আবু ইসহাকের (১৯২৬-২০০৩) প্রথম উপন্যাস সূর্য-দীঘল বাড়ী প্রকাশিত হয় ১৯৫৫ সালে।
তিনি পাঁচ দশকের বেশি সময় সাহিত্যজগতে বিচরণ করলেও তাঁর গ্রন্থের সংখ্যা মাত্র আটটি। এ-লেখকের গ্রন্থসংখ্যা কম হওয়ার একটি প্রধান কারণ পেশাগত জীবনের ব্যস্ততা। আবু ইসহাক যথেষ্ট লিখতে পারেননি বলে তাঁর মধ্যে ‘আক্ষেপ’১ ছিল। উপরন্তু জীবনের শেষ এক যুগেরও বেশি সময় তিনি প্রধানত অভিধান সংকলনের কাজে নিয়োজিত ছিলেন বলে সৃজনশীল সাহিত্য রচনায় মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। আবার কিছু বাস্তব কারণে তিনি কখনো হয়তো সাহিত্য রচনার উৎসাহ হারিয়েছিলেন, তার কিছু দিকও লেখক উল্লেখ করে গিয়েছেন একটি নিবন্ধে।২
ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার ফল প্রকাশের পূর্বেই মাত্র ১৮ বছর বয়সে ১৯৪৪ সালের মে মাসে বেসামরিক সরবরাহ বিভাগে যোগ দিয়ে আবু ইসহাক তাঁর কর্মজীবনের সূচনা করেন। সিভিল সাপ্লাই বিভাগে কর্মকালে আবু ইসহাক নারায়ণগঞ্জ, পাবনা, ঢাকা ও কলকাতায় দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তবে ওই পদে অধিকাংশ সময় তাঁর নারায়ণগঞ্জেই কাটে।৩ নারায়ণগঞ্জে অবস্থানকালেই তিনি সূর্য-দীঘল বাড়ী লেখা শুরু করেন – তরুণ চোখে দেখা অভিজ্ঞতার নিবিড় রূপায়ণ চলে লেখার খাতায়। তখনো বাংলায় দুর্ভিক্ষের প্রভাব কাটেনি। সূর্য-দীঘল বাড়ীতে তিনি যে জয়গুন, হাসু, শফির মা, লালুর মাকে এঁকেছেন সেই শ্রেণির অন্ত্যজ মানুষকে তিনি কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ট্রেনে চলার পথে। ওই সময়ই আবু ইসহাক জয়গুনের মতো সংগ্রামী নারী ও তার সাথিদের দেখেছেন ট্রেনে করে ময়মনসিংহ যেতে আবার থলিভরা চাল নিয়ে ময়মনসিংহ থেকে ফিরতে। ফতুল্লা, চাষাঢ়া প্রভৃতি স্টেশনে পৌঁছার আগেই চালের থলিগুলো দুপদাপ পড়তো রেলরাস্তার পাশে। আরো দেখেছেন নারায়ণগঞ্জ রেল ও স্টিমার স্টেশনে হাসুর মতো নম্বরবিহীন ক্ষুদে কুলিদের।৪ ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি সূর্য-দীঘল বাড়ী লেখা শুরু করেন। ‘হামিদা কুটির’ নামক বাড়ির মেসে থাকাকালে সূর্য-দীঘল বাড়ীর প্রথম অর্ধেকটা রচিত হয়। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে আবু ইসহাক বদলি হন পাবনায়। পাবনা শহরে প্রথমে একটি মেসে উঠলেও সে-জায়গাটি লেখালেখির জন্য অনুকূল মনে হয়নি; তাই তিনি পাবনা শহরের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত এক পণ্ডিতের বাড়ি ‘সপ্ততীর্থকুটিরে’ ওঠেন মাসিক ৫০ টাকা ভাড়ায়। সে-বাড়ির অনুকূল নির্জন দোতলায় বসে ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসে সূর্য-দীঘল বাড়ী লেখার কাজ শেষ করেন।৫ অবশ্য উপন্যাস লেখার ফাঁকে নারায়ণগঞ্জ, কলকাতায় বসে তিনি একাধিক গল্প লেখেন। কিন্তু সূর্য-দীঘল বাড়ী উপন্যাসটি বই আকারে প্রকাশের জন্য প্রায় সাত বছর অপেক্ষা করতে হয়। ইতোমধ্যে আবু ইসহাক ১৯৪৯ সালে পুলিশ বিভাগে চাকরি নিয়ে প্রশিক্ষণের জন্য সারদা পুলিশ ট্রেনিং কলেজে যোগদান করেন। প্রশিক্ষণ শেষে ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসে শিক্ষানবিশ সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে ঢাকার তেজগাঁও থানায় যোগদান করেন।
কবি গোলাম মোস্তফার আগ্রহে সূর্য–দীঘলবাড়ী উপন্যাসটি নওবাহার পত্রিকায় ১৯৫১-৫২ সালে প্রকাশ পায়। পরবর্তীকালে ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে (১৩৬২ বঙ্গাব্দ) এ-উপন্যাস কলকাতার নবযুগ প্রকাশনী থেকে গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হয়।৬ উপন্যাসটি প্রকাশের পর আবু ইসহাক বাংলা সাহিত্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ লেখক হিসেবে বিবেচিত হন। মুনীর চৌধুরী (১৯২৫-৭১) বাংলাদেশের যে তিনটি উপন্যাসকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করতেন সূর্য-দীঘল বাড়ী সেগুলোর অন্যতম।৭
আবু ইসহাকের কাহিনি নিয়ে মসিউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী নির্মাণ করেন সূর্য-দীঘল বাড়ী নামক চলচ্চিত্র। ছবিটির মুক্তিকাল ৩০শে ডিসেম্বর ১৯৭৯। এটি ছিল সরকারি অনুদানে নির্মিত বাংলাদেশের প্রথম চলচ্চিত্র। তবে প্রদর্শকদের অনীহার কারণে ছবিটিকে প্রথমে ঢাকায় মুক্তি দেওয়া যায়নি। ১৯৭৯ সালের ৩০শে ডিসেম্বর নাটোরের গীত সিনেমা হলে প্রথম প্রদর্শিত হয়।৮ পরে ১৯৮০ সালে ঢাকার পাঁচ-ছয়টি প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শন শুরু হয়। সিনেমাটি সাধারণ দর্শকদের কাছে তেমন গ্রহণযোগ্যতা না পাওয়ায় ব্যবসাসফল হয়নি। তবে কাহিনি ও নির্মাণশৈলীগুণে চলচ্চিত্রটি এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে নির্মিত অন্যতম শিল্পসফল চলচ্চিত্র হিসেবে স্বীকৃত। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছবিটি বহু পুরস্কার লাভ করে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এ-চলচ্চিত্র প্রসঙ্গে বলেন :
‘সূর্য-দীঘল বাড়ী আমাদের চলচ্চিত্রে একচ্ছত্র দাপটে প্রতিষ্ঠিত ন্যাকা, ছ্যাবলা ও নকলবাজে গিজগিজ করা বাড়িঘর কাঁপাবার জন্য প্রথম প্রকৃত আঘাত। … এই ছবি বাংলাদেশের গরিব ও শোষিত গ্রামবাসীর জীবনযাপনের একটি অন্তরঙ্গ পরিচয়।’৯
আবু ইসহাকের দীর্ঘ পরিশ্রমের ফল সমকালীন বাংলাভাষার অভিধান (স্বরবর্ণ অংশ) বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশ পায় ১৯৯৩ সালে। অভিধান প্রণয়নের জন্য তিনি ১৯৯৩-৯৪ সালে মানিক মিয়া গবেষণা বৃত্তি লাভ করেন। অভিধানটি রচনার জন্য তিনি কঠোর পরিশ্রম করেন। সত্তরোর্ধ্ব বয়সে তিনি এই কাজে প্রতিদিন ১২-১৪ ঘণ্টাও ব্যয় করেছেন।
দুই
আবু ইসহাক প্রকৃতপক্ষে নিরীক্ষাপ্রবণ সাহিত্যিক নন। তিনি মূলত realism ধারার লেখক। এই ধারার একজন শিল্পস্রষ্টা বিশেষ জটিলতায় না গিয়ে বাস্তব মানুষ, সমাজ ও প্রকৃতিকে স্বচ্ছ কাচের ভেতর দিয়ে যেভাবে দেখেন, সেভাবেই তুলে আনেন। অন্যদিকে নন-রিয়েলিস্টিক শিল্প-সাহিত্যকে সমালোচকেরা বিকৃত আয়নায় দেখা পৃথিবী বলে মনে করেন।১০
অবশ্য শিল্প-সাহিত্যে বাস্তব জগতের অনুকৃতি হলেও সেখানে হুবহু অনুকরণ করা হয় না, বাস্তববিশ্ব লেখকের চেতনা ও শিল্পীসত্তা দ্বারা জারিত হলে তবেই শিল্পসৃষ্টি সম্ভব হয়। আবু ইসহাক যখন তাঁর প্রথম উপন্যাস
সূর্য-দীঘল বাড়ী প্রকাশ করেন ততদিনে বিশ্বসাহিত্যে গল্প-উপন্যাসের শিল্পগত দিক ও অঙ্গপ্রকরণ নিয়ে বহুবিধ পরীক্ষা-পর্যবেক্ষণ সাধিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, গোপাল হালদার, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ী, অমিয়ভূষণ মজুমদার, কমলকুমার মজুমদার, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ প্রমুখ ঔপন্যাসিক ভাব, আঙ্গিক ও ভাষাশৈলীর দিক থেকে নানা দুঃসাহসী পথে অগ্রসর হয়েছেন। সে-সকল নিরীক্ষার পথ আবু ইসহাককে তেমন আকৃষ্ট করেনি। অবশ্য শুধু নতুন আঙ্গিক বা নিরীক্ষা-বৈশিষ্ট্য দ্বারা সাহিত্যের উৎকর্ষ বা আধুনিকতা বিচার করা সংগত নয়। উপরন্তু আবু ইসহাকের এই শিল্পপ্রয়াসকে ক্ষেত্রবিশেষে উত্তর-আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও মূল্যায়ন করা যেতে পারে। পাশ্চাত্যের অনুকরণে যে-আধুনিকতা তাকে প্রত্যাখ্যান করে হয়তো কলকাতা থেকে বহুদূরে সন্ধ্যায় মনসামঙ্গল বা ইউসুফ জুলেখা পুথির ঘরোয়া আসর বসেছে খোলা উঠানে। ইংরেজ-সৃষ্ট নকশার সকল চাপ সহ্য করে দিন শেষে অদ্ভুত পুথির আনন্দে মেতেছে তারা। অন্য একটি পক্ষ বাঙালির হৃদয়কে আরোপিত আধুনিকতা থেকে রক্ষা করে সঞ্জীবিত রেখেছিলেন, এরাই বাংলার প্রথম উত্তর-আধুনিক। এক্ষেত্রে নর্দমার মধ্যে মাথা গোঁজা’ বা ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’ অথবা নানাবিধ যৌনগন্ধী সংলাপ ওই আধুনিকতার অনেকটা ব্যর্থ অনুকরণ বলে উত্তর-আধুনিকগণ মনে করেন। তাঁদের বিচারে যে-সূত্রে গোবিন্দচন্দ্র দেব, যতীন্দ্রমোহন বাগাচী, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, ফররুখ আহমদকে ঈষৎ আধুনিক ভাবা হয়েছে, সেই সূত্রেই তাঁরা ‘উত্তর-আধুনিক’।১১ বাংলার গ্রামীণ ও লোকজীবন অংকনে সিদ্ধহস্ত কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাকের দুটি উপন্যাস মূল্যায়নেও ক্ষেত্রবিশেষে তাঁকে ‘উত্তর-আধুনিক’ বলে মনে করা অবান্তর নয়।
আবু ইসহাক তাঁর তিনটি উপন্যাসেই কাহিনি উপস্থাপনের প্রথানুগ বৃত্তবদ্ধ রীতিটি গ্রহণ করেছেন। তিনি direct method ধরেই অগ্রসর হন, এ-পদ্ধতিতে লেখক সর্বজ্ঞ, তিনি সমস্ত ঘটনা জানেন; তাদের কার্যকারণ সম্পর্কও তাঁর কাছে সুস্পষ্ট, এমনকি চরিত্রসমূহের মনের কথাও তাঁর অজানা নয়।১২ তবু এই উপন্যাসসমূহের
ঘটনা-সংস্থাপন সুপরিকল্পিত বলে তা পাঠককে ধরে রাখার পাশাপাশি পরবর্তী ঘটনার জিজ্ঞাসা ক্রমেই বাড়িয়ে দেয়।
যুদ্ধোত্তর কালের শূন্যতাবোধ, নৈরাশ্য, অবিশ্বাস, অস্তিত্ববাদ প্রভৃতি চিন্তা-চেতনা আমাদের কবিতা-উপন্যাসের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। আবু ইসহাককে এ-জাতীয় ভাবনা বিশেষ প্রভাবিত করেনি। অস্তিত্ববাদ, চেতনাপ্রবাহ রীতি, পরাবাস্তবতাবাদ, জাদুবাস্তবতা, প্লট বিন্যাসে নিরীক্ষা প্রভৃতি আধুনিক ধারণা তাঁর সাহিত্যকর্ম বিশ্লেষণে প্রাসঙ্গিক নয়।
বস্তুত তাঁর সাহিত্য-চেতনা বহিরাগত কোনো দর্শন দ্বারা চালিত হয়নি। তিনি সমসাময়িক অনেক বাঙালি ঔপন্যাসিকের মতো পাশ্চাত্য-প্রভাবিত হয়ে পরীক্ষায় উৎসাহী হননি।
বিশেষত তিনি যে-সকল বিষয় নিয়ে সাহিত্য রচনা করেছেন সেসব বিষয় নিরীক্ষা দাবি করেনি। আবু ইসহাক যেভাবে নিস্তরঙ্গ, কখনো মৃদুচঞ্চল গ্রামবাংলাকে অনন্য নৈপুণ্যে চিত্রিত করেন, সেখানে পশ্চিমা সাহিত্য থেকে আগত কোনো ইজম লেখকের চেতনা জুড়ে বসলে বর্ণিত জীবনচিত্র কতখানি অকৃত্রিম ও বাস্তব হতো তা বলা মুশকিল। তাঁর রচনা কোনো আধুনিক তত্ত্বের ছাঁচে ঢেলে তৈরি নয় বলে তাঁর সাহিত্যকর্মের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রায়ই জসীম উদ্দীনের প্রসঙ্গ টানা হয়। কোনো-কোনো সাহিত্যতাত্ত্বিক ও সমালোচক মনে করেন, পাশ্চাত্য সাহিত্যের আদর্শকে সামনে রেখে আমাদের নিজেদের সাহিত্যের নান্দনিকতা সম্বন্ধে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া ‘বৌদ্ধিক দাসত্ব’ কি না। এই দাসত্ব প্রবণতার সূচনা উনিশ শতকেই। আমাদের সাহিত্যালোচনার বেশিরভাগ এই পাশ্চাত্য-দাসত্বকে মেনে নিয়েই অগ্রসর হয়েছিল। কিন্তু সাহিত্য-সৃষ্টিতে যাঁরা ঔপনিবেশিক শক্তির প্রভাবকে অনেকটাই এড়িয়ে চলেছেন আবু ইসহাক তাঁদের একজন।১৩ বিশেষ করে বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তীকালে পাশ্চাত্য
সাহিত্য-সংস্কৃতির যে-সব তত্ত্ব বা দর্শন আমাদের বহু লেখককে নাড়া দিয়েছে সে-সব অভিনবত্বের প্রতি লেখক আবু ইসহাকের মধ্যে তেমন কোনো আগ্রহের প্রকাশ দেখা যায়নি।
আবু ইসহাকের সাহিত্য-দর্শনের একটি দিক হলো, তিনি শিল্পসৃষ্টিতে প্রকৃতি-প্রদত্ত ক্ষমতাকে মানেন এবং তাঁর বিশ্বাস : প্রতিভা-স্পৃষ্ট উর্বর চেতনা ব্যতীত শুধু কর্ষণের দ্বারা উৎকৃষ্ট সাহিত্যসৃষ্টি অসম্ভব।১৪ এই লেখক সর্বজ্ঞ শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাঁর প্রথম উপন্যাস সূর্য-দীঘল বাড়ির প্লট সৃষ্টি করেছেন। এর কেন্দ্রে রয়েছে জয়গুন, জয়গুনের গ্রামে ফিরে আসা এবং আবারো গ্রাম ত্যাগে বাধ্য হওয়া – এরই মধ্যে উপন্যাসের কাহিনির বিস্তার। কেবল আবশ্যক ঘটনা ও দৃশ্যবর্ণনার মাধ্যমেই ঔপন্যাসিক তাঁর কাঙ্ক্ষিত জীবনচিত্র অংকন করতে পেরেছেন।
যে-চরিত্রের স্বরূপ যতখানি উন্মোচিত হওয়া দরকার লেখক তাকে ততটাই দৃশ্যপটে এনেছেন, তার বেশি নয়। এ-রকম এক বঞ্চিত দারিদ্র্যপীড়িত নিগৃহীত নারীর জীবন-যন্ত্রণা যে নির্মোহ শিল্পীর দৃষ্টিতে আবু ইসহাক অংকন করেছেন তা আমাদের সাহিত্যে সহজপ্রাপ্য নয়। আবশ্যকের বাইরে সামাজিক-রাষ্ট্রীয় অবস্থার বিশদ বর্ণনাতেও যাননি লেখক। তিনি এখানে কোনো নীতিবাদী সমাজতাত্ত্বিক নন, নিছক এক নিরাবেগ কথাশিল্পী – আর এখানেই আবু ইসহাকের মহত্ত্ব।
জীবনদৃষ্টির দিক থেকে আবু ইসহাকের অবস্থান সর্বদাই প্রগতির পক্ষে। প্রথম থেকেই ধর্মান্ধতা-অপবিশ্বাসের বিরুদ্ধে তাঁর শিল্পীসুলভ অবস্থান। তবে সে-বিশ্বাস ও এর প্রকাশ কখনো প্রোপাগান্ডা হয়ে ওঠেনি। সূর্য-দীঘল বাড়ীর প্রায় সর্বত্রই লেখকের অসাধারণ সংযম প্রত্যক্ষ করা যায়। তাই সমালোচক মুনীর চৌধুরীর অভিমত : ‘এ বইয়ে যে জাতীয় পটভূমি ও বিষয়বস্তু একদিক থেকে তার প্রলোভন ক্ষতিকারক হতে পারত। আবু ইসহাক সেই স্বাভাবিক প্রবণতা থেকে নিজেকে রক্ষা করে শিল্পীর মান বাঁচিয়েছেন। তিনি বক্তৃতা দেননি কোনখানে। জীবনালেখ্য সৃষ্টি করতে গিয়ে তত্ত্বালোচনা করেননি। দুর্ভিক্ষের ওপর কেতাব লিখতে বসেননি। নির্ভর করেছেন নিজের সামগ্রিক জীবনোপলব্ধির উপর, নিজের সহানুভূতি, দরদ ও মমত্ববোধের উপর। পরিপূর্ণ প্রেম ও একাত্মবোধ নিয়ে সৃষ্টি করেছেন এক টুকরো জগৎ ও একগুচ্ছ মানুষের চরিত্র। মর্মমূলে মোচড় দিয়ে তারাই বারবার পাঠকের হৃদয় উদ্বেলিত করে তোলে, তাদের জীবনের অন্তর্নিহিত গভীর ও ব্যাপক তাৎপর্যটি অলক্ষ্যে প্রতিফলিত হয় পাঠকের চিত্তপটে।১৫
বস্তুত সূর্য–দীঘলবাড়ী উপন্যাসের কোথাও সামান্যতম অতিকথন নেই। সর্বত্রই লক্ষ করা যায় লেখকের সুলভ পরিমিতিবোধ। উপন্যাসের একেবারে শেষাংশে গদু প্রধানের হাতে করিম বক্শের মৃত্যুর পর লেখক আর পেছন ফিরে তাকাননি। অসাধারণ সংযমের সঙ্গে অতি সংক্ষেপে তিনি সে-অবস্থা বিবৃত করে চলে গিয়েছেন পরবর্তী প্রসঙ্গে।
সূর্য-দীঘল বাড়ী উপন্যাসের সফলতার কারণ কেবল মন্বন্তর-তাড়িত, দুর্বিপাকগ্রস্ত দরিদ্র গ্রামবাসীর বাস্তবনিষ্ঠ জীবনছবি অংকন নয়, পর্যবেক্ষণের গভীরতা সত্ত্বেও উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আবেগের পরিমিতি, চরিত্র নির্মাণে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার প্রতিফলন, প্রকাশভঙ্গির সারল্য এবং বিষয়োপযোগী গতিশীল ভাষা উপন্যাসের শিল্প-সাফল্যের ক্ষেত্রে কার্যকরী হয়েছে। চরম দুঃখ-দারিদ্র্যের বর্ণনায়ও ঔপন্যাসিক ভাষাকে আবেগ-সিক্ত করেন না। অনতিদীর্ঘ বাক্যে যথার্থ শিল্পীসুলভ সংযম-সহযোগে চিত্রিত করেন ঘটনা ও দৃশ্যাবলি : ‘দেশে চালের দর কুড়ি টাকার নিচে নামে না বছরের কোন সময়েই। ফাল্গুন মাস থেকে সে দর আরো চড়ে যায়। চড়ে যায় লাফিয়ে। চল্লিশ টাকায় গিয়ে ঠেকে। আউশ ধান ওঠার আগে এ দর আর নামে না। ফলে যারা টেনেটুনে দু’বেলা খেত, তারা একবেলার চালে দু’বেলা চালায়। ফেনটাও বাদ দেয় না, ভাতের সঙ্গে মিশিয়ে দুধভাতের মত করে খায়। যারা দু’বেলা আধ-পেটা খেয়ে থাক্ত, এসময়ে তারাও শাক-পাতার সঙ্গে অল্প চাল দিয়ে জাউ রেঁধে খায়। ক্ষুধিতের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যায়। পেটের জ্বালায় ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে অনেকে। আশা – দশদুয়ার মেগে এক দুয়ারে বসে খাবে। কিন্তু দশের দশা শোচনীয়। সমস্ত দেশ দিশেহারা। কে দেয় ভিক্ষে।’১৬
পদ্মার পলিদ্বীপ উপন্যাসটি লেখকের সুদীর্ঘ দুই যুগের ভাবনা ও শ্রমের ফসল। সমালোচকের দৃষ্টিতে এই মুখর, চঞ্চল, ঘটনাবহুল, কাহিনিপ্রধান উপন্যাসটির কাঠামো অনাধুনিক। এ-কালের আধুনিকতার মেরুদণ্ডহীন শিল্পাদর্শের বাইরেও এ-ক্ল্যাসিক মেজাজের উপন্যাসের মাহাত্ম্য কম নয়।১৭ দুই যুগব্যাপী একটি শিল্প-পরিকল্পনার প্রতি স্থির মনোযোগ রাখা সহজসাধ্য বিষয় নয়। কারণ এত দীর্ঘ সময়ে জাতীয় ও বিশ্বপটভূমির অনেককিছু বদলে যায়, এমনকি লেখকের ভাবনাজগতেও অনেক পরিবর্তন আসে। এই দুঃসাধ্য সাধনের মূলে ছিল সাহিত্যের প্রতি আবু ইসহাকের অকৃত্রিম নিষ্ঠা।
তাঁর প্রথম উপন্যাসের মতো এটাও পল্লী জীবনভিত্তিক, এখানেও জীবনবোধ তীক্ষ্ণ, বাস্তব জীবনের পরিবেশন
অকৃত্রিম ও সত্যনিষ্ঠ। তবে সূর্য-দীঘল বাড়ীর চাইতে বর্তমান উপন্যাসের পরিমণ্ডল বৃহত্তর, জীবনসংগ্রামের চিত্র এখানে আরো দ্বন্দ্বমুখর ও তীব্র, নাটকীয়তায় তা অধিকতর উজ্জ্বল এবং কাহিনির পটভূমি পরিবেশও ভিন্নতর।১৮
পদ্মার পলিদ্বীপ জটিল ও ঘটনাবহুল উপন্যাস হওয়া সত্ত্বেও এখানে কাহিনি বয়নে লেখকের ধীর-স্থিরতা ও নিপুণতার ছাপ স্পষ্ট। করুণ রসাত্মক সূর্য-দীঘল বাড়ীর তুলনায় এই উপন্যাসে বিচিত্র ভাব, অনুভূতি ও রসের সন্নিবেশ ঘটেছে। পূর্ববর্তী উপন্যাসের চেয়ে পদ্মার পলিদ্বীপ উপন্যাসে বিষয় ও দৃশ্য অনুযায়ী ভাষার কারুকাজ ও বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। এ-উপন্যাসের শৈলীগত দিক আলোচনার ক্ষেত্রে লেখকের কাছে পাঠানো সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্তের চিঠির একটি অংশ স্মর্তব্য : ‘দাঙ্গাবাজ চরবাসীদের কথা অপরেও লিখিতে পারে। কিন্তু তোমার মত এত ব্যাপক, বিস্তৃত, জটিল অথচ সুসংহত এবং স্বচ্ছন্দ কাহিনী কমই পড়িয়াছি। শেষের দিকটায় চমৎকার উপন্যাসের প্রয়াস আছে। কিন্তু কোথাও অস্পষ্টতা নাই। যাহারা অনুক্ষণ প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করিতেছে, কোথাও স্থির হইয়া বসিতে পারে না তাহাদের জীবনেও একটা ছন্দ আছে। তুমি সেই ছন্দ ধরিতে পারিয়াছ। শেষের দিকে একটু আতিশয্য আছে, নচেৎ প্রারম্ভে মধ্যস্থলে কোথাও অস্পষ্টতা নাই, পরস্পরবিরোধী উপাখ্যানের মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করিয়াছ। আমাদের মধ্যে গল্প শুনিবার একটা আকাংক্ষা আছে। এই গ্রন্থে সেই আকাংক্ষা পরিতৃপ্ত হয়।’১৯
তিন
আবু ইসহাকের গল্প-উপন্যাসে চরিত্র অংকন বাস্তব অভিজ্ঞতানির্ভর। এমন কোনো মুখ্য চরিত্র তাঁর উপন্যাসে আসেনি যে-চরিত্রের জীবন্ত কোনো প্রতিরূপ সম্পর্কে তিনি অবহিত নন। সূর্য-দীঘল বাড়ী উপন্যাসের জয়গুন চরিত্র সৃষ্টির ক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জে খাদ্য সরবরাহ বিভাগে কাজ করার অভিজ্ঞতার প্রতিফলন ঘটেছে। বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় জয়গুন চরমভাবে পরিস্থিতির শিকার। উপন্যাসে তার পিতৃ-মাতৃকুলের কোনো প্রসঙ্গ নেই। সে একাধিক পুরুষের পত্নীত্ব বরণ করেছে; উক্ত পুরুষদ্বয় জন্ম দিয়েছে চারটি সন্তান। কিন্তু তার নিজের বা সন্তানদের নিরাপত্তা দেয়নি কেউ। সন্তানদের বাঁচানোর জন্য জয়গুনকেই অর্থ আয়ের পথ খুঁজতে হয়েছে। কিন্তু তাতে সে সমাজের সমর্থন পায়নি, উল্টো সমাজপতিরা যখন তার টুঁটি চেপে ধরেছে তখন জয়গুনের প্রতিবাদী না হয়ে উপায় থাকে না। মা হিসেবে তার সন্তান-বাৎসল্যের কমতি নেই। কিন্তু একাকী লড়াই করে পরিবারের কাউকেই ন্যূনতম স্বাচ্ছন্দ্য বা মৌলিক চাহিদার জোগান দিতে পারেনি। জীবন-সংগ্রাম, সন্তান-বাৎসল্য, প্রতিবাদ, চারিত্রিক দৃঢ়তা মিলিয়ে বাংলা উপন্যাসের এক উল্লেখযোগ্য নারী-চরিত্র জয়গুন। শেষপর্যায়ে ধর্মের নামে অপশাসনের শৃঙ্খল-ভাঙা বাস্তব জীবন-ভাবনায় উজ্জীবিত জয়গুন সহৃদয় পাঠকের চিত্তে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যায়।
করিম বক্শ চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে লেখক অনন্যসাধারণ শিল্প-সজ্ঞানতার স্বাক্ষর রেখেছেন। করিম বক্শকে আমরা মূলত আত্মকেন্দ্রিক অবিবেচক কর্কশ-কঠোর ব্যক্তি রূপেই দেখি। তবে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তার মধ্যেও আমরা পরিবর্তন লক্ষ করি। একজন মানুষ যে আপাদমস্তক শয়তান বা নিষ্কলুষ ফেরেশতা নয় তা বোঝা যায় করিম বক্শকে দেখে। এ-সম্পর্কে কথাসাহিত্যিক রশীদ করিমের মন্তব্য : ‘আমরা উপন্যাসে অবিমিশ্র ভালো আর অবিমিশ্র মন্দ লোক আরো দেখেছি। এভাবে সাদা-কালো চরিত্র তৈরি করা সহজ কাজ। কিন্তু একজন করিম বখশ তৈরি করা সহজ নয়। লোকটিকে কেবল দুর্দান্তই নয় জ্যান্তও মনে হয়। ‘ক্যালিবান’-কে মনে পড়ে। করিম বখশই উপন্যাসের সবচাইতে সার্থক সৃষ্টি। এবং উজ্জ্বলতম অংশ। সে তার হৃদয়হীনতা, স্বার্থপরতা, পাপাচার এবং উচ্চমাত্রার মেজাজ নিয়েও একটি বলিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হতে পেরেছে। কম কথা নয়!’২০
যে নিষ্ঠুর করিম বক্শ দুর্ভিক্ষের সময় স্ত্রী-কন্যাকে ত্যাগ করেছে, শিশুপুত্র কাসুকে মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত করেছে সেই করিম বক্শও পুরোপুরি পাষণ্ড নয়, তাই পুত্র কাসুর অসুস্থতায় সে অস্থির উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে, দীর্ঘদিন পর ভাগ্যবঞ্চিত কিশোরীকন্যা মায়মুনকে দেখে তার সন্তান-বাৎসল্য জেগে ওঠে। সে ভাবে : ‘মেহেরুনকে হত্যা করার সময় যে হাত কাঁপেনি, মায়মুনসহ জয়গুনকে মেরে তাড়িয়ে দেওয়ার সময়ও যে হাত তার বিচলিত হয়নি, আজ সেই হাত কাঁপছে কেন? সেই হাতের শক্তি কোথায়? নিজের মেয়েকে স্পর্শ করার শক্তিও যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে।’২১
শফির মা নিম্নবিত্ত অসহায় নারীর সকল বৈশিষ্ট্যই ধারণ করে। এই শ্রেণির বহু মানুষের নিজের নামটিও একসময় হারিয়ে যায়। ঔপন্যাসিক তাই তার কোনো নাম না দিয়ে তাকে ‘শফির মা’ই বলেছেন। শফির মা নয়টি সন্তানের জন্ম দিলেও বেঁচে আছে কেবল ওই একটাই নাবালক সন্তান। ফলে তাকে বৃদ্ধ বয়সে ভিক্ষা করে চলতে হয়। অপুষ্টিতে অনাহারে অকালে সে বৃদ্ধ হয়েছে, হারিয়েছে চোখের জ্যোতি। শফির মা ভাবে, তার আগের সন্তানদের কথা : ‘ওরা বাঁইচ্যা থাকলে এই দশা আমার? আইজ আমি খরাত কইর্যা খাই! ওরা বাঁইচ্যা থাকলে আমার বাদশাই কপাল আছিল। ওরা কামাই করত। ওগ বউ আইত ঘরে। ওরা রাইন্দা বাইড়্যা সামনে ধরত। সোনার খাটে বইস্যা, রূপার খাটে পাও রাইখ্যা আমি সব দেখতাম আর হুকুম করতাম।’২২
হাসু ও মায়মুন চরিত্র দুটিও নির্বিত্ত গ্রাম্য কিশোর-কিশোরীর স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা-আহ্লাদ, চাঞ্চল্য-ঔৎসুক্য এবং দারিদ্র্যপূর্ণ জীবনের কিশোরোচিত উপলব্ধিতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। হাসু তেরো বছরের কিশোর হলেও দারিদ্র্য ও সামাজিক প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে অল্প বয়সেই বহু তিক্ত ও কদর্য অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে। সে দেখেছে মসজিদের ইমামের কট্টরপন্থী আচরণ, রশীদ কন্ট্রাক্টরের নির্দয় নিষ্পেষণ-প্রচেষ্টা, ছোঁবোন মায়মুনর প্রতি তার শ্বশুরবাড়ির লোকজনের বর্বর আচরণ, করিম বক্শের নিষ্ঠুরতা। তবু সে থমকে যায়নি, মায়ের সংসারের বোঝা অনেকটাই কাঁধে তুলে নিয়ে এগিয়ে যেতে চেয়েছে নতুন দিনের টানে। মায়মুন পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সকল প্রকার বঞ্চনা ও নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছে। একদিকে পিতা তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, অন্যদিকে বাল্যবিবাহের কবলে পড়ে শ্বশুরবাড়িতে সে নিদারুণ মানসিক ও শারীরিক নিপীড়নের শিকার হয়।
লেদু অশিক্ষিত সমাজে এক বিবেকবান চরিত্র। সে যা বোঝে, যা সত্য ও ন্যায্য বলে মানে – তা স্পষ্ট করে ভণিতা ছাড়াই বলে ফেলে। তার মুখে নিরন্ন জীবনের শ্লেষাত্মক বর্ণনা বিশেষ মাত্রা পায়। সে করিম বক্শের পুত্রকন্যাদের প্রতি দায়িত্বহীন আচরণ বিষয়েও সরাসরি প্রশ্ন করেছে – ‘মাইয়ার বিয়াতে গেলা না যে চাচা? তোমার পরাণ কি দিয়া বানাইছে খোদায়? পাথর না পোড়া মাডি দিয়া কও দেহি? দয়া-মায়া কি এক্কেরেই নাই তোমার পরাণে?’২৩
খুরশীদ মোল্লা গ্রামের ফুড কমিটির সেক্রেটারি। সে এলাকার প্রভাবশালী মোড়ল কাজী খলিল বক্শ ও গদু প্রধানের সঙ্গে ওঠাবসা করে। মিথ্যাচার ও নানা কৌশল করে সে দরিদ্রদের পাওনা থেকে বঞ্চিত করে এবং তাদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। অন্যদিকে সে জমিদার, ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বার প্রভৃতি ব্যক্তিকে চিনি সরবরাহ করে। এ-উপন্যাসের জোবেদ আলী ভণ্ড ফকির চরিত্র। সে মিথ্যা গায়েবি পাহারাদারের কথা বলে বছর বছর জয়গুনের মতো বিপন্ন অসহায় নারীর কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়। আবার জোবেদ আলী সুযোগমতো নারীলোলুপতার চরম প্রকাশ ঘটায়। হস্তরেখা গণনার কথা বলে জয়গুনের হাত ধরতে উদ্যত হয়, ‘দেহি না, বেয়ান! বলতে বলতে সে এগোয় – দেহি না তোমার নরম আতহানে কি লেহা আছে।’২৪ উপন্যাসের শেষে যেভাবে করিম বক্শ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে তাতে বোঝা যায় এই নীল-নকশায় জোবেদ আলীর ভূমিকা ছিল। সে আসলে সুযোগসন্ধানী ও দুর্বৃত্ত সমাজপতিদেরই অপরিহার্য সহযোগী।
গদু প্রধান দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিত্তবান প্রভাবশালী দুর্বৃত্ত চরিত্র। ঘরে তার তিন স্ত্রী, তিন পুত্রকেও বিয়ে করিয়েছে। তবু সে বৃদ্ধ বয়সে আরো একজন স্ত্রী গ্রহণে আগ্রহী, যার মূল আর কিছু নয় – আসঙ্গলিপ্সা। সূর্য-দীঘল বাড়ী ও জয়গুনকে নিয়ে সে-ই প্রধান ষড়যন্ত্রকারী। জয়গুনের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়ে প্রতিশোধ নিতে তৎপর হয় গদু। মায়মুনের বিয়ের আসরে গদু তাকে হেয় করে এবং ঘরের বাইরে কাজ করতে যাবে না এই মর্মে তওবা করতে বাধ্য করে। শেষ পর্যন্ত গদু প্রধান ও তার সহযোগীদের দ্বারা করিম বক্শ জয়গুনের ভিটের কাছে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। পরিণামে জয়গুন ও শফির মা সন্তান সহযোগে সূর্য-দীঘল বাড়ী ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।
এ-উপন্যাসের ডাক্তার রমেশ এক পরায়ণতার প্রতীক। তাঁর সর্বপ্রকার সংস্কারমুক্ত মনের পরিচয় ফুটে উঠেছে এই কথায় : ‘মরা-বাঁচা ঈশ্বরের হাত! তবে দেব এক ফোঁটা পটাশিয়াম সায়ানাইড? দেখি কে বাঁচায়?’২৫ এই চরিত্রের জবানিতে ঔপন্যাসিক যেন তাঁর নিজেরই জীবনদৃষ্টি ব্যক্ত করেছেন। গ্রামের অশিক্ষিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন
ধর্মান্ধতা-তাড়িত মানুষের মাঝে সে একটি আলোক-প্রদীপ। তার যুক্তিবাদ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবপ্রেম, জন্মভূমির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা তাকে এক অনন্যসাধারণ মানুষে পরিণত করেছে। তবে তার চরিত্রের এই অতি আদর্শপরায়ণতা অনেকটাই আরোপিত বলে মনে হয়।
পদ্মার পলিদ্বীপের প্রধান পুরুষ চরিত্র ফজল চরের এক প্রত্যয়ী যুবক। উপন্যাসে তাঁর ভূমিকা অনেকটা মহাকাব্যের নায়কের মতো। প্রসঙ্গক্রমে স্মর্তব্য মার্কসবাদী সমালোচক র্যালফ ফক্স মনে করতেন, সমাজ ও প্রকৃতির বিরুদ্ধে ব্যক্তি মানুষের যে-সংগ্রাম, তারই মহাকাব্যিক রূপ হলো উপন্যাস।২৬ পদ্মার পলিদ্বীপ উপন্যাসের পটভূমি এবং এর নায়ক চরিত্রের ক্ষেত্রে এ-কথা বহুলাংশেই প্রযোজ্য। নায়ক হিসেবে ফজল সাহসী, সংগ্রামী, বিচক্ষণ, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, মানবতাবাদী। বৃদ্ধ ও অসুস্থ পিতা এরফান মাতব্বরের স্থলে সে যথাযথ রূপে দায়িত্ব পালন করেছে, চরের লোকেরাও সহজে তাকে গ্রহণ করেছে। স্ত্রী, পিতা-মাতার প্রতি ফজল অত্যন্ত দায়িত্বশীল। পিতৃহীন ভ্রাতুষ্পুত্র নুরুর প্রধান আশ্রয়ও ফজল। তবে সে কেবল অবিমিশ্র সদ্গুণের ধারক নয়। তারও মানবীয় ত্রুটি-বিচ্যুতি ও সীমাবদ্ধতা আছে। তাই সমাজ বা প্রচলিত নীতিবিরুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তারই পরিত্যক্তা এবং অন্য এক পুরুষ হেকমতের স্ত্রী জরিনার সঙ্গে নির্জনে দিবারাত্রি যাপন করেছে।
বিবাহ, তালাক, ইত্যাদিকে ঘিরে ধর্মীয়-সামাজিক সংস্কার, মনের অন্ধকার রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাস করে, এই গল্পের নায়ক সেটিকে পদ্মার জলে ভাসিয়ে দিয়েছে। ব্যাপকভাবে না হলেও সেই বৈপ্লবিক চেতনার ভাঙাগড়া নায়কের চরিত্রে ঘটেছে।২৭
ফজল নিঃস্বার্থ ও উদার বলেই চাচাতো ভাই জাহিদের দাবি অযৌক্তিক হওয়া সত্ত্বেও ফজল তার ভাগ থেকে অর্ধেক জমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পল্লির তথা চরের মানুষ হলেও ফজল একেবারে অশিক্ষিত নয়। জেলে যাওয়ার পর তার মধ্যে একটা পরিবর্তন আসে বিপ্লবী মতি ও তার সহযোগীদের সংস্পর্শে। তার যুদ্ধ পরিকল্পনা, প্রস্তুতি ও চরের লড়াইয়ে তার ভূমিকা মহাকাব্যের নায়কের কথা মনে করিয়ে দেয়। যদিও এ-যুদ্ধ রাজা-রাজড়ার ঢাল-তলোয়ারের যুদ্ধ নয়, নিতান্তই চর দখলের লড়াই। কেবল চর দখল নয়, শেষ পর্যন্ত নিজের বুদ্ধি ও কৌশলের গুণে স্ত্রী রূপজানকে নিজের অধিকারে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে ফজল।
জরিনা বিশেষ প্রভাদীপ্ত মায়াকুশল এক পল্লি-নারী। শ্বশুর এরফান মাতব্বরের অবিমৃশ্যকারী সিদ্ধান্ত তাকে ফজলের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন করে দুর্ভাগ্যের ঘূর্ণিপাকে নিয়ে ফেলে। কিন্তু জীবন থেকে সে পলাতক হয়নি, বরং জীবনের রুক্ষতা জেনেও জীবনকে উপভোগ করতে চেয়েছে। রূপজানদের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করার সময় সে পরিকল্পিতভাবেই রাতের অন্ধকারে প্রাক্তন স্বামী ফজলকে শরীর সমর্পণ করেছে। সংশয় সত্ত্বেও ফজলের প্রতি তার দুর্নিবার আকর্ষণ চরিত্রটিকে রক্তমাংসের মানবীরূপে জীবন্ত করে তুলেছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তাকে এক অবদমিত জীবনের ভেতর বন্দি করে ফেলে। দ্বিতীয়বার জরিনা যার স্ত্রী হয় সে এক সিঁধেল চোর হেকমত। ফজলের মতো পুরুষের সান্নিধ্য লাভ করে একজন চোরকে ভালোবেসে স্বামীরূপে অন্তর থেকে মেনে নেওয়া অসম্ভবই ছিল। হেকমতের প্রতি তার বস্তুত এক ধরনের বিতৃষ্ণা ছিল। সে যেভাবে শাশুড়ি-স্বামী সকলকে ফাঁকি দিয়ে প্রেমিকের সঙ্গে মিলিত হওয়ার চেষ্টা চালায় তা শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের বংশীখণ্ড বা পদাবলির রাধাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। উপরন্তু জরিনার মধ্যে বাঙালি মুসলিম নারীসুলভ ধর্মভয়ও আছে : ‘অন্য সব গুনা মাফ হলেও হতে পারে, কিন্তু শরীরের গুনা কবিরা গুনা। এ গুনার মাফ নেই। সে শুনেছে, সারা জীবনভর আল্লার নাম জপ করলেও শরীরের গুনার শাস্তি থেকে কেউ রেহাই পাবে না। আর কি সাংঘাতিক সে শাস্তি। দুই সাপ এসে কামড়ে ধরবে দুই স্তন। ফেরেশতারা র্গুজু মারবে কুচকির ওপর।’২৮
সমাজ-সংসার সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে জরিনা প্রেমের সাগরে অবগাহন করেছে। এমনকি ফজলের সন্তান সে গর্ভে ধারণ করেছে। শেষ পর্যন্ত জঙ্গুরুল্লার প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তারই লোকেদের হাতে অকালে তাকে প্রাণ দিতে হয়।
সেই তুলনায় অপর নায়িকা রূপজান চরিত্রটি গতানুগতিক। লেখক অনেকটা মধ্যযুগের আখ্যানকাব্যের কবিদের মতো রূপজানের রূপের বর্ণনা দিয়েছেন : ‘যৌবনে পা দেয়ার সাথে সাথে সে রঙের ওপর কে যেন মেখে দিয়েছে জোছনার স্নিগ্ধতা। তার ঈষৎ লম্বা মুখে টিকলো নাক। মমতা মাখানো টানা চোখ। চোখদুটির যেন আলাদা সত্তা আছে। পাতলা ঠোঁট নেড়ে কথা বলার সময় প্রজাপতির ডানার মতো নড়ে তার চোখের পাপড়ি। ঝিলিক মেরে ওঠে ঘন নীল চোখের তারা। হাসবার সময় শশার বিচির মতো ছোট ছোট সুবিন্যস্ত দাঁত দেখা যায় কি যায় না। শুধু রং চেহারাই নয়। স্বাস্থ্যও তার ভালো। দোহারা গড়ন। দিঘল শরীর থেকে লাবণ্য যেন চুইয়ে চুইয়ে পড়ে। মজবুত ভিতের ওপর গঠিত তার পরিপুষ্ট বক্ষে যেন বাসা বেঁধেছে দুনিয়ার লজ্জা।’২৯
জরিনার মতো রূপজানও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তথা প্রবল পিতৃতান্ত্রিক পরিবারের কারণে বঞ্চিত ও ক্লিষ্ট
জীবন-যাপনে বাধ্য হয়েছে। তবে নিটল স্বামীপ্রেম, স্বামীর পূর্বতন স্ত্রী জরিনাকে নিয়ে সন্দেহ-ঈর্ষা, বিরহচেতনা এই চরিত্রটিকে স্বাভাবিক মহিমা দান করেছে।
বৃদ্ধ মোড়ল এরফান মাতব্বর চরের সংগ্রামী জীবনের সাক্ষী – সে ‘সকলের ওপর দিয়ে গাছ মাতব্বর’৩০। তার নেতৃত্বে চরবাসী বারবার লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠা করে বাঁচতে চায়। এরফান নির্লোভ ও বিচক্ষণ, তাই চরবাসী তার অনুগত। সে দলের লোকেদের প্রতি ইনসাফ বজায় রেখে কাজ করে। নেতৃত্বগুণ তার সহজাত এবং চরে তার শাসন গণতান্ত্রিক। অন্য মাতব্বরদের মতো সে ইচ্ছেমাফিক জমির মূল্য নির্ধারণ করে না। বরং সকলের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে নিম্নতম ন্যায্য মূল্যই নির্ধারণ করে। ফলে কোলশরিকরা তাকে পিতৃতুল্য অভিভাবকের সম্মান দেয়। রমিজ মিরধা তাই তাকে বলেছে, ‘উপরে আল্লা আর নিচে আপনে আমাগ বাপের সমান। আপনের কাছে আবদার করমু না তো কার কাছে করমু?’৩১ এক পুত্র রশিদকে হারিয়ে অপর পুত্র ফজলকে লড়াইয়ের নেতৃত্বে পাঠানোর বিষয়টি রাবণের মেঘনাদকে যুদ্ধে প্রেরণের সঙ্গে তুলনীয়। রূপজানের প্রতি শ্বশুর হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও সে জরিনার প্রতি অন্যায় আচরণ করেছিল। তার স্বেচ্ছাচারিতায় ফজল-রূপজানের সংসার ভেঙে দুজন দুদিকে ছিটকে পড়ে।
পদ্মার পলিদ্বীপ উপন্যাসের জঙ্গুরুল্লা প্রতিনায়ক চরিত্র। আশৈশব প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে লড়াই করে সে বেড়ে উঠেছে। অকালে মাতৃহারা জঙ্গুরুল্লার জীবনের প্রথম চল্লিশটি বছর চরম দারিদ্র্য আর দুঃখ-কষ্টে কেটেছে। তরুণ বয়সে কামলাখাটা আদিম-অসংস্কৃত জীবনে তাকে অনেক গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে। সোহরাব মোড়ল আসরের মধ্যে তাকে গালি দিয়েছে ‘জাইতনাশা কুত্তা’৩২ বলে। তার তুচ্ছ জীবনকে একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরো পরিহাস্য করে তুলেছিল
‘পা-না-ধোয়া জঙ্গুরুল্লা’৩৩ উপাধি। পরে অনেকটা নাটকীয়ভাবে ঘড়িশার নায়েবের বদান্যতায় পেয়াদার চাকরি লাভ করে। সেখান থেকে সে অর্থ ও ক্ষমতার স্বাদ লাভ করে। পাঁচ বছরের মাথায় পেয়াদার চাকরি হারালেও ততদিনে সে অনেক পরিণত, অন্য এক মানুষ – ‘আগে ধমক খেলে যার মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম হতো, সে এখন পানির ছিটে খেলে লগির গুঁতো দিতে পারে’।৩৪ মনের জোর বাড়িয়ে কূটবুদ্ধি শিখে দলে লোক ভিড়িয়ে একাধিক চর দখলের লড়াইয়ে সফল হয়। এভাবে তার অর্থ-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। টাকা ব্যয় করে তিন হাজার লোককে ‘জেয়াফত’ খাইয়ে চৌধুরী পদবি গ্রহণ করে। কূটকৌশল খাটিয়ে সে খুনের চর দখল করে। মাজার ব্যবসার পরিকল্পনায় বৃদ্ধ ফুলপুরী পীরবাবার সঙ্গে রূপজানের বিয়ের নীলনকশা তৈরি করে সে। সে ধার্মিক, তবে ধর্মবুদ্ধিকে নিতান্তই লোভ চরিতার্থ করার জাগতিক কাজে প্রয়োগ করে সে। তাই জঙ্গুরুল্লা দোয়া করতে পারে : ‘ইয়া আল্লাহ, এরফান মাতব্বরের পোলা ফজলরে শায়েস্তা করার বুদ্ধি দ্যাও, শক্তি দ্যাও, সুযোগ দ্যাও। ইয়া আল্লাহ থানার বড় দারোগা আমার উপর বড় রাগ, বড় খাপ্পা। ইয়া আল্লাহ, তারে অন্য থানায় বদলি কইর্যা দ্যাও।’৩৫
হেকমত একটি অপ্রধান চরিত্র হলেও ঔপন্যাসিক বিশেষ সহানুভূতির সঙ্গে চরিত্রটি অংকন করেছেন। রূপজানের দ্বিতীয় স্বামী হেকমতের পেশা চুরি করা। কিন্তু তার চোরাই দ্রব্যের একটি বড় অংশ চলে যায় ভদ্রবেশী মহাজনের কাছে। ইচ্ছে থাকলেও মহাজনের কারণে তার চুরি ছাড়বার উপায় নেই। তাতে মহাজনের পোষা গুণ্ডা বাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার ভয় আছে। শক্তিশালী অপরাধচক্রের কবলে পড়ে হেকতম অকালে প্রাণ হারায়।
আরশেদ মোল্লা লোভী ও প্রতারক চরিত্র। কন্যা রূপজানের গয়না তার শ্বশুর বিপদে পড়ে বন্ধক রেখেছিল বলে সে মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে যেতে দেয়নি। মোল্লা নিজের ভাইপোর জমি পর্যন্ত আত্মসাৎ করেছিল। মাছ বিক্রি করাকে খারাপ কাজ বিবেচনা করে জামাতা ফজলের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করেছে। কৌশলে মিথ্যাচার করে মেয়েকে আটকে রেখেছে। এরফান মাতব্বর পুত্রবধূকে নিতে এলে চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের মুরারি শীলের মতো মিথ্যাচার করে সটকে পড়েছে। নিজের অর্থনৈতিক লাভের আশায় কন্যা রূপজানের দিকে না তাকিয়ে জঙ্গুরুল্লার দুরভিসন্ধির সহযোগী হয়েছে সে। জোর খাটিয়ে ফজলের কাছ থেকে তালাকনামায় স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছে।
বরুবিবি চর দখলের লড়াইয়ে সন্তানহারা মা-রূপে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য একটি গ্রাম্য নারীচরিত্র। সেই চর আবার জেগে ওঠার খবরে মায়ের অন্তর নতুন করে ব্যথা অনুভব করে – ‘বরুবিবির বুকের ঝড় থামতে অনেক সময় লাগে। আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে সে মসলা বাটে, চুলো ধরায়। তারপর চাল-ডাল ধুয়ে এনে খিচুড়ি বসিয়ে দেয় এক ডেগ। চুলোর মধ্যে শুকনো লটা গুঁজতে গুঁজতে তার কেবলই দীর্ঘশ্বাস পড়ে।’৩৬
সে কোমল স্নেহপরায়ণ এক নারী। জরিনার সঙ্গে তার আত্মীয়তার সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও সে তার প্রতি সহাভূতিশীল ও স্নেহপরায়ণ আচরণ করেছে।
চার
১৩৫০ বঙ্গাব্দে সংঘটিত বাংলার ভয়াবহ মন্বন্তর সমকালীন প্রায় সকল সচেতন সাহিত্যিক-শিল্পীর হৃদয়ে গভীর দাগ কাটে। বলা যায় এই হৃদয়-বিদারক ঘটনাই জাগিয়ে তুলেছিল জয়নুল আবেদীনের প্রকৃত শিল্পী-চেতনা। বিভূতিভূষণ মন্বন্তর নিয়ে লেখেন অশনি সংকেত (১৯৪৪), তারাশঙ্কর লেখেন মন্বন্তর (১৯৪৪), পঞ্চাশের পথে (১৯৪৪) উপন্যাসটি রচনা করেন গোপাল হালদার। এছাড়া সুকান্ত ভট্টাচার্য, অমিয় চক্রবর্তী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিষ্ণু দে-র কবিতা, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্পে চিত্রিত মহামন্বন্তর পাঠকের হৃদয়কে আজো স্পর্শ করে। এসকল সাহিত্যিকের পরবর্তীকালে আবু ইসহাকের সূর্য-দীঘল বাড়ী মন্বন্তরকেন্দ্রিক সাহিত্যকর্মের তালিকায় প্রথম সারির শিল্পসৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মন্বন্তরের মর্মদ্রাবী ঘটনা যখন সংঘটিত হয় আবু ইসহাকের বয়স তখন মাত্র ১৬-১৭ বছর। তখন লেখকের কলম তিনি হাতে তুলে না নিলেও সময় ও পরিপার্শ্বকে উপলব্ধি করার ক্ষমতা তাঁর হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে রচনা শুরু করে প্রথম উপন্যাসেই সেই পর্যবেক্ষণ ও স্মৃতির যথার্থ প্রতিফলন ঘটালেন তিনি, যা তাঁকে সময় ও সমাজসচেতন লেখক রূপে প্রতিষ্ঠিত করে। ষষ্ঠ পরিচ্ছেদে বিত্তহীন ঘরের শিক্ষাবঞ্চিত কিশোরের দৃষ্টিতে দেশবিভাগের প্রথম দিনের চিত্র তুলে ধরেন লেখক :
১৫ই আগস্ট শুক্রবার, ১৯৪৭ সাল।
হাসু মা-কে মোড়লপাড়ায় নামিয়ে দিয়ে রেল-রাস্তার পাশে আসে। রোজ সেখানে কোষা ডুবিয়ে রেখে সে কাজে যায়। রাস্তায় উঠেই সে চমকে ওঠে। চারদিক থেকে চীৎকারের ধ্বনি শোনা যায়। হিন্দু-মুসলমানে কাটাকাটি শুরু হল না ত! …
একটা গাড়ি আসছে নারায়ণগঞ্জ থেকে। ইঞ্জিনের সামনে একটা নিশান পত্ পত্ করছে বাতাসে। সবুজ রঙের বড় নিশান। মাঝে চাঁদ ও তারা।
গাড়ীর মাঝেও চীৎকার। চারদিকের চীৎকারে আকাশ-বাতাস মুখর হয়ে উঠেছে। গাড়ীটা কাছাকাছি আসতে স্পষ্ট বোঝা যায় – আজাদ পাকিস্তান – জিন্দাবাদ।
… হিন্দু-মুসলমান, ছেলে-বুড়ো – সবাই আছে মিছিলে।৩৭
অপ্রকাশ্য আনন্দে উদ্বেলিত হাসুও স্বাধীনতার আনন্দে সবার সঙ্গে শরিক হতে চায়, গ্রামের সবাইকে জানিয়ে দিতে চায় স্বাধীনতার সুসংবাদ। দেশ-বিভাগের ফলে তার কিশোর চিত্তও নতুন স্বপ্ন-আকাক্সক্ষায় উন্মুখ হয়ে ওঠে :
হাসু বলে – আর আমগ কষ্ট হইব না, কেমুন গো, মা? মাইষ্যে কওয়া কওয়ি করতে আছে ঘাডে পথে। দ্যাশ স্বাদীন অইল। এইবার চাউল হস্তা অইব। মাইনষের আর দুক্খু থাক্ব না।
– হুঁ। জয়গুন সায় দেয়। সে-ও সেদিন গাড়িতে শুনেছে, দেশ স্বাধীন হবে। ভাত-কাপড় সস্তা হবে। কেউ না খেয়ে মরবে না। জয়গুনের সুখের স্বপ্ন আজ সফল হ’ল। সত্যি সত্যি স্বাধীনতা এল আজ।
হাসু বলে – টাউনে আজ বেবাক বাড়িত নিশান ওড়তে আছে, মা। কি সোন্দর, বড় বড় নিশান! তুমি একটা বানাইয়া দ্যাও না।৩৮
স্বাধীনতার আশার বাণী সর্বত্র পৌঁছে দিতে হাসু একটি নিশান বেঁধে দেয় গাছে। ‘জয়গুন নিশানটার দিকে তাকায়। সবুজ নিশান নতুন জীবনের আভাস দেয়। মনে জাগে বাঁচবার আশা।’৩৯ কিন্তু কিছুদিন না যেতেই কাচের প্রাসাদের মতো নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীন মানুষের এ আশা-আকাঙ্ক্ষা গুঁড়িয়ে যায়। তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন হয়নি স্বাধীন পাকিস্তানেও। তাই আশাভঙ্গের বেদনা নিয়ে দুলার চাচা লোকমান বলে, ‘কত আশা-ভস্সা আছিল। স্বাধীন অইলে ভাত-কাপড় সায্য অইব। খাজনা মকুব অইব। কিন্তু কই? বেবাক ফাঁকি। বেবাক ফাঁকি। আবার রেলগাড়ীর ভাড়াও বাইড়্যা গেল।’৪০ ধর্মভিত্তিক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকে অসংখ্য হিন্দু পূর্ববাংলা ছেড়ে পশ্চিবঙ্গে পাড়ি জমায়। আবু ইসহাকের উপন্যাসে এ-প্রসঙ্গটিও এসেছে সবিস্তারে।
সময়-সজ্ঞান, সমাজ-সচেতন ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী ঔপন্যাসিক আবু ইসহাক। তিনি সূর্য-দীঘল বাড়িতে রমেশ ডাক্তার চরিত্র সৃষ্টি করে সেই উদার মানসিকতারই পরিচয় দিয়েছেন। রমেশ ডাক্তার মানবিকতা, দেশপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ভাস্বর এক চরিত্র।
আবু ইসহাকের পদ্মার পলিদ্বীপ উপন্যাসে কাহিনিবিন্যাসে কাল-বিস্তারের (time-span) বিষয়টিও লক্ষণীয়। মহাকাব্যোচিত এই উপন্যাসে সময়ের হিসাবে কোথাও অসংগতি দেখা দেয়নি। উপন্যাসে আমরা দেখি সারদা আইনের বছর (১৩৩৬ বঙ্গাব্দ, ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দ) ১১ বছর বয়সী বালক ফজলের সঙ্গে ১০ বছরের বালিকা জরিনার বিয়ে হয়েছিল। পরবর্তীকালে লেখক চল্লিশের দশকের প্রেক্ষাপটে যে-বয়সী ফজল-জরিনাকে দেখিয়েছেন সেটাই স্বাভাবিক ও সংগত বলে মনে হয়। উপন্যাসের মূল কাহিনির কাল আনুমানিক ১৯৪১-৪২ খ্রিষ্টাব্দ (১৩৪৭-৪৮ বঙ্গাব্দ), যখন ফজলের বয়স ২৪ ও জরিনার ২৩ বছর।
এই উপন্যাসে মূল কাহিনির ফাঁকে-ফাঁকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) প্রাসঙ্গিক ও পরিমিত বর্ণনা রয়েছে, যা থেকে লেখকের সময় ও প্রতিবেশ-সজ্ঞানতার পরিচয় মেলে। জাপানিদের বার্মা দখল, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে বোমা বর্ষণ, যুদ্ধের প্রস্তুতি স্বরূপ ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক জেলেদের নৌকা তালিকাভুক্ত করে ক্রমিক নম্বর লাগানো, খাদ্যাভাব, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, কেরোসিন তেলের অভাব প্রভৃতি প্রসঙ্গ লেখক দক্ষতা সহযোগে মূল কাহিনির সঙ্গে একাত্ম করে দিয়েছেন।
নদীতে স্টিমারের সার্চ লাইট জ্বালিয়ে ব্রিটিশ সৈন্যদের চলাচল গ্রামবাসীর মধ্যে বেশ কৌতূহল সৃষ্টি করে।
যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে ব্রিটিশ সৈন্যদের লাম্পট্যের পরিচয় ও যুদ্ধ চলাকালে তাদের থাবায় বাঙালি নারীর সম্ভ্রম হারানোর চিত্রও রয়েছে এ-উপন্যাসে : ‘আবছা আলোয় দেখা যায় দুজন গোরা সৈন্য বৈঠার খোঁচ মেরে লঞ্চটা পাড়ের দিকে ঠেলছে। তাদের একজন লঞ্চের ডান পাশে এসে বৈঠা দিয়ে পানির গভীরতা মেপে চলে যায় কেবিনের ভেতর। অল্পক্ষণ পরেই একটা মেয়েলোক পাঁজাকোলে করে এনে সে নামিয়ে দেয় কোমর পানিতে। মেয়েলোকটি হুমড়ি খেয়ে পানির ওপর পড়তে পড়তে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। পানি ভেঙে কোনমতে পা টেনে টেনে তীরে উঠে সে বসে পড়ে মাটিতে।’৪১
পদ্মার পলিদ্বীপে দুর্ভিক্ষের চিত্র নেই, তবে দুর্ভিক্ষের পদধ্বনি সেখানেও শোনা গিয়েছে। বার্মা থেকে চাল আসা বন্ধ হওয়া, মিলিটারিদের জন্য ধানচাল মজুদ করা, ফসলহানি প্রভৃতি কারণে দুর্ভিক্ষের কালো মেঘ ক্রমান্বয়ে জমে ওঠার ইঙ্গিত রয়েছে এ-উপন্যাসে। ভারতবর্ষ ছাড়াও বিশ্বের অন্যান্য স্থানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রসঙ্গও লেখক এনেছেন। যেমন অষ্টবিংশতিতম অধ্যায়ে ফজল-পঠিত সংবাদপত্রের উদ্ধৃতি : ‘উত্তর আফ্রিকায় মিত্র বাহিনীর সাঁড়াশী আক্রমণ। রোমেলের দুর্ধর্ষ বাহিনীর পশ্চাদপসারণ।’ ‘ব্রিটিশ বিমান হামলায় আকিয়াবের জাপানী ঘাঁটি বিধ্বস্ত।’ ‘স্তালিনগ্রাদে প্রচণ্ড যুদ্ধ।’৪২
উপন্যাসের মতিসহ বিপ্লবী কয়েকজন তরুণের মাধ্যমে লেখক সন্ত্রাসবাদী দর্শনের শেষ পর্যায়কে তুলে ধরেছেন। ফজল মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে জেলখানায় কয়েকজন আসামির সঙ্গে পরিচিত হয়। ‘ইংরেজ শাসকদের দেশ থেকে তাড়াবার জন্য ওরা গুপ্ত রাজনৈতিক দল গঠন করেছিল। দলের নেতাসহ সাতজন ধরা পড়েছে।’৪৩ এদের সঙ্গে পরিচিত হয়েই ফজল ভারত ও বহির্বিশ্বের সমকালীন অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে এবং নতুন করে উজ্জীবিত হয় জীবন-সংগ্রামে : ‘কাগজ পড়ে সে আরো জানতে পারে, সারা দেশব্যাপী ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছে। দুটি রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে বিরোধ বেড়েই চলেছে। কংগ্রেস চায় অখণ্ড ভারত আর মুসলিম লীগ চায় সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় মুসলিমদের জন্য আলাদা সার্বভৌম রাষ্ট্র – পাকিস্তান।’৪৪
একটি বিশেষ ভৌগোলিক পরিবেশে বসবাসরত মানুষের জীবনাচরণ, ধর্মবিশ্বাস, সামাজিক রীতিনীতির চিত্রণ ঘটায় কোনো কোনো সমালোচক পদ্মার পলিদ্বীপকে আঞ্চলিক উপন্যাস বলতে চেয়েছেন। তবে আলোচ্য উপন্যাসের ভৌগোলিক পরিবেশ ও জনপ্রকৃতি বাঙালি পাঠকের কাছে মোটেই অপরিচিত নয়। তাছাড়া এখানে আঞ্চলিক জীবনচিত্র বিধৃত হলেও তার মধ্যে বাঙালির জাতীয় চিন্তা-চেতনা, তৎকালীন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক অবস্থা প্রভৃতিও দুর্লক্ষ নয়। নিভৃত চরবাসীর জীবনেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অভিঘাত কীভাবে প্রভাব বিস্তার করছে তা আমরা প্রত্যক্ষ করি। বিশ্বযুদ্ধের কারণে মূল্যবৃদ্ধি; কেরোসিন, চাল প্রভৃতির সংকট; জেলেদের নৌকায় নম্বর দেওয়া; ব্রিটিশ সৈনিক-কর্তৃক বাঙালি নারী সবুরনকে ধর্ষণ; ফজলের জেল-জীবন এবং জেল থেকে পালানো; রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্তাপ গ্রহণ প্রভৃতি প্রসঙ্গ উপন্যাসটিকে আঞ্চলিক গণ্ডির বাইরে নিয়ে এসেছে।
আমরা আবু ইসহাকের উপন্যাসশৈলীর দুর্বলতার বাইরে কৌতূহল জাগানো নৃতাত্ত্বিক অভিক্রিয়াকে লক্ষ করব। একজন অমার্কসবাদী লেখকের পক্ষে এই দৃষ্টির স্পষ্টতা মোটেই ছোট কিছু নয়, বরং বড় প্রচেষ্টা। তিনি স্পষ্ট ধরতে পেরেছিলেন বাঙালি নৃতাত্ত্বিকভাবেই ভূমিসংলগ্ন জনজাতি। ভূমি ভিন্ন অন্য কিছু যাদের জীবিকার উৎস হয়ে ওঠেনি, সেখানে ভূমি হারানো বা অনার্জিত থাকা জীবন অনিশ্চয়তারই অভিশাপ। তাই পদ্মা-তীরবর্তী মানুষ চরভাঙাকে জীবন অস্তিত্বের বিপরীত মাত্রা হিসেবেই দেখতে বাধ্য।৪৫
পাঁচ
আবু ইসহাকের উপন্যাসসমূহের অনেক স্থানেই নাটকীয়তা লক্ষ করা যায়। সূর্য–দীঘলবাড়ী উপন্যাসে অল্প পরিসর ও সময়ের মধ্যে অনেক ঘটনা ঘটেছে। জয়গুনের গ্রামে ফেরত আসা, পরিত্যক্ত ভিটেয় নতুন করে বসবাস শুরু করা, গ্রামের মানুষের দেশবিভাগ অবলোকন, মায়মুনের বিয়ে ও শ্বশুরবাড়ি থেকে বিতাড়ন, কাসুর মারাত্মক অসুস্থতা, করিম বক্শের অনুতাপ এসব বৃত্তান্ত বহু নাটকীয় দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে এবং পরিণামে করিম বকশের হত্যাকাণ্ড পষরসধী বা চরম পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
পদ্মার পলিদ্বীপ উপন্যাসে খুনের চর জেগে ওঠা, তা ফজল বাহিনী দখল করে দখল হারানো এবং পুনরায় অধিকার লাভের দৃশ্যের মধ্যেই যাবতীয় ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এর মধ্যে ফজলের ব্যক্তিজীবনে দুই নারীকে নিয়ে টানাপড়েন, তার বন্দি হওয়া, বন্দিত্ব থেকে মুক্তি, চর দখলের সংগ্রাম – এ সবকিছু ঘটনাপ্রবাহকে বিশেষ গতি দান করেছে। এ-উপন্যাসের পরিসমাপ্তিও বেশ নাটকীয়। পুলিশের হঠাৎ ন্যায়নিষ্ঠ আচরণ অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। তবে – ‘পুলিশী তদন্তের ক্ষেত্রে ডেথক্লাচ, ক্যাডাভেরিক স্প্যাজম, অস্বাভাবিক মৃত্যু, মৃতদেহের পোস্টমর্টেম, পুলিশসুপারের নির্দেশ জঙ্গুরুল্লাকে ২১১ ধারায় প্রসিকিউট করার ব্যবস্থার বর্ণনার মধ্য দিয়ে গ্রন্থটির বাস্তবতার ভিত্তিভূমি দৃঢ়তর হয়েছে।’৪৬
ছদ্মবেশী ফজল কর্তৃক রূপজানকে উদ্ধারের কৌশলকে মেলোড্রামাই বলা যায়। এ-অংশটির এরূপ উপস্থাপন হয়তো উপন্যাসের জন্য অপরিহার্য ছিল না। লেখক সচেতনভাবেই উপন্যাসের শেষে সূর্য-দীঘল বাড়ীর মতো করুণ রস সৃষ্টি করতে চাননি, তারই ফল এই মিলনান্তক পরিণতি। অবশ্য এই দৃশ্য সুখপাঠ্য এবং তা কাহিনির সংহতি বা শিল্পবৈশিষ্ট্য ক্ষুণ্ন করেনি মোটেও।
ছয়
আবু ইসহাক তাঁর কথাসাহিত্যে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি বিশেষ নিষ্ঠা প্রকাশ করেননি। প্রায় চার দশক সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত থাকায় এক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ কোনো সম্পৃক্তিও সম্ভব ছিল না। তবে তাঁর রচনায় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা, মানবতাবাদ, শ্রেণিচেতনা, সাম্যবাদ প্রভৃতি দৃষ্টিভঙ্গি বা শুভবোধ যেভাবে প্রকটিত হয়েছে তা বহুলাংশে সমাজতন্ত্রের অনুগামী। তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য বা সত্যেন সেনের মতো তাত্ত্বিক দিক থেকে মার্কসবাদে দীক্ষা নিয়ে সাহিত্য রচনা করেননি। মতির বক্তব্যে যে পরোক্ষ নিরীশ্বরবাদ প্রকাশ পায় তাতে লেখকের নিজস্ব জীবন-ভাবনার ছাপ থাকা অস্বাভাবিক নয় :
মতি বলে, ‘আজ খাওয়াটা খুব জমবেরে ফজল।’
‘হ, আল্লা খুব মেহেরবান।’
‘কিন্তু এই মেহেরবানিটা গতকাল জাহির করলেই ভালো করত আল্লা। কাল খিদের জ্বালায় যখন কষ্ট পাচ্ছিলাম তখন অত বিষ্টি না ছিটিয়ে আমাদের নৌকায় কিছু চিড়ে-মুড়ি ছিটিয়ে দিলে বুঝতাম আল্লা খুব মেহেরবান। তাহলে কি খিচুড়ি মেগে খেতে হতো কাল?’৪৭
সমজাতীয় জীবনবোধ থেকে লেখক সূর্য–দীঘলবাড়ী উপন্যাসের রমেশ ডাক্তার চরিত্রটি সৃষ্টি করেন।
পাকিস্তান সরকারের পুলিশ বিভাগে কর্মরত ইসহাক করাচি ইসলামাবাদে নিয়োজিত থেকেও বাঙালিত্বের গৌরব সর্বদা বজায় রেখেছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন থাকলেও সে-সময় প্রবাসে অসহায় বিপন্ন জীবন-যাপন করতে হয়েছে। তাঁর স্মৃতিকথামূলক একাধিক রচনায় সেই পরিস্থিতির বিবরণ রয়েছে।
সাত
আঙ্গিকের মতো আবু ইসহাক ভাষার ক্ষেত্রেও সাধারণত সরল বর্ণনার আশ্রয় নেন। তাঁর উপস্থাপনশৈলী বা ভাষায়ও বিশেষ কোনো নিরীক্ষা নেই। তিনি দীর্ঘ ও জটিল বাক্য সাধারণত এড়িয়ে চলেন। নিরীক্ষাপ্রিয় লেখকদের মতো তাঁর লেখা মোটেই দুষ্পাঠ্য নয়। সহজেই দ্রুত পড়ে যাওয়া যায় তাঁর রচনা। উপন্যাসের তুলনায় আবু ইসহাকের গল্পের ভাষা আরো সরল। তবে আঞ্চলিক ভাষার দক্ষ প্রয়োগ তাঁর কথাসাহিত্যকে প্রাণবন্ত করে।
সূর্য–দীঘলবাড়ী উপন্যাসের পাত্রপাত্রী প্রধানত নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার অদূরবর্তী গ্রামের বাসিন্দা। আবু ইসহাক শরিয়তপুরের যে অঞ্চলে বড় হয়েছেন সেখানকার সাধারণ মানুষের ভাষার সঙ্গে এ-এলাকার মানুষের ভাষার পার্থক্য কমই। তাছাড়া নারায়ণগঞ্জে অবস্থানকালে জয়গুন-হাসু কিংবা করিম বক্শ শ্রেণির মানুষকে তিনি কাছ থেকে দেখার ও তাদের সঙ্গে কথা বলার অভিজ্ঞতা লাভ করেন। ফলে তাদের মুখের ভাষাকে সাহিত্যরূপ দান আবু ইসহাকের পক্ষে সহজসাধ্য হয়েছে। এখানে লেখকের নিজের বর্ণনার ভাষা নিরাবেগ, কাব্যিকতামুক্ত : ‘দুটি ছেলে-মেয়ের হাত ধরে জয়গুনও গ্রামে ফিরে আসে। বাইরের ছন্নছাড়া জীবন এতদিন অসহ্য ঠেকেছে তার কাছে। কতদিন সে নিজের গ্রামে ফিরে আসার তাগিদ অনুভব করেছে, স্বপ্ন দেখেছে। ছায়াসুনিবিড় একখানি বাড়ী ও একটি খড়োঘর তাকে হাতছানি দিয়ে ডেকেছে কতদিন। কিন্তু বৃথাই ডেকেছে। তার সে বাড়ী, সে ঘর আর তার নয় এখন। দুর্ভিক্ষের মহাগ্রাসে কোথায় গেল বাড়ী আর কোথায় গেল ঘর। বেচে নিঃশেষ করে দিল উদরের জ্বালা মিটাতে।’৪৮
পদ্মা-তীরবর্তী মানুষের ‘আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের দক্ষতা বইটির একটি বিশেষ আকর্ষণ ও সুস্বাদু গুণ’।৪৯ বিশেষ অঞ্চলের জীবনযাত্রা ও ভাষা-সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রগাঢ় ও স্বচ্ছ ধারণা থাকায় উপভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আবু ইসহাকের নৈপুণ্য সমসাময়িক যে-কোনো লেখকের চেয়ে কম নয়। আবু ইসহাকের পদ্মার পলিদ্বীপ সমবিষয়ক অন্য উপন্যাস থেকে অনেকটাই আলাদা। লেখকের নির্লিপ্ত বর্ণনাভঙ্গি ও চরিত্রচিত্রণ সালভেদর কোয়াসিমোদোর সঙ্গে তুলনীয়। তিনি সিসিলির লোকজীবনকে তাঁর সাহিত্যে তুলে এনেছেন। এখানে টমাস হার্ডির উপন্যাসের বিস্তৃতি যেমন আছে অন্যদিকে রয়েছে স্টেইনবেকের বাস্তবতা।৫০ পদ্মার পলিদ্বীপ উপন্যাসে বিশেষ প্রাণসঞ্চার করে একে অকৃত্রিম করে তুলেছে শরিয়তপুরের চরাঞ্চলের উপভাষা। আবু ইসহাক উপন্যাস রচনার জন্য এ-ভাষা শেখেননি, এ-সকল শব্দসম্ভার, উচ্চারণ, বাগ্বিধির সঙ্গে তাঁর আশৈশব পরিচয়। ফলে তিনি নিপুণভাবে উক্ত আঞ্চলিক ভাষা প্রয়োগে সক্ষম হয়েছেন। অবশ্য একটি এলাকায় জন্মালেই যে সাহিত্যে সে-এলাকার আঞ্চলিক ভাষাকে শিল্পরূপদান সকলের পক্ষে সহজসাধ্য হয়, তা-ও ঠিক নয়। কারণ যে-ভাষা মুখে আছে, আছে ধ্বনিতে তাকে সকলে নির্ভুল রূপে বর্ণমালায় তুলে ধরতে পারেন না। আবু ইসহাক ছাত্রজীবন থেকেই ভাষা বিষয়ে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। পরবর্তী পর্যায়ে অভিধান প্রণয়নের মতো দুঃসাধ্য কাজও করেছেন। ভাষার প্রতি তাঁর এই সহজাত প্রীতি ও গভীর ভাষাবোধ এক্ষেত্রে তাঁকে সফল হতে সাহায্য করেছে। পদ্মার চরে বসবাসকারী মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যেমন কোনো আরোপিত শিক্ষা-সংস্কার নেই, তাদের ভাষাও অকৃত্রিম ও সহজাত।
আট
উপন্যাসের মতো গল্পেও আবু ইসহাক মূলত নিরীক্ষামুখী নন। তাঁর দীর্ঘ লেখক-জীবনে আমরা বিশেষ বিবর্তন বা বাঁক পরিবর্তন দেখতে পাই না। রিয়েলিস্টিক ধারার এই লেখক প্রধানত প্রথাগত অবয়ব ও নির্মাণশৈলীতে আস্থা রেখেছেন। গল্পের বিষয়বস্তু ও কাহিনিকে সরাসরি তুলে ধরাই তাঁর উদ্দেশ্য, ক্ষেত্রবিশেষে আছে প্রতীক-ভাবনার প্রয়োগ। ঘটনাবিন্যাসে কখনো কখনো পশ্চাৎ-উদ্ভাসন বা ফ্ল্যাশব্যাক রীতির আশ্রয় নেন তিনি। আবু ইসহাকের গল্পগুলো বিষয়বৈচিত্র্য এবং নিজস্ব অনাড়ম্বর ঢঙে বিশিষ্ট। তিনি গল্প শুরু করেন হঠাৎ প্রবহমান জীবনের ভেতর থেকে, ভণিতাবিহীন ভাবেই – উদ্ঘাটন করেন জীবনের একটি খণ্ডাংশ। একটি মাত্র থিম বা কথাবস্তুকেই লেখক যথাসম্ভব স্বল্প পরিসরে দু-চারটি চরিত্রের মাধ্যমে পল্লবিত করার প্রয়াস পান। কতিপয় গল্পে তিনি তৎকালীন প্রেক্ষাপটে কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামীণ জীবনকে চিত্রিত করার প্রয়াস পেয়েছেন। ‘দাদীর নদী দর্শন’ গল্পে আধুনিক যুগে প্রাচীনপন্থী ধর্মান্ধতার প্রতিভূ দাদির করুণ পরিণতি দেখিয়েছেন লেখক। ‘জোঁক’, ‘বিস্ফোরণ’ প্রভৃতি গল্পে কৃষক-শ্রমিক শ্রেণির সঙ্গে নব্য ধনিক শ্রেণির দ্বন্দ্বের চিত্র রয়েছে। ‘প্রতিবিম্ব’ ও ‘ঘুপচি গলির সুখ’ গল্পে ব্রিটিশ সরকারের তীব্র বৈষম্যনীতির শিকার নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলার চিত্র পাওয়া যায়। এখানে ব্রিটিশ শাসনের শেষের দিকে ভারতবর্ষের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, কলকাতার নাগরিক জীবনের অস্বস্তি, মধ্যবিত্তের জীবনসংগ্রাম, প্রভৃতি দিক উদ্ঘাটিত হয়েছে।
‘পণ্ডশ্রম’ ও ‘পিপাসা’ গল্পদুটো মূলত ভাষা-আন্দোলনের পটভূমিতে রচিত। ‘পণ্ডশ্রম’ গল্পে ভাষা সম্পর্কে বিভ্রান্ত মানুষের অবাস্তব ধারণা তুলে ধরে বাংলা ভাষাকেই গল্পকার বাঙালির সকল স্বপ্ন-কল্পনা, আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে একাত্ম বলে প্রমাণ করতে চেয়েছেন। বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পরও তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের ভিত্তিহীন দেশপ্রেমহীন সংস্কৃতি-চিন্তার পরিণতি চিত্রিত হয়েছে ‘পিপাসা’ শীর্ষক গল্পে। পাকিস্তান-প্রবাসী বাঙালির মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির প্রতি তীব্র আকর্ষণেরও পরিচয় আছে এখানে। ‘মহাপতঙ্গ’ গল্পটি লেখকের অত্যন্ত আধুনিক চিন্তার ফসল। মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে সংঘটিত দুটি বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা ও হিংস্রতা আবু ইসহাকের চিত্তকে যে ব্যথিত করেছে তার প্রমাণ এই গল্পটি। যুদ্ধবিগ্রহের প্রতি লেখকের তীব্র ঘৃণা এই গল্পে অভিনব প্রকাশভঙ্গিতে বাক্সময় হয়েছে।
আবু ইসহাক রচিত ছোটগল্পসমূহ বিষয়গত দিক থেকে বৈচিত্র্যপূর্ণ হওয়ায় নানা শ্রেণির চরিত্র এসেছে এসব গল্পে। গ্রাম্য-শহুরে, বিত্তবান-বিত্তহীন, শোষক-শোষিত সকল চরিত্রই তিনি আঁকেন নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে। তাই চরিত্রগুলোকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া পাঠকের পক্ষে কষ্টসাধ্য হয় না। ‘জোঁক’ গল্পের ওসমান, ‘আবর্ত’ গল্পের নূরজাহান, ‘দাদীর নদী দর্শন’ গল্পের দাদি, ‘কানাভুলা’ গল্পের রিকশাওয়ালা জাহিদ সকলেই আমাদের অত্যন্ত পরিচিত প্রেক্ষাপটের জানাশোনা চরিত্র। আবার ‘শয়তানের ঝাড়ু’ গল্পের জাদুকরের মতো ব্যতিক্রমধর্মী চরিত্র-সৃজনও বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়া সম্ভব নয়।
আবু ইসহাক তাঁর গল্পে প্রায়ই রূপক-প্রতীকের ব্যবহার ঘটান, যা গল্পের শিল্পমূল্য বাড়িয়ে দেয় নিঃসন্দেহে। এক্ষেত্রে লেখকের ‘জোঁক’ গল্পটির কথা স্মরণ করা যায়। ‘মহাপতঙ্গ’ গল্পে তাঁর অসাধারণ কল্পনা-প্রবণতা ও বিশিষ্ট আঙ্গিক-ভাবনার চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে। একাধিক গল্পে লেখক যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে নিজস্ব বক্তব্য প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস পান। গল্পের পরিণতিতে তিনি প্রায়ই ইঙ্গিত, চমক ও বিস্ময় সৃষ্টি করেন; ‘পণ্ডশ্রম’, ‘খুতি’ প্রভৃতি গল্পের পাওয়া যায় ফৎধসধঃরপ রৎড়হু বা নাটকীয় শ্লেষ। তবে গল্প বলার দিকেই লেখকের বেশি ঝোঁক, এর ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দ্রুত তিনি গল্প বলে গিয়েছেন ফলে পরিপার্শ্ব বর্ণনা, পারিপাট্য কিংবা শিল্পোৎকর্ষতার বিষয়টি কখনো কখনো লেখকের যথেষ্ট মনোযোগ লাভ করেনি। তাঁর অনেক গল্পই ঠিক পূর্ণবৃত্ত বা নিটোল নয়, তবে সেখানে আছে নাটকীয় দ্রুতগতি ও anti-climax-এর চমক।
উপন্যাসের তুলনায় গল্পে আবু ইসহাকের ভাষা আরো সহজ-সরল এবং তা সর্বদা গল্পের মেজাজের অনুগামী। একাধিক গল্পে লেখকের পরিহাস-নৈপুণ্য লক্ষণীয়। তাঁর পরিহাস-মিশ্রিত ভাষা দুঃখ-দারিদ্র্য, সামাজিক অসংগতির চিত্র তুলে ধরতে বিশেষ কার্যকরী হয়। যেমন, পরিহাস-কুশল ভাষার গুণে ‘ঘুপচি গলির সুখ’ গল্পে দারিদ্র্যের নির্মম চিত্র অধিকতর বাস্তব ও হৃদয়স্পর্শী হয়েছে :
নাজিরা বাজারের ঘুপচি গলির শেষে, শাহী নর্দমার পাশে, খানদানী দেয়ালের বেষ্টনীর মধ্যে একটা কুঁড়ে ঘর তার বাসা। ভাড়া দশ টাকা।
স্ত্রী খুশী। কারণ এহেন বাসায় তার পর্দার কোনরূপ বরখেলাপ হবে না। আর বাচ্চা-কাচ্চাদের গায়েও বাও-বাতাস লেগে অসুখ করবে না।
হানিফ মহা খুশী। কারণ বেনারসী, জামদানী, ক্রেপ, জর্জেটের ঝলমলানি আর সোনা-গয়নার চকমকানি তার স্ত্রীর চোখে জ্বালা ধরাবে না।৫১
আবু ইসহাকের অধিকাংশ গল্পে বর্ণনার তুলনায় সংলাপের ভাগ বেশি। এছাড়া অনেক গল্পে রয়েছে সুস্পষ্ট নাটকীয় ভঙ্গি। প্লট, কাহিনি, ভাষা সকল ক্ষেত্রে সারল্যই গল্পকার আবু ইসহাকের বৈশিষ্ট্য।
কাহিনি-বয়ন, চরিত্র-নির্মাণ, বর্ণনাশৈলী প্রভৃতি ক্ষেত্রে আবু ইসহাক নিরীক্ষাহীন হলেও তাঁর রচনায় স্বভাবজ প্রতিভাদীপ্তি দুর্লক্ষ নয়। ক্ষেত্রবিশেষে তাঁর সাহিত্যবোধকে উত্তরাধুনিক ভাবনা দ্বারাও বিশ্লেষণ করা সম্ভব। আবু ইসহাকের গল্প-উপন্যাসসমূহ মূলত বাংলার লোকজীবনের শৈল্পিক প্রতিবিম্ব। তাঁর লেখায় প্রকাশ পায় এদেশের গ্রামীণ মানুষ ও প্রকৃতির অন্তর্নিহিত সংবাহিকার প্রতিধ্বনি। তাই মাত্র
সাত-আটটি সাহিত্যগ্রন্থের রচয়িতা হয়েও বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে আবু ইসহাকের উচ্চাসন নির্ধারিত হয়েছে।
তথ্যসূত্র
১. আবু ইসহাক : ‘সাহিত্য-সাধনায় আমার পঁচিশ বছর : স্বাধীনতা উত্তরকাল’; প্রতিপদ, দ্বিতীয় সংখ্যা, এপ্রিল ২০০৫, ঢাকা; পৃ ৩৭৯।
২. ওই; পৃ ৩৭৯-৩৮০।
৩. আবু ইসহাক : স্মৃতিবিচিত্রা, সময় প্রকাশন, ঢাকা ২০০১; পৃ ১১৯।
৪. আবু ইসহাকের নিজ হস্তাক্ষরে লেখা ‘আবু ইসহাক সম্বন্ধে কিছু তথ্য’ (অপ্রকাশিত); পৃ ৮।
৫. আবু ইসহাক : ‘স্মৃতিবিচিত্রা ’, পূর্বোক্ত; পৃ ২৪।
৬. আহমাদ মাজহার : ‘আবদুল হকের চোখে আবু ইসহাক’, ঊষালোকে , পূর্বোক্ত; পৃ ২১৭।
৭. আবদুল মান্নান সৈয়দ : সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্, অবসর, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০০১। ‘প্রবেশক’ অংশ দ্রষ্টব্য।
৮. আহমেদ আমিনুল ইসলাম : বাংলাদেশের চলচ্চিত্র : আর্থসামাজিক পটভূমি, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০০৮; পৃ ২১৫।
৯. আখতারুজ্জামান ইলিয়াস : সংস্কৃতির ভাঙা সেতু, নয়া উদ্যোগ, কলকাতা, ২০০২; পৃ ১৩০।
১০. John Peck and Martin Coyle : Literary Terms and Criticism. 3rd edition : Palgrave Macmillian, England, 2002; p. 127.
১১. ইফতেখার ইকবাল : ‘উত্তর আধুনিকতার প্রকারভেদ প্রসঙ্গে’, লিরিক, (উত্তর আধুনিকতার ভিন্ন দিগন্ত সংখ্যা) চট্টগ্রাম, ডিসেম্বর ২০০৫; পৃ ৯৮।
১২. রথীন্দ্রনাথ রায় : ছোটগল্পের কথা, পু-মু; পুস্তক বিপণি, কলকাতা, ১৯৯৬; পৃ ১০৯।
১৩. সরকার আবদুল মান্নান : ‘পদ্মার পলিদ্বীপ :
লোকজ-জীবনের মহাভাষ্য’; ঊষালোকে, নবপর্যায় পঞ্চম সংখ্যা, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০০৯; পৃ ৯২।
১৪. আবু ইসহাকের সঙ্গে লেখকের ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ, ১৯শে মার্চ, ১৯৯৭।
১৫. উদ্ধৃত, স্বরোচিষ সরকার : ‘আবু ইসহাক জয়যুক্তেষু’, সংবাদ, ২৭শে ফেব্রুয়ারি ২০০৩।
১৬. আবু ইসহাক : সূর্য-দীঘল বাড়ী। পঞ্চম মুদ্রণ : নওরোজ সাহিত্য সম্ভার, ঢাকা, ১৯৯৮; পৃ ৯৪-৯৫।
১৭. বশীর আল হেলাল : ‘আবু ইসহাকের উপন্যাস’, ঊষালোকে, পূর্বোক্ত; পৃ ১৯২।
১৮. কবীর চৌধুরী : প্রবন্ধ সংগ্রহ, শিল্পতরু প্রকাশনী, ঢাকা ১৯৯৩; পৃ ২৩৫।
১৯.আবু ইসহাকের নিকট লিখিত সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্তের ২৮শে জুলাই ১৯৯১ তারিখের পত্র।
২০. রশীদ করিম : ‘একটি বিখ্যাত উপন্যাস’, দীপঙ্কর ২য় বর্ষ, ২য় সংখ্যা, মে-জুলাই, ১৯৮৭; পৃ ১৪-১৫।
২১. আবু ইসহাক : সূর্য-দীঘল বাড়ী, পূর্বোক্ত; পৃ ৯২।
২২. ওই; পৃ ৩৯।
২৩. ওই; পৃ ৭১।
২৪. ওই; পৃ ১১।
২৫. ওই; পৃ ৮৪।
২৬. রালফ ফক্স : উপন্যাস ও জনগণ (অনুবাদ : বদিউর রহমান), প্যাপিরাস, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০০৫; পৃ ৩৮।
২৭. বশীর আল হেলাল : পূর্বোক্ত; পৃ ১৯২।
২৮. আবু ইসহাক : পদ্মার পলিদ্বীপ, পূর্বোক্ত; পৃ ১৫০-১৫১।
২৯. ওই; পৃ ১০৯।
৩০. ওই; ৩২।
৩১. ওই; পৃ ৭৩।
৩২. ওই; পৃ ৩৫।
৩৩. ওই; পৃ ৩৫।
৩৪. ওই; পৃ ৩৭।
৩৫. ওই; পৃ ২২২।
৩৬. ওই; পৃ ২৬।
৩৭. আবু ইসহাক : সূর্য-দীঘল বাড়ী, পূর্বোক্ত; পৃ ২৫।
৩৮. ওই; পৃ ২৬।
৩৯. ওই; পৃ ২৮।
৪০. ওই; পৃ ৬৫।
৪১. আবু ইসহাক : পদ্মার পলিদ্বীপ, পূর্বোক্ত; পৃ ১৪৮।
৪২. ওই; পৃ ২০৬।
৪৩. ওই; পৃ ১১৬।
৪৪. ওই; পৃ ১১৭।
৪৫. হরিপদ দত্ত : ‘পদ্মার পলিদ্বীপ : রাষ্ট্রভূমির প্রতীক’, ঊষালোকে, পূর্বোক্ত; পৃ ৬৭।
৪৬. কবীর চৌধুরী : পূর্বোক্ত; পৃ ২৩৯।
৪৭. আবু ইসহাক : পদ্মার পলিদ্বীপ, পূর্বোক্ত; পৃ ১৩৩।
৪৮. আবু ইসহাক : সূর্য-দীঘল বাড়ী, পূর্বোক্ত; পৃ ৭।
৪৯. জহুরুল হক : ‘বইপ্রসঙ্গ’, দীপঙ্কর, ২য় বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৩৯৪; পৃ ৫৬।
৫০. আখতার-উল-আলম : ‘পদ্মার পলিদ্বীপ’, ঊষালোকে, পূর্বোক্ত; পৃ ২০১-২০২।
৫১. আবু ইসহাক : গল্প সমগ্র, নওরোজ সাহিত্যসম্ভার, বাংলাবাজার, ঢাকা, ২০০৬; পৃ ২০।


Leave a Reply
You must be logged in to post a comment.