই জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রতিপাদ্য। শিল্পরসিকরা আজীবন সে-ধারারই আনুগত্য পোষণ করে আসছেন এবং এই সাবজেক্টিভ সমর্থনীয় বিষয়টিই বস্তুধারণার উপলক্ষ এবং বিভাময়তার প্রলুব্ধ রূপ।

তিন

বিপরীতে সামাজিক উপযোগিতার মধ্যেই শিল্পের জন্ম ও বিকাশ। শিল্প সমাজের জন্য। বঙ্কিমচন্দ্র থেকে অদ্যাবধি এ প্রবণতার স্বপক্ষে তত্ত্ব ও ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ‘লেখা তো সমাজের জন্য, সমাজের উপকার না হইলে লিখিয়া কী লাভ!’ – বঙ্কিমের এইরূপ প্রস্তাবনা আলেখ্যনীয় করে এই বাংলাদেশের শিল্পচার্য জয়নুল আবেদিনও এ মত ও পথকে বিশ্বাস করেন। এই তত্ত্বধারাটি তীব্রতর হতেও দেখা যায়, বস্তুবাদিতা কিংবা প্রয়োজনবাদের সূত্রে। রুশ সাহিত্য, সঞ্চারবাদী তত্ত্ব, মার্কসসিজম অতঃপর নব্যবস্তুবাদী সাহিত্যচিন্তার প্রক্ষেপণে গড়ে ওঠে ‘জীবনের জন্য শিল্প’ ধারণাটি। এ ধারণার ভিত্তিভূমি ১৮৪৮ সালের পরে। সৌন্দর্যের যে পরোক্ষ পটভূমি রচিত হয় তাতে দেখা যায়, শ্রম ও সভ্যতার ক্রমবিকাশের ভেতরে মানুষের মানবিক মূল্য যাচাই মূখ্য হয়ে ওঠে। এই মুখ্যতা সৌন্দর্যের অনন্য রূপ। শিল্পবস্তুতে সে-বিষয়টি লগ্ন হয়ে রয়। শিল্পবস্তু সমাজবিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, সমাজের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া একপ্রকার সারাৎসার। মার্কস বলেছেন : ‘পঞ্চেন্দ্রিয়ের গঠনকালের পিছনে অনাদিকাল থেকে শুরু করে 
 এ-পর্যন্ত জগতের ইতিহাস নিহিত রয়ে গেছে। স্থূল জৈব প্রয়োজন দ্বারা বদ্ধ ইন্দ্রিয়ের তাৎপর্য অত্যন্ত সংকীর্ণ। ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে খাদ্যের তো কোনো রূপই নেই, আছে শুধু তার অবচ্ছিন্ন সারবস্তু। স্থূলতম চেহারা নিয়ে তা হয়তো হাতের কাছে লভ্য হতে পারে এবং এ-কথা নির্ধারিতরূপে বলা শক্ত কোথায় বুভুক্ষু মানুষের আহারের সঙ্গে পশুর খাদ্যগ্রহণের তফাৎ রয়েছে। ক্লিষ্টকাতর দারিদ্র্য-পীড়িত মানুষের পক্ষে সূক্ষ্মতম নাট্য আস্বাদন সম্ভব নয়; ধাতু ব্যবসায়ী শুধু বাজারদর বোঝে, জানে না ধাতুর মৌলতা, সৌন্দর্য। তার কোনো খনিজ বোধভাষ্যি নেই। তাই তো থিয়োরিগত ও বস্তুগত অর্থে মানুষের অনাত্মীয়করণ প্রয়োজন, প্রয়োজন সেই মাধ্যমের যা মানব-ইন্দ্রিয়কে মনুষ্যজীবন ও প্রকৃতির ঐশ্বর্যের সমানুপাতে মানবিক করে তোলে।’    

সারকথা, এমন উপলব্ধির শেষপর্যাবৃত্ত লক্ষ করি বিভাগোত্তর পূর্ব-বাংলায়, শিল্পী জয়নুল, সফিউদ্দীন আহমদ কিংবা কামরুল হাসানের চিত্রায়নে – যেখানে বাঙালিয়ানার সহজাত রূপ, প্রান্তিক মানুষের শৈল্পিক শোভনতা প্রয়োজনের মধ্যে নয়, নিছক ‘মনের সুকুমার কলার’ বাঞ্ছা থেকেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। হয়তো প্রয়োজনের ব্যাপারটি মূলে আছে সংঘবদ্ধভাবে কিন্তু তা ততোধিকরূপে পরিগণিত সূক্ষ্মতর জীবন মাধুর্যের অভীপ্সা থেকে। সুতরাং শিল্পসৌন্দর্য সমাজের উপযোগেরও অংশ। রোমান্টিক সৌন্দর্যরসিক রবীন্দ্রনাথ একে অসমর্থনও করেননি। 

চার

এসব নানাবিধ তত্ত্বে যখন সৌন্দর্য নিয়ে একটা কাঠামোতে পৌঁছা গেল তখন এর সঙ্গে জীবনের সম্পর্কটুকু তো আরো অধিক নিবিড় করা জরুরি। রোবট পৃথিবীতে, কর্মমুখী মানুষ কর্ম হারাবে। নন্দনবিশ্বে গোলাপ তখন কোন প্রকাশে সুন্দর হয়ে উঠবে?

বৈষম্য-পণ্যায়ন, মার্কেটিং-বিনিয়োগ কোন রকমে রূপ নেবে। মেধা-চিন্তার মূল্য কেমন হবে। সৌন্দর্য-ধারণা তো কোনো কিছুকেই বাদ দিয়ে নয়। দুনিয়ায়, মেশিন সকলকে পরাস্ত করে অধিকার করবে কি মন-মস্তিষ্কের জমিন! আর তখন যান্ত্রিক মনে গোলাপের রং ও রূপ কিংবা রমণীর সৌন্দর্য বা পুরুষের পৌরুষত্ব কোন কষ্টিপাথরে যাচাই হবে? প্রশ্নগুলো একুশ শতকের ‘ছবি-দুনিয়া’ বা ভার্চুয়াল পৃথিবীর আইঢাই উপযোগকে কেন্দ্র করে। আর লেখকরা? কোথায় সেই হোমার-দান্তে-বাল্মীকির কাব্য রোম্যান্টিকতা। তবে কী সব ফিরে আসবে, অন্য বেশে – এই মনুষ্য পৃথিবীতে? মানুষই যদি শেষ কথা হয়, তবে মানুষ তার মনকেই মানবের পথে টেনে নেবে না কেন – এই কী সত্য নয়!

বলেছিলাম, গোলাপ তুমি সুন্দর হয়ে উঠলে – চেতনার রঙে। তখন তো তিরোহিত ‘আমি’। আমিত্ব বিলীন, অন্তর্লীন হয় তার সৌন্দর্যে। সেটি কম্পিউটিং বিশ্ব হরণ করতে পারবে কি? না। আমাদের ধারণা, যান্ত্রিক বিশ্বে নৈরাজ্য, নিপীড়নের সাম্রাজ্য হুংকার দিলেও ক্লান্তি আর ক্লেদ ভুলে যাবে না মানুষ। অতৃপ্ত মন খুঁজে নেবে তার তৃপ্তির সনদ। বনরাজির সৌন্দর্য, মুখস্থ মন গ্রহণ করতে পারে না। তাই সৌন্দর্যের উচ্চতা – তার স্বরূপেই নির্ধারিত হবে। ক্ল্যাসিক উপযোগ মানুষের অনুসন্ধিৎসা মনের আঁধিতে খুঁজে ফেরে, সে তৃপ্তি আর রসবোধের অনুগত – এই মানুষ। সে কি পারে তার মন – আত্মাকে বিসর্জন দিতে? কতজন – কেন? সমাজ বদলের ক্রমিক পরিণতির ভেতরেই এ সত্যটি গৃহীত হতে বাধ্য, নইলে পৃথিবীর ধ্বংস অনিবার্য। একটি ভাইরাস আমাদের যন্ত্রণাকে ধরিয়ে দিচ্ছে, এটি উপশমের পথ যে দ্বন্দ্বের ভেতরেই নিহিত আছে – তা কে অস্বীকার করবে! সেই নিহিতার্থ ধর্মটি কোনো মূর্খ, অসংস্কৃত কেউ কেউ প্রথাগত নিয়মে অস্বীকার করলে, সে পরাস্ত হবে এবং বিপরীতে কেউ তা টিকিয়ে রাখার কাজটি সহজতায় সম্পন্ন করে প্রকৃতিকে সম্মুখে এগিয়ে নেবে। অর্জিত এ-পথ অধিক সুন্দর তৃপ্তিদায়ক হতে সক্ষম। এভাবেই প্রতিকূলতাকে পাশ কাটিয়ে জগৎ-জীবনে নতুন আলোর পৃথিবী গৃহীত হবে। সেখানে ‘সুন্দর’ই সবকিছুকে আরও সুন্দর করে তুলবে। গোলাপের অকৃত্রিম ধর্ম সেভাবেই রক্ষিত হোক, রক্ষা পাক। এই তো চিরকল্যাণের বাণী!